বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস – মতিউর রহমান আকন্দ

[ পূর্ব প্রকাশের পর ]

মুসলিম শাসনামলে ইসলাম
নির্মূলের ষড়যন্ত্র
১২০৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত ৫৫৪ বছর বাংলাদেশ মুসলমানদের শাসনে পরিচালিত হয়। ভারত উপমহাদেশে সাড়ে ৫ শ’ বছরের মুসলিম শাসনামলে বিশেষ করে মুসলিম শাসকগণ যদি জীবনের সকল ক্ষেত্রে সত্যিকার মুসলমানি জীবনযাপন করতেন, ইসলামী শিক্ষার প্রচার-প্রসার ও ইসলামী চরিত্রগঠনের কাজ করতেন, তাহলে ভারতের ইতিহাস অন্যভাবে রচিত হতো। ব্যক্তিগতভাবে দু’একজন শাসক মুসলমানি জীবনযাপন করলেও মোগল শাসনামলে শাসক ও জনগণের মধ্যে চরম নৈতিক বিকৃতি ঘটে।
সাধারণত ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এ উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষ মুসলমান হয়েছেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষা ও ইসলামী চরিত্রগঠনের কোনো ব্যবস্থা তাদের জন্য করা হয়নি। ফলে নওমুসলিমদের অধিকাংশই ঐসব মুশরেকি ও জাহেলি রসমরেওয়াজের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি, যা ইসলামের পূর্বে তারা মেনে চলতো। বাইরে থেকে যেসব মুসলমান এ দেশে এসেছিল তাদের অবস্থাও ভারতীয় মুসলমান থেকে তেমন বেশি ভালো ছিল না। পার্থিব ভোগবিলাসের প্রতি তাদের ছিল অধিক আগ্রহ-আসক্তি। মুসলিম শাসকদের উদ্দেশ্য ছিল শুধু দেশ শাসন করা। ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা এবং ইসলামের খেদমত তাদের জীবনের লক্ষ্য ছিল না।
বিশেষ করে বাদশাহ আকবরের শেষের দিকে ভারতভূমি থেকে ইসলামকে নির্মূল করার এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছিল। এ ষড়যন্ত্রের ইন্ধন জুগিয়েছিলেন শুধু তার অমুসলিম অমাত্যবর্গই নয়, কতিপয় দুনিয়াপূজারি আলেম ও মুসলিম পন্ডিত। ‘দ্বীনে এলাহী’র নাম দিয়ে নতুন এক ধর্মের প্রবর্তন করা হয়েছিল। মুসলমানি নাম রাখা, গরুর গোশত খাওয়া, দাড়ি রাখা, মুসলমান মাইয়াতকে কবর দেয়া প্রভৃতি এ নতুন ধর্মে নিষিদ্ধ ছিল। নামাজ ও আজান বন্ধ হয়ে গেলো। বাদশাহকে সিজদাহ করার প্রচলন হলো। এ ধর্মে হিন্দুদের উৎসব দেওয়ালি, দশোহারা, রাখী পূর্ণিমা, শিব রাত্রি প্রভৃতি পালন করার ব্যবস্থা করা হলো। মুসলিমসমাজকে পৌত্তলিক সমাজে পরিণত করার সকল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা করা হলো। ইসলামের ইতিহাসে আকবরের ন্যায় এতবড় ইসলামের শত্রুর কোনো নজির পাওয়া যায় না।
কিন্তু আকবর তার গোটা রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে কল্পিত ধর্মের গোড়াপত্তন করতে পারেননি। তার কারণ এই যে, সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের বিকৃতি যতই ঘটে থাক না কেন, তাদের মনের অভ্যন্তরে ইসলামী চেতনা অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো বিদ্যমান ছিল এবং তা প্রজ্বলিত করার জন্য কিছু ঈমানদার বান্দাও এ দেশে বিদ্যমান ছিলেন। তাদেরই একজন শায়খ আহমদ সিরহিন্দি মুজাদ্দিদে আলফেসানি আকবরের নতুন ধর্মের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন।
আকবরের পর তার পুত্র জাহাঙ্গীর সিংহাসনে আরোহণ করে ‘দ্বীনে এলাহী’ ধর্মের প্রচার-প্রসারের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেও ব্যর্থ হন। এ ধর্মের বিরোধিতা করার অপরাধে শায়খ আহমদকে গোয়ালিয়ার দুর্গে বন্দী করে রাখা হয়। তথাপি ইসলামের বিকল্প এক নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠার স্বপ্নসাধ চিরতরে নির্মূল হয়ে যায়। জাহাঙ্গীর অবশেষে আলফেসানির কাছে নৈতিক পরাজয় বরণ করেন। আকবর তাঁর ষড়যন্ত্রমূলক এক অতি অভিনব ধর্মপ্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু সেই সাথে তিনি এই উপমহাদেশে মোগল সাম্রাজ্য তথা মুসলিম শাসনের অধঃপতনের বীজও বপন করেন।
স¤্রাট আওরঙ্গজেব সারা জীবনব্যাপী তার সর্বশক্তি দিয়ে সে ধ্বংসকে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। তার উত্তরাধিকারীগণ যদি তার মতো বিচক্ষণ ও শক্তিশালী হতেন তাহলে ভারতের ইতিহাসে মুসলমানদের অবস্থান এত বিপর্যস্ত হতো না। ১৭০৭ সালে স¤্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে ১৭৫৭  খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত পঞ্চাশ বছরে কমপক্ষে সাতজন শাসক দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন।
কিন্তু তাদের মধ্যে কারো যোগ্যতা ছিল না যে পতনোন্মুখ সা¤্রাজ্যকে রক্ষা করা। তারা ছিলেন শাসনকার্য পরিচালনায় অযোগ্য, অদক্ষ, বিলাসী ও অদূরদর্শী।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলায় আগমন
সাড়ে ৫শত বছরব্যাপী প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসনের মূলোৎপাটন করে এ দেশবাসীকে গোলামির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছিল যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, তারা এসেছিল মূলত বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে। ১৫৯৯ সালে কতিপয় ব্যবসায়ীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় লন্ডনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্ম হয়। ১৬১২ খ্রিষ্টাব্দে বাদশাহ জাহাঙ্গীরের নিকট থেকে সনদ লাভ করে এ কোম্পানি সর্বপ্রথম সুরাট বন্দরে তাদের বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। ১৬৪৪ সালে বাদশাহ শাহজাহান দাক্ষিণাত্যে অবস্থানকালে তার কন্যা আগুনে দগ্ধীভূত হয়। তার চিকিৎসার জন্য সুরাটের ইংরেজ-কুঠির অধ্যক্ষ কর্তৃক প্রেরিত সুদক্ষ সার্জন ডা: গ্যাব্রিল বাউটন চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে নিরাময় করে তোলেন। তার প্রতি বাদশাহ অত্যন্ত মুগ্ধ হয়ে পড়েন। বাউটনের অনুরোধে ইংরেজ বণিকগণ বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করে। এভাবেই ইংরেজরা তাদের বাণিজ্যকার্যক্রম প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পায়। বাদশাহ শাহজাহান ও  তার পুত্রদের উদারতার সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। অকৃতজ্ঞ ইংরেজ বণিক তাদের কুটিল রাজনৈতিক চালে ও  বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে মোগল সা¤্রাজ্যের ও বাংলা-বিহারের স্বাধীনতার মৃত্যু পরোয়ানা ডেকে আনে। তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ দ্বারা শাসকদের বশে নেয়ার চেষ্টা করে। ১৬৭৮ সালে ইংরেজ কোম্পানি তাদের হীন স্বার্থসিদ্ধির জন্য তদানীন্তন বাংলার সুবেদার মোহাম্মদ আজমকে একুশ হাজার টাকা ঘুষ প্রদান করে। ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ইংরেজরা বাংলার শাসকগোষ্ঠীকে ক্রয় করার যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল তাই একপর্যায়ে বাংলার স্বাধীনতাকে বিকিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করে।
১৬৮৭ সালে কাসিম বাজার কুঠির প্রধান জব চার্নক সকল শর্ত স্বীকার করে নিয়ে বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্য করার অনুমতি লাভ করে। এ শর্তগুলো ছিল তাদের জন্য অবমাননাকর। সুচতুর ইংরেজরা এখান থেকেই এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ওপর লুণ্ঠন এবং দস্যুতায় জড়িয়ে পড়ে। সেই সাথে দুরভিসন্ধি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়। বাদশাহ আওরঙ্গজেব তাদের ষড়যন্ত্র জানতে পেরে তাদের বাণিজ্য কুঠিসমূহ বাজেয়াপ্ত করেন। কোম্পানি চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়।
১৬৮৯ সালে ইব্রাহিম খান বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার নিযুক্ত হন। দেশে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার কল্পে  এ সময় ইংরেজদের বাণিজ্যের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হয় এবং জব চাণককে পুনরায় বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়। ধূর্ত জব অনুমতি পাওয়া মাত্র ১৬৯১ সালে কলকাতা নগরীর পত্তন করে নিজেদেরকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যে, এর সুদূরপ্রসারী ফলস্বরূপ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলা তথা সমগ্র ভারত ভূমিতে তাদের আধিপত্য ও সা¤্রাজ্যবাদ অক্ষুণœ থাকে।

ইংরেজদের ষড়যন্ত্র
স¤্রাট আওরঙ্গজেবের নিযুক্ত বাংলার সুবাদার আজিমুশশানের আরামপ্রিয়তা ও অর্থের প্রতি লোভের সুযোগে ইংরেজরা তাকে প্রভূত পরিমাণ উপঢৌকনাদি, নজরানা দিয়ে সুতানটি বাণিজ্যকুঠি সংরক্ষিত করার অনুমতি লাভ করে। তার ১৬ হাজার টাকার নজরানা ও মূল্যবান উপহারাদি দিয়ে সুতানটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা গ্রাম তিনটি লাভ করে। আজিমুশশানের পর মুর্শিদকুলি খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন। মুর্শিদকুলি খান ইংরেজদের অর্থের দ্বারা বশীভূত হবার পাত্র ছিলেন না। ১৭২৭ সালে মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর তার পৌত্র সরফরাজ খানকে উত্তরাধিকার মনোনীত করা হলে হিন্দু প্রধানগণ বাধা দান করেন। কারণ তাঁকে তারা তাদের স্বার্থের পরিপন্থী মনে করতো। তারা সরফরাজ খানের পিতা সুজাউদ্দিনকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করে। তার শাসনকালে (১৭২৭-১৭৩৯ খ্রি:) এ সকল বেনিয়া প্রকৃতপক্ষে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের প্রধান উদ্যোক্তা হয়ে পড়েন। তাদের দলপতি আলম চাঁদ ও জগৎশেঠ হয়ে পড়েছিল প্রকৃত শাসক। সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর এ ষড়যন্ত্রকারী দলটি উড়িষ্যার নায়েব নবাব আলীবর্দী খানকে বাংলার সিংহাসন লাভে সাহায্য করে। তাঁর আমলে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চরমে পৌঁছে। এ অবস্থার সুযোগে মারাঠাগণ বার বার বাংলার ওপর চড়াও করে। বেগতিক দেখে আলীবর্দী খান এসব প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তিনি তাদেরকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করেন। ফলে রায় দুর্লভ রায়, মাহতাব রায়, স্বরূপ চাঁদ, রাজা জানকী রায়, রাজা রাম নারায়ণ, রাজা মানিক চাঁদ প্রভৃতির নেতৃত্বে এ দলটি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে পড়ে।
বর্গিদের হামলা ও ইংরেজদের ক্রমবর্ধমান অশুভ শক্তি ও আলীবর্দীর বার্ধক্যজনিত পরিস্থিতিতে ইংরেজরা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠালাভের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। আলীবর্দী খান বুঝতে পেরেছিলেন ইংরেজদের ক্ষুব্ধ করলে তারা যে ষড়যন্ত্রের আগুন প্রজ্বলিত করবে তা নির্বাপিত করার ক্ষমতা বাংলার নেই। তিনি সব কিছু জেনেও ইংরেজদের চক্রান্ত ও বর্গি দস্যুদের দমন করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেননি। এ অবস্থায় আলীবর্দী খান মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর এক মহা সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে নবাব সিরাজউদ্দৌলা তার উত্তরাধিকারী হন।
আলীবর্দীর মৃত্যুর পর দু’জন বাংলার সিংহাসনের দাবিদার হয়ে পড়েন। আলীবর্দীর বিধবা কন্যা ঘষেটি বেগম এবং পুর্ণিয়ার নবাব শওকত জং। ইংরেজগণ ঘষেটি বেগমের দাবি সমর্থন করেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের ষড়যন্ত্র, কুকর্ম ও চক্রান্ত বানচাল করতে চেয়েছিলেন বলে তিনি তাদের বিরাগভাজন হয়ে পড়েন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে আরোহণের পর ঘষেটি  বেগম ও শওকত জংয়ের সকল ষড়যন্ত্র বানচাল করে দিতে সক্ষম হন। তাদের বিদ্রোহে ইন্ধন জোগাচ্ছিল রাজ ভল্লব। সিরাজউদ্দৌলা তা জানতে পেরে তার কাছে হিসাবপত্র তলব করেন। রাজস্ব আদায়ের ভার রাজ ভল্লবের ওপর ছিল। আদায়কৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছিল বলে হিসাব দিতে অপারগ হওয়ায় নবাব সিরাজউদ্দৌলা রাজ ভল্লবের ঢাকাস্থ ধন-সম্পদ আটক করার আদেশ জারি করেন। রাজ ভল্লবের পুত্র কৃষ্ণ ভল্লব অবৈধভাবে অর্জিত যাবতীয় সম্পদসহ গঙ্গা ¯œানের ভান করে পালিয়ে গিয়ে কলকাতায় ইংরেজদের আশ্রয় গ্রহণ করে। সিরাজউদ্দৌলা ধনরতœসহ পলাতক কৃষ্ণ ভল্লবকে তার হাতে অর্পণ করার জন্য কলকাতার গভর্নর মি. ড্রেককে নির্দেশ দেন। মাহতাব চাঁদ ও অন্যান্য হিন্দু বণিক ও বেনিয়াদের প্ররোচনায় সিরাজউদ্দৌলার এ আদেশ পালন করতে কলকাতার গভর্নর অস্বীকার করে। তারপর অকৃতজ্ঞ ক্ষমতালিপ্সু ইংরেজগণ ও তাদের দালাল হিন্দু প্রধানগণ সিরাজউদ্দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুত করে চিরদিনের জন্য মুসলিম শাসন বিলুপ্ত করার যে ষড়যন্ত্র জাল বিস্তার করে তা চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয় পলাশীর ময়দানে।

পলাশীর যুদ্ধ
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ইতিহাসে একটি কালো দিন। সেদিন ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পলাশীর আ¤্রকাননে প্রহসনের যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হলে প্রথমে বঙ্গদেশ এবং পরে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ ইংরেজ কোম্পানির করতলগত হয়। পলাশীর যুদ্ধকে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠায় একটি চূড়ান্ত যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ যুদ্ধে লুণ্ঠিত সম্পদকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের শক্তিবৃদ্ধিতে ব্যবহার করে। পলাশীর যুদ্ধ ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা এবং বৃহত্তর উপনিবেশ গঠনের একটি প্রচেষ্টা। এ বিজয়ের খলনায়ক ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক অফিসার কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ। তার বিজয়ের মূলে ছিল চক্রান্ত, ঘুষ প্রদান, চুক্তি ভঙ্গ এবং নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা।
শক্তিশালী রাষ্ট্রের কাছে একটি দুর্বল রাষ্ট্র পরাজিত হতে পারে। তদ্রুপ একটি দেশের সেনাবাহিনীর কাছে আরেকটি দেশের সেনাবাহিনীর বিপর্যয় ঘটতে পারে। কিন্তু পলাশীতে ঘটেছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার প্রবল পরাক্রান্ত নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হয়েছিলেন একটি বিদেশী জয়েন্ট স্টক কোম্পানির সামান্য একজন কর্নেলের কাছে। পলাশীর যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তবে যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হয়েছিল নবাবের সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছার অনেক আগে। যুদ্ধ না করার জন্য তার সৈন্যদের ঘুষ দেয়া হয়েছিল। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু তার ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’য় ক্লাইভের বিজয়কে প্রতারণা ও ছলচাতুরীর বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ব্যবসা বাণিজ্য করতে এসে একটা বিরাট সা¤্রাজ্যের মালিক মোখতার হয়ে পড়া কোনো আকস্মিক বা অলৌকিক ঘটনার ফল নয়। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবসার পথ উন্মুক্ত হয় এবং ইউরোপীয় জাতিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ঔপনিবেশিক ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা-প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। ফলে আমেরিকায় স্পেন সা¤্রাজ্য, মশলার দ্বীপে ওলন্দাজ সা¤্রাজ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফরাসি সা¤্রাজ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায়  ব্রিটিশ সা¤্রাজ্য স্থাপিত হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইংল্যান্ডের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে অগ্রগতির নীতি অবলম্বন করে এবং যেসব বাণিজ্যিক এলাকায় তাদের প্রতিনিধিগণ বাস করতো তারা একটা রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হোক এ ছিল তাদের একান্ত বাসনা।
তাদের সেই বাসনা পূরণের জন্য তারা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের আশ্রয় গ্রহণ করে। তারা ভারতের হিন্দু ব্যবসায়ীদেরকে তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আলমচাঁদ জগৎশেঠ প্রভৃতি হিন্দু প্রধানগণ যদি চরম বিশ্বাসঘাতকতার ভূমিকা পালন না করতো তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লিখিত হতো। পলাশী নাটকের সবচেয়ে ঘৃণিত ও অভিশপ্ত ব্যক্তি করা হয়েছে মীর জাফরকে। কলকাতা ফোর্ট উইলিয়ামের যুদ্ধে ইংরেজদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করার পর নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা শাসনের ভার অর্পণ করেন মানিক চাঁদের ওপর। মানিক চাঁদ ইংরেজদেরকে কলকাতা ও হুগলীতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র পাকাপোক্ত হয় রায় দুর্লভ রায়, উমিচাঁদ ও জগৎশেঠ ভ্রাতৃবৃন্দের পরামর্শে এ কাজের জন্য মীর জাফরকে বেছে নেয়া হয় শিখন্ডী হিসেবে অথবা ‘শো বয়’ হিসেবে। এদেরই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পড়েছিল মীর জাফর। মীর জাফর যে দোষী ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ হীন ষড়যন্ত্রে তার অংশ কতটুকুই বা ছিল? বড়োজোর এক আনা। কিন্তু তার দুর্ভাগ্যের পরিহাসই বলতে হবে যে, ইতিহাসে তার চেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি আর কেউ নেই। তাই সকল সময়ে বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তির নামের পূর্বে ‘মীর জাফর’ শব্দটি বিশেষণরূপে ব্যবহৃত হয়। এ ঘৃণ্য নামটি চিরকাল বিকৃত ও নিন্দিত হয়ে থাকবে।
দেশপ্রেমিক সিরাজউদ্দৌলা বাংলা-বিহারের স্বাধীনতা বিদেশী শক্তির হস্তে বিক্রয় না করার জন্য মীর জাফরসহ হিন্দু প্রধানগণের কাছে বার বার আকুল আবেদন জানান। কিন্তু তার সকল নিবেদন আবেদন অরণ্যরোদনে পরিণত হয়। বিশ্বাসঘাতকের দল তাদের বহুদিনের পুঞ্জীভূত আক্রোশের প্রতিশোধ গ্রহণ করে দেশের স্বাধীনতার বিনিময়ে। এতেও তাদের প্রতিহিংসা পুরোপুরি চরিতার্থ হয়নি। সিরাজউদ্দৌলাকে পৈশাচিকভাবে হত্যা করেই তারা তাদের প্রতিহিংসার প্রজ্বলিত অগ্নি নির্বাপিত করে।
সিরাজউদ্দৌলাকে ধরাপৃষ্ঠ থেকে অপসারিত করে অন্য কাউকে বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত করাÑ ইংরেজদের উদ্দেশ্য ছিল না। তারা চেয়েছিল এ দেশে তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে। মীর জাফরকে তারা কাষ্ঠপুত্তলিকাবৎ গদিতে প্রতিষ্ঠিত করে। মীর জাফর তাদের ক্রমবর্ধমান অন্যায় দাবি মিটাতে সক্ষম হয়নি বলে তাকেও অবশেষে সরে দাঁড়াতে হয়। হিন্দু প্রধানদের নিকটে শুধু সিরাজদ্দৌলাই অপ্রিয় ছিলেন না। যদি তাই হতো, তাহলে তাঁর স্থলে তাদেরই মনোনীত ব্যক্তি মীর জাফর এবং তারপর তাদেরই মনোনীত মীর কাসিম তাদের অপ্রিয় হতো না। তাদের একান্ত কামনার বস্তু ছিল মুসলিম শাসনের অবসান। তাই নিজের দেশের স্বাধীনতা জলাঞ্জলি দিয়ে মুসলিম শাসনের পরিবর্তে বিদেশী শাসনের শৃঙ্খল স্বেচ্ছায় গলায় পরিধান করতে তারা ইতস্তত করেনি। মীর জাফরের পর মীর কাসিম আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন দেশের প্রশাসন ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধন করতে এবং তার  সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে। কিন্তু তিনিও ইংরেজদের অদম্য ক্ষুধার খোরাক জোগাতে পারেননি বলে বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে তাঁকেও বিদায় নিতে হয়। (হিল, যদুনাথ সরকার; ম্যালিসন, ড. মোহর আলী)
বাংলা-বিহার তথা ভারতে ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দু’শ বছরে এ দেশের জনগণের ভাগ্যে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। অবশ্য কিছু বৈষয়িক  মঙ্গল সাধিত হলেও পরাধীনতার অভিশাপ, লাঞ্ছনা-অপমান জাতিকে জর্জরিত করেছে। সিরাজউদ্দৌলার পতনের অব্যবহিত পরে এ অঞ্চলের অধিবাসীদের বিশেষ করে মুসলমানদের ওপর যে শোষণ নিষ্পেষণ চলেছিল তার নজির ইতিহাসে বিরল। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, দারিদ্র্য দেশকে গ্রাস করে ফেলে।
পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন এবং পরে তিনি নিহত হলে মীর জাফর বাংলার নবাব হন। মীর জাফরের নবাবিকালে ইংরেজরা কার্যকরভাবে বাংলার নিয়ন্ত্রণ কব্জা করে। ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে নবাব মীর কাসিম ও মোগল স¤্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম সম্মিলিতভাবে পরাজিত হলে উত্তর ভারতে ব্রিটিশদের আধিপত্য বিস্তারের পথে আর কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেননি। বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের ভিত রচিত হয়। ব্রিটিশদের এ সাফল্যের পেছনে ঐতিহাসিক নগরী কলকাতার বিরাট অবদান ছিল। কর্নাটক যুদ্ধে কলকাতা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঘাঁটি থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তারা ফরাসিদের পরাজিত করতে বাংলার সম্পদকে কাজে লাগিয়েছিল। ড. আর. সি. মজুমদার তার ‘এন অ্যাডভান্সড হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’য় মন্তব্য করেছেন, সত্যিকারভাবে পলাশীর যুদ্ধকে ভারতে ফরাসিদের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে।
১৭৫৭ সালের ১৩ জুন মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট  ডেভিডের গভর্নর অ্যাডমিরাল চার্লস ওয়াটসন নৌপথে ও ডেপুটি গভর্নর কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ চন্দরনগর (বর্তমান চন্দননগর) থেকে স্থলপথে যাত্রা করেন। চন্দরনগর ছিল একসময় ফরাসিদের ঘাঁটি। ক্লাইভের সঙ্গে যুদ্ধে ফরাসিরা এ ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ হারালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেখানে তাদের আধিপত্য কায়েম করে। ১৯ জুন ক্লাইভের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা কাটওয়ায় পৌঁছে। আগের দিন মেজর আয়ারকুট কাটওয়া দখল করে নিয়েছিলেন। ২১ জুন ক্লাইভ কলকাতার প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উত্তরে মুর্শিদাবাদ থেকে ১৬ মাইল ভাটিতে আ¤্রবাগান শোভিত পলাশী নামে একটি গ্রামের বিপরীতে গঙ্গা নদীর শাখা ভাগিরথী নদীর তীরে পৌঁছান।
ইংরেজরা এসেছিল নৌকায়। অন্য দিকে দেশীয় সিপাহিরা এসেছিল হুগলী নদীর তীর ধরে হেঁটে। ক্লাইভ শিকারের জন্য ব্যবহৃত একটি ঘরে নিজের সদর দফতর স্থাপন করেন। তার মনে ছিল শঙ্কা। জীবনের প্রথম ভয় তাকে স্পর্শ করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান তিনি। নিজের ক্ষুদ্র সামর্থ্যরে কথা ভেবে তিনি যুদ্ধ বিলম্বিত করার কথা ভাবতে থাকেন। সহযোদ্ধাদের তিনি বলেন যে, অন্য কোনো পক্ষ অথবা মিত্র কোনো দেশের সহযোগিতা ছাড়া যুদ্ধে বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই তিনি অভিযান বিলম্বিত করার প্রস্তাব দেন। অন্যরা তার প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় তিনি ১৬ জন ইংরেজ অফিসারকে নিয়ে একটি কাউন্সিল গঠন করেন। যুদ্ধ বিলম্বিত করা হবে নাকি এ মুহূর্তে যুদ্ধ শুরু করা হবে, এ প্রশ্নে ২১ জুন ওয়ার কাউন্সিলে ভোটাভুটি হয়। ৯ জন সদস্য যুদ্ধ বিলম্বিত করার পক্ষে ভোট দেন। ক্লাইভ ছিলেন তাদের একজন। মেজর আয়ারকুটের নেতৃত্বে অন্য সাতজন সদস্য অবিলম্বে যুদ্ধ শুরু করার পক্ষে রায় দেন। তারা যুক্তি দিয়ে বলেন যে, বিলম্বিত করা হলে অথবা পিছু হটলে পরাজয় নিশ্চিত। নিজের কাপুরুষতার প্রতি ধিক্কার আসায় এবং মীর জাফরের পত্রে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির কথা মনে হওয়ায় ক্লাইভ মনোভাব পরিবর্তন করেন। তিনি এক ঘণ্টা চিন্তা করেন। মীর জাফর ক্লাইভের কাছে পাঠানো এক পত্রে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধ শুরু হলে তিনি নবাবের পক্ষে অস্ত্রধারণ করবেন না। ২২ জুন বিকেলে মীর জাফরের কাছ থেকে সবুজসঙ্কেত পেয়ে ক্লাইভ পলাশীর উদ্দেশে যাত্রা করেন। মধ্যরাতে তিনি সেখানে পৌঁছান। প্রবল বৃষ্টিপাতের পর সূর্য উঁকি দেয়। ক্লাইভ ৩ হাজার ৩ শ’  সৈন্য ও ৯টি কামান নিয়ে ভাগিরথী নদী অতিক্রম করেন এবং পলাশী গ্রামের পাশে একটি আমবাগান ও কয়েকটি পুকুরের পাড়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। অন্য দিকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা যাত্রা করেন রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে। ইংরেজদের ১২ ঘণ্টা আগে পলাশীতে তিনি তাঁবু খাটান।
২৩ জুন ভোর ৭টায় প্রচন্ড গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় যুদ্ধ শুরু হয়। নবাবের সৈন্যরা তাদের সুরক্ষিত শিবির থেকে বের হয়ে ব্রিটিশ শিবিরে ব্যাপক গোলাবর্ষণ করে। তুমুল যুদ্ধের একপর্যায়ে নবাবের পক্ষের বিজয় সুনিশ্চিত হয়ে ওঠে। সকাল ১১টায় মীর মদন, মোহনলাল, খাজা আবদুল হাদি খান ও নবাব সিংহাজারী প্রচন্ড গতিতে হামলা চালালে ব্রিটিশ সৈন্যরা পিছু হটে আমবাগানে আশ্রয় নেয়। ঠিক তখন গোলন্দাজ বাহিনীর কমান্ডে নিয়োজিত বকশি মীর মদন ব্রিটিশ কামানের গোলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মারা যান। এ ঘটনায় যুদ্ধের দৃশ্যপট পাল্টে যায়। মীর মদনের অধীনস্থ সৈন্যসহ গোলন্দাজরা আতঙ্কিত হয়ে নিজেদের তাঁবুতে ফিরে আসে। তখন ছিল দিনের মধ্যভাগ। গোলন্দাজ সৈন্যরা মীর মদনের লাশ নিয়ে তাঁবুতে ফিরে। নবাবের অধীনে তখন ছিল মাত্র ২ হাজার সৈন্য। তিনি এ মুষ্টিমেয় সৈন্য নিয়ে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। ঐতিহাসিকরা বলছেন যে, মীর মদনের মতো নবাবের অধীনস্থ সকল সেনাপতি একযোগে হামলা চালালে ব্রিটিশরা অবশ্যই পরাজিত হতো। কিন্তু সেনাপতি ইয়ার লতিফ খান ও রায় দুর্লভ সেনাপতি মীর জাফরের মতো রণাঙ্গন থেকে দূরে অবস্থান করছিলেন। সেনাপতি মীর জাফর তার অধীনস্থ ১৬ হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের বামদিকে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকেন। নবাব তাকে বার বার তার পাশে এসে যুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। কিন্তু জাফর নবাবের আহ্বানে সাড়া দেননি।
ব্রিটিশদের কামানের পাল্লা ছিল নবাবের কামানের পাল্লার চেয়ে দীর্ঘ। দুপুর ১২টায় মুষলধারে বৃষ্টি নবাবের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষায় ব্রিটিশরা তাদের কামান ও গোলাবারুদ আচ্ছাদন  দিয়ে ঢেকে রাখলেও ৪০ জন ফরাসি কামান চালক নবাবের কামান রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বৃষ্টিতে গোলাগুলি ভিজে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে।  বেলা ২টা থেকে নবাবের কামান থেকে গোলাবর্ষণ বন্ধ হয়ে যায়। ক্লাইভের অন্যতম সহযোগী মেজর কিলপ্যাট্রিক দু’টি বাহিনীর মাঝামাঝি একটি পুকুরের বিপরীত দিক থেকে হামলা চালান। কামান ও গোলাগুলিতে কাজ না হওয়ায় এবং মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ধরা পড়ায় নবাবের সৈন্যরা ভীত হয়ে পড়ে। সেনাপতি মীর মদন নিহত হলে নবাব সিরাজউদ্দৌলা মীর জাফরকে তার শিবিরে ডেকে পাঠান। মীর জাফর পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার শপথ করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে নবাবকে পরামর্শ দেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, পরদিন ভোরে নতুন উদ্যমে লড়াই শুরু করা হবে। নবাব সরল বিশ্বাসে মীর জাফরের পরামর্শে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেন এবং পরদিন নাগাদ যুদ্ধ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। মীর জাফর নবাবের শিবির থেকে বের হয়েই গুপ্তচর মারফত ইংরেজদের কাছে একটি গোপন চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি অবিলম্বে নবাবের সৈন্যদের ওপর আক্রমণ চালানোর জন্য ক্লাইভকে ইঙ্গিত দেন। ক্লাইভ আক্রমণ চালান। নবাবের পিছু হটা সৈন্যরা অতর্কিত আক্রমণে হকচকিত হয়ে পড়ে।
দাউদপুর শিবিরের সৈন্যরা পালিয়ে নদীর ওপারে চলে যায়। নবাব পলায়নরত সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসার আহ্বান জানান। সূর্যাস্তের দুই ঘণ্টা আগে সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীতে ব্যাপক পলায়ন শুরু হয়। ৫টার মধ্যে তার সকল সৈন্য মাঠ ত্যাগ করে। তখন রণাঙ্গনে ব্রিটিশ সৈন্যদের একক নিয়ন্ত্রণ কায়েম হয়। তারা নবাবের কামানগুলো দখল করে। এ পরিস্থিতিতে নবাব যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগে বাধ্য হন। রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে নৌকায় পাটনার রাজমহলের উদ্দেশে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেন। ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত নবাব দানা শাহ নামে এক ফকিরের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ লোভী ফকির নবাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করায় তিনি ভগবান গোলায় ধরা পড়েন। ২৭ জুন বন্দী করে তাকে মুর্শিদাবাদ নিয়ে আসা হয়। পরে মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে ইরানী প্রহরী মোহাম্মদ আলী বেগ তাকে ২ জুলাই দিবাগত রাতে হাজার দেউরির নিমক হারাম গেইটে হত্যা করে। নবাবের লাশ হাতির পিঠে চড়িয়ে সারা মুর্শিদাবাদ ঘুরিয়ে অমর্যাদাকর অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। তার লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। পরে রাতের অন্ধকারে নবাবের বিশ্বাসী খাদেম হোসেন খাঁ খোশবাগে তাকে সমাহিত করেন।
মৃত্যুকালে তিনি মা আমেনা বেগম, স্ত্রী লুৎফুন্নেসা, কন্যা উম্মে জোহরা ও ভাই মীর্জা মেহেদীকে রেখে যান। ২৯ জুন ইংরেজরা হীরাঝিলে নবাবের প্রাসাদে ঢুকে ধনাগার লুট করে। তারা ৩২ লাখ স্বর্ণমুদ্রা, এক কোটি ৭৬ লাখ রৌপ্য মুদ্রা, দুই সিন্দুক ভর্তি স্বর্ণপিন্ড, চার বাক্স হীরা-জহরত ও দুই বাক্স মণিমুক্তা লুট করে। আর নবাবের গোপন ধনাগার থেকে দেশীয় বিশ্বাসঘাতকরা লুট করে আট কোটি টাকা।
যুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে কতজন হতাহত হয় তা নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত আর্থার ব্রুমের ‘হিস্ট্রি অব বেঙ্গল আর্মি’ নামে ঐতিহাসিক পুস্তকের ৪৮-৪৯ পৃষ্ঠায় বলা হয়, পলাশীতে ব্রিটিশদের পক্ষে ৭২ জন হতাহত হয়। নিহতদের মধ্যে ৭ জন ছিল ইংরেজ এবং আহতদের মধ্যে ছিল ১৩ জন। দেশীয় সিপাহি নিহত হয় ১৬ জন এবং আহত হয় ৩৬ জন। অন্য দিকে ‘দ্য ইন্ডিয়ান রেকর্ড সিরিজ’- এ বলা হয়, ইংরেজ নিহত হয় ৪ জন ও আহত হয় ১৫ জন। দেশীয় সিপাহি নিহত হয় ১৫ জন এবং আহত হয় ৩৮ জন। নবাবের যেসব কামান ব্রিটিশদের হস্তগত হয় সেগুলো কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে সংরক্ষিত হয়েছে।
(চলবে)

SHARE