বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস -মতিউর রহমান আকন্দ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

“আমি সত্যিকার অর্থে এবং মনে প্রাণে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রয়োজনীয়তাও বাঞ্ছনীয়তা কামনা করি। আমি মুসলিম নেতাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করতেও প্রস্তুত আছি। কিন্তু কুরআন ও হাদিসের যেসব বাধা নিষেধ আছে সেগুলোর ব্যাপারে কি হবে? নেতারা এগুলো পরিহার করতে পারবেন না। আমাদের বিপর্যয় কি তাহলে অবশ্যম্ভাবী? আমি আশা করি আপনার জ্ঞানসমৃদ্ধ মন ও প্রাজ্ঞতাপূর্ণ চিন্তাধারা দিয়ে এই সমস্যা থেকে উত্তরণের একটা পথ বের করবেন।”
ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহিলাগণ, এটা হলো পনেরো বছর আগে একজন হিন্দু নেতার কাছে আরেক হিন্দু নেতার লিখিত চিঠিমাত্র। এবার সকল বিষয় বিবেচনা করে আমার যা অভিমত সেটাই আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। ব্রিটিশ সরকার ও পার্লামেন্ট এমনকি ব্রিটিশ জাতিও বিগত কয়েক দশক ধরে ভারতের ব্যাপারে কিছুটা নির্দিষ্ট ধারণা পোষণ করে আছে। ওটার ভিত্তি হলো তাদের দেশে রাজনৈতিক ব্যবস্থার ক্রমবিবর্তন যার ফলে তারা ব্রিটিশ সংবিধান প্রণয়ন করেছে আর বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার উদ্ভব হয়েছে। রাজনৈতিক রীতিতে পরিচালিত দলীয় সরকারই তাদের কছে আদর্শ সরকার এবং তারা মনে করেন সকল দেশের জন্য সর্বোত্তম সরকার। একটা একপেশে ও অত্যন্ত প্রবল একটা প্রচারণা যেটা স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশদের প্রভাবিত করে সেটা তাদেরকে একটা মস্ত ভুল করতে প্রবৃত্ত করেছে। সেটা হলো ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে লিপিবদ্ধ শাসনব্যবস্থা। আমরা দেখছি ব্রিটেনের নেতৃস্থানীয় রাজনীতিকরা তাদের কথাবার্তায় অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে ভারতে যেসব অসঙ্গতিপূর্ণ অবস্থা সেগুলো সময়ের সাথে সাথে দূর হয়ে যাবে।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে London Times-এর মত পত্রিকা লিখেছে, “হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকৃত অর্থে ধর্মীয় ব্যাপারে নয়, সেটা হলো আইন ও সংস্কৃতিগত। সে কারণে এ কথা বলা যায় যে তারা সম্পূর্ণ আলাদা ও ভিন্ন সভ্যতার ধারক। তবে কালক্রমে এই কুসংস্কার চলে যাবে এবং ভারত একটি অভিন্ন জাতিতে পরিণত হবে।” সুতরাং London Times-এর মতে একমাত্র পার্থক্যের বিষয় হলো অন্ধ বিশ্বাস। এই মৌলিক ও দৃঢ়মূল পার্থক্যগুলো যেমন আধ্যাত্মিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক- কেবল ‘অন্ধ বিশ্বাস’ শব্দের মধ্যে এনে জড়ো করা হয়েছে। তবে এটা নিশ্চয়ই ভারতীয় উপমহাদেশের অতীত ইতিহাসকে অবজ্ঞা করা হবে যদি সমাজ সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক ধারণা এবং এর বিপরীতে হিন্দুধর্মের ধ্যানধারণা বিচার করে এগুলোকে অন্ধবিশ্বাস বলে গণ্য করা হয়। এক হাজার বছরের কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ধর্মীয় জাতীয়তাবোধ যেটা সবসময়ের জন্যই বিচিত্র একটা ব্যাপার সেটা কোন সময়ই একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের অধীন করে এবং একটি অস্বাভাবিক ও কৃত্রিম ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি আইনের দ্বারা জোর করে একত্রিত করে, একটি জাতিতে রূপান্তরিত করা যাবে না।
গত ১৫০ বছরের এককেন্দ্রিক সরকার যা করতে পারেনি সেটা একটা ফেডারেল কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে করা যাবে না। এভাবে গঠিত কোন সরকারের নির্দেশ সমস্ত উপমহাদেশের বিভিন্ন জাতীয়তাবাদের অনুসারী মানুষের স্বেচ্ছাকৃত আনুগত্য লাভ করতে পারবে এর পেছনে সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তা ছাড়া-একথা ধারণা করা যায় না।
