বাংলাদেশের সাথে বহিঃবিশ্বের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত -ম. সালাহউদ্দিন আইয়্যুবী

কোন রাষ্ট্র জাতিরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে অবস্থিত কর্তৃত্বের (Super national authority)  অস্তিত্ব স্বীকার করে না। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রত্যেক রাষ্ট্রেই স্বাধীন ও সার্বভৌম। তারা প্রত্যেকেই একে অন্যের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীতে এমন কোন রাষ্ট্র নেই যে সম্পূর্ণরূপে নিজের ওপর নির্ভর করে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বাস করতে পারে। প্রত্যেক রাষ্ট্রই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে অপর রাষ্ট্রের ওপর কোন না কোন ভাবে নির্ভরশীল। এভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (Mutual Inter-depence)। বর্তমান কালে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেন সবাই এক বৃহৎ আন্তর্জাতিক পরিবারের সদস্য। বাংলাদেশ এ বাস্তবতার বাইরে নয়।
তাই বাংলাদেশের ১. আত্মরক্ষা ২. অর্থনৈতিক অগ্রগতি ৩. অন্য রাষ্ট্রের তুলনায় নিজের জাতীয় শক্তিকে রক্ষা ও প্রয়োজনবোধে বৃদ্ধি করা ৪. নিজস্ব মতবাদে দৃঢ় থাকা ও ৫. জাতীয় মর্যাদা বৃদ্ধি করা। এই ৫ লক্ষ্য ও কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, সকলের প্রতি বন্ধুত্ব (Friendship with all and malice towards none) এই মূলনীতিকে সামনে রেখে গড়ে তুলেছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪৫ বছর অতিক্রম করেছে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে শুরু করে এই সময়ে বাংলাদেশ বৈদেশিক নীতির বিভিন্ন ধারা আমরা লক্ষ করব। বিভিন্ন সময়ে শাসকগোষ্ঠীর পটপরিবর্তনে বৈদেশিক নীতিরও ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। ফলশ্রুতিতে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও কোন স্থিতিশীল বৈদেশিক নীতি অনুপস্থিত। কিন্তু সময়ের বাস্তবতা হলো সম্পর্কের ভিতকে শক্ত করতে হলে ও নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে অবশ্যই সফল বৈদেশিক নীতি ঠিক করতে হবে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া : আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশ হলো দক্ষিণ এশিয়ার গেটওয়ে। তাই অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশর গুরুত্ব একটু বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের স্বার্থ বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
আর দক্ষিণ এশিয়ার মোড়ল হিসাবে চিন্তা করা হয় ভারতকে। স্বাধীনতাযুদ্ধে সহযোগিতার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু। বাংলাদেশের সীমান্তের সিংহভাগ ভারতের সাথে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা ভারতের সাথে স্বার্থকে অক্ষুন্ন রেখে যুক্তিসঙ্গত কোন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারিনি। ভারত বাংলাদেশের সম্পর্কের চিত্র ওঠে তাদের সীমান্ত আচরণে। নিরপরাধ বাংলাদেশী নাগরিকেরা বিএসএফের গুলিতে মারা যাচ্ছে। কিশোরী ফেলানীর মৃত্যু কিংবা চাঁপাইনবাবগঞ্জের যুবক হাবিবুর রহমানকে উলঙ্গ করে অত্যাচারের দৃশ্য ভারতের খারাপ সম্পর্কের জানান দেয়। গত এক দশকে বিএসএফের হাতে প্রাণ দিয়েছে প্রায় এক হাজার বাংলাদেশী। সীমান্তে চোরাচালান ও মাদক ব্যবসা অনেকটা ওপেন সিক্রেট। সীমান্ত ঘেঁষে শত শত মাদক তৈরির কারখানা গড়ে তুলা হয়েছে। কোন কোন এলাকার বিপুল পরিমাণ জমিতে গাঁজার চাষ করা হচ্ছে।
তা ছাড়া বরাক নদীর ওপর টিপাইমুখ বাঁধ, ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা হিস্যা অনুযায়ী পানি না দেয়া, ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা তৈরি ও প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ইত্যাদি কোন ক্ষেত্রেই ভারতের কাছ থেকে বন্ধুত্বের পরিচয় পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশ সরকার ভারতকে চওয়ার আগেই নৌ, স্থল ও আকাশ পথের ট্রানজিট দিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশকে কী দিলো? সেই অর্থে কিছুই না। সীমান্তে হত্যাকান্ডের ব্যাপারে চোরাকারবারির অভিযোগ তোলা হয়, কিন্তু ভারতের সাথে মিয়ানমার, পাকিস্তান, ভুটান, নেপালের সীমান্তে কি চোরাকারবারি হয় না। তাই বলে কি হত্যাকান্ড ঘটছে? বছরে দু-একটি দুর্ঘটনা ছাড়া ভারত সে সাহস দেখায় না।
আমরা নদীকে হত্যা করে বাঁধ দিয়ে ভারতকে ৪২ চাকার যান চলাচলের সুযোগ করে দিয়েছি। যার নজির পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া অসম্ভব। আজ যখন তরুণ ব্যবসায়ী নাদের আলীর হত্যাকান্ডের খবর আমরা জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হতে দেখি তখন ভাবি ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা কি পারবে একজন চীনা নাগরিক কিংবা তাদের চিরশত্রু পাকিস্তানি নাগরিগকে হত্যা করতে? সেই সাহস কি তাদের আছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সাহস তারা পায় কোথায়? আমরা দুর্বল ও দলীয় স্বার্থরক্ষায় অস্থিতিশীল ভারতনীতিই তাদেরকে এই সাহস জুগিয়েছে। বন্ধুত্ব রক্ষার নামে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়ায় বন্ধুত্ব এখন যেন এক তরফা হয়ে যাচ্ছে। আমরা অবশ্যই বন্ধুত্ব চাই। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থটাই হলো প্রধান। বাংলাদেশ তার নিজের স্বার্থ দেখবে, এতে করে সম্পর্ক বৈরী হবে, এটা ভাবা অবান্তর।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সহযোগিতার কথা দেশের মানুষ আজও স্মরণ করে কৃতজ্ঞচিত্তে। ভারতকে বাংলাদেশের মানুষ বন্ধু মেনেছিল কিন্তু ভারতের সাম্প্রতিক আচরণ মোটেই বন্ধুসুলভ নয়। আর একতরফা বন্ধুত্ব কখনো হয় না।
ক্ষমতার মূল অংশীদারি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চিন্তা কে এক করতে হবে। ক্ষমতায় টিকে থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে বন্ধুত্ব রক্ষার নীতি পরিহার করে মেরুদন্ড সোজা করে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
ম্যাকেইভেলিয়ান বাস্তববাদী রাজনীতিতে কোন চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই। মাও সে তুং বলেছিলেন, যদি কোন জাতি উন্নতি করতে চায়, সর্বপ্রথম তাকে শত্রু বা বন্ধু কে তা চিহ্নিত করতে হবে।
সুতরাং আমাদের উচিত বাস্তববাদী হয়ে সঠিক বন্ধুত্ব গ্রহণ ও শত্রুকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তার সমাধান করা।
মিয়ানমার দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী দেশ ও বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা প্রতিবেশী। মিয়ানমারকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের বিদেশনীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের যাঁতাকলে থাকা দেশটি সে দেশের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের জোর করে বাংলাদেশে পাঠানো, নাফ নদী থেকে বাংলাদেশী জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া, নাঈক্ষ্যংছড়িতে কাঠুরিয়াদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করা, ব্যাপক হারে বাংলাদেশে ইয়াবা ট্যাবলেটের চালান ইত্যাদি করে যাচ্ছে। বিশেষ করে কিছু দিন আগে মিয়ানমারে বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) হাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানের মৃত্যু ও বঙ্গোপসাগরে মিয়ানমারের তিনটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন প্রমাণ করে তারা আমাদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করছে না।
তবে আশার দিক হলো দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী সেনাশাসনে থাকা বৌদ্ধ সংখাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রটি গত কিছু দিন পূর্বে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরেছে। এমতাবস্থায় আমাদের সরকার যদি যথাযথ কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে তাহলে সম্পর্ক উন্নয়ন শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার পরাশক্তি পাকিস্তানকে আজ চিহ্নিত করা হচ্ছে চিরশত্রু হিসেবে। বিশ্বায়নের এ যুগে বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি মোটেও দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। বাংলাদেশর মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। কিন্তু আজ সময়ের ব্যবধানে ভারত- আমেরিকা জাতীয় স্বার্থে আজ তারা বন্ধু। যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা দীর্ঘ আশি বছর পর আজ প্রশংসনীয় উন্নতি সাধন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ পাকিস্তান সম্পর্ক দিন দিন অবনতি হচ্ছে। প্রায়ই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চলে শীতল যুদ্ধ। এমনকি সম্প্রতি কূটনীতিককে প্রত্যাহার ও বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে যা মূলত আমাদের পররাষ্ট্র দফতরের প্রফেশনালিজমের অভাবই প্রকাশ করে। অতিমাত্রায় ভারতপ্রীতির যে বৈদেশিক নীতি আমরা চালিয়ে যাচ্ছি তা মূলত পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্ককে শীতল করে দিচ্ছে।
