বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আখ্লাকে নববী সা.-এর প্রয়োজনীয়তা মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

সুবহি সাদিকে প্রকৃতি যখন থাকে শান্ত, নীরব-নিথর, দক্ষিণা বেহেস্তী বাতাস প্রবাহিত হয় ঝির ঝির শীতলতা ছড়িয়ে, আবছা আলো আঁধারির সে মায়াময় পরিবেশে লক্ষ বেলালের কণ্ঠে সুমধুর ঝংকারে ভেসে আসে আহ্বান- হাইয়্যালাস সালাহ, হাইয়্যালাল ফালাহ, আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম- এসো নামাযের ধ্যানে, এসো কল্যাণের পানে; ওঠো! ঘুম অপেক্ষা নামায উত্তম। স্বর্গীয় সুধা মিশ্রিত এই আহ্বানে যে দেশের মানুষ আয়েশি ঘুমের জড়তা ঝেড়ে ফেলে ছুটে চলে মসজিদে; শিশুর কণ্ঠে ফোটে, ইয়্যাকানা’বুদু-ওয়াইয়্যাকা নাসতাইন, ইহ্দিনাস সিরাতাল মুসতাকিম- (হে প্রভু)! আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং আমরা শুধুমাত্র তোমার কাছে সাহায্য চাই। আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন কর; পুণ্যবতী নারী জায়নামায ছেড়ে উনুনে আগুন জ্বালে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে; কৃষক মাঠে লাঙ্গলের ফলা পাতে ‘রাজ্জাকের’ নাম নিয়ে; ভূমিষ্ঠ সন্তানের কানে প্রথম যে ধ্বনি প্রবেশ করে ‘লা-শরিক আল্লাহ্’র সে দেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। এদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ। এদেশ ইসলামের লালন ভূমি। এদেশের মানুষের মন ও মননে সর্বদা বিরাজ করে আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রেম।
১২ই রবিউল আউয়াল রাসূলে পাক সা. এর পবিত্র জন্মদিবস উপলক্ষে আমার প্রবন্ধের বিষয়বস্তু, “বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আখ্লাকে নববী সা. এর প্রয়োজনীয়তা।” পাঠকবৃন্দের বোঝার সুবিধার্থে প্রবন্ধটি আমি নিম্নরূপে আলোচনা করবো :
১. বাংলাদেশে ইসলাম কী রূপে এলো?
২. বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আদৌ প্রয়োজন আছে কি?
৩. ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উপকরণ ও বাধাসমূহ।
৪. আখ্লাকে নববী সা.-এর ভূমিকা।
বাংলাদেশে ইসলামের আবির্ভাবের দু’টি স্রােত ঐতিহাসিকভাবে দৃশ্যমান :
এক : ধর্ম প্রচারক ও সুফি সাধকগণ
দুই : মুসলিম বিজয় অভিযান।
ধর্ম প্রচারক ও সুফি-সাধকগণ
হিজরি দশম সালে রাসূলে আকরাম সা. পবিত্র বিদায় হজে ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দানে লক্ষ লক্ষ সাহাবীর উদ্দেশে দ্বীন ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব অর্পণ করে উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানান –
তোমাদের কাছে রেখে গেনু আজি
দুটো মহা উপহার…
কোরআনের পূত মঙ্গল বাণী
মম উপদেশ আর;
যতদিন সবে পরম আদরে
আঁকড়ি রাখিবে ধরি দুই করে
হারাবে না পথ ঝঞ্ঝা ও ঝড়ে
সংসার সাহারার।

“যাহারা আছে এখানে
যারা নাই, যেন তাহাদের স্থানে,
দিয়ো এ বচন মোর,
হয়তো জীবনে হজের ভাগ্য
আসিবে না আর বার।”
(বিদায় হজ- আবুল হাশেম)
উপস্থিত জনতা (সাহাবীগণ) অনুপস্থিত অনাগত আদম সন্তানের কাছে আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল সা. প্রদর্শিত দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার যে ওয়াদা আরাফাত ময়দানে করেছিলেন, সে ওয়াদার ফলশ্রুতিতে সারা বিশ্বব্যাপী ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন যুগে যুগে দ্বীনের নিশানবর্দার মহা মনীষীরা।