ভারতের সমস্যা আসলে আন্তঃসাম্প্রদায়িক বিষয় নয়, স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক ব্যাপার এবং সে দৃষ্টিতেই ওটা দেখতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই মূল ও আসল সত্যটি উপলব্ধি করা না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত যেকোনো সংবিধানই রচনা করা হোক সেটা বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং সেটা শুধু মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক হবে না, হিন্দু ও ব্রিটিশদের জন্যও হবে। যদি ব্রিটিশ সরকারের সদিচ্ছা থাকে যে তারা এই উপমহাদেশের মানুষের সুখ ও শান্তি বিধান করবেন তাহলে একমাত্র যে পথ খোলা আছে তা হলো প্রধান প্রধান জাতিকে তাদের নিজস্ব আবাসভূমি নিয়ে ভারতকে বিভক্ত করে “স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় রাষ্ট্রসমূহ”(Autonomous National States) গঠন করতে দেয়া। এই রাষ্ট্রগুলো একটি অপরটির বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন কেন হবে তার কোনো যুক্তি নেই। অন্যদিকে পারস্পরিক বিরোধ এবং একের ওপর অন্যের রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা এবং সমাজ শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করার স্বাভাবিক প্রচেষ্টা ও প্রবণতা দূর হবে। তাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে স্বাভাবিক সদিচ্ছার দিকে তা নিয়ে যাবে এবং তারা প্রতিবেশীদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারবে। এর ফলে মুসলিম ভারত ও হিন্দুদের মধ্যে ঐকমত্যের মাধ্যমে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ মীমাংসায় সহজে উপনীত হওয়া যাবে এবং এটা মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের অধিকার ও স্বার্থ অধিক কার্যকরভাবে এবং পর্যাপ্তভাবে রক্ষা করতে পারবে।
এটা বোঝা খুবই কঠিন যে, আমাদের হিন্দু ভাইয়েরা ইসলাম ও হিন্দুধর্মের আসল প্রকৃতি উপলব্ধি করতে পারছেন না। ধর্ম শব্দটির যথাযথ অর্থে ওগুলো আসলে কোন ধর্ম নয়, দুইটি ভিন্ন সমাজব্যবস্থা। হিন্দু ও মুসলমানরা একটা অভিন্ন জাতীয়তার জন্ম দিতে পারে এরকম চিন্তা একটা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। ভারতের একটি জাতির এই ভুল ধারণা সীমা ছাড়িয়ে গেছে এবং আপনাদের সকল দুঃখ-কষ্টের মূলেও আছে এটা। আমরা যদি যথাসময়ে আমাদের এই ধারণা পরিবর্তন না করি তাহলে ভারতকে তা ধ্বংসের পথেই নিয়ে যাবে। হিন্দু ও মুসলমানদের দু’টি ভিন্ন ধর্মীয় দর্শন, সামাজিক প্রথা ও সাহিত্য রয়েছে। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ হয় না। একত্রে খাওয়া দাওয়া চলে না। তারা আসলে দুইটি ভিন্ন সভ্যতার ধারক যেগুলো বিপরীতমুখী ধারণা ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে আছে। জীবন সম্পর্কে তাদের ধারণা এবং তাদের জীবনবৈশিষ্ট্যও ভিন্ন। এ কথা একেবারে স্পষ্ট যে হিন্দু ও মুসলমানরা ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন সূত্র থেকে তাদের অনুপ্রেরণা লাভ করে। তাদের মহাকাব্য ভিন্ন, তাদের বীরেরা ভিন্ন, তাদের গৌরবময় ঘটনা ভিন্ন। প্রায়ই দেখা যায় একের বীর অন্যের শত্রু। তাদের বিজয় ও পরাজয় বিপরীতমুখী। যদি এ ধরনের দুইটি জাতিকে একটি অখন্ড রাষ্ট্রে একীভূত করা হয়- একটিকে সংখ্যার দিক দিয়ে সংখ্যালঘু হিসেবে এবং অন্যদিকে সংখ্যাগুরু হিসেবে তাহলে অসন্তোষ বেড়েই চলবে এবং এ ধরনের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে ধরনের কাঠামোই গড়ে তোলা হোক সেটা ভেঙে পড়বে।
ইতিহাস আমাদের অনেক উদাহরণই জুগিয়েছে যেমনটা ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে ঘটেছে, চেকোশ্লোভাকিয়া ও পোল্যান্ডের মধ্যে হয়েছে। ইতিহাস আমাদের এটাও দেখিয়েছে যে ভারতীয় উপমহাদেশের চেয়ে কম এলাকা বিশিষ্ট অনেক ভৌগোলিক অঞ্চলের যেখানে একটা দেশ হওয়ার কথা ছিল সেখানে যত জাতি আছে তত জাতির জন্য অনেক রাষ্ট্রই গঠন করা হয়েছে। বলকান উপদ্বীপে ৭/৮টি স্বাধীন দেশ আছে। একইভাবে আইবেরিয়ান উপদ্বীপে পর্তুগিজ ও স্পেনীয়রা বিভক্ত হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের ঐক্যের অজুহাতে এবং এক জাতির ধুয়া তুলে (যেটার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই), এখানে একটি কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চলছে, অথচ আমরা জানি যে বিগত বারোশত বছরেরও অধিক সময়েও এখানে ঐক্য গড়ে ওঠেনি এবং যুগ যুগ ধরেই ভারত হিন্দু ভারত ও মুসলিম ভারত এই দুইভাগে বিভক্ত হয়ে আসছে। বর্তমানে ভারতের কৃত্রিম ঐক্য একমাত্র ব্রিটিশ বেয়নেটের জোরে ধরে রাখা হয়েছে। যেটা ব্রিটিশ সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণায় লুক্কায়িত আছে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সাথে সাথে তা পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে, আর এমন বিপর্যয় দেখা দেবে যেটা গত এক হাজার বছরের মুসলিম শাসনাধীনে কখনো ঘটেনি। বিপর্যয় দেখা দেবে যেটা গত এক হাজার বছরের মুসলিম শাসনাধীনে কখনো ঘটেনি। এটা এরূপ কোনো ব্যবস্থা না হোক যা ১৫০ বছরের শাসনের পর ব্রিটিশ আমাদের জন্য রেখে যাবে। ভারতের হিন্দু-মুসলিম কেউই এরূপ নিশ্চিত একটা বিপর্যয় ডেকে আনার ঝুঁকি নেবে না।
মুসলিম ভারত এমন কোনো শাসনতন্ত্র মেনে নেবে না যেখানে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাই প্রাধান্য পাবে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে হিন্দু ও মুসলমানদের এনে তা সংখ্যালঘুদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার অর্থ হলো হিন্দুরাজ প্রতিষ্ঠা। কংগ্রেস হাইকমান্ড যে ধরনের সমাজতন্ত্রের প্রতি অনুরক্ত সেটা ইসলামে যা মূল্যবান সবই ধ্বংস করে দেবে। গত আড়াই বছরে আমাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হয়েছে। এ ধরনের সরকারের পুনরাবৃত্তি ঘটলে এর ফল হবে গৃহযুদ্ধ এবং সুক্কুরে হিন্দুদের প্রতি মি. গান্ধী যা বলেছেন বেসরকারি সৈন্যদল গড়ে ওঠা। তিনি যখন বলেছেন তাদের আত্মরক্ষা করতে হবে সহিংসভাবে অথবা অহিংসভাবে- আঘাতের বদলে আঘাত; যদি তারা তা না পারে তবে তাদের অন্যত্র চলে যেতে হবে।
মুসলমানরা যে সংখ্যালঘু নয় সেটা সকলেই বুঝেন ও বলে থাকেন। চারিপাশে তাকালেই সেটা বুঝা যাবে। আজও ব্রিটিশদের তৈরি মানচিত্র অনুসারে ১১টি প্রদেশের মধ্যে ৪টি প্রদেশে যেখানে মুসলমানদের কমবেশি প্রাধান্য আছে সেখানে হিন্দু কংগ্রেস হাইকমান্ডের অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের প্রস্তুতির ডাক সত্ত্বেও স্বাভাবিক কাজ চলছে। কোনো জাতির যেকোনো সংজ্ঞায়ই মুসলমানরা একটি জাতি। তাদের অবশ্যই নিজস্ব আবাসভূমি দরকার। তাদের একটা ভূখন্ড, তাদের একটা রাষ্ট্র দরকার। আমরা একটা মুক্ত স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের প্রতিবেশীদের সাথে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে সাথে বসবাস করতে চাই। আমাদের আধ্যাত্মিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন আমরা পরিপূর্ণভাবে এবং আমরা যেটা সর্বোত্তম মনে করি সেই উপায়ে গড়ে তুলতে চাই, আর সেটা হবে আমাদের প্রতিভার আলোকে। সততার দাবি ও আমাদের লাখ লাখ মানুষের অতিগুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রক্ষার জন্য আমাদের ওপর ‘পবিত্র দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে’ যেটা হলো একটি সম্মানজনক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান উদ্ভাবন করা যেটা হবে সকলের কাছে সঠিক ও ন্যায় সম্মত। তবে ভয় দেখিয়ে আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে কেউ বিচ্যুত করতে পারবে না। সকল ধরনের বাধাবিপত্তি ও ফলাফল মোকাবিলা করার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। আমাদের সামনে আমরা যে লক্ষ্য রেখেছি সেটা অর্জনে যে কোন ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন হলে সেজন্যও আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহিলাবৃন্দ, আমাদের সম্মুখে এখন এটাই কাজ। আমার মনে হয় আমার জন্য নির্ধারিত সময়ের বেশি সময় আমি কথা বলেছি। অনেক ব্যাপারই রয়েছে যেটা আমার ইচ্ছে হচ্ছে আপনাদের জানাই। তবে যেসব বিষয় আমি বলেছি সেগুলোর অধিকাংশ উল্লেখ করেই আমি একটি ক্ষুদ্র প্রচার পুস্তিকা ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছি। আমার মনে হয় মুসলিম লীগ অফিস থেকে সহজেই আপনারা তা সংগ্রহ করতে পারবেন। সেটা উর্দু ও ইংরেজি দুটি ভাষায়ই আছে। ওটা থেকে আমাদের লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবেন। এতে মুসলিম লীগের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবই আছে, তাছাড়া আছে বেশ কিছু বিবৃতি। যাই হোক, আমাদের সামনে যে কাজ রয়েছে সেটাই আপনাদের কাছে তুলে ধরলাম। আপনারা কি বুঝতে পারছেন সেটা কত বড় ও কষ্টসাধ্য? আপনারা কি বুঝতে পারছেন, কেবল যুক্তিতর্ক দিয়ে আমাদের মুক্তি বা স্বাধীনতা অর্জন করা যাবে না? আমি বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সকল দেশের বুদ্ধিজীবীরাই যেকোন স্বাধীনতা আন্দোলনের পথিকৃৎ। মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা কি করতে চান? আমি আপনাদের বলছি যদি না আপনারা আপনাদের রক্তের মধ্যে এই ব্যাপারটা প্রবেশ না করান, যদি না আপনারা আপনাদের কোট খুলতে প্রস্তুত থাকেন, আর আপনাদের সবকিছু ত্যাগ করে, নিঃস্বার্থভাবে, মনপ্রাণ দিয়ে ও আন্তরিকতার সাথে আপনাদের মানুষের জন্য কাজ করতে না পারেন তাহলে আপনারা আপনাদের লক্ষ্য বুঝতে পারবেন না। বন্ধুগণ, তাই আমি চাই আপনারা নির্দিষ্টভাবে আপনাদের মনস্থির করুন, তারপর কৌশলের কথা চিন্তা করুন, আপনাদের মানুষদের সংগঠিত করুন, আপনাদের সংগঠনকে শক্তিশালী করুন এবং সারা ভারতের মুসলমানদের সংহত করুন। আমি মনে করি সাধারণ মানুষ সদাজাগ্রত। তারা শুধু আপনাদের নির্দেশনা ও নেতৃত্ব চায়। ইসলামের সেবক হিসেবে এগিয়ে আসুন, মানুষকে সংগঠিত করুন অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, শিক্ষা-দীক্ষার দিক দিয়ে এবং রাজনৈতিকভাবে। আমি নিশ্চিত যে আপনারা একটা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবেন আর সকলে সেটা মেনে নিবে।
““It is extremely difficult why our Hindu friends fail to understand the real nature of Islam and Hinduism. They are not religious in strict sense of the word, but are, in fact, different and distinct social orders. It is a dream that the Hindus and Muslims can ever evolove a common nationality, and this misconception of one Indian nation has gone far beyond the limits, and will lead India to destruction, if we fail to revise our nations in time, The Hindus and Muslims belong to two different religions philosophics, social customs and literature. They neither intermarry nor interdine together, and indeed they belong to two different civilizations, which are based mainly on confilictine ideas and conceptions. Their aspect on life and of life are different. It is quite clear that Hindus and Mussalmans derive their aspirations from defferent sources of history. They have different epics, their heroes are different and they have different episodes. Very often the hero of one is a foe of the other and like wise their victories and defeats overlap. To yoke together two such nations under a singh state, one as a numerical minority and the other as a majority, must lead to growing discontent and the final destruction of any fabric that may be built up for the government of such a state.” –(Ideological Foundation of Pakistan by Dr. Waheed Quraishy, pp. 96-97)|
জিন্নাহর বক্তৃতার পর ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। উত্থাপন করেন তদানীন্তন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। প্রস্তাবের সমর্থন উত্থাপন করেন যুক্ত প্রদেশের চৌধুরী খালিকুজ্জামান। তারপর একে একে সমর্থন জানান ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মুসলিম নেতৃবৃন্দ। উপস্থিত জনসমুদ্র গগনবিদারী “আল্লাহু আকবার” আওয়াজ তোলে সমর্থন জানান যুগান্তকারী এই প্রস্তাবের পক্ষে।
পাকিস্তান প্রস্তাবকে অনেক কংগ্রেস নেতা মেনে নিতে পারেননি। অনেকে বললেন, ‘উন্মাদ ভিন্ন আর কেউ এতে বিশ্বাস করতে পারে না’ নেহেরু এটাকে কাল্পনিক আখ্যায়িত করে বললেন, ‘এ হলো সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের বিড়ালের থাবার মতো।’ গান্ধী বললেন, ‘মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাব আমাকে হতবুদ্ধি করেছে।’ তিনি আরও বললেন, ‘ভারতের অঙ্গচ্ছেদ করার পূর্বে আমার অঙ্গচ্ছেদ কর।’ (মহাত্মা গান্ধী, ৫১ খন্ড পৃ: ৩৮৭, কায়েদে আযম, আকবর উদ্দীন পৃ: ৫২৪)
সম্মুখ পক্ষে মুসলিম লীগকে কাবু করতে না পেরে কংগ্রেস মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও মুসলিম লীগে ভাঙন সৃষ্টির হীন পথ অনুসরণ করে। এ কাজে তারা ব্যবহার করে কংগ্রেসি মুসলমানদের। কংগ্রেস সভাপতি মাওলানা আজাদকে দিয়ে মুসলিম লীগ নেতাদের দল থেকে ভাগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। (Path way to Pakistan, page: 325)
কিন্তু এতদসত্ত্বেও কংগ্রেস মুসলিম জনমতের ওপর কোন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। বরং যেসব কংগ্রেসি মুসলমান এসব কাজে অংশ নেন তারা মুসলিম মহলে নিন্দিত হন।
এ সময় জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থানকারী একে ফজলুল হকের সঙ্গে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। এর সূত্রপাত ঘটে ‘সমর পরিষদ’কে কেন্দ্র করে। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বড়লাট লর্ড লিননিথগো বৃটেনের পক্ষে ভারতের যুদ্ধে যোগদানের কথা ঘোষণা করেন। ভারত সরকারের যুদ্ধনীতির বিষয়ে মুসলিম লীগ নিরপেক্ষ থাকার নীতি গ্রহণ করে। জিন্নাহ ঘোষণা করেন, মুসলিম লীগের দাবির যৌক্তিকতা অস্বীকার করলে ব্রিটিশ সরকারের ‘সমর পরিষদে’ মুসলিম লীগ যোগ দিবে না। জিন্নাহ সমর পরিষদ গঠনের প্রতিবাদ করে এই পরিষদ ত্যাগ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন। ফজলুল হক জিন্নাহর নির্দেশ মানতে রাজি হননি। হক সাহেবের এ আচরণের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ ১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করে। এ আচরণ হক সাহেবের আত্মসম্মানে প্রচন্ড আঘাত করে এবং তিনি জিন্নাহর বিরুদ্ধে স্বেচ্চাচারিতার অভিযোগ এনে সমর পরিষদ, লিগ কমিটি ও লিগ পরিষদ থেকে পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন। লীগ কমিটি হক সাহেবের এ অভিযোগ আপত্তিজনক বর্ণনা করে তাকে দশ দিনের মধ্যে অভিযোগ প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। এ সময় থেকে মুসলিম লীগের সাথে হক সাহেবের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ১৯৪১ সালের ১৮ নভেম্বর ফজলুল হক ‘প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন’ পার্টি গঠন করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিন্নাহ এবং ফজলুল হকের এ দ্বন্দ্ব মুসলমানদের রাজনীতির ঐক্যে এক বড় ধরনের আঘাত।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply