বাংলাদেশের ট্র্যাজেডি পর্ব-দুই -মো: কামরুজ্জামান বাবলু

এই ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে কিছুটা তুলে ধরেছি ঐতিহাসিক দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে যেখানে যেকোনো সচেতন ও বিবেকবাক মানুষই বুঝতে সক্ষম হবেন যে নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হিসেবে জাহির করে আওয়ামী যে রাজনীতি এদেশে বিগত প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলছে তা কতটা ভাঁওতাবাজি। তবে, বাংলাদেশের জন্য যেটা বড় ট্র্যাজেডি তা হলো এ দেশের কোটি কোটি মানুষ এই রাজনৈতিক কূটচাল ও মিথ্যাচার সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন।
যেই রাজনৈতিক দলের সব নেতার বক্তব্যের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই খই ফুটে সেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আসলে মুক্তিযুদ্ধে কতটা অবদান রেখেছিল তার সঠিক ইতিহাস অবশ্যই দেশের মানুষের কাছে উপযুক্ত তথ্য-উপাত্তসহ তুলে ধরা প্রতিটি সচেতন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। কোন ধরনের রাজনৈতিক বৈরিতা থেকে নয় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœ রাখার স্বার্থেই বিষয়টি পরিষ্কার হতে হবে। এবারে কয়েকটি সূত্রের বরাতসহ তথ্য তুলে ধরছি :
নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কমোডর (অব:) আতাউর রহমান। দেশে-বিদেশে দীর্ঘ ২৬ বছর নৌবাহিনীতে চাকরির পর ১৯৭৬ সালে কমোডর হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। তিনি ৪ বছর ডিপ্লোম্যাটিক সার্ভিসে লন্ডনে ডেপুটি নেভাল অ্যাডভাইজার হিসেবে কাটিয়েছেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানে অন্তরীণ ছিলেন সাবেক এই ঊর্ধ্বতন নৌকর্মকর্তা। তার লেখা ‘অবরুদ্ধ দিনগুলো’ নামক গ্রন্থে তিনি লিখেছেন :
“সমগ্র জাতি নির্বাচন নিয়ে মেতে উঠল আর ঠিক সে সময়ই ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বাংলার জাতীয় ইতিহাসে নেমে এলো এক কালরাত্রি। এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় বাংলার দক্ষিণাঞ্চল তছনছ করে দিয়ে গেল এবং এর ছোবলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল ১০ লক্ষ উপকূলীয় বাসিন্দা। সময়মত ঝড়ের সঙ্কেত পেলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হতো বলেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রকাশিত হতে থাকলো। সরকারের ঢিলেমিতে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছতে বিলম্ব হলো বলেও দুঃখ-দুর্দশা শত গুণে বেড়ে গেল। তদুপরি এ ধরনের চরম জাতীয় দুর্যোগেও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উপেক্ষা ও উদাসীনতা বাঙালিদের চরমভাবে আহত করল।
এই পটভূমিতে হলো ডিসেম্বরের নির্বাচন। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি সিটের মধ্যে ১৬০টি আসন পেল আওয়ামী লীগ, পিডিপির নুরুল আমীন পেলেন ১টি আর স্বতন্ত্র ত্রিদিব রায় পেলেন ১টি। ত্রিদিব রায়ও পরে আওয়ামী লীগভুক্ত হয়ে যান। অন্য দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে পিপল্স পার্টি পেল ৮৩টি সিট এবং আওয়ামী লীগ পেল না একটিও। জাতি সম্পূর্ণ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেল।” (সূত্র : অবরুদ্ধ দিনগুলো, কমোডর (অব:) এম আতাউর রহমান, পালাবদল পাবলিকেশন্স, ফরিরেরপুল, ঢাকা, মে ১৯৯৯, পৃষ্ঠা-৩৬)

কমোডর (অব:) এম আতাউর রহমান তার ‘অবরুদ্ধ দিনগুলো’ গ্রন্থে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করেছেন। তিনি লিখেছেন : “৭ই মার্চে শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং তারপর ২৫ মার্চ পর্যন্ত অনিশ্চিত অবস্থা সমগ্র বাঙালিদের স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেও বাঙালি জাতির কাক্সিক্ষত স্বায়ত্তশাসনের দাবি আদায় করার সংগ্রাম শেখ মুজিব অব্যাহত রেখেছিলেন। পাকিস্তানে বসে উর্দুওয়ালাদের, বিশেষ করে পাঞ্জাবিদের নিকট থেকে আমরা সব সময় ধারণা পেতাম শেখ মুজিব ও কিছু গাদ্দার বাঙালি দেশটাকে দু’ভাগ করে দিতে চাইছে। আমরা অর্থাৎ বাঙালিরা এই অপবাদ ঠিক বিশ্বাস করতে পারতাম না এবং বলতাম যে, শেখ মুজিব ও বাঙালি নেতৃবৃন্দ স্বায়ত্তশাসনের ন্যায্য দাবি উত্থাপন করছেন যাতে দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়। বহু বছর পর দৈনিক টেলিগ্রাফের দক্ষিণ এশীয় সংবাদদাতা ডেভিড লোসাক-এর ‘পাকিস্তান ক্রাইসিস’ নামক বইতে লিখেন- আমরা প্রমাণ পাই যে শেখ মুজিব দেশ ভাঙতে চাননি। এই বইতে স্পষ্টভাবেই লেখা আছে শেখ মুজিব বলেন, ‘বিচ্ছিন্নতা থেকে পূর্ব পাকিস্তান কিছুই পাবে না- রক্তপাত ও পীড়ন ছাড়া। আওয়ামী লীগের ম্যানডেট স্বাধীনতার জন্য নয়-স্বায়ত্তশাসনের জন্য’। কিন্তু শুধু তিনি চাইলেই ত হবে না।
১৯৭৪ সালে একদিন গণভবনে (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অফিস) বঙ্গবন্ধুর সাথে একান্ত আলাপের সময় জিজ্ঞেস করেছিলাম তিনি কি পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন? তিনি আমার দিকে ক্ষণকাল একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকলেন, তারপর গুরুগম্ভীর স্বরে পাল্টা আমাকেই প্রশ্ন করলেন, আমার কি মনে হয়? প্রমাদ গুনলাম। ভাবলাম কেন এ ধরনের প্রশ্ন করলাম? আমার বিব্রতকর অবস্থা থেকে তিনিই আমাকে উদ্ধার করলেন এই বলে, “আমি প্রতারণা করার জন্য ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সাথে বৈঠকে বসিনি। দেশের সঙ্গে, বাংলার মানুষের সঙ্গে বেঈমানী আমি করিনি।” বঙ্গবন্ধুর এই উক্তি থেকেও সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় যে তিনি স্বায়ত্তশাসনের জন্যই সংগ্রাম করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে তিনি প্রতারিত হয়েছিলেন।” (সূত্র : অবরুদ্ধ দিনগুলো, কমোডর (অব:) এম আতাউর রহমান, পালাবদল পাবলিকেশন্স, ফরিরেরপুল, ঢাকা, মে ১৯৯৯, পৃষ্ঠা-৬৮-৬৯)

সুতরাং সবদিক পর্যালোচনা করে বলা যায়-বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে ৬-দফা আন্দোলন কতটা ভূমিকা রেখেছিল তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক থাকলেও ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা দিতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের গড়িমসির প্রেক্ষাপটেই যে আওয়ামী লীগ ছিল ক্ষুব্ধ। কিন্তু তা সত্ত্বেও দলটির শীর্ষ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করতে চেয়েছিলেন। মূলত পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কারণেই যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। কমোডর (অব:) এম আতাউর রহমান আরও লিখেছেন :
“পাকিস্তান ভাঙার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের জেনারেলগণ ও রাজনীতিবিদ ভুট্টোই দায়ী। তারাই বাঙালিদের দমনের জন্য নীলনকশা তৈরি করে ফেলেছিলেন ১৯৭১ এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে এবং অন্তর্বর্তীকালীন আলাপ-আলোচনা ছিল লোক দেখানো বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দেয়ার ফন্দি।
শেখ মুজিব আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করতেন যে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটা সুরাহা হবে। তাই তিনি আলাপ চালিয়ে গেছেন। তিনি ও তার দলের নেতৃবৃন্দ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি যে, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ভুট্টোর পরামর্শ অনুযায়ী দেশ ভাঙা ও বাঙালিদের নির্মূল করার লক্ষ্যে কি গভীর ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছিল।” (সূত্র : অবরুদ্ধ দিনগুলো, কমোডর (অব:) এম আতাউর রহমান, পালাবদল পাবলিকেশন্স, ফরিরেরপুল, ঢাকা, মে ১৯৯৯, পৃষ্ঠা-৬৯)

১৯৭১ সালের শুরুর দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) এবং ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ হোসেন তার ‘একাত্তরের স্মৃতি’ বইয়ে লিখেছেন কিভাবে দেশের মানুষকে যুদ্ধের জন্য আহবান জানিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন : ‘আশ্চর্যের বিষয় যারা গৃহযুদ্ধের পরিকল্পনা করেছিলো এবং আর্মির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের উসকানি দিয়ে যাচ্ছিলো তাদের কাউকে গ্রেফতারও করা হয়নি। রহস্যের কথা ২৫ মার্চের পর আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সকলে সীমান্ত অতিক্রম করে ইন্ডিয়া চলে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।” (সূত্র : একাত্তরের স্মৃতি, ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৫ আগস্ট ২০০৯, পৃষ্ঠা নং ৭৫)

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী সাজিয়ে কিভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিল আওয়ামী লীগ তারও প্রমাণ পাওয়া যায় মেজর জলিলের লেখায়। নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে এসেও হেন কোন অপকর্ম নেই যা আওয়ামী লীগ করেনি। মেজর জলিল লিখেছেন :
“ভারতে অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অনেক কিছুই জানতে চেয়েছিলেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক এবং চিত্রনির্মাতা কাজী জহির রায়হান। তিনি জেনেছিলেন অনেক কিছু, চিত্রায়িতও করেছিলেন অনেক দুর্লভ দৃশ্যের। কিন্তু অতসব জানতে বুঝতে গিয়ে তিনি বেজায় অপরাধ করে ফেলেছিলেন। স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই তাকে সেই অনেক কিছু জানার অপরাধেই প্রাণ দিতে হয়েছে বলে সকলের ধারণা। ভারতের মাটিতে অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের চুরি-দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা, যৌন কেলেঙ্কারি, বিভিন্ন রূপ ভোগ-বিলাসসহ তাদের বিভিন্নমুখী অপকর্মের প্রচুর প্রামাণ্য দলিল ছিল- ছিল সচিত্র দৃশ্য। আওয়ামী লীগের অতি সাধের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে জহির রায়হানের এত বড় অপরাধকে স্বার্থান্বেষী মহল কোন্ যুক্তিতে ক্ষমা করতে পারে? তাই বেঁচে থেকে স্বাধীনতার পরবর্তী রূপ দেখে যাওয়ার সুযোগ হয়নি জহির রায়হানের।” (সূত্র : মেজর জলিল, রচনাবলি, কমলকুঁড়ি প্রকাশন, জুলাই-২০০৬, পৃষ্ঠা-৫৫-৫৬)

মুক্তিযুদ্ধের কথিত চেতনাধারী আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আহমদ ছফা লিখেছেন : “উনিশ শ’ একাত্তর সালের ষোলই ডিসেম্বরের পরে ভারতীয় বাহিনীর পেছন পেছন আওয়ামী লীগের লোকেরা বাংলাদেশে প্রবেশ করে ক্ষমতার আসনে গ্যাঁট হয়ে বসে। তাদেরকে দেশের অভ্যন্তরে কোনো রকমের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়নি। পাছে অন্যরকম কোনকিছু ঘটে এ জন্য অনেকদিন পর্যন্ত ভারতীয় বাহিনী তাদের চারিদিকে পাহারা দিয়েছে। নিরুপদ্রবে যাতে আওয়ামী লীগাররা রাজ্য ভোগ করতে পারে সে জন্য প্রকৃত সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের অনেককেই কারাগারের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে তারপর ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ ছেড়েছে।
আওয়ামী লীগের লোকেরা দেশে প্রবেশ করে মনের আনন্দে গুলি ছুড়ছে, অনেক সময় দেশের নাম করে ব্যক্তিগত শত্রুদের নিঃশেষ করে দেবার জন্য এবং বিহারিদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখল করার জন্য রাইফেল, এলএমজির ব্যবহার করলেও বিরোধিতার কারণে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার তাদের একেবারেই করতে হয়নি। পাকিস্তানি সৈন্যদের আগেই ভারতে চালান করে দেয়া হয়েছে এবং কলাবরেটররা অনেকে ধরা পড়েছে এবং অনেকে সঙ্গে সঙ্গেই মারা পড়েছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে টুঁ-শব্দটি উচ্চারণ করার কোন মানুষ ছিল না। তারা ইচ্ছেমতো লুটপাট করেছে। পরিত্যক্ত বাড়িঘর যার যা পছন্দ হয়েছে দখল করে নিয়েছে। গাড়ি-ঘোড়া যা পেয়েছে নিজেরা নিয়ে নিয়েছে। দেখা গেল, উনিশ শ’ একাত্তরের আগে যাদের ধন-সম্পদ, চরিত্র এবং বিদ্যা এসবের কিছুই ছিল না, বাহাত্তরের মধ্যে দেখা গেল তারা একেকজনে দু’তিনটা করে প্রাইভেট কার রাখে, চার পাঁচটা করে বাড়ির মালিক এবং নগদ টাকার অন্ত নেই। শুধু লুটপাট নয়, সরকারি আইনের সুযোগ নিয়ে লাইসেন্স-পারমিট ইত্যাদি বাগিয়ে আওয়ামী লীগের নিরীহতম মানুষটিও টাকার গাছে পরিণত হয়েছে। জয়বাংলা মন্ত্রের কি অপরূপ মহিমা।
এরা একবার উনিশ শ’ একাত্তর সালে তথাকথিত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিহারিদের বাড়ি-গাড়ি, টাকা-পয়সা লুট করেছে, তাদের হত্যা করেছে। তাদেরই একাংশ পাকিস্তানি সৈন্যের আক্রমণের পর ব্যাংক ও ট্রেজারির কোটি কোটি টাকা লুট করে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল। এই আওয়ামী লীগের আরেকটি ক্ষুদ্র অংশ দেশের ভেতরে থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগিতা করেছে।” (সূত্র : আহমদ ছফা, নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ফেব্রুয়ারি ২০১১, বাংলাবাজার, ঢাকা, পৃষ্ঠা-৪৫৩)

সত্যি কথা বলতে ক্ষমতাই সব সময় আওয়ামী লীগের কাছে মুখ্য বিষয়। দেশ, দেশের স্বার্থ কখনই এই দলটির কাছে বড় ছিল না। আহমদ ছফা আরো লিখেছেন :
“খাঁটি আওয়ামী লীগাররা ভারতীয় সৈন্যের পিছু পিছু দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বাড়ি গাড়ি দখল, দোকানপাট হস্তগত করা থেকে শুরু করে নারী নির্যাতন পর্যন্ত সমস্ত কাজ অবলীলায় সম্পন্ন করে দেশপ্রেমের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এতেও শেষ নয়। দেশের যা কিছু সম্পদ যেমন পাট, চামড়া ইত্যাদি এবং অন্যান্য জিনিস অবশিষ্ট ছিল রাতারাতি ভারতে পাচার করে দিয়ে বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করল।
দেশে কল-কারখানা নেই বিশেষ, তবু অল্প-স্বল্প যা আছে তার যন্ত্রপাতি খুলে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বেচে দিল। আওয়ামী লীগাররা যেখানেই হাত দেয় সোনার বাংলা সোনা তাল তাল তাদের হাতে উঠে আসতে থাকল। এত লুট তবু সোনার বাংলার সম্পদ ফুরায় না। তারপরও কল-কারখানা যেগুলো ছিল সেগুলোতে ধরে ধরে নিজের দলের লোকদের চালক বানিয়ে সম্পূর্ণভাবে বিকল করে দিল। এসব নিয়ে কেউ যদি হ্যাঁচ্ছো করত, অমনিই বলা হতো কলাবরেটর, রাজাকার, আলবদর, চীন এবং পাকিস্তানের গুপ্তচর।” (সূত্র : আহমদ ছফা, নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ফেব্রুয়ারি ২০১১, বাংলাবাজার, ঢাকা, পৃষ্ঠা-৪৫৪)

এভাবে একটু ইতিহাস ঘাঁটলেই সবার কাছে প্রতীয়মান হবে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যুগের পর যুগ মিথ্যাচার করে গেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তবে, এটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাদ দিলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার মতো কোনো নৈতিক ভিত্তিই থাকে না। তখন তাদেরকে শুধুমাত্র দেশপ্রেম, সততা ও অন্যান্য যোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল হতে হতো। আর দেশের রাজনীতিতে পড়তো এর সুফল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে দলটি যুগের পর যুগ সব অপকর্ম ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছে, আর আমাদের দেশের উদাসীন এবং ইতিহাসবিস্মৃত জনগণও ঘোরের মধ্যে আওয়ামী লীগকে সমর্থন জুগিয়ে আসছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে রাজনীতির এই ধারাকেই আমার কাছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে মনে হচ্ছে। এটা থেকে দেশকে মুক্ত না করা পর্যন্ত দেশের মানুষের প্রকৃত মুক্তি আসবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ এত বড় একটি ঐতিহাসিক মিথ্যাচারনির্ভর রাজনীতি যে দেশে প্রতিষ্ঠিত থাকে সেই দেশে রাজনীতিবিদদের পক্ষে সততা ও দেশপ্রেম নিয়ে দেশের সেবায় কাজ করা কখনোই সম্ভব বলে অন্তত আমি মনে করি না। আর এর প্রমাণ আমরা প্রতি পদে পদে দেখতে পাচ্ছি। আর তার ফল কী হচ্ছে সেটা বোঝাতে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের একটি সাম্প্রতিক বক্তব্য দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। তিনি চলতি বছরের ২৭ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এক ইফতার পার্টিতে অংশ নিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে যা বলেছিলেন তারই খানিকটা নিম্নরূপ :
“আইনজ্ঞরা আর সংসদ চালায় না, এখন সংসদ চালায় মাদক ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, সুশাসন আজ গুলিবিদ্ধ। ৫৪ ধারা উঠে গেছে কিন্তু তার পরিবর্তে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। রিমান্ডে থাকা আসামি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছে। দেশে কোনো আইনের শাসন চলছে না। আর এ কারণেই বন্দুকযুদ্ধের নামে একের পর এক মায়ের বুক খালি হচ্ছে। প্রতিনিয়ত মানুষ হত্যা, গুপ্তহত্যা হচ্ছে। এমন নির্যাতন, নিষ্ঠুরতা আগে কখনও দেখা যায়নি। সর্বত্রই ভয় আর আতঙ্ক। জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। লাখ লাখ মামলার জটে বিচারপ্রার্থীরা প্রতিনিয়ত হয়রানি হচ্ছে।” (সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন, অনলাইন সংস্করণ, আপডেট ২৭ জুন ২০১৬, রাত ৯টা ৪৫ মিনিট)।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের অংশীদার এবং মন্ত্রীর সমমর্যাদাপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালনরত এরশাদের বক্তব্যই যখন এমন তখন দেশের বাস্তব পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা সবাই উপলব্ধি করছি। কিন্তু এরপরও দেশের ক্ষমতা দখল করে আছে আওয়ামী লীগ। তাও আবার একটি বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। সবই সম্ভব হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জোরে। যেহেতু তারা দেশ স্বাধীন করেছে, তারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারী একমাত্র দল। তাই এতটুকু বাড়াবাড়ি তো তাদের প্রাপ্য!
(চলবে)
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

SHARE