বাঁশের ঘরে, হলুদ পাখি -মুহা: ওমর ফারুক

চিরসবুজ এ পৃথিবীর আলিঙ্গনের চেয়ে তিনি বাতিল শক্তির রক্তলোলুপ বুলেটের নিষ্ঠুর আলিঙ্গনকেই বেশি পছন্দ করলেন। ইসলামী আন্দোলনের পথপ্রদর্শক আল কুরআনের বিপ্লবী আহবানে, আমিনুরের মত অসংখ্য মুজাহিদ সর্বস্ব ত্যাগ করে সাড়া দিয়েছেন বলেই এক সময় ইসলামই বিশ্বমানবতার পথ দেখিয়েছিল। আজ ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যখন শহীদ আমিনুরের মত ত্যাগ স্বীকার করে জেহাদের উত্তপ্ত ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বে। সুন্দর সুঠাম দেহের অধিকারী সুদর্শন যুবক বাংলা পড়ালেখা শেষ করে যেন স্বপ্ন দেখছিলেন। মা-বাবার ৮ ছেলের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম। বৃদ্ধ বাবাকে সহায়তা করা এবং ঘুণেধরা এ সমাজকে সুন্দর করার জন্য মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ করার। তখনই হিংস্র রাজনীতিবিদদের আজন্ম শাসন ধরে রাখার বাসনা বাস্তবায়নে প্রশাসন ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং কে আগে গুলি করতে পারে এ প্রতিযোগিতা শুরু করে। কিছুক্ষণ গুলির শব্দ, আহত কয়েকজন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে আর মুখে উত্তাল হাসির ছাপ নিয়ে সদর হাসপাতালের প্রবেশদ্বারে চিরনিদ্রায় শহীদ আমিনুরের বস্ত্রহীন লাশ। পরনে শুধু একটি জাঙ্গিয়া, সিনা বরাবর গভীর ক্ষত সেখানে বেলুনের মত উঁচু বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। আর ইসলামী আদর্শবাহী দলকে নিষিদ্ধ করে বা ব্যক্তি হত্যা করে, আদর্শকে হত্যা করা যাবে না। শাহাদাতের পূর্ব মুহূর্তে এ কথাগুলো বাতিল শক্তিকে জানিয়ে উড়ে গেল শহীদ আমিনুরের আত্মা। এই তো কদিন আগে মিছিলে আমার ডান পাশে চেক কাটা টি শার্ট, পরনে প্যান্ট, পায়ে জুতা, সুন্দর এক টকবগে যুবক দুর্দান্ত সাহসী, বলিষ্ঠ ঈমান। আমি একটু টেনে ধরতে চেয়েছিলাম, আমাকে শুনিয়ে দিলেন কারোর পক্ষে চিরদিন দুনিয়ায় থাকা সম্ভব নয়। সবাইকে আল্লাহর আদেশে এই পৃথিবী ছাড়তে হবে। আমি সমঝে গেলাম। কয়েক দিন পর আমরা কয়েকজন একটি মিটিংয়ে ছিলাম। হঠাৎ ফোন এলো, জানলাম ছাত্রশিবিরের কেন্দ্র ও শহর দায়িত্বশীলগণ দুপুরে খাওয়া শেষ করেছে মাত্র। বাতিল শক্তির আক্রমণে ৮ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কারোর মৃত্যুও হতে পারে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের প্রবেশমুখে মানুষের ভিড়। প্রশাসন ঘিরে রেখেছে পুরো এলাকা। গেটে ঢুকতেই শহীদ আমিনুরের লাশ। শরীরে একটি কাপড়ও নেই! তলায় একটি বিছানাও নেই, রক্তমাখা নিথর দেহ, পাশে তার সঙ্গীদের যাওয়ার অধিকার নেই, নেই অধিকার স্বজনদেরও। কেউ একনজর দেখতেও পারছে না “উহ! ভাবা যায় এ দৃশ্য! রক্তাক্ত বস্ত্রহীন দেহ, হাস্যোজ্জ্বল নীরব চাহনি আমাকে প্রচণ্ড ব্যথিত করে, যা প্রকাশ করার সাধ্য বা ভাষা আমার জানা নেই। কেঁদে ওঠে অন্তর। শহীদ আমিনুর যখন ৯ম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন কালিগঞ্জ শাখার সাথী, বর্ষার দিন বিকেল ৩টায় সাথী বৈঠক। আমি একটু আগেই পৌঁছে গেলাম। থানা সভাপতি আ: রব। তিনি অত্যন্ত যোগ্য ও দক্ষ দায়িত্বশীল ছিলেন। তার সাথে সাংগঠনিক আলাপ করছিলাম। একটি ছেলে প্রবেশ করলেন হাতে পলিথিনের একটি ব্যাগ। আমার নজর তার দিকে গেল। দেখলাম পোশাক পরিবর্তন করছেন। আমি আ: রব ভাইকে বললাম, কী ব্যাপার? তিনি শুনালেন, আমিনুরের বাড়ি থেকে পিচের রাস্তা প্রায় ৩ কিলোমিটার কাদা। এ জন্য তিনি পোশাক ব্যাগে করে নিয়ে আসেন এবং এত কষ্ট করে সব প্রোগ্রামে আগেই আসেন। আমার সেই ছোট্ট দ্বীনের মুজাহিদ আমিনুরকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, আল্লাহ আপনাকে অনেক বড় দায়িত্বশীল করবেন। আজ যখন লিখতে বসছি তখন আপনি আমাদের থেকে অনেক দূরে। আপনার মুখমন্ডলে জান্নাতি জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আপনি জান্নাতের হলুদ পাখিদের সাথী, কিন্তু সেদিন হাসপাতাল গেটে বস্ত্রহীন একটি জাঙ্গিয়া পরা তাও রক্ত আর ধূলি-বালুতে বিবর্ণ। এ দৃশ্য দেখে ১৪০০ বছর পূর্বের কথা স্মৃতিতে ভেসে ওঠে। ওহুদ যুদ্ধের ময়দান, যুদ্ধ শেষ হয়েছে। শহীদদের দাফন কাফনের প্রস্তুতি চলছে। এরই মধ্যে হযরত মুসআব (রা:)-এর লাশ পাওয়া গেল। শরীরে জোড়াতালি দেয়া শত ছিন্ন জামা। ক্ষতবিক্ষত তবুও তার চেহারা দিয়ে আল্লাহর নূর চমকাচ্ছে। নবী (সা:) মুসআব (রা:) এ অবস্থা দেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে লাগল। উপস্থিত সাহাবীদের চোখও অশ্রু সজল হয়ে উঠল। তাকে দাফন দেয়ার মুহূর্তে সামান্য এক টুকরো কাপড় ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেল না। তা দিয়ে মাথা ঢেকে দিলে পা বেরিয়ে যায়, আর পা ঢেকে দিলে মাথা বেরিয়ে যায়। ধনীর আদরের দুলালের শরীরে জামা আর কাফনের এ অবস্থা। শহীদ মুসআব (রা:)কে কবরে রেখে নবী (সা:) দোয়া করলেন ইসলামের জন্য মুসআব (রা:) শহীদ হয়েছে। তাকে পরিপূর্ণ কাপড় দিতে পারলাম না, তুমি তাকে জান্নাতে সম্মানিত কর। আল্লাহর রাসূলের এ দোয়া শুনে সাহাবীরা কেঁদে উঠলেন। এ লাশটি ! কেন আমাদের হলো না। আপনার এ অবস্থা দেখে দোয়া করি আল্লাহ যেন মুসআব (রা:)-এর সঙ্গে আপনাকে জান্নাতের ব্যবস্থা করেন। ব্যথাভরা মনে শহীদ আমিনুরের বাড়িতে গেলাম। ছাত্রজীবনে একবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আর অনেক দিন পর আজ। খুব খারাপ লাগছে, আদর্শ মানুষ হবে, দ্বীনের মুয়াজ্জিন হবে, এ প্রতিশ্রুতিতে একদিন এ বাড়িতে দাওয়াত নিয়ে আসা দ্বীনের এ মুজাহিদের আজ মৃত্যুর খবর দেয়া অনেক কষ্টের। উঠানে অনেক মানুষ বসা, আমি কুণ্ঠিত, তাদের সামনে যেতে পারছি না। এক পর্যায়ে বারান্দায় বসলাম, শুনতে পেলাম তার বাবা-মায়ের অশ্রুসিক্ত ভাষা। প্রথমেই আমি চিন্তিত হলেও পরক্ষণেই বুঝলাম শহীদের পিতা-মাতা কতখানি মনোবলের অধিকারী হন। বাবা বললেন, যখন আমি শুনেছি একজন শহীদ হয়েছে তখন আমি বুঝেছি আমার আমিনুরই শহীদ হয়েছে। এইতো গত কয়েকদিন আগে আমার সাথে দেখা করে বলছিল, দেশ ও দ্বীনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। অনেক রক্ত ঝরবে, বাড়তে পারে শহীদের মিছিল। আব্বা আপনার তো ৮টি ছেলে, সবাই দ্বীনের কাজে সম্পৃক্ত। আমি হয়তো শহীদ হতে পারি মন খারাপ করবেন না। কথাগুলো বলছিলেন শহীদ আমিনুরের বাবা, সাথে সাথে দু’ হাত তুলে দোয়া করছিলেন আল্লাহর দরবারে। বলেছিলেন আমার ছেলে মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হয়েছে। শহীদের পিতা হতে পেরে আমি গর্বিত। তিনি আবেগ ভরে বললেন, আমার ছেলে শহীদ হবে আমি জানতাম। গর্বিত পিতার মুখে কথাগুলো শুনতেই মনে পড়ল ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ঈমান কত দৃঢ়, যেমন ইসলামী আন্দোলনের মহিলাকর্মী বনু হারেসা দুর্গের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন অধীর আগ্রহ নিয়ে তারই গর্ভজাত সন্তান যাবে মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে। মায়ের চোখে গর্বের চিহ্ন। তার সন্তান ইসলামের মুজাহিদ। তিনি ভাবছেন প্রাণপ্রিয় পুত্র মুয়াজ যুদ্ধের ময়দানে যেতে এত দেরি করছে কেন? মা নিচের দিকে তাকিয়ে দেখেন মদিনার আউস গোত্রের অধিপতি তার প্রিয় সন্তান, যুদ্ধসাজে সজ্জিত, মা বললেন বাবা তুমি তো পেছনে পড়ে গেছ। তাড়াতাড়ি জান্নাতের দিকে যাও। কেয়ামতের ময়দানে শহীদের মা হিসেবে আল্লাহর দরবারে যেন আমি পরিচয় দিতে পারি। তাদের অনুভূতি আমাদের প্রেরণা, শহীদ আমিনুরের লাশ আসছে। খবর আসার সাথে সাথে ভারি হয়ে গেল রহমতপুর গ্রামখানি। বালিয়াডাংগা বাজার, লাশের গাড়িটি আসতেই রাস্তার দুই ধারের মানুষ ডুকরে কেঁদে উঠল। তারা বলতে লাগল, ছেলেটি কত ভালো ছিল, নামাজ পড়ত, কুরআনের কথা বলত, এলাকার যুবক ও মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে ডাকত। তাকে আজ লাশ হয়ে ফিরতে হলো। বাড়িতে পৌঁছানোর সাথে সাথে যে ঘরে কেটেছে শহীদের শৈশব ও কৈশোর, সেখানের কান্নার দৃশ্য সব মানুষকে বিহ্বল করে দেয়।
একটি ছেলে যে সবার এত আপন হতে পারে এ দৃশ্য না দেখলে বলা যায় না। সবার চোখে যে এত পানি থাকতে পারে সেখানে না দাঁড়ালে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। যে উঠানে শহীদ আমিনুর ধুলো খেলে বড় হয়েছে সেখানে লাশটি রাখতেই তার মুখে হাত বুলায় গর্ভধারিণী মা। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। কিছু না বলতেই বেহুঁশ হয়ে ঢলে পড়ে ডান দিকে। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যাদের সুখ দেখার জন্য সব কিছু করেছেন নির্বাক তাকিয়ে অশ্রু ঝরাচ্ছেন শহীদ আমিনুরের পিতা। কফিন জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন স্বজনরা। মনের অজান্তে হাত চলে যায় আমার চোখের নিচে। মুছে শেষ করতে পারলাম না চোখের পানি, কারণ আমিও যে তাদের মত একজন। সবার মায়া ছিন্ন করে সাথী স্বজনেরা কাঁধে করে নিয়ে রেখে এলেন ‘বাঁশের ঘরে’। শহীদ আমিনুর আপনি থাকেন জান্নাতের বাগানে। জান্নাতের হলুদ পাখি হয়ে আল্লাহর নেয়ামতের সাথে।

SHARE

Leave a Reply