বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের স্নায়ুযুদ্ধ

ড. ফিরোজ মাহবুব কামাল

Varotযুদ্ধের শুরু সাতচল্লিশ থেকেই।
যুদ্ধ শুধু গোলাবারুদে হয় না। অতি আগ্রাসী ও দেশধ্বংসী যুদ্ধ হয় গোলাবারুদ ছাড়াই। পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোকে পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী শক্তির প্রভাব বলয়ে বন্দী করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের একটি গোলাও ছুড়তে হয়নি। সেটি সম্ভব হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধের ময়দানে বিশাল বিজয়ের ফলে। এটি এক শীতলযুদ্ধ। এখানে জয়-পরাজয় হয় অতি নীরবে। পূর্ব ইউরোপের এ দেশগুলো মার্কিন স্বার্থের এতটাই তাঁবেদারে পরিণত হয়েছে যে, পোল্যান্ড, আলবেনিয়াসহ কয়েকটি দেশের সৈন্যরা আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন সৈন্যদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধও লড়েছে। স্নায়ুযুদ্ধে লড়তে হলে প্রয়োজন পড়ে বিশাল গুপ্তচর বাহিনীর এবং সে সাথে সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মিডিয়া সৈনিকের। ভারত সে যুদ্ধটি বাঙালির চেতনারাজ্যে ১৯৪৭ থেকেই লড়ে আসছে। তখন সে যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের বিনাশ। আর এখন লক্ষ্য, বাংলাদেশের বিনাশ। গোলাবারুদের যুদ্ধে দেশ দখল হয়। আর স্নায়ুযুদ্ধে অধিকৃত হয় শত্রুদেশের জনগণের মনের ভূগোল। পরাজিত নাগরিকগণ তখন মানসিক গোলামে পরিণত হয়।
স্নায়ুযুদ্ধে ভারতের বিজয়টি বিশাল। ভারতের হাতে পাকিস্তানে পরাজয়ের শুরুটি মূলত স্নায়ুযুদ্ধের ময়দানে। ভারত কাশ্মির, হায়দারাবাদ ও সিকিমের মতো পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র দখলে নিতে না পারলেও পূর্ণ দখলদারি প্রতিষ্ঠা করেছিল শেখ মুজিব, তাজুদ্দীনসহ আওয়ামী নেতাকর্মীদের মনের মানচিত্রে। একাত্তরের বহু আগেই এভাবে অধিকৃত হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের লক্ষ লক্ষ ছাত্র-শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীর মনের ভুবন। অথচ ব্রিটিশ আমলে বাঙালি মুসলমানের মনের জগতে প্রবলভাবে বেড়ে উঠেছিল প্যান-ইসলামিক চেতনা, মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও ইসলামের বিজয়ে গভীর অঙ্গীকার এবং উচ্চারিত হতো ‘নারায়ে তকবির, আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি। বাংলাই ছিল সে সময় ভারতের বুকে মুসলিম জাগরণের মূল ঘাঁটি। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান খেলাফত বাঁচাতে এই বাংলার বুকেই গড়ে উঠেছিল ইতিহাসের সর্বপ্রথম গণ-আন্দোলন ‘খেলাফত আন্দোলন’। প্যান-ইসলামিক সে চেতনা নিয়ে তারা অবাঙালি মুসলমানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তান আন্দোলন করেছে এবং বিজয়ীও হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানÑ যার সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল বাংলাভাষী। কিন্তু ভারত-পরিচালিত স্নায়ুযুদ্ধের প্রকোপে সে চেতনার অচিরেই মৃত্যু ঘটে। ভারতীয় হিন্দুদের দখলে যায় লক্ষ লক্ষ বাঙালি মুসলমানের চেতনারাজ্য। ফলে অবাঙালি মুসলমানের চেয়ে তখন বেশি আপন হতে শুরু করে ভারতের অবাঙালি কাফের। তেমন একটি আদর্শিক পরাজয়ের কারণেই ভারতের কোলে আশ্রয় নিতে মুজিব ও তার অনুসারীদের বিন্দুমাত্র শরম হয়নি। নিজ দেশের ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, নাজিমুদ্দীনের চেয়ে ভারতের গান্ধী, নেহেরুর চেতনাই তাদের কাছে আপন মনে হয়। আর মন যে দিকে যায়, দেহও সেদিকে যায়। একাত্তরে তাই ভারতের অস্ত্র নিয়ে নবদীক্ষিত এ সেক্যুলারিস্টরা ভারতীয় এজেন্ডা পূরণে রণাঙ্গনে নেমেছিল। সাতচল্লিশের বাঙালি মুসলমানদের চেতনা ও বিশ্বাসের সাথে একাত্তরে এসে এভাবেই ঘটে সবচেয়ে বড় গাদ্দারি এবং সেটি মুজিবের নেতৃত্বে। শেখ হাসিনাসহ আজকের আওয়ামী বাকশালীদের চেতনারাজ্যে আজও সে ভারতীয় দখলদারিটি প্রকট। দেশ অধিকৃত হলে সে দেশের নদীর পানি ইচ্ছামত তুলে নেয়া যায়। বুকের ওপর দিয়ে ইচ্ছামত ট্রানজিটও নেয়া যায়। বাজারও দখলে নেয়া যায়। ইচ্ছামত সম্পদ-লুট ও শিল্প-ধ্বংসও তখন সহজ হয়। মানুষ মারতে দুর্ভিক্ষও সৃষ্টি করা যায়। ভারত তো বাংলাদেশে সেগুলোই করছে। সেটি যেমন মুজিব আমলে, তেমনি হাসিনার আমলে।
শত্রুর যুদ্ধ কখনোই শেষ হয় না। শুধু রণাঙ্গন ও কৌশল পাল্টায় মাত্র। রণকৌশল রূপেই ভারত এখন গোলাবারুদ ব্যবহার না করে শুরু করেছে ব্যাপক প্রচারণা যুদ্ধ। স্নায়ুযুদ্ধের মূল অস্ত্রটি হলো প্রচার। আর ভারত সে অস্ত্রের সংখ্যা বিপুল হারে বাড়িয়েছে। একাত্তরের আগে ছিল শুধু কলকাতা ও আগরতলা থেকে আকাশবাণীর বেতার প্রচারণা। আর এখন বাংলাদেশের সীমান্ত ঘিরে অসংখ্য ভারতীয় চ্যানেল। বাংলাদেশের মানুষ যত না বাংলাদেশী চ্যানেল দেখে তার চেয়ে বেশি দেখে ভারতীয় চ্যানেল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতপন্থীদের পত্রিকাও অসংখ্য। এসব পত্রিকা বহু কলামিস্ট ভারতীয়দের চেয়েও অধিক ভারতীয়। তা ছাড়া তাদের পত্রিকায় ভারতীয় কলামিস্টগণও লিখছেন মুক্তহাতে। একাত্তরের আগে সেটি ছিল না। ভারতের এ স্নায়ুযুদ্ধটি যে শুধু বাঙালি সেক্যুলারিস্টদের চেতনায় দখলদারি প্রতিষ্ঠা করেছে তা নয়, আঘাত হেনেছে কিছু কিছু ইসলামি দলের দুর্গেও। ফলে অধিকৃত হচ্ছে বহু ইসলামপন্থীর মনের ভুবনও। তাই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সামরিক বিজয় নিয়ে তারাও বিজয় মিছিল করে। ভারতের বিজয়ের এ ধারা আরো কিছু কাল চলতে থাকলে সে দিন আর বেশি দূরে নয় যখন ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও আজকের পৃথক বাংলাদেশ তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হবে। অখণ্ড ভারতের মোহে তখন তারাও ভারতীয়দের সাথে গলা মিলিয়ে ‘জয়হিন্দ’ শ্লোগান তুলবে। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অনুসারীরা তো ভারতীয় কংগ্রেসের সাথে একই মঞ্চে সে অখণ্ড ভারতের জিকির ১৯৪৭ সালের আগে থেকেই দিয়ে আসছে।
