বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যাকাতের ভূমিকা

শাহ্ মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান

দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে এ যাবৎ বিস্তর আলোচনা হয়েছে। নানা মডেল, নানা কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। গৃহীত হয়েছে বেশ কয়েকটি পাঁচসালা পরিকল্পনাও। কিন্তু দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই উন্নয়নের সুফলবঞ্চিত। বরং বলা যায় তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি। এত যে ঘটা করে মাইক্রো ক্রেডিটের গুণকীর্তন করা হয়েছে গত দুই দশকেরও বেশি, শেষ বিচারে সেই ক্ষুদ্রঋণ আজ দারুণ প্রশ্নবিদ্ধ, তার কথিত সাফল্য সংশয় জর্জরিত। অথচ ইসলামের যে সুমহান অর্থনৈতিক রক্ষাকবচ রয়েছে তার যথাযথ ব্যবহার হলে এ দেশে দারিদ্র্য থাকারই কথা নয়। জাকাতই হলো দারিদ্র্য দূরীকরণের সেই মোক্ষম কৌশল, একই সঙ্গে যা ঐশী বিধানও। আজ জাকাত দেয়া হয় ব্যক্তিগতভাবে এবং অনেকটা খয়রাত দেবার মতো। রাষ্ট্রীয়ভাবে জাকাত বাধ্যতামূলক আদায় ও তার পরিকল্পিত ব্যবহারই মাত্র পারে এর অন্তর্নিহিত শক্তির ও কল্যাণের বদৌলতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে সেই বিষয়েই আলোচনা করা হয়েছে।

ইসলামে জাকাতের গুরুত্ব

জাকাত ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। আল কুরআনে বারবার নামাজ কায়েমের পরেই জাকাত আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, “সালাত কায়েম করো এবং জাকাত প্রদান করো।” (সূরা আল বাকারাহ : ৪৩, ৮৩, ১১০ ও ২৭৭ আয়াত; সূরা আন-নিসা : ৭৭ ও ১৬২ আয়াত; সূরা আন নুর : ৫৬ আয়াত; সূরা আল-আহযাব ৩৩ আয়াত, সূরা মুয্যাম্মিল : ২০ আয়াত)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন, “তাদের অর্থসম্পদ থেকে জাকাত উসুল করো যা তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে।” (সূরা আত্ তাওবা : ১০৩ আয়াত)

‘‘মুশরিকদের জন্যে রয়েছে ধ্বংস, তারা জাকাত দেয় না।” (সূরা হামীম : ৬-৭ আয়াত)

‘‘আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমরা যে জাকাত দাও মূলত তা জাকাত দানকারীরই সম্পদ বৃদ্ধি করে।” (সূরা আররুম : ৩৯ আয়াত)

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জাকাতের বিধি-নির্দেশ শুধু উম্মতে মুহাম্মদীর ওপরই নাযিল হয়নি, অতীত কালে অন্যান্য নবীদের উম্মতের ওপরেও এই হুকুম ছিল। হযরত ইসমাইল (আ) ও হযরত ঈসার (আ) সময়েও জাকাতের বিধান প্রচলিত ছিল (সূরা মরিয়ম : ৩১ ও ৫৫ আয়াত এবং সূরা আল আম্বিয়া : ৭৩ আয়াত)।

কেন জাকাতের এই গুরুত্ব? ইসলামী সমাজব্যবস্থায় জাকাত সম্পদ বণ্টনের তথা সামাজিক সাম্য অর্জনের অন্যতম মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে। সমাজে আয় ও সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে বিরাজমান ব্যাপক পার্থক্য হ্রাসের জন্যে জাকাত অত্যন্ত উপযোগী হাতিয়ার। কিন্তু জাকাত কোন স্বেচ্ছামূলক দান নয়। বরং দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের জন্যে আল্লাহ নির্ধারিত বাধ্যতামূলক প্রদেয় অংশ। জাকাতের সঙ্গে প্রচলিত অন্যান্য সকল ধরনের করের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কারণ, ইসলামের এই মৌলিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একাধারে নৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ অন্তর্নিহিত রয়েছে। কিন্তু করের ক্ষেত্র এই ধরনের কোন নৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক তাগিদ নেই।

