বাংলাদেশে এক আজব নির্বাচন

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
Azobকোনো দেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এমন তামাশা বোধকরি স্মরণকালের ইতিহাসে আর কোথাও ঘটেনি। চার দিকে নানা কথার ফুলঝুরি, সারা বিশ্বের মুখ ফিরিয়ে নেয়া আর শুধু ভারতের আওয়ামী লীগকে চাওয়াÑ এ নিয়েই হচ্ছে বাংলাদেশের দশম সংসদ নির্বাচন। মন্ত্রীরা আছেন মন্ত্রী পদে। প্রধানমন্ত্রী নিজের ও অন্যসব মন্ত্রীর ক্ষমতা নিজ হাতে নিয়ে স্বপদে বহাল আছেন। এমপিরা এমপি পদে আছেন। নতুন করে আবার একজন এমপি পদে দাঁড়িয়েছেন। সেটা দাঁড়ানোর বোধকরি দরকার ছিল না। কারণ ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। আর ১৪৭ জন। তারমধ্যে জনা পঞ্চাশেক আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। কিছু আছে তার শরিক দলের। আর অন্যরা নাম নাজানা ‘স্বতন্ত্র’।
নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টিকে টানতে সে-কি প্রাণান্ত কোশেশ। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সোজা বলে দিয়েছেন, সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া তিনি এ নির্বাচনে অংশ নেবেন না। আর যায় কোথায়। এ ঘোষণা দেয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই এরশাদকে র‌্যাব পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে তার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় সিএমএইচে। সরকার বলছে, এরশাদ চিকিৎসার জন্য সিএমএইচে ভর্তি হয়েছেন। এরশাদ সেখান থেকে বারবার বলেছেন, সরকার আমাকে আসলে সিএমএইচে বন্দী করে রেখেছে। কড়াকড়ি অনেক। তার পরও তার হাসপাতাল কেবিনের চিত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এরশাদকে গলফ খেলতে যেতে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তার ভাই জি এম কাদেরকেও তার সাথে দেখা করতে দেয়া হচ্ছে না। প্রথম দিকে বলা হতে থাকল, এরশাদের জাতীয় পার্টি নির্বাচনে আছে। রওশন এরশাদ এতে নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান পণ্ড করে দিয়েছে র‌্যাব-পুলিশ। রওশন এরশাদ কখনো বলেননি, এরশাদ তাকে নির্বাচনী নেতৃত্ব গ্রহণ করতে বলেছেন। এরশাদের মুখপাত্র ববি হাজ্জাজকে তুলে নিয়ে গিয়ে র‌্যাব জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তারপর ১২ ঘণ্টার মধ্যেই তাকে লন্ডন পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফাঁক দিয়ে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ গং অত্যন্ত চুপিসারে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন না রওশন এরশাদ বা জি এম কাদের। কেন তারা নেই? আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জবাবে জানিয়েছেন, তারা অসুস্থ।’ তবু ভালো, এদের কোনো হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য করা হয়নি।
এরশাদের জাতীয় পার্টি এর আগেও ভেঙে তিন টুকরো হয়েছে। এক দিকে ছিলেন এরশাদ, আরেক দিকে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, অন্য দিকে নাজিউর রহমান মঞ্জু। তা সত্ত্বেও জাতীয় পার্টির বড় অংশ এরশাদের সাথেই ছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচন নিয়ে এরশাদ যখন নির্বাচনে যাবো, যাবো না করছিলেন এবং একপর্যায়ে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন কাজী জাফর আহমদ দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে তার নেতৃত্বে আরেকটি জাতীয় পার্টি গঠন করেছেন। এরশাদ স্পষ্টতই বুঝতে পারছিলেন যে, নির্বাচনে যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় তাহলে তাকে আওয়ামী লীগের ছুড়ে দেয়া উচ্ছিষ্ট হয়ে থাকতে হবে। হয়তো তারচেয়ে অনেক বেশি আসন তিনি পাবেন। কিন্তু সে দেনদরবারে যখন মেলেনি, তখন এরশাদ চূড়ান্তভাবে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঢাকায় এসে এরশাদকে অনেক বুঝিয়েছেন যেন তিনি নির্বাচনে অংশ নেন। তা না হলে ‘জামায়াতের উত্থান ঘটবে।’ এরশাদ সুজাতা সিংকে বলে দিয়েছেন, জামায়াতের উত্থান যদি ঘটে তার জন্য দায়ী হবে সরকার; এরশাদ নন।’ কিন্তু জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চাই-ই চাই। সে কারণে কট্টর ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত আনিসুল ইসলাম মাহমুদ গংয়ের ওপর নির্ভর করল সরকার। এ নির্বাচন শেষে ধারণা করা হচ্ছে, জাতীয় পার্টি আরো একবার ভাঙবে। নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মার্কা লাঙ্গল কারো নামে বরাদ্দ না দেয়ার জন্য এরশাদ নির্বাচন কমিশন বরাবর আবেদন করেছিলেন। কমিশন সে আবেদন আমলে নেয়নি। এর বোধকরি প্রয়োজনও নেই। ‘উচ্ছিষ্ট’ ভাগাভাগি হয়ে গেছে। এরশাদ সম্ভবত, সিএমএইচে বসে অতি চালাকির পরিণতির হিসাব-নিকাশ করছেন। এরশাদের জাতীয় পার্টিকে শেখ হাসিনার দরকার ছিল খুবই। কারণ তা হলে অন্তত বলা যাবে, নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে। শেষপর্যন্ত এই প্রচারণা বাজারে ‘খাবে’ কিনা সন্দেহ।
এ নির্বাচন সম্পর্কে চমকপ্রদ এক পরিসংখ্যান দিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। তাদের হিসেবে দেখা যায়, যে ৫৪০ জন প্রার্থী এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তাদের অর্ধেকেরও বেশি (৫২.২২ ভাগ) ব্যবসায়ী। ৯৩ জনের শিক্ষাগতযোগ্যতা মাত্র এএসসি বা এরচেয়েও কম। হত্যা মামলার আসামি ১২ জন। ৮৬ জন প্রার্থী আয়কর রিটার্ন জমা দেননি। আবার ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় ৫৩ শতাংশ ভোটার (প্রায় পাঁচ কোটি) তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন না। অনেকেই কমিশনে যে তথ্য দিয়েছেন তাতে গোপন করেছেন অনেক কিছু। সরকারও বেছে বেছে তার গডফাদারদের কয়েকজনকে মনোনয়ন দিয়েছেন। অবশ্য জয়নাল হাজারী এবার মনোনয়ন পাননি। তিনি তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। কমিশন তা বাতিল করে দিয়েছে। মনোনয়ন পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমানও।
এর আগে অবশ্য মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের এক হিসাব বিবরণী নির্বাচন কমিশন তার ওয়েবসাইটে দিয়েছিল। তাতে দেখা গেছে, একেকজন মন্ত্রী-এমপির সম্পদ শত গুণ বা হাজার গুণ বেড়েছে গত পাঁচ বছরে। সাড়ে চার হাজার গুণ পর্যন্ত বাড়ার হিসাবও আছে। দুর্নীতি আর লুণ্ঠন কাকে বলে সেটা এই সরকার বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে। জনগণও দেখেছে এবং জনগণ জানে এ বিপুল অর্থ তাদেরই। নানা কৌশলে সরকার ও তার লোকজন তা লুট করে নিয়ে গেছে।
ভারতও বেশি খেলতে গেছে। এখনো খেলে যাচ্ছে। ভারত সরকারের বক্তব্য একটাইÑ বাংলাদেশে জামায়াতের উত্থান ঘটতে দেয়া যাবে না। তা হলে দেশে ‘ইসলামী জঙ্গিবাদের’ উত্থান ঘটবে। আর তাদের ‘হামলার’ শিকার হয়ে বহু হিন্দু ভারতে চলে গিয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। সুতরাং জামায়াতকে রুখতেই হবে। কিন্তু এই তথ্য সত্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে না যে, জামায়াত কোনো জঙ্গিবাদী দল। তারা মনে করে, জামায়াত মধ্যপন্থী ইসলামি দল। আর এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যত হামলা হয়েছে, তার প্রায় সব হামলায় জড়িত আছে আওয়ামী লীগের লোকেরা। নিজেরা এসব দুষ্কর্ম করে সেগুলো জামায়াতের ওপর চাপিয়ে দিয়ে জামায়াতকে জঙ্গিবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করছে আওয়ামী লীগ ও ভারত। কিন্তু মুসলমানদের দেশে ইসলামি রাজনীতি করা যাবে না, এমন চিন্তা হাস্যকর। ভারতে যদি বিজেপি এবং আরএসএসের মতো হিন্দু মৌলবাদীরা রাজনীতি করতে পারে, সরকার গঠন করতে পারে, তা হলে বাংলাদেশে জামায়াত রাজনীতি করতে পারবে না কেনো? তা ছাড়া গত ৪২ বছরে দেখা গেছে, কখনো জামায়াতের জনপ্রিয়তা ২০ ভাগে ওঠেনি। ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে যে জামায়াতের ২০ ভাগও সমর্থন নেই তাদের নিয়ে ‘মৌলবাদ মৌলবাদ’ বলে লাফালাফি নিতান্তই হাস্যকর।
আমরা অনেকবার বলেছি, আবারো বলছি, এ দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান বলেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। তাদের মুসলমানিত্ব খারিজ করে দেয়া সহজ কাজ হবে না। বরং যে উদারনৈতিক মনোভাবাপন্ন বাংলাদেশের মুসলমান, তাদের মুসলমানিত্ব খারিজ করার চেষ্টায় জঙ্গিবাদের জন্ম হতে পারে। সে জঙ্গিবাদের কারো জন্য শুভ নয়। অপর দিকে, আপনি যখন আমার ধর্ম কেড়ে নেবার চেষ্টা করবেন, তখন আমি তা বহাল রাখার জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করব। তার জন্য আমার জামায়াত হওয়ার প্রয়োজন হবে না।
এই সত্যটুকু ভারত উপলব্ধি করলে ভালো হতো। জনগণ মনে করছে, আওয়ামী লীগ ভারতের স্বার্থে মুসলমান অধ্যুষিত এ দেশে যে অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে, যেভাবে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে, যেভাবে খুন-গুম-হত্য নিপীড়ন চলছে, তাতে প্রতিশোধস্পৃহা থেকে কেউ কেউ ‘জঙ্গিতে’ রূপান্তিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। সে পরিস্থিতি যদি বাংলাদেশে হয়ই তাহলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যে এর মারাত্মক হয়ে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান, চীন, রাশিয়া, জাতিসঙ্ঘ সবাই বলছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য। তবুও যে পথেই হোক আওয়ামী লীগকে ‘জিতিয়ে’ এনে ভারত তার স্বার্থ হাসিল করতে চায়। এ নিয়ে ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বেশ টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এখন ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে বলছে, তিনি যেন এই নির্বাচনের পর দ্রুত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। তা না হলে হাসিনা সরকারের সাথে চূড়ান্ত অসহযোগিতা করবে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সে পরিস্থিতি শেখ হাসিনা সামাল দিতে পারবেন না।
দেশে শাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। বিরোধীদলীয় নেতা ও ১৮ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কার্যত গৃহবন্দী। প্রধান বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের প্রায় সবাই কারাগারে। হাজারে হাজারে মামলা। হাজারে হাজারে গ্রেফতার। নির্বিচার গুলি। নির্দ্বিধায় মানুষ হত্যা। এর কোনোটাই বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এই বিশ্বে রাষ্ট্র হিসেবে থাকতে হলে বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের জাতিসঙ্ঘ সনদ মেনে চলতে হবে আমাদেরকে। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের রাজনীতিবিষয়ক বিশেষ সহকারী, আর্জেন্টিনার নাগরিক অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো মহাসচিব বান কি মুনের কাছে যে রিপোর্ট দাখিল করেছেন, তা শেখ হাসিনার জন্য সুখকর বলে বিবেচিত হবে বলে মনে হয় না। বরং তা অত্যন্ত নেতিবাচক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। জনগণ মাসাধিককাল ধরে রাজধানী ঢাকাকে অবরোধের মাধ্যমে সারা দেশ থেকে বিচ্ছন্ন করে দিয়েছে। সরকারের কর্তৃত্ব এখন কার্যত ঢাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে দেখা যাচ্ছে। সংসদ নির্বাচন প্রার্থীদের কেন্দ্রে যেতে ভয়। পথ চলতে ভয়। প্রচারণায় ভয়। কখন কে কলার চেপে ধরে তার শেয়ারের টাকা ফেরত চায়। কখন কে টুঁটি চেপে ধরে কুইক রেন্টালের মাধ্যমে তার পকেট কাটা টাকা ফেরত চায়। কখন কে তার পিতৃহত্যা, ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয়।
সর্বশেষ, যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই জানিয়ে দিয়েছে যে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অয়োজন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে বাংলাদেশ সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এটা কোনো শুভ লক্ষণ নয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অবস্থা পর্যালোচনা করছে এবং প্রয়োজনমতো পদক্ষেপ নিচ্ছে। সে পদক্ষেপের বোঝা শেখ হাসিনার জন্য বহন-অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

SHARE

Leave a Reply