বাংলাদেশের ট্র্যাজেডি -(চতুর্থ ও শেষ পর্ব) – মো: কামরুজ্জামান বাবলু

একজন সাংবাদিক হিসেবে বিগত দেড় যুগের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা, সামান্য লেখাপড়া এবং এ দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার মনে যে দৃঢ়বিশ্বাস জন্মলাভ করেছে তাতে আমি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে চাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো ভারতকে বরাবরই বন্ধু মনে করা। আমার কথার অর্থ অবশ্যই এটা নয় যে ভারতের সাথে শত্রুতামূলক আচরণ করতে হবে। আমার কথার অর্থ হলো শুধু সাবধান থাকা এবং নিজেদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সোচ্চার হওয়া। বিশ্বায়নের এই যুগে ভারতের সাথে অবশ্যই সুসম্পর্ক রাখতে হবে এবং নিশ্চয়ই তার অর্থ নতজানুতা ও পদলেহন নয়।
সেই স্বাধীনতার সময় থেকে শুরু করে বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত বাংলাদেশের সম্পদ লুট, সীমান্তে হত্যা, অভিন্ন নদীতে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে দেশকে মরুভূমি বানানো থেকে শুরু করে একের পর এক শত্রুতামূলক কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু নির্বোধের মতো আমরা ভারতকে বন্ধু বলে স্লোগান দিয়ে যাচ্ছি। প্রায় বিনামূল্যে ট্রানজিট সুবিধা, সমুদ্র ও নৌবন্দর ব্যবহার, বাংলাদেশকে একচেটিয়া বাজারে পরিণত করা সত্ত্বেও বাংলাদেশি পণ্য নানা অজুহাতে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে না দেয়া, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ সীমান্তের অনেক ভেতরে ঢুকে বাংলাদেশি ইলিশ লুট এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনসহ নানা আয়োজনে তাদের স্বার্থ হাসিলে সদা তৎপর। বছরের পর বছর বাংলাদেশের সামনে তিস্তা চুক্তির মুলা ঝুলিয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রায় সবই আদায় করে নিচ্ছে প্রতিবেশী দেশটি।
এভাবে বর্ণনা দিতে থাকলে এর শেষ যে কোথায় তা বলা মুশকিল। এমন বন্ধুত্বের নজির পৃথিবীর ইতিহাসে কোন দিন ছিল বলে আমার জানা নেই। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ-ভারত ব্যতীত এরূপ একতরফা বন্ধুত্বের নমুনা কোনদিন সৃষ্টি হবে বলেও অন্তত আমি বিশ্বাস করি না।
বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের বিশ্বাসও এমন বলেই আমার ধারণা। তবে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলই এর ব্যতিক্রম। আর সেটি হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। যারা নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দল বলে জাহির করে, নিজেদেরকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অতন্ত্র প্রহরী বলে প্রচারণা চালায়। কত বড় ধাপ্পাবাজি! প্রতিনিয়ত ভারতীয় চামচামি ও গোলামি করতে গিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রায় বিলীন করে দিয়ে এবং মীর জাফরের ভূমিকায় আসীন হয়েও নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি বলে জাহির করছে। অথচ একাত্তরের প্রকৃত রণাঙ্গনে তারা কত নগণ্য ভূমিকা রেখেছিল সে আলোচনাও ইতোমধ্যেই আগের পর্বগুলোতে ডকুমেন্টসহ আমি পেশ করেছি।
এই ভারতীয় গোলাম সরকার আজ ক্ষমতার জন্য কতটা লালায়িত যে দেশের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়ে হলেও তারা ভারতকে তুষ্ট করতে চায়। যার বড় প্রমাণ সুন্দরবনের কাছে ভারতের সাথে পার্টনারশিপে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ। পরিকল্পনাধীন ও বাস্তবায়নের পথে অগ্রসরমান এই প্রকল্প সম্পর্কে গত ৩ আগস্ট (২০১৬) দৈনিক প্রথম আলোতে “তবু কেন রামপাল?” শিরোনামে মতামত লিখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল। সেই মতামত থেকে খানিকটা হুবহু তুলে ধরছি :
‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কোনো রকম বিরোধিতা পছন্দ নয় সরকারের, এই বিরোধিতার যুক্তিগুলোও আর শুনতে রাজি নয় সরকার। কিন্তু তাই বলে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হওয়ার দায়িত্ব থেকে থেমে থাকলে চলবে না। সরকারের বহু শুভাকাক্সক্ষী এই প্রকল্পকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রধানতম চেতনা দেশের সম্পদ ও দেশের স্বার্থকে রক্ষা করা। রামপাল প্রকল্প এর সবকিছু বিপন্ন করতে পারে। কারণ, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হতে যাচ্ছে সুন্দরবনের ঠিক পাশে।
সুন্দরবন শুধু আমাদের নয়, গোটা বিশ্বের জন্য একটি অনন্য প্রাণী বৈচিত্র্যপূর্ণ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। এই বনের শুধু অনন্য নৈসর্গিক, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদ রয়েছে তা নয়, বাংলাদেশকে বিভিন্ন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচাতে এটি একটি চিরন্তন ও অতুলনীয় ভূমিকা পালন করে থাকে। রামপালের বিরুদ্ধে আপত্তির প্রধানতম কারণ হচ্ছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবন এবং এর অসাধারণ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে ফেলবে। সুন্দরবন না থাকলে যে বাংলাদেশ থাকবে তা হবে বিকৃত, খন্ডিত ও কুৎসিত একটি লোকালয়।
রামপাল নিয়ে মারাত্মক আশঙ্কার বহু কারণ রয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশ নির্মাণ করতে যাচ্ছে ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন অব ইন্ডিয়ার (এনটিসি) সঙ্গে। সব বাদ দিয়ে শুধু ভারতের নিজের পরিবেশ আইনের দিকে লক্ষ্য করলেই এই তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অযৌক্তিকতা আমরা বুঝতে পারব। তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মারাত্মক পরিবেশগত প্রভাবের কথা বিবেচনা করে ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ২০১০ সালের ইআইএ গাইডলাইনে অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা ইত্যাদির ২৫ কিলোমিটার সীমার মধ্যে এ ধরনের কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিষিদ্ধ করা আছে। সুন্দরবন বাংলাদেশের আইনে একটি অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা। তাহলে এর ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে রামপালের মতো একটি অতিবৃহৎ কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কী করে নিরাপদ হতে পারে? ভারতে যা নিরাপদ নয়, তা বাংলাদেশে কোন বিবেচনায় নিরাপদ হবে? সেও খোদ সুন্দরবনের পাশে?
ভারতের বিজ্ঞান ও পরিবেশ সেন্টারের ‘হিট অন পাওয়ার’ নামক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে বৈশ্বিক মানদন্ডে ভারতের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলোর পরিবেশদূষণ রোধের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্নমানের। প্রতিবেদন অনুসারে ভারতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে আবার নিম্নতর মানের একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এনটিপিসি এবং ভারতেই সবচেয়ে পরিবেশদূষণকারী বদরপুর প্রকল্পটি ছিল এদেরই। তাহলে কী করে আমরা ভাবতে পারব এদের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সব যুক্তিতর্কের উর্ধ্বে ওঠে একটি নিরাপদ প্রকল্প হবে?
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বিপক্ষে যেসব বৈজ্ঞানিক যুক্তিতর্ক, তা বহুবার বিভিন্ন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। প্রথম আলোতে কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিদ্যুৎ প্রকৌশলী আরশাদ মজুমদার কিছু সহজবোধ্য প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে এই প্রকল্পের মারাত্মক ঝুঁকির কথা বুঝিয়ে বলেছেন। কোনো যুক্তির, কোনো উদ্বেগের সরাসরি উত্তর না দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার শুধু কিছু খেলো কথা বলে দায় সারার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি তার দু-একটি বিষয় এখানে তুলে ধরছি।
এক. সরকারের পক্ষ থেকে বহুবার বলা হয়েছে বড়পুকুরিয়ার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনো পরিবেশদূষণ হচ্ছে না, তাহলে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পরিবেশদূষণ হবে কেন? এর উত্তর হচ্ছে, বড়পুকুরিয়ার কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে না এর কোনো প্রমাণ নেই; বরং পরিবেশবাদীদের পক্ষ থেকে কৃষিজমি, পানির স্তর ও মাছের ওপর এই কেন্দ্রটির মারাত্মক প্রভাবের কথাই বারবার তুলে ধরা হয়েছে। তা ছাড়া, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ১৩২০ মেগাওয়াট, যা বড়পুকুরিয়ার কার্যকর (১২৫ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার ১০ গুনেরও বেশি এবং এটি নির্মিত হচ্ছে স্পর্শকাতর একটি বনাঞ্চলের পাশে। কাজেই প্রশ্ন আসে রামপালের ঝুঁকি অনুধাবনের সদিচ্ছা থাকলে এর সঙ্গে বড়পুকুরিয়ার কোনো তুলনা করা যায় কি?
দুই. সরকার এবং রামপালের প্রস্তাবিত নির্মাতাদের লোকজন বলেছেন, অক্সফোর্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, সেগুলোতে কোনো ক্ষতি হয় না। রামপালে তাহলে কেন ক্ষতি হবে? এর উত্তর হচ্ছে এই প্রশ্নের তথ্যই ভুল। অক্সফোর্ডশায়ার ডিডকোট-ওয়ান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিবেশদূষণের কারণেই ২০১৩ সালের মার্চ মাসে বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রটোকলের পর ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় আরও অনেক কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
এমনকি খোদ ভারতের জ্বালানি মন্ত্রণালয় কর্ণাটক, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও উড়িষ্যার রাজ্য সরকারগুলো এবং স্থানীয় জনগণের আপত্তির কারণে চারটি বড় ধরনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প এ বছর জুন মাসে বাতিল করে দিয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর কোনোটিই সুন্দরবনের মতো অনন্য একটি প্রাকৃতিক সম্পদের পাশে ছিল না। পরিবেশদূষণের কারণে এগুলো বন্ধ হলে সুন্দরবনের পাশে রামপালের মতো একটি অতিঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প কিভাবে গ্রহণ করার কথা ভাবতে পারি আমরা?
তিন. রামপালের পক্ষে সরকারের অন্যতম যুক্তি হচ্ছে: রামপালে ‘সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি’ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। ফলে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, সাব ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির তুলনায় সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করলে দূষণের পরিমাণ মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস পায়, যা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভয়াবহ দূষণ সামান্যই কমাতে পারে। আর সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি যদি রক্ষাকবচ হয়ে থাকে তাহলে খোদ ভারতেই বিভিন্ন রাজ্যে এই টেকনোলজি ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল এমন কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাদ দেয়া হলো কেন?
রামপালের বিপক্ষে আরও বহু যুক্তি রয়েছে। আমাদের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী কিছুদিন আগে বলেছেন, প্রতিবাদী নাগরিকবৃন্দ এ বিষয়ে কোনো সঠিক তথ্য ও যুক্তি ছাড়াই তাদের বিরোধিতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর উত্তরে ৫৩টি সামাজিক আন্দোলনের সমন্বয়ে গঠিত সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে সুলতানা কামাল একটি বিবৃতি গণমাধ্যমে প্রেরণ করেছেন। ১লা আগস্টের এই বিবৃতিতে তিনি বলেছেন: ‘আমি পরিষ্কারভাবে জানাতে চাই যে, মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের এই বক্তব্যটি একেবারেই সত্য নয় এবং তা আন্দোলনকারী নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত অপপ্রচারের শামিল।’
সরকারের কাছে আমাদের তাই অনুরোধ, সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প অবিলম্বে বাতিল করুন। সেই সঙ্গে ওরিয়ন গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সুন্দরবনবিনাশী সব প্রকল্প বাতিল করুন। নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সব পরিকল্পনা বাদ দিয়ে কম ব্যয়সাপেক্ষ ঝুঁকিমুক্ত বৃহৎ গ্যাস, বর্জ্য ও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করুন। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি নির্মাণ করতেই হয়, অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তা করুন।
মনে রাখতে হবে যে সুন্দরবন কোনো সরকারের না, এটি রাষ্ট্রের। সুন্দরবন শুধু এই প্রজন্ম বা এই অঞ্চলের মানুষের না, এটি সবার এবং সব সময়ের একটি অমূল্য সম্পদ বা হেরিটেজ।”
আসিফ নজরুলের মতো আরো অনেক বোদ্ধাই রামপাল প্রকল্পের ভয়াবহতা অত্যন্ত যুক্তিযুক্তভাবে তুলে ধরেছেন। দি ডেইলি স্টার পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রায় সব গণমাধ্যমেই এ নিয়ে লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু সরকার ও কতিপয় সাংবাদিক চোখে রঙিন চশমা দিয়ে থাকায় তাদের দৃষ্টিতে এসব লেখা ও যুক্তি পড়ছে না।
এই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন না করতে ভারত সরকারের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (এক্সিম) কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বিশ্বের ৯৬টি পরিবেশবাদী ও নাগরিক সংগঠন। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে পাশের সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষতি হবে এই আশঙ্কা প্রকাশ করে সংগঠনগুলো এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে একটি খোলা চিঠি দিয়েছে।
ওই খোলা চিঠি সম্পর্কে ভারতের জনবিজ্ঞান প্রচারাভিযানের সৌম্য দত্ত বলেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে এক্সিম ব্যাংকের এই অস্বাভাবিক পরিমাণে ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মানুষ ও সুন্দরবনের প্রতি এক ধরনের অপরাধ। শুধু এই প্রকল্পের কারণেই বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ১৫ শতাংশ বেড়ে যাবে।
(সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো : ১৪ই মে ২০১৬)
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের “রামপালের কালো ধোঁয়া”-শিরোনামে দৈনিক যুগান্তরে গত ১২ আগস্ট (২০১৬) প্রকাশিত এক নিবন্ধের খানিকটা হুবহু তুলে ধরছি :
“আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের মতো সমমনা বেশ কয়েকজন শিক্ষক অনেক বছর থেকে সপ্তাহের একটি দিন বসে কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। এই সপ্তাহে আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল ‘বিদ্যুৎ নাকি সুন্দরবন? নাকি দুটোই?’ নানা বিষয়ের নানা বয়সের অনেক শিক্ষকের মাঝে আমি একজন শিক্ষককেও খুঁজে পাইনি যিনি রামপালের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে মেনে নিতে রাজি আছেন। এই শিক্ষকরা আবেগনির্ভর যুক্তিহীন মানুষ নন। দেশের জন্য তাদের ভালোবাসা আছে সরকারের জন্য মমতা আছে, তারপরও তাদের কারও কাছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি গ্রহণযোগ্য প্রজেক্ট নয়।
পত্রপত্রিকায় অনেক লেখালেখি বের হয়েছে, যার মধ্যে কোনো লেখাতেই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে কাউকে কিছু লিখতে দেখিনি। শুনেছি টেলিভিশনের টকশোতে সরকারের পক্ষের কিছু মানুষ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে কথা বলে যাচ্ছেন; কিন্তু কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে কাউকে নরম করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। পৃথিবীর সামনে গর্ব করার মতো আমাদের খুব বেশি কিছু নেই, সুন্দরবন এর মধ্যে ব্যতিক্রম। যারা সুন্দরবন দেখেছে তারা এটাকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসে। সেই সুন্দরবনের ক্ষতি হয়ে যাবে সেটি এ দেশের কেউ মেনে নেবে না।
দেশের একেবারে সাধারণ মানুষও এতদিনে জেনে গেছে, প্রস্তাবিত ১৩২০ মেগাওয়াটের অর্ধেকও পাওয়া সম্ভব নয়, প্রায় দ্বিগুন দামে এই ইলেকট্রিসিটি কিনতে হবে, লাভের টাকা চলে যাবে ভারতে, পরিবেশ নষ্ট হবে বলে দুই-দুইটি ব্যাংক এই প্রজেক্ট থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। আমার মনে হয়, এরপরও জোর করে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করার চেষ্টা করলে সরকার তার অর্জনের অনেকটুকুই ম্লান করে ফেলবে।”
বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক, অলাভজনক ও মারাত্মক ক্ষতিকর এবং ভারতকে একচেটিয়া লাভ প্রদানকারী এই নতজানু রামপাল প্রকল্প থেকে কিছুতেই সরে আসবে না বলে যেভাবে নির্লজ্জ বক্তব্য ও ঘোষণা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রীরা দিচ্ছেন তা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জন্য কিছুতেই মানানসই হতে পারে না। “ক্ষতি হলেও সরবে না রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র : অর্থমন্ত্রী”Ñএই শিরোনামে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের খানিকটা তুলে ধরলেই বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার হবে।
“সুন্দরবনের কাছে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক কিছু প্রভাব পড়লেও প্রকল্পটি না সরানোর পক্ষেই সরকার অটল থাকবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
সোমবার (১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬) বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক পলা ক্যাবালেরো নেতত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, “দ্যাট উড বি সাম ইমপ্যাক্ট, অবভিয়াসলি (অবশ্যই কিছু প্রভাব পড়বে)। এত নৌকা আসবে, ক্যারিং সো মাচ কোল; এই নৌকা আসার ফলেই তো ফ্লোরা-ফনা ভেরি সাবস্টেনশিয়ালি অ্যাফেক্টেড হবে।”
অর্থমন্ত্রী বলেন, “রামপাল নিয়ে আমাদের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য হলো, তারা একটা ভালো পরিবেশগত সমীক্ষা করেছে। সেখানে খুব বেশি ইমপ্যাক্ট হবে না বলে দেখা গেছে।”
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সরিয়ে অন্য কোথাও করা যায় কি না- সাংবাদিকদের এই প্রশ্নে তিনি বলেন, এর কোনো সম্ভাবনা নেই।”
একটু লক্ষ্য করুন অর্থমন্ত্রী কিন্তু স্পষ্ট ভাষায় স্বীকারও করলেন যে অবশ্যই রামপাল বিদ্যুৎকন্দ্রের প্রভাব সুন্দরবনের ওপর পড়বে। অথচ তারপরও কতটা নির্লজ্জ ও দেশের প্রতি উদাসীন হলে এমন মন্তব্য করতে পারেন।
যাই হোক একটি বিষয় নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে শুধু বলতে চাই ভারতকে সঠিকভাবে উপলব্ধি না করাটা বাংলাদেশের জন্য যে কত বড় ট্র্যাজেডি তা ইতোমধ্যেই দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। বাকিরাও খুব শিগগিরই টের পাবেন। তবে ক্ষমতাসীন দল নিজেদেরকে স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি দাবি করে শুধুমাত্র ক্ষমতার নেশায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে যে বেঈমানী করে চলেছে তা বুঝতে দেশের মানুষের সক্ষমতার অভাব এই দেশের আরেক বড় ট্র্যাজেডি।
যেই পাটকে এক সময় বাংলাদেশের সোনালি আঁশ বলা হতো সেই পাটশিল্প ধ্বংসে ভারত যুগের পর যুগ যেভাবে একের পর এক ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে অবশেষে সফল হয়েছে সেই কাহিনী অনেকেরই জানা। পাটের সফলতা আজ বাংলাদেশের মানুষের কাছে কেবলই ইতিহাস। এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি অনেকটাই স্থিতি লাভ করেছে গার্মেন্টস শিল্পকে কেন্দ্র করে। এবার এই শিল্পকে ধ্বংসে ভারত ভয়ানক কূটকৌশল নিয়ে এগুচ্ছে। এমনকি ভারতের গণমাধ্যমও এক্ষেত্রে পালন করছে অত্যন্ত কুটিল ভূমিকা। একটি উদাহরণ দিলেই আশা করি সবার কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
“বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ভোগ করছে ভারত, আমেরিকাও”-এই শিরোনামে ভারতের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় গত ৬ই মে ২০১৬ তারিখে। শিরোনাম দেখে এই খবরটিকে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবদেন হিসেবে গ্রহণ করে আনন্দবাজারের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের অনেক গণমাধ্যমেও তা স্থান পেয়েছে।
প্রতিবেদনের ভাষা ও উপস্থাপনার ঢংয়ের মধ্যে রয়েছে বেশ নাটকীয়তা। শুরু থেকে এর খানিকা পড়লেই তা বোঝা যায়।
প্রতিবেদনের শুরু থেকে খানিকটা এরকম : “দরজা জানালা খোলা রেখে এসি চালালে কী লাভ? ঘর ঠান্ডা তো হবেই না। মাঝখান থেকে হু হু করে কারেন্ট পুড়বে। গরম থেকে রেহাই দূর অস্ত। এমন খামখেয়ালি কাজ মানা যায় না। বাংলাদেশের বাণিজ্যে এমনটাই হচ্ছে। রফতানিতে যত আয় তার চেয়ে ব্যয় বেশি। আয়ের ৮০ শতাংশ ছিদ্রপথে বিদেশে চলে যাচ্ছে।
ঠেকাবে কে! সর্ষের মধ্যেই যে ভূত! অভিযোগের আঙুল কাস্টমস আর ব্যাংক কর্তাদের দিকে। রফতানি সংস্থার মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশে তাঁরা অর্থ নির্গমনের পথ চওড়া করছেন। টাকার বৈভবে আহ্লাদে আটখানা। প্রাপ্য রসদ থেকে বঞ্চিত হয়ে শীর্ণ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।
দোষটা শুধু বাংলাদেশের নয়, যারা নিচ্ছে তাদেরও। কৃষ্ণবর্ণ অর্থের অনুপ্রবেশ বন্ধের দায়িত্ব তারা এড়ায় কী করে। অপরাধ ভারতেরও। সেখানেও চার ফেলে পাচার হওয়া টাকা ঘরে তোলার লোকের অভাব নেই। সরকারি স্তরে কড়া ব্যবস্থা নিয়ে ঠেকানো যাচ্ছে না কেন! ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। আসলে অর্থ¯্রাবী আগ্নেয়গিরির লাভা ¯্রােতের লোভ থেকে উত্তীর্ণ হওয়াটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এভাবে পাওয়া টাকাটা খারাপ টাকা। খারাপ টাকা ভালো কাজে নয়, খারাপ কাজেই লাগে। সন্ত্রাসীরাও এই টাকার প্রতীক্ষায় থাকে। যে দেশেই তারা থাকুক, তাদের প্রথম লক্ষ্য সে দেশের অর্থনীতির ভিত ভেঙে চুরমার করে নিজেদের ঐশ্বর্য বৃদ্ধি। নাশকতায় সক্রিয় হওয়ার সহজ রাস্তা সেটাই।”
প্রতিবেদনটিকে সবার কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করার জন্য বাংলাদেশের আত্মসাতের টাকা আরও যেসব দেশে পাচার হয় তারও শর্ট লিস্ট বা খুদে তালিকাও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয় :
“ভারত ছাড়াও আরও ৩৬টি দেশ বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ভোগ করছে। তার মধ্যে আমেরিকা, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড ব্রিটেন, জার্মানি, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, জাপানও আছে। সুযোগ বুঝে, কালো টাকা আত্মসাতের খেলায় নেমেছে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, রোমানিয়া, তুরস্ক, বেলারুশ ও মরিশাস।
বোঝাই যাচ্ছে, টাকা পাচারের মার্কেট নেহাত ছোট নয়। এত বড় চক্র এক দিনে গজায়নি। ধীরে ধীরে ডানা ছড়িয়েছে। এইসব দেশকে সাবধান করার দায়িত্ব বাংলাদেশের। অর্থনৈতিক ক্ষতিটা তাদেরই বইতে হচ্ছে।”
প্রতিবেদনের এই পর্যায়ে এসে আনন্দবাজার পত্রিকা তার আসল চালটি চেলেছে। বাংলাদেশের সহজ-সরল ও উদাসীন জনগোষ্ঠীর খুব সামান্য সংখ্যকই হয়তো এই কূটচালের বিষয়টি খেয়াল করে থাকবেন বলে আমার ধারণা। প্রতিবেদনের এই পর্যায়ে বলা হয়েছে :
“রফতানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের সব থেকে বেশি আয় পোশাক শিল্পে। রফতানির ৮২ শতাংশ তারাই করে। পাচার চক্রে তারাই যুক্ত। পোশাক শিল্পে যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য শুল্ক নেয়া হয় না। সেখানেও গোলমাল। কম দামে মাল কিনে বেশি দাম দেখানো হয়। অতিরিক্ত টাকাটা ফাঁক গলে চলে যায় বিদেশে।”
এখানে এসেই আসল জায়গায় আঘাত করলো ভারতীয় পত্রিকাটি। কোন ধরনের তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই এবং বিশ্বাসযোগ্য সূত্রের বরাত না দিয়েই সোজাসাপ্টা বলে দিল টাকা পাচার চক্রে শুধু পোশাক শিল্প মালিকরাই জড়িত। বাক্যটির দিকে খেয়াল করুন। বলা হলো : “পাচার চক্রে তারাই যুক্ত”।
দেশের প্রধান রফতানি খাতের এই শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য শুল্ক নেয়া হয় না তাও যেন সহ্য হচ্ছে না আনন্দবাজারের। অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উত্থানের মূল শক্তি অর্থাৎ কম খরচ (সস্তা শ্রমসহ) যাতে বাধা পায় তার সুন্দর ফর্মুলা ঠিক করে দেয়া হলো।
এরপরই আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বিগত ১০ বছরের পাচারের একটি খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে : “দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৪৯ হাজার ১৩ কোটি ডলার। পরিমাণটা কী ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার মতো? টাকাটা কোথায় কিভাবে খরচ হলো সেটাও তো দেখা দরকার। সব রফতানিকারক সংস্থাই যে এ কাজ করছে এমন তো নয়।
অপরাধীদের জেরা করলেই জানা যাবে কোন দেশে কত টাকা যাচ্ছে। কী কাজে লাগছে। বাংলাদেশের ঊর্ধ্বমুখী অর্থনীতিকে টান মেরে নিচে নামানোর চেয়ে জঘন্য কাজ আর কী হতে পারে। যাদের জেলখানার ভেতরে থাকার কথা, তারা বাইরে ঘুরে বেড়ায় কী করে!”
এই প্রতিবেদনের সরল অর্থ দাঁড়ালাÑ এখন বাংলাদেশ সরকারের উচিত দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরী পোশাক শিল্পের মালিকদের ধরে ধরে আটক করা ও ডিটেনশনে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা। আর এই সুযোগে দেশের তৈরী পোশাক খাত গোল্লায় যাক এবং শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসুক আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু দেশের উদ্যোক্তারা।
বিষয়টি বোধগম্য করার জন্য বিগত ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে আমেরিকার কমার্স ডিপার্টমেন্টের (টঝ পড়সসবৎপব ফবঢ়ধৎঃসবহঃ) এর অধীন পোশাক খাতে নিয়োজিত টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলস (ঙভভরপব ড়ভ ঞবীঃরষবং ধহফ অঢ়ঢ়ধৎবষং) অফিস থেকে প্রকাশিত জরিপের খানিকটা তুলে ধরতে চাই।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রফতানি আয় বেড়েছে ১১.৪০ শতাংশ। বিগত ২০১৪ সালের প্রথম ১০ মাসে এই আয় যেখানে ছিল ৪.৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৪,৭২০ কোটি টাকা, সেখানে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে এই আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪.৮৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৮,৭২০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ বিগত এক বছরে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রফতানি আয় বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার। প্রতি ডলারের বিপরীতে ৮০ টাকা করে হিসাব করে এই তথ্য বের করা হয়েছে। আর এই রফতানি আয়ের সিংহভাগই এসেছে পোশাক খাত থেকে।
আমেরিকার ওই জরিপে আরো বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানির পরিমাণ বেড়েছে ১১.১৪ শতাংশ।
এই সময়ে বাংলাদেশ আমেরিকার বাজারে তৈরী পোশাক রফতানি করে আয় করেছে ৪.৬৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৭,২৮০ কোটি টাকা। বিগত ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই আয় ছিল ৪.১৯ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৩,৫২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিগত ১ বছরে আমেরিকার বাজারে তৈরী পোশাক রফতানি খাত থেকে বাংলাদেশের আয় বেড়েছে প্রায় ৩,৭৬০ কোটি টাকা।
এদিকে, আমেরিকার বাজারে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের পোশাক রফতানির বিষয়ে মার্কিন কমার্স ডিপার্টমেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে এই রফতানি বেড়েছে ৭.৫২ শতাংশ। এই সময়ে ভারত আমেরিকায় ৩.১৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৫,২৮০ কোটি টাকার তৈরী পোশাক রফতানি করেছে।
বিগত ২০১৪ সালে এর পরিমাণ ছিল ২.৯৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৩,৫২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমেরিকার বাজারে তৈরী পোশাক খাত থেকে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসেই ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের আয় প্রায় ১৩,৭৬০ কোটি টাকা বেশি।
নিশ্চয়ই এটা এখন দিবালোকের মতো বোধগম্য যে ভারত যেকোন মূল্যে এই খাতে বাংলাদেশকে টপকে উপরে উঠতে চায়। তাই এ বিষয়ে সতর্কতার সাথে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
প্রতিযোগিতার এই বিশ্বায়নের যুগে ভারত তার পোশাক খাতকে শক্তিশালী করার জন্য সম্ভাব্য সব উপায় অবলম্বন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশ এই ব্যাপারে কতটা সচেতন সেটাই এখন দেখার বিষয়।
যাই হোক, মনে রাখতে হবে ভারত সব সময়ই বাংলাদেশকে দমিয়ে রাখতে চাইবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদেরকে যেটা করতে হবে তা হলো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দেশের ও দেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণীয় বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু এটা উপলব্ধিতে না আসাটাই হলো বড় ট্র্যাজেডি। তবে, আশা করি এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। নতুন প্রজন্মকে অন্তত আর বোকা বানিয়ে রাখা যাবে না বলেই আমার দৃঢ়বিশ্বাস। তারা ঠিকই চিনতে পারবে কে তাদের আসল শত্রু, কোন মাত্রার শত্রু এবং কার সাথে কি সম্পর্ক রাখতে হবে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথা হলো বাংলাদেশকে কুক্ষিগত করার ব্যাপারে ভারতের আত্মবিশ্বাস দিন দিন এক অবিশ্বাস্য মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না দিলেও বাংলাদেশকে তাদের অঙ্গরাজ্য হিসেবে গণ্য করা শুরু করেছে। শেখ হাসিনার সরকার দেশের গণমাধ্যমকে প্রায় শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করায় এখন আর ভারতের আগ্রাসন নিয়ে খুব একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে না বাংলাদেশের মিডিয়া। তা না হলে বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি ভারতের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হলো তা নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের মধ্যে ন্যূনতম কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি অনলাইন গণমাধ্যম ও ব্লগে এ নিয়ে কিছু লেখালেখি হয়েছে। এ বিষয়ে “বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ভারতের সরকারি চাকরির ওয়েবসাইটে!” শিরোনামে ২০ জুন ২০১৬ তারিখে বিডিটুডে ব্লগে প্রকাশিত প্রতিবেদনটির খানিকটা তুলে ধরছি :
“বিষয়টা উদ্বেগজনক হলেও সত্য যে ভারতের সরকারি চাকরি ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়েছে। কর্মসূত্র (যঃঃঢ়://িি.িশধৎসধশংযবঃৎধ.ড়ৎম/) নামের ওয়েবসাইটটি মূলত ভারতীয় বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি চাকরি বিজ্ঞপ্তি প্রচারের একটি ওয়েবসাইট। সেখানে দেখা যাচ্ছে ভারতের অন্যান্য চাকরির সাথে সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চাকরির বিজ্ঞপ্তিও রাখা হয়েছে। (যঃঃঢ়://িি.ি শধৎসধশংযবঃৎধ.ড়ৎম/নফ-ধৎসু-ংধরহরশ-ৎবপৎঁরঃসবহঃ/)।
ভারতীয় ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতীক দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কে বা কারা প্রচার করছে সেটা অনেক বড় প্রশ্ন। ওয়েবসাইটটিতে বাংলাদেশের আর অন্য কোন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি রাখা হয়নি, সেনাবাহিনীটির ছাড়া।
সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, যোগ্যতা হিসাবে ওয়েবসাইটের কোথাও লেখা নাই যে প্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। অনলাইন ও এসএমএসে দরখস্ত করা যাবে।
বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে স্কেল অব পে বিভাগে স্পষ্ট করে ভারতীয় রুপি উল্লেখ করে বেতনের কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, নির্বাচিত প্রার্থীরা বেসিক পারিশ্রমিক পাবেন ৫,২০০ থেকে ২০,২০০ রুপি। এদিকে অ্যাপ্লিকেশন ফিস বিভাগেও রুপির কথা উল্লেখ করে লেখা হয়েছে, আবেদনকারীদের অফেরতযোগ্য ২০০ রুপি পরিশোধ করতে হবে এবং এই পেমেন্ট ব্যাংক ড্রাফের মাধ্যমে পাঠাতে হবে।
বাংলাদেশের বাংলা বিজ্ঞাপনে আবেদন করার জন্য টেলিটকের সাইটের ঠিকানা দেয়া হলেও ভারতীয় সাইটে তা গোপন করা হয়েছে। একইভাবে এসএমএস-এর মাধ্যমে আবেদন করার জন্য নির্দিষ্ট কোড লেখে ১৬২২২ নাম্বারে পাঠিয়ে দেয়ার কথা বলা হলেও সেটাও বাদ দেয়া হয়েছে। বাংলা বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশের কোন কোন জেলার মানুষ আবেদন করতে পারবে তা লেখা থাকলেও ভারতীয় বিজ্ঞাপনে তাও বাদ গিয়েছে। বাংলা বিজ্ঞাপনে কোথাও রুপি শব্দটি উল্লেখ করা না হলেও তারা নিজেদের মত করে এটি উল্লেখ করেছে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় অনেক তথ্যই ওই বিজ্ঞাপনে প্রকাশ পায়নি।
অনেকেই এটাকে ভয়াবহ আলামত হিসেবেই দেখছেন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কোন বিদেশি নিয়োগের সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে ভারতীয়দের মধ্যে প্রচারের দরকারও নেই। কিছুদিন আগে যমুনা টিভির এক প্রতিবেদনে দেখা যায় নাম, স্থানীয় পরিচয় গোপন করে শত শত পুলিশ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীতেই কি সেভাবে ভারতীয় নিয়োগ দেয়া হচ্ছে? সূত্র : যঃঃঢ়://িি.িশধৎসধশংযবঃৎধ.ড়ৎম/নফ-ধৎসু-ংধরহরশ-ৎবপৎঁরঃসবহঃ/
তবে, বিশাল শরীরের ক্ষুদ্র আত্মার ভারত বিজ্ঞাপনটি পরবর্তীতে সরিয়ে ফেলে। এই নিয়ে ফেসবুকে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক লেখালেখি শুরু হয়। ক্ষুদ্র মনের কিন্তু ধূর্ত ভারত বুঝতে পারে বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে এবং ভারতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হতে পারে। এতে করে বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় দেশটি। আমাদের জন্য আশার দিক হলো এটাই। দেশের মানুষ সত্যিকার দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে একযোগে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে এদেশকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারবে না বলেই আমার বিশ্বাস। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারতের আগ্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ যেভাবে ফুঁসে উঠেছিল সেভাবেই দেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে এ দেশের মানুষ জেগে উঠবে সেই দিনটিরই অপেক্ষায় থাকলাম।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

SHARE