জাকাত ও প্রচলিত করের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, কর হচ্ছে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারকে প্রদত্ত নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ যার জন্য করদাতা কোন প্রত্য উপকার প্রত্যাশা করতে পারে না। সরকারও করের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দরিদ্র ও অভাবী জনসাধারণের মধ্যে ব্যয়ের জন্যে বাধ্য থাকেন না। পান্তরে জাকাতের অর্থ অবশ্যই আল কুরআনে নির্দেশিত নির্ধারিত লোকদের মধ্যেই মাত্র বিলি-বণ্টন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জাকাতের অর্থ রাষ্ট্রীয় সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে ব্যয় করা যাবে না। কিন্তু করের অর্থ যেকোন কাজে ব্যয়ের মতা ও পূর্ণ স্বাধীনতা সরকারের রয়েছে।

তৃতীয়ত, জাকাত শুধুমাত্র সাহেবে নিসাব মুসলিমদের জন্যেই বাধ্যতামূলক। কিন্তু কর, বিশেষত পরো কর, সর্বসাধারণের ওপর আরোপিত হয়ে থাকে। অধিকন্তু প্রত্য করেরও বিরাট অংশ জনসাধারণের ওপর কৌশলে চাপিয়ে দেয়া হয়।

চতুর্থত, জাকাতের হার পূর্ব নির্ধারিত ও স্থির। কিন্তু করের হার স্থির নয়। যে কোন সময়ে সরকারের ইচ্ছানুযায়ী করের হার ও করযোগ্য বস্তু বা সামগ্রীর পরিবর্তন হয়ে থাকে। সুতরাং, জাকাতকে প্রচলিত অর্থে সাধারণ কর হিসাবে যেমন কোনক্রমেই গণ্য করা যায় না তেমনি তার সঙ্গে তুলনীয়ও হতে পারে না।

জাকাত অর্থনীতির কত বড় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ তা বুঝতে হলে ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকরের (রা) সময়ের ঘটনা জানতে হবে। তিনি খলিফা হওয়ার পর পরই কিছু ভণ্ড নবীর প্ররোচনায় কয়েকটি গোত্র জাকাত দিতে অস্বীকার করে। খলিফার নিকট তারা জাকাত প্রদান হতে অব্যাহতি চাইল। হযরত আবু বকর (রা) তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “যদি কারো কাছে উট বাঁধার রশি পরিমাণও জাকাত প্রাপ্য হয় আর সে তা দিতে অস্বীকার করে তবে তার বিরুদ্ধেই আমি জিহাদ ঘোষণা করব।” ইতিহাস সাী, তিনি তা করেছিলেনও।

জাকাতের খাত ও হকদার

ইসলাম শরীয়াহ অনুসারে যে সমস্ত সামগ্রীর জাকাত দিতে হবে সেগুলি হলোÑ সঞ্চিত অর্থ, সোনা, রূপা ও সোনা-রূপা দ্বারা তৈরী অলঙ্কার, ব্যবসায়ের মজুদ পণ্যসামগ্রী, কৃষি উৎপন্ন এবং ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে পালিত গবাদিপশু।

উপরোক্ত দ্রব্য সামগ্রীর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ যখন কোন মুসলমান অর্জন করে তখন তাকে জাকাত দিতে হয়। এই পরিমাণকে ‘নিসাব’ বলে। নিসাবের সীমা বা পরিমাণ দ্রব্য হতে দ্রব্যে ভিন্নতর। একইভাবে জাকাতের হারও দ্রব্য হতে দ্রব্যে ভিন্নতর। জাকাতের সর্বনিম্ন হার শতকরা ২.৫% হতে শুরু করে সর্বোচ্চ ২০.০%।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জাকাত কাদের প্রাপ্য অর্থাৎ, কাদের মধ্যে জাকাতের অর্থ বণ্টন করে দিতে হবে সে সম্পর্কে আল-কুরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “দান খয়রাত তো পাওনা হলো দরিদ্র ও অভাবীগণের, যে সকল কর্মচারীর ওপর আদায়ের ভার আছে তাদের, যাদের মন সত্যের প্রতি অনুরাগী হয়েছে, গোলামদের মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্যে, আল্লাহর পথে (মুজাহিদদের জন্যে) এবং মুসাফিরদের জন্যে। এটি আল্লাহর তরফ হতে ফরজ এবং আল্লাহ সব জানেন ও সব বুঝেন।” (সূরা আত্-তওবা : ৬০ আয়াত)

উপরের আয়াত হতে সুস্পষ্টভাবে আট শ্রেণীর লোকের জন্যে জাকাতের অর্থ ব্যবহারের জন্যে নির্দেশ পাওয়া যায়। এগুলি হচ্ছে : দরিদ্র জনসাধারণ (ফকির), অভাবী ব্যক্তি (মিসকিন), জাকাত আদায়ে নিযুক্ত ব্যক্তি, মন জয় করার জন্য, ক্রীতদাস মুক্তি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথে, এবং মুসাফির।

এই আটটি খাতের মধ্যে ছয়টিই দারিদ্র্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অন্য দু’টি খাতও (গ ও ছ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাকাত আদায় ও এর বিলিবণ্টন এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের এটাই সার্বণিক দায়িত্ব। সুতরাং, তাদের বেতনও এই উৎস হতেই দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

জাকাতের নিসাব

জাকাতের নিসাব সম্পর্কে অনেকেরই সম্যক ধারণা নেই। সে জন্যে সম্পদের নিসাব ও জাকাতের হার এখানে উল্লেখ করা হলো।

১. সাড়ে সাত ভরি (৮৫ গ্রাম) পরিমাণ সোনা বা এর তৈরি অলঙ্কার অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি (৫৯৪ গ্রাম) পরিমাণ রুপা বা তার তৈরি অলঙ্কার অথবা সোনা-রুপা উভয়ই থাকলে উভয়ের মোট মূল্য ৫২.৫ ভরি রুপার সমান হলে তার বাজার মূল্যের ওপর ১/৪০ অংশ বা ২.৫% হারে জাকাত দিতে হবে।

২. হাতে নগদ ও ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ ৫২.৫ ভরি রুপার মূল্যের সমান হলে তার ওপর ২.৫% হারে জাকাত দিতে হবে।

ঊষরের বিধান

ধনসম্পদ, গবাদিপশু, স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলঙ্কার, ব্যবসায়িক পণ্যের ওপর যেমন জাকাত আদায় ফরজ তেমনি ফসলের ওপর ঊষর আদায়ও ফরজ। আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, “তোমরা এগুলোর ফল ও ফসল খাও যখন ফল ধরে এবং আল্লাহর হক আদায় করো ফসল কাটার (বা আহরণ) করার দিন।” (সূরা আল আনআম : ১৪১ আয়াত)

“তোমাদের জন্যে জমি থেকে যা কিছু বের করেছি তা থেকে খরচ করো (আল্লাহর পথে)।” (সূরা আল বাকারাহ : ২৬৭ আয়াত)

আল্লাহর এই নির্দেশ অলঙ্ঘনীয়। তাফসিরে তাবারী অনুযায়ী ফল বা শস্যের ফরজ জাকাত আদায় করতেই হবে। তাফসিরে কাশশাফ অনুসারে এই আয়াতে উল্লিখিত ‘হক’ শব্দ দ্বারা কৃষিজাত ফসলের ওপর ফরজ জাকাতকেই বোঝানো হয়েছে। ঊষরের বিধান সম্পর্কে রাসূলে করীম (সা) বলেন, “যেসব জমি বৃষ্টির পানিতে সিক্ত হয় তাতে ঊষর (বা দশ ভাগের এক ভাগ) আর যেসব জমি সেচের সাহায্যে সিক্ত হয় তাতে নিসফ ঊষর (বা বিশ ভাগের এক ভাগ) আদায় করতে হবে।” (বুখারী, আবু দাউদ)

সুতরাং, সেচ বা অসেচ জমিভিত্তিতে উৎপন্ন ফসলের ১০.০% বা ৫.০% জাকাত আদায় করা মুমিন মুসলমান নর-নারীর শরয়ী দায়িত্ব। জাকাতের অর্থসম্পদ ব্যয়ের জন্যে যে আটটি খাত নির্ধারিত, উষরের ক্ষেত্রও সেই খাতগুলো নির্ধারিত। অবশ্য ঊষরের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যথা :

১. ঊষর আদায়ের জন্যে ফসলের এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া শর্ত নয়। বরং প্রতি বছর প্রতিবার উৎপন্ন ফসলেরই ঊষর আদায় করতে হবে।

২. ঊষর আদায়ের জন্যে ঋণমুক্ত হওয়া শর্ত নয়।

৩. নাবালক ও পাগলের জমির ফসলেও ঊষর আদায় করতে হবে।

৪. ঊষর আদায়ের জন্যে জমির মালিক হওয়া শর্ত নয়।

ফল ও ফসলের ক্ষেত্র নিসাবের পরিমাণ হলো পাঁচ ওয়াসাক। অর্থাৎ, পাঁচ ওয়াসাক পরিমাণ ফসল উৎপন্ন হলে ঊষর (বা ঊষরের অর্ধেক) আদায় করতে হবে। পাঁচ ওয়াসাকের পরিমাণ প্রায় ৯৮৯ কেজি। অর্থাৎ, এই পরিমাণ ফসল উৎপন্ন হলেই ঊষর দিতে হবে। ইমাম আবু হানিফার মতে কৃষি ফসল ও ফলে কোন নিসাব নেই। যা উৎপন্ন হবে তার ওপরই ঊষর বা অর্ধেক ঊষর ধার্য হবে। (মুহম্মদ রুহুল আমীন-ইসলামের দৃষ্টিতে ঊষর: বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে: ১৯৯৯, পৃ: ৩৩)

জাকাত উসুল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব

জাকাত উসুল ও তার বিলি-বণ্টন ব্যক্তির খেয়াল খুশির ওপর ছেড়ে দেয়া হয়নি। বরং রাষ্ট্রীয়ভাবেই এর আদায় ও বণ্টনের হুকুম দেয়া হয়েছে। আল্লাহ রাববুল আলামিন তাঁর রাসূলকে (সা) নির্দেশ দিচ্ছেন-

“তাদের অর্থ-সম্পদ থেকে জাকাত উসুল করো যা তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে।” (সূরা আত্ তাওবা : ১০৩ আয়াত)

আল-কুরআনে আল্লাহ আরও বলেছেন-

“আমরা তাদেরকে মানুষের নেতা বানিয়েছি, তারা আমাদের বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করে। … আমরা অহির সাহায্যে তাদেরকে ভাল কাজ করার, নামাজ কায়েম করার ও জাকাত আদায় করার আদেশ দিয়েছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া : ৭৩ আয়াত)

উপরের আয়াতগুলো হতে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে আল্লাহর অভিপ্রায়ই হলো রাষ্ট্রই জাকাত আদায় করবে এবং তা জাকাতের হকদারদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছেও দেবে। আল্লাহ যাদেরকে রাষ্ট্রমতা প্রদান করেছেন, মানুষের নেতা বানিয়েছেন অন্যান্য কাজের মধ্যে তাদের অন্যতম অপরিহার্য দায়িত্ব হলো জাকাত আদায় করা ও আদায়কৃত জাকাত তার হকদারদের মধ্যে পৌঁছে দেয়া। এ জন্যেই রাসূলে করীম (সা) ও খুলাফায়ে রাশিদুনের (রা) সময়ে জাকাতের অর্থ, সামগ্রী ও গবাদি পশু সংগ্রহ, সংরণ ও বিতরণের জন্যে আট শ্রেণীর লোক নিযুক্ত ছিল এরা হলো :

সায়ী = গবাদি পশুর জাকাত সংগ্রাহক,

কাতিব = জাকাতের খাতাপত্র লেখার করণিক,

ক্বাসাম = জাকাত বণ্টনকারী,

আশির = জাকাত প্রদানকারী ও জাকাত প্রাপকদের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপনকারী;

আরিফ = জাকাত প্রাপকদের অনুসন্ধানকারী,

হাসিব = জাকাতের হিসাব রক,

হাফিজ = জাকাতের অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী সংরক,

ক্বায়াল = জাকাতের পরিমাণ নির্ণয়কারী ও ওজনকারী।

দ্রষ্টব্য : এস এ সিদ্দিকী (১৯৬২) পাবলিক ফিন্যান্স ইন ইসলাম, পৃ. ১৬০।

বিস্ময়ে হতবাক হতে হয় যে আজকের যুগেও কর আদায়ের জন্যে এত বিভিন্ন পদের লোক নিযুক্ত হয় না, অথচ চৌদ্দশত বছর পূর্বেই জাকাত আদায় ও তার বিলিবণ্টনের জন্যে কত নিখুঁত ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছিল। এভাবেই তখন ধনীদের সম্পদের একাংশ গরিব ও অভাবীদের হাতে পৌঁছতো, দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে খরচ হতো, মুসাফিরের কষ্ট লাঘব হতো। উপরন্তু ব্যক্তির খেয়াল খুশির ওপর জাকাত উসুল নির্ভরশীল না থাকায় আদায়কৃত জাকাতের পরিমাণ ছিল যেমন বিপুল তেমনি তার দারিদ্র্য বিমোচন ও মানব কল্যাণের মতাও ছিল বিপুল। কিন্তু এই দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথ পালিত না হওয়ায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের জনসাধারণ আজ দারিদ্র্যপীড়িত এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও ভয়াবহ দুরবস্থার শিকার।

বাংলাদেশে জাকাতের ব্যবহার

আমাদের দেশে প্রবাদ রয়েছে, অভাবে স্বভাব নষ্ট। তাই সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর করা জরুরি। কিন্তু এক্ষেত্রে যেসব বাধা রয়েছে সেসবের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিক্ষা ও প্রশিণের সুযোগের অভাব, প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব। এ ছাড়া রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্বিপাকের ফলে ফসলহানি, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পে গৃহহানি, পরিবারের একমাত্র উপার্জনম ব্যক্তির মৃত্যুতে গোটা পরিবারের ভিক্ষুক হওয়ার অবস্থা। রয়েছে রোগ-ব্যাধি। দুর্ঘটনায় বিকলাঙ্গ হওয়া বা অসুস্থতায় শারীরিকভাবে পঙ্গু ও অম হওয়া তো রয়েছেই। ফলে আমাদের বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের পরিমাণ দুটোই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়। অথচ বাংলাদেশের অবস্থা এমন হবার কথা নয়। এ দেশের ৮৫% লোক মুসলমান। এদের মধ্যে সাহেবে নিসাব মুসলমানরা জাকাত ও ঊষর আদায় করলে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে দারিদ্র্য থাকার কথা নয়। ইসলামের সোনালি যুগে তা ছিলও না। বরং ইতিহাস স্যা দেয়, জাযিরাতুল আরবে জাকাতের অর্থ নেবার লোক না থাকায় সেই অর্থ নতুন বিজিত দেশসমূহের জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হতো।

অনেকেই মনে করেন দরিদ্র জনগণের অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে চাই সরকারি সাহায্য নয়তো বিদেশী অনুদান। বস্তুতপে এদেশে এখন বহু এনজিও বিদেশী অনুদান নিয়েই দরিদ্র জনগণ, বিশেষত গ্রামাঞ্চলের গরিব জনসাধারণের মধ্যে কাজ করে চলেছে। তারা প্রধানত সুদের ভিত্তিতে অর্থ ঋণ দিয়ে কর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচি গ্রহণের কথা বলে। বাস্তবে এরা দারিদ্র্য বিমোচনের নামে দারিদ্র্যের চাষ করছে। এদের সৃষ্ট গোলক ধাঁধা হতে বেরিয়ে আসতে পারছে না ঋণ গ্রহীতারা। অনেক সমাজহিতৈষী ব্যক্তি হতাশা প্রকাশ করে থাকেন তাদের পর্যাপ্ত অর্থ নেই বলেই দরিদ্র জনসাধারণের ভাগ্যের চাকা ঘোরানো যাচ্ছে না। একটু তলিয়ে বিচার করলে দেখা যেত এ দেশে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ জাকাত হিসেবে বিতরণ করা হয় তার সুষ্ঠু, সংগঠিত ও পরিকল্পিত ব্যবহার হলে এসব দরিদ্র লোকদের অবস্থার পরিবর্তন করা খুবই সম্ভব ছিল।

উদাহারণস্বরূপ বলা যায়, বহু ধনী ব্যক্তি লাধিক টাকার ওপর জাকাত দিয়ে থাকেন। কিন্তু তারা সাধারণত এই অর্থের বড় অংশ পঞ্চাশ-একশ টাকার নোটে পবিত্র রমযান মাসে বাড়ির গেটে উপস্থিত গরিব নারী-পুরুষের মধ্যে বিলিয়ে দেন, অথবা শাড়ি-লুঙ্গি আকারে বিতরণ করে থাকেন। কখনও কখনও এরা এলাকার মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিং বা ইয়াতিমখানাতে এই অর্থের কিছুটা দান করে থাকেন। এরা মুসাফির ঋণগ্রস্ত অসুস্থ লোকদের কথা আদৌ বিবেচনায় আনেন না। বিবেচনায় আনেন না আল্লাহর পথে মুজাহিদদের কথা। অথচ এরাই যদি পরিকল্পিতভাবে এলাকার দুস্থ, বিধবা, সহায়-সম্বলহীন পরিবারের মধ্যে থেকে বাছাই করে প্রতি বছর অন্তত পাঁচটি পরিবারকে নিজের পায়ে দাঁড়াবার জন্যে রিক্সা রিক্সাভ্যান নৌকা সেলাই মেশিন অথবা কয়েকটা ছাগল কিনে দিতেন তাহলে দেখা যেত তার একার প্রচেষ্টাতেই পাঁচ বছরে তার এলাকায় অন্তত পঁচিশটি পরিবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে। ভিক্ষুক ও অভাবী পরিবারের সংখ্যাও কমে আসছে। এরাই এলাকার দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকের জন্যে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষাবৃত্তি চালু করে তাদের জীবন গড়ার পথ সুগম করে দিতে পারতেন।

গভীরভাবে নিরীণ করলে দেখা যাবে যখনই ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে কাজে নিয়োজিত হতে পেরেছে, নিজের চেষ্টায় রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতে পেরেছে তখন শুধু তারই পারিবারিক উন্নতি হয়নি, গোটা সমাজের চেহারাও বদলাতে শুরু করেছে। বরং সুদের ভিত্তিতে যেসব এনজিও ক্ষুদ্রঋণ দিচ্ছে তারা দারিদ্র্য দূর করতে তো পারেইনি বরং এর পরিধি আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মনে রাখা দরকার, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্যে প্রদত্ত মাইক্রো ফাইন্যান্স ও মাইক্রো ক্রেডিট সমার্থক নয়। ফাইন্যান্সের সাথে মুনাফার সম্ভাব্যতা যুক্ত থাকলে তা হয়ে দাঁড়ায় ইনভেস্টমেন্ট বা বিনিয়োগ। পান্তরে ফাইন্যান্সের সাথে সুদ যুক্ত হলে তা ক্রেডিট বা ঋণের রূপ লাভ করে। এই ক্রেডিট বা ঋণ নিয়ে বেকার নারী-পুরুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ করে নিতে পারে ঠিকই কিন্তু তার আয়ের সিংহভাগই চলে যায় কিস্তিতে সুদসহ ঋণ শুধতে। পরিণামে স্বাবলম্বী হতে পারা তার জন্যে দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এজন্যই বিশ্বজুড়ে মাইক্রো ক্রেডিটের এত বন্দনা চললেও এর দ্বারা স্বাবলম্বী মানুষের সংখ্যা বাড়েনি, দারিদ্র্য দূর হয়নি। বরং অনেকেরই মতে এর দ্বারা প্রকৃতপে দারিদ্র্যকে জিইয়ে রাখা হচ্ছে। কারো কারো অভিমত, মাইক্রো ক্রেডিটের মাধ্যমে এনজিওগুলো আসলে দারিদ্র্যেরই চাষ করছে। সমাজের যে বিপুলসংখ্যক লোক কর্মজীবী হলে দেশের সার্বিক উন্নয়নের গতিধারা সচল হয়, কিন্সের ভাষায় পূর্ণকর্মসংস্থান অর্জিত হয়, সেই স্তরে পৌঁছুতে সুদি এনজিওগুলো কখনই সমর্থ নয়। তাই যদি বিনা সুদে বা মুনাফার অংশ দাবি না করে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া যায়, কাজের বা উৎপাদনের উপকরণ সরবরাহ করা যায় তাহলে সমাজে যে ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয় তার চেইন রিএয়াকশন চলে দীর্ঘদিন ধরে। এ ক্ষেত্র লাভের গুড় পিঁপড়েয় খায় না বলে উদ্যোক্তারা প্রকৃত অর্থেই স্বাবলম্বী হতে পারেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উদ্যোক্তা উন্নয়ন তথা ভিখারির হাতকে কর্মীর হাতিয়ারে রূপান্তরের মধ্যে দিয়েই দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি তার অভীষ্ট লক্ষে পৌঁছাতে সম। এজন্যেই ভিখারি তথা অভাবগ্রস্তকে কর্মীতে রূপান্তরের যথাযথ কৌশল উদ্ভাবন ও তার ব্যবহারই হবে যথোচিত পদপে। এই কর্মকৌশলই হলো মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড। দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গৃহীত না হলে সমাজে স্থায়ী কল্যাণ ও মঙ্গল সাধন অসম্ভব। জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তর তথা মানবসম্পদে উন্নীত করার জন্যে যেসব মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করতে হবে সেসবের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ও প্রশিণ, স্বাস্থ্যরা ও চিকিৎসা এবং গৃহায়ন। অন্নবস্ত্রের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি এগুলো পূরণ না হলে জাতি যে পশ্চাৎপদ ছিল সেখানেই রয়ে যাবে। এজন্যে উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিণ দানের মাধ্যমে দরিদ্র শিশু-কিশোরদেরকে ভবিষ্যতের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা, যুবক-যুবতীদের স্বউদ্যোগে কর্মসংস্থানের জন্যে নিখরচায় প্রয়োজনীয় পুঁজি সরবরাহ করা সম্ভব একমাত্র জাকাতের অর্থের মাধ্যমেই।

প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে জাকাত ও ঊষরের মাধ্যমে কত টাকাই বা আদায় হতে পারে? ব্যক্তির প্রদত্ত জাকাতের হিসাব পাওয়া দুরূহ। কিন্তু সরকারি তথ্য ব্যবহার করে জাকাতের সম্ভাব্য হিসাব পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী দেশের ব্যাংকসমূহে ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এক হতে তিন বছরের ঊর্ধ্বে মেয়াদি আমানতের পরিমাণ ছিল ৮০,২৭৫ কোটি টাকা। মেয়াদি আমানত যেহেতু এক বছরের বেশি সময়ের জন্য এবং আমানতকারী স্বেচ্ছায় সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যেই জমা রাখে সেহেতু এর জাকাত উসুল করা ফরজ। এই অর্থের ২.৫% হারে জাকাতের পরিমাণ দাঁড়াবে ২,০০৭ কোটি টাকা। (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০১০; পৃঃ ২৬৩)

যেসব কৃষিজমির মালিকের নিসাব পরিমাণ ফসল হয় তাদের মধ্যে কতিপয় উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছাড়া অন্যান্যরা ফসলের ঊষর আদায় করে না। বাংলাদেশের ভূমি মালিকানার দিকে তাকালে দেখা যাবে সমগ্র উত্তর অঞ্চল তো বটেই, দণি ও পূর্ব অঞ্চলেও চাষাধীন জমির বৃহৎ অংশের মালিক মোট কৃষকের ১৭% – ২০%। অথচ এরা ফসলের ঊষর আদায় করে না। এ দেশের সাহেবে নিসাব পরিমাণ ফসলের অধিকারী জমির মালিক নিজ উদ্যোগেই যদি ঊষর আদায় করতো তাহলে এর পরিমাণ কম করে হলেও ১,০০০ কোটি টাকার বেশি হতো। সুতরাং, জাকাত ও ঊষর সূত্রে বার্ষিক ন্যূনতম তিন হাজার কোটি টাকা আদায় হওয়া খুবই সম্ভব। এ ছাড়া জাকাত আদায়ের অন্যান্য উৎস তো রয়েছেই।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জাকাত আদায় সম্পর্কে এ দেশের ইসলামপ্রিয় জনগণের মধ্যে কিছুটা হলেও ধারণা রয়েছে। কিন্তু ঊষর সম্বন্ধে যে একেবারেই নেই তা বেশ জোর দিয়েই বলা যায়। অথচ যথাযথভাবে ঊষর ও অর্ধ-ঊষর আদায় ও তা হকদারদের মধ্যে সুচারুভাবে বণ্টিত হলে গ্রামাঞ্চলে নিদারুণ দারিদ্র্য ও চরম ধনবৈষম্য বিদ্যমান থাকার কথা নয়। এ ক্ষেত্র নির্মম সত্য হলো ঊষর আদায়ের উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্র সবচেয়ে বড় বাধা আসবে বিত্তশালী জোতদার ও গ্রামীণ মহাজনদের কাছ থেকেই। ইতিহাস স্যা দেয়, উপমহাদেশের ইসলামী আন্দোলনের সিপাহসালার শহীদ সৈয়দ আহমদ বেরেলভীর উদ্দেশ্যে তাঁর হন্তারকের নিষ্ঠুর মন্তব্য ছিল “এখন তোমার ঊষর বুঝে পেয়েছো তো মৌলানা?” এ থেকেই বোঝা যায় তাঁর ঊষর আদায়ের আন্দোলনকে সেকালের ধনী জমিদার ও জোতদার মুসলমানরা কিভাবে গ্রহণ করেছিল।

