বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস -মতিউর রহমান আকন্দ

[ পূর্ব প্রকাশের পর ]

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ
ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতে ধর্মীয় আলেমগণ পরাধীন মুসলমানদের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। দারুল উলুম দেওবন্দের ভূমিকা ছিল অগ্রণী। দেওবন্দ ছিল সর্বভারতীয় মুসলমানদের সংগঠন ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’-এর কেন্দ্রস্থল। তবে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের আত্মপ্রকাশ ঘটার আগে ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতেন শায়খুল হিন্দ হযরত মাহমুদুল হাসান (র.)। তিনি একসময় শাহ আবদুল আজিজের (র.) জিহাদি আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে তিনি পবিত্র মক্কাশরিফ যান এবং তার শিষ্য উবায়দুল্লাহ সিন্ধিকে জিহাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাবুলে প্রেরণ করেন। উবায়দুল্লাহ সিন্ধি তিন টুকরো রেশমি কাপড়ে কাবুলে জিহাদের প্রস্তুতি ও আন্দোলনের বিবরণ দিয়ে একটি পত্র লিখেন। এ পত্র পাঞ্জাবের গভর্নর মাইকেল ওডায়ারের হস্তগত হয়। উবায়দুল্লাহ সিন্ধির রেশমি রুমাল ধরা পড়ে যাওয়ায় শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসানকে মক্কা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ মাল্টায় বন্দি করে রাখা হয়।
শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসানের ইচ্ছা ছিল, তার অবর্তমানে জিহাদি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। তার মৃত্যুর পর মাওলানা আবুল কালাম আজাদ মাওলানা মাহমুদুল হাসানের ইচ্ছা পরিত্যাগ করে করমচাঁদ মোহনদাস গান্ধীর আদর্শ গ্রহণ করেন। মাওলানা আজাদ জিহাদি রাজনীতির পথ পরিত্যাগ করায় ১৯৪৬ সালে আল্লামা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী ও আল্লামা সাব্বির আহমদ উসমানীর নেতৃত্বে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ গঠন করা হয়। তবে দ্বিজাতি তত্ত্ব নিয়ে আল্লামা মাদানী ও আল্লামা উসমানীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। মাওলানা মাদানী ছিলেন অখন্ড ভারতের পক্ষে। অন্যদিকে মাওলানা সাব্বির আহমদ উসমানী ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে। মাওলানা সাব্বির মাওলানা মাদানীকে বুঝানোর চেষ্টা করেন যে, ব্রিটিশ পরবর্তী অখন্ড ভারতে বর্ণ হিন্দুদের আধিপত্য কায়েম হবে এবং সেখানে মুসলমানদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে। কিন্তু তিনি তাকে বুঝাতে ব্যর্থ হন। ১৯৪৫ সালে কলকাতার মোহাম্মদ আলী পার্কে মাওলানা সাব্বির আহমদ উসমানীকে সভাপতি করে একটি নয়া সংগঠন দাঁড় করানো হয়। এ সংগঠনের নামকরণ করা হয় ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম’। এভাবে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী এবং অন্য অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সাব্বির আহমদ উসমানী। মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (র.), মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী, মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ শফি, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর, মাওলানা এহতেশামুল হক থানবী, মাওলানা সৈয়দ সোলায়মান নদভী, ফুরফুরার আবদুল হাই সিদ্দিকী, মাওলানা আতাহার আলী, মাওলানা দ্বীন মোহাম্মদ খান প্রমুখ দেশবরেণ্য আলেম জমিয়তে উলামায়ে ইসলামে যোগদান করেন। (সূত্র : পলাশী থেকে একাত্তর- সাহাদাত হোসেন খান)

অসহযোগ আন্দোলন
ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অসহযোগ আন্দোলন এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ইতঃপূর্বে ইতালিতে টলস্টয় স্বৈরাচারী সরকারকে অচল করে দেয়ার জন্য এক খোলা চিঠিতে এ ধরনের কর্মসূচির প্রস্তাবনা তুলে ধরেছিলেন।  ঘটনাটি ছিল ‘১৯০১ সালে ইতালির রাজা জনৈক নৈরাজ্যবাদী কর্তৃক আক্রান্ত হন। টলস্টয় তখন নৈরাজ্যবাদী মহলের প্রতি লেখা তাঁর এক খোলা চিঠিতে বলেন যে, হিং¯্রতার পথ নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভুল এবং রাজনৈতিক দিক থেকে দেখতে গেলে এর আদৌ কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই। একজনকে হত্যা করা হলে অপরজন এসে তাঁর স্থান দখল করবে। প্রকৃতপক্ষে হিং¯্রতা তার চাইতে বড় হিং¯্রতাকে ডেকে আনে। গ্রিক উপকথায় আছে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত প্রত্যেকটি সৈন্যের রক্তের ছিটায় ৯৯৯ জন করে নতুন সৈন্য বেরিয়ে আসে। রাজনৈতিক হত্যাকান্ডে জড়িত হওয়ার মানে দাঁড়ায় অজগরের দাঁত বপন করা। টলস্টয় তাই তাঁর পরামর্শে বলেন যে, একটা স্বৈরাচারী সরকারকে অচল করে দেয়ার পথ হলো কর দিতে অস্বীকার করে বসা, সরকারি চাকরিসমূহে ইস্তফা দেয়া এবং সরকারি আনুকূল্যে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানকে বয়কট করা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, এমন ব্যবস্থা অবলম্বন করলে যে কোন সরকার একটা সমঝোতায় আসতে বাধ্য।’
টলস্টয়ের এ বক্তব্য সমসাময়িককালে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ভারতের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখক, কলামিস্টদের পক্ষ থেকে এ ধরনের কর্মসূচি গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। ১৯২০ সালে মি: গান্ধী টলস্টয়ের অনুরূপ অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি তুলে ধরেন। কলকাতার কংগ্রেস সম্মেলনে অসহযোগ আন্দোলন অনুমোদন করা হয়।
তুর্কি খেলাফত প্রশ্নে ভারতীয় মুসলমানদের ভূমিকার প্রেক্ষিতে মি: গান্ধী এ আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি উপলব্ধি করে এ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। মি: গান্ধী খেলাফত আন্দোলনকে সহযোগিতার জন্য ভারতের ২৩ কোটি হিন্দুর প্রতি আহ্বান জানান। তুরস্ক ও ভারতের প্রতি ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধে মুসলমানরা ক্রমেই সোচ্চার হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক ব্রিটিশের বিপক্ষ দলে যোগদান করে। যুদ্ধে সম্মিলিত শক্তির জয় হয়। যুদ্ধে জয়ের সাথে সাথেই তারা একটি গোপন চুক্তির মাধ্যমে বিরাট তুর্কি সা¤্রাজ্যকে নিজেদের মধ্যে ভাগ বণ্টন করে ফেলে। ১৯১৯ সালের মে মাসে উসমানী রাজধানীতে নামসর্বস্ব সুলতান ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। আলজেরিয়া থেকে বাহরাইন পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চল খন্ড-বিখন্ড করে ফ্রান্স, গ্রিস ও ব্রিটেনের মধ্যে বিতরণ করা হয়। উসমানীয় রাষ্ট্রকে খন্ড-বিখন্ড করায় মুসলমানদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। ১৯১৯ সালের ডিসেম্বরে অমৃতসরে খেলাফত আন্দোলনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে খেলাফত আন্দোলন চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি গৃহীত হয়। ভাইসরয় ও ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে খেলাফত আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদল সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতিনিধিদল ভাইসরয়ের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তারা তুর্কি সামম্জ্যকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তা ও খলিফা হিসেবে তুর্কি সুলতানের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। কিন্তু কোন ফল পাওয়া যায়নি। ভাইসরয় প্রতিনিধিদলকে বলেন, ব্রিটিশ সরকারের সম্মুখে মুসলিম সমাজের মনোভাব তুলে ধরার জন্য কোন প্রতিনিধিদল যদি বিলাত যেতে চায় তবে সরকার তাদের যাবার ব্যাপারে সর্বপ্রকার সুযোগ-সুবিধে দিতে প্রস্তুত রয়েছেন। এ ব্যাপারে তার নিজের যে করার মত কিছুই নেই এটাও তিনি ব্যক্ত করলেন।
১৯২০ সালের জানুয়ারি মাসে ডা. আনসারীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বড় লাটের সাথে দেখা করেন। ঐ বছর মার্চ মাসে মাওলানা মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে আরেকটি প্রতিনিধিদল যান ব্রিটেনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জের সাথে দেখা করার জন্য। কিন্তু কোন ফল পাওয়া যায়নি। এ প্রেক্ষিতে পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করার জন্য একটি সভা আহ্বান করা হয়। সে সভায় মি: মোহাম্মদ আলী, মি: শওকত আলী, হাকিম আজমল খান এবং ফিরিঙ্গিমহল্লী লক্ষেèৗর মাওলানা আব্দুল বারী উপস্থিত ছিলেন। এ সভাতেই মি: গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের পরিকল্পনা পেশ করেন। তিনি বলেন, ‘স্মারকপত্র এবং প্রতিনিধিদল প্রেরণের যুগ গত হয়ে গেছে। আমাদের অবশ্যই সরকারের প্রতি সর্বপ্রকার সমর্থন প্রত্যাহার করে নিতে হবে। একমাত্র এ পন্থাই সরকারকে একটা সমঝোতায় আসতে বাধ্য করা যাবে। তিনি প্রস্তাব করেন যে, সর্বপ্রকার সরকারি খেতাব বর্জন করতে হবে। আইন-আদালত এবং সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে বয়কট করতে হবে। ভারতীয়দের উচিত হবে সর্বপ্রকার সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দেয়া এবং নবগঠিত আইন সভায় অংশগ্রহণের অস্বীকৃতি জানানো।’
সভায় উপস্থিত যার যার অবস্থান থেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বক্তব্য রাখেন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এ কর্মসূচি সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘জনগণ যদি প্রকৃতই তুরস্ককে সাহায্য করতে চায়, তবে গান্ধীজীর রচিত এ কর্মসূচি ছাড়া অপর কোন বিকল্প নেই।’ (সূত্র : ভারত যখন স্বাধীন হচ্ছিল- আবুল কালাম আজাদ)
দিল্লির খেলাফত সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে মি: গান্ধী বলেন, ‘মুসলমানদের অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য বয়কট নয়, প্রয়োজন অসহযোগিতা।’ (History of Freedom Movement in India, by Twachand Page- 417)
গান্ধী খেলাফত আন্দোলনের সুযোগে অসহযোগ আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে খেলাফত আন্দোলনকে যুক্ত করতে চেষ্টা করেন। তার এ প্রচেষ্টা পূর্ণতা পায় কংগ্রেসের ১৯২০ সালের মে মাসের কলকাতা সম্মেলনে।
এর আগে বেশ কিছু ঘটনা সংঘটিত হয়। ১৯১৯ সালের ডিসেম্বরে অমৃতসরে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের অধিবেশন হয়। সদ্য গঠিত ‘জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ’কেও আহ্বান জানানো হয় এ সম্মেলনে। তারাও তাদের আনুষ্ঠানিক সম্মেলন এ সময় অমৃতসরে করে। অমৃতসর সম্মেলনে কায়েদে আযম মুসলিম লীগের স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত হন। মুসলিম লীগ সম্মেলনে তুরস্ক ও ভারতের প্রতি ব্রিটিশ নীতির তীব্র সমালোচনা করা হয়।
১৯২০ সালের জানুয়ারিতে মিরাটে অনুষ্ঠিত হয় খেলাফত সম্মেলন। খেলাফত কমিটিতে গান্ধীর যে অসহযোগ পাস হয়েছিল এ খেলাফত সম্মেলনে তা অনুমোদিত হয়। এ বছরই মে মাসে কলকাতার কংগ্রেস সম্মেলনে খেলাফত আন্দোলনের সাথে ‘স্বরাজ’ দাবি যুক্ত করে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব পাস করিয়ে নেন। এরপর থেকে আন্দোলনের গুরুত্ব খেলাফত সংশ্লিষ্ট বিষয় থেকে স্বরাজ বা স্বদেশ সংক্রান্ত বিষয়ের দিকেই ঘুরে যায়। মে মাসে বোম্বাইতে খেলাফত কমিটির বৈঠকে ‘অসহযোগ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয়। বলা হয় দেশবাসী সরকার প্রদত্ত সম্মানসূচক পদ ও পদবি প্রত্যাখ্যান করবে, আইন সভার সদস্যপদ পরিত্যাগ করবে, সরকারের সামরিক ও বেসামরিক পদ থেকে ইস্তফা দেবে, এমনকি প্রয়োজনে কর প্রদান হতেও বিরত থাকবে।’
(পাকিস্তান : দেশ ও কৃষ্টি, মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, পৃ: ১৪১)
১৯২০ সালের ১ আগস্ট থেকে অসহযোগ শুরু হয়। চলে ১৯২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। গোটা ভারতে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। গান্ধী তার সকল পদক সরকারকে ফিরিয়ে দেন। কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও তাঁর সহযোগী আলেমবৃন্দ ফতোয়া দেন ব্রিটিশ শাসিত ভারত ‘দারুল হরব’। তারা নির্দেশ দিলেন যে, এ দেশ ছেড়ে মুসলমানদের চলে যাওয়া উচিত। প্রথমে সিন্ধু পরে গোটা দেশ থেকে হাজার হাজার মুসলমান আফগানিস্তানে হিজরত শুরু করে। আন্দোলন শুরুর প্রথম মাসেই ১৮ হাজার মুসলমান দেশান্তরিত হয়। হাজার হাজার লোকের আগমনে ভীত হয়ে আফগানিস্তান তার সীমানা বন্ধ করে দেয়। হিজরত করা হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষ চরম হতাশাগ্রস্ত হয়। ৫ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ মুসলমান বাস্তু হারা হয় এবং তাদের ভাগ্যে জোটে বর্ণনাতীত দুর্গতি। অনেক জীবন নাশ ও অপরিমেয় সম্পদ হানির পর দারুল হরব ঘোষণা প্রত্যাহার করা ও হিজরত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। মুসলমানরা দেশ ত্যাগের ফলে শিক্ষা, চাকরি ও বিভিন্ন পেশায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জিন্নাহ অসহযোগ কর্মসূচির সাথে একমত ছিলেন না। সঙ্গত কারণেই মুসলিম লীগ অসহযোগ আন্দোলনের বিষয়ে নীরব রইল। কিন্তু সরকার সম্পর্কে তার মত প্রকাশ করে বলেন, “এ সরকারকে আর বরদাশত করবো না। একটি পূর্ণ দায়িত্বশীল সরকার চাই।” (পাকিস্তান : দেশ ও কৃষ্টি; মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, পৃ: ১৪১)
অসহযোগ আন্দোলনের ডাক ভারতে এক উন্মাদনার সৃষ্টি করে। কোটি কোটি ভারতীয় এ আন্দোলনে শরিক হয়। ১৯২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি উত্তর প্রদেশে পুলিশের গুলিতে তিনজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়। প্রথমে আন্দোলনকারীর সংখ্যা ছিল দুই হাজার। তিনজন নিহত হওয়ার পর বিক্ষোভকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় হাজার হাজার। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের চৌকিতে অগ্নিসংযোগ করলে ২৫ জন পুলিশ সদস্য ও একজন পুলিশ অফিসার নিহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্রিটিশ সরকার ঐ এলাকায় সামরিক আইন জারি করে। পুলিশ চৌকিতে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশ হত্যার জন্য ১৭২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। মামলার শুনানি শেষে আদালত ১৯ জনকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে। এ ঘটনার পর গান্ধী খেলাফত কমিটির সাথে পরামর্শ না করে ‘পর্বত প্রমাণ ভুল হয়েছে বলে দুঃখ প্রকাশ করে’ অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।
কংগ্রেসও ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে অসহযোগ প্রত্যাহার করে। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গান্ধী ও কংগ্রেস উভয়ই খেলাফত আন্দোলনকে পরিত্যাগ করে। অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করা হলেও ১৯২২ সালের ১০ মার্চ গান্ধীকে গ্রেফতার করা হয়। রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার দায়ে তাকে দু’বছর কারাদন্ড দেয়া হয়।

গান্ধীর পাতা ফাঁদে খেলাফত
ও মুসলমান
খেলাফত আন্দোলনের সাথে গান্ধী ও কংগ্রেসের ভূমিকা মুসলমানদের মাঝে বড় ধরনের আঘাত হানে। খেলাফত নেতৃবৃন্দ ও মুসলিম জনগণ গান্ধীর এ ভূমিকার বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হন। গান্ধী কর্তৃক অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে খেলাফতের সকল নেতাই প্রতিবাদ জানান। আন্দোলন প্রত্যাহার করায় অনেক বিক্ষুব্ধ কংগ্রেস নেতা গান্ধীকে পরিত্যাগ করে। গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে প্রকৃতপক্ষে খেলাফত আন্দোলনের কোনই উপকার হয়নি। মি: গান্ধীর স্বরাজ ও অসহযোগ আন্দোলন মুসলমানদের ক্ষতিগ্রস্ত করে বেশি। খেলাফত আন্দোলনের স্বার্থে মুসলমানদের সাধারণ অংশ শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ও আলেমসমাজ আন্তরিক ভাবেই অসহযোগ ও স্বরাজ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মুসলমানদের অংশগ্রহণে খেলাফত আন্দোলন ব্যাপক রূপ লাভ করে। এ আন্দোলন ব্রিটিশের মেরুদন্ড ভেঙে দিতে সফল হয়। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ভারতীয়রা স্বাধীনতা অর্জন করে। মুসলমানদের মধ্যে যারা সরকারি চাকরি করতো অসহযোগ আন্দোলনের সময় তারা চাকরি প্রত্যাহার করায় বেকার হয়ে পড়ে। মুসলমানরা অংশগ্রহণ করেছিল ব্যাপকভাবে তাই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেও বেশি। অসহযোগের ঝড় খেলাফতের দাবিকে পেছনে ঠেলে দেয়। গান্ধীর উদ্দেশ্য ছিল খেলাফত আন্দোলনকে সমর্থন দেয়ার নামে তার স্বরাজ আন্দোলনে মুসলমানদের সমর্থন আদায় করা। তিনি মুসলমানদেরকে অসহযোগ আন্দোলনে ঠেলে দিয়ে হঠাৎ করে আবার পিছু টান দিয়ে মুসলমানদের ব্যাপক ক্ষতি করেন। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও গান্ধীর ডাকে প্রভাবিত হয়ে অন্যান্য আলেমদের হঠাৎ করে মুসলমানদের ভারত ত্যাগের নির্দেশ দেয়ার মাধ্যমে মুসলমানদের যে ক্ষতি হয় তার মধ্যেও ষড়যন্ত্র ছিল বলে মনে করা হয়।
খেলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়ে খেলাফত আন্দোলন করা গান্ধীর লক্ষ্য ছিল না, একথা গান্ধীর কথা থেকেই প্রমাণ হয়। তিনি বলেছেন, “খেলাফত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আমি ও মুহাম্মদ আলী ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম।”
(Pakistan in the Formative stage by khalid bin syeed, young India)
গান্ধীর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন। ১৯২২ সালে স্বরাজ ও অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার হবার পর কংগ্রেস ও হিন্দু নেতৃত্বের সাথে খেলাফত আন্দোলনের সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা ঘটে। এর আগেই মুসলিম লীগের সাথে কংগ্রেসের বিচ্ছিন্নতা এসেছিল। এভাবেই শেষ হয়ে যায় হিন্দু-মুসলিম সহযোগিতার একটি অধ্যায়। এর সমাপ্তি ঘটলো উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস ও অনাস্থার গাঢ় অন্ধকারের মাধ্যমে। তা পরবর্তীতে রূপ নেয় দাঙ্গা-হাঙ্গামায়। (সূত্র : এক শ’ বছরের রাজনীতিÑ আবুল আসাদ, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস- আব্বাস আলী খান)

হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা
১৯১৬ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি সভাপতির দায়িত্ব পেয়েই লক্ষেèৗ চুক্তি স্বাক্ষরে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। লক্ষেèৗ প্যাকট একদিকে হিন্দু-মুসলিম সহযোগিতার স্মরণীয় দলিল, অপরদিকে এটি বৈরিতারও ভিত্তি। লক্ষেèৗ চুক্তি মুসলমানদের পৃথক নির্বাচন ও পৃথক প্রতিনিধিদের অধিকার দিয়েছিল। লক্ষ্মৌ চুক্তিতে কংগ্রেস মুসলমানদের দাবি মেনে নেয়ায় হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে মুসলিম লীগ তাদের নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে এবং ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করতে কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলানোর উদ্যোগ নেয়। হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে অনুকূল সম্পর্ক গড়ে ওঠায় এবং অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় সরোজিনী নাইড়– জিন্নাহকে ‘হিন্দু-মুসলিম মিলনের অগ্রদূত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ৮ বছরের বেশি স্থায়ী হয়নি এবং খেলাফত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে এ চুক্তি ভেঙে যায়। চুক্তি ভেঙে গেলেও দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে তা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই প্রথম কংগ্রেস মুসলিম লীগকে ভারতীয় মুসলমানদের একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে এবং মুসলমানদের পৃথক আসনে নির্বাচিত করার দাবিতে একমত হয়ে বস্তুত মুসলমানদের একটি পৃথক জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এভাবে হিন্দু কংগ্রেস ভারতে এক জাতীয়তার পরিবর্তে দ্বিজাতি তত্ত্ব স্বীকার করে নেয়, যা ছিল ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি।
কংগ্রেস লক্ষেèৗ চুক্তি মেনে নিয়েছিল মাত্র। তাদের মধ্যে জাগ্রত ছিল চরম মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব। হিন্দুরা উপলব্ধি করেছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতে মুসলমানরা প্রাধান্য পেতে চলেছে। এর ফলে হিন্দুরা গোটা দেশের উপর একতরফা অধিকার হারাচ্ছে। এ কারণেই গান্ধী অবশেষে এ আইন প্রত্যাখ্যান করেন। হিন্দুবাদী সংগঠনগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে মারমুখী হয়ে ওঠে। এসব সংগঠন মুসলমানদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা শুরু করে। হাজার হাজার মুসলমানকে প্রলোভন দ্বারা হিন্দু করা হয়। মুসলমানদের মসজিদ দখল করা হয়। (রাজমুকুট, সাইদ উদ্দীন আহমদ : পৃষ্ঠা- ২১৯, ২২০)
মুসলমানরা সাম্প্রদায়িক মিলন ও শান্তির আশায় উদারতা প্রদর্শন করে। তারা কোন কোন ক্ষেত্রে ইসলামের চিরাচরিত রীতি-নীতি ভঙ্গ করে হিন্দুদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করে। আর্য সমাজের নেতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দকে মুসলমানরা দিল্লি জামে মসজিদের পবিত্র মিম্বরে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করার সুযোগ দেয়। মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণœ করে শ্রদ্ধানন্দ তথা হিন্দু সমাজকে মুসলমানরা যে অভূতপূর্ব উদারতা প্রদর্শন করলো হিন্দুরা তার প্রতিদান দিয়েছিল মুসলমানদের ওপর হামলা করে।
হিন্দু সংগঠনগুলোর উসকানিমূলক এ ধরনের আচরণের ফলেই দেশব্যাপী দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। দাঙ্গার জন্য পরিবেশ ও উত্তপ্ত অবস্থা তারা সৃষ্টি করে আসছিল বহুদিন ধরে। সাহিত্যের মাধ্যমে মুসলমানদের প্রতি আক্রমণ চালানো হয়। গরু কোরবানিতে বাধা প্রদান, মুসলমানদের রাজকর্ম লাভে হিন্দু কর্তৃক বাধা প্রদান, মুসলমানদের প্রতি হিন্দু জমিদারদের অবৈধ আচরণ এবং সাধারণ হিন্দুরাও পথে-ঘাটে, রেলে-স্টিমারে, হাটে, বাজারে মুসলমানদের প্রতি অবজ্ঞা, ঘৃণাসূচক ব্যবহার ও শ্লেষোক্তি প্রয়োগ প্রভৃতি ছিল এসব দাঙ্গার প্রস্তুতি পর্ব।
[আল-এসলাম, তৃতীয় বর্ষ, ১১ সংখ্যা (১৯১৭)]
১৯২৩ সালে দাঙ্গা মারাত্মক রূপ ধারণ করে। মুসলমানদের শক্তিতে বাধা প্রদান, জব্দ ও কাবু করা, মুসলমান শক্তি চূর্ণ করে তাদেরকে পদানত করে রাখা, সম্ভব হলে ভারত ছাড়া করা এসকল উদ্দেশ্য নিয়ে ‘হিন্দু-সংগঠন সমিতি’ স্থাপিত হয়। (ছোলতান)
হিন্দু সংগঠনগুলোর ক্রমবর্ধমান মুসলিমবিদ্বেষী তৎপরতা ব্যাপক রূপ লাভ করে। ১৯২৬ সালে মুসলিম বিরোধিতা ভীষণভাবে বেড়ে যায়। তা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে। স্বামী শ্রদ্ধানন্দ শুদ্ধি আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতে অজ্ঞ দরিদ্র ও অশিক্ষিত মুসলমানদেরকে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করার এক অভিযান শুরু করে। ধর্মান্তরের পূর্বে মুসলমানদেরকে গোবরের পানি খেতে এবং গোবর পানিতে আপাদমস্তক ধুয়ে অবগাহন করতে বাধ্য করা হতো। বলপ্রয়োগে এভাবে নিরীহ ও নিরক্ষর মুসলমানদেরকে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করার কাজ পূর্ণ উদ্যমে চলতে থাকে। এ অশুভ তৎপরতা মুসলমানদেরকে বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত করে তোলে। যার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ জনৈক আব্দুর রশীদ নামের এক যুবক প্রকাশ্য দিবালোকে শ্রদ্ধানন্দকে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচারে আব্দুর রশীদের প্রাণদন্ড হয়। সে হাসি মুখে ফাঁসি মঞ্চে আরোহণ করে।
এ ঘটনায় সারা ভারতে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গার দাবানল প্রজ্বলিত হয়। হিন্দু সম্প্রদায় লোকের দ্বারা যেখানে সেখানে মুসলিম বস্তিসমূহ আক্রান্ত হতে থাকে। মুসলমানদের জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু লুণ্ঠিত হতে থাকে। হিন্দু নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে সকল দোষ মুসলমানদের ঘাড়ে চাপাতে থাকে। ভারতের সর্বত্র চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচার অব্যাহত থাকে। স্বয়ং গান্ধী প্রকাশ্যে ইসলাম ধর্মের প্রতি কটূক্তি করে বক্তৃতা শুরু করেন। প্রকাশ্য জনসভায় বলতে থাকেন, ‘ইসলাম অন্য ধর্মাবলম্বীকে হত্যা করার মন্ত্রে দীক্ষা দেয় এবং এটাকে মুসলমানরা মনে করে পরকালের মুক্তির উপায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইসলাম এমন পরিবেশে জন্মলাভ করেছে যে, তার চূড়ান্ত শক্তির উৎস আগেও তরবারি ছিল এখনও তরবারিই আছে।’ মি: গান্ধীর এ বক্তব্য সাধারণ মুসলমান ও আলেমসমাজের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
শ্রদ্ধানন্দের হত্যাকান্ডের ঘটনাবলিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার পরিবর্তে ইসলামবিরোধীরা এ ঘটনার জন্য গোটা মুসলিম জাতিকে এবং ইসলামের মূল আদর্শকেই দায়ী করতে আরম্ভ করে। তারা পবিত্র কোরআনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উত্থাপন করে যে, কোরআনের শিক্ষাই মুসলমানদেরকে হিং¯্র করে তোলে এবং তা সামাজিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সহাবস্থানের পরিপন্থী। ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয় যে, ইসলামের শিক্ষা মুসলমানদেরকে এতটা জেদি ও গোড়া বানিয়ে দিয়েছে যে, তারা প্রত্যেক অমুসলিমকে হত্যার যোগ্য বলে মনে করে এবং সেই হত্যাকে বেহেশত লাভের উপায় বলে গণ্য করে। এমনকি কেউ কেউ ধৃষ্টতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে এ কথাও বলেন যে, পৃথিবীতে যতদিন কোরআনের অস্তিত্ব থাকবে ততদিন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তাই সমগ্র মানবজাতির ঐক্যবদ্ধ হয়ে কোরআন চর্চা ও শিক্ষা বন্ধ করা উচিত। এই ভ্রান্ত কথাবার্তা এত ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে থাকে যে, সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরাও বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়ে।
মি: গান্ধী ও হিন্দু নেতৃবৃন্দের ভূমিকায় ভারতের মুসলমানগণ মর্মাহত ও বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। মাওলানা মুহাম্মদ আলী দিল্লির জামে মসজিদে বক্তৃতাকালে দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে একদিন বলেন, ‘গান্ধীজীর উক্তির দাঁতভাঙা জবাব দেয়া দরকার। কারণ তিনি ইসলাম, মহাগ্রন্থ আল কোরআন ও জিহাদের অপব্যাখ্যা করছেন।’ দিল্লি জামে মসজিদের এ বক্তৃতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদী ‘আল-জিহাদ ফিল ইসলাম’ নামক গ্রন্থটি প্রণয়ন করেন।
১৯২২ সাল থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত দাঙ্গায় ৫ হাজারেরও বেশি মুসলমান নিহত হন। আহত হন হাজার হাজার। মুসলমানদের ঘরবাড়ি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট করা হয়। শত শত অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। হিন্দু রাজনীতিকরা কেউ প্রকাশ্যে কেউ গোপনে হিন্দু মহাসভা ও শুদ্ধি আন্দোলনের সাথে ছিলেন। কেউবা মৌন থেকে সহযোগিতা করেন।
১৯২৭ সালে সারাদেশে একত্রিশটি দাঙ্গা সংঘটিত হয়, যা পূর্বের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে। এবার হতাহতের সংখ্যা এক হাজার ছয় শ’। নিহতের সংখ্যা এক শ’ চল্লিশ।
১৯২৮ সালে অবস্থা কিছুটা প্রশমিত হয়। কিন্তু ১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে বোম্বাই শহরে দাঙ্গা সংঘটিত হয় যার ফলে হতাহতের সংখ্যা দাঁড়ায় এগার শ’। কলকাতা দাঙ্গার ন্যায় এখানেও দোকানপাট লুণ্ঠিত হয়। ১৯৩১ সালে কানপুরে প্রচন্ড দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হয় এবং তিন দিন পর্যন্ত হত্যা, লুঠতরাজ ও অগ্নিসংযোগ চলতে থাকে। জনৈক হিন্দু হত্যাকারীর সম্মানে বলপূর্বক দোকানপাট বন্ধ করতে গিয়ে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ শুরু হয় এবং প্রচন্ড আকার ধারণ করে। এ দাঙ্গায় চার-পাঁচ শ’ লোক নিহত হয়, বহুসংখ্যক মসজিদ মন্দির ধ্বংস করা হয় এবং বহু ঘরবাড়ি অগ্নিদগ্ধ হয়।
(A. Hamid: Muslim Separatism in India, p. 162; Cumming: Political India, p. 114-17)
হিন্দু ও মুসলমানের পক্ষ থেকে এসব সংঘর্ষের বিবরণ গান্ধীজীর নিকটে বিবৃত করা হলে তিনি মুসলমানদের ঘাড়েই দোষ চাপান। গান্ধীজী মন্তব্য করেন: আমার মনে কোনোই সন্দেহ নেই যে, অধিকাংশ কলহে হিন্দুদের স্থান দ্বিতীয় পর্যায়ে পড়ে।

(চলবে)

SHARE

Leave a Reply