বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অন্তরায় ও উত্তরণ ভাবনা -মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম

ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের দাবিটি এ দেশে দীর্ঘ সাত-আট দশক ধরে নানাভাবে উচ্চারিত হলেও অদ্যাবধি এটি কার্যত আলোচনা পর্যালোচনা স্তরেই রয়ে গেছে। অথচ ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবদুল মালেক এ দাবিতে সোচ্চার হয়ে শাহাদাৎ বরণ করার পর এ প্রচেষ্টাটি তখন যেভাবে গতিশীল আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল তাতে নিকট ভবিষ্যতেই এদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করা গিয়েছিল। কিন্তু এক এক করে অর্ধশতাব্দীকাল অতিক্রম এবং জাতীয় পর্যায়ে অন্তত আট-নয়টি শিক্ষা কমিশন গঠিত হওয়ার পরও ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা চালুর দাবিটি আজ শুধু উপেক্ষিতই থেকে যায়নি; বরং সর্বশেষ শিক্ষা কমিশনে হতাশাজনকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতাকেই শিক্ষার আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। সুতরাং, শতকরা নব্বই ভাগ মুসলিম জনসংখ্যার এ দেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের অপরিহার্য বাস্তবতাকে যেভাবে কখনো উপেক্ষা করার মাধ্যমে আবার কখনো সরাসরি বিরোধিতা করার মাধ্যমে অস্বীকার করা হচ্ছে ; তা এদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সত্যিকারের মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলার উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে অন্ধকারে হারিয়ে দিচ্ছে। সে প্রেক্ষিতে এদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রকৃত অন্তরায়সমূহ চিহ্নিতকরণ ও তা নিরসনের উপায় সম্পর্কে আলোচনা সময়ের বিচারে যথেষ্ট গুরুত্বের দাবিদার।
বস্তুত আমাদের দেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে নানাবিধ অন্তরায় রয়েছে। বিশেষ করে ইংরেজ শাসনামলে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার প্রবর্তিত বিভেদ সৃষ্টির শিক্ষাব্যবস্থা চালুর সুদূরপ্রসারী ফলাফলে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার ধারণা ও রূপরেখা প্রসঙ্গে ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মাঝে সৃষ্ট দৃষ্টিভিঙ্গর পার্থক্য ও অনৈক্য, রাষ্ট্রীয় সমর্থন, আনুকূল্য ও সহযোগিতার অভাব, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ নারীদেরকে ইসলামী শিক্ষাকার্যক্রম ও কর্মসংস্থানে অন্তর্ভুক্তিতে অনীহা, প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় যুগোপযোগিতার অভাবসহ নানাবিধ ত্রুটি-বিচ্যুতির অব্যাহত বিস্তৃতি এবং ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শ মডেল উপস্থাপনে ব্যর্থতা প্রভৃতি এসব অন্তরায়ের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অথচ ব্রিটিশ শাসন-পূর্ববর্তী প্রায় ছয়শত বছরের মুসলিম শাসনকালে এদেশে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল, তা ছিল যুগোপযোগী এক আদর্শ ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা। এস.এম. জাফর ও অন্যান্য গবেষকদের অনুসন্ধানে দেখা যায়, তখনকার আরবি ও ফরাসি মাধ্যমের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের মাদ্রাসাগুলোতে ইসলামী জীবনাদর্শভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার উপযুক্ত লোক তৈরির ব্যবস্থা ছিল। এ প্রসঙ্গে ইংরেজ সিভিল সার্ভেন্ট উইলিয়াম হান্টার সাক্ষ্য দিচ্ছেন- “আমরা এদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে মুসলমানরা কেবল রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারীই ছিল না, বরং জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং বুদ্ধি ও মেধাগত দিক থেকেও তারা ছিল শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। তাঁদের হাতে ছিল এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা যাকে কোন অবস্থাতেই খাটো করে দেখা যায় না। এতে ছিল উন্নত নৈতিক ও মানসিক প্রশিক্ষণের সুব্যবস্থা।” বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তানায়ক আল্লামা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী (রহ) এ সম্পর্কে জানাচ্ছেন- “তখন আমাদের দেশে যে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল, তা সে সময়ের দাবি ও প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট ছিল। এ ব্যবস্থায় এমন সকল বিষয় পড়ানো হতো, যা তখনকার রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল। তাতে শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই প্রদান করা হতো না, বরং সে শিক্ষাব্যবস্থায় দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি, সাহিত্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়েও শিক্ষা দেয়া হতো। সে সময়ের সিভিল সার্ভিসের জন্য যে ধরনের বিদ্যা বুদ্ধির প্রয়োজন ছিল তা সবই পড়ানো হতো। কিন্তু যখন সে রাজনৈতিক বিপ্লব সংঘটিত হয়, যার প্রেক্ষিতে আমরা গোলামে পরিণত হলাম। তখন এ গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেললো।” বস্তুত সে সময়ে শিক্ষাব্যবস্থার এই যুগোপযোগিতার কারণে তখন শিক্ষার হার এবং জনসংখ্যার অনুপাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও ছিল সন্তোষজনক। ম্যাক্স মুলারের দেয়া তথ্য মতে, “সে সময়ে শুধু বাংলা প্রদেশেই আশি হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। সে হিসেবে প্রতি চার শ’ জনের জন্য একটি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গ্রাম হিসেবেও প্রত্যেক গ্রামে একটি করে এ জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল।” এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহের জন্যও ছিল সরকারি অনুদান ও নানা ধরনের ওয়াক্ফ এস্টেট। কিন্তু ব্রিটিশরা এদেশে এসে তাদের সাম্রাজ্যবাদী নখর দেশের অন্যান্য সেক্টরের মতো শিক্ষা ক্ষেত্রেও বিস্তৃত করে এবং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে তাদের বশংবদ প্রজন্ম সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করে। লর্ড ম্যাকলের ভাষায়- “ডব সঁংঃ ধঃ ঢ়ৎবংবহঃ ফড় ড়ঁৎ নবংঃ ঃড় ভড়ৎস ধ পষধংং যিড় সধু নব রহঃবৎঢ়ৎবঃবৎং নবঃবিবহ ঁং ধহফ ঃযব সরষষরড়হং যিড়স বি মড়াবৎহ; ধ পষধংং ড়ভ ঢ়বৎংড়হং ওহফরধহং রহ নষড়ড়ফ ধহফ পড়ষড়ঁৎ, নঁঃ ঊহমষরংয রহ ঃধংঃবং, রহ ড়ঢ়রহরড়হং, রহ সড়ৎধষং ধহফ রহ রহঃবষষবপঃ” অর্থাৎ, যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে তারা শাসন করছিল তাদের সাথে শাসক ইংরেজদের মধ্যে দূতের কাজ করা এবং রক্তে ও গায়ের রঙে ভারতীয় হলেও মেজাজে, চিন্তা-ভাবনায়, নৈতিকতায় ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ইংরেজ হয়ে যাবে এমন একটি গোষ্ঠী সৃষ্টি করাই ছিল তাদের এই নতুন শিক্ষাকার্যক্রমের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
শিক্ষাব্যবস্থায় সর্বভারতীয় এই সাধারণ লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি রাজ্যহারা মুসলিমদের জন্য তাদের ছিল আরো সুনির্দিষ্ট কৌশল। এ সম্পর্কে উইলিয়াম হান্টারের ভাষ্য, “ডব ংযড়ঁষফ ধঃ ষবহমঃয যধাব ঃযব গড়যধসসবফধহ ুড়ঁঃয বফঁপধঃবফ ধপপড়ৎফরহম ঃড় ড়ঁৎ ঢ়ষধহ. ডরঃযড়ঁঃ রহঃবৎভবৎরহম রহ ধহু ধিু রিঃয ঃযবরৎ ৎবষরমরড়হ ধহফ রহ ঃযব ঢ়ৎড়পবংং ড়ভ বহধনষরহম ঃযবস ঃড় ষবধৎহ ঃযবরৎ ৎবষরমরড়ঁং ফঁঃরবং, বি ংযড়ঁষফ ৎবহফবৎ ঃযব ৎবষরমরড়হ ঢ়বৎযধঢ়ং ষবংং ংরহপবৎব নঁঃ পবৎঃধরহষু ষবংং ভধহধঃরপধষ.” অর্থাৎ, মুহাম্মদী (মুসলিম) যুবকদের ধর্মে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে তাদেরকে ধর্মীয় দায়িত্বাবলি শিক্ষা দিতে দিতেই ধর্মের প্রতি কম আন্তরিকতাপূর্ণ, অন্তত কম গোঁড়া করে ফেলার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। সত্যি বলতে কি, এ লক্ষ্যে তারা এদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু ইংরেজি ও ধর্মীয় এ দু’ভাগেই বিভক্ত করেনি; উপরন্তু মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকেও সরকার নিয়ন্ত্রিত আলিয়া ও সরকারি নিয়ন্ত্রণহীন কওমি এ দু’ভাগে বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয়। ফলে মুসলিম সমাজে দেখা দেয় ত্রিধা বিভক্তি যা আজ অবধি কার্যকর আছে এবং এদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবায়নে এটি অন্যতম প্রধান অন্তরায় বলে চিহ্নিত করা যায়। কেননা একই মুসলিম পরিবারের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত সন্তান তার বস্তুবাদী ও ভোগবাদী শিক্ষাদর্শনের আলোকে একই পরিবারের মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত সন্তানকে অতীতমুখী, পশ্চাৎগামী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও গোঁড়া এবং মাদ্রাসা শিক্ষিত সন্তানটি ইংরেজি শিক্ষিত সদস্যকে দুনিয়ামুখী ও নাফরমান বলে উপসংহার টেনে বসেন। একইভাবে মাদ্রাসা শিক্ষিতদের মাঝেও আলিয়া ও কওমি এ দু’গ্রুপের মধ্যে দ্বীনদারি, পরহেজগারির পূর্ণতা ও অপূর্ণতা প্রশ্নে ভিন্নমতের সরব উপস্থিতি। এভাবে ইংরেজরা এদেশে বিভক্তির শিক্ষানীতি চালু করে গোটা মুসলিম জাতির মধ্যে তাদের শিক্ষাব্যবস্থাসহ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল স্তরে যে বিভক্তির রেখা টেনে দিয়েছে, তা আজ অবধি কার্যকর থাকায় এদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের বিষয়টি বার বার যথাযথ গুরুত্ব লাভে ব্যর্থ হচ্ছে।
আমাদের দেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন না হওয়ার পথে এর পরে যে কারণটি দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়, তা হলো ইসলামী শিক্ষাবিদদের মাঝে চিন্তার অনৈক্য এবং ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার কোন একক মডেল উপস্থাপনে ব্যর্থতা। কেননা এদেশে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ইসলামপ্রিয় শিক্ষাবিদ এবং আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসা থেকে শিক্ষিত ইসলামী চিন্তাবিদদের মাঝে চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গির যে পার্থক্য আছে, তা তাদেরকে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার কোন একক মডেল তৈরিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। প্রত্যেকটি গ্রুপই তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে অনড় অবিচল থাকতে দৃঢ়তা দেখাচ্ছেন কিংবা প্রয়োজনীয় ছাড় দিতে অপারগতার নজির রাখছেন। এমনকি আলিয়া মাদ্রাসার ফাজিল ও কামিলকে সাধারণ শিক্ষার ডিগ্রি ও মাস্টার্সের সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্নে সামঞ্জস্য বিধান কিংবা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাকে সরকারি স্বীকৃতি দেয়ার লক্ষ্যে আধুনিকায়নের প্রশ্নেও ঐকমত্যে আসতে পারছেন না কোনো পক্ষই। এর ফলে প্রচলিত বস্তুবাদী শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের সমাজ জীবনে যে ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলা, অন্যায়-অবিচার ও অনৈতিকতার সয়লাব বইয়ে দিচ্ছে তা থেকে উত্তরণের জন্য ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবায়ন সময়ের বিচারে অপরিহার্য হলেও তার কোনো আদর্শ নমুনা স্থাপন কিংবা সে লক্ষ্যে জনমত সংগঠন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও প্রচলিত ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থার কুফল উপলব্ধি করে এদেশে একটি আদর্শ ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা চালুর প্রচেষ্টা চলছে গত শতাব্দীর শুরু থেকেই। কখনও আল্লামা শিবলী নোমানী (রহ), কখনও নওয়াব নিযামুল মুলক ও মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী (রহ)-র নেতৃত্বে, কখনও শামসুল ওলামা আবু নসর ওয়াহিদের নেতৃত্বে এই উদ্যোগসমূহ সক্রিয় ছিল। কেননা ১৭৫৭ সালে পলাশীতে বাংলার মুসলমানদের ভাগ্য বিপর্যয়ের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশের রাজদন্ডের কর্তৃত্ব লাভের পর ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮১ সালে যে আলিয়া মাদ্রাসা স্থাপন করেছিলেন তা যে কোনোভাবেই ইসলামের কোন বিশেষজ্ঞ তৈরির জন্য ছিল না, বরং ধর্মশিক্ষা বিস্তারের নামে মুসলমানদেরকে আপাত সন্তুষ্ট রাখা এবং অফিস আদালতের জন্য ইংরেজদের প্রতি আনুগত্যশীল একদল আমলা বা দোভাষী জোগানের পাশাপাশি ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে; উইলিয়াম হান্টারের পূর্বোক্ত উক্তিটি তারই সাক্ষ্য বহন করে। বস্তুত এ বিষয়টি অল্প দিনের ব্যবধানেই উপমহাদেশীয় অনেক দূরদর্শী আলেম উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এ জন্য এ অবস্থা মোকাবেলায় ইসলামের মূল স্পিরিট বজায় রেখে প্রকৃত মুসলিম তৈরির লক্ষ্যে আল্লামা কাশেম নানুতুভির (রহ) নেতৃত্বে ১৮৮০ সালে যে দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটিও যে যুগোপযোগী ছিল না, অল্পকালের ব্যবধানে তাও স্পষ্ট হয়ে যায়। কেননা এ শিক্ষাব্যবস্থায় সামাজিক শিক্ষা বা বিজ্ঞান ও ব্যবহারিক শিক্ষাকে কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে, ফলে সম্প্রসারণমান পাশ্চাত্য সভ্যতার বিপরীতে ইসলামী সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব উপস্থাপনে তা ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে ১৮৬৩ সালে নবাব আব্দুল লতিফের ‘মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি’ ও ১৮৭৮ সালে নবাব আমীর আলীর ‘ন্যাশনাল মোহামেডান সোসাইটি’-র প্রতিষ্ঠা এবং ১৮৭৫ সালে স্যার সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে আলিগড় ‘মোহামেডান ওরিয়েন্টাল কলেজ’ স্থাপনের মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষাকে গ্রহণ করে ইংরেজ আনুগত্য প্রদর্শনের মাধ্যমে মুসলমানদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার প্রচেষ্টার ফলাফলও যে ইসলামের প্রকৃত অনুসারী সৃষ্টির আদৌ সহায়ক ছিল না, তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এ শিক্ষাব্যবস্থা যে ভয়ানক পরিণতি এনে দিয়েছে সে সম্পর্কে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ) লিখেছেন, “আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা শুধু ত্রুটিপূর্ণই নয়, বরং স্যার সৈয়দ আহমেদ খান, মুহসিনুল মূলক, ভিকারুল মূলক এবং অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ যেসব উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হাসিলের জন্য একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন এবং যে জন্য মুসলমানরা তাদের সামর্থ্যরে চাইতেও বেশি উৎসাহের সাথে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্মাণকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, সেসব উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের উল্টো ফলাফলই এ থেকে পাওয়া যাচ্ছে। Ñ এ আন্দোলন একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত আমাদের পার্থিব ও বৈষয়িক স্বার্থ হাসিলে সহায়ক হয়েছিল। তবে এর মাধ্যমে আমরা পার্থিব স্বার্থ যতটা উদ্ধার করেছি, আমাদের দ্বীনকে তার চেয়ে অনেক গুণে বেশি বিকৃত করে ফেলেছি। এভাবে আমাদের মাঝে কৃষ্ণবর্ণের ফিরিঙ্গিদের আবির্ভাব ঘটেছে, এ্যাংলো মোহামেডান ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ান জন্ম লাভ করেছে, তাও আবার এমন যাদের মানসিকতায় ‘মোহামেডান’ ও ‘ইন্ডিয়ান’ হওয়ার অনুপাত নামে মাত্র বিদ্যমান।”
সুতরাং, এদেশে কোন কোন মহল থেকে প্রচলিত বস্তুবাদী দর্শনভিত্তিক শিক্ষা অব্যাহত রেখে তার সাথে ইসলামিয়াতের মত একটি পত্রকে বাধ্যতামূলক করে কিংবা উক্ত পত্রের নম্বরের বরাদ্দ বৃদ্ধি করে, আবার কোন কোন মহল থেকে সামাজিক শিক্ষা ও বিজ্ঞান শিক্ষা বর্জিত কুরআন, হাদীস, ফেকাহর ঐতিহ্যবাহী হালাল-হারাম, পাক-নাপাক বিষয়ক আলোচনার মধ্যেই ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবায়ন খুঁজে পাবার দৃষ্টিভঙ্গি দু’টি আদৌ কল্যাণকর নয়। কেননা ইসলামী শিক্ষাদর্শনের যে ইঙ্গিত আল্লাহ তা’আলা কালামে পাকে দিয়েছেন তা উপর্যুক্ত দু’মতের সমন্বিত রূপ “ওয়া আল্লামা আদামাল আসমা’আ কুল্লাহা ছুম্মা আরাদাহুম আ‘লাল মালাইকাহ”- অতঃপর আল্লাহ তায়ালা আদম (আ)কে সকল জিনিসের নাম শিক্ষা দিলেন এবং তা সবই ফিরিশতাদের সামনে পেশ করলেন। (সূরা আল্ বাকারা : ৩১) অর্থাৎ ফিরিশতাদের সামনে বনি আদমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের হাতিয়ার ছিল বস্তুনাম বা ব্যবহারিক শিক্ষা। সুতরাং, ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবায়নে উপর্যুক্ত দুটি প্রান্তিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় সাধন অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, লোকপ্রশাসন, নৃ-বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, আইন প্রভৃতি বিষয়ে পাশ্চাত্য দর্শনের নাস্তিক্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে তা শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা দরকার এবং পদার্থবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল, গণিত, পরিসংখ্যান প্রভৃতি প্রকৃতি বিজ্ঞানের সূত্রগুলোকে মহাবিজ্ঞানী ও সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালার নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা দরকার, যাতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিষয়ে মুসলিম বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে কুরআন, হাদীস, ফিকাহ্ ও কালামশাস্ত্রের আলোচনাতে ঐতিহ্যবাহী হালাল-হারাম, পাক-নাপাক বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিষয়ে বিশেষ করে সমাজব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন প্রভৃতি বিষয়ক আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এক্ষেত্রে ভাষা, বিষয়বিন্যাস এবং রচনাশৈলীতেও আধুনিকায়ন প্রয়োজন যাতে তা বর্তমান যুগের মনমানসিকতায় আবেদন জানাতে পারে।
উল্লেখ্য, শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবায়ন একটি ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ এবং এর জন্য সরকারি সাহায্য, সমর্থন ও আনুকূল্য অপরিহার্য। কিন্তু আমাদের দেশে ব্রিটিশ ও ব্রিটিশ-পরবর্তী শাসনকালে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রশ্নে প্রয়োজনীয় সরকারি সাহায্য, সমর্থন ও আনুকূল্য প্রাপ্তি তো দূরের কথা, অধিকাংশ সময়ে এ প্রচেষ্টাকে অতীতমুখিতা ও প্রগতির অন্তরায় বলে চিহ্নিত করে তা স্তব্ধ করে দেয়ার প্রচেষ্টা চলেছে এবং প্রায় সবগুলো শিক্ষা কমিশনই ইসলামিয়াতের নম্বরকে কম- বেশি করার পাশাপাশি প্রচলিত আলিয়া মাদ্রাসাকে যুগোপযোগিতার নামে আরো ইংরেজিমুখী এবং কওমি মাদ্রাসাগুলোকে বন্ধ করে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা উচ্চারিত হয়েছে। অথচ এদেশে মুঘল ও প্রাক-মুঘল শাসনকালে অধিকাংশ মক্তব মাদ্রাসা তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি আনুকূল্য ও নানা প্রকার ওয়াক্ফ এস্টেট দ্বারা পরিচালিত হতো যা ইংরেজ শাসনামলে বন্ধ হয়ে যায়। কেননা ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী প্রথমে সরকারি সাহায্যের হাত গুটিয়ে নেয়, এরপর ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে প্রায় সমস্ত জমিদারি মুসলিমদের হাত থেকে উঠতি বিত্তশালী হিন্দুদের হাতে স্থানান্তরিত হয়। এর ফলে মুসলিম জমিদারদের আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৮৩৮ সালে ইসলামী শিক্ষার জন্য উৎসর্গীকৃত সকল তহবিল ইংরেজি শিক্ষার জন্য বরাদ্দকরণ ও ১৮৬৪ সালে সমস্ত ওয়াকফ এস্টেটগুলো বাজেয়াপ্ত করে এদেশে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের মৃত্যু ঘণ্টা বাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়, যা আজ অবধি ক্রিয়াশীল। সুতরাং, এদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবায়নে সরকারি সমর্থন, সাহায্য ও অনুদান লাভ অপরিহার্য।
আমাদের দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। অথচ ইসলামী শিক্ষা বিস্তার প্রচেষ্টায় বিগত কয়েক শতাব্দী যাবৎ নারীদেরকে সম্পৃক্তকরণের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়ে আসছে। যদিও ইসলামে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জ্ঞানার্জনকে বাধ্যতামূলক করার যে নির্দেশনা আছে, তা ইসলামের স্বর্ণযুগে এমনকি এই উপমহাদেশেও মুসলিম শাসনকালে কার্যকর ছিল বলে জানা যায়। উল্লেখ্য, ইসলামের স্বর্ণযুগে নারী শিক্ষার কতটুকু গুরুত্ব দেয়া হতো তা বিবেচনায় হাদীসশাস্ত্রে মহিলা সাহাবীদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। হাদীসশাস্ত্রে যে এক হাজার সাহাবীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তার মধ্যে মহিলা সাহাবী ছিলেন দেড়শত এবং প্রথম দিক থেকে তৃতীয় স্থানে হলেন নবীপতœী হযরত আয়েশা (রা:)। রাসূলের (সা) পর উমাইয়া যুগে হযরত মুসআবের (রা) দুই স্ত্রী যথাক্রমে আয়েশা বিনতে তালহা (রা) জোতির্বিদ্যা ও আরব ইতিহাসে এবং সাফিনা বিনতে হুসাইন (রা) কবিতা ও সাহিত্যে উচ্চস্তরের গবেষক ছিলেন। একইভাবে আব্বাসীয় যুগে আবুল আব্বাস আল সাফ্ফার স্ত্রী উম্মে সালমা, খলিফা আল মাহদীর স্ত্রী খায়জুরান ও কন্যা উলাইয়া, খলিফা হারুন-অর-রশীদের স্ত্রী জুবায়দা প্রভৃতি নারী রাজকার্যে প্রভাব বিস্তারে যেমন সক্ষম ছিলেন, তেমনি খলিফা আল মামুনের স্ত্রী বুরান যুগ শ্রেষ্ঠ লেখিকা ছিলেন। এই উপমহাদেশেও সুলতানি ও মুঘল শাসনকালে মুসলিম নারীদের শিক্ষা দানের ব্যাপক ব্যবস্থা ছিল বলে জানা যায়। ইবনে বতুতা তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণ কাহিনীতে তিনটি প্রসিদ্ধ মহিলা মাদ্রাসার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিক মুহাম্মদ কাশিম ফিরিশতা লিখেছেন, সুলতান গিয়াসুদ্দীন খিলজির মহলে যে দশ হাজার মহিলা ছিলেন, তাদের মধ্যে কয়েক হাজার ছিলেন হাফেজা, ক্বারিয়া, আলেমা ও শিক্ষিকা। একইভাবে সম্রাট বাবরের কন্যা গুলবদন বানু লেখিকা, হুমায়ুন ভ্রাতুষ্পুত্রী সেলিমা সুলতানা কাব্যে, আকবরের ধাত্রীমাতা মাহাম আনকাহ শিক্ষা বিস্তারে, জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নুরজাহান কাব্যে ও আরবি-ফারসি সাহিত্যে সুপণ্ডিত, শাহজাহান স্ত্রী মমতাজ মহল ও কন্যা জাহান আরা বেগম ফারসি ভাষায় সুপণ্ডিত ও কবি, অপর কন্যা জেবিন্দা বেগম স্বভাবকবি এবং জাহান আরার শিক্ষিকা সতিউন্নিসা মুসলিম ধর্মশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন। আওরঙ্গজেব কন্যা জেবুন্নিসা তো ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ সংস্কৃতিসেবী মহিলা। এ ছাড়া দাক্ষিণাত্যের চাঁদ সুলতানা, ইলতুৎমিশ কন্যা সুলতানা রাজিয়া ও বেগম হাসরত মহল তাদের যুগে জ্ঞান গরিমা ও শিক্ষা-দীক্ষায় বিশিষ্ট স্থানের অধিকারিনী ছিলেন। অথচ আমাদের এই দেশে বিগত কয়েক শতকে শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রমে নারীদের সম্পৃক্তকরণের বিষয়টি অব্যাহতভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। এর ফলে একদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতা এ সুযোগে নারীসমাজকে কাছে টেনে তাদের জন্য আধুনিক শিক্ষার দ্বার খুলে দিয়েছে এবং ইসলামে স্বীকৃত নারী অধিকার সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ও বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের মত মহীয়সী মহিলা এ অবস্থায় কিছুটা ধর্মীয় অনুশাসনের অনুসরণ অব্যাহত রেখে যেভাবে নারী শিক্ষা বিস্তারে অগ্রসর হয়েছিলেন তার ফলাফলও পরবর্তীতে কার্যত ইসলামবিমুখতায় পর্যবসিত হয় এবং ইসলাম নারী অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করেছে বলে প্রপাগান্ডা চালানোর ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। এ অবস্থায় অতি সম্প্রতি কিছু মহিলা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্দা রক্ষার মাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ নারী শিক্ষার উপর্যুক্ত গুরুত্বকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে এবং এ বিষয়ে অতীত দৃষ্টিভঙ্গির অসারতা তুলে ধরছে। অতএব এদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নে নারীদেরকে অন্তর্ভুক্তকরণ এবং নারী কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব প্রদান সময়ের এক অপরিহার্য দাবি।
উল্লেখ্য, ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের অন্তরায় হিসেবে ইতঃপূর্বে এদেশের ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে বিদ্যমান যেসব মত পার্থক্যকে তুলে ধরা হয়েছে তার অনিবার্য ফলশ্রুতিতে এদেশের ইসলামপ্রিয় সাধারণ জনগণও নানা রকম বিভ্রান্তিতে রয়েছে। কেননা আজও এদেশে ইসলামের ইতিহাস বলতে সাধারণভাবে যেমন মুসলমান রাজা-বাদশাহদের রাজ্য জয়ের ইতিহাসকে বুঝানো হয়ে থাকে, তেমনি ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বলতে প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে বুঝানো হয়ে থাকে। এর ফলে এক দিকে এদেশের মাদ্রাসাগুলোতে সামাজিক শিক্ষা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মমুখী শিক্ষার অনুপস্থিতির ফলে সেখান থেকে তৈরি জনশক্তি যখন কর্মজীবনে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরত্বপূর্ণ পদগুলোতে প্রবেশের সুযোগ না পায়, তখন অভিভাবকমহল তাদের মূল্যায়নে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার অকার্যকারিতাকেই চিহ্নিত করে বসেন। অন্যদিকে সাম্প্রতিককালে মাদ্রাসাগুলোর পাবলিক পরীক্ষায় ব্যাপক হারে দুর্নীতি ও নকলবাজিতে ছাত্র-শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতার ফলে এই শিক্ষাব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাকে শূন্যের কোঠায় পৌঁছে দেয়ার উপক্রম হয়েছে। সর্বোপরি মুসলিম সমাজে দেশ ও জাতিকে পরিচালনার জন্য উপর্যুক্ত নেতৃত্ব উপহার দেয়ার যে স্বাভাবিক গুরুদায়িত্ব ইসলামী চিন্তাবিদদের ওপর অর্পিত আছে; সেক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতা এদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তরায়নে আর এক উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা। কেননা সমকালীন যুগ জিজ্ঞাসার জবাব দান ও নিত্য নতুন সমস্যার সমাধান প্রশ্নে সব সময়ই আমাদের দেশের আলেমসমাজের মধ্যে পশ্চাদমুখীনতা অর্থাৎ প্রথমে বিরোধিতা, এরপর মৌনতা ও অবশেষে তা গ্রহণ করার প্রবণতা লক্ষণীয়। বিশেষ করে রেডিও-টিভি ও ফটোগ্রাফির ব্যবহার, নাট্যাভিনয়, মরণোত্তর অঙ্গদান ও রক্তদানের মত বিষয়গুলোতে ত্বরিত সিদ্ধান্ত প্রদানে ব্যর্থতা এক্ষেত্রে অনস্বীকার্য। বস্তুত প্রথমে অস্বীকার ও পরবর্তীতে গ্রহণ করার এ প্রবণতার ফলে পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবীগণ ইসলাম ও তার বিশেষজ্ঞদেরকে প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পাচ্ছে যা এদেশে ইসলামী শিক্ষাদর্শনের অপরিহার্যতাকেও প্রশ্নবোধক করে তোলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।
সুতরাং, এদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত প্রতিবন্ধকতাগুলো অতিক্রমের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা দরকার। এজন্য একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে অগ্রগামী তথা নেতৃত্বদানকারী ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় এনে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত রূপরেখা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের আলোকে যুগোপযোগী সিলেবাস ও কারিকুলাম প্রণয়ন করা অপরিহার্য। আশা করা যায়, এর ফলে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার ধারণা, রূপরেখা ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া বিষয়ে এদেশের ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের মত-পার্থক্য ও নানাবিধ বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে; এদেশের ইসলামপ্রিয় সাধারণ জনগণও তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় সম্পৃক্ত করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে উৎসাহী হবে। কেননা এর মাধ্যমে আধুনিক যুগজিজ্ঞাসার জবাবদান তথা আধুনিক জাহেলিয়াতের সর্বগ্রাসী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম এমন দক্ষ ও উপযুক্ত জনশক্তি সৃষ্টির ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে, জাতীয় জীবনে প্রত্যাশিত নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বস্তুত এ জাতীয় সাফল্য আমাদের দেশের সচেতন মহলে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে এবং এ দেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রতিবন্ধকতাগুলোও দূর হবে।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply