শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মাতের বৈশিষ্ট্য -ড. মোহাম্মদ অলী উল্যাহ

সরল অনুবাদ
বিশিষ্ট সাহাবী জাবির ইবনে আব্দিল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে পাঁচটি বস্তু দেয়া হয়েছে যা আমার পূর্বে কাউকে দেয়া হয়নি। শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চার করে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে, যা এক মাসের রাস্তার সীমা পর্যন্ত প্রযোজ্য। জমিনকে আমার জন্য মসজিদ তথা সালাত আদায়ের যোগ্য ও পবিত্রতা অর্জনের যোগ্য করে দেয়া হয়েছে। আমার উম্মাতের যে কোনো ব্যক্তি যে কোন স্থানে সালাতের সময় হলেই সালাত আদায় করতে পারবে। আর আমার জন্য গনিমত তথা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হালাল করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে কারো জন্যই হালাল ছিলো না। আমাকে (কিয়ামত দিবসে) শাফাআত তথা সুপারিশ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। প্রত্যেক নবীকে বিশেষভাবে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে আর আমি সকল মানুষের কাছে প্রেরিত হয়েছি। (সহীহুল বুখারী, ১ম খন্ড, পৃ ৩৪৫, হাদিস নং- ৩৩৫; সহীহ মুসলিম, ২য় খন্ড, পৃ ৬৩, হাদিস নং- ১১৯১

রাবি পরিচিতি
জাবির ইব্ন আব্দিল্লাহ ইব্ন আমর ইব্ন হারাম ইব্ন কাব ইব্ন সালামা আল-আনসারি আস-সুলামি। উপনাম আবু আব্দিল্লাহ, আবু আব্দির রহমান ও আবু মুহাম্মাদ। মুকছিরিন তথা রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে অধিক সংখ্যায় হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবীগণের অন্যতম। অনেক সাহাবীই তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি ও তাঁর পিতা দু’জনই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাহচর্য লাভে ধন্য হয়েছেন। তিনি ‘আকাবায় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে মোট ১৯টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য হয়েছিল এই বিশিষ্ট সাহাবীর। জাবির (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) লায়লাতুল জামালে [জাতুর রুকা যুদ্ধ শেষে জাবির (রা)-এর ঘোড়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নবী (সা) তা ক্রয় করেছিলেন যে রাতে তাকে লায়লাতুল জামাল বলা হয়] আমার জন্য ২৫ বার ইস্তেগফার করেছেন। বর্ণিত আছে যে, মসজিদে নববীতে তাঁর একটি ইলমি জলসা ছিল যেখানে অনেক সাহাবা ও তাবেঈ তাঁর কাছে থেকে ইলমের দীক্ষা নিতেন। শেষ বয়সে দৃষ্টিশক্তি লোপ পেয়েছিল। বিশিষ্ট তাবেঈ কাতাদা বলেন, মদিনায় মৃত্যুবরণকারী শেষ সাহাবী হলেন জাবির ইব্ন আব্দিল্লাহ। দীর্ঘজীবী সাহাবী জাবির (রা) ৭৮ মতান্তরে ৭৪ মতান্তরে ৭৩ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৯৪ বছর। কোনো কোনো বর্ণনামতে হাজ্জাজ যেন তাঁর জানাজায় অংশগ্রহণ না করে এ মর্মে তিনি অসিয়ত করেছিলেন। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হাজ্জাজ তাঁর জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন।

হাদিসের ব্যাখ্যা

অত্র হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কতিপয় বৈশিষ্ট্য বা মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে যা তিনি ব্যতীত অন্য কোনো নবী বা রাসূলকে দেয়া হয়নি। কাজেই তা অন্য কোনো অলি বা মুর্শিদের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়। বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্যতম হলোÑ আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় রাসূলের (সা) শত্রুদের মনে  এমন অস্থিরতা ও ভীতি সঞ্চার করে দেন যাতে তারা এক মাসের দূরত্বের রাস্তায় থাকলেও রাসূলের ভয়ে তটস্থ ও বিচলিত থাকে। একজন নবী বা রাসূলের দাওয়াতি মিশনে সফলতা লাভের জন্য এ ধরনের বিশেষত্ব খুবই তাৎপর্য বহন করে। আর এটি শেষ নবীর প্রতি তাঁর রবের পক্ষ থেকে অন্যতম উপহার। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্য আহলে কিতাব ও অন্যান্যÑ তাদের নির্দিষ্ট ইবাদতখানায় ইবাদত করা অপরিহার্য হলেও শেষ নবী ও তাঁর উম্মতের জন্য পুরো জমিনকে নামাজের স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং মাটি দ্বারা তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জনের বিধান দেয়া হয়েছে। (ঈসা আ:-কে যেকোনো মাটিতে নামাজের অনুমতি দিলেও তা দ্বারা পবিত্রতা অর্জনের অনুমতি দেয়া হয়নি।)  নিঃসন্দেহে এ দুর্লভ সুযোগ তাদের দীন পালনে অত্যন্ত সহায়ক ও আরামদায়ক হবে। অতএব যখন যেখানে নামাজের সময় হবে তখন সেখানে নামাজ আদায় করা যাবে। (অবশ্য পরবর্তীতে অন্য হাদিসের দ্বারা কবরস্থান, গোসলখানা ও অপবিত্র স্থানে নামাজ আদায় করতে নিষেধ করা হয়েছে।) এ ছাড়া মাটিকে পবিত্র করা হয়েছে যাতে তা দ্বারা তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করা যায়। এটিও এই উম্মতের জন্য আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কার। তৃতীয় বৈশিষ্ট্য বা মর্যাদা হলো এইÑ নবী ও তাঁর উম্মতের জন্য যুদ্ধলব্ধ গনিমতের মাল (কাফিরদেরকে পরাজিত করার পর তাদের কাছ থেকে নেয়া সম্পদ) হালাল করা হয়েছে, যা পূর্বে কোনো নবীর জন্য বৈধ ছিল না। পূর্বেকার নবী-রাসূলগণ শত্রুদের পরাজিত করে যে সম্পদ লাভ করতেন তা নির্দিষ্ট এক স্থানে রেখে দেয়া হতো এবং আগুন এসে সেগুলোকে ভস্মীভূত করে দিত। হাদিসের কোনো কোনো ভাষ্যকার অভিমত দেন যে, এটিকে তাঁদের জিহাদ তথা আল্লাহর পথে লড়াইয়ে নিয়্যতের বিশুদ্ধতা বা এখলাসের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হতো। চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হলোÑ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কিয়ামত দিবসে শাফাআত বা সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হবে এবং তাঁর সুপারিশ গ্রহণ করার ব্যাপারে আল্লাহ্ তা’আলা অঙ্গীকার করেছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সা)-কে বলা হবে তুমি সুপারিশ করো, তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। আলোচ্য হাদিসে বর্ণিত এই সুপারিশ দ্বারা কোন সুপারিশকে বুঝানো হয়েছে তা নিয়ে ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ বিভিন্ন উক্তির অবতারণা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এই সুপারিশ দ্বারা কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাওয়ার সুপারিশকে বুঝানো হয়েছে। কারো মতে ইহা দ্বারা এমন সুপারিশকে বুঝানো হয়েছে যা আল্লাহ তা’আলা কখনো প্রত্যাখ্যান করবেন না। কোনো কোনো আলেমের মতে এই সুপারিশ দ্বারা যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ ঈমান রয়েছে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনার সুপারিশকে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, বেহেশতের মধ্যে স্তর উন্নয়ন বা মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য যে সুপারিশ করা হবে তাকে বুঝানো হয়েছে। কারো মতে যাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে গেছে তাদেরকে তা থেকে রক্ষা করার সুপারিশকে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, বিনা হিসাবে বিশেষ কোনো দলকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য যে সুপারিশ করা হবে তাকে বুঝানো হয়েছে। (উমদাতুল ক্বারী শরহু সহীহিল বুখারী, ৪র্থ খন্ড, পৃ. ১০) পঞ্চম ও সর্বশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সকল নবীকে তাঁদের স্ব স্ব সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে আর আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)-কে সাদা, কালো, আরব, অনারব নির্বিশেষ সকল মানুষের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,
“আর আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির নিকট সুসংবাদদানকারী ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এ বিষয়ে জ্ঞান রাখে না।” (সূরা সাবা, আয়াত-২৮) এ আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, নবী (সা)কে সমগ্র মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। আর এটি হচ্ছে তাঁর জন্য বিশেষ নিয়ামত ও পুরস্কার। কেননা সকল নবীকেই বিশেষ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে; ব্যতিক্রম শুধু শেষ নবীর (সা) ক্ষেত্রে।

হাদিসের শিক্ষা

হযরত জাবির (রা) কর্তৃক বর্ণিত উপরোক্ত হাদিসের প্রতি গভীরভাবে মনোনিবেশ করলে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় পরিলক্ষিত হয়।
১.    এই হাদিস আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মত তথা আমাদের জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্যের বার্তা বহন করে।
২.    রাষ্ট্রনায়ক বা আল্লাহর পথে দাঈ হিসেবে সফলতা লাভের জন্য শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চার অত্যন্ত জরুরি।
৩.    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শত্রু বা প্রতিপক্ষের লোকদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার  করে তাঁকে যে সাহায্য করা হয়েছে এটি তাঁর মু‘জিযার অংশ।
৪.    পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার।
৫.    গনিমতের মাল দ্বারা উপকৃত হওয়া বৈধ।
৬.    বিশেষ কোন দল, গোত্র, বংশ বা জাতির কাছে প্রেরিত না হয়ে বিশ্বমানবতার দূত হিসেবে আগমন আমাদের প্রিয় নবীর সা. অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে তাঁর সন্তুষ্টি মোতাবেক কাজ করার তৌফিক দিন। আমিন! ছুম্মা আমিন!!

লেখক : প্রফেসর, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

SHARE