বাংলাদেশে জাকাত খাত থেকে প্রাপ্তব্য এই বিপুল অর্থ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে নানা ত্রাণ ও পুনর্বাসনমূলক এবং প্রশিণ ও কর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা সম্ভব। এসব ত্রাণ ও কল্যাণধর্মী পদপে গ্রহণের মূল ল্যই হবে দারিদ্র্য বিমোচন বা দারিদ্র্য দূরীকরণ। এসব পদপে গ্রহণ করার ফলে আগামী দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ হতে দারিদ্র্য সত্যিকার অর্থেই বিদায় নেবে। প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত পল্লী। পল্লী এলাকাতেই মাইক্রো ক্রেডিটের বিপরীতে জাকাত হতেই নিখরচায় মূলধন সরবরাহ করতে হবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, প্রান্তিক চাষি ও বিত্তহীন মহিলা ও পুরুষদের। এদের স্বকর্মসংস্থানের মাধ্যমেই গ্রামীণ দারিদ্র নিরসন তথা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।

জাকাতের মূল অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এতে শুধু সমাজই নয়, রাষ্ট্রও উপকৃত হয় সমানভাবে। দারিদ্র্য মানবতার পয়লা নম্বরের দুশমন। ত্রেবিশেষে তা কুফরি পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। সমাজে হতাশা ও বঞ্চনার অনুভূতির সৃষ্টি হয় দারিদ্র্যের ফলে। পরিণামে দেখা দেয় মারাত্মক সামাজিক সংঘাত। অধিকাংশ সামাজিক অপরাধও ঘটে দারিদ্র্যের জন্যে। এর প্রতিবিধানের জন্যে জাকাত ইসলামের অন্যতম মুখ্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে ইসলামের সেই সোনালি যুগ হতেই। জাকাতের অর্থসামগ্রী প্রাপ্তির ফলে দরিদ্রদের জীবন যেমন আনন্দ ও নিরাপত্তার হয় তেমনি কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়।

জাকাতের অর্থসামগ্রী যখন সমাজের দরিদ্র ও অভাবী শ্রেণীর লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হয় তখন শুধু যে অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয় তা নয়, বরং অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও গতিবেগ সঞ্চারিত হয়। দরিদ্র ও দুর্গত লোকদের ক্রয় মতা থাকে না। বেকারত্ব তাদের নিত্যসঙ্গী। জাকাতের অর্থপ্রাপ্তির ফলে তাদের হাতে অর্থাগম হয়। ফলশ্রুতিতে বাজারে কার্যকর চাহিদার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। দরিদ্র জনসাধারণের প্রান্তিক ভোগ প্রবণতা (Marginal Propensity to Consume) সচারচর একের অধিক। অধিকাংশ মুসলিম দেশে এরাই জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ। তাদের হাতে যা আসে তার সবটুকুই খরচ করে ফেলে ভোগ্যপণ্য ক্রয়ের জন্যে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি সময়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রকৃতপে সমাজের বিপুলসংখ্যক লোকের যদি ক্রয়মতা ঠিক মতো চালু থাকে তাহলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নতুন প্রেরণার সৃষ্টি হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, নির্মাণ ও সেবার ক্ষেত্রও সৃষ্টি হয় অনুকূল পরিবেশের। পরিণামে সামাজিক আয় বা ধনবণ্টনগত পার্থক্য হ্রাস পেতে থাকে। তাই জাকাত শুধু অর্থনৈতিক সুবিচারই প্রতিষ্ঠা করে না, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতাও এনে দেয়।

সুতরাং, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপন্ন জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জাকাতের কোন বিকল্প নেই। মাইক্রো ক্রেডিট বা মাইক্রো ফাইন্যান্স নয়, মুনাফা বা সুদ প্রদানের দায়মুক্ত জাকাতের অর্থের ব্যবহারের মাধ্যমেই স্বাবলম্বী মানুষ গড়ে তুলতে হবে এবং এজন্যে উদ্যোগ নিতে হবে রাষ্ট্রীয়ভাবেই। কেননা রাষ্ট্রই পারে সাহেবে নিসাব লোকদের জাকাত প্রদানে বাধ্য করতে এবং প্রাপ্ত সেই বিপুল অর্থ শহর হতে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত পরিকল্পিতভাবে গৃহীত কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের মহাসড়কে সকলকে তুলে আনতে পারে, পারে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে। আজ সময়ের দাবিই তাই।
লেখক – অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply