বাংলাদেশে গণতন্ত্র -এবনে গোলাম সামাদ

বাংলাদেশের স্বাধীন সুলতানদের সময় (১৩৪৩-১৫৭৬ খ্রি:) সুলতানের পুত্রই যে কেবল জন্মসূত্রে সুলতান হতেন, তা নয়। সুলতান হওয়ার জন্য প্রয়োজন হতো সেনাবাহিনীর এবং রাজ্যশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্মতি। একে বলা যেতে পারে এক ধরনের গণতন্ত্র। সুলতান হোসেন শাহ্ কেবলমাত্র এ রকম সম্মতির মাধ্যমে হন বাংলার সুলতান। তিনি কোনো সুলতানের পুত্র ছিলেন না। মুঘল আমলে বাদশা হতে গেলে এরকম কোনো সম্মতির প্রয়োজন হয়নি। মুঘল আমলে ছিল না গণতন্ত্রের লেশ। আজকের যে অঞ্চল নিয়ে বাংলাদেশ গঠিত, অতীতে সেই অঞ্চলে মানুষ অত্যাচারী রাজার বিরুদ্ধে করেছে বহুবার বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহীরা করেছে তাদের নেতাকে রাজা। নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার মৌজাদির গ্রামে প্রায় আধা মাইল লম্বা হাজার বছরের অধিক পুরনো একটা জলাশয় আছে। যা দিবর দীঘি নামে পরিচিত। এই দীঘির মধ্যে প্রায় ৪১ ফুট উঁচু ও ১০ ফুট ব্যাসবিশিষ্ট একটি আটকোনা গ্রানাইট পাথরের স্তম্ভ আছে। স্তম্ভটির মাথায় আছে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নকশাযুক্ত কিরিট। এই স্তম্ভটি মহারাজ দিব্য-স্তম্ভ নামে পরিচিত। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে পাল বংশীয় রাজা দ্বিতীয় মহিপাল অত্যন্ত অত্যাচারী হয়ে ওঠেন। দিব্যর নেতৃত্বে প্রজারা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহে প্রজারা জয়ী হয়। বিদ্রোহী প্রজারা দ্বিতীয় মহিপালকে হত্যা করে দিব্যকে রাজা নির্বাচন করে।

আজ যে অঞ্চল নিয়ে বাংলাদেশ গঠিত সে অঞ্চলে অতীতে মানুষ অত্যাচারী রাজার বিরুদ্ধে বহুবার বিদ্রোহ করেছে। মেনে নেয়নি অত্যাচারী রাজার শাসনকে। বাংলা ভাষায় সভা ও সমিতি বলে দু’টি কথা আছে। মানুষ সমস্যার সমাধানের জন্য অতীতে একত্রিত হয়ে সভা করেছে। সভায় আলোচনার মাধ্যমে খুঁজে বের করতে চেয়েছে সমস্যার সমাধান। অন্য দিকে মানুষ সমিতি গড়েছে সভার সিদ্ধান্তকে বাস্তবে কার্যকর করবার জন্য। সভা ও সমিতি গড়া এক ধরনের গণতন্ত্রকে চর্চা করা। অনেক গ্রামে মানুষ গঠন করেছে স্থায়ী গ্রাম পঞ্চায়েত। ইতিহাসে দেখা যায় বাংলাদেশের কাছে বিহারে বৈশালি রাজ্য ছিল গণরাজ্য। এখানে রাজার ছেলে রাজা হয়নি। এক রাজার পরে আর এক রাজা হয়েছেন প্রজাকর্তৃক নির্বাচিত। তবে এই নির্বাচন ব্যবস্থাকে ঠিক ভোট বলা যায় কি না, সেটা নিয়ে মতভেদ আছে। আমরা বর্তমান ভোটের ধারণা লাভ করেছি বিলাতের কাছ থেকে। লর্ড রিপন এর সময় (১৮৮০-১৮৮৪ খ্রি:) প্রবর্তিত হয় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন। গঠিত হয় জেলাবোর্ড, ইউনিয়ন বোর্ড ও মিউনিসিপালিটি। প্রবর্তিত হয় ভোটের মাধ্যমে এর কিছু প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া। এ সময় থেকেই ভোট কথাটার সঙ্গে পরিচয় ঘটে বাংলাদেশ ও ব্রিটিশ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের। লর্ড রিপনের সময় বিলাতের পার্লামেন্টে ক্ষমতায় ছিল উদারনৈতিক দল। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন গ্লাডস্টোন। তাঁর ইচ্ছা অনুসারেই লর্ড রিপন স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কে গঠন করেছিলেন আইন। ১৯০৯ সালে প্রবর্তিত হয় ওহফরধহ ঈড়ঁহপরষং অপঃ। যাকে সাধারণত উল্লেখ করা হয় গড়ৎষবু-গরহঃড় জবভড়ৎসং। এ সময় থেকে গভর্নর কাউন্সিলের অধিকাংশ প্রতিনিধি হতে থাকেন নির্বাচিত। গভর্নর কাউন্সিলকে একটা পুর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা যায় না।

কারণ এই কাউন্সিলকৃত যে কোনো আইনকে গভর্নর জেনারেল তার ইচ্ছা মত বাতিল করতে পারতেন। কিন্তু এই সময় থেকেই এই উপমহাদেশে আরম্ভ হতে পারে বেশ কিছুটা গণতান্ত্রিক বিধিবিধানের চর্চা। আরম্ভ হয় আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে পরিচয়। আসে আধুনিক আইনের শাসনের ধারণা। প্রণীত হতে পারে প্রধানত লিখিত আইনের মাধ্যমে দেশ শাসনের ব্যবস্থা। আগে এদেশে সরকার প্রণীত এরকম কোন লিখিত আইনের মাধ্যমে দেশ শাসনের ব্যবস্থা ছিল না। এই লিখিত আইন ব্যবস্থা হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিশেষ ভিত্তি। মর্লি মিন্টো রিফর্মে ভোট দেয়ার ব্যবস্থা হয়। ভোট দিতে পারতেন যারা বছরে দেড় টাকা সরকারি কর দিতেন। অথবা গ্রামে বছরে দুই টাকা বা সমপরিমাণ কর দিতেন জেলা বা ইউনিয়ন বোর্ডে। ব্রিটিশ ভারতে মোট জনসংখ্যার শতকরা মাত্র তিনভাগ ছিলেন ভোটার। ১৯৩৫ সালের অ্যাক্টে প্রদেশগুলিকে বিশেষভাবে প্রদান করা হয় স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতা। ১৯৩৭ সালে যে নির্বাচন হয় তার মাধ্যমে বলা যায় ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশগুলি পেতে পেরেছিল যথেষ্ট গণতন্ত্র। কারণ প্রধানত আইনসভায় নির্বাচিত সদস্যরা লাভ করেন আইন প্রণয়নের ক্ষমতা। আইন পরিষদের সদস্যরা ক্ষমতা পান মন্ত্রিসভা গঠনের; মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের। যদিও ছোট লাট পারতেন আইনসভাকৃত প্রণীত আইনকে বাতিল করে দিতে। অর্থাৎ পাকিস্তান হবার আগেই এই উপমহাদেশে এসেছিল বিলাত থেকে উদার গণতন্ত্রের দর্শন। ছাত্ররা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচিত হতে পেরেছে বিলাতের রাষ্ট্র-দার্শনিক জেরেমি বেনথাম ও স্টুয়ার্ট মিলের রাষ্ট্র-দর্শনের সঙ্গে। যাতে বলা হয়েছে সর্বাধিক জনের সর্বাধিক কল্যাণের জন্য আইন প্রণয়নের কথা।

পাকিস্তানে শুরু হয় ১৯৩৫ সালের অ্যাক্টকে অনুসরণ করে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের পরিচালনার মধ্যে দিয়ে। নানা কারণেই পাকিস্তানে রচনা করা সম্ভব হয় না সংবিধান। যদিও চেষ্টা চলে সংবিধান রচনার। জেনারেল আইয়ুব খান (পরে মার্শাল) সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় আসেন ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসে। খুব সীমিত ভোটের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতে থাকে সরকার। যাকে বলা হতে থাকে মৌলিক গণতন্ত্র। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন মৌলিক গণতন্ত্রের বিরোধী। তিনি ফিরে যেতে চান উদার পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে। কিন্তু সেই শেখ মুজিবই বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের কম্যুনিস্ট পার্টির অনুকরণে গড়তে চান একদলীয় সরকার। ফলে ঘটতে পারে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা। পরে বাংলাদেশে চলে আধা প্রেসিডেন্ট আধা প্রধানমন্ত্রীর শাসন। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে প্রবর্তিত হয় ব্রিটিশ গণতন্ত্রের অনুকরণে পার্লামেন্টারি শাসনব্যবস্থা।

বিলাতে কোনো লিখিত সংবিধান নাই। বিলাত চলেছে কতগুলি পার্লামেন্টকৃত মৌলিক আইনের ভিত্তিতে। কিন্তু বাংলাদেশের একটি লিখিত সংবিধান আছে। বাংলাদেশের পার্লামেন্ট থেকে যদি এমন কোনো আইন পাস করা হয়, যা সংবিধানের পরিপন্থী, তবে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হলে সুপ্রিম কোর্ট ঐ আইনটাকে বাতিল করে দিতে পারে সংবিধানের পরিপন্থী বলে। ব্রিটেনের মত বাংলাদেশের পার্লামেন্ট সার্বভৌম নয়। পার্লামেন্টকে মানতে হয় সংবিধান। এদিক থেকে বাংলাদেশের মিল আছে মার্কিন গণতন্ত্রের সঙ্গে।
বাংলাদেশের মানুষ পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রকেই চাচ্ছে। তাই এদেশে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র টিকবে, এরকমটিই আশা করা যায়। বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। ইসলাম গণতন্ত্রের আদর্শ পরিপন্থী ধর্ম নয়। কারণ কুরআনে বলা হয়েছে, সব বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে (৪২:৩৮)। ইসলামে ইজমা বলে একটা কথা আছে। মুসলিম জনসমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে মতামত জ্ঞাপন করে প্রয়োজনীয় আইন গ্রহণ করতে পারে।

হাইকোর্ট অব দি পার্লামেন্ট

রাজা বা রানী লর্ডসভা এবং কমনসভা নিয়ে গঠিত ব্রিটেনের পার্লামেন্ট। একে বলা হয় ‘হাইকোর্ট অব দি পার্লামেন্ট’। আমরা এখন বিলাতের গণতন্ত্রকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করলেও হাইকোর্ট অব দি পার্লামেন্টের মত কোনো ব্যবস্থাকে গ্রহণ করিনি। আমাদের দেশে কোনো রাজা বা রানী নাই। নাই কোনো হাউস অব লর্ডস-এর মত অভিজাত উচ্চ পরিষদ। ব্রিটিশ গণতন্ত্রের সবকিছুকেই যে আমরা গ্রহণ করেছি, তা নয়। আমরা গ্রহণ করেছি কেবলমাত্র প্রাপ্ত বয়স্কদের গোপন ভোটের মাধ্যমে পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচনের ধারণাকে। যেমনভাবে নির্বাচিত হন বিলাতের হাউস অব কমন্সের সদস্যরা। ব্রিটিশ গণতন্ত্রে যারা সরকার গঠন করেন, তারা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলেন বিরোধী পক্ষরা। ব্রিটেনে গণতন্ত্র হলো ক্যাবিনেট বনাম অ্যান্টিক্যাবিনেট। আমরা এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে চাচ্ছি। চাচ্ছি না এক দলের কোনো গণতন্ত্রকে সমর্থন করতে। একদলের গণতন্ত্র আসলে হলো গণতন্ত্রের বরখেলাপ মাত্র।

লেখক : বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply