বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের করণীয়

আব্দুদ্দাইয়ান মুহাম্মদ ইউনুছ

আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের মাঝে মধ্যে ভাল ও মন্দ অবস্থায় ফেলে পরীক্ষা করা তাঁর চিরাচরিত নিয়ম।তিনি নানা কারণে নানাভাবে ঈমানদারদের পরীক্ষা করেন। মূলত ঈমানের ঘোষণা দেয়ার পর একজন বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীর মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়। কেননা ঈমানদারের জ্ঞানের উৎস আর অবিশ্বাসীর জ্ঞানের উৎস এক নয়। তাই বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীর কর্মজীবনে পার্থক্য দেখা দেয়,  অনুসরণ ও অনুকরণের মানদন্ডে এবং কৃষ্টি ও কালচারে পার্থক্য হয়। এর ফলে প্রচলিত সমাজ ও সভ্যতা এবং মিথ্যা রুসম রেওয়াজের ধারক ও বাহকগণের সাথে দ্বন্ধ সৃষ্টি হয়। কেননা তারা মানুষকে মানুষের গোলামে পরিণত করতে চায়। কিন্তু একজন ব্যক্তি এক আল্লাহতে ঈমান আনার পর নিজে শুধু মানুষের গোলামী ত্যাগ করে আল্লাহর গোলাম হয়ে যায়না বরং অন্যান্য মানুষকেও আল্লাহর গোলামে পরিণত করার জন্য কথা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে দাওয়াত ইলাল্লাহর কাজ করে। যারা মানুষকে মানুষের গোলামের পরিবর্তে আল্লাহর গোলামী করার দাওয়াত দেয়। প্রত্যেক যুগে কায়েমী স্বার্থবাদীদের পক্ষ থেকে তারা বাধার সন্মুখীন হয়েছেন। গালমন্দ, মিথ্যা অপবাদ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে তাদের উপর। অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামাজিক বয়কটের সন্মুখীন হয়েছিলেন তারা। এই ধরনের পরিস্থিতির সন্মুখীন করে আল্লাহ পাক তাঁর বান্দাহদেরকে পরীক্ষা করেন কারা ঈমানের দাবীতে কতটুকু সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী  এবং কারা কতটুকু ধৈর্য্যশীল।
আল্লাহতায়ালা মহাগ্রন্থ আল কুরআনের অনেক জায়গায় সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে তিনি জালিমকে পছন্দ করেন না। তিনি জালিমকে আখিরাতে কঠিন শাস্তি দেবেন। আর দুনিয়াতেও ফেরাউন-শাদ্দাদ, নমরুদসহ কিছু জালিমের করুণ পরিণতি এবং আদ-সামুদসহ বিভিন্ন জাতি ধ্বংস হওয়ার ঘটনা দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। আজকের যুগেও যারা সত্য ও ন্যায়ের পথে চলছেন তারা জালিমদের জুলুমের শিকার হচ্ছেন। জালিমের এই ধরনের জুলুমের শিকার শুধু অমুসলিমদের দ্বারা হচ্ছে না বরং পৃথিবীর অনেক মুসলিম দেশে কিছু মুসলিম শাসকের হাতেও চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অনেক সত্যপন্থী মানুষ। ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, ইরাক, বসনিয়াসহ পৃথিবীর নানা দেশে যখন অমুসলিমরা সরাসরি আক্রমণ করে তখন আমরা তা সহজেই দেখি এবং প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠি। কিন্তু মিসর, বাংলাদেশ, আলজেরিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে মুসলিম শাসকদের হাতে যখন মুসলমানেরা নির্যাতিত হয় তখন সে খবর খুব কম লোকই রাখে। পৃথিবীর মানুষগুলো না জানলেও আল্লাহপাক জানেন কারা কিভাবে কাদের ওপর নির্যাতন করছে এবং মাজলুমের ফরিয়াদ আল্লাহ শোনেন।
আল্লাহতায়ালা অতীতে আবরাহার বাহিনীকে আবাবিল পাখি দিয়ে ধ্বংস করেছেন। ফেরাউন নদীতে ডুবে মরেছে। নমরুদ ক্ষুদ্র মশার কামড়ে নিহত হয়েছে। তিনি বর্তমান জামানার জালিমদেরকেও শায়েস্তা করতে পারেন। বদর যুদ্ধে ফেরেশতা পাঠিয়ে সহযোগিতা করেছেন। তিনি এইভাবে কখন সাহায্য করবেন তা একান্তভাবে তাঁর ইচ্ছা। কিন্তু তাঁর স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে মুসলমানদেরকেই হক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সাধনায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। নানা ধরনের ঘাতপ্রতিঘাত এবং জুলুম নির্যাতন সহ্য করেই সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সব সময় সচেষ্ট থাকতে হবে। এই ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হলে তাদেরকে আল্লাহর রাসূল (সা) এর সুন্নাহ এবং তাঁর সাহাবাদের আদর্শ থেকে সঙ্কট ও প্রতিকূলতা মোকাবেলার জন্য করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। নিম্নে কুরআন ও হাদিস থেকে আমি কয়েকটি পয়েন্ট অতি সংক্ষেপে উল্লেখ করছি :
১. আল্লাহর ফায়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা : আল্লাহর বান্দাহ হিসাবে আল্লাহতায়ালা আমাদের জন্য যেই ফায়সালা করেন তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এইভাবে যারা প্রশান্তচিত্তে আল্লাহর সকল ফায়সালা গ্রহণ করেন তাঁরা ক্বালবে সালিমের অধিকারী হন। আর যারা ক্বালবে সালিমের অধিকারী তাঁরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে ভাল-মন্দ সব কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। এই প্রসংগে আল্লাহ বলেন, এমন কোন বিপদ নেই, যা দুনিয়াতে বা তোমাদের নাফসের ওপর নাজিল হয়, আর আমি একে পয়দা করার আগেই তা এক কিতাব (তাকদিরে) লিখে রাখিনি। এমনটা করা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজ কাজ। (সূরা হাদীদ-২২)
২ আল্লাহর দরবারে ধরনা দেয়া : আল্লাহর বান্দাহরা বিপদ মুসিবতে পতিত হলে অন্য কারো কাছে ধরনা দেয়ার পরিবর্তে আল্লাহর কাছেই ধরনা দেয়। মূলত একজন মুমিন সঙ্কটজনক সময়ে আল্লাহর সাহায্য চায়। যখন দুনিয়ার সকল শক্তি ইসলামী আদর্শের অনুসারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয় তখন তারা ভড়কে না গিয়ে আল্লাহর কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করে। জাগতিক উপায় উপকরণের ওপর নির্ভরশীল থাকে না। তাঁরা নির্ভরশীল থাকে আল্লাহর রহমতের ওপর। জাগতিক সহায় সম্পদ তাদের কম থাকলেও সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাদের কাছে রয়েছে। আর তা হচ্ছে দোয়ার অস্ত্র। আল্লাহর রাসূল (সা) এর ভাষায় দোয়া হচ্ছে মুমিনের অস্ত্র। দুনিয়ার কোন শক্তি যত বড় অস্ত্র নিয়ে আসুক না কেন দোয়ার অস্ত্রের কাছে সব কিছু তুচ্ছ। আল্লাহ যদি ইচ্ছে করেন সকল অস্ত্রকে অকার্যকর করে দিতে পারেন। যা অতীতে অনেক সময় করে তাঁর কুদরত দেখিয়েছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে মু’মিনরা জাগতিক কোন উপায় উপকরণ ব্যবহার করবে নাÑ মু’মিনদেরকে সামর্থ্য অনুসারে জাগতিক উপায় উপকরণ ব্যবহার করতে হবে।
৩. সবর ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে : সঙ্কটজনক সময়ে অনেকে অস্থির হয়ে ওঠেন। অস্থির হয়ে কোন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাই শান্তভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ধৈর্য ও সাহসিকতার সাথেই বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করতে হবে। আর নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। হযরত মুহাম্মদ (সা) এর পবিত্র অভ্যাস এই ছিল যে যখনই তিনি কোন কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতেন তখনই নামাজ আরম্ভ করতেন। আর সে নামাজের বরকতেই তাঁর যাবতীয় বিপদাপদ দূর করে দিতেন। হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে যে, মহানবীকে যখনই কোন বিষয় চিন্তিত করে তুলত তখনই তিনি নামাজ পড়তে শুরু করতেন। নামাজ এবং সবরের মাধ্যমে যাবতীয় সঙ্কটের প্রতিকার পাওয়ার কারণ এই যে, এই দুই পন্থায়ই আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত সান্নিধ্য লাভ হয়।
৪. উগ্রতা প্রদর্শন কিংবা  বাড়াবাড়ি না করা : ঈমানের দাবি হচ্ছে ময়দানে দৃঢ় থাকা কিন্তু কোন অবস্থাতেই উগ্রতা প্রদর্শন কিংবা বাড়াবাড়ি করা যাবে না। কঠিন পরিস্থিতিতে ময়দানে দৃঢ় থাকতে হবে তবে কোন অবস্থাতে শত উসকানির মুখেও সীমালঙ্ঘন করা যাবে না। অনেক সময় বিরোধী পক্ষ উসকানি দেয় যেন সত্যপন্থীরা মেজাজের ভারসাম্যতা হারিয়ে একটু উগ্রতা প্রদর্শন করে। সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চলতে হবে।
৫. মন্দের জবাব উত্তমভাবে দেয়া : আদর্শিক আন্দোলনের কর্মীরা মন্দের জবাব মন্দভাবে দেয়ার কথাচিন্তাই করতে পারে না। এই প্রসংগে আল্লাহপাক বলেন,  (হে নবী!) সৎকাজ ও অসৎ কাজ এক সমান নয়। আপনি অসৎ কাজকে ঐ নেক কাজ দ্বারা দমন করুন, যা সবচেয়ে ভালো। তাহলে দেখতে পাবেন যে, যার সাথে আপনার দুশমনি ছিলো, সে আপনার প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে। সবরকারী ছাড়া এ গুণ আর কারো ভাগ্যে জোটে না। আর অতি ভাগ্যবান ছাড়া আর কেউ এ মর্যাদা লাভ করতে পারে না। যদি কখনো টের পান যে, শয়তান আপনাকে ওয়াসওয়াসা দিচ্ছে, তখনই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান। নিশ্চয়ই তিনি সব কিছু শোনেন ও সব কিছু জানেন। (সূরা ফুসসিলাত : ৩৪-৩৬)
৬ আর্থিক কুরবানি পেশ করা: সঙ্কটজনক মুহূর্তে অনেক সময় আর্থিক সঙ্কট দেখা দেয়। যারা আহত হয় তাদের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। যারা কারাবন্দী হন তাদের পরিবারের খোঁজখবর রাখতে হয়। আবার যারা শহীদ হন তাদের পরিবার পরিজনের প্রতিও দায়িত্ব থাকে। মিথ্যা মামলার কারণে আইনি লড়াইয়ে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গও নানাভাবে আর্থিক সঙ্কটে পতিত হয়। এমতাবস্থায়ও আল্লাহর পথে মালের কুরবানি দেয়ার নজরানা পেশ করতে হয়। তাবুক যুদ্ধে হযরত আবু বকর (রা) তাঁর সকল সহায় সম্পদ আল্লাহর রাসূলের সামনে হাজির করেন। হযরত উমর (রা) তাঁর সম্পদের অর্ধেক দান করেন। আর হযরত উসমান (রা) বিপুল পরিমাণ সাদকা করেন। এইভাবে ইসলামের ইতিহাস অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, সঙ্কটকালে মুমিনরা দান খয়রাত বেশি বেশি করতো। কেননা সঙ্কটকালে দান করা বা ভূমিকা পালন করার সাওয়াব আর সঙ্কট-উত্তরণ হওয়ার পরে দান করা বা ভূমিকা পালনের সাওয়াব এক নয়।
৭. পরস্পর বিবাদে লিপ্ত না হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নষ্ট না করা : কঠিন মুহূর্তে পর্যালোচনা বেশি হয়। এই সময় বিপদের কারণ নিয়ে অনেক সময় পরস্পরের প্রতি দোষ দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণে মতপার্থক্য দেখা দেয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে কোন অবস্থাতেই পরস্পরের বিবাদে লিপ্ত হওয়া যাবে না এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নষ্ট করা যাবে না। আমাদেরকে সব সময় আদর্শের প্রতি অনুগত থাকতে হবে। অনেক সময় মুসলমানদেরকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা করা হয়। সে সময় একদিকে নেতৃত্বের প্রতি অনুগত থাকতে হবে অপর দিকে কখনও কোন কারণে ব্যক্তির পরিবর্তন হলেও আদর্শের প্রতি কমিটমেন্ট রক্ষার ক্ষেত্রে কোন ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না। কেননা ইসলাম ব্যক্তি নয় বরং আদর্শের প্রতি অনুগত থাকতে নির্দেশ দেয়।
৮. বিশ্বাস করতে হবে যে নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথে যারা চলে তারাই বিজয়ী হবে : আদর্শের বিজয়ের ব্যাপারে আত্মপ্রত্যয় থাকতে হবে। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, আল্লাহ লিখে দিয়েছেন যে, আমি ও আমার রাসূলই বিজয়ী হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ বড়ই শক্তিশালী ও জবরদস্ত। তোমরা কখনো এমন দেখতে পাবে না যা, যারা আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে তারা ঐসব লোককে মহব্বত করে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করেছেÑ তারা তাদের পিতা হোক বা পুত্র হোক বা ভাই হোক বা আত্মীয় হোক। তাঁরাই ঐসব লোক, যাদের দিলে আল্লাহর ঈমান কায়েম করে দিয়েছেন এবং নিজের পক্ষ থেকে একটি রূহ দান করে তাদেরকে শক্তি জুগিয়েছেন। তিনি তাদেরকে এমন বেহেশতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচে ঝরনাধারা বহমান। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট হয়েছে। তারা আল্লাহর দলের লোক। জেনে রাখো যে, আল্লাহর দলই কামিয়াব হবে। (সূরা মুযাদালাহ ২১-২২)
৯. সর্বাবস্থায় সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে চলতে হবে : দুর্বলচেতা মানুষ সঙ্কটকালে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ ছেড়ে দিতেও কার্পণ্য করে না কিন্তু বিজয় দেখলে আবার ঈমানদারদের সাথেই থাকতে চায়। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, মানুষের মধ্যে কেউ এমনও আছে যে বলে, আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। কিন্তু যখনই আল্লাহর (প্রতি ঈমান আনার) কারণে তাকে কষ্ট দেয়া হয়েছে, তখন লোকদের চাপিয়ে দেয়া পরীক্ষাকে সে আল্লাহর আজাবের মতো মনে করে নিয়েছে। এখন যদি আপনার রবের পক্ষ থেকে বিজয় ও সাহায্য এসে যায় তাহলে এ লোকটিই বলবে, আমরা তো তোমাদের সাথেই ছিলাম। দুনিয়াবাসীর মনের অবস্থা কি আল্লাহ ভালোভাবে জানেন না? আল্লাহ তো অবশ্যই অবশ্যই যাচাই করে দেখবেন যে, কারা ঈমান এনেছে, আর কারা মুনাফিক। (সূরা আনকাবুত : ১০-১১)
১০. কোন অবস্থাতেই হতাশ কিংবা মনোবল হারানো যাবে না : আল্লাহপাক তাঁর বান্দাহদেরকে হতাশ হতে নিষেধ করেছেন। আমাদেরকে আল্লাহর সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে। সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে এবং আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল রাখতে হবে। জনসংখ্যা বা বস্তুগত কোন ধরনের সহায় সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গর্ব অহঙ্কার প্রকাশ পায় এমন কোন কথা বা কাজ করা যাবে না। হোনাইন যুদ্ধের সাময়িক পরাজয়ে এই শিক্ষাই নিহিত রয়েছে ।
১১. সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও ভিশনারি পরিকল্পনার অধিকারী হতে হবে এবং কৌশলী ভূমিকা পালন করতে হবে: আল্লাহর রাসূল (সা) কর্তৃক মদিনা সনদ ও হুদাইবিয়ার সন্ধি এই ক্ষেত্রে বিরাট নজির হয়ে আছে। তিনি অনেক সময় গন্তব্যস্থলের উল্টো পথে প্রথমে রওয়ানা করতেন। এইভাবে আল্লাহর রাসূল (সা) এর জীবন থেকে অনেক কৌশল জানা যায় যা আজকের সময়েও আমাদেরকে সঙ্কটজনক সময়ে নির্দেশনা দান করে। মুতার যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (সা) পরপর তিনজন সেনাপতির নাম উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু চতুর্থ সেনাপতির নাম উল্লেখ করেন নাই। আল্লাহর রাসূল (সা) যেই তিনজন সেনাপতির নাম উল্লেখ করেছেন তাঁরা সবাই শহীদ হওয়ার পর সাহাবারা চতুর্থ সেনাপতি নিজেদের মধ্য থেকে নিয়োগ করেন।
১২. আমাদেরকে হাওয়ারির দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং মাজলুমের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে : আল্লাহপাক মাজলুমের কথা সরাসরি শোনেন; মাযলুমের ফরিয়াদ সাথে সাথেই কবুল করেন। তাই মাযলুমকে অসহায় মনে করার কোন কারণ নেই। আল্লাহতায়ালা স্বয়ং মাযলুমের সাহায্য করেন। তিনি কখনও ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করেন। আবার কখনও আবাবিল পাখিবা ক্ষুদ্র একটি মশা দিয়েও যালিমকে শায়েস্তা করার মাধ্যমে মাযলুমের সহযোগিতা করেন। মাযলুমের হৃদয়ে দৃঢ়মনোবল সৃষ্টি করে হকের ওপর অটল ও অবিচল রাখার মাধ্যমেও তিনি মাজলুমকে সাহায্য করে থাকেন।
আল্লাহপাক মাযলুমের সাহায্য করেন তাই বলে কি আমাদের কোন করণীয় নেই? আমাদের অবশ্যই করণীয় রয়েছে। রাসূলে কারীম (সা) মাযলুমের সাহায্য করার জন্য সরাসরি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন  ‘‘উনসুর আখাকা যালিমান আও মাযলুমান’’Ñ এই হাদিসের আলোকে জালেম ও মাযলুম উভয়কে সাহায্য করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ আমরা মাযলুমকে সাহায্য করতে পারি কিন্তু যালেমকে কিভাবে সাহায্য করব? আল্লাহর রাসূল (সা) জবাবে বলেছেন জুলুম থেকে বিরত রাখার চেষ্টার মাধ্যমেই যালেমকে সাহায্য করা যায়। যালেম যদি যুলুম করার সময় প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয় তাহলে সে কম জুলুম করবে আর এর ফলে তার কম পাপ হবে। আমাদের সমাজে অনেকই জালেমকে এত বেশি ভয় পান যে তারা জুলুমের প্রতিবাদ করার সাহস পান না। আর কেউ কেউ যালেমকে ঘৃণা করেন সত্য কিন্তু প্রকাশ্যে মাযলুমের সাহায্য করতেও ভয় পান। আর কেউ আছেন তারা নীরব থাকেন এর ফলে যালেম জুলুম করতে আরও বেশি উৎসাহিত হয়। আর কেউ আছেন যালেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর থাকেন এবং মাজলুমকে সকল ধরনের সহযোগিতা করেন। আর কিছু মানুষ আছে তারা মাযলুমের পরিবর্তে জালিমকেই আরও বেশি জুলুম করতে সাহায্য করেন।
আমার আফসোস লাগে আমরা কিভাবে জুলুম দেখে নীরব ভূমিকা পালন করি? মাযলুমের কান্নার আওয়াজ শোনেও না শোনার ভান করি? অথচ আমাদের হাওয়ারির ভূমিকা পালন করার কথা ছিল। আমি মনে করি মাযলুমের কান্না শোনার পরও যদি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করি তাহলে একদিন আমাদেরকে জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে এবং নিজেদের বিবেকের কাছেও অপরাধী হয়ে থাকতে হবে আমরণ। হয়তবা এমন সময় আসবে তখন বর্তমানের ভূমিকার জন্য শুধু অনুশোচনা- কান্নাই করতে হবে। কিন্তু তা বেশি ফলদায়ক হবে না। তাই সময়মত আমাদের করণীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মাজলুমের সাহায্যে কিভাবে অতীতে অনেকই ভূমিকা পালন করেছেন তার উল্লেখ আছে। হযরত ঈসা (আ) তৎকালীন শত্র“দের আক্রমণে অতিষ্ঠ হয়ে যখন আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছিলেন- মান আনসারি ইলাল্লাহ- আল্লাহর দ্বীন প্রচারে কে আমার সাহায্যকারী হবে? প্রত্যুত্তরে ১২ জন লোক আনুগত্যের শপথ করে এবং খ্রিস্টধর্ম প্রচারে হযরত ঈসা (আ)কে সাহায্য করার ঘোষণা দেয়। তাঁরা হযরত ঈসা (আ)-এর আন্তরিক বন্ধু হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। আল কুরআনের সূরা সফে তাঁদেরকেই ‘হাওয়ারি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় (তাফসির মাআরেফুল কুরআন)।
প্রত্যেক যুগে যেমনি যালিম থাকে তেমনি হাওয়ারিও থাকে। যালিমরা যুলুম করে আর হাওয়ারিরা মাজলুমের পক্ষে ভূমিকা পালন করে। আর এটাই পৃথিবীর বাস্তবতা যে, রাতের পরদিন আসে এবং দিনের পর রাত আসে। মানুষের জীবনে কখনও সুখ আসে আর কখনও দুঃখ আসে। নদীতে কখনও জোয়ার আসে আবার কখনও ভাটা আসে। আকাশে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় দেখা দিলেও তা এক সময় থেমে যায়। সব সময় ঘূর্ণিঝড় থাকে না। সব সময় বাতাস একদিকে প্রবাহিত হয় না। বাতাসের গতি সব সময় সমান থাকে না। আল্লাহতায়ালা তাঁর মুমিন বান্দাহদের সব সময় বিপদে রেখেই খুশি হন বিষয়টা এমনটি নয়। তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাহদের আরও বেশি প্রিয়পাত্র বানানোর জন্য পরীক্ষা করেন। এই ক্ষেত্রে কাউকে একটু বেশি পরীক্ষা করেন আর কাউকে কম করেন। কাউকে বেশি সময় পরীক্ষায় রাখেন আর কাউকে কম সময়ের জন্য পরীক্ষা করেন। কাউকে পরীক্ষার সময় গায়েবি সাহায্য পাঠিয়ে দুনিয়াতেই উক্ত বিপদ থেকে রক্ষা করেন। আর কাউকে পরীক্ষার সময় তাঁর দরবারে উঠিয়ে নিয়ে যান। তবে কাকে কখন কিভাবে পরীক্ষা করা হবে এবং উক্ত পরীক্ষার  শেষ পরিণতি কী হবে তা শুধুমাত্র তিনিই জানেন।
অতীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যে আল্লাহর প্রিয় বান্দাহদের ওপর যারা জুলুম নির্যাতন করেছে তারা দুনিয়াতেই ধ্বংস হয়েছে কিন্তু আল্লাহপাক তাঁর প্রিয় বান্দাহদেরকে রক্ষা করেন। ফেরাউন কর্তৃক হযরত মূসা (আ)কে দেশত্যাগে বাধ্য করা এবং হত্যা প্রচেষ্টার সময় ফেরাউন নদীতে ডুবে মারা যায় আর হযরত মূসা ও তাঁর অনুসারীদের জন্য বারটি রাস্তা করে আল্লাহপাক তাদেরকে উদ্ধার করেন। হযরত আসিয়ার ওপর নির্যাতন চলাকালে তিনি আল্লাহর কাছে শাহাদাতের প্রার্থনা করেন আল্লাহপাক তাঁর  দোয়া কবুল করেন। আবার হযরত ঈসাকে শূলিবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হলে আল্লাহপাক তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে যান।
আল্লাহপাক মাঝে মধ্যে তাঁর প্রিয় বান্দাহদেরকে শত্র“র হাত থেকে রক্ষা করেন। শত্র“র চোখের সামনে দিয়ে তাঁরা চলে যান কিন্তু তারা তাঁদেরকে দেখতে পাননি। আল্লাহতায়ালা শত্র“দের চোখে পর্দা দিয়ে দেন। আল্লাহর রাসূল (সা) মদিনায় হিজরাতের সময় যখন সাওর গুহায় ছিলেন তখন ক্ষুদ্র মশার বাসা দিয়ে গর্তের মুখ ঢেকে দেন। ফলে শত্র“রা গর্তের মুখে মশার বাসা দেখে চিন্তাই করেনি যে উক্ত গর্তের ভেতর কেউ থাকতে পারে।
আল্লাহর প্রিয় বান্দাহরা আল্লাহর ফায়সালার প্রতি সব সময় সন্তুষ্ট থাকেন। আল্লাহপাক তাদেরকে কোন বিপদাপদে পতিত করলে তাঁরা কখনও মন খারাপ করেন না কিংবা আল্লাহ অখুশি হতে পারেন এমন কোন উক্তি করেন না। এইভাবে যারা আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকেই আখিরাতে জান্নাত দান করবেন। আর কখনও কখনও দুনিয়াতেও তাদেরকে মহাবিজয় দান করেন। হযরত ইউসুফ, হযরত দাউদ, হযরত সুলাইমান দুনিয়াতেও রাজকীয় সম্মান ভোগ করেন।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাস অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে কোন একটি দেশে কেউ চিরদিন একই অবস্থানে থাকেন না। কেউ কখনও শাসক হয় আবার শাসিত হয়। কখনও জালিম হয় বা মাজলুম হয়। হিটলার তার ক্ষমতার সময় অনেক নির্মম অত্যাচার চালায় কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী হয়ে আছে যে হিটলারের পরিণতিও কত করুণ হয়েছে। হিটলারের শাসনেরও অবসান আছে। ফেরাউন-নমরুদের শাসনেরও শেষ ছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর যেসব দেশে মুসলমানেরা নির্যাতিত হচ্ছে সেসব দেশে সব সময় একই অবস্থা থাকবে না ইনশাআল্লাহ। সময়ের আবর্তনে যেমনি রাতের গভীরতার পর সোবহি সাদেকের আলোকরশ্মি দেখা দেয়। অনুরূপভাবে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় জালিমদের পতন ঘটবে। আর মাজলুম মানবতা খুঁজে পাবে ন্যায় ও ইনসাফের সৌধের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সুন্দর সমাজ। এই জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, হিকমাত ও সাহসিকতার সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা করা। জাগতিক উপায় উপকরণের পরিবর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা করে পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় প্রচেষ্টা চালানো। সর্বদায় হকের ওপর অটল ও অবিচল থাকা এবং শত উসকানি ও বাড়াবাড়ি সত্ত্বেও সীমালঙ্ঘন না করা।
লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply