বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি ও ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের চেতনা

জুবায়ের হুসাইন

ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর। মহান জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহী-জনতার মিলিত প্রতিরোধে ৫৫ হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যায়। সেদিনের জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের মিলিত সংগ্রাম আমাদেরকে জাতি হিসেবে বেঁচে থাকার দুর্বার প্রেরণা যুগিয়েছিল।
৭ নভেম্বরের ঘটনা এক বিরল ও অনন্যসাধারণ ঘটনা। স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথে দৃপ্ত কোটি মানুষের মিছিলের দিন ৭ নভেম্বর। সশস্ত্রবাহিনী ও জনগণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে এদিন অভূতপূর্ব বিপ্লব সংঘটিত করতে না পারলে অপশক্তিকে পরাস্ত করা সম্ভব হতো না। ঐতিহাসিক বিপ্লব না হলে জাতি হিসেবে আমরা আবার পরাধীন হতাম। তাই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে জাতি গত ৪২ বছর ধরে এ দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পালন করে আসছে। যদিও ’৯৬ সালে এক গভীর ষড়যন্ত্র ও নীল-নকশার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পরের বছর ১৯৯৭ সালে আকস্মিকভাবে ৭ নভেম্বরের সরকারি ছুটি বাতিল করে দেয়। ওই সময় দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সেই প্রতিবাদ একদলীয় বাকশালী ভাবাদর্শের সরকার আমলে নেয়নি। বরং ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর পালনের জন্য প্রধান ও সর্ববৃহৎ একটি বিরোধী দল-বিএনপি ’৯৮ সালে ঢাকার পল্টন ময়দানে বিশাল জনসভার আয়োজন করলে সরকারের নির্দেশে পুলিশ বেপরোয়া টিয়ার গ্যাস চালিয়ে ওই জনসভা ভেঙে দেয়। সরকারের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কানায়-কানায় ভর্তি পল্টন ময়দানে উপস্থিত লাখো মানুষের উদ্দেশে বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ভাষণ দেয়ার উদ্দেশে মাইকের সামনে দাঁড়াতেই এই নোংরা খেলায় মেতে উঠে বাকশালী প্রেতাত্মা শাসকগোষ্ঠী। ওইদিন সরকার দলীয় গুণ্ডাবাহিনী ও পুলিশ দিয়ে সন্ত্রাসের তাণ্ডব চালিয়ে জনসভা ভেঙে দেয়ার পাশাপাশি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রাণনাশের চেষ্টা চালানো হয়।
দেশবাসী ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট কার্যকলাপের সমুচিত জবাব দিয়েছিল ব্যালটের মাধ্যমে। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর আধিপত্যবাদ বিরোধী চেতনার সমুজ্জ্বল ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সরকারি ছুটি পুনর্বহাল করে। কিন্তু দেশের স্বাধীনতাকামী জনতার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের কালো থাবা গোপনে বিস্তার করতেই থাকে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জরুরি আইনের নামে তাদের দোসরদের ক্ষমতায় বসানো হয়। দেশের সম্পদ এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে শুরু হয় নতুন চক্রান্ত। ওই ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার।

৭ নভেম্বরের ঘটনা
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর ভারতীয় চরেরা ইতিহাসের চাকাকে পিছনের দিকে ঘুরাবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তারই অংশ হিসেবে ২ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থান ভারতমুখী অভ্যুত্থান হিসেবে সর্বমহলে চিহ্নিত হয়ে যায়। এ সময় বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর ভারতীয় সৈন্য সমাবেশ, বাংলাদেশের ভেতরে ভারতীয় এজেন্টদের নাশকতামূলক তৎপরতা অল্প সময়ের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের দেশপ্রেমকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার মিলিত অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর গভীর রাত পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এক কথায় ভাগ্যকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়। সৃষ্টি হয় এক অরাজক-নাজুক পরিস্থিতি। ৩ নভেম্বর থেকে মহান স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
আধিপত্যবাদী শক্তির দোসররা নানা ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে তাদের হত্যার এক জঘন্য নীল-নকশার অংশ হিসেবে মুহূর্তের মধ্যে সন্ত্রাস ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া হয় ক্যান্টনমেন্টগুলোয়। বহু সেনা অফিসার এই অরাজকতার শিকার হন। আইন-শৃঙ্খলা ও সেনা শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। সশস্ত্র বাহিনীকে পঙ্গু করে দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আমন্ত্রণ জানানোই ছিল এই ষড়যন্ত্রের অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু দেশপ্রেমিক সাধারণ সৈনিকদের সংহতি এতোটাই সুদৃঢ় ছিল যে, অপশক্তির কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হতে পারেনি। সকল সিপাহী অফিসার-জনতার কাছে তখন একমাত্র গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন মহান স্বাধীনতার ঘোষক, রণাঙ্গনের সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। অবশেষে ৭ নভেম্বর ভোর বেলা দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী ও জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অভ্যুত্থানকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আনেন। সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে অপশক্তির ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তদানীন্তন দৈনিক বাংলার রিপোর্টে বিপ্লব সম্পর্কে বলা হয়, ‘সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চারদিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১টায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহী-জওয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহীরা। ৭ নভেম্বর শুক্রবার ভোরে রেডিওতে ভেসে আসে, ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি।’ জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। ওইদিন রাজধানী ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। পথে পথে সিপাহী-জনতা আলিঙ্গন করেছে একে অপরকে। নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ ধ্বনিতে  ফেটে পড়েন তারা। সিপাহী-জনতার মিলিত বিপ্লবে ভণ্ডুল হয়ে যায় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী সব ষড়যন্ত্র। আনন্দে উদ্বেলিত হাজার হাজার মানুষ নেমে আসেন রাজপথে। সাধারণ মানুষ ট্যাঙ্কের নলে পরিয়ে দেন ফুলের মালা। এই আনন্দের ঢেউ রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের সব শহর-নগর-গ্রামেও পৌঁছে যায়।’
৭ নভেম্বর সম্পর্কে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশ এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইতে লেখেন, ‘১৯৭৫ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টসহ সারা শহরে ছড়ানো হলো হাজার হাজার প্রচারপত্র। একটি ব্যাপারে ডান ও বাম উভয় রাজনৈতিক দলই একমত ছিল, আর তা হচ্ছে খালেদ মোশাররফ একজন বিশ্বাসঘাতক, ভারতের দালাল এবং সে ঘৃণিত বাকশাল ও মুজিববাদ ফিরিয়ে আনতে চাইছে।’
গ্রন্থটিতে আরও বলা হয়েছে, ‘রেডিওতে ক্রমাগত সিপাহী জনতার বিপ্লবের ঘোষণা এবং জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা দখলের খবর শুনে হাজার হাজার লোক স্রোতের মতো রাস্তায় নেমে এলো। তিন দিন ধরে তারা বিশ্বাস করছিল যে, ভারত খালেদ মোশাররফের মাধ্যমে তাদের কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতাকে বিপন্ন করছে। এখন সেই দুঃস্বপ্ন কেটে গেছে। সর্বত্র জওয়ান এবং সাধারণ মানুষ খুশিতে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করল, রাস্তায় নামল। সারারাত তারা স্লোগান দিল, ‘আল্লাহু আকবর, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহী বিপ্লব জিন্দাবাদ।’ অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মতো এদেশের মানুষ আবার জেগে উঠেছে।
সিপাহী-জনতার মিলিত প্রতিরোধের নেতৃত্বে এসে দাঁড়ান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি ক্ষিপ্রতা ও দ্রুততার সাথে সেনাছাউনিসমূহে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। রক্ষা করেন দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে। সকলেই তাঁর গতিশীল নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। তিনিও সাফল্যের সঙ্গে তাঁর সেই দায়িত্ব সম্পাদন করেছিলেন।

৭ নভেম্বরের তাৎপর্য
৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা অভ্যুত্থানের প্রকৃত তাৎপর্য শাসক সমাজের ওপর বৈদেশিক মুরুব্বিয়ানার বাধ্যতা প্রত্যাখ্যান করে গণচেতনায় জাতিরাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার। দেশবাসীর মনে সার্বভৌমত্বের গর্ববোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। পঁচিশ বছর মেয়াদি শান্তি ও মৈত্রী চুক্তির অসম সম্পর্কের মায়াজাল এদেশের অভিজন সমাজে যে ভারতমুখাপেক্ষিতা ও হীনম্মন্যতার প্রসার ঘটিয়ে চলেছিল, তার বজ্রআঁটুনি ছিন্ন করেছিল দৃপ্ত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান ও আত্মস্থশক্তির বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়েছিল দিল্লির প্রাসাদকামী পরগাছার জঞ্জাল।
এভাবে জাতিরাষ্ট্রের আত্মমর্যাদাবোধ ঐ দিন থেকে যে স্বকীয়তা, স্বনির্ভরতা ও আত্মোন্নতির উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল, আজও তা জাতিকে প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে। যদিও ভূরাজনৈতিক চক্রান্তে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা দিল্লির পদলেহি একটা পরিবারতন্ত্রের সংঘশক্তির করায়ত্ত, জাতিরাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানকে সাবোটাজ করে ঐ সংঘশক্তির পঞ্চম বাহিনী এদেশকে বিশ্বের চোখে স্বশাসনের অযোগ্য প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছে, প্রকারন্তরে বাংলাদেশের ভারতভুক্তির একটা নীলনকশা অনুসরণ করে চলেছে, নভেম্বর বিপ্লবে জাগ্রত দেশবাসী পদে পদে নতজানু ভারতমুখাপেক্ষী সরকারি উদ্যোগগুলোকে জনমতের প্রাচীর দিয়ে অবরুদ্ধ করেছে। জনস্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রের বিকলাঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর খর্বশক্তি দিয়েও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। চলমান বিশ্বব্যবস্থার সংঘাতসঙ্কুল আবর্তে, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের হুমকিতে কিংবা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার গোলকধাঁধায় পথ হারায়নি। রাষ্ট্রঘাতী চক্রান্তের মোকাবেলায় রাজপথে নেমে এসেছে, প্রতিবাদে প্রতিরোধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রঘাতী চক্রের কবল থেকে অচিরে আবার রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেবে জাগ্রত জনতা, এ কথা সুনিশ্চিত। এবং চারদিকে এখন সে আয়োজনই চলছে।
jubair_hussain@yahoo.com

SHARE

Leave a Reply