বাংলাদেশে যখন বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর উপর ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের অকথ্য নির্যাতনের স্টিম রোলার চলছিলো, ঠিক সে সময়ে (৭ম খ্রি. শতাব্দী) বাংলার সমুদ্র উপকূলবর্তী (চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, নোয়াখালী) অঞ্চলসমূহে প্রচারিত হচ্ছিল মানবতা, সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্বের ধর্ম ইসলাম। আরবের ধর্ম প্রচারক বণিকেরা তাঁদের সওদার সাথে খোদার দেয়া অনন্য ‘দ্বীনি সওদা’ নিয়ে আসেন বাংলায়। তাঁদের পথ ধরে ইসলামী দর্শনের প্রচার প্রসারের জন্যে ভিড় জমালো জানা অজানা অসংখ্য সুফি-সাধক। যাঁরা নিজেদের জীবন কুরবানি দিয়ে এদেশের শ্যামল মাটিতে ইসলামের বীজ বপন করেছিলেন। আর বাংলার জাতিভেদ পীড়িত জনগোষ্ঠী ইসলামী আদর্শের মধ্যে খুঁজে পেলো নব মুক্তির পথ।
যে সব ওলি আউলিয়া এদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য মহান ভূমিকা পালন করেন, তাঁরা মিশে যান এদেশের সাধারণ গণমানুষের সাথে। প্রথম দিকের প্রচারকদের সাথে কোনরূপ অস্ত্রশস্ত্র; এমনকি বই-পত্রও থাকতো না। সংখ্যায় অল্প হলেও সত্যিকার মুসলমান তৈরি করাই তাঁদের মহান লক্ষ্য ছিল। এঁরা গ্রামে বাস করতেন। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে ঘুরে মানুষের দ্বারে দ্বারে ইসলাম প্রচার করতেন। ফলে দিন দিন মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ তাৎক্ষণিকভাবে ইসলামী সংস্কৃতি অনুযায়ী পরিবর্তন হতে থাকে। অপর দিকে পরবর্তী সময়ে আগত ওলি-আউলিয়াবৃন্দ এদেশের জাতিভেদ পীড়িত সমাজের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে জালিম সমাজপতিদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেন। এই জিহাদের মাধ্যমে অনেকে শহীদ হয়ে ¯্রষ্টা প্রদত্ত মানুষের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে আনেন। এতদদৃষ্টে দলে দলে সাধারণ মানুষ ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় খুঁজে নেয়। ইসলামের শাশ্বত সত্যের এই পদাঙ্ক অনুসরণ করে এদেশে আসেন : চট্টগ্রামে ৮ম-১০ম শতাব্দীতে হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.), হযরত ফরিদ উদ্দীন গঞ্জ-ই-শকর, রাজশাহীতে ১১০০/১৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে হযরত শাহ মখদুম রূপোস (রহ.) সিলেটে ১৩০২/১৩২২ খ্রি. হযরত শাহ জালাল (রহ.) এবং যশোর-খুলনা-বরিশাল অঞ্চলে হযরত খান জাহান আলী (রহ.) প্রমুখ। এছাড়া আরো অনেক বিখ্যাত পীর-দরবেশ এদেশে নানা পর্যায়ে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন। তাঁরা তাঁদের ভক্ত-অনুরক্তদের সহযোগিতায় মসজিদ, মক্তব, খানকাহ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে সাধারণ মানুষের আত্মিক ও নৈতিক সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। এদের অসংখ্য পবিত্র মাযার বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে। সেগুলো জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবার সম্মানের (তীর্থ) ক্ষেত্র (যদিও কালক্রমে নৈতিক অধঃপতনের কারণে কিছু মাযার র্শিক ও বিদয়াতে ভরে গেছে, শরিয়ত এসব কর্মকাণ্ডের অনুমোদন দেয় না)। এদেশে কেবল তাঁদের ধর্মীয় প্রভাবই পড়েনি বরং প্রাত্যহিক চাল-চলন, আহার-বিহার, তাহজিব-তমদ্দুন এবং পোশাক-পরিচ্ছদেও বিশেষ প্রভাব পড়েছে।
(ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ : অধ্যাপক আব্দুল গফুর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, বিশ্ব মুসলিম সংখ্যা ১৯৮৫)
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিম বাংলাদেশে ইসলামী ধর্ম বিশ্বাস, প্রচার ও প্রসারে সুফি-সাধকদের ভূমিকা সম্বন্ধে বলেন-
The Saadak, Ulama and Mashaiekh palyed their due role in the strenghting of Muslim society and culture and in propogationg Islam. These people well-versed in Islamic Learning. must have taught the people in observing the Islamic priniciples and the institution i-e, Mosque, Madrasah and Khanqah afforded facilities to observe them.
