বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস -মতিউর রহমান আকন্দ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ভুট্টোর অপসারণ ও পিপিপি গঠন
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ আইয়ুবের ক্ষমতার ভিত নড়বড়ে করে দেয়। তখনো দেশটি যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানের ওপর ভারতের সশস্ত্র হামলায় যুদ্ধের সূচনা হয়। যুদ্ধে সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার ও জোয়ানরা বীরত্বের পরিচয় দেয়। যুদ্ধে ভারতের সুবিধা হচ্ছে না দেখেই ভারতের বন্ধু রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়। রাশিয়ার তাসখন্দ শহরে পাক-ভারত সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আইয়ুব খান তাসখন্দ চুক্তিতে যুদ্ধে অর্জিত বিজয় বিসর্জন দিয়েছেন মর্মে জনগণের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপিত হয়। আইয়ুব খানের সন্ধিচুক্তির বিপক্ষে অবস্থান নেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি আইয়ুব খানের মন্ত্রী হয়েও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় তাকে রোষানলে পড়তে হয়। এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্টের নির্দেশে ১৯৬৬ সালের ১৮ জুন চিকিৎসার অজুহাতে ভুট্টোকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। ইতঃপূর্বে তাকে পাকিস্তান মুসলিম লীগের (কনভেনশন) সাধারণ সম্পাদক হতে অপসারণ করা হয়েছিল।
গণভোট অনুষ্ঠান মারফত কাশ্মির সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত পাক-ভারত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা ও তাসখন্দ শান্তিচুক্তি সম্পাদনের বিরুদ্ধে স্থির সঙ্কল্প আপসহীন বিরোধিতার কারণে জনাব ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানি জনসাধারণের নিকট অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সোভিয়েত রাশিয়া ও কমিউনিস্ট চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য জনাব ভুট্টোর বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রগতিশীল ও সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী উদীয়মান ও ক্রমবর্ধমান বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ হতে অপসারিত হওয়ার পর জনাব ভুট্টো পাকিস্তান পিপলস পার্টি বা পিপিপি গঠন করে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের অবতারণা করেন। তিনি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ শেষে পশ্চিম পাকিস্তানের ধূমায়িত বিক্ষোভ আইয়ুববিরোধী খাতে প্রবাহিত হয় এবং এটাই রূপান্তরিত হয় ভুট্টোর রাজনৈতিক মূলধনে। ভুট্টো জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হন। তাসখন্দ চুক্তির বিরোধিতা করে ভুট্টো সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তান সফর শুরু করেন এবং জনসভায় বক্তব্য রেখে জনগণকে সংঘবদ্ধ করেন। ভুট্টো ছিলেন একজন অসাধারণ বক্তা। কাশ্মিরিরা স্বাধীনতা পেল না সে দুঃখ সইতে না পেরে চোখের জলে হাতের রুমাল ভেজাতে থাকলেন। একবার লাহোর রেলস্টেশনে বক্তৃতারত অবস্থায় যে রুমালটি দিয়ে তিনি চোখের পানি মুছেছিলেন তা তাৎক্ষণিক এক নিলামে দশ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। সুবক্তা ও সুপুরুষ ভুট্টোর এ অভিযান পশ্চিম পাকিস্তানিদের ব্যাপকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এ জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করেই ১৯৭০ সালে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পশ্চিম পাকিস্তানে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান।

আওয়ামী লীগ ও ছয় দফা কর্মসূচি
আইয়ুবের বিরুদ্ধে আন্দোলনের উদ্দেশ্যে গঠিত হয় এনডিএফ। এ ফ্রন্টের সাথে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলসমূহ অনেকটা নেতৃত্বসর্বস্ব দলে পরিণত হয়। জনসমর্থন তাদের পেছনে ছিল না বললেই চলে। তারা মূলত বৈঠকি রাজনীতিতে মশগুল ছিল। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে পরিচালিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি আইয়ুবের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন সংগঠিত করার ঘোর বিরোধী ছিল। পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী আদর্শভিত্তিক ভাবধারার ধারক ও বাহক দল হিসেবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সচেষ্ট ছিল। এ সময় পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো ক্রমশ আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সংগঠিত হতে আরম্ভ করে। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জনগণের সাথে তাদের সংযোগ হারিয়ে ফেলে। রাজনৈতিক দল ন্যাপ দুর্বল হয়ে পড়ে। সামগ্রিক অবস্থার গুরুত্ব উপলব্ধি করে শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলনে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তিনি স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলে ধরেন।
১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনটি নেজামে ইসলাম প্রধান চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী, কাউন্সিল মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ যোগদান করেন। আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। বৈঠকে যুদ্ধকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অসহায়ত্বের চিত্র তুলে ধরে শেখ মুজিবুর রহমান স্বায়ত্তশাসনের দাবি সংবলিত ঐতিহাসিক ছয় দফা উপস্থাপন করেন। তিনি এ বিষয়টিকে বৈঠকের আলোচ্যসূচি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। সভাপতি চৌধুরী মোহাম্মদ আলী এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। ছয় দফা আলোচ্যসূচি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বৈঠক থেকে ওয়াক আউট করেন। ঐ দিনই লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে শেখ মুজিব ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন। ১৯৪০ সালে মার্চ মাসে এ শহরেই লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। এ সময় তিনি দাবি করেন যে, লাহোর প্রস্তাবের নীতিমালা অনুসরণে প্রণীত ছয় দফার বাস্তবায়ন পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে। (সূত্র : রাজনীতির তিনকাল- মিজানুর রহমান চৌধুরী)
১৯৬৬ সালের ১৮-১৯ মার্চে ঢাকার ইডেন হোটেল প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিল অধিবেশনে প্রথম দিবসে ছয় দফা অনুমোদন করা হয়। দ্বিতীয় দিবসে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে আওয়ামী লীগের নতুন ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়।

ছয় দফা কর্মসূচির চিত্র ছিল নিম্নরূপ
-লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংবিধান রচনা করে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকার ফেডারেশনে পরিণত করতে হবে, যেখানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে, আইন পরিষদ হবে সার্বভৌম এবং সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভোটে আইন পরিষদ গঠিত হবে।
-ফেডারেল সরকারের হাতে থাকবে শুধু তিনটি বিষয়, যথা-প্রতিরক্ষা বৈদেশিক সম্পর্ক ও মুদ্রাব্যবস্থা। অন্য সব ক্ষমতা ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে ন্যস্ত থাকবে।
-দেশের দু’টি অঞ্চল তথা পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য পৃথক অথচ অবাধ হস্তান্তরযোগ্য মুদ্রা চালু করতে হবে। অথবা সমগ্র পাকিস্তানের জন্য একটি মুদ্রাব্যবস্থা থাকবে, তবে সে ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পুুঁজি যাতে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে, তার যথাযথ ব্যবস্থা সংবলিত সুনির্দিষ্ট বিধি সংবিধানে সন্নিবেশ করতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকতে হবে এবং পৃথক আর্থিক নীতি ও মুদ্রানীতি চালু করতে হবে।
-সব ধরনের কর ও শুল্ক ধার্য এবং আদায় করার ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যগুলোর সরকারের হাতে থাকবে। তবে অঙ্গরাজ্যের আদায় করা অর্থে কেন্দ্রের নির্দিষ্ট হিস্যা থাকবে, যা দিয়ে ফেডারেল তহবিল গঠিত হবে এবং ফেডারেল সরকারের খরচ নির্বাহ হবে।
-বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তি, বিদেশে বাণিজ্য প্রতিনিধিদল প্রেরণসহ ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যগুলোকে সাংবিধানিক ক্ষমতা দিতে হবে। দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দু’টি পৃথক হিসাব থাকবে এবং নিজ নিজ অঙ্গরাজ্য তা নিয়ন্ত্রণ করবে। অঙ্গরাজ্যগুলো সমান হারে অথবা কোনো সম্মত হারে কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা মেটাবে। দেশীয় পণ্য এক অংশ থেকে অন্য অংশে অবাধে প্রবেশাধিকার লাভ করবে।
-নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সংহতি রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাজ্যগুলোকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীন আধাসামরিক বাহিনী গঠন করার ক্ষমতা দিতে হবে।

ছয় দফা কর্মসূচি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর পরই তা ব্যাপকভাবে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ছয় দফা প্রস্তাবকারী শেখ মুজিব বিবৃতি দিয়ে পাকিস্তানের জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে তার প্রস্তাবে পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসীদের ভীত হওয়ার কোন কারণ নাই। উপরন্তু তার প্রস্তাবিত ছয় দফার বাস্তবায়ন পাকিস্তানকে পূর্বাপেক্ষা আরো জোরদার করে তুলবে বলে তিনি মতামত ব্যক্ত করেন। ছয় দফা দেশের জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোকে অনুপ্রাণিত ও সংঘবদ্ধ হতে সাহায্য করে।
আইয়ুব খানের সহযোগীরা বিভিন্ন সংবাদপত্রে ছয় দফা কর্মসূচির বিরুদ্ধে বিরূপ সমালোচনামূলক বিবৃতি প্রদান শুরু করে। ১৯৬৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কনভেনশন মুসলিম লীগের জনসভায় আইয়ুব খান এই বলে হুমকি দেন যে, যারা ছয় দফা কর্মসূচির কথা বলবে, সেসব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনবোধে “অস্ত্রের ভাষা” ব্যবহার করা হবে। কেবলমাত্র সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলই নয় পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সব ক’টি রাজনৈতিক দল ছয় দফার তুমুল সমালোচনা করে। প্রবল বিরোধিতার ফলে ছয় দফা কর্মসূচি অধিকতর জনপ্রিয় হতে থাকে। ১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ ছয় দফা কর্মসূচির বিস্তারিত ব্যাখ্যা সংবলিত একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী ঝটিকা সফরের মাধ্যমে জনসভা করতে থাকেন। জনসভাগুলোতে নজিরবিহীন জনসমাগম হয় এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ছয় দফা কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে শেখ মুজিবের নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রদর্শন করে। সংবাদপত্র পড়ে এবং লোকজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে দেশের বুদ্ধিজীবী ও সচেতন মহল বুঝতে পেরেছিলেন দ্রুতই শেখ মুজিব অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছেন।
প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আইয়ুব খানও বুঝতে সক্ষম হন, কী ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে তিনি সামরিক কায়দায় প্রত্যাঘাত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গৃহযুদ্ধের কথা বলে অস্ত্রের ভাষায় শেখ মুজিবকে মোকাবিলার ভয় দেখান। ছয় দফার মতো পুরোদস্তর একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে আইয়ুব খানের অসার ও অরাজনৈতিক হুমকি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মেনে নেয়নি। ছয় দফা কর্মসূচি মেনে নিলে পাকিস্তান বিভক্ত হওয়া থেকে রক্ষা পেত এবং একই সঙ্গে জনগণের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থগুলো, যা দীর্ঘকাল ধরে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা অব্যাহতভাবে অর্থনৈতিক শোষণ ও প্রশাসনিক দমননীতির কারণে উপেক্ষিত হয়েছিল, তা রক্ষা করা যেত। যে আকারের স্বায়ত্তশাসন পেলে ১৯৫৬ সালে (অর্থাৎ পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র যে বছরের ২৩ মার্চ চালু হয়েছিল) পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সন্তুষ্ট হতো ১৯৬৬ সালে তা চায়ের কাপের সমতুল্য মনে হয়েছিল তাদের কাছে। বস্তুত ছয় দফা কর্মসূচিতে স্বাধীনতার কথা বলা না হলেও চরম প্রকৃতির আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের উল্লেখ ছিল। এ কথা মানতেই হবে, যদি রাজনৈতিক সমস্যাবলি যথাযথ পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করা না হয় এবং যথাসময়ে সমাধান করা না যায়, তাহলে সেগুলো আরও বড় আকার ধারণ করে বিবদমান শ্রেণী বা গোষ্ঠীর মধ্যে দারুণ ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে এবং এতদূর গড়ায় যে পরে তার আর কোনো মীমাংসার সম্ভাবনা থাকে না। (সূত্র : সত্য মামলা আগরতলা- কর্নেল শওকত আলী)
১৯৫৬ সালের সংবিধানে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মেনে নেয়নি। আইয়ুব খান স্বায়ত্তশাসনে বিশ্বাসীই ছিলেন না, বরং স্বায়ত্তশাসনকে অর্থহীন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বিষয় হিসেবে গণ্য করতেন। সুতরাং ১৯৬৬ সালে কঠিন শর্তসংবলিত স্বায়ত্তশাসনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হলো আইয়ুব খানকে। ছয় দফা কর্মসূচির প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অবিচল বিশ্বস্ততা লক্ষ করে আইয়ুব খান ছয় দফার বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে ওঠেন। তিনি গৃহযুদ্ধের অজুহাত খাড়া করে অস্ত্রের ভাষায় জবাব দেয়ার ভীতি প্রদর্শন অব্যাহত রাখলেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাঁর ভ্রুকুটি তথা হম্বিতম্বিতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়নি।
ছয় দফা আন্দোলনের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণায় নামেন শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। ৩৫ দিনে ৩২টি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ অভিযানে শেখ মুজিব গ্রেফতার ও জামিনে মুক্তিলাভ করতে থাকেন। ছয় দফার সমর্থনে ভূমিকা রাখে জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাক। ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া প্রথম দিকে মনে প্রাণে ছয় দফা গ্রহণ করতে পারেননি। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ছয় দফার সমর্থনে কলম ধরেন। ইত্তেফাকের মাধ্যমে ছয় দফার প্রচার অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। জনগণের বোধগম্য ভাষায় এবং দাবির স্বপক্ষে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যসমৃদ্ধ জোরালো যুক্তির মাধ্যমে মানিক মিয়া ছয় দফাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন। ইত্তেফাকের প্রচারণায় ছয় দফা বাংলার জনগণের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়। মানিক মিয়ার এই ভূমিকায় দিশেহারা হয়ে সরকার ১৯৬৬ সালের ১৫ জুন তাকে গ্রেফতার করে। পরদিন ১৬ জুন দৈনিক ইত্তেফাকের মুদ্রাযন্ত্র দি নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেসকে বাজেয়াপ্ত এবং দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশনার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সরকারের এ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। আদালত সরকারি আদেশের বিরুদ্ধে রায় প্রদান করেন। আদালতের আদেশের পর সরকার অর্ডিন্যান্সে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে পাকিস্তান দেশ রক্ষার আইনে দৈনিক ইত্তেফাকের মুদ্রাযন্ত্র দি নিউ ন্যাশন প্রিন্টিং প্রেসকে পুনরায় বাজেয়াপ্ত করেন।
মামলা, গ্রেফতার ও বিভিন্ন হয়রানির মাধ্যমে আইয়ুব খান ও তদীয় গভর্নর মোনায়েম খানের ভীতি প্রদর্শন সত্ত্বেও জনগণ ছয় দফা কর্মসূচির প্রতি দৃঢ় সমর্থন অব্যাহত রাখে।

আগরতলার মামলা
১৯৬৮ সালে ৬ জানুয়ারি সরকারি এক প্রেসনোটের মাধ্যমে সর্বপ্রথম আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কথা প্রকাশ করা হয়। এত বলা ‘ঢাকাস্থ ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনের প্রথম সচিবের সঙ্গে মিলে সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে’। ভারত সরকারের সহায়তায় পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চক্রান্তে জড়িত থাকায় তাদের অভিযুক্ত করা হয়। চক্রান্তে লিপ্ত থাকায় পাকিস্তান সরকার ভারতীয় কূটনীতিক পি এন ওজাকে বহিষ্কার করে। মামলার বিবরণে বলা হয়, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় ভারতীয় কর্মকর্তা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এ ষড়যন্ত্র পাকানো হয়। এ জন্য এ মামলাকে “আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের এক আদেশ বলে পাকিস্তান পেনাল কোডের ১২১(ক) ও ১৩১ ধারায় সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ বিচারপতি এম এ রহমান, পূর্ব পাকিস্তানের হাইকোর্টের বিচারপতি মুজিবর রহমান ও বিচারপতি মকসুমুল হাকিমের সমন্বয়ে বিশেষ আদালত গঠন করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে এই মামলার বিচারের ব্যবস্থা করা হয়।
আগরতলা সম্পর্কে কর্নেল শওকত আলী যিনি এই মামলার একজন অভিযুক্ত তার রচিত গ্রন্থ “সত্য মামলা আগরতলা”-তে লিখেছেন :
“শুরু থেকেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, প্রেসিডেন্ট ফিন্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানের Central Intgerlligence Bureau বা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (CIB) সহায়তায় Inter Services Intelligence (ISI) কর্তৃক মামলার তদন্ত ও প্রস্তুতির কাজ পরিচালিত হচ্ছিল। CIB ও ISI দুটিই কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন দুটি সংস্থা। ISI ছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আর CIB ছিল অভ্যন্তরীণ (স্বরাষ্ট্র ও কাশ্মির) বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন। জিজ্ঞাসাবাদকালীন মামলার কাগজপত্র প্রস্তুত এবং গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর বা Generel Head Quarters (GHQ)- Judge Advocate General (JAG) শাখা থেকে মেজর হাসানকে প্রেষণে নিয়োগ করা হয়। এ বিষয়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে মূলত এড়িয়ে যাওয়া হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ইস্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের (IB, বর্তমানে স্পেশাল ব্রাঞ্চ) কর্মকর্তাসহ বাঙালি পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যবহার করা হয়েছিল। অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য-প্রমাণ, যথা ক্রোককৃত মালামালের তালিকা তৈরি, মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্নজনের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান-সম্পর্কিত তথ্য, হোটেল ব্যবস্থাপকদের সাক্ষ্য, ব্যাংকে লেনদেনসংক্রান্ত ব্যাংক ব্যবস্থাপকদের সাক্ষ্য ইত্যাদি সংগ্রহ করার জন্য ISI-এর লেফটেন্যান্ট কর্নেল (পরে ব্রিগেডিয়ার) শামসুল আলমই ছিলেন তুলনামূলকভাবে উচ্চ পদে আসীন একমাত্র বাঙালি অফিসার, যিনি এই মামলার প্রস্তুতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ISI Detachment-এর প্রধান ছিলেন। তদন্তকাজ পরিচালনার জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ওঝও-এর শের আলী বাজ নামক আরেকজন লে. কর্নেলকে পাঠানো হয়েছিল।
কোর্টের ধরন এবং বিচার-প্রক্রিয়াসম্পর্কিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার আইয়ুব খান তার নিজের হাতেই রেখেছিলেন। প্রথম দিকে তিনি চিন্তা করেছিলেন যে, একজন ব্রিগেডিয়ারকে প্রধান করে গঠিত সামরিক ট্রাইব্যুনাল দ্বারা সেনা আইনের অধীনে অভিযোগ গঠনপূর্বক বঙ্গবন্ধুসহ সব অভিযুক্তের বিচার করবেন। কিন্তু সেনা আইন ও সেনা আইনের বিধিতে বড় ধরনের সংশোধনী না এনে সামরিক আইনে বিচার করা সম্ভব ছিল না। কেননা প্রচলিত সেনা আইনে সশস্ত্র বাহিনীতে চাকরিরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এবং অসামরিক ব্যক্তি ও প্রাক্তন সৈনিকদের একই সঙ্গে বিচার করার বিধান ছিল না। সেনা আইনে অভিযুক্তদের শাস্তি প্রদানের এই পদক্ষেপ আইয়ুব খানের অসৎ অভিপ্রায়ের উন্মোচন ঘটায় এবং জনগণকে সরকারের আনীত অভিযোগের কাহিনী অবিশ্বাস করতে উদ্বুদ্ধ করে। তখন আইয়ুব খানকে প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করে অসামরিক বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল দ্বারা বিচারকার্য পরিচালনা করার পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু আইয়ুব খান কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি এবং দণ্ডাজ্ঞা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি এই মামলা পরিচালনার ব্যাপারে ফৌজদারি কার্যবিধিতে ও সাক্ষ্য আইনে কিছু সংশোধনী আনেন। এই পদক্ষেপও একইভাবে আইয়ুব খানের অসৎ অভিপ্রায় উন্মোচন করেছিল এবং জনগণ স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, মামলার গুণাগুণ যা-ই থাকুক না কেন, আইয়ুব খান আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে চান।
মানব-ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে শাসক ও নেতারা তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে প্রচলিত আইন সংশোধন করেছেন অথবা নতুন আইন প্রণয়ন করেছেন। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, অনেক সময়ে সেই একই শাসক বা নেতারা বা তাঁদের অনুসারীরা সেই সংশোধিত আইনের অথবা নতুন আইনের শিকার নিজেরাই হয়েছেন। কিন্তু তার পরও অনেকেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করে, তাঁদের পূর্বসূরিরা যে ভুল করেছিলেন, সেই ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করে যান।”

কর্নেল শওকত আলী আরো লিখেছেন :
“পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জাস্টিস এস এ রহমানকে চেয়ারম্যান করে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং মামলার বিচারকার্যের ভার উক্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনালের ওপর ন্যস্ত করা হয়। ট্রাইব্যুনালের অপর দুজন সদস্য ছিলেন জাস্টিস মুজিবুর রহমান খান এবং জাস্টিস মুকসুমুল হাকিম। জাস্টিস এস এ রহমানের মতো একজন পাঞ্জাবিকে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করার ফলে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মনে প্রচণ্ড অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। এমনকি ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার এ এ মির্জাকেও লাহোর হাইকোর্ট থেকে প্রেষণে নিয়োগ করা হয়েছিল। যদিও বিশেষ ট্রাইব্যুনালটি একটি বেসামরিক আদালত ছিল এবং বিচারকার্য বেসামরিক আইন ও বিধির আওতায় পরিচালনা করার কথা ছিল, কিন্তু আদালতের অবস্থান, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ের চরিত্র ছিল সামরিক। আদালতের অবস্থান ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে হওয়ায় বাঙালি জনগণের মনে সংগতভাবেই গভীর সন্দেহের উদ্রেক হয়। একটি সেনা অফিসার্স মেস অর্থাৎ তৎকালীন সিগন্যালস অফিসার্স মেসকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে রূপান্তর করা হয়েছিল। এই মেসটিকে পরে স্টেশন লাইব্রেরি করা হয়। এখন তা ‘বিজয় কেতন’ এর অংশ। তৎকালীন স্টাফ রোডের (পরে শহীদ বাশার রোড) উত্তর-পশ্চিম কর্নারে কোর্ট বিল্ডিং বা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল অবস্থিত ছিল। ট্রাইব্যুনাল কক্ষ ও বিচারকমণ্ডলীর চেম্বার মূল মেস বিল্ডিংয়ে স্থাপন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল কক্ষ অফিসার্স মেসটির ডাইনিং হল ও এন্ট্রি রুমে অবস্থিত ছিল। ট্রাইব্যুনাল কক্ষের উত্তর প্রান্তে বিচারকমণ্ডলী বসতেন। বিচারকমণ্ডলী বসার স্থান ছিল কৃত্রিমভাবে উঁচু করা একটি প্ল্যাটফর্মে। বিচারকমণ্ডলী দক্ষিণ দিকে মুখ করে বসতেন। বিচারকমণ্ডলীর ডান দিকে অন্য একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মে পূর্ব দিকে মুখ করে সাংবাদিকেরা বসতেন। ট্রাইব্যুনাল কক্ষের পশ্চিম দিকের দেয়াল ঘেঁষে সাংবাদিকদের ডান দিকে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বিচারকমণ্ডলীর দিকে অর্থাৎ উত্তর দিকে মুখ করে বসতেন। এক সারিতে তিনজন করে অভিযুক্তের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বসার জায়গা বা Accused Dock’ ১২টি সারিতে লম্বালম্বিভাবে তৈরি করা হয়েছিল। ৩৫ জন অভিযুক্ত ছোট ছোট চেয়ারে গাদাগাদি করে বসতেন। সাবেক অফিসার্স মেসের পশ্চিমাংশের দেয়ালের পাশ দিয়ে ডাইনিং হলের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত Accused Dock বিস্তৃত ছিল। Accused Dock পাঁচ ফুট উঁচু কাঠের গ্রিল দিয়ে ঘেরা ছিল। সরকারপক্ষের আইনজীবীরা ও কর্মচারীরা ডাইনিং হলের পূর্ব পাশে বিচারকমণ্ডলীর দিকে মুখ করে বসতেন। সাক্ষীদের দাঁড়ানোর জায়গা বা Witness Box সরকারপক্ষের আইনজীবীদের সামনে বিচারকমণ্ডলীর দিকে মুখ করে আড়াআড়িভাবে তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেয়ার সময় বিচারকমণ্ডলীর সংকেত মতো দক্ষিণ-পূর্ব দিকে দাঁড়াতেন। অভিযুক্তদের আইনজীবীরা ডাইনিং হলের মধ্যভাগ এবং Accused Dock-এর লাগোয়া ডাইনিং হলের পূর্ব পাশে উত্তর দিকে মুখ করে বসতেন। আইনজীবীদের পেছনের অংশে অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে সীমিতসংখ্যক দর্শনার্থীর বসার ব্যবস্থা ছিল। অফিসার্স মেসের এন্টি রুমের দক্ষিণ পাশের অংশ খালি ছিল। Mess Bar-টিকে একটি ক্যান্টিনে রূপান্তর করা হয়েছিল, যা আইনজীবী ও দর্শনার্থীরা ব্যবহার করতে পারতেন। অফিসার্স মেসের পশ্চিম দিকে অবস্থিত মূল ফটক অভিযুক্তদের প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য সংরক্ষিত ছিল। অফিসার্স মেস বিল্ডিংয়ের দক্ষিণ প্রান্তের দেয়াল ভেঙে একটি নতুন প্রবেশপথ করা হয়েছিল। যেখান দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনজীবী ও দর্শনার্থীরা বিচারালয়ে প্রবেশ করতেন। তাঁরা প্রবেশপথ দিয়ে প্রথমে মেস বিল্ডিংয়ের খালি অংশে ঢুকতেন এবং উত্তর দিকে অর্থাৎ বিচারকমণ্ডলীর বসার প্ল্যাটফর্মের দিকে বা তাদের দিকে মুখ করে ঢুকতেন। একই অফিসার্স মেসের অর্থাৎ Signals Officers Mess-এর ব্যাচেলর অফিসার্স কোয়ার্টার্সগুলোকে ট্রাইব্যুনালের কার্যালয়ে রূপান্তর করা হয়েছিল, যার কিছু অংশ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার এবং তাঁর স্টাফদের দেয়া হয়েছিল এবং বাকি অংশে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বসতেন। সরকারপক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের কার্যালয় স্থাপন করেছিলেন অফিসার্স মেসের ভিআইপি কক্ষে। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনজীবীদের জন্য কোনো অফিস বরাদ্দ করা হয়নি।
বিচারকর্ম চলাকালীন অভিযুক্ত ব্যক্তি ও কতিপয় সাক্ষী, বিশেষ করে রাজসাক্ষীরা পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে সামরিক হেফাজতে ছিলেন। ইতঃপূর্বে কয়েকজনকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছিল। বিচারকার্য শুরু হওয়ার আগে তাদেরও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে আসা হয়। ট্রাইব্যুনালের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে বিচারকার্যের যাবতীয় কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা পশ্চিম পাকিস্তানিরা নিয়ন্ত্রণ করত। এসব দেখলেই প্রতীয়মান হতো যে একটি প্রহসনমূলক বিচারকার্য অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে কোনো সন্দেহ ছিল না যে, পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের বিচার করে কঠোর শাস্তি প্রদানের যাবতীয় ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেছিল।
১৯ জুন ১৯৬৮ তারিখে আসামিদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালের সামনে বিচারের জন্য হাজির করা হয়। ৩৫ জন অভিযুক্তের মধ্যে বঙ্গবন্ধুসহ ১৩ জন তৃতীয় পাঞ্জাব অফিসার্স মেসে থাকতেন। বাকি ২২ জনকে তৃতীয় পাঞ্জাব ইউনিট লাইনসের ভেতরে রাখা হয়েছিল। তৃতীয় পাঞ্জাব অফিসার্স মেস থেকে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কক্ষ অর্থাৎ সিগন্যালস অফিসার্স মেস মাত্র ২০০ মিটার দক্ষিণে ছিল।”

তিনি আরো লিখেছেন :
“ট্রাইব্যুনালে বা আদালতের অভ্যন্তরে অভিযুক্তদের পক্ষে মামলা পরিচালিত হয়েছিল মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে। সব অভিযুক্তই নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু সব অভিযুক্তের ডিফেন্স ছিল রণনীতিগতভাবে বা স্ট্রাটেজিক্যালি অবিভাজ্য। কোনো একজন বিশেষ অভিযুক্তের পক্ষে আদালত রায় দেবেন, সে লক্ষ্যে আইনজীবীরা কাজ করবেন, বিষয়টি এ রকম ছিল না। বিষয়টি ছিল, সব অভিযুক্তই যেন মুক্তি পান, সেই লক্ষ্যে আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধভাবে মামলা পরিচালনা করবেন। সঙ্গে সঙ্গে মামলার জেরায় এবং অন্যান্য কৌশলে পশ্চিম পাকিস্তানিদের, বিশেষ করে আইয়ুব খানকে বাঙালি জাতির শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। রণনীতিগতভাবে আরও সিদ্ধান্ত হয়, এই মামলা পরিচালনার মাধ্যমে অর্থাৎ অভিযুক্তদের পক্ষ সমর্থনের জন্য প্রচলিত আইনে যেটুকু সুযোগ পাওয়া যায়, তার সদ্ব্যবহার করে স্বাধীনতার ধারণা জনগণের মাঝে পৌঁছে দিতে হবে। আইনজীবীরা যার যার মক্কেলের পক্ষে মামলা পরিচলনা করে তাঁদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ খন্ডন করতে পারবেন। কিন্তু সামগ্রিক বা যৌথ ডিফেন্সের কোনো ক্ষতি হয়, এ রকম কোনো ভূমিকা কোনো আইনজীবী রাখতে পারবেন না। এই নীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, আমরা অভিযুক্তরা আমাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের উত্তরে নিজেদের ‘নির্দোষ’ দাবি করব। অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ কেউ, বিশেষ করে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক (অভিযুক্ত ১৭), নিজেকে ‘নির্দোষ’ দাবি করার বিপক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য যা করেছি, তা সবারই, বিশেষ করে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের সঠিকভাবে জানা উচিত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিজে এবং আমাদের আইনজীবীরা তাঁদের নিবৃত্ত করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই নিজেদের ‘নির্দোষ’ বলে দাবি করি।
কেউ কেউ বলতে পারেন, আদালতে নিজেদের ‘নির্দোষ’ দাবি করে এবং প্রকাশ্যে মামলাটিকে মিথ্যা বলে বা মামলাটিকে ‘ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা’ বলে আখ্যায়িত করে, পরবর্তীকালে মামলার ঘটনাবলি বা অভিযোগগুলোকে সত্য বলে প্রচার করা নৈতিকতার পরিপন্থী কি না। কিন্তু এ রকম কথা যাঁরা বলেন, তাঁরা বিষয়টিকে অরাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করেন। মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতার প্রশ্নটি ছিল একটি রাজনৈতিক বিষয় এবং আগরতলা মামলার সামগ্রিক বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা উচিত। ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত অভিযোগগুলো স্বীকার করলে তাতে হয়তো অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত শৌর্যের প্রমাণ পাওয়া যেত, কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টি ক্ষতিগ্রস্ত হতো। সে ক্ষেত্রে মামলার বিচারকার্য প্রলম্বিত হতো না। ফলে দীর্ঘদিন শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক ফয়েজ আহমদের ‘ট্রাইব্যুনাল কক্ষে’ শিরোনামে দৈনিক আজাদ-এ প্রকাশিত বিচারকার্যের সংবাদ থেকে জনগণ বঞ্চিত হতো। যদি তা-ই হতো, তাহলে মামলার বিচারকার্যকে ঘিরে মানুষের মনে যে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যেত। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান হয়তো সম্ভব হতো না।
বিচারকার্যের প্রথম দিন অর্থাৎ ১৯ জুন ১৯৬৮ তারিখের পর বিচারকার্য মুলতবি হওয়ার কথা ছিল। হয়েছিলও তা-ই। অভিযুক্তদের আইনজীবীদের তাঁদের ডিফেন্স প্রস্তুত করার সুযোগ দেয়ার জন্য বিচারকার্য ২৯ জুলাই ১৯৬৮ তারিখ পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছিল। কথা ছিল, ওই তারিখে অর্থাৎ ২৯ জুলাই ১৯৬৮ তারিখে স্যার থমাস উইলিয়ামস অভিযুক্তদের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত থাকবেন। ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের পক্ষ সমর্থনের জন্য আইনজীবীদের প্রস্তুতির পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ও অভিযুক্তদের পক্ষে দেশে-বিদেশে প্রচার চালানো হবে। ট্রাইব্যুনাল মুলতবির সময় এবং পরে ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুসহ অভিযুক্তদের মুক্তির দাবি জোরদার হতে থাকে।
[চলবে]

SHARE

Leave a Reply