বাংলাদেশের ট্র্যাজেডি পর্ব : তিন -মো: কামরুজ্জামান বাবলু

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশেষ করে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল-ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি-ক্ষমতা দখলের জন্য এক ভয়ঙ্কর ভারত-তাঁবেদারি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এর ফলে একাত্তরে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া এই ভূখন্ডে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য ভারতের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেই আশঙ্কা অনেক বিজ্ঞজনের। গণতন্ত্রের যে বীজ এদেশে বপন করা হয়েছিল তা মারাত্মকভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে।
প্রকৃতিগতভাবেই আত্মভোলা ও ইতিহাসবিস্মৃত এদেশের মানুষ এই বিষয়টি হয়তো খুব কমই উপলব্ধি করে থাকেন। মারাত্মকভাবে বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত হওয়ার আগ পর্যন্ত হয়তো বিষয়টি নিয়ে খুব একটা চিন্তিত হতে দেখা যাবে না বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষকে। তবে, এদেশের ধূর্ত ও নীতিহীন রাজনীতিবিদদের অনেকেই এখন মনে করেন, জনগণের সমর্থন কোন বিষয় নয়, ভারতের আস্থাভাজন হওয়াই এখানে ক্ষমতায় আরোহণের মূলমন্ত্র। রাজনীতিবিদদের এমন নতজানু মনোভাবের ফলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশের মানুষের চরিত্রের এই দিকটি এবং তাদেরকে শাসন করার জন্য উপযুক্ত যে বৈশিষ্ট্যগুলো এদেশের রাজনীতিবিদরা লালন করে আসছেন তা বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন আমেরিকার ওয়েস্টার্ন মিসিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের (Western Michigan University) অধ্যাপক লরেন্স জিরিং (Lawrence Ziring)। তিনি ১৯৫৭ সালে প্রথম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৫৯-৬০ সালে প্রথম দফায় এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় দফায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই দেশ নিয়ে তার দীর্ঘদিনের গবেষণার ফসল হলো তার অমর গ্রন্থ Bangladesh-From Mujib to Ershad : An interpretive study
পরবর্তীতে বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন আরেক কীর্তিমান গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো: মাইমুল আহসান খান। তিনি তার অনুবাদ গ্রন্থের নাম দিয়েছেন “বাংলাদেশ-মুজিব থেকে এরশাদ : একটি বিশ্লেষণধর্মী ইতিহাস”। অধ্যাপক জিরিং তার বইয়ে লিখেছেন :
It has been demonstrated that politics in Bangladesh revolves around personalities, not ideas or institutions. The record to date describes petty but sometimes deadly plays for power and privilege; there is little evidence that national growth and purpose are seriously involved.
(m~Î: Lawrence Ziring, Bangladesh-From Mujib to Ershad: An interpretive study, Oxford University Press, 1992, pp. 216)
অর্থাৎ-“এ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয় কিছু ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কোন আদর্শ, ধারণা বা প্রতিষ্ঠান বড় হয়ে ওঠে না। সঠিক তথ্য অনুসারে দেখা যায় যে, ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধার লড়াইয়ে কেবলই ব্যক্তিস্বার্থ নিহিত থাকে। জাতীয় স্বার্থ ও সমৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার লড়াই হয়েছে এমন ইতিহাস বাংলাদেশে কম।”
(সূত্র : লরেন্স জিরিং, বাংলাদেশ-মুজিব থেকে এরশাদ : একটি বিশ্লেষণধর্মী ইতিহাস, স্কাইলার্ক প্রিন্টার্স, জুলাই ২০১৪, পৃষ্ঠা-২৫৭)
আজ (২০১৬) থেকে ২৪ বছর আগে ১৯৯২ সালে প্রকাশিত লরেন্স জিরিংয়ের বইয়ে লেখক অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই ভয়াবহ দিকটি তুলে ধরেছিলেন। একজন ভিনদেশী গবেষক হওয়ায় বাংলাদেশের কোনো শক্তির প্রতি তার কোন ধরনের অনুরাগ বা বিরাগভাজন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকায় হয়তো তিনি অত্যন্ত পক্ষপাতহীনভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির এই দৈন্যদশাটি তুলে ধরতে পেরেছিলেন। তিনি লিখেছেন :
ÒIn such an environment perhaps it is asking too much for Bangladesh to evolve a more positive political mindset, and hence a more congenial political system. People will continue to play out their lives in the land of the Bengla speakers irrespective of the tug or war between ambitious personalities. Their minimum life standards are unaffected by these struggles for status and influence, for power and wealth. The gap between the rulers and the ruled is substantial and it is destined to spread as more and more people sense less and less affiliation with national figures.