ভারত একাত্তরে তার সশস্ত্র বাহিনীকে তুলে নিলেও স্নায়ুযুদ্ধের সৈনিকদের তুলে নেয়নি। বরং তাদের সংখ্যা বিপুলভাবে বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি শহর, প্রতিটি থানা ও প্রতিটি ইউনিয়নে এখন ভারতীয় গুপ্তচর। ভারতপন্থী হাজার হাজার সৈনিকের অবস্থান যেমন বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা ও টিভিতে, তেমনি প্রশাসন, শিক্ষা সংস্কৃতি, সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীতে। এ সৈনিকদের প্রতিপালনে ও তাদের বিজয়ী করতে ভারত বিপুল অর্থও ব্যয় করছে। এমনকি ভারতীয় পত্রিকায় প্রকাশ, এবার আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে ভারতের বিনিয়োগ ১০০ কোটি রুপি। গত নির্বাচনে ছিল ৮০০ কোটি রুপি। এত বিনিয়োগের কারণ, ভারতীয় বর্ণহিন্দুদের উচ্চাশা। তারা চায় বিশ্বশক্তির মর্যাদা। সে লক্ষ্যে চাই বৃহৎ ভূগোল, চাই শত্রুমুক্ত দক্ষিণ এশিয়া। এ জন্যই ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙে পাকিস্তানের সৃষ্টি তাদের পছন্দ হয়নি। শুরু থেকে তাই দেশটির অস্তিত্বকেও তারা মেনে নিতে পারেনি। কারণ তাতে ভারতের ভূগোলই শুধু ছোট হয়নি, জনসংখ্যারও এক-তৃতীয়াংশ তখন বেরিয়ে গিয়েছিল।
ভারতের লক্ষ্য এখন দ্বিমুখী। এক, সুযোগ পেলেই ভূগোল বাড়ানো। দুই, প্রভাব বাড়ানো। ভূগোল বাড়াতে গিয়েই দখল করে নিয়েছে কাশ্মির, হায়দারাবাদ, জুনাগড়, মানভাদর ও সিকিম। যে দেশগুলোকে ভারত এখনও গিলতে পারেনি, চায় তাদের ওপর প্রভাব বাড়াতে। ভারত চায়, নিজ সীমান্ত ঘিরে সিকিম, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কার ন্যায় শক্তিহীন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশ। চায় সেসব দেশে নিজ-পণ্যের উন্মুক্ত বাজার। সেটি যেমন শিল্পপণ্যের, তেমনি সাংস্কৃতিক পণ্যের। পাকিস্তান এখন পারমাণবিক অস্ত্রধারী একটি দেশ। সেটি ভারতের পছন্দ হয়নি। দেশটি আরো টুকরো করা তাই ভারতীয় বিদেশনীতি। বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের দেশ। ফলে সম্ভাবনা রয়েছে পাকিস্তানের ন্যায় এক শক্তিশালী বাংলাদেশ উদ্ভবের। কিন্তু সেটি ভারতের পছন্দ নয়। ফলে বাংলাদেশকে পঙ্গু করাও ভারতের স্ট্র্যাটেজি। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের স্নায়ুযুদ্ধের মূল হেতু তো সেটিই।

ইসলাম-আতঙ্ক
গত ২৮ নভেম্বর তারিখে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা বাংলাদেশের ওপর একটি রিপোর্ট ছেপেছে। রিপোর্টটি লিখেছেন নয়াদিল্লি থেকে জনৈক অগ্নি রায়। রিপোর্টটি পড়ে মনে হয়, এটি কোনো সাংবাদিকের হাতে মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত রিপোর্ট নয়। বরং লেখা হয়েছে ভারতীয় গোয়েন্দাদের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে। উক্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে : ‘ব্যাপক হিংসার ছক রয়েছে জামায়াতের, দিল্লির চিন্তা বাড়িয়ে নতুন রিপোর্ট বিদেশ মন্ত্রকের হাতে এসেছে। তাতে বলা হযেছে, ভোটের আগে বাংলাদেশে হিংসা ও নাশকতার বন্যা বইয়ে দেয়ার জন্য তোড়জোড় করেছে জামায়াতে ইসলামী। এ জন্য বিশাল তহবিল গড়া হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, ‘শুধু জামায়াতই নয়, সন্ত্রাস-নাশকতার কাজে সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে গোপনে বেড়ে ওঠা অন্তত ১০৮টি মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠন। সাউথ ব্লকের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে, রিপোর্টে এ কথাও বলা হচ্ছে, রাস্তায় লড়ার জন্য কিশোরদের নিয়ে বিশেষ একটি কর্মীবাহিনী গড়া হচ্ছে। এদের মধ্যে বাছাই করা একটি অংশকে ফিদায়ে (তথা শহীদ) হওয়ার মতো মানসিক প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে।’
হিন্দু-মৌলবাদ ও হিন্দু-সন্ত্রাসের দেশ ভারত। সে সন্ত্রাসের শিকার হলো সে দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানেরা। মুসলিম নির্মূল ও তাদের সহায়-সম্পদ ধ্বংস বা দখলে নেয়াই দেশটির হিন্দু রাজনীতির সংস্কৃতি। সে সংস্কৃতির ধারায় ভারতীয় হিন্দুদের জীবনে যেমন প্রতি বছর বহুবার পূজা-পার্বণ আসে, তেমনি রক্তক্ষয়ী দাঙাও আসে। মাত্র মাসখানেক আগে উত্তর প্রদেশের মুজাফ্ফর নগর জেলায় ঘটে গেল ভয়াবহ মুসলিমবিরোধী দাঙা। সে দাঙায় হত্যা করা হয়েছে বহু মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুকে। দগ্ধিভূত করা হয়েছে বহু ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। বহু হাজার মুসলিম পরিবার নিজ ঘরবাড়ি ছাড়া উদ্বাস্তু। তারা আশ্রয় নিয়েছে প্রদেশের অন্য জেলায় বা অন্য নগরীতে। তারা নিজ গ্রাম ও নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছে না। না ফেরার কারণ, নিজ গ্রাম ও নিজ ঘরে ফিরলেই দেখতে পাবে, তাদের ভাই- বোন, পিতা-মাতা ও সন্তানদের যারা হত্যা করেছে এবং তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট জ্বালিয়েছে, তাদের সামনে তারাই বুকফুলিয়ে হাঁটছে। এত অপমান নিয়ে বাঁচাটি কি কখনো সুখের হয়? সরকার তাদের জানমালের কোনো নিরাপত্তা দিতে পারছে না।
জঙ্গলে আগুন লাগলে সে আগুন থামানোর কেউ থাকে না। হাজার হাজার গাছপালা ছারখার করার পর সেটি নিজে নিজেই থামে। তেমনি মানব অধ্যুষিত আরেক জঙ্গল হলো ভারত। একবার মুসলিমবিরোধী দাঙা দেশটিতে শুরু হলে সে দাঙাও থামানোর কেউ থাকে না। বহু শত নারী-পুরুষ হত্যা ও বহু হাজার ঘরবাড়ি পোড়ানোর পর সেটি থামে। তাই যখন দিন-দুপুরে ভারতের ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদটির ধ্বংসে হাজার হাজার মানুষ লিপ্ত হয় তখন সে বর্বর কাজটি রুখার কেউ ছিল না। ভারতের কোন মন্ত্রী, প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বা কোনো রাজনৈতিক নেতাই সে ধ্বংসকর্মকে প্রশংসনীয় কর্ম বলে বিবৃতি দেননি। কিন্তু তারপরও সে বর্বর কর্মটি রুখার জন্য সমগ্র ভারতে কেউ ছিল না। সেটি দিনভর ঘটেছে অসংখ্য পুলিশ, প্রশাসনের হাজার হাজার কর্মকর্তা ও লক্ষ লক্ষ রাজনৈতিক নেতাকর্মীর চোখের সামনে। টিভির দৌলতে মসজিদ ধ্বংসের সে চিত্রটি দেখেছে প্রায় সমগ্র ভারতবাসী। স্বচোখে দেখেছেন তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরসীমা রাও। কিন্তু কেউ কোনো উদ্যোগ নেননি সেটি থামানোর। দিনের আলোয় পুলিশ সেদিন কোনো অপরাধীকে খুঁজে পায়নি। এই হলো ভারতের প্রকৃত অবস্থা।

ভয় শক্তিশালী বাংলাদেশের
নিজ দেশের ভয়ানক সন্ত্রাসীদের নিয়ে দৈনিক আনন্দবাজারের কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ, হিন্দু সন্ত্রাসীদের হাতে মুসলমানদের জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হলেও তাতে ভারতের সিকিউরিটির কোনো সমস্যা হয় না। আনন্দবাজারের ভাবনা তো ভারতের বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে ওঠা নিয়ে। মুসলমানদের নিরাপত্তা ড্রেনে গিয়ে পড়লেও তা নিয়ে তাদের সামান্যতম ক্ষোভ নেই। তারা বরং ভারতের বিপদ দেখে প্রতিবেশী দেশে ইসলামের জাগরণ দেখে। সেটি যেমন আফগানিস্তানে। তেমনি পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে। তাই এসব দেশে ইসলাম রুখতে তাদের অর্থ, অস্ত্র ও মেধার বিনিয়োগও বিশাল। আফগানিস্তানে তালেবানদের বিজয় রুখতে তারা মার্কিন হানাদার বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ যোগ দিয়েছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিজদেশে এনে প্রশিক্ষণও দিচ্ছে। ইসলাম রুখার সে গরজ নিয়েই বাংলাদেশে তারা আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বামপন্থীদের পেছনে বিপুল বিনিয়োগ করছে এবং তাদেরকে ইসলামের বিরুদ্ধে এক মঞ্চে এনে খাড়া করেছে।
বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের শক্তি বাড়লে তাতে ভারতের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ বাড়বে, এবং দেশটির নিজস্ব রাজনীতিতে অশান্তি বাড়বে-বিশেষ করে পাশের পশ্চিমবঙ্গ, যেটি নিয়ে ভারত সরকার আতঙ্কিত। আতঙ্ক আনন্দবাজারেরও। রিপোর্টটি পড়ে মনে হয়, ইসলামের এমন একটি জাগরণ নিয়ে ভারত যেন ভাবতেই পারেনি। আজ থেকে ৫ বছর আগে তাদের কল্পনাতেও সেটি আসেনি। তারা ভাবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হলো আওয়ামী লীগ। কলেকৌশলে ক্ষমতাদখল এবং বাহুবলে রাজপথ দখলে নেয়ার সামর্থ্য যেন একমাত্র তাদেরই। ভারতীয় পত্রপত্রিকা ও নীতি নির্ধারকদের সে ধারণাটি আরো প্রবলতর হয়েছিল শাহবাগ মোড়ে গণজাগরণ মঞ্চের আয়োজন থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারা ছিল হঠাৎ সৃষ্ট বুদবুদ এবং তারা বেড়ে উঠেছিল সরকারি আয়োজনে। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনীতির টেবিল উল্টে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে নতুন বাস্তবতা। গণজাগরণ মঞ্চের নেতারা এখন দেশের কোথাও প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করার সামর্থ্য রাখে না। সে সামর্থ্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণের নেই। তাদের নামতে হয় পুলিশের পাহারাদারিতে। মফস্বলের নেতারা তো বহু আগে থেকেই নিজ নিজ এলাকা ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশের মতো ১৬ কোটি মানুষের একটি দেশে একাকী কোনো সংগঠনের পক্ষে দেশব্যাপী হরতাল করে দেশকে অচল করে দেয়া যা তা ব্যাপার নয়। কিন্তু সে সামর্থ্য যে জামায়াতের আছে, এমনকি ছাত্রশিবিরেরও আছে, সে প্রমাণটিও বার বার মেলেছে। আর সেটি আতঙ্কিত করেছে যেমন দৈনিক আনন্দবাজারকে, তেমনি ভারতীয় প্রশাসনকে।

ভ্রষ্ট ভারতীয় বিচারবোধ
আনন্দবাজারের ভ্রান্তিটা হলো, ইসলামের পক্ষে বাংলাদেশের জনগণের মাঝে যে বিপুল জনসমর্থন আছে সেটি তারা দেখতে পায়নি। আর সে অন্ধত্বটি তাদের মনের। মন যা জানে না, চোখ কি তা দেখতে পায়? আওয়ামী বাকশালীদের ন্যায় তারাও জামায়াত-শিবিরকে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি মনে করে। যারা একাত্তরে বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধিতা করলো তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী দলে পরিণত হবে সেটি তারা ভাবতেই পারেনি। তবে একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙার বিরোধিতা করার অর্থ যে বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের বিরোধিতা করা নয় তা নিয়ে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই। এমন একটি অটল বিশ্বাসের কারণেই একাত্তরের রাজাকারদের জনগণ ভোট দেয়, তাদেরকে মন্ত্রী রূপে বরণও করে নেয়। তাই শাহ আজিজুর রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, আব্দুর রহমান বিশ্বাস বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট এবং সালাহউদ্দীন কাদের চোধুরী ও আব্দুল আলীমদের মতো ব্যক্তিদের মন্ত্রীরূপে মেনে নিতে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের কোনোরূপ অসুবিধা হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাতেও কোন রূপ ব্যাঘাত ঘটেনি। অথচ ভারত ও ভারতের প্রতি অনুগতদের পক্ষে তাদেরকে মেনে নেয়াটি অসম্ভব। তাদের বিজয়ে তারা বরং নিজেদের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি দেখে। তাই এখন ষড়যন্ত্র চলছে তাদেরকে আওয়ামী সেবাদাসদের দিয়ে তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার। তাদের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি রূপে গণ্য হওয়ার জন্য শর্ত হলো, ভারতপন্থী হওয়া, একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙার পক্ষ নেয়া এবং সর্বদা ইসলামের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া। আর এমন একটি ধারণার কারণে একাত্তরে যারা অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছিল, তারা যদি আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রাণদানও করে তবুও আওয়ামী বাকশালীগণ তাদেরকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি রূপে গণ্য করতে রাজি নয়। অনুরূপ বিচার ভারতীয়দেরও। জামায়াত ও শিবিবের বহু সদস্যের জন্ম একাত্তরের পর। তাদের জীবনে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করার যেমন সুযোগই জোটেনি, তেমনি সুযোগ মেলেনি পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টির কাজে অংশ নেয়ারও। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুরক্ষায় তারা যদি আজ জানমালের কোরবানিও দেয়, তবুও চিত্রিত হচ্ছে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি রূপে। তাদের কথা, ইসলামি চেতনাধারী কোনো ব্যক্তি বা দলই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙা ও বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষ নেয়নি। এ কাজ তো ছিল আওয়ামী সেক্যুলার ও সোসালিস্টদের কাজ। ফলে আজ তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হয় কী করে? আর একাত্তরে যারা স্বাধীনতার শত্রু পক্ষে ছিল তারা জনসমর্থন পাবে সেটি কি বিশ্বাস করা যায়? তাদের ডাকে দেশে হরতাল হবে সেটিই বা কী করে মেনে নেয়া যায়? ফলে তাদের হিসাব মেলে না? প্রশ্ন হলো, ইসলামবিরোধী এমন রুগ্ণ মানসিকতা নিয়ে কি হিসাব মেলানো যায়?
তবে জনগণ ঠিকই বুঝেছে, একাত্তরে পাকিস্তানের বিভক্তিকে যারা সমর্থন করেনি তাদের সে চেতনা ও বিচারবোধটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-বিরোধী ছিল না। এ জন্যই সংসদ নির্বাচনে শাহ আজিজুর রহমান, খান আব্দুস সবুর খান, সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরী, আব্দুল আলীমের ন্যায় বহু ব্যক্তিকে জনগণ বিপুল ভোটে বার বার নির্বাচিত করেছে এবং পরাজিত করেছে বহু মুক্তিযোদ্ধাকে। ভারত ও আওয়ামী বাকশালীদের কাছে তাদের সে বিজয় ভালো না লাগলেও সেটিই বাস্তবতা। তা ছাড়া কোনো দলের জনপ্রিয়তা কি সব সময় এক রকম থাকে? আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তাও যে চিরকাল বেঁচে থাকবে, সেটিও কি ভাবা যায়? মানুষের চাওয়া-পাওয়াতেও তো দিন দিন পরিবর্তন আসে। দিন বদলের সাথে সাথে তাই রাজনীতিও বদলে যায়। তখন নতুন নতুন দল জনপ্রিয়তা পায়।

বাকশালীদের কুকর্ম ও ইসলামি জাগরণ
আওয়ামী লীগ এখন গণধিকৃত। সেটির কারণ, হাসিনার সীমাহীন স্বৈরাচার এবং রাষ্ট্রের ওপর আওয়ামী বাকশালীদের সীমাহীন ডাকাতি। তাদের স্বৈরাচারের ফলে অসম্ভব হয়েছে বিরোধী দলগুলির পক্ষে রাজপথে সভা-সমাবেশ করা। জামায়াত-শিবিরের নেতাদের ওপর চলছে নির্যাতন। আওয়ামী বাকশালীদের লাগাতর ডাকাতি থেকে দেশের শেয়ারবাজার, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক, সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার, খাসজমি, এমনকি বিশ্বব্যাংকের ঋণের টাকাÑ কোনো কিছুই রেহায় পায়নি। কোন দেশের জনগণ কি এমন ডাকাতদের ভোট দেয়? আওয়ামী লীগও সেটি বুঝে। এ জন্যই নির্বাচনে বিজয়ী করার জন্য প্রয়োজন পড়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলুপ্তি এবং সে সাথে একটি ষড়যন্ত্রের নির্বাচন। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের রাজনীতির এ নতুন বাস্তবতাটি বুঝতে রাজি নয়, মেনে নিতেও রাজিী নয়। মেকি জনপ্রিয়তার দোহাই দিয়ে আওয়ামী লীগের পুনঃনির্বাচনকে তারা জায়েজ বলতে চায়। আর সে ষড়যন্ত্রমূলক বিজয় রুখাটাই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যারাই সে লক্ষ্যে আপসহীন দৃঢ়তা নিয়ে ময়দানে নামছে জনগণ তাদেরকেই স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দিচ্ছে। আওয়ামী বাকশালীদের ক্ষমতা থেকে নামানোর বিষয়টি জামায়াত-শিবিরের কাছে নিছক রাজনীতির বিষয় নয়, সেটি তাদের অস্তিত্ব বাঁচানোর বিষয়। ফলে তারা স্বৈরাচার-বিরোধী সংগ্রামে আপসহীন হবে এবং সে লক্ষ্যে ত্যাগী হবে সেটি বাংলাদেশের জনগণও বুঝে। ফলে তাদের জনসমর্থন যেমন বাড়ছে, তাদের ডাকে স্বতঃস্ফূর্ত হরতালও হচ্ছে।
গ্রামে ডাকাত পড়লে দলমত নির্বিশেষে হাতের কাছে যা পায় তা নিয়ে সবাই রাস্তায় নামে। তেমনি দেশ ডাকাতদের কবলে পড়লে তখন সমগ্র দেশবাসী রাস্তায় নেমে আসে। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে।

SHARE

Leave a Reply