(Social History of the Muslims in Bengal. Page-211)
সুফি দরবেশ, ওলামায়ে কেরামের ধর্ম প্রচার এবং ধর্ম সংরক্ষণের এই প্রক্রিয়ায় পরিপূর্ণ রূপে বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়নি; শুধুমাত্র তিতুমীরের হিন্দু জমিদার এবং ইংরেজবিরোধী বিচ্ছিন্ন বাঁশবাড়িয়া আন্দোলন; হাজী শরীয়ত উল্লাহ্র ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন ছাড়া। বালাকোটের শহীদ সাইয়্যেদ আহমদ ব্রেলভী (রহ.)-এর অনুসারী শহীদ সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর, হাজী শরীয়ত উল্লাহ্ ছাড়াও সুফি নূর মুহাম্মদ নিজামপুরী (রহ.), ইমাম উদ্দীন বাঙ্গাল (রহ.), হযরত আবদুল হাকিম (রহ.), সুফি আবদুল মজিদ (রহ.)সহ অন্যান্য সুফি-দরবেশ অনুকূল পরিবেশের অভাবে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইসলামকে কায়েম রাখার প্রয়াসী হন। পরবর্তীতে ফুরফুরার পীর হযরত মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.), মাওলানা কেরামত আলী জৈনপুরী (রহ.) এর ইসলাম প্রচার ও সংস্কার কর্ম সর্ব সাধারণের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে।
মুসলিম বিজয় অভিযান
পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা দেখলাম যে বাংলাদেশে পীর আউলিয়াদের দ্বারা ইসলামের প্রদীপ শিখা প্রজ্বলিত হয়েছে সত্য কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম কায়েম হয়নি। এখন আমরা দেখবো মুসলিম বীর এবং সুলতানদের দ্বারা এদেশে ইসলামের কতটুকু উপকার হয়েছে।
১২০১ (মতান্তরে ১২০৪) খ্রিষ্টাব্দের এক সকাল বেলা মহারাজ লক্ষ্মণ সেন নদীয়ায় তাঁর অবসরকালীন রাজপ্রাসাদে নিশ্চিন্তে প্রভাতকে স্বাগত জানান। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলেন ক্ষুদ্র এক অশ্বারোহী কাফেলা রাজপ্রাসাদের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে। মহারাজ মনে করেছিলেন আরবের কোন বণিক দল এসেছে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে। তাঁর প্রহরীরা এগিয়ে গেলো কাফেলাকে স্বাগত জানাতে। কিন্তু না; কোন অভিবাদন নয়- কাফেলা খোঁজ করলো রাজার। প্রহরীরা বুঝতে পারল আগতদের উদ্দেশ্য। তারা সরাসরি আক্রমণ চালালো কাফেলার ওপর। মুসলিম মুজাহিদদের মুখ দিয়ে প্রকম্পিত ধ্বনি উচ্চারিত হলো, নারায়ে তাকবির- আল্লাহু আকবর। প্রতিহত করল প্রহরীদের। মাত্র ১৭ জন ঘোড়সোয়ার নিমিশে দখল করে নিলেন রাজপ্রাসাদ। মহারাজ লক্ষ্মণ সেন জান নিয়ে পালালেন প্রাসাদের পেছনে দরজা দিয়ে।
কুতুবুদ্দীন আইবেকের প্রতিনিধি আফগান মুসলিম বীর, ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর গৌঢ় দখলের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস রচিত হয় অন্যভাবে। মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যান। পরবর্তী মাত্র তিন বছরে বাংলাদেশের বিরাট অঞ্চল নিজের শাসনাওতাভুক্ত করে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে খেদমত করেন।
বঙ্গ বিজয়ী প্রথম এই মুসলিম বীর সম্বন্ধে ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিম বলেন-
Bakhtyar Khalji capture Nadia and established of a Kingdom, with Lakhnauti as capital, inagurated a new age for Bengal. Politically it sowed the seeds of Muslim rule but socially it planted a Muslim society opening the gates of Bengal to numerous immigrant foreigners from the muslim world which enormously affected existing soceity and culture.
তিনি আরো বলেন- মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার মাত্র অল্পদিনে ইসলামী শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন মাদ্রাসা-মক্তব, নামাযের জন্য মসজিদ। তাঁর সহযোগিতায় খানকাগুলোর মাধ্যমে পীর মাশায়েখবৃন্দ ইসলামের ধর্মীয় দিকগুলো সর্বসাধারণের নিকট প্রস্ফুটিত করেন। তাঁর সময়ে এদেশে আগমন করেন প্রখ্যাত সুফি সাধক শেখ জালালুদ্দীন তাবরিজি (রহ.), কাজী রুকনুদ্দীন সমরখন্দী (রহ.), মাওলানা তকী উদ্দীন আরবি (রহ.) প্রমুখ। (Social History of the Muslims in Bengal. page-38 & 39)
১২০১ খ্রিষ্টাব্দের বঙ্গ বিজয়ী ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি থেকে শুরু করে ১৭৫৭ সালে ইংরেজদের হাতে পরাজিত সিরাজউদ্দৌলার রাজত্বের ইতিহাসে আমরা আল কুরআন ও মহানবী সা.-এর সুন্নাহ বাংলাদেশের কোথাও পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখি না বরং দেখি মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির অনুসরণে ছিটেফোঁটা ইসলামের খেদমত; পাশাপাশি আত্মকলহ, হত্যা, পলায়ন, আর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গদি দখলের ইতিহাস; যার বিষফল স্বরূপ ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ খ্রি. পর্যন্ত এদেশে চলে ইংরেজ বেনিয়ার শোষণ, নিপীড়ন ও নিষ্ঠুর শাসন।
হাজার বছরের ইসলামী ঐতিহ্যে লালিত ৮৫% মুসলমানের এই দেশ বাংলাদেশ। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এ দেশের মানুষের আজন্ম বাসনা। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্বন্ধে যাঁদের সামান্যতম ধারণা আছে তাঁরা সবাই বলেন, বাংলার প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতাদের আহ্বানে সাধারণ মানুষ কুরআন এবং সুন্নাহ্র আইনের অধীনে ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাস করার জন্যই মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলন করেছিল। তাদের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের ফলে হাজার মাইলের ব্যবধানে দু’টি ভূখণ্ড নিয়ে “ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান” গঠিত হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত আদর্শ প্রস্তাবে (ঙনলবপঃরাব জবংড়ষঁঃরড়হ) সেই আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফল দেখা যায়। সে প্রস্তাবে স্বীকৃত হয়-
১নং প্রস্তাব : আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি : সমগ্র বিশ্বের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ্ এবং জনগণ কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরকারের নিকট রাষ্ট্র ‘পাকিস্তান’ একটি পবিত্র আমানত।
২নং প্রস্তাব : ইসলামী আদর্শের স্বীকৃতি : পাকিস্তান সরকার ইসলামী নির্দেশিত গণতন্ত্র, সাম্য, স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।
৩নং প্রস্তাব : ইসলামী জীবনযাত্রা : পাকিস্তানের নাগরিকরা ব্যক্তিগত ও সমবেতভাবে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনানুযায়ী জীবন যাত্রা নির্বাহ করবে।
(এফ. জামান, বাংলাদেশের সরকার ও রাজনীতি। পৃষ্ঠা-১৮৪-৮৫)
উক্ত তিনটি প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে সুস্পষ্ট স্বীকৃতি পাওয়া গেল যে, রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ্ এবং তাঁর প্রতিনিধি জনগণ। রাষ্ট্র চলবে কুরআন ও সুন্নাহ মত। দেশের আদর্শ হবে ইসলাম। দুর্ভাগ্যের বিষয় ইসলামী রাষ্ট্রের এই মৌলনীতি সংবিধানে থাকার পরও পাক আমলে দেশের মানুষ একদিনের জন্যও ইসলামী বিধানের অধীনে জীবনযাপন করতে পারেনি। বরং সীমাহীন দুর্নীতি, বৈষম্য ও বিমাতাসুলভ আচরণের পরিণতিতে অনেক রক্তের বিনিময়ে আমরা পেলাম ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে ধর্মহীনতা, পশ্চিমা শোষণের বিরুদ্ধে সাম্যের নামে সমাজতন্ত্র, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বদলে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি লালনে প্রতিশ্রুত স্বাধীন দেশ। যা এদেশবাসীর কখনো কাম্য ছিল না। বাংলার তরুণ-যুবা মুসলিম সন্তানরা বুকের রক্ত ঢেলে যে স্বাধীনতা এনেছিল চার যুগ পার হবার পরও তারা কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার সুফল পায়নি। মেলেনি অর্থনৈতিক মুক্তি। কেন এমন হলো?
কারণ সামাজিক দিক দিয়ে আমরা জাহেলিয়াতের যুগে আবর্তিত। প্রাক ইসলামিক যুগের মানুষগুলো ধর্মহীনতা, অজ্ঞতা, দ্বন্দ্ব কলহের কারণে আদিমতার নিচু পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু বাংলাদেশে জাহেলিয়াত প্রকটিত তথাকথিত ভদ্রবেশী ধনিক শ্রেণি হতে শুরু করে সমাজের নিম্নস্তর পর্যন্ত মদ, জুয়া, গাঁজা, ঘুষ, বেশ্যাবৃত্তি, ধর্ষণ আজ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক উপকরণের মাধ্যমে চরিত্র হননের যাবতীয় কার্যে তাদের অনেকে লিপ্ত। এদেশে আজ ন্যায়বিচার নীরবে নিভৃতে কাঁদে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা বিহীন লক্ষ কোটি মানুষের আহাজারিতে খোদার আরশ বারবার কেঁপে উঠছে। মানুষের হৃদয়হীন অন্যায়-অসত্যের পাপরাশি ভারী হয়ে খোদার গজব রূপী বান-বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, আকস্মিক দুর্ঘটনা, অভাব-অনটন মহামারী এদেশে বারবার সংঘটিত হয়েছে, হচ্ছে। জাহেলিয়াত আজ বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। চারদিকে শুধু হতাশা আর হতাশা।
এখানে এসেই আমাদের থমকে দাঁড়াতে হয় মহানবী সা. প্রদর্শিত কল্যাণ ও করুণার জন্যে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের জন্যে। মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নামক মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে। ফুটপাথে পড়ে থাকা নিরন্ন মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বিলাসী মদমত্ত ঐ শোষক শ্রেণির লাগাম টেনে ধরতে। সা¤্রাজ্যবাদের দোসর অত্যাচারী স্বৈরশাসকের কালো হাত ভেঙ্গে দিয়ে ইসলামের নিশানবর্দার মহানুভব খোলাফায়ে রাশেদীন প্রদর্শিত সাম্যের সমাজ গড়ে তুলতে। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই, মুক্তির কোন পথ নেই।
বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক কী কী উপাদান আছে, আর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে কী কী বাধা আছে তা আমরা এখন আলোচনা করবো।
১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার (নতুন ছিটমহলসহ) বর্গমাইল ভূমি বেষ্টিত বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত ও বার্মার কিছু অংশ। দক্ষিণে সাড়ে তিনশত মাইল সমুদ্র উপকূল ছাড়া বাকি সাড়ে ১১শ মাইল সীমান্ত ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুস্তানের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা রাজ্য দ্বারা পরিবেষ্টিত। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ১৫% তথা দেড় কোটি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান। প্রতিনিয়ত তারা নানা ইস্যুতে এক সুরে কথা বলে। ইসলামী আদর্শ বিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে সুকৌশলে নানা অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। তারা নামধারী মুসলমানদের পৃষ্ঠপোষকতা করে খাঁটি দেশপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। তারা অন্তকরণে এ দেশের আনুগত্য করে কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থান, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অব্যাহত ষড়যন্ত্র এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পটভূমিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে হিফাজতের জন্যই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ঈমানের দাবি অনুযায়ী এখানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। আমাদের একমাত্র বিশ্বাস এতেই রয়েছে ইহকালীন ও পরকালীন সুখ এবং শান্তি।
বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সহায়ক উপকরণ
ক) সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জনসমর্থন, যারা শত ষড়যন্ত্রের মাঝেও ঈমান ধারণ করে আছে।
খ) ধর্ম হিসেবে স্বভাবগত ইসলামী আদর্শ ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পারিবারিকভাবে বিদ্যমান।
গ) নাস্তিক্যবাদী সমাজতন্ত্র বা কম্যুনিজমের প্রতি জনগণের চরম ঘৃণাবোধ।
ঘ) রাজনৈতিকভাবে তরুণ সমাজবিপ্লবীদের মাঝে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তীব্র আকাক্সক্ষা ও ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা।
ঙ) ভৌগোলিকভাবে পার্শ্ব শত্রু পরিবেষ্টিত রাষ্ট্রের ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের ঘৃণাবোধ।
বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য অপর্যাপ্ত উপাদান
(ক) সঠিক ও একক নেতৃত্ব,
(খ) আদর্শ কর্মী বাহিনী,
(গ) শিক্ষা,
(ঘ) রাজনৈতিক বিপ্লবী কর্মসূচি।
বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বাধাসমূহ
ক) বিরুদ্ধবাদীদের সীমাহীন অপপ্রচারের কারণে ইসলামী রাজনীতি ও সমাজ বিপ্লবের কর্মসূচি এবং ধর্মকে রাষ্ট্র পরিচালনা প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখা। পাক আমলে ও স্বাধীনতা সংগ্রামকালীন ইসলামী দলসমূহের বিতর্কিত ভূমিকার প্রতি জনভীতি।
খ) সা¤্রাজ্যবাদী দুই পরাশক্তি এবং প্রতিবেশী নয়া উপনিবেশবাদী ভারতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চক্রান্ত; তাদের এ দেশীয় এজেন্ট বা দালালদের পোষণ, তোষণ ও মদদ জোগানো।
গ) ধর্মের ব্যাপারে বুদ্ধিজীবী মহলের নির্লিপ্ততা এবং অন্য মতাদর্শের সেবাদাসে পরিণত হয়ে যুবশিক্ষিত সমাজের আদর্শিক মস্তিষ্ক বিকৃত করণ প্রক্রিয়া।
ঘ) আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র তথা ঘএঙ-দের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিরোধিতা।
ঙ) সংখ্যালঘুদের ইসলামভীতি।
চ) ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহ এবং পীর-মাশায়েখদের মধ্যে অব্যাহত অনৈক্য।
ছ) ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এনজিও পরিচালিত বামপন্থী (বর্তমানে সরকারপন্থী) পত্রিকাসমূহে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও বিবৃতিজীবীদের ইসলাম, ইসলামী দল ও ইসলামী ব্যক্তিত্বগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক অব্যাহত মিথ্যা অপপ্রচার ও কুৎসা রটনার মাধ্যমে সহজ-সরল জনগণকে বিভ্রান্তকরণ।
সহায়ক, অপর্যাপ্ত এবং বাধা প্রদানকারী উপকরণসমূহ চিহ্নিত করণের পর এখন আমরা বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আখ্লাকে নববী সা.-এর ভূমিকা আলোচনা করবো।
বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর আখ্লাক বা চারিত্রিক সৌন্দর্য সুষমার কথা চিন্তা করলে বুঝা যায় যে, তিনি ছিলেন দুনিয়ার তাবৎ মানুষ এমনকি আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক প্রেরিত নবী-রাসূলগণের চেয়েও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা পবিত্র কুরআনে সাক্ষ্য দিয়ে ঘোষণা করেন, “ইন্নাকা লা’আলা খুলুক্কিন আযিম” হে মুহাম্মাদ! নিশ্চয়ই আপনি অনুপম চরিত্রের অধিকারী। তিনি ছিলেন সর্বোৎকৃষ্ট মহাপুরুষ ও নবীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতে বলা হয়েছে Of all the religious personalities of the world Muhammad (Sm.) তিনি নিজেই ছিলেন তার বাস্তব নমুনা। তাঁর চারিত্রিক সৌন্দর্য পূর্ণতার চরম শিখরে পৌঁছেছিলো।
বিশ্বনবী সা.-এর ওফাতের পর কতিপয় সাহাবী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হযরতের চরিত্র-মাধুর্য কিরূপ ছিল? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আপনারা কি কুরআন পাঠ করেননি? রাসূলে করিম সা.-এর চরিত্র ছিল কুরআনের বাস্তব নমুনা।’
পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করে আমরা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আখ্লাকে প্রস্ফুটিত হতে দেখি, ‘হযরত ইব্রাহীম (আ) এর তাওহিদ, হযরত ইউনুছ (আ) এর একাগ্রতা, হযরত ইউসুফ (আ) এর লজ্জা, হযরত শীষ (আ) এর আধ্যাত্মিকতা, হযরত নূহ (আ) এর বীরত্ব, হযরত লুত (আ) এর হিকমত, হযরত সালেহ্ (আ) এর স্পষ্টবাদিতা, হযরত ইয়াকুব (আ) এর সুসংবাদ, হযরত আইয়ুব (আ) এর ধৈর্য, হযরত মূসা (আ) এর জেহাদী প্রেরণা এবং হযরত ইয়াহিয়া (আ) এর পূত পবিত্রতা।’ (হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল জব্বার, শানে রিসালত, মাসিক দ্বীন-দুনিয়া ঈদে মিলাদুন্নবী সা. সংখ্যা ১৪০৭ হি.)।
মাত্র ৬৩ বছরের জীবনে আমরা রাসূলে পাক সা.-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করলে দেখি ৩টি পর্যায় :
১. নবুওয়াত পূর্ব জীবনে : কিশোর যুবক আল-আমীন, সামাজিক শৃঙ্খলার সংগঠক, সফল ব্যবসায়ী, আদর্শ স্বামী, নিরন্ন মানুষের মহান সেবক।
২. নবুওয়াতের পর ১৩ বছরের মক্কী জিন্দেগি : আল্লাহ্র পথে আহ্বানকারী একজন দা’য়ী ইলাল্লাহ, চরম কষ্ট সহিষ্ণু, লোভহীন, আপসহীন সংগ্রামী, শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষক, দূরদর্শী রাজনীতিক, আধ্যাত্মিক জগতে বিচরণকারী, হক ও সত্য পথ প্রদর্শনকারী, শত বিরোধিতার মাঝে আপন বিশ্বাসে অটল এবং অতুলনীয় আমানতদার।
৩. মাদানী জীবনের ১০ বছর : সফল রাষ্ট্রনায়ক, আদর্শ নেতা, আদর্শ সেনানায়ক, অনন্য কূটনীতিক, বৃহৎ মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, খোদা প্রদত্ত ইসলামী বিধান এবং উত্তম আখলাকের মাধ্যমে দ্বন্দ্ব-কলহপ্রিয় জাতিকে একক ঐক্যবদ্ধ জাতি, বীর সেনানী, রাষ্ট্রনায়ক ও দিগি¦জয়ী রূপে আবির্ভূত করণ।
ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ আরবের কলহপ্রিয় বেদুঈন জাতির উপর রাসূল সা.-এর চারিত্রিক প্রভাব কী রূপে পড়েছিল তা কত সুনিপুণ ভাবেই না তুলে ধরেছেন :
গলেছে পাহাড়, জ্বলেছে আকাশ, জেগেছে মানুষ তোমার সাথে
তোমার পথের যাত্রীরা কভু থামেনি চরম ব্যর্থতাতে,
তাই সিদ্দিক পেয়েছে বক্ষে অমন সত্য সিন্ধু দোল,
তাই উমরের পাতার ডেরায় নিখিল জনেরও কলরোল,
তাই ওসমান খুলে গেল দ্বার অতুলন দিল মণিকোঠার,
তাই তো আলীর হাতে চমকায় বাঁকা বিদ্যুৎ জুলফিকার,
খালেদ, তারেক ওড়ায় ঝাণ্ডা মাশুকের বুকে প্রেমের টান,
মহাচীন মুখে ফেরায়ে কাফেলা জ্ঞান যাত্রীরা করে প্রমাণ।
(সিরাজাম মুনীরা)
সংক্ষিপ্তাকারে নবী করীম সা. এর উপরোক্ত চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা শেষে আমরা বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর আখ্লাকের ভূমিকা তথা গৃহীত কর্মসূচি আলোচনা করতে পারি। জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে আদর্শ নেতৃত্ব, নিষ্ঠাবান কর্মীবাহিনী এবং সফল রাজনৈতিক কর্মসূচির অভাব দেখি। তৎকালীন আরবের বিশৃঙ্খল গোত্র ও নেতৃত্বাহীন মূর্তিপূজারি জাতির মাঝে আবির্ভূত মহানবী সা. এ জন্যই ১৩ বছরের মক্কী জিন্দেগিতে জাহেলি সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে ৩টি কর্মসূচি নিয়েছিলেন :
(ক) দাওয়াত : রাসূল সা. নব উদ্যমে সবর, হেকমত ও চারিত্রিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে লোকদের আহ্বান জানালেন, “হে মানবজাতি! তোমরা সেই আল্লাহ্র দাসত্ব স্বীকার কর, যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তী সকল লোকের সৃষ্টিকর্তা। তোমাদের সফলতা এবং আত্মরক্ষার পথ এখানেই নিহিত রয়েছে। সেই আল্লাহ্ই তোমাদের জন্য মাটির শয্যা বিছিয়ে দিয়েছেন। আকাশের ছাদ তৈরি করে ঊর্ধ্ব দেশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করান এবং নানা শস্য ও ফল উৎপন্ন করে তোমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করেন। সুতরাং তোমরা সে দ্বীনকে মেনে নাও।” (সূরা বাকারা : ২১)
রাসূলের এই দাওয়াতি অভিযানে ধীরে ধীরে হযরত আবু বকর রা., হযরত আলী রা., হযরত উসমান রা. এবং হযরত ওমর রা.সহ শত শত মক্কাবাসী চরম ত্যাগের মধ্য দিয়ে ইসলাম কবুল করেন।
(খ) সংগঠন : দাওয়াত কবুলকারীদের প্রতি রাসূল সা. আবার কুরআনের ভাষায় আহ্বান জানালেন, “তোমরা আল্লাহ্র রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁক্ড়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” এই আহ্বানের ফলে দৃঢ় প্রত্যয়ী ও সংগঠিত মুসলমানেরা শত লাঞ্ছনা, অপমানের মধ্যেও ইসলামের পতাকার সুশীতল ছায়া ত্যাগ করেন নি।
(গ) প্রশিক্ষণ : হযরত ইকরামা রা. ও হযরত আবু বকর রা. এর গৃহ ছিল ইসলামী আন্দোলনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এখানে নবীজী মুসলমানদের নৈতিক, আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক কল্যাণের প্রশিক্ষণ দান করে দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তোলেন।
উক্ত প্রাথমিক ৩টি কাজই যে কোন দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার বুনিয়াদ। এরপর নবীজী লোকদের প্রকাশ্য দাওয়াত দিতে গিয়ে মারাত্মক বিরোধিতার সম্মুখীন হয়ে আল্লাহ পাকের নির্দেশে মদিনায় হিজরত করেন। হিজরতের ফলে তাঁর সামনে খুলে যায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অবারিত দ্বার।
বাংলাদেশে যেরূপ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের বসবাস; মদিনাতেও তেমনি ছিল পৌত্তলিক, অগ্নি-উপাসক, ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। তারা নানাভাবে নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে থাকে। নবীজী মুসলিম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও বিধর্মীদের জন্য রচনা করলেন পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদিনার সনদ’ যা অনুসরণ করলে যে কোন মুসলিম রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু সমস্যার সহজ সমাধান দেয়া যায়। বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এটাও রাসূলের সা. একটি মহান শিক্ষা ও সনদ হিসেবে আমরা গ্রহণ করতে পারি।
ইংরেজ ঐতিহাসিক উইলিয়াম মুর তাই যথার্থ বলেছেন, “মদিনার সনদ শুধু সেই যুগের নয় বরং সর্ব যুগে মুহাম্মাদ সা.-এর বিরাট মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে।”
রাসূলে করিম সা. মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামের সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং প্রশাসনিক রূপ দেন। এখানে একাধারে ইবাদত, জ্ঞান-বিজ্ঞান আলোচনা, রাষ্ট্র পরিচালনা, কূটনৈতিক মিশন পরিচালনা, বিচার পরিচালনা, অর্থনৈতিক ক্রিয়া-কলাপ এবং রণনীতি প্রণীত হতো। আল্লাহ ও রাসূল সা.-এর দুশমন কুরাইশরা যখন শিশু রাষ্ট্রকে মিছমার করে দেবার জন্য এগিয়ে এলো, রাসূল সা. তখন গণযুদ্ধের আহ্বান জানালেন, ‘তোমরা কেন যুদ্ধ করো না ঐ সব নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অবহেলিত ও নিষ্পেষিতদের জন্য, যারা আকুল হয়ে ফরিয়াদ জানাচ্ছে, হে আমাদের প্রভু! আমাদের এই জালিম জনপদ থেকে উদ্ধার করো এবং আমাদের জন্যে একজন সাহায্যকারী পাঠাও।’ (সূরা আন নিসা : ৭৫)
নবীজীর ডাকে সাড়া দেয় আনসার ও মুহাজির তরুণ বিপ্লবীরা। আসে একে একে বদর, ওহুদ, খন্দকের যুদ্ধ। শত্রুরা পরাস্ত হয় চরমভাবে। বিজয়ীর বেশে উদ্ধার করেন প্রিয় নবীজীর মাতৃভূমি মুসলিম বিশ্বের পবিত্র কাবা নগরী মক্কা মুয়াজ্জামা। শত্রুর প্রতি তাঁর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা ইতিহাসে বিরল।
বাংলাদেশেও বাতিল শক্তি, শোষক শ্রেণি এবং সম্প্রসারণবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আদর্শ নেতৃত্বের মাধ্যমে বিপ্লবী কর্মীবাহিনী নিয়ে এগিয়ে গেলে এদেশে ইসলামী সমাজব্যবস্থা কায়েম সম্ভব হবে। নিজেদের আজাদিও সংরক্ষিত হবে ইসলামী ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের সুদৃঢ় বুনিয়াদে।
রাসূলের সা. চরিত্রের আরেকটি দিক রহমত : তিনি নিজ অধীন চাকরের সাথে যেরূপ ভালো ব্যবহার করতেন, তেমনি প্রতিবেশীর সেবায় এগিয়ে যেতেন। সাহাবীদের সুখ-সুঃখের সমভাগীদার হতেন। নিজে না খেয়েও দান করতেন। অতিথির সেবা করতেন, এমনকি নিজ হাতে মেহমানের ময়লা আবর্জনাও সাফ করেছেন। অনেক (ক্ষেত্র-বিশেষ) ইসলামী রাজনীতিকদের চরিত্রে এসব গুণাবলির দারুণ অভাব পরিলক্ষিত হয়। তাই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে নবীজীর চারিত্রিক ঐ বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের নেতা ও কর্মীদের অর্জন করতে হবে আন্তরিকতার সাথে।
আরেকটি দিক তাঁর আপসহীনতা
মক্কার সমাজপতিরা আরবের সেরা সুন্দরী ও অঢেল ধন-সম্পদ দান এবং নিজেদের রাজা বানাবার নানা প্রলোভন দেখিয়েছিলো রাসূল সা.কে ইসলামের সুমহান দাওয়াত প্রদান থেকে বিরত রাখার জন্যে, কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মাদ সা. তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। আজকাল বাংলাদেশে অনেক ইসলামী দলকে এবং তাদের নেতৃবৃন্দকে দেখা যায় প্রতিষ্ঠিত অনৈসলামিক সরকারের সাথে, বাতিল শক্তির সাথে আঁতাত করে ইসলামের ক্ষতি করতে। আমাদের লক্ষ্য যখন পূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, তবে কেন অন্য দলের সাথে অংশীদার হবো? কেন তাদের দুর্নীতির দায় ভাগ আমাদের গায়ে লাগবে? ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আল-কুরআন ও সুন্নাহ্র উপর টিকে থেকে অবশ্যই এর বিপ্লবী নেতা ও কর্মীবাহিনীকে আপসহীন হতে হবে। যাবতীয় সমঝোতা ও আপসকামিতার বিরুদ্ধে সবক নিতে হবে রাসূল সা.-এর আখ্লাক থেকে।
বিদ্যা শিক্ষার কোন বিকল্প নেই
শিক্ষিত কর্মীবাহিনী না হলে ইসলামী সমাজ বিপ্লব করা যায় না বিধায় তৌহিদে বিশ্বাসী মুসলমানদের মহান নেতার (নবী করীম সা.) প্রতি আল্লাহ্র প্রথম সবক ছিল, “পড়! তোমার প্রভুর নামে।” রাসূল সা.-ও তাই শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিেেছন বিশেষভাবে :
১. বিদ্যা শিক্ষা অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ফরজ।
২. বিদ্যার জন্য দরকার হয় চীন যাও।
৩. বিদ্বানের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও উত্তম।
রাসূলে পাকের উপরোক্ত হাদিসের আলোকে বাংলাদেশের ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনসাধারণকে ব্যাপকভাবে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।
আরবদের জাহেলি সমাজে নারীরা ছিলো ভোগের বস্তু তথা মর্যাদাহীন। নবীজী সে জাহেলি সমাজে নারীকে মা, বোন, স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে তাদের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করেন। “মায়ের পায়ের তলায় সন্তানের বেহেস্ত” নির্ধারণ করে দিয়ে তাদের পরম শ্রদ্ধার পাত্রী করেছেন। পর্দা প্রথার মাধ্যমে তাদের মর্যাদা সমুন্নত রেখেছেন। তাই বাংলাদেশের নারীদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ও সামাজিক অনাচার থেকে রক্ষা করার জন্যে রাসূল সা.-এর নীতিই একমাত্র অনুসরণযোগ্য আদর্শ।
তিনি সমাজের বিত্তশালীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, “তোমার অর্জিত সম্পদের উপর তোমার গরিব ভাইদের হক আছে। এটা গরিব ভাইদের প্রতি তোমার করুণা নয় বরং এটা তাদের অধিকার।” যাকাতের বিধান প্রতিষ্ঠা এবং সুদ হারাম করে তিনি ইসলামী অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সুদৃঢ়ভাবে কায়েম করেছেন। উপহার দিয়েছেন অভাবহীন এক সুখী সমৃদ্ধজাতি। বাংলাদেশের অনগ্রসরতায় নবীজীর সে অর্থনৈতিক বিধানসমূহ অনুসরণ করে আমরাও অর্থনৈতিক মুক্তি পেতে পারি।
সর্বশেষে বলবো- একমাত্র রাসূল সা. এর উপরোক্ত আখলাক, আদর্শ ও নীতি অনুসরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আর এতেই পূর্ণ হবে এদেশের মানুষের চির আশা। বিশ্বের দরবারে আমরা মান-ইজ্জতের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো। সামাজিক কল্যাণের সুবাদে আমাদের পার্থিব জীবনে আসবে সুখ আর পরকালীন জীবনে আমরা পাবো অনন্ত শান্তি।
আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর পেয়ারে হাবীব রাসূলে পাক সা.-এর আখ্লাক অনুসরণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার তৌফিক দিন। আমিন।
লেখক : সম্পাদক, মাসিক দ্বীন দুনিয়া

SHARE

Leave a Reply