বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস -মতিউর রহমান আকন্দ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

তবে আরো অনেক কিছু করার বাকি আছে। আমি যা দেখতে পাচ্ছি ও শুনতে পাচ্ছি তাতে আমি নিশ্চিত যে, মুসলিম ভারত এখন সচেতন ও জাগ্রত এবং মুসলিম লীগ এমন একটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে যে কেউ তাকে আর ধ্বংস করতে পারবে না। মানুষ আসবে, যাবে; কিন্তু মুসলিম লীগ চিরকাল টিকে থাকবে।
যুদ্ধ ঘোষণার পর আমাদের অবস্থান বলতে গেলে এমন পর্যায়ে চলে এল যে, আমরা উভয় সঙ্কটে পড়ে গেলাম। তবে আমার মনে হয় না আমাদের এই সঙ্কট এখনো কেটে গেছে। যাক, আমাদের অবস্থানটা হলো এই- আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ভারতের স্বাধীনতা দাবি করছি। তবে এই স্বাধীনতা হবে সারা ভারতের- বিশেষ কোনো অংশের ভারতীয়দের নয়, বা কংগ্রেস ককাসের, মুসলমানদের ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের দাসত্বের স্বাধীনতা নয়।
ভারতে বাস করে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিশেষ করে গত আড়াই বছরে কংগ্রেস শাসিত প্রদেশসমূহে আমরা অনেক শিক্ষা পেয়েছি। আমরা এখন অত্যন্ত শঙ্কিত, কাউকেই আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি মনে করি এটা সকলের জন্য সবচেয়ে উত্তম নিয়ম হলো কাউকেই খুব বেশি বিশ্বাস করা উচিত নয়। কোনো কোনো সময় আমরা অনেক লোককেই বিশ্বাস করি। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায় আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। এটা থেকে নিশ্চয়ই সকলের এই শিক্ষা নেয়া উচিত যে যারা তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাদের বিশ্বাস করা উচিত নয়। ভদ্র মহোদয় ও ভদ্রমহিলাগণ, আমরা কখনো ভাবিনি যে কংগ্রেস শাসিত প্রদেশসমূহে কংগ্রেস হাউকমান্ড আমাদের সাথে যেরূপ আচরণ করেছে সেরূপ আচরণই করবে। আমি স্বপ্নেও ভাবিনি যে তারা এত নিচুতে নামতে পারবে। আমি কখনো বিশ্বাস করতে পারিনি যে কংগ্রেস ও ব্রিটিশদের মধ্যে একটা ভদ্রজনের চুক্তি হবে- যদিও আমরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ এটা নিয়ে প্রতিবাদ করেছি। গভর্নররা ছিলেন নিষ্ক্রিয় আর গভর্নর জেনারেল ছিলেন অসহায়। আমাদের প্রতি ও অন্যান্য সংখ্যালঘুর প্রতি তাদের দায়িত্ব ও আমাদের দেয়া তাদের প্রতিশ্রুতির কথা আমরা তাদের স্মরণ করিয়ে দিলাম। কিন্তু সবকিছুই হয়ে গেল নিষ্ফল। সৌভাগ্যক্রমে বিধাতা আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এলেন। আল্লাহকে ধন্যবাদ, ব্রিটিশ ও কংগ্রেসের মধ্যে যে অলিখিত চুক্তি ছিল সেটাও ভেঙে গেল, কংগ্রেসও ক্ষমতা থেকে সরে এলো। আমার মনে হয় তাদের পদত্যাগ করার জন্য তারাও এখন অনুশোচনা করছে। ধোঁকাটাও উবে গেল। এ পর্যন্ত ভালো হলো। সুতরাং আমি আপনাদের কাছে আবেদন জানাচ্ছি এবং অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েই সেটা করছি