বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস -মতিউর রহমান আকন্দ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ভারত বিভক্তি নিয়ে বিতর্ক

ঐতিহাসিকভাবে বলা যায় ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব নয় ১৯৪৬ সালের দিল্লি প্রস্তাব মোতাবেক ভারত খন্ডিত হয়ে একটি পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম হয়। ১৯৪৭ সালের ২৭ জুন বঙ্গীয় মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি ঢাকাকে পূর্ববঙ্গের রাজধানী করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালের ৫ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে খাজা নাজিমুদ্দীন ৭৫-৩৯ ভোটে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পরাজিত করে পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা নির্বাচিত হন। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও অবিভক্ত বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। ফলে পূর্ব পাকিস্তান রাজনীতিতে নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি অত্যন্ত বিতর্কিত একটি ঘটনা এবং এ বিভক্তি এখনো উপমহাদেশে উত্তেজনা জিইয়ে রাখছে। দু’টি দেশের সীমান্ত নির্ধারিত হওয়ার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। ভারত বিভাগের পরিকল্পনাটি ভাইসরয়ের শাসনতান্ত্রিক উপদেষ্টা ভি.পি. মেনন মাত্র চার ঘণ্টায় রচনা করেন এবং ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা মাত্র পাঁচ মিনিটের সংক্ষিপ্ত বৈঠকে তা অনুমোদন করেন। সীমান্ত নির্ধারণের জন্য স্যার সিরিল রেড ক্লিফকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তাকে সীমান্ত চিহ্নিত করার জন্য মাত্র ৫ সপ্তাহ সময় দেয়া হয়। যেখানে কয়েক বছর সময়ের প্রয়োজন ছিল, রেড ক্লিফ মাত্র ৫ সপ্তাহের মধ্যে সেই কাজ সমাপ্ত করেন। রেড ক্লিফের সীমান্ত নির্ধারণে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের অংশে রাখা হয়। এটা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন নেহেরু। তিনি বলেন, এ রায় তিনি মানেন না। তিনি আরো বলেন, প্রয়োজন হলে জোর করে এলাকা ছিনিয়ে নেয়া হবে। কিন্তু অবশেষে এ এলাকা পাকিস্তানকেই দেয়া হয়। এমন পরিকল্পিতভাবে ভারত ভাগ হলো যে, পাকিস্তান হলো খন্ডিত এবং ভারত সর্বাধিক সম্ভব ভূ-খন্ড লাভ করলো। পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে শিল্প কলকারখানা কিছুই পড়লো না। তা দেখে ভারত নেতৃবৃন্দ খুবই খুশি হলেন এই কারণে যে কয়েক মাসের মধ্যেই পাকিস্তান আর্থিক সঙ্কটে পড়বে এবং তা ধ্বংস হয়ে যাবে। ভারত বিভক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হলো বিপর্যয়, বিশৃঙ্খলা ও চরম আর্থিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে। খন্ডিত এ পাকিস্তান দুর্বল হবে এবং শিগগিরই তা ভেঙে পড়বে তার ফলে সমগ্র ভারতকে আবার কব্জায় আনা সম্ভব হবে- এটা ছিল কংগ্রেসের দৃঢ় ধারণা। এ আশা জওহরলাল নেহেরুও ব্যক্ত করেন। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন মাউন্টব্যাটেনের বক্তৃতার পর নেহেরু যে বেতার বক্তৃতা দেন তাতে তিনি বলেন, ‘হয়তো এ পন্থাতেই অদূর ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধ ভারত প্রতিষ্ঠিত হবে।’ বস্তুত কংগ্রেসের কাছে ভারত বিভাগ মূল বিষয় ছিল না, তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র ভারতকে কব্জায় আনা। (Transfer of power in India- V.P. Menon)আজও তাদের এ মনোভাবের পরিবর্তন হয়নি।
ভারত বিভক্তির পর অব্যাহত গতিতে দাঙ্গা চলতে থাকে। দাঙ্গা কলহ ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত হানে। এ পরিস্থিতিতে উভয় দেশের নেতৃবৃন্দ আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৫০ সালে ২ এপ্রিল দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। উভয়ের মধ্যে বৈঠক ৬ দিন স্থায়ী হয়। ৮ এপ্রিল দুই প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষ্যে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এ চুক্তি ‘লিয়াকত-নেহরু প্যাক্ট’ হিসেবে পরিচিত।
শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ছিল ভারত ও পাকিস্তানের নয়া সরকারের। বিপুলসংখ্যক লোক উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে এমন চিন্তা কেউ করেননি। ভারত বিভক্তির পরিকল্পনায় নয়া সীমান্ত রেখার উভয় পাশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করা ছিল একটি অসম্ভব কাজ এবং উভয় সরকার সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়। আইন-শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। বহু লোক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, নৃশংসতা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে যাওয়ার সময় ক্লান্তিতে মৃত্যুবরণ করে। এসব ঘটনায় বৃহত্তম মানবিক বিপর্যয় ঘটে। ঐতিহাসিক রিচার্ড সাইমন্ডসের ভাষায়, ‘সর্বনি¤œ হিসেবে পাঁচ লাখ লোক নিহত এবং আরো ১ কোটি ২০ লাখ লোক গৃহহীন হয়ে পড়ে।’
ভারত বিভক্তির আগে বহুবার আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল। তাতে হিন্দু ও মুসলমান উভয় পক্ষে বহু লোক নিহত হয়। ভাইসরয় হিসেবে মাউন্টব্যাটেনের নিযুক্তির সময় একটি ব্যাপক গৃহযুদ্ধ আসন্ন বলে মনে হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনের সম্পদ সীমিত হয়ে পড়ে। ভারতের মতো একটি বিশাল উপনিবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার মতো অবস্থা তাদের ছিল না। মাউন্টব্যাটেনের হাতে সময় খুব সংক্ষিপ্ত থাকায় ভারত বিভক্ত করা ছাড়া তার সামনে আর কোনো উত্তম বিকল্প ছিল না এবং একটি কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি সর্বোত্তম সাফল্য অর্জন করেছেন। ঐতিহাসিক লরেন্স জেমস যথার্থই বলেছেন যে, ‘১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত করে দ্রুত প্রস্থান করা ছাড়া মাউন্টব্যাটেনের আর কোনো উপায় ছিল না। সম্ভাব্য বিকল্প ছিল একটি গৃহযুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়া যেখান থেকে বেরিয়ে আসা হতো দুরূহ।’
ইংল্যান্ডের রক্ষণশীলরা মনে করে, যে মুহূর্তে ভারত বিভক্ত হয়ে যায় ঠিক তখন থেকে একটি বিশ্বশক্তি হিসেবে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। লর্ড কার্জন বলতেন, ‘যতক্ষণ আমরা ভারত ধরে রাখবো ততদিন আমরা একটি প্রথম শ্রেণীর বিশ্বশক্তি হিসেবে বহাল থাকবো। ভারত ছেড়ে দিলে আমরা তৃতীয় শ্রেণীর একটি শক্তিতে পরিণত হবো।’ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলির ভারতকে স্বাধীনতা প্রদানের আইনে স্বাক্ষর দানের সময়টি ছিল ব্রিটেনের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তার এ স্বাক্ষর দানের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশদের শুধু ভারত খোয়াতে হয় তাই নয়, বিশ্বশক্তি হিসেবে ব্রিটেনের মর্যাদাও শেষ হয়ে যায়।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম জীবনে ছিলেন কংগ্রেসী। তিনি কখনো উপমহাদেশ বিভক্তি চাননি। ব্যক্তিগতভাবে তার পক্ষে উপমহাদেশ বিভক্তি কাম্য ছিল না। তার জন্ম হয়েছিল ভারতের বোম্বাইয়ে। বোম্বাইয়ের মালাবার হিলসে ছিল তার বসতবাড়ি। জন্মভূমি হওয়ায় এ শহরের প্রতি ছিল তার অন্তরের গভীর দুর্বলতা। অবিভক্ত ভারতে মুসলমানদের অধিকারের সাংবিধানিক গ্যারান্টি অর্জনের চাপ হিসেবে তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেছিলেন। কংগ্রেস তাকে বাধ্য করায় তিনি উপমহাদেশ বিভক্তি মেনে নেন। ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা যশোবন্ত সিং স্বীকার করেছেন যে, ভারত বিভক্তির জন্য জিন্নাহ নন, নেহেরু দায়ী। তিনি জিন্নাহকে একজন মহান ভারতীয় জাতীয়তাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, `Pakistan’s founder Mohammad Ali Jinnah was demonised by India even though it was Jawaharlal Nehur whose belief in a centralised system had led to the Partition.
অর্থাৎ ‘সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি নেহেরুর বিশ্বাসের পটভূমিতে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হলেও ভারত পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে খলনায়ক বানিয়েছিল।’ তিনি আরো বলেছেন, The Indian Muslims have paid the price of Partition. India treats them as aliensঅর্থাৎ ‘ভারতীয় মুসলমানদের বিভক্তির চড়া মাসুল দিতে হয়েছে। ভারতে তাদেরকে বিদেশী হিসেবে জ্ঞান করা হয়।’ যশোবন্ত সিংয়ের মতো ভারতীয় ঐতিহাসিক এইচ এম সিরবাই তার ‘পার্টিশন অব ইন্ডিয়া : লিজেন্ড অ্যান্ড রিয়্যালিটি’ নামে বইয়ে ভারত বিভক্তির জন্য কংগ্রেস ও নেহেরুকে দায়ী করেন। গান্ধীর নাতি রাজমোহন গান্ধীও ভারত বিভক্তিতে জিন্নাহর কোনো দোষ খুঁজে পাননি। জিন্নাহর প্রতি গভীর অনুসন্ধিৎসা থেকে তিনি তার জীবনী নিয়ে একটি বই লিখেছেন। বইটিতে তিনি রাজনীতিতে ধর্মকে সম্পৃক্ত এবং মুসলমানদের ক্ষমতার অংশীদারিত্ব প্রদানে অস্বীকৃতি জানানোর জন্য তার দাদা মোহনসাদ করমচাঁদ গান্ধীর সমালোচনা করেছেন।
কবি আল্লামা ইকবাল শুরুতেই পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেননি। ভারতকে তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন। এ ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছিল তার একটি কবিতায়। কংগ্রেসের মঞ্চে তিনি তার সে কবিতা পাঠ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘সারা জাঁহা সে আচ্ছা, হিন্দুস্তাঁ হামারা, হাম উসকে বুলবুলি হে, ও গুলিস্তাঁ হামারা’। তিনি সারা পৃথিবীতে ভারতকে শ্রেষ্ঠতম দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। হিন্দুরা তাকে উপহাস করে বলতে লাগলো, ভারত মুসলমানদের দেশ নয়। আরব হলো মুসলমানদের ঠিকানা। হিন্দুদের উক্তিতে কবি ইকবাল ভীষণ ব্যথিত হন। কবি ইকবাল তার রচিত গানে বলেন, ‘চীন ও আরব হামারা, হিন্দুস্তাঁ হামারা, তৌহিদ কী আমানত সিনু মে হে হামারা’। তিনি তার এ কবিতার মাধ্যমে হিন্দুদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, শুধু হিন্দুস্তান নয়, আরব ও চীনসহ সারা দুনিয়া মুসলমানদের দেশ। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্র প্রণেতা মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহরও ছিলেন অখন্ড ভারতে বিশ্বাসী। তিনি ছিলেন সংগ্রেসী। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস মুসলিম স্বার্থের বিরোধিতা না করলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, কবি ইকবাল ও মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতেন কিনা সন্দেহ। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী ভারতের অখন্ডত্ব বা বিভক্তির ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেন। এ কারণে অনেকেই মাওলানা মওদূদীকে পাকিস্তানবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেন। মাওলানা মওদূদী তার জবাবে বলেন, ‘মুসলমান হিসেবে আমার কাছে এ প্রশ্নের কোনই গুরুত্ব নেই যে, ভারত অখন্ড থাকবে না দশ খন্ডে বিভক্ত হবে। সমগ্র পৃথিবী এক দেশ। মানুষ তাকে সহ¯্র খন্ডে বিভক্ত করেছে। আজ পর্যন্ত পৃথিবী যত খন্ডে বিভক্ত হয়েছে তা যদি ন্যায়সঙ্গত হয়ে থাকে, তাহলে আরও কিছু খন্ডে বিভক্ত হলেই বা ক্ষতিটা কী? এ দেব প্রতিম খন্ড বিখন্ড হলে মনঃকষ্ট হয় তাদের যারা একে দেবতা মনে করে। আমি যদি এখানে এক বর্গমাইলও এমন জায়গা পাই যেখানে মানুষের উপর আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো প্রভুত্ব কর্তৃত্ব থাকবে না, তাহলে এ সামান্য ভূ-খন্ডকে আমি সমগ্র ভারত থেকে অধিকতর মূল্যবান মনে করবো। (সিয়াসী কাশ্মাকাশ্Ñ ৩য় খন্ড)
অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করছেন যে, ১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার ভারত বিভক্তির জন্য দায়ী। এ সংস্কার বাস্তবায়িত হওয়ায় ভারত শাসনে ভারতীয়দের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায় এবং তাদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের চেতনা জাগ্রত হয়। মর্লি-মিন্টো সংস্কারে ধর্মীয় গ্রুপগুলোর জন্য পৃথক নির্বাচনের অধিকার স্বীকার করে নেয়ায় ভারতীয়দের মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, তাদের সমাজব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় এবং প্রতিটি ধর্মীয় গ্রুপ একে অন্য থেকে পৃথক। ধর্মীয় বিভাজন ঘটায় সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং পাকিস্তান আন্দোলনের জন্ম হয়। রাজনীতিবিদরা জনসমর্থন আদায়ে ধর্মীয় ভাবাবেগকে কাজে লাগাতে থাকেন। ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন এবং পরবর্তীকালে ১৯৪৫-৪৬ সালের প্রাদেশিক ও গণপরিষদ নির্বাচনে বিজয় লাভে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়ে ধর্মীয় ভাবাবেগে তাড়িত হয়। এ ধর্মীয় বিভক্তি ভারত বিভক্তিকে অনিবার্য করে তোলে।

পাকিস্তানের মৌলিক দুর্বলতা ও
রাজনৈতিক সঙ্কট

বহুবিধ অসামঞ্জস্যতা নিয়ে সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রথম থেকেই নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে থাকে। প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তান স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ২৪ বছর। বিশ্বে আর কোনো রাষ্ট্রের এত দ্রুত পতন ঘটার নজির নেই। গোটা উপমহাদেশের রক্তক্ষরণের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল সে রাষ্ট্র কেন ভেঙে গেল তার জবাব খুঁজে বের করা উচিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞায় রাষ্ট্রকে একটি স্থায়ী ও অবিভাজ্য সত্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বর্ণিত সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞাই যেন পাল্টে যাচ্ছে। এ বিস্ময়কর ঘটনা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য একটি গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দেশটির অগ্রপশ্চাৎ নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন। সঠিক প্রেক্ষিতে আলোচনা করলে যথার্থ জবাব খুঁজে পাওয়া যাবে। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের জনগণ ছিল ইতিহাসের এক বিরল প্রজন্ম। এ প্রজন্ম প্রথম জীবনে ছিল ব্রিটিশ ভারতের অধিবাসী। পরবর্তী জীবনে পাকিস্তানের এবং আরো পরে স্বাধীন বাংলাদেশের অধিবাসী। এক জীবনে তিনটি রাষ্ট্রে বসবাসকারী কোনো মানুষের সন্ধান পাওয়া ভার হলেও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এ ধরনের একটি বিরাট প্রজন্ম ছিল। এ প্রজন্মের দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে পাকিস্তানের ভাঙা গড়া নিয়ে আলোচনা ও তার শিকড় অনুসন্ধান একান্ত প্রয়োজন।
পাকিস্তানির শাসকগোষ্ঠীর অদূরদর্শীর রাজনৈতিক ভূমিকা ও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করায় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঞ্চনার প্রতিশোধ হিসেবে তাদের ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে এককভাবে বিজয় লাভ করে। পাকিস্তানের তদানীন্তন নেতৃবৃন্দ জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হওয়ায় শুরু হয় রাজনৈতিক সঙ্কট। এ সঙ্কট ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায় সামরিক অভিযানের সূচনা করে। পাকিস্তান ভাঙনের জন্য ১৯৭০ সালের নির্বাচন কিংবা ২৫ মার্চ ঢাকায় ক্রাকডাউন নয়, তার কারণ অন্য কোথাও এবং সেগুলোর উৎস আরো গভীরে বলে অনেক ঐতিহাসিক মত দিয়েছেন। পন্ডিত, গবেষক, লেখক ও বিশ্লেষকগণ পাকিস্তানের মৌলিক দুর্বলতা হিসেবে যেসব উপাদান চিহ্নিত করেছেন সেগুলো হচ্ছে পাকিস্তান ভেঙে যাবার প্রকৃত কারণ। ঐ কারণসমূহ ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পরিণত হয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়।

ভৌগোলিক ব্যবধান

ভৌগোলিক ব্যবধান না থাকলে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য ও ভুল বুঝাবুঝি স্থায়ী হতো কিনা সন্দেহ। পাকিস্তানের আত্মপ্রকাশ ঘটার আগেই দেশটির স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল। এ উদ্বেগ থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতের মধ্য দিয়ে করিডোর দাবি করেন। ভারতের মধ্য দিয়ে জিন্নাহর করিডোর দাবি প্রসঙ্গে জন কী তার ইন্ডিয়া অ্যা হিস্ট্রি নামে বইয়ের ৫০৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “ঞযব ঃৎধমবফু রহ ঔরহহধয’ং বুবং ষধু রহ ঃযব ঢ়ধৎঃরঃরড়হ ড়ভ ইবহমধষ ধহফ চঁহলধন. ঞড় পড়হহবপঃ ঃযবংব ঃড়ি ঢ়ৎড়ারহপবং যব যধফ ড়হপব ধৎমঁবফ ভড়ৎ ধ পড়ৎৎরফড়ৎ ৎঁহহরহম ৎরমযঃ ঃযৎড়ঁময টচ ধহফ ইরযধৎ. ঋধরষরহম ঃযধঃ, যব যধফ রহংরংঃবফ ঃযধঃ ইবহমধষ ধহফ চঁহলধন সঁংঃ নব ঃৎধহংভবৎৎবফ ঃড় চধশরংঃধহ রহ ঃযবরৎ বহঃরৎবষু. ওহ ঃযব ভরহধষ হবমড়ঃরধঃরড়হং যব ংঃরষষ পড়ঁষফ হড়ঃ নৎরহম যরসংবষভ ঃড় ধপপবঢ়ঃ রঃ. অঃ ঃযব পৎঁপরধষ সববঃরহম, ঁহধনষব ঃড় ংধু ুবং, যব যধফ লঁংঃ রহপষরহবফ যরং যবধফ. ওঃ ধিং ঃধশবহ ঃড় নব ধ হড়ফ ড়ভ ধংংবহঃ”. অর্থাৎ বাংলা ও পাঞ্জাব বিভক্তি ছিল জিন্নাহর জন্য একটি ট্র্যাজেডি। এ দু’টি প্রদেশের মধ্যে সংযোগ সাধনে তিনি উত্তর প্রদেশ ও বিহারের মধ্য দিয়ে করিডোর দাবি করেন। করিডোর আদায় করতে না পেরে তিনি বাংলা ও পাঞ্জাবকে পুরোপুরিভাবে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করার দাবি জানান। চূড়ান্ত আলোচনায় তিনি বাংলা ও পাঞ্জাব বিভক্তি মেনে নিতে পারেননি। একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি হ্যাঁ বলতে অক্ষম হওয়ায় কেবল মাত্র মাথা নাড়েন। মাথা নাড়ানোকে তার সম্মতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জিন্নাহর দাবি অগ্রাহ্য হওয়ায় নবগঠিত দু’টি রাষ্ট্র জন্মমাত্র এমন এক নাজুক ভৌগোলিক বাস্তবতা নিয়ে যাত্রা করে যেখানে একে অন্যকে একটি প্রত্যক্ষ হুমকি হিসেবে দেখতে পায়। ১২ লাখ ৬৯ হাজার বর্গমাইল আয়তনের ভারত ছিল পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ হুমকি মোকাবিলায় দেশটি ভারতবিরোধী নাগা, মিজো ও নকশালবাদীদের মদদ দিয়ে ভারতকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। অন্য দিকে ভারতও পাকিস্তানের সংহতিবিরোধী শক্তিগুলোকে মদদ দিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছে। পাকিস্তানের আয়তন ৩ লাখ ৬৫ হাজার বর্গমাইল হলেও দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ছিল ভারতের দু’দিকে। পাকিস্তানের অবস্থান দু’দিকে হওয়ায় ভারতকে দুটি ফ্রন্টের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। দু’টি ফ্রন্টে সামরিক শক্তি মোতায়েন করতে গিয়ে দেশটির হিমশিম খাওয়ার অবস্থা হয়। এ অবস্থা ভারতের জন্য কাম্য ছিল না।
পাকিস্তানের দুটি অংশের মধ্যে ব্যবধান ছিল স্থলপথে অন্তত এক হাজার এবং জলপথে আড়াই হাজার মাইল। পাকিস্তানের এ নাজুক ভৌগোলিক অবস্থান দেশে সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিন মন্তব্য করেছিলেন, ‘ঝঁপয ধ ংঃধঃব পধহহড়ঃ ংঁৎারাব ভড়ৎ ষড়হম.’ অর্থাৎ এ ধরনের একটি রাষ্ট্র বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না। ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেস ভারত বিভক্তিতে রাজি হলেও পাকিস্তানের দুটি অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে পৃথক হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে শুরুতেই উদ্বেগ দেখা দেয়। হিন্দুপ্রধান ভারতের সঙ্গে দা-কুমড়া সম্পর্ক এবং ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ছিল পাকিস্তানের মৌলিক দুর্বলতা। এ দুর্বলতা নিয়ে পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হয়। ভারত আয়তন ও লোকসংখ্যায় পাকিস্তানের চেয়ে দুর্বল অথবা ছোট হলে দুশ্চিন্তা ছিল না। কিন্তু দেশটি ছিল পাকিস্তানের চেয়ে পাঁচগুণ শক্তিশালী। ভারত কখনো পাকিস্তান সৃষ্টি মেনে নেয়নি। উপমহাদেশ বিভক্তির সময় হিন্দু নেতৃবৃন্দ একটির পর একটি বিবৃতি দিয়ে বলতেন যে, এ বিভক্তি সাময়িক এবং পাকিস্তান আবার ভারতে ফিরে আসবে। দ্বিজাতি তত্ত্বকে তারা ঘৃণা করতেন। পাকিস্তানের অস্তিত্ব ছিল তাদের কাছে অসহ্য। নেহরু ভারত বিভক্তিতে বিশ্বাস করতেন না। তবে সাময়িকভাবে তিনি বিভক্ত মেনে নেন। কুমিল্লার কংগ্রেস নেতা আশরাফউদ্দিনের কাছে চিঠি তার প্রমাণ। ১৯৪৭ সালের ২৩ মে প্রেরিত চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, শিগগির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কৌশল হিসেবে সাময়িকভাবে তিনি ভারত বিভক্তি মেনে নিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারত আবার ঐক্যবদ্ধ হবে। তিনি তার এ বিশ্বাসের কথা ডিসকভারি অব ইন্ডিয়াতে উল্লেখ করেছেন। তার এ বিশ্বাস ‘নেহেরু মতবাদ বা নেহেরু ডকট্রিন’ নামে পরিচিত। ভারত বিভক্তির অব্যবহিত আগে নেহেরু মন্তব্য করেছিলেন, “ওভ ওহফরধ রং ংঢ়ষরঃ ঁঢ় ঃড়ি ড়ৎ সড়ৎব ঢ়ধৎঃং ধহফ পধহ হড় ষড়হমবৎ ভঁহপঃরড়হ ধং ধ ঢ়ড়ষরঃরপধষ ধহফ বপড়হড়সরপ ঁহরঃ, যবৎ ঢ়ৎড়মৎবংং রিষষ নব ংবৎরড়ঁংষু ধভভবপঃবফ নঁঃ সঁপয ড়িৎংব রিষষ নব ঃযব রহহবৎ ঢ়ংুপযড়ষড়মরপধষ পড়হভষরপঃ নবঃবিবহ ঃযড়ংব যিড় রিংয ঃড় ৎবঁহরঃব যবৎ ধহফ ঃযড়ংব যিড় ড়ঢ়ঢ়ড়ংব ঃযরং. ঞযঁং বি ধৎৎরাব ধঃ ঃযব রহবারঃধনষব ধহফ রহবষঁপঃধনষব পড়হপষঁংরড়হ ঃযধঃ যিবঃযবৎ চধশরংঃধহ পড়সবং ড়ৎ হড়ঃ, ধ হঁসনবৎ ড়ভ রসঢ়ড়ৎঃধহঃ ধহফ নধংরপ ভঁহপঃরড়হং ড়ভ ঃযব ংঃধঃব সঁংঃ নব বীবৎপরংবফ ড়হ ধহ ধষষ- ওহফরধ নধংরং রভ ওহফরধ রং ঃড় ংঁৎারাব ধং ধ ভৎবব ংঃধঃব ধহফ ঢ়ৎড়মৎবংং. অর্থাৎ ভারত দুই কিংবা ততোধিক খন্ডে বিভক্ত হলে এবং একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইউনিট হিসেবে অস্তিত্ব বজায় রাখতে অক্ষম হলে তার (বাদ বাকি ভারতের) অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভারতকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করতে আগ্রহীদের সঙ্গে ঐক্যের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে আন্তঃমনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব হবে ভয়াবহ। অতএব আমরা এ অবশ্যম্ভাবী ও অখন্ডনীয় সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছি যে, পাকিস্তানের জন্ম হোক না হোক, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকে টিকে থাকতে হলে অবশ্যই সর্বভারতীয় ভিত্তিতে রাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক কার্যাবলি প্রয়োগ করতে হবে। এই হলো নেহেরু মতবাদ। ভারতের কোন সরকার কখনো প্রকাশ্যে নেহেরু মতবাদ প্রয়োগ করার কথা উচ্চারণ করেনি। এ মতবাদ তাদের ঘোষিত ছিল না। আবার অঘোষিতও ছিল না। নেহেরুর কন্যা গান্ধীর একটি উক্তি তার প্রমাণ। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা ১৯৭০ সালের ৩০ নভেম্বর বলেছিলেন। ‘ওহফরধ হবাবৎ ৎবপড়হপরষবফ রিঃয ঃযব বীরংঃবহপব ড়ভ চধশরংঃধহ. ওহফরধহ ষবধফবৎ’ং ধষয়ধুং নবষরবাবফ ঃযধঃ চধশরংঃধহ ংযড়ঁষফ হড়ঃ যধাব নববহ পৎবধঃবফ ধহফ ঃযধঃ চধশরংঃধহ যধং হড় ৎরমযঃ ঃড় বীরংঃ. অর্থাৎ ভারত কখনো পাকিস্তানের অস্তিত্ব নিয়ে তুষ্ট ছিল না। ভারতীয় নেতৃবৃন্দ বরাবরই বিশ্বাস করতেন যে, পাকিস্তান সৃষ্টি করা উচিত হয়নি। অতএব পাকিস্তানের টিকে থাকার কোন অধিকার নেই। (সূত্র : ইন্ডিয়া’স নিউক্লিয়ার ডকট্রিন, উইং কমান্ডার অব: মোহাম্মদ ইরশাদ, ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে ডিফেন্স জার্নালে প্রকাশিত)।
উপমহাদেশ বিভক্তির সময় কংগ্রেসকে ব্রিটিশ ও মুসলিম লীগের সঙ্গে দুটি ফ্রন্টে লড়াই করতে হয়েছে। তাই তারা আপাতত মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবি মেনে নিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে মনোনিবেশ করে। তবে তখনি মনে হয়েছিল যে, ব্রিটিশদের বিতাড়িত করার পর তারা দ্বিতীয় শত্রু পাকিস্তানের মোকাবেলায় নামবে। তার এ হিসেবের ব্যতিক্রম করেনি।
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝ বরাবর বৈরী বৃহৎ শক্তি ভারতের অবস্থান ছিল যেমন একটি হুমকি তেমনি পূর্ব পাকিস্তান ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের দুটি মুসলিম অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ছিল আরেকটি হুমকি। একটি মুসলিম অঞ্চল মরক্কো থেকে এবং পাকিস্তান সীমান্ত এবং আরোকটি মুসলিম অঞ্চল মালয়েশিয়া থেকে ব্রুনেই পর্যন্ত প্রসারিত। এ দুটি মুসলিম অঞ্চলের আশপাশে কোন না কোন মুসলিম দেশ রয়েছে। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের আশপাশে অমুসলিম ভারত ও বার্মা ছাড়া আর কেউ ছিল না। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলটি যেন ছিল ইউরোপে মুসলিম শাসনাধীন স্পেনের মতো। পূর্ব পাকিস্তানের তিন দিকে ছিল ভারত। প্রতিবেশী বৃহৎশক্তি ভারতের সঙ্গে শত্রুতা ছিল পাকিস্তানের স্থায়িত্বের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ১৯৫৩ সালে টু ন্যাশন্স অ্যান্ড কাশ্মির’ গ্রন্থের প্রণেতা লর্ড বার্ডউড পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দকে লক্ষ্য করে মন্তব্য করেছিলেন, “ঝড়ষাব ঃযব ঢ়ৎড়নষবস ড়ভ ওহফড়-চধশ ৎবষধঃরড়হংযরঢ় ধহফ ও ফড়ঁনঃ রভ ঊধংঃ ধহফ ডবংঃ চধশরংঃধহ ড়িঁষফ পড়হঃরহঁব ভড়ৎ সধহু ুবধৎং ঃড় ঢ়ৎবংবহঃ ধ ঁহরঃবফ ভৎড়হঃ. অহফ রঃ ড়িঁষফ হড়ঃ নব ঁহহধঃঁৎধষ রভ ড়হব ফধু ঃযব বধংঃবৎহ ষরসন ড়ভ চধশরংঃধহ ফবপরফবফ ঃড় পঁঃ রঃংবষভ ধফৎরভঃ ভৎড়স ঃযব পড়হঃৎড়ষ ড়ভ কধৎধপযর” অর্থাৎ পাক-ভারত সমস্যার সমাধান করুন। দীর্ঘদিন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ হিসেবে টিকে থাকবে কি না সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ রয়েছে। কোন একদিন পূর্ব পাকিস্তান করাচির নিয়ন্ত্রণ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তা মোটেও অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা হবে না।’ (সূত্র : ইস্ট পাকিস্তান ক্রাইসিস ১৯৭১ : সাম ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডি-ফ্যাক্টস, সৈয়দ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী)
পৃথিবীতে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন দু’টি অঞ্চল কখনো এক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে পারে না। একটি গরিব ও নিঃস্ব দেশ হিসেবে পাকিস্তানের জন্ম হয়। এ বাস্তবতার তাগিদে দুটি অঞ্চলের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বাজায় রাখার জন্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতের মধ্য দিয়ে করিডোর দাবি করেন। কিন্তু ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন তার এ প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকার করেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি মারাত্মক আঘাত। তিনি মারা যান স্বাধীনতা লাভের পরের বছর। জিন্নাহর মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান হাল ধরেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডির মিউনিসিপ্যাল পার্কে মুসলিম সিটি লীগের সমাবেশে আততায়ীর গুলিতে তিনি নিহত হলে দৃশ্যত পাকিস্তান অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিরাজ করছিল হানাহানি ও পারস্পরিক কোন্দল। স্বাধীনতা লাভ করা সত্ত্বেও দেশটির সংবিধান প্রণয়নে সময় লেগেছিল ৯ বছর।
রাজনৈতিক সঙ্কটের সূচনা

সূচনালগ্ন থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল দুর্বল। বহুবিধ গঠনগত দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল। এই দ্বন্দ্ব ও সংকটসমূহ পাকিস্তানের প্রাথমিক জীবনের রাজনীতিতে মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করে। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর পাকিস্তান ও ভারত উভয় রাষ্ট্রই সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক জীবন পরিক্রমণ আরম্ভ করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা বাস্তবে পাকিস্তানে প্রবর্তিত হয়েছিল কিনা তা বিচারসাপেক্ষ।
যে সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও সঙ্কট নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছিল তা সমাধান করা কেবলমাত্র রাজনৈতিক এলিটের পক্ষে সম্ভব ছিল না। মূলত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে আঞ্চলিক, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক এবং অন্যান্য বিষয়ে পর্বতপ্রমাণ বৈষম্য ছিল সেসবের সামঞ্জস্য বিধান করে উভয় অঞ্চলকে সমন্বিত করে এক জাতি এক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতৃত্বের পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভবপর ছিল না। ফলে বিদ্যমান সঙ্কট মোকাবেলা করার জন্য পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সহযোগিতায় মুসলিম লীগ সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়েছে।
যেহেতু মুসলিম লীগ দলের নেতৃত্বে পাকিস্তান স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেহেতু নব্য রাষ্ট্র পাকিস্তান ও স্বাধীনতায় নেতৃত্বদানকারী দল মুসলিম লীগ ছিল পরস্পরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এই দু’টি সংগঠন অর্থাৎ রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দল সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও চরিত্রের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়। প্রকৃতপক্ষে, কোনো রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্রের সমান মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের সমকক্ষ হতে পারে না। তথাপি পাকিস্তানের শাসক এলিট তাদের আলাপ-আলোচনা, বক্তৃতা-বিবৃতিতে মুসলিম লীগকে পাকিস্তানের সমকক্ষ বলে প্রকাশ্যেই উল্লেখ করেছেন। মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ প্রায়শই এ কথা বিস্মৃত হয়েছেন যে, সরকার গঠনকারী রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব এবং মর্যাদা কোনোটাই সমান হতে পারে না। কোনো দলীয় সরকারের পতনের ফলে রাষ্ট্রের পতন বা অস্তিত্বের সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে না। এমতাবস্থায় মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যদের স্বৈরাচারী মনোভাব এবং আচরণ বিরোধীদল সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। (চলবে)

SHARE

Leave a Reply