(m~Î: Lawrence Ziring, Bangladesh-From Mujib to Ershad: An interpretive study, xfo
অর্থাৎ “কাজেই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সমঝোতার বাতাসও সহজে বইবে না। বাংলাদেশের কিছু অতি উচ্চাভিলাষী মানুষের রাজনৈতিক লড়াই ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বাংলাদেশীদের জীবন বাংলার মাটিতে সম্ভবত অনেক কষ্টকরই করে রাখবে। আর এর ভেতর দিয়েই বাংলাদেশের মানুষ অধিকতর ভালো জীবন যাপনের চেষ্ট করবে; এমনভাবে যাতে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে কুরুক্ষেত্রের ভেতর দিয়েই তারা নিজেদের জীবন রক্ষা করে চলবে। ক্ষমতা ও সম্পদের এ লড়াই বাংলাদেশে এত দ্রুত থামবার নয়। কারণ শাসক শ্রেণীর সাথে শাসিতের ব্যবধান এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সাধারণ জনগণ আর জাতীয় কোন নেতার প্রতিই আনুগত্যশীল নয়। বাংলাদেশের জাতীয় নেতাদের সাথে জনগণের এই বিরাট দূরত্ব যেন জাতির ভাগ্যলিপি হয়ে উঠেছে।”
(সূত্র : লরেন্স জিরিং, বাংলাদেশ-মুজিব থেকে এরশাদ : একটি বিশ্লেষণধর্মী ইতিহাস, স্কাইলার্ক প্রিন্টার্স, জুলাই ২০১৪, পৃষ্ঠা-২৫৮-২৫৯)
বাংলাদেশ নিয়ে যারাই একটু গভীর চিন্তা-ভাবনা করেন এবং এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি সম্পর্কে সামান্যতমও ধারণা রাখেন, এমন সবাই নিশ্চয়ই একবাক্যে স্বীকার করবেন ভারতের কারণে সবসময়ই বাংলাদেশের ভাগ্য একটি অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাবে। কারণ ভারত তার নিজের স্বার্থ এবং সঙ্কীর্ণ মানসিকতার কারণে সব সময়ই বাংলাদেশের ক্ষতি করতে চাইবে এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। বিষয়টি বুঝতে চাইবে না শুধু কিছু ক্ষমতালোভী ও ভারতের মদদপুষ্ট রাজনীতিকরাই এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অবস্থাও তদ্রুপ।
বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের বিষয়টি অনেক সময়ই সাধারণ মানুষ বুঝতে না পারলেও একটু সচেতন অনেকেই বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই ঘুমন্ত জাতির ঘুমের ফলে পলাশীর প্রান্তরে একবার স্বাধীনতার লাল সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর যেমন দুইশো বছর লেগেছিল তা পুনরুদ্ধারে, ভারতীয় তাঁবেদারির ফলে আরেকবার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হারিয়ে বসলে তা আবার পুনরুদ্ধারে কয়শো বছর লাগবে সেটাই চিন্তার বিষয়। এখন থেকে ২০ বছর আগেই অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে “বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং ফারাক্কার রাজনৈতিক প্রেক্ষিত”-শীর্ষক এক নিবন্ধে বিশিষ্ট কলামিস্ট ও সাংবাদিক আহমদ ছফা লিখেছিলেন :
“আমাদের দেশের জ্ঞানীগুণী অনেকেই পত্র-পত্রিকায় মতামত প্রকাশ করছেন যে ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে ফারাক্কার পানির একটা ব্যবস্থা আমাদের করে ফেলা উচিত। আমাদের দেশের কিছু পত্র-পত্রিকা এই বিশেষ মতবাদটি প্রায় প্রতিদিন প্রচার করে আসছে। প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ করা উচিত নয় এবং সমস্ত বিবাদ-বিসম্বাদ আপসে মিটিয়ে ফেলাই প্রকৃষ্ট পন্থা। এটা হলো আদর্শের কথা। কিন্তু আদর্শ ও বাস্তবতা প্রায় সময়ই এক হয় না। ভারত যখন গত দুই যুগ (বর্তমানের হিসাবে প্রায় চার যুগ) গঙ্গার পানি একতরফা প্রত্যাহার করে বাংলাদেশে জাহান্নাম সৃষ্টি করেছিল, এই ভদ্রলোকেরা তার বিরুদ্ধে একটি কথাও উচ্চারণ করেননি। আজকে যখন ভারত ট্রানজিটের বদলে পানি বিনিময় করার প্রস্তাব দিয়েছে, সকলে সোচ্চার হয়ে বলছেন ভারতের সঙ্গে আমাদের একটা মিটমাট করে ফেলা দরকার।
মিটমাট অত্যন্ত ভালো জিনিস। কিন্তু কিসের বিনিময়ে ভারত আমাদের দেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট চায়, চট্টগ্রাম বন্দরের সুযোগ-সুবিধা দাবি করে, এই কথাটি আজকে হঠাৎ করে অগ্রাধিকার পেল কেমন করে। উত্তর অত্যন্ত সরল। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট না পেলে পূর্ব-ভারতের অশান্ত রাজ্যগুলো তার নিয়ন্ত্রণে রাখা অসাধ্য না হলেও দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে না পারলে তার ক্রমসম্প্রসারমান শিল্প পণ্যের রফতানি সম্ভব নয়। কথাটি ঘুরিয়ে বললে এরকম দাঁড়ায়-এই ট্রানজিট, বন্দর এবং বাজার সুবিধা আদায় করার অস্ত্র হিসেবে আগেভাগে ঠান্ডা মাথায় অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ফারাক্কা সঙ্কটটির জন্ম দিয়েছে। পানি বাংলাদেশের প্রাণস্বরূপ। এই প্রাণের অস্ত্র প্রয়োগ করে বাংলাদেশকে ভারতীয় দাবির কাছে নতজানু করানো যাবে- এই চিন্তা সে দীর্ঘদিন ধরে লালন করে আসছে।”
(সূত্র : আহমদ ছফা: নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, বাংলাবাজার, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা-২৭৪-২৭৫)
এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে উদ্ধার করা অত্যন্ত জটিল বলেই মনে হচ্ছে। একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এবং ভারতের একচেটিয়ে আশীর্বাদের বদৌলতে ক্ষমতায় আসা ও টিকে থাকা আওয়ামী লীগের হাতে দেশ, দেশের স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চেয়েও এখন ভারতের স্বার্থ উদ্ধারই যে মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার প্রমাণস্বরূপ ভূরি ভূরি উদাহরণ দেয়া যায়। এখানে আমি শুধু বাংলাদেশের বুকে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় পেরেক হিসেবে উল্লেখ করতে চাই ট্রানজিট ইস্যুটি। আহমদ ছফার ২০ বছর আগের শঙ্কা সত্যে পরিণত হলো।
বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে কোন না উপায়ে পাশ কাটিয়ে ভারতের নিজের স্বার্থ আদায় করে নেয়ার অভ্যাসটি বহু পুরনো। সেই স্বাধীনতার পর থেকেই এই পরিস্থিতি দেখে আসছি আমরা। তবে শেষ পর্যন্ত নামমাত্র ভ্যাটে ভারতকে ট্রানজিট দিয়ে যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকার নিয়েছে তা শুধুমাত্র ভারতের মদদপুষ্টে টিকে থাকা কোন অগণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমহীন এবং ক্ষমতালোভী সরকারের পক্ষেই সম্ভব। আর সেই কাজটিই করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনের দাবিদার আওয়ামী লীগ।
চলতি ২০১৬ সালের ১৬ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় বাংলাদেশ ধ্বংসকারী এই ট্রানজিট। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যারা হর-হামেশা পাকিস্তানকে রাজাকার বলে গালি দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলে সেসব গণমাধ্যম, সুশীলসমাজ ও চেতনাধারীরা এক রহস্যজনক কারণে মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছেন। দাদাদের রুপির দাপটে ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভয়ে কেউ এ ব্যাপারে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করছেন না। হাতে গোনা দু-একটা পত্র-পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ব্লগে এই নিয়ে ছিটেফোঁটা কিছু লেখা বের হয়েছে যার মধ্য দিয়ে এদেশের উদাসীন মানুষের গোচরীভূত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ বিষয়ে গত ১৮ জুন (২০১৬) দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় বিশিষ্ট কলামিস্ট ও সিনিয়র সাংবাদিক ড. রেজোয়ান সিদ্দিকীর “না, আর সুদ টানব না”-এই শিরোনামে প্রকাশিত উপ-সম্পাদকীয়টির খানিকটা তুলে ধরছি :
“বাংলাদেশের স্বার্থ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ভারতের পদতলে নৈবেদ্য দেয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে অনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বহীন সরকার। আর তারই অংশ হিসেবে কোনোরূপ আগ-পিছ বিবেচনা না করেই গত ১৬ জুন (২০১৬) থেকে বাংলাদেশ সরকার গোপন চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে করিডোর সুবিধা দিয়েছে। চালু হয়ে গেছে প্রায় বিনামূল্যে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পণ্য পরিবহন। করিডোর বা ট্রানজিট বিশ্বে কোনো নতুন ঘটনা নয়। পৃথিবীর বহু দেশেই ট্রানজিট করিডোরের চুক্তি রয়েছে। কিন্তু তার সব চুক্তিই সম্পন্ন হয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পারস্পরিক স্বার্থের নিরিখে, কোনো গোপন চুক্তির মাধ্যমে নয়। তাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণের অনুমোদন নিয়েই সেসব দেশ ট্রানজিট-করিডোরের চুক্তি করেছে।
কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েই এক ষড়যন্ত্রমূলক আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে এমন ব্যবস্থা করেছে যে, এ ধরনের কোনো চুক্তি করার ক্ষেত্রে জনগণ তো দূরের কথা জাতীয় সংসদকে জানানোর বাধ্যবাধকতাও লুপ্ত করে দিয়েছে। শুধু ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি করতে পারেন। আর চুক্তির পর তা প্রেসিডেন্টকে জানালেই যথেষ্ট। প্রেসিডেন্টের অনুমোদনেরও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এটা কোনো বিধান হতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। জনগণকে তা জানাতে সরকার বাধ্য। যখন এই বিধান চালু করা হয়, তখনই বোঝা গিয়েছিল, এর পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে। এখন সে ষড়যন্ত্র মুখ ব্যাদান করে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের বুক ফালাফালা করে চলছে ভারতীয় যানবাহন, চালু হয়ে গেল করিডোর।
কিন্তু কিসের বিনিময়ে? না, দেশের কোনো স্বার্থের বিনিময়ে নয়। সেটা চালু হলো শুধু শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতায় থাকার বিনিময়ে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একদলীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করে নেন শেখ হাসিনা। একমাত্র ভারত ছাড়া সারা পৃথিবীর আর কোনো রাষ্ট্রই ওই নির্বাচনকে বৈধতা দেয়নি। এখনো না। সে সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখার জন্য ভারত অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ চালায়। পাঠায় তাদের পররাষ্ট্রসচিবকে, বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বশ করার জন্য। কিন্তু বিশ্ব এ অবস্থা মেনে নেয়নি। আর সে কারণেই বিশ্বের অন্যান্য দেশ অবিরাম বলে যাচ্ছে, বাংলাদেশে অবিলম্বে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেয়া হোক। কিন্তু ভারত চাইছে, শেখ হাসিনার সরকার অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকুক।
ভারতের ক্ষমতায় কংগ্রেস বা বিজিপি যেই থাকুক না কেন, তারা বাংলাদেশে তেমন সরকারই চাইবে, যে সরকার ভারতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করবে। ভারতের প্রতিবেশীদের মধ্যে এখন একমাত্র বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিত্বহীন সরকারই দিল্লির তাঁবেদার। আর কোনো রাষ্ট্র ভারতের এই খবরদারি মানছে না। নেপাল মানছে না, মালদ্বীপ মানছে না, শ্রীলঙ্কা মানছে না (মিয়ানমারও তোয়াক্কা করছে না ভারতের খবরদারির)। এখন শুধু বাংলাদেশকেই তারা পদানত করতে পারছে। আর তারই অংশ হিসেবে চালু হলো এই করিডোর।
কথা ছিল, ভারতকে এই সুবিধা দেয়ার আগে আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার সড়ক চার লেন করা হবে। কিন্তু সে কাজ শুরুই হয়নি। এতে ভারতের বিনিয়োগ করার কথা ছিল এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু ভারত সে অর্থায়নে এগিয়ে আসেনি। তবু কেন ভারতকে এ সুবিধা তড়িঘড়ি করে দিতে হবে সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ভারতকে সবকিছু উজাড় করে দিলেও পাওয়া যায়নি গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা, পাওয়া যায়নি তিস্তার পানি। অভিন্ন নদ-নদীগুলোর পানির প্রবাহের নিশ্চয়তা। সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা না করার নিশ্চয়তা। বাণিজ্যে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করার নিশ্চয়তা। সবকিছু উজাড় করে দিলাম। বিনিময়ে প্রাপ্তি শূন্য।
এর আগে কানেকটিভিটির নামে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতীয় যানচলাচল অবাধ হয়ে গেছে। তখন কথা ছিল, ভারতকে এই সুবিধা দেয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশ ভারতের ওপর দিয়ে নেপাল ও ভুটানে পণ্য রফতানি করতে পারবে। কিন্তু ভারত নিজে সুবিধা নিলেও বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান ভারতের অসহযোগিতার কারণে সে সুবিধা ভোগ করতে পারছে না। পণ্য পরিবহন তো দূরের কথা, বাংলাদেশী পর্যটকেরাও নেপাল বা ভুটান সফরে যেতে পারছেন না ভারতের ওপর দিয়ে। ভারত নানা ফ্যাকরা তুলে সে পথ রুদ্ধ করে রেখেছে।
আবার বাংলাদেশ সরকার জনগণকে ধোঁকা দেয়ার জন্য বলে আসছিল যে, ভারত বাংলাদেশকে ত্রিপুরা থেকে গ্যাস দেবে। কিন্তু যেদিন থেকে ভারতকে করিডোর দেয়ার চুক্তি বাস্তবায়ন হলো, সেদিনই ভারত বাংলাদেশ সরকারকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলো যে, তাদের দেশে গ্যাসের এমন প্রাচুর্য নেই যে, এখনই তা অন্য কোনো দেশকে দেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে জ্বালানি বিষয়ে প্রথম আলোচনায় ভারত তাদের এই মনোভাবের কথা জানিয়ে দেয়। ত্রিপুরা থেকে মাত্র চার কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করলেই ভারত থেকে গ্যাস আমদানি সম্ভব। এখানে বাংলাদেশের ভেতরে পাইপলাইন বসাতে হবে মাত্র দুই কিলোমিটার। কিন্তু ভারতীয় প্রতিনিধি কে ডি ত্রিপাঠী বলে দিয়েছেন, ত্রিপুরায় ভারতেরই প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাসের পরিমাণ কম। তাই বাংলাদেশের গ্যাসের অনুরোধ রাখা সম্ভব নয়। তাহলে বাংলাদেশকে করিডোর নিয়ে এই সেবাদাস মনোবৃত্তি দেখানোর প্রয়োজন হলো কেনো?
আমাদের প্রশ্ন, বাংলাদেশ আর কতকাল ভারতীয় তথাকথিত ঋণের সুদ টানবে? এখন মনে হয় সমস্বরে বলার সময় এসেছে, ‘না, আর সুদ টানব না’।”
এবার “বাংলাদেশের স্বার্থও দেখা উচিত” শিরোনামে ২২শে জুন ২০১৬ দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত সাংবাদিক এ বি সিদ্দিকীর প্রতিবেদনের খানিকটা তুলে ধরছি:
“ভারত তার বৃহত্তর স্বার্থে একে একে বাংলাদেশের কাছ থেকে সব সুবিধা আদায় করছে। এক রাজ্যের বিদ্যুৎ অন্য রাজ্যে নেয়ার জন্য বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযোগ পেল। ত্রিপুরা রাজ্যের উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ গ্রিডের পাশাপাশি গ্যাস লাইনের সংযোগ। মালামাল ও যাত্রী পরিবহনের জন্য সড়ক ও রেলসংযোগ। একই উদ্দেশ্যে নৌ-ট্রানজিট। কিন্তু বাংলাদেশ কী পাচ্ছে বা পেয়েছে? তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হবে, এমন কোনো সম্ভাবনা আর নেই। আর এখন বা ভবিষ্যতে চুক্তি হলেও বাংলাদেশ পানি পাবে না। কারণ, তিস্তায় ভারত একের পর এক বাঁধ দিয়ে যাচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী গঙ্গার পানি বাংলাদেশ পাচ্ছে না।
পদ্মার উজানে ফারাক্কা বাঁধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। এতে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে পদ্মা ও এর শাখা নদীগুলো। এরই মধ্যে এ অববাহিকায় শুরু হয়েছে মরুকরণ প্রক্রিয়া। চরম হয়ে উঠছে এ অঞ্চলের জলবায়ু। বিপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। শুরু থেকেই ফারাক্কা ইস্যুতে সরব বাংলাদেশ। আন্দোলন করছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোও। তবে ভারতের একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে কাজের কাজ হচ্ছে না। অভিন্ন ৫৪ নদীতে আগেই বাঁধ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে অন্তত পানির ন্যায্য হিস্যাটুকু আদায় করা দরকার। একপক্ষ শুধু একক সুবিধা নেবে আর বাংলাদেশ কিছুই পাবে না- এটা কেমন নীতি?”
তবে ইতিহাসসচেতন সবার কাছে যেটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার তা হলো ভারত আওয়ামী লীগকে ভালোবেসে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করছে-এমনটি ভাবা আর বোকার স্বর্গে বাস করার মধ্যে কোন তফাত নেই। ভারত তার লুটপাট ও খবরদারি অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থেই শুধু ৫ জানুয়ারির অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখতে চাইছে। ভারত কখনই বাংলাদেশের কল্যাণ চায় না। এমনকি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করার কারণে ভারতকে অনেকেই বন্ধু বলে প্রচার করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। কিন্তু একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই ভারত এদেশে যে লুটপাট ও অপকর্মের বেসাতি গড়েছিল সেদিকে একটু নজর দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের নয় নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জলিল তার “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” বইয়ে লিখেছেন :
“পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক পরিত্যক্ত কয়েক হাজার সামরিক-বেসামরিক গাড়ি, অস্ত্র, গোলাবারুদসহ আরো অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ‘প্রাইভেট কার’ পর্যন্ত যখন রক্ষা পায়নি, তখনই কেবল আমি খুলনা শহরের প্রাইভেট গাড়িগুলো রিকুইজিশন করে খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে হেফাজতে রাখার চেষ্টা করি। এর পূর্বে যেখানে যে গাড়ি পেয়েছে, সেটাকেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে সীমান্তের ওপারে। যশোর সেনানীবাসের প্রত্যেকটি অফিস এবং কোয়ার্টার তন্ন তন্ন করে লুট করেছে। বাথরুমের ‘মিরর’ এবং অন্যান্য ফিটিংস পর্যন্ত সেই লুটতরাজ থেকে রেহাই পায়নি।
রেহাই পায়নি নিরীহ পথযাত্রীরা। কথিত মিত্র বাহিনীর এ ধরনের আচরণ জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। বাংলাদেশে প্রবেশের সাথে সাথেই যাদের শ্রী এমন, তারা যদি বাংলাদেশ ত্যাগ না করে বাংলাদেশের মাটিতেই অবস্থান করতে থাকে তাহলে কি দশা হবে দেশ ও জাতির? একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ কোন ধরনের স্বাধীনতা অর্জন করলাম আমরা- এ ধরনের নানান প্রশ্ন দেখা দিল জনমনে। আমি জনগণ থেকে যেহেতু মোটেও বিচ্ছিন্ন ছিলাম না, সুতরাং ভারতীয় সেনাবাহিনীর আচরণে আমি বিক্ষুব্ধই হয়ে উঠিনি এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার পর্যায়ে চলে গেলাম।”
(সূত্র : মেজর জলিল, রচনাবলী, কমল কুঁড়ি প্রকাশন, বাংলাবাজার, ঢাকা, জুলাই ২০০৬, পৃষ্ঠা-৬৮)
মেজর জলিল আরও লিখেছেন : “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শুরু থেকেই ভারতীয় হস্তক্ষেপ বিদ্যমান ছিল- এই সন্দেহে ভারতবিদ্বেষী রাজনৈতিক দলগুলো তাই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ না হয়েও যুদ্ধ করেছে এই লক্ষ্যে ‘যে কোন মূল্যে দেশ স্বাধীন করতে হবে। যে কোন মূল্যে অর্জিত স্বাধীনতা যে নিজেদের ভোগের বাইরে চলে যেতে পারেÑ এ ধারণা মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল না। প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের সাহায্য সহযোগিতা স্বাধীনতার রূপ ও স্বাদ পাল্টে দেয়, স্বাধীনতা বিনষ্টও করে দেয়- এ সচেতনতা সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল না। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এবং ভারতীয় চক্রের মধ্যকার ষড়যন্ত্র সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের জানারও কথা ছিল না।”
(সূত্র : মেজর জলিল, রচনাবলী, কমল কুঁড়ি প্রকাশন, বাংলাবাজার, ঢাকা, জুলাই ২০০৬, পৃষ্ঠা-৭২-৭৩)
প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেই স্বীকার করে না ভারত। বর্তমান এই বিশ্বায়নের যুগেও ভারত মনে করে বাংলাদেশের জন্ম তাদের করুণায়। বিষয়টি পরিষ্কার করতে ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর “সন্ত্রাস নিয়ে পাকিস্তানকে কড়া বার্তা প্রণবের” শিরোনামে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সাংবাদিক অগ্নি রায়ের একটি প্রতিবেদনের প্রতি নজর দেয়া যেতে পারে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয় :
“ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাণকেন্দ্র ব্রাসেলসে বসে পাকিস্তানের কড়া সমালোচনা করলেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। ইউরোপের এক টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রণববাবু জানিয়েছেন, ভারত প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি চায়। কিন্তু, নয়াদিল্লির পক্ষে দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনও সমঝোতা করা সম্ভব নয়।
আলোচনার মাধ্যমেই জম্মু-কাশ্মীর-সহ সব সমস্যার সমাধান করতে চান বলে রাষ্ট্রপুঞ্জে বার্তা দিয়েছেন নয়া পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। কিন্তু, সেই সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরে চলছে পাক মদদপুষ্ট জঙ্গিদের হামলাও। প্রণববাবু জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপুঞ্জে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহও। ব্যক্তিগত স্তরে নওয়াজের সঙ্গে ভারতীয় নেতৃত্বের সম্পর্কও ভালো।
কিন্তু, ভারতের পক্ষে তার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণœ হয় এমন কোনও সমঝোতা করা সম্ভব নয়। আর সীমান্তের ওপার থেকে সন্ত্রাসে মদদ দেয়াও বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। শিমলা চুক্তির পরে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে বন্দি ৯১ হাজার পাক সেনাকে ছেড়ে দিয়েছিল ভারত। যুদ্ধে দখল করা ভূখন্ডও ছেড়ে চলে এসেছিল ভারতীয় সেনা। প্রণববাবুর মতে, এই পদক্ষেপ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বোঝাতে চেয়েছিলেন ভারতের অন্য কোনও দেশের ভূখন্ডের উপরে নজর নেই। অন্য কোনও দেশের উপরে নিজের মতবাদও চাপিয়ে দিতে চায় না নয়াদিল্লি। ভারত এখনও সেই নীতি মেনেই চলছে বলে দাবি রাষ্ট্রপতির। সন্ত্রাসে পাক মদদ প্রসঙ্গে বরাবরই কড়া অবস্থান নেয়ার পক্ষপাতী প্রণববাবু। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার সময়ে বিদেশমন্ত্রী ছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর পাকিস্তান সফরের প্রশ্নে তখন এবং তার পরেও নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছিলেন প্রণববাবু।”
এখানে ভারতের রাষ্ট্রপতির কয়েকটি কথা বাংলাদেশের জন্য কতটা ভয়াবহ একটু লক্ষ্য করুন। তিনি বলেছেন, শিমলা চুক্তির পরে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে বন্দি ৯১ হাজার পাক সেনাকে ছেড়ে দিয়েছিল ভারত। তার মানে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকারই করে না ভারত। বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন এবং মা বোনদের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পরাস্ত করেছিলাম পাকিস্তানি হানাদারদের। এখানে যুদ্ধের দু’টি মূল পক্ষ ছিল বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। ভারত বাংলাদেশকে এই যুদ্ধে সহযোগিতা করেছিল মাত্র। অথচ দেশটির রাষ্ট্রপতি স্বাধীনতার চার দশক পরে এসেও বলছেন, ৯১ হাজার পাক সেনাকে ছেড়ে দিয়েছিল ভারত। পরাজিত পাক সেনাদের ছেড়ে দেয়ার ভারত কে? তাহলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অস্তিত্ব থাকলো কোথায়?
শুধু কি তাই ভারতের রাষ্ট্রপতি বললেন যে, যুদ্ধে দখল করা ভূখন্ডও ছেড়ে চলে এসেছিল ভারতীয় সেনারা। তার মানে ভারত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে নভেম্বরে বাংলাদেশে তাদের সেনা পাঠিয়ে যে সহায়তা করেছিলেন সেটাকে প্রণব মুখার্জি ভূখন্ড দখলের সাথে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান দখল করেছিল। আর সেই ভূখন্ড তারা ছেড়ে দিয়েছে। কত বড় জঘন্য মিথ্যাচার! ভারত যদি এতই উদার হতো তাহলে ভারতের আগ্রাসনের যাঁতাকলে কাশ্মির ও সিকিমকে যুগের পর যুগ পিষ্ট হতে হতো না। স্বাধীনতার জন্য পাগলপারা বাংলাদেশকে দখলে রাখা যে তাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়, সেটা বুঝতে পেরেই ভারত সেদিন এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল তা ইতিহাসসচেতন সবারই জানা।
একযুগেরও বেশি আগে ভারতের এই আগ্রাসী মনোভাবের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল। তিনি তার “দাবি আন্দোলন দায়িত্ব” শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন : “বৃহৎ প্রতিবেশী আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে আজ পর্যন্ত আকার-ইঙ্গিতে, ছলে-বলে এবং তাদের সকল কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে এ কথাই বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছে যে, বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে বিকশিত না হয়ে তারই বশীভূত অথবা কৃপামুখী হয়ে থাক, যেমন আছে ভুটান, সিকিম, কাশ্মির। অর্থাৎ প্রতিবেশী এরূপ হলে খুশি। এর অন্যথায় বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কার পরিণতি বরণ করতে বাধ্য করা হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাই কেবল সঙ্কটাপন্ন হবে না, বাংলাদেশের অবস্থান হবে প্রতিবেশীর জঠরেই।
বাংলাদেশের সচেতন মহলের বেশ একটা অংশও উপরোক্ত মত পোষণ এবং প্রকাশ করা শুরু করে দিয়েছে। ইতোমধ্যেই তারা প্রকাশ্যেই মন্তব্য করে বেড়াচ্ছে যে, বৃহৎ প্রতিবেশী আগ্রাসন চালালে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী নাকি তাদেরকে কোনরূপ বাধাই প্রদান করবে না। প্রতিবেশী ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী ‘র’ (জঅড) নাকি ইতোমধ্যেই নানান গোপন সুযোগ সুবিধা প্রদানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ সকল অফিসারকে হাত করে নিয়েছে। সত্যিই ভয়ঙ্কর কথা। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনী ‘র’- এর দখলে চলে গেল।
খবরটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একটা কুৎসা হোক- হোক একটা সাজানো অপবাদ, তবুও ভালো। কিন্তু খবর যা রটেছে, তা যদি সত্যিই হয়ে থাকে তাহলে বাংলাদেশের একটি স্বাধীন জাতিসত্তা হিসেবে বিকাশ লাভের আর অবকাশই বা কোথায় রইলো! উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা কি তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশ কামনা করে না? এহেন অবস্থায় একটি জাতির স্বাধীন বিকাশ ঘটানো সুকঠিন কাজই বটে।”
(সূত্র : মেজর জলিল, রচনাবলী, কমল কুঁড়ি প্রকাশন, বাংলাবাজার, ঢাকা, জুলাই ২০০৬, পৃষ্ঠা-১২৪)
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে একের পর এক ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলছে তাতে দেশের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকারের গভীরে নিপতিত হচ্ছে তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। শুধুমাত্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য ভারতের কূট-কৌশলের বিষয়ে একেবারেই উদাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। দুই দশক আগে এমনই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন আহমদ ছফা। তিনি লিখেছেন :
“কাশ্মিরে তারা (ভারত) যেই খেলাটি খেলেছে এই একই খেলা বাংলাদেশে তারা খেলতে আরম্ভ করেছে। বাংলাদেশের জনগণের একাংশকে আরেক অংশের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়ার কাজটি এত সন্তর্পণে এবং সুকৌশলে করে যাচ্ছে সেই জিনিসটি উপলব্ধি করার মত মেধা এবং দূরদৃষ্টি বাংলাদেশের অতীতের শাসকদের যেমন ছিল না বর্তমান শাসকদেরও আছে তেমন মনে করার কোন কারণ নেই। আজকে ফারাক্কা, ট্রানজিট, বন্দরসুবিধা ইত্যাদি যে সকল কথা উঠে আসছে সেসবের সঙ্গে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি এবং ভারতের অতীত আচরণের প্রেক্ষিতটি বিচার না করে কোনও বিষয়েই স্থির সিদ্ধান্ত জাতির পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হলে সেটা হবে এই জাতির ১২ কোটি মানুষের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হত্যার নামান্তর।”
(সূত্র : আহমদ ছফা : নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, বাংলাবাজার, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা-২৭৬)
(চলবে)
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

SHARE