যে, আপনারা এমনভাবে নিজেদের সংগঠিত করুন যাতে আপনাদের অন্তর্নিহিত শক্তি ছাড়া অন্য কারো ওপর নির্ভর করতে না হয়। এটাই আপনাদের একমাত্র রক্ষাকবচ, নিজেদের ওপরই কেবল নির্ভরশীল হোন। তবে একথার অর্থ এই নয় যে অন্যের প্রতি আমাদের কোনো বিদ্বেষভাব থাকবে। আপনাদের অধিকার ও স্বার্থরক্ষা করতে আপনাদের মাঝে এমন শক্তি গড়ে তুলতে হবে যাতে আপনারা নিজেরা নিজেদের রক্ষা করতে পারেন। এ আহ্বানই আমি আপনাদের জানাতে চাই।
এবার কথা হলো, ভবিষ্যৎ সংবিধান সম্পর্কে আমাদের অবস্থান কী? এটা হলো, পরিস্থিতি অনুকূল হলে অথবা যুদ্ধ শেষ হওয়ার অব্যবহিত পরই ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধানের প্রশ্নটি নতুন করে পরীক্ষা করতে হবে এবং ১৯৩৫ সালের আইন চিরতরে বাতিল করতে হবে। এ ব্যাপারে ঘোষণা দেয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারকে বলাতে আমরা আর বিশ্বাস করি না। এসব ঘোষণার বাস্তবে কোনো মূল্য নেই। আপনারা ব্রিটিশদের ঘোষণা দেয়ার কথা বলে এদেশ থেকে সরাতে পারবেন না। অবশ্য কংগ্রেস ভাইসরয়কে ঘোষণা দেয়ার জন্য বলেছিল। ভাইসরয় বলেছেন, “আমি ঘোষণাতো করেছি।” কংগ্রেস বলল, “না, না আমরা অন্যরকম ঘোষণা চাই। আপনাকে অবশ্যই ঘোষণা করতে হবে এবং এখনই করতে হবে যে ভারত মুক্ত ও স্বাধীন এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার বা যতদূর সম্ভব ভোটাধিকার দেয়া যায় তার ভিত্তিতে নির্বাচনের মাধ্যমে যে গণপরিষদ (সংবিধান পরিষদ- Constituent Assembly)) গঠিত হবে তার মাধ্যমে নিজেদের সংবিধান প্রণয়ন করার অধিকার থাকবে। এই সংবিধান পরিষদ অবশ্যই সংখ্যালঘুদের বৈধ স্বার্থগুলো রক্ষার ব্যবস্থা করবে।” মি. গান্ধী বলেন, সংখ্যালঘুরা যদি সন্তুষ্ট না হয় তাহলে তার ইচ্ছা হলো একটি উচ্চপর্যায়ের ও সবচেয়ে নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যা এই সমস্যা সমাধান করবে। এবার আমরা যদি এ সত্যটাও বাদ দেই যে কোন সংবিধান পরিষদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য শাসনশক্তিকে বলা ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক উভয় বিবেচনায়ই অসম্ভব- আবার এগুলো বাদ দিয়েও যদি আমরা যে ভোটাধিকার ব্যবস্থার ভিত্তিতে নির্বাচন হবে তাতে রাজি না হই কিংবা যদি সংবিধান পরিষদে অমুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আমরা মেনে না নেই, তাহলে কি হবে? বলা হয়ে থাকে এতবড় একটা উপমহাদেশের জন্য একটি জাতীয় সংবিধান প্রণয়ন করতে গিয়ে এই পরিষদ যা করবে তাতে সম্মত না হওয়ার কোনো অধিকার আমাদের নেই, একমাত্র সেইসব বিষয়ে ছাড়া যেগুলো সংখ্যালঘুদের রক্ষাকবচের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট। সুতরাং শুধুমাত্র সংখ্যালঘুদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে একমত না হওয়ার বিশেষ অধিকারই কেবল আমাদের দেয়া হচ্ছে। পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের নিজেদের প্রতিনিধি প্রেরণেরও বিশেষ সুবিধা আমাদের দেয়া হচ্ছে। তবে এই প্রস্তাবের ভিত্তি হলো এ কথা ধরে নেয়া যে যখনই এই অবদানটা কার্যকর হবে, তখনই ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে। অন্যকথায়, তার প্রস্তাবের মূলকথা হলো, আগে আমাদেরকে ঘোষণা দিন যে আমরা মুক্ত ও স্বাধীন দেশ, তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নেব এর বিনিময়ে আপনাদের কি দেয়া যায়। মি. গান্ধী যখন এরকম কথা বলেন তখন কি এ কথা মনে হয় যে, তিনি আসলেই ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চান? তবে ব্রিটিশরা যাক বা না যাক, এর অর্থ দাঁড়ায়, জনগণকে ব্যাপক ক্ষমতা দিতে হবে। যদি সংবিধান পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাথে মুসলমানদের কোন ব্যাপারে মতদ্বৈধতা ঘটে তাহলে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে করবে? যদি আমরা ধরে নেই যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা গেল, তাদের রোয়েদাদ ও সিদ্ধান্ত পাওয়া গেল, কিন্তু আমি জানতে চাই এই রোয়েদাদটা বাস্তবায়িত হয়েছে কিনা বা ঐ রোয়েদাদ উল্লিখিত শর্ত অনুসারে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা, তা কে দেখবে? বাস্তবে ওটা মানা হচ্ছে কিনা এটাই বা কে দেখবে? কারণ আমাদের বলা হচ্ছে ব্রিটিশরা তাদের প্রধান ক্ষমতা বা সম্পূর্ণ ক্ষমতা ছেড়ে দেবে। তাহলে এই রোয়েদাদ কার্যকরী করার জন্য এর পেছনে কি বাধ্যকারী সংস্থা থাকবে? তাহলে আমাদের এই একই উত্তরে চলে আসতে হয়। সেটা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা তা করবে- তবে, এটা কি ব্রিটিশদের ‘বেয়নেট’ দিয়ে কিংবা মি. গান্ধীর ‘অহিংসা’ দিয়ে? তাদেরকে কি আমরা আর বিশ্বাস করতে পারি? তা ছাড়া, ভদ্র মহোদয় ও ভদ্র মহিলাগণ, আপনারা কি একথা কল্পনা করতে পারেন যে এ ধরনের একটা প্রশ্ন, একটা সামাজিক চুক্তির বিষয় যার ওপর ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান নির্ভর করবে এবং যা ৯০ মিলিয়ন মুসলমানকে প্রভাবিত করবে সেটা কি কোন বিচার বিভাগীয় ট্রাইব্যুনাল দ্বারা মীমাংসা করা যাবে? কিন্তু এটাই হলো কংগ্রেসের প্রস্তাব।
কয়েকদিন আগে মি. গান্ধী যা বলেছেন সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে অন্যান্য কংগ্রেস নেতারা ভিন্ন ভিন্ন সুরে যেসব কথা বলছেন সে দিকে সৃষ্টি দেয়া যাক। মাদ্রাজের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজা গোপাল আচারি বলেছেন, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য গঠনের একমাত্র পথ হলো যৌথ নির্বাচকমন্ডলী। কংগ্রেস সংগঠনের অন্যতম এই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র হলো এটা। কয়েকদিন আগে বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ বলেছেন, “মুসলমানরা আর কি চায়?” আমি তার কথাগুলো আপনাদের পড়ে শুনাব। সংখ্যালঘুদের প্রশ্ন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “ব্রিটিশ যদি আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার মেনে নেয় তাহলে সব ধরনের মতভেদই দূর হয়ে যাবে।” কিভাবে আমাদের মতভেদ দূর হবে? তিনি এ ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেননি বা এ বিষয়ে আমাদের জ্ঞানদান করেননি।
“তবে যতক্ষণ পর্যন্ত ব্রিটিশরা ক্ষমতা দখল করে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত এ মতভেদ থাকবে। কংগ্রেস একথা পরিষ্কার বলে দিয়েছে যে ভবিষ্যৎ সংবিধান কংগ্রেস কর্তৃক প্রণীত হবে না, হবে সকল রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের দ্বারা। কংগ্রেস আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছে, সংখ্যালঘুরা পৃথক নির্বাচন করতে পারবে যদিও কংগ্রেস মনে করে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থাটা একটা খারাপ জিনিস। সকল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী নির্বিশেষে এই দেশের সকল মানুষের প্রতিনিধিই ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান প্রণয়ন করবে- এই দল বা ঐ দল নয়।” তাই বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদের মতে যে মুহূর্তে আমরা এই পরিষদে প্রবেশ করব সেই মুহূর্তেই আমরা আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় বিষয় ও অন্যান্য সবকিছু ভুলে যাবো। এটা হলো ১৮ মার্চ ১৯৪০ তারিখে বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদের কথা। এবার ২০ মার্চ ১৯৪০ তারিখে মি. গান্ধী যা বললেন তা হলো-
“আমার কাছে হিন্দু, মুসলমান, পার্সি, হরিজন সকলে সমান। আমি চপলতা করতে পারি না।” আমি মনে করি তিনি তাই করছেন। “যখন আমি কায়েদে আজম জিন্নাহ্র কথা বলি তখন চপলতা করতে পারি না। তিনি আমার ভাই।”
একমাত্র পার্থক্য হলো, আমার গান্ধী ভাইয়ের আছে তিনটি ভোট আর আমার আছে একটি।
“আমি খুশি হবো যদি তিনি আমাকে তার পকেটে রেখে দিতে পারেন।” তার এই সবিশেষে প্রস্তাব সম্পর্কে কী বলব আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।
“এক সময় ছিল যখন আমি বলতে পারতাম যে এমন কোনো মুসলমান নেই যার আস্থা আমার প্রতি নেই। এটা আমার দুর্ভাগ্য যে এখন সে অবস্থা নেই।”
কেন তিনি আজ মুসলমানদের আস্থা হারালেন? আমি কি ভদ্র মহোদয় ও ভদ্র মহিলাদের জিজ্ঞেস করতে পারি?
“উর্দু সংবাদপত্রে কি লেখা হয় এর সবকিছু আমি পড়ি না, তবে সেখানে আমাকে প্রচুর গালি দেয়া হয়। এতে আমি দুঃখিত নই। আমি এখনো বিশ্বাস করি যে হিন্দু-মুসলমান সমস্যার নিষ্পত্তি না হলে স্বরাজ হবে না।”
গত ২০ বছর ধরেই মি. গান্ধী এ কথা বলে আসছেন।
“আপনারা হয়ত জানতে চাইবেন, সেটা হলে আমি লড়াইয়ের কথা বলছি কেন? আমি বলছি যে এটা হবে সংবিধান পরিষদের জন্য লড়াই।”
তিনি ব্রিটিশদের সাথে লড়াই করছেন। আমি কি মি. গান্ধী ও কংগ্রেসকে বলতে পারি যে আপনারা এমন এক সংবিধান পরিষদের জন্য লড়াই করছেন যেটা মুসলমানরা বলছে, তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, যেটা, মুসলমানরা বলছে, বুঝায় তিনের মধ্যে এক, যেটা সম্পর্কে মুসলমানরা বলছে যে মাথা গণনায় তারা কোনোভাবেই এমন কোন চুক্তিতে আসতে পারবে না যেটা হবে অন্তর থেকে আসা প্রকৃত চুক্তি এবং যেটা আমাদের বন্ধুর মত কাজ করতে সাহায্য করবে। সুতরাং এ ধরনের সংবিধান পরিষদের ধারণা আপত্তিকর, অন্যান্য আপত্তির ব্যাপার এতে জড়িত থাকলেও।
তবে তিনি সংবিধান পরিষদের জন্য লড়াই করছেন মুসলমানদের সাথে নয়।
তিনি বলেন, “আমি এটা করছি, কারণ এটা হবে একটা সংবিধান পরিষদের জন্য লড়াই। যেসব মুসলমান সংবিধান পরিষদের আসবে তারা যদি” কথাগুলো লক্ষ করুন। “যারা সংবিধান পরিষদে মুসলমানদের ভোটে আসবে।” -প্রথমে তিনি আমাদের ঐ পরিষদে আসতে বলছেন- তারপর তিনি বলছেন “যদি এ কথা ঘোষণা করে যে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে অভিন্ন কোনো বিষয়ই নেই তাহলে আমি সব আশা ছেড়ে দেবো, তবে এমন অবস্থায়ও আমি তাদের সাথে একমত হবো। কারণ তারা কুরআন পড়ে এবং আমিও ঐ পবিত্র গ্রন্থের কিছুটা পড়েছি।”
সুতরাং তিনি মুসলমানদের মতামত সম্পর্কে নিশ্চিত হবার জন্যই সংবিধান পরিষদ চান এবং যদি তারা রাজি না হন তাহলে তিনি সকল আশা ছেড়ে দেবেন। তবুও আমাদের সাথে একমত হবেন! বেশ, ভদ্র মহোদয় ও ভদ্র মহিলাগণ, আমি আপনাদের কাছে জানতে চাচ্ছি- মুসলমানদের সাথে কোন সমঝোতায় আসার যদি ইচ্ছা থেকে থাকে তাহলে এ কথা কি তার প্রকৃত ইচ্ছা প্রকাশ করে? (না, না বলে সভা থেকে উত্তর) মি. গান্ধী তাহলে একথাটা কেন স্বীকার করেন না, যেটা আমি তাকে অনেকবার বলেছি, এখনো বলছি যে কেন মি. গান্ধী অকপটে একথা মেনে নিচ্ছেন না যে কংগ্রেস হলো হিন্দু কংগ্রেস ও তিনি পুরোপুরি একটা হিন্দুদের সংগঠনের ছাড়া অন্য কারো প্রতিনিধি নন? মি. গান্ধী কেন গর্বের সাথে বলছেন না “আমি একজন হিন্দু কংগ্রেস যার পেছনে হিন্দুদের পুরোপুরি সমর্থন আছে। আমি একথা বলতে লজ্জিত নই যে আমি একজন মুসলমান। আমার কথা ঠিক এবং একজন অজ্ঞ লোকেরও এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে মুসলিম লীগের প্রতি ভারতীয় মুসলমানদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। কেন তাহলে এই ছদ্মবেশ? কেন এইসব কূটকৌশল। কেন মুসলমানদের উৎখাতের জন্য ব্রিটিশদের ওপর বল প্রয়োগ? কেন এই অসহযোগের ঘোষণা? কেন গণ আইন অমান্য আন্দোলনের ভয়? মুসলমানরা রাজি হয় কি না হয়, এটা বুঝার জন্য কেন এই সংবিধান পরিষদের জন্য লড়াই? কেন একজন হিন্দু নেতা হিসেবে গর্বের সাথে আপনার লোকদের প্রতিনিধি হিসেবে আসেন না আর আমাকেও মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসেবে গর্বের সাথে আপনার সাথে মিলিত হতে দেন না। কংগ্রেস সম্পর্কে এতটুকুই আমার বলার আছে।
ব্রিটিশ সরকারের সাথে আমাদের সম্পর্কের ব্যাপার হলো, কোন ধরনের বোঝাপড়া এখনো হয়নি যেটা আপনারাই জানেন। আমরা কতিপয় বিষয়ে নিশ্চিত আশ্বাস চেয়েছিলাম। তবে একটা ব্যাপারে আমরা বেশ অগ্রগতি সাধন করতে পেরেছি আর তা হলো এরূপ : আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে আমাদের দাবি ছিল ভবিষ্যৎ সংবিধানের পুরো সমস্যাটি ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন বাদ দিয়ে, পুরোপুরি নতুনভাবে পরীক্ষা করতে হবে। এর উত্তরে ভাইসরয় মহামান্য ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্ব নিয়ে যা বলেছেন, সেটার উদ্ধৃতি দেয়াই ভালো- আমার নিজের কথায় না বলে। ২৩ ডিসেম্বর তারিখে নিম্নোক্ত উত্তর আমরা পাই-
আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমার জবাব হলো ১৩ অক্টোবর মহামান্য ব্রিটিশ সরকারের অনুমোদনক্রমে আমি যে ঘোষণা দিয়েছিলাম তা থেকে- “১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন, অথবা যে মূলনীতি অথবা যে পরিকল্পনার ভিত্তিতে তা রচিত তার কোন অংশ পরীক্ষা করার বিষয়টি”-“বাদ দেয়া হয়নি।” “বাদ দেয়া হয়নি” কথাগুলো লক্ষ করুন।
অন্যান্য ব্যাপার হলো, আমরা এখনো আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- (১) আমাদের সম্মতি ও অনুমোদন ছাড়া ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান সম্পর্কে কোনো ঘোষণা ব্রিটিশ সরকার দিতে পারবেন না; (২) আমাদের অগোচরে কোন দলের সাথে কোন ধরনের মীমাংসায় যাওয়া যাবে না যদি না এতে আমাদের সম্মতি ও অনুমোদন থাকে। ভদ্র মহোদয় ও ভদ্র মহিলাগণ, ব্রিটিশ সরকার আমাদের দাবি মানুক বা না মানুক, আমাদের নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি দিক বা না দিক, আমরা বলেছি যে আমরা আমাদের লোকদের অন্য কোনো বিচারকের হাতে ছেড়ে দিতে পারব না। আমরা এবং একমাত্র আমরাই হবো আমাদের ভাগ্যবিধাতা। নিশ্চয়ই এটা আমাদের ন্যায্য দাবি। আমরা চাই না যে ব্রিটিশ সরকার আমাদের ওপর এমন একটা সংবিধান চাপিয়ে দিক যাতে আমাদের কোনো অনুমোদন নেই এবং যা আমরা মানি না। সুতরাং এ ধরনের নিশ্চয়তা বিধান করা এবং মুসলমানদের এই বিষয়ে সম্পূর্ণ শান্তি ও নিশ্চয়তা প্রদান করে তাদের সৌহার্দ্য অর্জন করাই হবে ব্রিটিশদের বিজ্ঞজনোচিত কাজ। তবে তারা এটা করুক আর নাই করুক, যেকথা আমি আগেই আপনাদের বলেছি, আমাদেরকে আমাদের নিজেদের শক্তির ওপরই নির্ভর করতে হবে। এই মঞ্চ থেকে আমি একথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই যে, যদি আমাদের অনুমোদন ও সম্মতি ছাড়া কোনো ঘোষণা দেয়া হয় বা অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তাহলে ভারতের মুসলমানরা তা প্রতিহত করবে। এ বিষয়ে কোনো ভুল করা হবে না।
পরবর্তী বিষয় হলো, প্যালেস্টাইন প্রশ্নে আমাদের বলা হয়েছে যে “আরবদের ন্যায়সঙ্গত দাবি পূরণ করার জন্য সর্বাত্মক ও গুরুত্বসহকারেই প্রবল চেষ্টা করা হচ্ছে।” আমরা সর্বাত্মক চেষ্টাতেই সন্তুষ্ট থাকতে পারি না। সর্বাত্মক চেষ্টাই সর্বোত্তম চেষ্টা নয়। আমরা চাই ব্রিটিশ সরকার প্রকৃত অর্থেই এবং বাস্তবেই প্যালেস্টাইনে আরবদের দাবি পূরণ করবেন।
পরবর্তী প্রশ্ন হলো বাইরে সৈন্য পাঠানোর ব্যাপার। এখানে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি আছে। সে যাহোক, আমরা আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছি। এটা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না, ভাষাও একথা প্রমাণ করে না যে, এ ব্যাপারে কোনো আশঙ্কা বা ভুল আশঙ্কা আছে যে আমাদের নিজেদের দেশ রক্ষার্থে আমাদের সৈন্যদের পুরোপুরি ব্যবহার করা যাবে না। আমরা ব্রিটিশ সরকারকে যে ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে বলেছিলাম তা হলো, কোনো মুসলিম দেশ বা মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের পাঠানো যাবে না। আশা করি এ অবস্থানটা পরিষ্কার করতে ব্রিটিশ সরকার সক্ষম হবেন।
এটাই হলো ব্রিটিশ সরকারের বিষয়ে আমাদের অবস্থান। ওয়ার্কিং কমিটির বিশেষ সভায় ভাইসরয়কে আমাদের ৩ ফেব্রুয়ারির প্রস্তাবের আলোকে আমরা যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম সেটার ভিত্তিতে তার ২৩ ডিসেম্বরের পত্রখানা পুনর্বিবেচনা করার কথা বলেছিলাম। আমাদের জানানো হয়েছে যে ব্যাপারটি তার সযত্ন বিবেচনায় আছে।
ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহিলাগণ, যুদ্ধের পর থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই হলো আমাদের অবস্থান।
আমাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থাটা হলো, আমরাও ব্যাপারটি পরীক্ষা করছি এবং আপনারা জানেন, অনেক বিজ্ঞ সংবিধান-বিশারদ আমাদের কাছে বিভিন্ন পরিকল্পনা পাঠিয়েছেন। ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান সমস্যা নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তারাও অনেক পরিকল্পনা পাঠিয়েছেন। এখন পর্যন্ত যেসব পরিকল্পনা এসেছে সেগুলো পরীক্ষার জন্য আমরা একটা সাব-কমিটিও গঠন করেছি। তবে একটা বিষয় একেবারে পরিষ্কার। সেটা হলো, সর্বদা একটা বিষয় ধরে নেয়া হয়েছে যে মুসলমানরা সংখ্যালঘু যা ঠিক নয়। এত দীর্ঘ সময় ধরে একথায় আমরা এতই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে এইসব স্থায়ী হয়ে যাওয়া ধারণা দূর করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মুসলমানরা সংখ্যালঘু নয়। যেকোনো সংজ্ঞার বিচারেই মুসলমানরা একটা জাতি। ব্রিটিশ এবং বিশেষ করে কংগ্রেস বলে থাকে, “তোমরা সংখ্যালঘু, তোমরা কি চাও?” সংখ্যালঘুরা আর কি চায়? যেভাবে বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ বলেছিলেন। কিন্তু মুসলমানরা নিশ্চয়ই সংখ্যালঘু নয়। ব্রিটিশরাও ভারতের যে মানচিত্র করেছে তাতে দেখা যায় এ দেশের বিশাল এলাকা আছে যেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ যেমন বাংলা, পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান।
এখন প্রশ্ন দাঁড়াল এই হিন্দু মুসলমান সমস্যার সবচেয়ে উত্তম সমাধান কি হতে পারে? এ ব্যাপারটা আমরা চিন্তা করে আসছি এবং যে কথা আমি ইতোমধ্যেই বলেছি বিভিন্ন প্রস্তাব পরীক্ষা করার জন্য একটা কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে সংবিধানের চূড়ান্ত রূপরেখা যাই হোক, আমি আপনাদের কাছে আমার নিজস্ব মতামত তুলে ধরা এবং এর সমর্থনে সি. আর. দাশের কাছে লালা রাজপত রায়ের একটা চিঠির কথা বলব। ওটা লেখা হয়েছিল ১৪, ১৫ বছর আগে। ইন্দ্র প্রকাশ নামে জনৈক ব্যক্তির সম্প্রতি প্রকাশিত বইতে ওটা স্থান পাওয়ায় সেটা সকলের জানা হয়েছে। একজন ধূর্ত রাজনীতিবিদ ও কট্টর হিন্দু মহাসভার সদস্য লালা রাজপত রায় এই কথাই বলেছেন। তবে এই পত্রটি পড়ার আগে একটা কথা পরিষ্কার যে আপনি যদি হিন্দু হন, তাহলে হিন্দু হওয়া থেকে আপনি দূরে সরে আসতে পারেন না। “জাতীয়তাবাদী” শব্দটি এখন রাজনীতিতে যারা জাদুকর তাদের খেলার বস্তুতে পরিণত হয়ে গেছে। তিনি যা বলেন তা হলো-
আরো একটা ব্যাপার আছে যেটা সম্প্রতি আমাকে খুব উদ্বিগ্ন করছে এবং যেটা আমি চাই আপনিও ভালোভাবে চিন্তা করে দেখবেন। সেটা হলো হিন্দু-মুসলমান ঐক্য। আমি গত ছয় মাসের অধিকাংশ সময়ই মুসলমানদের ইতিহাস ও মুসলিম আইন পড়ায় সময় কাটিয়েছি। আমার মনে হচ্ছে যেটা সম্ভবও নয় বাস্তবসম্মতও নয়। অসহযোগ আন্দোলনে মুসলমান নেতাদের একনিষ্ঠতা ধরে নিলেও আমি মনে করি তাদের ধর্মটাই এ ধরনের কোনো বিষয়ে বহু বাধা সৃষ্টি করবে।”
“আপনার মনে আছে হাকিম আজমল খান ও ড. কিচলুর সাথে আমার আলাপের কথা। হাকিম আজমল খানের মত এত ভালো কোন মুসলমান হিন্দুস্থানে নেই। কিন্তু কোন মুসলমান নেতা কি কুরআনের বাইরে যেতে পারে? আমি আশা করছি ইসলামি আইন সম্পর্কে আমার ধারণা ভুল হোক।”
আমি মনে করি তার ধারণা সম্পূর্ণ ঠিক।
“এটা ঠিক নয়-এই মর্মে আমাকে কেউ আশ্বস্ত না করা পর্যন্ত আমি স্বস্তি পাবো না, তবে যদি সেটা ঠিক হয়ে থাকে তাহলে এটা দাঁড়ায় যে আমরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হলেও ব্রিটিশদের রীতিতে আমরা হিন্দুস্তান শাসন করতে পারব না। আমরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হিন্দুস্তান শাসন করতে পারব না।”
ভদ্র মহোদয় ও ভদ্র মহিলাগণ, যখন লালা রাজত রায় বলেন যে আমরা গণতান্ত্রিক রীতিতে ভারত শাসন করতে পারব না তখন সব ঠিক থাকে। কিন্তু আঠারো মাস আগে আমি যখন একই সত্য কথা বলি তখন আক্রমণ ও সমালোচনার ঝড় আসে। তবে লালা রাজপত রায় ১৫ বছর আগে বলেছিলেন যে আমরা তা করতে পারব না অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রীতিতে হিন্দুস্তান শাসন করতে পারব না। তাহলে এর প্রতিকার কি? কংগ্রেসের মতে এর প্রতিকার হলো, আমাদের সংখ্যালঘু করে সংখ্যাগুরুদের অধীনে রাখা। লালা রাজপত রায় আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেন, “তাহলে এর প্রতিকার কী? আমি সাত কোটি মুসলমানের ভয়ে ভীত নই। তবে আমি ভাবছি হিন্দুস্তানের সাত কোটির সাথে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া, আরব, মেসোপটেমিয়া ও তুরস্কে যেসব সশস্ত্র লোক আছে তাদের যোগ করলে ওরা অপ্রতিরোধ্য হবে।” হ
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply