বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনীতির কয়েকটি দিক

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম

বাংলাদেশের
বড় সম্পদ মানুষের সৃজনশীলতা। এই সৃজনশীতার স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের জন্য সুযোগের সমতা সৃষ্টি করতে হবে। এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের অস্থিরতা চলছে। একই সঙ্গে আলোচনা চলছে আর্থিক খাতে বেশ কিছু অব্যবস্থাপনার চিত্র নিয়ে। প্রথমেই বলতে হয় শেয়ারবাজার পরিস্থিতি নিয়ে। পূর্ববর্তী অর্থবছরে বাজারে ধস নেমেছিল, যা গত অর্থবছরেও পুনরুদ্ধার হয়নি। এ নিয়ে বিনিয়োগকারী বিশেষ করে কম পুঁজির মালিককদের মধ্যে যথেষ্ট ক্ষোভ রয়েছে এবং একাধিকবার তার প্রকাশ ঘটেছে। সরকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। অনিয়মের ঘটনায় তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে। তাতেও লেনদেনে স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি উদ্বেগের সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের মুদ্রা টাকার মান কমে যাওয়া। এ বছরে ডলারের তুলনায় মুদ্রামান ১১ শতাংশ কমেছে যা এক বছরে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। এক বছরে এতটা অবমূল্যায়ন বলা যায় রেকর্ড।
আর্থিক অব্যবস্থাপনার আরেকটি নজির হিসেবে উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন বাজেটের কথা তুলে ধরা যায়। এর আকার সরকারের ব্যয় করার ক্ষমতার চেয়ে বেশি। বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে ধারণাতীত পরিমাণে ভর্তুকি দিতে হয় এবং তাতেও গ্রীষ্মকালে এ সঙ্কটের প্রকোপ কমানো যায়নি। রেন্টাল বিদ্যুৎ সরকারের গলার কাঁটা হয়ে রয়েছে। এর ভর্তুকির জোগান দিতে বাজেটে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানত ভর্তুকির চাপ কমাতে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে প্রচুর ঋণ নিয়েছে এবং লিকুইডিটি সমস্যার কারণে তার প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ওপর। ক্রাউডিং অ্যাফেক্ট ভালোভাবেই উপলব্ধি করা যাচ্ছে এ বছরে এ দাবি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের।
বাংলাদেশে সরকারি বিনিয়োগ দরকারি বলে বিবেচিত হয়। সড়ক, রেলপথ, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বন্দর ইত্যাদি খাতে মানসম্মত বিনিয়োগ হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অর্থনীতিতে এমন কিছু খাত রয়েছে, যেখানে বিনিয়োগ করলে তার সুবিধা সবাই ভোগ করে এবং এ কারণে সরকারকেই এ ক্ষেত্রে প্রধান উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়। এমন পদক্ষেপকে বেসরকারি খাত স্বাগত জানায়। এতে ক্রাউনিং-ইনের পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং তারা এর সুফল ভোগ করে। সরকার যদি এ ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যাংকিং সূত্র থেকে ঋণ নিয়ে থাকে, সেটা গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সময়ে সরকারের নেয় যে ব্যাংকঋণ তা ব্যয়ের রূল খাত ছিল চলতি ব্যয় নির্বাহ।
অর্থনীতির এই যে চিত্র, সেটা নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক নয়। অস্থিতিশীলতা ও ঝুঁকির ঘূর্ণাবর্তে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। মুদ্রাস্ফীতির কারণে উৎপাদন উপকরণগুলোর দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতির প্রকৃত খাতগুলো () অস্থিরতার শিকার হচ্ছে। সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতির আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর তারল্যের রাশ টেনে ধরার প্রবণতার কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে ঋণের প্রবাহ কমে বিনিয়োগ কমেছে। বিনিয়োগ কমে গেলে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এমনিতে বেশ কিছুকাল ধরে ব্যাংকিং চ্যানেলে তারল্য সঙ্কটের কারণে বেসরকারি খাতে সঠিকভাবে ঋণ পাচ্ছে না। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদের হারের ঊর্ধ্বসীমা উঠিয়ে দেয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে উচ্চ সুদের ঋণ উৎপাদনশীল খাতে অর্থনৈতিক প্রবৃত্তিকে কমিয়ে দিচেছ। এতবেশি সুদহার দিয়ে বিনিয়োগ করে শিল্প চালানো সম্ভব নয় বলে শিল্পপতি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তার ওপর গ্যাস ও বিদ্যুতের অপ্রতুলতা ও অবকাঠামোগত সমস্যা শিল্পের একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া শিল্পখাতে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। কমে যাচ্ছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা (), নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে অর্থনীতি। ফলে শিল্পখাতে অব্যাহত ঋণপ্রবাহ ধরে রেখে উৎপাদন প্রক্রিয়া ও তার বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে ঋণপ্রবাহ সঙ্কুচিত হবে না বললেও সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে ঋণ সঙ্কোচনের নীতি প্রবাহ আক্রান্ত হওয়াতে উৎপাদনশীল শিল্প কারখানায় গতিশীলতায় ভাটা পড়েছে। ব্যাংকগুলোর কাছে বর্ধিত বিনিয়োগের জন্য নগদ অর্থের সঙ্কট দেখা যাচ্ছে। এ দিকে ব্যাংকগুলা সুদের হার বাড়িয়ে ব্যাংক আমানত বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বিনিয়োগের রেট অব রিটার্নও ব্যাংকগুলো বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর ভেতর একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতাই শুধু বাড়ছে না, সাথে সাথে তা প্রকৃত অর্থনীতির উৎপাদন কর্মকাণ্ডকে নেতিবাচকভাবে অঘাত করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রতিক্রিয়াও বর্তমানে প্রতিভাত হয়ে উঠছে।
এ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাশালী ও বিশ্বনন্দিত নিউইয়র্ক টাইমসে সংবাদ এসেছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে স্বল্প মজুরির ওপর। এটি হচ্ছে টানা তৃতীয় দিনের সংবাদ, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ব্যাপারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত ২৫ আগস্ট ২০০৮ নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত বৈরী প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘ওয়েজ ইন বাংলাদেশ ফার বিলো ইন্ডিয়া’ এ সংবাদে বলা হয়েছে বর্তমানে চীনের পর বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে তৈরি পোশাকের বাজারে দ্বিতীয় কিন্তু বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের অস্থিরতা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি জোরালো হওয়ায়। প্রসেসিং প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে মতামত ব্যক্ত করা হয়েছে এবং একই সাথে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিযোগিতার বাজারে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাথে এহেন আচরণের জের পড়তে পারে গোটা শিল্পে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশী পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার নিয়ে যে আলোচনা চলছে তা আর এগোবে না বলে রিপোর্টে মন্তব্য করা হয়েছে। শিল্প কারখানার পরিবেশ উন্নত এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এএফএল-সিআইও তাদের আপত্তি উঠিয়ে নেবে কিভাবে এমন আশঙ্কাও ব্যক্ত করা হয়েছে। ইতঃপূর্বে নিহত শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের প্রসঙ্গ রয়েছে। হিলারি ক্লিনটনের সর্বশেষ ঢাকা সফরের রেফারেন্সও রিপোর্টে দেয়া হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের হালহকিকত সরেজমিন পর্যবেক্ষণের জন্য এএফএল-সিআইও একজন ইন্সপেক্টর নিয়োগ করেছে বলেও টাইমসের খবরে উল্লেখ রয়েছে।১
এ দিকে সম্প্রতি সমকাল রিপোর্ট করেছে, গত এক বছরে রফতানি আয় কমেছে ১২শ কোটি টাকা। দুর্দিনে পড়েছে দেশের অন্যতম প্রধান রফতানিপণ্য পাট। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের (২০১১-২০১২) পাট ও পাটজাত সব পণ্যের রফতানি আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় কমেছে ১৫ কোটি ডলার বা ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা থেকে এ খাতের রফতানি আয়ে ব্যবধান ৩ হাজার কোটি টাকা। কাঁচাপাট, পাটের তৈরি সুতা, পাটের ব্যাগ ও বস্তা এ তিন ধরনের পাটপণ্য এখন রফতানি হয়ে থাকে। এর মধ্যে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পড়েছে কাঁচাপাট। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ খাতের রফতানি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে ২৫ শতাংশ।২ ভারতে পাটের চোরাচালান, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা এবং পাটের প্রধান বাজার মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পাট ও পাটপণ্যের রফতানি আয় কমেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বর্তমান সময়ের আর একটি প্রবণতা হচ্ছে বিদেশী দাতা অর্থাৎ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দাতাদের সঙ্গে মহাজোট সরকারের মতবিরোধ চলছে, তার প্রভাবে বিদেশী সাহায্য আগামীতে কম আসবে বলে মনে হয়। সরকার বাধ্য হবে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটটি পূরণ করতে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস পাবে না।
আগামীতে বহুল বিতর্কিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্র্তুকির চাপ কমবে না। ভর্তুকি না দিলে বা অনেক পরিমাণে কমিয়ে আনতে হলে দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বলানির দাম বাড়াতে হবে। তার ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। যেহেতু সাধারণ নির্বাাচন সন্নিকটবর্তী হচ্ছে এবং সে কারণে এ বছরটি সরকারের পুননির্বাচনের জন্য গুরুতপূর্ণ, সেহেতু মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি নেয়া সরকারের জন্য কঠিন। কিন্তু পরিস্থিতিটা শাখের করাতের মতো। যদি সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাকে বর্ধিত ভর্তুকির সংস্থান করতে হবে। সেটা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বা টাকা ছাপিয়ে করলে মুদ্রাস্ফীতি আবারো ঊর্ধ্বমুখী হবে। সরকারের তাই চয়েজ থাকবে কষ্ট পুল ইনফ্লেশন কিংবা ডিমান্ড পুল ইনফ্লেশন- কোনো একটি বেছে নেয়া। অর্থাৎ ইনফ্লেশন বা মুদ্রাস্ফীতির চাপ থাকছেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি দুর্বলতা নিয়ে এ মুহূর্তে উদ্বেগের কারণ রয়েছে। প্রথমত এখানে ভৌত অবকাঠামোর ঘাটতি অত্যন্ত প্রকট। জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা অবকাঠামোর ঘাটতিকে আরো প্রকট করে তুলছে।
দ্বিতীয়ত বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সমস্যা বেড়ে চলছে।
তৃতীয়ত বাংলাদেশের নগরায়নের নাটকীয় সম্প্রসারণ ঘটছে। সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ দারিদ্র্যের চেয়েও জটিল সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে নগর দারিদ্র্য। নগর দারিদ্র্য সারা দেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তবে বাংলাদেশের বড় সম্পদ মানুষের সৃজনশীলতা। এই সৃজনশীতার স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের জন্য সুযোগের সমতা সৃষ্টি করতে হবে। এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তথ্যপঞ্জি
১. গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসে তৈরি প্রতিবেদন, নিউইয়র্ক থেকে এনার বরাতে নয়া দিগন্ত রিপোর্ট, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৬ আগস্ট, ২০১২, পৃৃ: ১২ ।
২. আবু হেনা মুহির, এক বছরে পাট খাতে রফতানি আয় কমেছে ১২শ কোটি টাকা, দৈনিক সমকাল, ৫ আগস্ট, ২০১২, পৃ: ৪।

লেখক : বিশিষ্ট ব্যাংকার ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply