বহুমাত্রিক আবদুল মান্নান তালিব

মোশাররফ হোসেন খান
২২ সেপ্টেম্বর ২০১১।
এই দিনে চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, অনুবাদক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক, সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আমাদের প্রিয় ভাই- আবদুল মান্নান তালিব। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।
আবদুল মান্নান তালিব ছিলেন একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। গোটা জীবন তিনি সাহিত্য, মুসলমানদের কল্যাণ ও ইসলামী জীবনাদর্শের প্রতিষ্ঠা প্রচার ও প্রসারে অতিবাহিত করেছেন। আপন ধর্ম, ঐতিহ্য, জাতীয় পরিচয় ও সত্যের সন্ধানে তিনি নিবেদিত ছিলেন। তাঁর গবেষণা ও অনুসন্ধানের ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে ইসলামী সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিশাল চত্বর।
আবদুল মান্নান তালিব এক বিরল প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। একই সাথে তিনি কুরআন, হাদিস, ফেকাহ, আইন, ইতিহাস, আন্তঃধর্ম, সাহিত্য, ইসলামী সাহিত্য, কবিতা, ছন্দ ইত্যাদি বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখতেন।
আমাদের সমাজে একই সাথে এতো গুণের সমাহার তেমনটি দেখা যায় না। এখানে যারা সাহিত্য করেন সাধারণত তাঁরা অন্য বিষয়ে আগ্রহী থাকেন না। আবার যারা গবেষণা বা অনুবাদে অবদান রাখেন তাঁরা মৌল সাহিত্যের বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী হন না। যারা আরবি জানেন তাঁরা হয়তো অনুবাদ করতে পারেন কিন্তু মৌলিক সাহিত্যে তেমন অবদান রাখতে সক্ষম হন না। এ ক্ষেত্রে আবদুল মান্নান তালিব ছিলেন দুই ধারী তরবারির মতো। তিনি সকল বিষয়ে সমান দক্ষতা ও পাণ্ডিত্যের ছাপ রেখেছেন। এটা একটি বিস্ময়কর বিষয় বটে!
তিনি ছিলেন কুরআন-হাদিসে সুবিজ্ঞ এবং সাহিত্য সাধনায় পথিকৃৎতুল্য। আল কুরআন ও হাদিস অনুবাদের পাশাপাশি ইসলামী নানা বিষয়ে বহু গ্রন্থ তিনি অনুবাদ ও রচনা করেছেন। শিশুদের মানস গঠনের জন্যও তিনি লিখেছেন প্রচুর।
আগেই বলেছি, আবদুল মান্নান তালিব ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। তাঁর লিখিত ও অনূদিত গ্রন্থসমূহ সামনে রাখলে এই বক্তব্য আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তাঁর গ্রন্থসমূহের একটি তালিকা একটু পাঠ করা যাক :
মৌলিক গ্রন্থ : অবরুদ্ধ জীবনের কথা (১৯৬২), মুসলমানের প্রথম কাজ (১৯৭৫), বাংলাদেশে ইসলাম (১৯৭৯), ইসলামী সাহিত্য: মূল্যবোধ ও উপাদান (১৯৮৪), আমল আখলাক (১৯৮৬), ইমাম ইবনে তাইমিয়ার সংগ্রামী জীবন (১৯৮৭), ইসলামী আন্দোলন ও চিন্তার বিকাশ (১৯৮৮), সাহিত্য সংস্কৃতি ভাষা : ঐতিহ্যিক প্রেক্ষাপট (১৯৯১), ইসলামী জীবন ও চিন্তার পুনর্গঠন (১৯৯৪), সত্যের তরবারি ঝলসায় (২০০০), আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ ও ইসলাম (২০০১)।
শিশু-কিশোর সাহিত্য : সহজ পড়া (১৯৮২), ছোটদের ইসলাম শিক্ষা ১ম ভাগ (১৯৮০), ২য় ভাগ (১৯৮১), ৩য় ভাগ (১৯৮২), ইসলাম শিক্ষা ১ম ভাগ (১৯৭৬), ২য় ভাগ (১৯৭৬), এসো জীবন গড়ি ১ম ভাগ (১৯৭৫), ২য় ভাগ (১৯৭৫), পড়তে পড়তে অনেক জানা (২০০০), মা আমার মা (২০০১), আমাদের প্রিয় নবী (১৯৭৫), মজার গল্প (১৯৭৬), কে রাজা (১৯৮১), হাতিসেনা কুপোকাত (১৯৯০), আদাবুল আরারিয়া (১৯৮৪)।
সম্পাদিত গ্রন্থ : আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা (১৯৬৯), সহীহ্ আল বুখারী ১ম খণ্ড (১৯৮২), সহীহ আল বুখারী ৩য় খণ্ড (১৯৯৬), রিয়াদুস সালেহীন ১ম খণ্ড (১৯৮৫), মুসলিম শরীফের মুকদ্দমা (১৯৮৬), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৫), সত্য সমুজ্জ্বল (১৯৮১), রসূলের যুগে নারী স্বাধীনতা ১ম খণ্ড, ২য় খণ্ড ও ৪র্থ খণ্ড (১৯৯৫-২০০৪)।
অনুবাদ সাহিত্য : খতমে নবুয়ত (১৯৬২,) ইসলামের নৈতিক দৃষ্টিকোণ (১৯৬৪), ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলন (১৯৬৫), ইসলামের দৃষ্টিতে জীবন বীমা (১৯৬৬), ইসলামের সমাজ দর্শন (১৯৬৭), পয়গামে মোহাম্মদী (১৯৬৭), সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং (১৯৭৯), আত্মশুদ্ধির ইসলামী পদ্ধতি (১৯৭৬), আত্মশুদ্ধি কিভাবে (১৯৭৬), ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক জাহেলিয়াত (১৯৭৫), ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার মূলনীতি (১৯৬৮), মুসলিম নারীর নিকট ইসলামের দাবী (১৯৮২), মহররমের শিক্ষা (১৯৭৭), ইসলামী আন্দোলন : সাফল্যের শর্তাবলী (১৯৭৫), কুরবানীর শিক্ষা (১৯৭৬), চরিত্র গঠনের মৌলিক উপদান (১৯৬৮), রাসায়েল ও মাসায়েল ২য় খণ্ড (১৯৯১), ৩য় খণ্ড (১৯৯১), যরবে কলিম (কাব্য গ্রন্থ, ১৯৯৪), সীরাতে সরওয়ারে আলম ১ম খণ্ড (১৯৮১), রাসূলের যুগে নারী স্বাধীনতা ৩য় খণ্ড (১৯৯৪), রিয়াদুস সালেহীন ২য় খণ্ড (১৯৮৬), ৩য় খণ্ড (১৯৮৬), ৪র্থ খণ্ড (১৯৮৭), ইরান বিপ্লব একটি পর্যালোচনা (১৯৮২), সহীহ আল বুখারী ৪র্থ খণ্ড (১৯৮২), তাফহীমূল কুরআন ১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম, ৯ম, ১০ম, ১১তম, ১২তম, ১৩তম ও ১৯তম খণ্ড (১৯৮৯-১৯৯৪), ভারত যখন ভাঙলো (২০০২), প্রত্যয়ের সূর্যোদয় (২০০৩), অপরাজিত (২০০৩)।
এছাড়াও তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সাংবাদিক ও সম্পাদক। তিনি সম্পাদনা করেছেন- সাময়িক পত্র ‘জিয়াউল ইসলাম’ সম্পাদনা (বার্ষিকী ১৯৫২, বীরভূম পশ্চিম বঙ্গ), সহ-সম্পাদক, উর্দু দৈনিক ‘রোজনামা তাসনীম’ (লাহোর ১৯৫৭-৫৯), সহ-সম্পাদক ‘দৈনিক ইত্তেদাহ’ ঢাকা (১৯৫৯-৬০), সম্পাদক ‘সাপ্তাহিক জাহানে নও’ (১৯৬২-৬৬), সম্পাদক ‘মাসিক পৃথিবী’ (১৯৬৯-৭১ ও ১৯৮১-৯৯), ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ‘সাপ্তাহিক মীযান’ (কলিকাতা ১৯৭৩-৭৫) সম্পাদক, ‘ত্রৈমাসিক ও মাসিক কলম’ (১৯৭৭-৯৪), সম্পাদক শাহীন শিবির, দৈনিক সংগ্রাম (১৯৭০-৭১), ১৯৮৩ থেকে দৈনিক সংগ্রামের কলামিস্ট ও ফিচার এডিটর হিসেবে ছিলেন।
জ্ঞানপিপাসা ছিল তাঁর অদম্য। আজীবন পঠন-পাঠন এবং জ্ঞানপিপাসায় ছিলেন তিনি অতৃপ্ত এক চাতকের মতো। ১৯৮৬ সালের কথা। একবার একটি পত্রিকায় ইতিহাসবিষয়ক একটি বইয়ের পরিচিতি ছাপা হয়েছিল। ঠিকানা দেয়া ছিল শান্তিনগর। বাসার নম্বরটিও ছিল। বইটি সম্ভবত ইতিহাসবিষয়ক ছিল যতদূর মনে পড়ছে। তালিব ভাই আমাকে নিয়ে এক সন্ধ্যায় বের হলেন বইটির খোঁজে। আমরা তিন ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করেও ঠিকানার হদিস পাইনি। ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলাম। তালিব ভাই বইটি না পেয়ে সেদিন বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন। এমন জ্ঞানতৃষ্ণা আমি খুব বেশি কারও মধ্যে দেখিনি।
তালিব ভায়ের সাথে আমার পরিচয় ১৯৮৬ সাল থেকে। এটা হলো সাক্ষাৎ পরিচয়ের কাল। এর আগেও তাঁর সাথে পরিচয় ছিলো লেখালেখির ময়দানে। পরিচয়ের পর থেকেই আন্তরিকতা ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। যা অব্যাহত ছিল শেষ পর্যন্ত। যতবারই তাঁকে দেখেছি, যতবেশি তাঁকে দেখেছি, তাঁর যত কাছাকাছি গিয়েছি বলতে দ্বিধা নেই, ততই মুগ্ধ হয়েছি। তাঁর মধ্যে এক সম্মোহনি শক্তি ছিলো। ছিলো মানুষকে কাছে টানার, আপন করে নেয়ার এক অপরিসীম দক্ষতা ও ক্ষমতা।
আবদুল মান্নান তালিব ছিলেন স্বল্পভাষী। বিনয় ও ভদ্রতা ছিলো তাঁর একান্ত ভূষণ। যেটা এই সমাজে সহজলভ্য নয়।
কবি, সাহিত্যিক, চিন্তাশীল লেখক ও গবেষকরা মানুষের কথা ভাবেন। সমাজের কথা ভাবেন। দেশ ও জাতির কথা ভাবেন। বিশ্বের কথা ভাবেন এবং সেটা প্রকাশ করেন তাঁদের লেখা ও বক্তব্যে। কিন্তু তাঁদের নিয়ে ভাববার তেমন কেউ আছে বলে আমার মনে হয় না। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। দুর্ভাগ্যের তো বটেই। যাঁরা গোটা জীবনটাই ব্যয় করেন সৃষ্টিশীলতায়, দেশ জাতির জন্য, শেষ পর্যন্ত তাঁরাই থেকে যান সকলপ্রকার হিসাবের বাইরে। অতীত ও বর্তমান তো সেই সাক্ষ্যই বহন করে।
তালিব ভাইয়ের জীবনও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। নানা মাত্রিক লাঞ্ছনা, অপমান, অবহেলা তাঁকেও বারবার স্পর্শ করেছিলো। লেখকদের জীবনে যে ধরনের বিড়ম্বনা ও বিসম্বাদ আসে, তাঁর জীবনেও তেমনটি এসেছিলো। গুণীর মর্যাদা পাওয়ার প্রত্যাশা করা কিংবা সৃষ্টিশীল কাজের বিনিময় পাওয়া এই সমাজে আদৌ কি সম্ভব! তেমনটিই আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে প্রতি নিয়ত বেদনার সাথে। জানি না এই বেদনার ভার আর কতদিন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বয়ে বেড়াতে হবে!
লেখক : কবি ও সম্পাদক
নতুন কলম ও নতুন কিশোরকণ্ঠ

SHARE

Leave a Reply