তাই আমাদের উচিত স্মরণ রাখা জসীমউদ্দীনের পঙ্ক্তি-
‘‘আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।’’
বাংলাদেশ ও মুসলিমবিশ্ব সম্পর্ক : জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম মসলিম দেশ। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর আস্থার জায়গা হলো মুসলিম দেশগুলো। বাংলাদেশর অর্থনীতির মেরুদন্ড হলো প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। বিশ্বের মোট ১৪৩টি দেশে বাংলাদেশের অভিবাসী রয়েছে প্রায় ১ কোটিরও বেশি যার মধ্যে প্রায় ৮০ লাখ হলো মুসলিমবিশ্বে। মুসলিমবিশ্ব শুধু জনশক্তির বাজার নয়, আমাদের ঔষধ ও সবজি রফতানির এক বিশাল বাজার। আমাদের ৯০ ভাগ জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়াম আমদানি হয় মুসলিমবিশ্বের দেশগুলো থেকে। এ ছাড়া যে সকল নিঃশর্ত সাহায্য বা অনুদান বা দান আসে তা মুসলিমবিশ্ব থেকে আসে। আমাদের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে (মসজিদ-মাদ্রাসা) লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষা, বইপুস্তক, খাদ্য ও অন্যান্য সুযোগ পেয়ে থাকে মুসলিমবিশ্বের দেশগুলোর সাহায্য থেকে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে আমরা লক্ষ্য করছি আমাদের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে মুসলিমবিশ্বের সাথে সম্পর্ক ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি কূটনীতিক খালাফ হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে ব্যর্থ হওয়া ও ২০১১ সালে মুসলিমবিশ্বকে অবজ্ঞা করে ওআইসি সম্মেলনে যাওয়া থেকে বিরত থাকায় এ সম্পর্ক অবনতির সূত্রপাত হয়। যার পরিণামে আমরা দেখতে পাই আমাদের জনশক্তি রফতানির সবচেয়ে বৃহৎ বাজার সৌদি আরব ও দ্বিতীয় বৃহৎ বাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সহ মালয়েশিয়া, কুয়েত ও কাতারে জনশক্তি রফতানি বন্ধ আছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ কাতারে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হবে। সে জন্য কাতারে অত্যাধুনিক প্রায় ৩৫টি স্টেডিয়াম নির্মাণসহ নানা অবকাঠামোগত খাতে ১০ লক্ষাধিক বিদেশী শ্রমিক রফতানির সুযোগ নিতে পারে।
সর্বোপরি সরকার চাইলে মুসলিমবিশ্ব থেকে বড় বিনোগকারী প্রতিষ্ঠানকে আমাদের দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করা সম্ভব। আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ হিসেবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে মুসলিম বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
তবে চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সতর্ক পররাষ্ট্রনীতির পাশাপাশি বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। আল কায়েদা, আইএসসহ বিশ্ব কাঁপানো কথিত সন্ত্রাস। আবার এ সন্ত্রাস দমনে পশ্চিমা বিশ্বের নীতিহীন সিদ্ধাতের বিষয়ে বাংলাদেশ কৌশলী ভূমিকা পালন করতে না পারলে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
অপর দিকে আরব বিশ্বে ইসলামপন্থী দলগুলোর উত্থানও আমাদের বৈদেশিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ ইসলামপন্থীদের উত্থানই বিশ্ব নিয়ন্ত্রকদের চিন্তার বিষয়। যেমন পশ্চিমাদের কাছে জীবিত কিংবদন্তিতুল্য বুদ্ধিজীবী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা বিশ্বাস করেন বর্তমান পৃথিবীতে পুঁজিবাদের বিপরীতে ইসলামই একমাত্র চ্যালেঞ্জ। তার মতে  (Democracy’s only real competitor is the realm of ideas today is radical Islamism. Indeed one of the worthy most dangerous nation states today is Iran, run by the extremist suit Mullah. But sunni radicalism has been remarkably ineffective in actually taking control of a nation state, due to its propensity to devour its own potential supporters.)
অর্থাৎ আদর্শের জগতে বর্তমানে গণতন্ত্রের একমাত্র যোগ্যতর প্রতিদ্বন্দ্বী হলো রাজনৈতিক ইসলাম। পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়াবহ জাতিরাষ্ট্র হলো ইরান, যা কট্টরপন্থী শিয়া মোল্লাদের দিয়ে পরিচালিত। সুন্নি কট্টরপন্থীরা তাদের সমর্থকদের কাছে ঠিকভাবে বিষয়টি উত্থাপন করতে না পারায় এখনো একটি জাতিরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
আমেরিকার কনজারভেটিভ ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা ও গত তিন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন, ফর্ড ও রিগানের উপদেষ্টা প্যাট বুচানন (Pat Buchanan) বলেন, ইসলামিক শাসনব্যবস্থা একটি ধারণা যা সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে যাকে বিশ্বের শক্তিশালী সেনাবাহিনী থামাতে পারবে না (If Islamic rule is an idea taking hold the Islamic masses, how does even the best army on earth stop it?)
কলামিস্ট শারিক নাইম বলেন-
(Quaite clearly, beyond the Arab spring is an Islamic awakening that may well materialised into apolitical model which once unified the region for centuries. i. E. The caliphate.) (এটা পরিষ্কার যে, আরব জাগরণের সাথে আরেকটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তব রূপ লাভ করতে যাচ্ছে, তা হলো খিলাফাত ব্যবস্থা যা এক সময় মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল।)
পশ্চিমা বিশ্বের মনোভাব স্পষ্ট যে, তারা আগামীর পৃথিবীর নেতৃত্বের আসনে দেখতে পাচ্ছে ইসলামপন্থীদের। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের টেকসই পররাষ্ট্রনীতি নিশ্চিত করতে হলে আগামীর বিশ্বশক্তিকে মাথায় নিয়ে এগোতে হবে।
বিশ্বশক্তি ও বাংলাদেশ : উদীয়মান কিছু বিশ্বশক্তির নাম শোনা গেলেও মূলত পশ্চিমাবিশ্বই বিশ্বকে এখনো নিয়ন্ত্রণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের বড় অংশীদার। বাংলাদেশের আয়ের দ্বিতীয় উৎস হলো পোশাক শিল্প। আর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে তৈরী পোশাকের বড় বাজার, যার লেনদেন ২০০০ (দুই হাজার) মিলিয়ন ডলার। কিন্তু কূটনৈতিক তৎপরতার দুর্বলতা, অনাকাক্সিক্ষত কিছু ঘটনা যেমন রানা প্লাজার ধস, আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ড, শ্রমিক নেতাদের সাথে মালিক পক্ষের বিরূপ সম্পর্কসহ বিভিন্ন কারণে আমাদের পোশাকের বাজার আস্তে আস্তে কমে আসছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোম্পানি ওয়ালমার্ট বাংলাদেশ থেকে তার তৈরী পোশাক ক্রয় বাতিল করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র পোশাক শিল্পে জিএসপি (জেনারেল ইজড সিস্টেম প্রেফারেন্স) বাতিল করেছে। পোশাক শিল্পের দ্বিতীয় বাজার ইউরোপের অর্থনীতিতে মন্দাভাবের কারণে অর্ডার কমে আসছে। এ ছাড়াও পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বাতিল করা নিয়ে অধ্যাপক ইউনূসের সাথে সম্পর্ক দুর্বল করা, একজন সিনিয়র মন্ত্রী যখন বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে কাজের মেয়ে মর্জিনা হিসেবে আখ্যায়িত করা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিমা বিসওয়ালকে দুআনার মন্ত্রী হিসাবে সম্বোধন করা, শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে না পারা, তৈরী পোশাক শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা না করার ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়াও অন্যান্য বিশ্বশক্তি যেমন চীন, জাপান, রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে থাকতে হবে বিশেষ পরিকল্পনা। জাপানের নাগরিক কোনিও হোশির হত্যাসহ অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে সতর্কতার সাথে এগোতে হবে। এ বিষয়গুলোতে অনেক সময় দলীয় স্বার্থে রাজনৈতিক রূপ দেয়া হয় যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অবিশ্বাস তৈরি করে।
তুরস্ক হতে পারে মুসলিম বিশ্বের পররাষ্ট্রনীতির মডেল
তুরস্কের ক্ষমতার মসনদে যারা আছেন তারা কেউই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন, যে কারণে পৃথিবীর বড় বড় বিনিয়োগগুলো তারা আকৃষ্ট করতে পারছেন।
ইসলাম ও গণতন্ত্র যে একে অপরের পরিপূরক এবং ইসলাম গণতন্ত্রের শত্রু নয় কিংবা গণতন্ত্র ইসলামের বিরোধ নয় তুরস্ক তা প্রমাণ করেছে। যে কারণে গণতন্ত্রকামী বিশ্ববাসী ও ইসলামপন্থী মুসলিমবিশ্ব দুইদিকেই তারা সমান সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম। আমরা জনপ্রত্যাশা বাদ দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশের সন্তুষ্টির জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাকে দীর্ঘদিন পর ফিরিয়ে এনেছে। অন্য দিকে আমরা লক্ষ করব কামাল আতাতুর্ক তুরস্ককে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। মাদরাসা শিক্ষা নিষিদ্ধ করেছিলেন, মেয়েদের মাথায় ওড়না বা হিজাব পরা নিষিদ্ধ করেছিলেন শুধুমাত্র ইউরোপকে খুশি করার জন্য কিন্তু মুসলিমবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন্ হয়ে গিয়েছিলেন এমনকি ইউরোপের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। কিন্তু বর্তমান সরকার ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে সরে এসে দেশটিকে একটি মুসলিম ঐতিহ্যসম্পন্ন আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলেছেন। মাদ্রাসা শিক্ষা চালু করে ওড়না বা হিজাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। মিসেস এরদোগান (রাষ্ট্রপতির স্ত্রী) নিজে হিজাব পরিধান করেন।
দেশটি তার সেনাবাহিনীকে গণতন্ত্রমুখী করেছে। ন্যাটোতে তাদের অবস্থান দ্বিতীয়। বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান এরদোগান নিজেই একটি কবিতা লিখে সেনাবাহিনীর কাছ থেকে বিরোধিতার সম্মুখীন হয়ে জেলে গিয়েছিলেন। সেদিন এ কারণে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। পরে উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পার্লামেন্টে আসেন। সেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে বৈরিতায় না গিয়ে গণতন্ত্রের মূল ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে এরদোগান সফল হয়েছেন, যা সমগ্র মুসলিমবিশ্বের জন্য একটি মডেল।
তুরস্কের অর্থনীতি দেশটিকে অধিকাংশ মুসলিম দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে সাহায্য করেছে। সমগ্র ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও তারা তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করেছেন, যা আমাদের জন্য মডেল হতে পারে।
তুরস্কের পাশের মুসলিম দেশগুলোসহ মুসলিমবিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে তৎপর। ন্যাটোর সদস্য হওয়ার পরও মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ ক্ষুন্ন্ হয় এমন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তারা মুসলিমবিশ্বের সঙ্কট নিরসনে ভূমিকা রাখে। সোমালিয়া, ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত হাজার হাজার ছাত্রসহ মুসলিম বিশ্বের বহু ছাত্রকে স্কুল থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছেন যা উন্নত মুসলিম বিশ্বগঠনে বড় সহয়ক।
তুরস্ক প্রমাণ করেছে জঙ্গিবাদ ও ইসলাম এক নয়। বিভিন্ন্ সময় সাময়িক দুর্ঘটনার মাধ্যমে তাদেরকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করা হলেও সেই সঙ্কট পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে তরস্ক। তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে দেখা যায় ছাত্রদের নিয়মিত নামাজ পড়তে, পূর্ণাঙ্গ ইসলাম চর্চা করতে। তাই মুসলিমবিশ্ব যখন জঙ্গিবাদের বড় ধরনের হুমকির মুখোমুখি তুরস্কের স্থিতিশীলতা তখন সারা বিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে।
পরিশেষে বলা যায় বাংলাদেশ মুসলিমবিশ্ব থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র একটা দেশ। সমগ্র বিশ্বের নজর কাড়ার মতো কিছু ঘটনা এ দেশটিকে বিশ্বময় পরিচিতি এনে দিয়েছে। আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বময় প্রশংসিত। তাই বিশ্বব্যাপী নিজের স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। একমুখী বন্ধুত্ব ক্ষমতার রাজনীতির জন্য সহায়ক হলেও দেশের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিচ্ছে। সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়। এই নীতির পুরোপুরি বাস্তবায়ন করে দেশের স্বার্থ ফিরিয়ে আনতে সরকারের ভূমিকা আরো জোরালো হোক- এটাই সবার কামনা।

SHARE

Leave a Reply