বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস -মতিউর রহমান আকন্দ

যারা ইতিহাসের ছাত্র বা ইতিহাস চর্চা করেন তাদের পক্ষেই ইতিহাসের ওপর কিছু বলা বা লেখা যথার্থ। আমি ইতিহাসের ছাত্র নই। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে লেখাপড়া ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স, মাস্টার্স এবং লন্ডনের ওলভার হ্যাম্পটন ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে অনার্স ডিগ্রি গ্রহণের পর আইন পেশার সাথে আমার সম্পৃক্ততা। আইন অঙ্গনে কাজের সুবাদে বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে সরকারের দায়ের করা  মামলায় ডিফেন্স টিমের একজন সদস্য হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মামলা সংশ্লিষ্ট অতীতের অনেক ঘটনার শিকড় অনুসন্ধান করতে হয়েছে। সরকার কর্তৃক দায়ের করা মামলায় তদন্তকারী সংস্থা মামলার ঐতিহাসিক পটভূমিতে যেসব বিষয়ের অবতারণা করেছেন সেসব ঘটনার গভীরে ঢোকার চেষ্টা করে সত্য বের করার অনুসন্ধানী ভূমিকা রাখতে গিয়ে আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছি, বাংলাদেশের অতীত গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের ঘটনা পরখ করে। বাংলাদেশসহ পাক-ভারত উপমহাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের যেসব বীরত্বপূর্ণ ঘটনা লুকিয়ে আছে তা আমাদের হৃদয় মনকে দারুণভাবে উদ্বেলিত করে। দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম ভাষার সকল শব্দ উজাড় করে দিলেও নতুন প্রজন্মের উপলদ্ধির তন্ত্রীতে সেই দুঃস্বপ্নময় অসাড় করা দিন-রাত্রির ঘটনাসমূহের চিত্র তুলে ধরা যাবে না।
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য যেভাবে দেশপ্রেমিক জনতা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ভূমিকা পালন করেছেন, নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন তা দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। শত শত বছর ধরে বাংলার জনগণ নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছে। আজও সে আন্দোলন অব্যাহত আছে। সে আন্দোলনের ঘটনাবলি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উজ্জীবিত করবে।
যে রাজনীতি নিয়ে আমাদের আলোচনা সে রাজনীতি মানুষকে নিয়ে। মানুষের কল্যাণ, অকল্যাণ ও অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের জন্যই রাজনীতি। মানুষের অধিকারের উৎপত্তি তাদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ থেকে। বাংলাদেশের প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাজনীতিতে তাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও চেতনার প্রকাশ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষের জীবনে অন্য যে কোন অধিকারের চাইতে রাজনৈতিক অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক অধিকার না থাকলে মানুষের সকল অধিকার ম্লান হয়ে যায়। রাজনৈতিক পতন মানুষের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। বাংলাদেশের জনগণের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস অনেক ঘটনাবহুল। এ দেশের রাজনীতির স্বরূপ অত্যন্ত বেদনাদায়ক। রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে যে দেশের অভ্যুদয় সেই বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস অনেক প্রাচীন। এ রাজনীতির জন্ম হাজার বছরের বেশি আগে। এ দেশের রাজনীতির সাথে মিশে আছে অনেক ত্যাগ, অনেক  কোরবানি। যে দেশের মুসলমানরা ছিল রাজ্যের মালিক, সম্মান, মর্যাদা ও দাপটের সাথে যারা রাজ্য পরিচালনা করত; ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে বেঈমানী ও বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতি তাদেরকে শুধু রাজ্যহারা-ই করেনি তাদেরকে সর্বস্বহারা করেছিল। হারানো সে অধিকার পুনরুদ্ধার করতে তাদের দীর্ঘ সংগ্রামী পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।  নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের অনেক সংগ্রামী ঘটনা আমাদের জাতীয় জীবনের এক অমূল্য ইতিহাস। অতীত ইতিহাস আমাদের চলার পথকে করে গতিময়। যে কোন দেশের নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি করে সে দেশের অতীত ইতিহাস। ইতিহাস চর্চা ব্যতীত কোন জাতিকে আত্মসচেতন করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণে ইতিহাস জাতিকে সহায়তা করে। ইতিহাস একটা জাতির মধ্যে জীবনীশক্তি সঞ্চার করে। কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার অতীত ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে হবে অথবা বিকৃতভাবে পেশ করতে হবে।
ইতিহাস সম্পর্কে কার্লাইলের ধারণা ছিল ‘মহামানবদের মহান কর্মের সঙ্কলিত রূপই হলো ইতিহাস।’ নেহেরুর লেখা ‘গ্লিম্পসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’ বইয়ের চিঠিগুলোতে সক্রেটিস, অশোক, আকবর, আলেকজান্ডার, গারিবল্ডি, বিসমার্ক, হিটলার, ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট এদের কীর্তিগাথাই ফুটে উঠেছে। আবার একই সঙ্গে নেহেরু বলেছেন, শুধু মহান রাজা বাদশাহদের কীর্তি দিয়েই ইতিহাস হয় না। এদের সাথে থাকে জনগণের শক্তি। কারণ তারাই দেশ গঠন করে। নেহেরু পরিষ্কার ভাষায় বলেন, ইতিহাস কোন অতীতের শবদেহ নয় বা এটি শেষ হয় না। ইতিহাস জীবন্ত ও চলমান থাকে। নেহেরু বলেন, ইতিহাস আসলে ‘বর্তমান’। ইতিহাস মানবজাতির কীর্তিময় ঘটনাগুলোকে শ্রদ্ধা জানাতে শিখায় সে ইতিহাসকে বিকৃত করার অর্থই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কৃতিত্ব ও বীরত্বপূর্ণ ঘটনাবলিকে অবজ্ঞা করা।
নাগরিক হিসেবে জাতির রাজনৈতিক উত্থান, পতন কিংবা পটপরিবর্তনের ঐতিহাসিক মুহূর্তে জাতি কিভাবে সাড়া দিয়েছিল, কী ছিল রাজনীতিবিদদের ভূমিকা, দল হিসেবে কার কী অবস্থান ছিল তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যথার্থ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। যে ভূখন্ডে আমাদের অবস্থান সেখানকার ৮৭% মানুষ মুসলমান। মুসলিম জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে হলে তাদের সঠিক অতীত ইতিহাস যথার্থভাবে জানতে হবে। পরম পরিতাপের বিষয় এই যে, একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে জাতির নতুন প্রজন্মকে তাদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ রাখা হয়েছে। ১৯০ বছর গোলামির জিঞ্জিরে শৃঙ্খলিত থাকার পর ব্রিটিশদের হাত থেকে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েম হওয়ার মাত্র ১০-১৫ বছর পর স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের এ কথা জানারও সুযোগ রইল না যে, ভারতবর্ষ দু’ভাগ কেন হলো? পশ্চিম বাংলা ও পূর্ব বাংলার মাতৃভাষা এক হওয়া সত্ত্বেও বাংলা কেন দু’ভাগ হলো? যে চেতনার ভিত্তিতে এ দেশ বিভক্ত হয়েছিল এবং যে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ভারত বিভক্তির ভূমিকা পালন করে উপসংহারে নিয়ে গিয়েছিল তা বস্তুনিষ্ঠ ও যথার্থভাবে জানতে দেয়া হয়নি। প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার এ ষড়যন্ত্রের ভূত বাংলাদেশের শাসকদের ঘাড়ে শক্তভাবে চেপে বসেছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত ঘটনাবলি এবং ঐ সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভূমিকাসমূহ বহুক্ষেত্রে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ শিশু খুনের দরিয়া সাঁতরিয়ে বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামক যে ভূখন্ডটি প্রতিষ্ঠিত করেছে তার অনেক অজানা তথ্য নতুন প্রজন্মকে জানানো হয়নি। ঐতিহাসিক ঘটনাবলি যথাযথভাবে জানতে না দেয়া বা উপস্থাপন না করা আত্মপ্রবঞ্চনারই শামিল।
এক অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী ব্যক্তিবর্গকে স্বাধীনতাবিরোধী, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহায়তাকারী, গণহত্যা, খুন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনসহ নানান ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করে গোটা জাতিকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে নিরপরাধ ব্যক্তিদের দোষী বানানো হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো ইসলামী আদর্শে লালিত ব্যক্তিবর্গই দেশ, দেশের জনগণ ও জাতির কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।  রক্তশয্যা বানিয়ে যে দেশের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ঈশা খাঁ, শরীয়তউল্লাহ, শহীদ তিতুমীর- তাদের আন্দোলনের গৌরবগাথা ঘটনা জাতি কখনো ভুলবে না। উদ্বেগের বিষয় আমাদের চেতনা থেকে ঐ সব বীরপুরুষদের ঘটনাবলি মুছে ফেলার চক্রান্ত চলছে।
বাংলাদেশের অতীত গৌরবময় ইতিহাস সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করা না হলে তারা বিভ্রান্ত হতে থাকবে এবং জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করে ফেলবে। তাই তাদেরকে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও সঠিক রাজনীতির চিত্রসমূহ যথার্থভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত ভূখন্ডের অধিবাসী হিসেবে আমাদের ইতিহাসের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। আমাদের ধমনীতে মিশে আছে ইসলামী মূল্যবোধ। এ মূল্যবোধ আঁকড়ে থাকার কারণে বহু মানুষের বুকের রক্তে সিক্ত হয়েছে এ ভূখন্ড। মনে রাখতে হবে আমাদের ইতিহাস কালের কোন এক বিশেষ সময় থেকে শুরু হয়ে কোন এক বিশেষ সময়ে গিয়ে শেষ হয়নি। এ ইতিহাসের সূচনা দুনিয়ার প্রথম মানুষ হজরত আদম (আ) থেকে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত এ ইতিহাস অবিচ্ছিন্নভাবে চলে এসেছে সময়, কাল ও পরিবেশ-পরিস্থিতি চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে এবং চলতে থাকবে যতদিন দুনিয়া বিদ্যমান থাকবে। এই ইতিহাসই ভবিষ্যৎ চলার পথনির্ধারণে আমাদেরকে উজ্জীবিত করবে।
বাংলাদেশের রাজনীতির ঘটনাসমূহ বড় বিচিত্র। রাজনীতি আজ নানা মেরুকরণের প্রকাশ্য রূপ নিয়ে জনতার সামনে হাজির হয়েছে। বিশ্বায়নের জটিল ও কুটিল আবর্তে সদা ঘূর্ণায়মান আমাদের দেশের রাজনীতি যেন এক রহস্যময় চক্রের আবর্তে  জনমতকে উপেক্ষা করে বাহুবলে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার নেশায় বিভোর। জোর করে ক্ষমতায় থাকার প্রবণতা আজও আমাদেরকে তাড়িত করছে। পেছনের অদৃশ্য শক্তির জোরে ধরাকে সরাজ্ঞান করে রাজ্য শাসন করা হচ্ছে। এ দেশের রাজনীতির সাথে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী ব্যক্তিবর্গের যে ভূমিকা এবং তারা রাজনৈতিক অঙ্গনে যে প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেছেন তা নতুন প্রজন্মের সামনে না থাকলে তারা বুঝতেই পারবে না এ দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে কত ত্যাগ ও কোরবানির স্বীকারই না তারা করেছেন! স্বাধীনতার জন্য বাংলার জনগণ ১৯০ বছর ব্যাপী ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। ব্রিটিশদের গোলামি থেকে মুক্তি লাভের জন্য মুসলমানদের অনেক রক্ত দিতে হয়েছে। অনেকে ফাঁসিতে জীবন দিয়েছেন। অনেকে গিয়েছেন নির্বাসনে। ইংরেজের জেলে ধুঁকে ধুঁকে মরেছে হাজার হাজার মুক্তিসংগ্রামী। ইংরেজের অত্যাচার-নিপীড়নে ধ্বংস হয়েছে লাখো মুসলিম পরিবার। ইংরেজের বৈষম্য বিদ্বেষ নীতির শিকার হয়ে মুসলিম জাতি ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। সে অবস্থার উত্তরণ ঘটিয়ে রক্তপিচ্ছিল পথ পেরিয়ে যে জাতি মুক্তির সূর্য ছিনিয়ে আনে তাদের অতীত ইতিহাসের সে আলোকোজ্জ্বল ও নির্যাতনের রক্তাক্ত পথের অনেক ঘটনাই অজানা রয়ে গেছে। ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে সেগুলো টেনে এনে নতুন প্রজন্মকে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক ঘটনাবলির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া প্রয়োজন। এ উপলব্ধি থেকে আমরা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসকে জানার ও বুঝার চেষ্টা করবো।

বাংলাদেশের জনগণের উৎপত্তি
বর্তমান বাংলাদেশ ও এ দেশে বসবাসরত জনগোষ্ঠী প্রায় ৫ হাজার বছরের ক্রমবিকাশের ধারা বেয়ে গড়ে উঠেছে। এ জনপদের মানুষের মানস গঠনে এখানকার প্রকৃতি গভীর প্রভাব ফেলে। আবহমান বাংলার প্রকৃতি মনোরম ও উদার আবার প্রলয়ঙ্করী। নদীমাতৃক বাংলাদেশের বহমান নদীর ¯্রােতের ধারার সাথে মিশে আছে এ দেশের মানুষের জীবনধারা। নদীর ¯্রােত যেমন চলমান, তেমনি এখানকার মানুষের জীবন, জীবনধারার আবেগ, অনুভূতিও চলমান। নদীর বৈশিষ্ট্য হলো একূল ভাঙা ওকূল গড়া। ভাঙা গড়ার সাথে সদা সংগ্রামরত গঙ্গা, যমুনা, মেঘনা ও পদ্মা পাড়ের মানুষকে সংগ্রাম করে বাঁচতে হয়েছে। নদী ও সাগর তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষগুলো ঝড়, বৃষ্টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। এখানকার জনবহুল গ্রামগুলো প্রকৃতির সাথে লড়াই করে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে নিহত হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ। মানুষের লাশের ওপর দিয়ে যাদের পদচারণা তাদের প্রকৃতির সাথে মিশে আছে সংগ্রাম-আন্দোলন। সংগ্রাম ও প্রতিবাদ এ দেশের মানুষের অহঙ্কার। (স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের ইতিহাসÑ সিরাজউদ্দীন আহমদ)।

বাংলায় মুসলমানদের আগমন
যে দেশের রাজনীতি নিয়ে আমাদের আলোচনা এবং যে ভূখন্ডে আমাদের বসবাস প্রথমেই জানতে হবে সে দেশে আমাদের পূর্বপুরুষদের পরিচয়। আবহমান কাল থেকে বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান অঞ্চল। এ মুসলিম জাতি হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোন মানবগোষ্ঠী নয়। এক মহান উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে মুসলিম জাতির দুনিয়ায় আগমন। ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের আগমন দু’ভাগে হয়েছিল। একশ্রেণীর মুসলমান ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আগমন করেন। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ব থেকেই জীবিকার্জনের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে আরববাসীগণ বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করতেন। তারা উটের সাহায্যে স্থলপথে এবং নৌযানের সাহায্যে বাণিজ্য ব্যপদেশে দেশ থেকে দেশান্তরে ভ্রমণ করতো। সমুদ্রপথে একদিকে আবিসিনিয়া এবং অপরদিকে সুদূর চীন পর্যন্ত তাদের ব্যবসার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত ছিল। আরব থেকে চীন যাওয়ার পথে যে সব ঘাঁটি তারা অতিক্রম করতো তার একটি ছিল মালাবার। মালাবার মাদ্রাজ প্রদেশের সমুদ্র তীরবর্তী একটি জেলা।
বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা) এর আগমনের বহুকাল পূর্বে বহুসংখ্যক আরব বণিক এ দেশে আগমন করেছিলেন। তারা সমুদ্রতীরবর্তী মাদ্রাজ প্রদেশের মালাবারের ওপর দিয়ে চট্টগ্রাম এবং সেখান থেকে সিলেট ও কামরুক হয়ে চীন দেশে যাতায়াত করতেন। এভাবে বাংলার চট্টগ্রাম এবং তৎকালীন আসামের সিলেটও তাদের যাতায়াতের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এসব স্থানে আরবদের বসতি গড়ে উঠেছিল। নবী করীম (সা)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর দ্বীন ইসলামের প্রচারের বিপ্লবী ঢেউ আরব বণিকদের মাধ্যমে মালাবার, চট্টগ্রাম, সিলেট ও চীন দেশেও পৌঁছে ছিল। এভাবে আরব বণিকদের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামের আগমন ঘটেছিল। স্থানীয় অধিবাসীরা ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে সাথে তাদের নিকট মানবিক অধিকার ও মর্যাদার সন্ধান পেয়ে মুসলিম হওয়া শুরু করেছিল। এমন উর্বর জমির খোঁজ পেয়ে বহু নিঃস্বার্থ ইসলাম প্রচারক এ দেশে আগমন করেন। এভাবে নদীমাতৃক বাংলাদেশে মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পায়।
আরেক শ্রেণীর মুসলমান এসেছিলেন বিজয়ীর বেশে, দেশ জয়ের অভিযানে। ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের সিন্ধু প্রদেশে সর্বপ্রথম মুহাম্মদ বিন-কাশিম আগমন করেন বিজয়ীর বেশে। তিনি এ উপমহাদেশে শুধু ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না, তিনি ইসলামী সভ্যতা, সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠারও অগ্রদূত ছিলেন। তার বিজয় সিন্ধু প্রদেশ পর্যন্তই সীমিত থাকেনি। বরঞ্চ তা বিস্তার লাভ করে পাঞ্জাবের মুলতান পর্যন্ত।
মোহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুরাজ দাহিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে সিন্ধু প্রদেশে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেন। তিনি যে সিন্ধু বিজয় করেন সেখানে অনেক পূর্ব থেকেই বহুবার অভিযান পরিচালিত হয়।
হিজরি প্রথম শতকের মাঝামাঝি সময়ে সিন্ধু অভিযানের সূচনা হয়। পঞ্চদশ হিজরিতে হজরত ওমরের (রা) খেলাফত আমলে একটি সেনাবাহিনী ভারত সীমান্তে প্রেরিত হয়। হজরত আলীর (রা) খিলাফতের সময় ৩৯ হিজরির প্রারম্ভে সিন্ধু সীমান্তে অভিযান পরিচালিত হয়। আমীর মোয়াবিয়ার (রা) শাসনামলে মুসলমানগণ সিন্ধু সীমান্ত আক্রমণ করে মুলতান ও কাবুলের মধ্যবর্তী স্থান পর্যন্ত অগ্রসর হন। খলিফা ওয়ালিদের শাসনামলে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত হন। তিনি ৯৩ হিজরিতে মোহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানের সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তার নেতৃত্বে সিন্ধু বিজয় হয় এবং এ বিজয়ের মাধ্যমে উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে। ৭১২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে  পরবর্তী সহ¯্রাধিক বছর এ উপমহাদেশে ইসলামী শাসন প্রচলিত থাকে।
বাংলায় মুসলমানদের আগমন এক বিপ্লবী ঘটনা। ১২০৩ সালে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলার রাজধানী গৌড় দখল করেন। এর মাধ্যমে এ দেশে মুসলমানদের সর্বপ্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভ হয়। মুসলমানদের আক্রমণ প্রতিহত করার মতো সাহস ও শক্তি লক্ষণ সেন বা তৎকালীন ব্রাহ্মণ সমাজের ছিল না। নিপীড়িত বাংলার জনগণ মুসলিম শাসনকে সাদরে গ্রহণ করে এবং অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। অনেক তুর্কি, আফগান, ইরান ও আরব দেশীয় মুসলমান বাংলায় বসতি স্থাপন করে। অধিকাংশ এসেছিলেন সৈনিক হিসেবে। অবশিষ্টাংশ ব্যবসা-বাণিজ্য, ইসলাম প্রচার ও আশ্রয় গ্রহণের উদ্দেশ্যে। এভাবে বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। অসংখ্য পীর-দরবেশ ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আসেন। নিপীড়িত বাংলার জনগণ মুসলিম শাসনের সংস্পর্শে এসে নতুন জীবনের সন্ধান পায়। মুসলমানগণ বিজয়ীর বেশে আগমন করার পর অমুসলিমদের সাথে মিলেমিশে বাস করেন। সাধারণ জনগণ সানন্দে মুসলমানদের শাসন মেনে নেয়। জনতার সমর্থনে গৌড়ের সুলতানগণ দিল্লির অধীনতা ছিন্ন করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাই ঐতিহাসিকগণ বাংলাকে বিদ্রোহ নগর বলে আখ্যায়িত করেছেন। মোহাম্মদ বখতিয়ারের বাংলা বিজয়ের ফলে বহিরাগত মুসলমান দলে দলে এ দেশে বসতি স্থাপন করে। ব্যবসা-বাণিজ্য, সেনাবাহিনীতে চাকরি ও অন্যান্য নানাবিধ উপায়ে জীবিকার্জনের জন্য অসংখ্য মুসলমান এ দেশে আগমন করে এবং এ আগমনের গতিধারা অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। মুসলিম ধর্মপ্রচারক অলি ও দরবেশগণ এ দেশে আগমন করেন এবং ইসলামের সুমহান বাণী, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রচার করেন।
মোহাম্মদ বখতিয়ারের বাংলা বিজয়ের পর থেকে ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর প্রান্তরে মুসলিম রাজ্যের পতন পর্যন্ত ৫৫৪ বছরে একশত একজন বা ততোধিক শাসক বাংলায় শাসন পরিচালনা করেন।
১২৭৮ সালে গৌড়ের সুলতান তিঘরিল খাঁ স্বাধীনতা ঘোষণা করলে দিল্লির সম্রাট গিয়াস উদ্দিন বলবন তাকে দলবলসহ হত্যা করেন। ১৩৪২ সালে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ লখেœৗতি বা গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ১৩৫২ সালে উত্তর-পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গকে একত্র করে সমগ্র বাংলাদেশের অধিপতি হন। সর্বপ্রথম তিনিই বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করে শাহ বাঙ্গাল উপাধি ধারণ করেন।
১৫২৬ সালে মোগল সম্রাট বাবর পাঠানদের পরাজিত করে দিল্লি দখল করেন। ১৫৭৫ সাল থেকে ১৬১১ সাল পর্যন্ত বার ভূঁইয়ারা স্বাধীনভাবে বাংলাদেশ শাসন করে। বার ভূঁইয়া ঈশা খাঁ প্রতাপাদিত্য রামচন্দ্র, চাঁদ রায়, কেদার রায় বাংলার স্বাধীনতার জন্য মোগল স¤্রাট ও জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
১৬১১ সালে স¤্রাট জাহাঙ্গীর বার ভূঁইয়াদের পরাজিত সমগ্র বাংলা দখল করেন। বাংলাকে বিহার ও উড়িষ্যার সাথে যুক্ত করে একটি প্রদেশ বা সুবা গঠন করা হয়। রাজধানী ছিল ঢাকায়। একজন সুবেদার বাংলা শাসন করতেন। স¤্রাট শাহজাহানের আমলে মগ ও পর্তুগিজরা বাংলাদেশ আক্রমণ করে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করে এবং সম্পদ লুট করে। তাদের আক্রমণের ফলে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জনবসতিশূন্য হয়ে পড়ে।
১৬৬৬ সালে সুবেদার শায়েস্ত খাঁ মগ-পর্তুগিজ কঠোর হস্তে দমন করেন। ১৭১৭ সালে মুর্শিদ কুলি খাঁ বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করেন। ১৭৪০ সালে আলীবর্দী খাঁ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন করতেন। মোগল স¤্রাটকে নামমাত্র কর দিতেন। আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর তার দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালে মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে আরোহণ করেন।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply