বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ -ড. ফিরোজ মাহবুব কামাল

ইতিহাসের বর্বরতম নাশকতা
ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী কোয়ালিশনের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধটি নিছক সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়। সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে সে যুদ্ধটি অতি প্রবলভাবে হচ্ছে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক ময়দানে। সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক যুদ্ধের তেমনি একটি অতি রক্তাক্ত রণাঙ্গন হলো বাংলাদেশ। ইসলামবিরোধী পাশ্চাত্যের সে কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছে আরেক আগ্রাসী দেশ ও মুসলিমদের পরিচিত শত্রু ভারত। শত্রুপক্ষের আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া বা ফিলিস্তিনের মুসলিমদের বিরুদ্ধে আজ যা কিছু করছে, ভারতে অবিকল সেটিই ঘটে আসছে বিগত ৬০ বছরের বেশি কাল ধরে। সেটি যেমন অধিকৃত কাশ্মিরে, তেমনি ভারতীয় জিম্মি মুসলিমদের বিরুদ্ধে। একাত্তরের পর সে যুদ্ধই প্রবলভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে বাংলাদেশে।
ভারতীয় বর্ণহিন্দুদের কাছে গরু-বাছুর, সাপ-শকুনেরাও পূজা পায়। নিরাপত্তাও পায়। কিন্তু ঘৃণ্য ও হত্যাযোগ্য গণ্য হয় মুসলিম নর-নারী ও শিশু। সে অভিন্ন ঘৃণা নিয়ে মুসলিমদের ঘরে আগুনও দেয়া হয়। তাই স্রেফ গরুর গোশত রাখার সন্দেহে সে দেশে দিবালোকে পুলিশের সামনে অতি নৃশংসভাবে মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে একই রূপ ধুমধাম করে অযোধ্যার বাবরি মসজিদও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। সে অপরাধের বিরুদ্ধেও পুলিশ কোনোরূপ ব্যবস্থা নেয়নি। ভারতীয় সরকার ও তার পুলিশের কাছে অপরাধের সংজ্ঞা যে ভিন্ন, সেটি কি এরপরও বুঝতে বাকি থাকে? কোন মুসলিম খুন হলে, মুসলিমের কোন ঘর জ্বালিয়ে দিলে বা কোন মসজিদ গুঁড়িয়ে দিলে ভারেত যে সেটি অপরাধ গণ্য হয় না, সেটি মুসলিমবিরোধী এত দাঙ্গা ও মুসলিমের এতো ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার পর গোপন থাকার কথা নয়। গরু বাঁচানোর লক্ষ্যে হাজার হাজার হিন্দু রাস্তায় নামলেও সে গরজ মুসলিমদের জান বাঁচানোর বেলায় নেই। বরং উল্টো, যারা গরু বাঁচাতে নেমেছে তারাই হত্যা করছে নিরীহ মুসলিমদের। এক্ষেত্রে সরকার ও সরকারি দলের প্রশ্রয়ও কি কম?
যে নরেন্দ্র মোদির হাত গুজরাটের মুসলিম রক্তে রঞ্জিত, সে এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ফলে মোদির মতো কোটি কোটি মোদি এখন ভারতজুড়ে ছেয়ে গেছে। মুসলিমবিনাশী এরূপ ভয়ানক চেতনা নিয়ে মানবরূপী এসব দানব এখন শুধু ভারত বা কাশ্মিরে নয়, খোদ বাংলাদেশের রাজনীতিতেও জেঁকে বসেছে। তবে বাংলাদেশের রণাঙ্গনে তাদের বাড়তি সুবিধাটি হলো তারা দেশটিতে একা নয়; বরং সাথে পেয়েছে অভিন্ন চেতনার বিপুলসংখ্যক সহযোদ্ধা। ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এসব ভারতসেবী বাংলাদেশীগণ ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয়; এবং হিন্দুদের চেয়েও অধিক পূজারি হলো হিন্দু সংস্কৃতির। তাই মঙ্গল প্রদীপের পূজা যতটা ঢাকায় হয় এবং সেখানে বেদিমূলে যত ফুল দেয়া হয় তা কলকাতা বা দিল্লিতে হয় না। ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদার রূপে বাংলাদেশের মাটিতে তাদের অবস্থান হলো রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংস্কৃতিক ক্যাডার, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবী, বিচারপতি, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা রূপে। তাদের ওপর অর্পিত মূল দায়িত্ব হলো, বাংলার মাটিতে শরিয়ত, হুদুদ ও কোরআনি নীতির বাস্তবায়নের ন্যায় ইসলামের অতি মৌল বিষয়গুলোকে পরাজিত রাখা। লক্ষ্যÑ বাংলাদেশী মুসলিমদের পূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে না দেয়া। সেই সাথে বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির ওপর ভারতীয় দখলদারিকে বহাল রাখা।
ভারতীয়দের সাহায্যে ও প্রশ্রয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতসেবীদের সফলতাটি বিশাল। সেটি যেমন একাত্তরে, তেমনি আজও। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই তারা বাংলার সমগ্র মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে। একাত্তরে লক্ষাধিক বিহারি মুসলিমদের এরা বিনা বিচারে হত্যা করেছে। এখন সে অভিন্ন হত্যাকান্ড চলছে খোদ বাঙালি মুসলিমদের বিরুদ্ধে। তাই ২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্বরে নিরস্ত্র মুসল্লিদের জমায়েতের ওপর কামান দেগে শত শত নিরীহ মানুষ নিমিষের মধ্যে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর বিগত ৭০ বছরে ভারতের সকল মুসলিমবিরোধী দাঙ্গাতে যত মুসলিম নর-নারীকে হত্যা করা হয়েছে ভারতসেবী বাঙালিগণ একমাত্র একাত্তরেই তার চেয়ে বেশি মুসলিমকে বাংলাদেশে হত্যা করেছে। শুধু অবাঙালিদের নয়, বহু ভারতবিরোধী বাঙালি মুসলিমদেরও হত্যা করা হয়েছে। একাত্তরে বিহারি মুসলিমগণ অপরাধী গণ্য হয়েছে এ কারণে যে, নিজেদের ঘর-বাড়ি ভারতে ফেলে ১৯৪৭-এ তারা পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল এবং একাত্তরে দেশটির ভাঙার কাজে তারা ভারতের অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি। বরং পাকিস্তানকে নিজেদের দেশ ভেবে দেশটির সংহতি ও দীর্ঘায়ু কামনা করেছে। বিহারিদের সবচেয়ে বড় অপরাধ, ভারতসেবী বাঙালিদের ন্যায় তারা ভারতীয় আধিপত্যের সেবাদাস হতে পারেনি। তবে সেরূপ না করার পেছনে প্রচুর কারণও ছিল। ভারতে জন্ম নেয়ার কারণে বিষপূর্ণ হিন্দু মানসিকতার সাথে তাদের পরিচিতিটি ছিল যে কোন বাংলাদেশীদের চেয়ে অতি গভীর। তা ছাড়া এ অপরাধটি কি শুধু বিহারিদের? লক্ষ লক্ষ বাঙালি মুসলিমও তো সেদিন অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। তাদের অনেকে ভারতীয় বাহিনী ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছিল। কোন একজন শিক্ষিত আলেম পাকিস্তান ভাঙাকে সমর্থন করেছে, সে প্রমাণ কি আছে? প্রতিটি আলেম ও ইসলামপন্থি এজন্যই ভারতসেবীদের কাছে আজও রাজাকার। অথচ সে দোষে বিহারিদের বাঁচতে দেয়া হয়নি।
রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের আচরণটি অতি নৃশংস। কিন্তু একাত্তরে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি নৃশংস বর্বরতা হয়েছে বিহারি মুসলমানদের বিরুদ্ধে। এবং সেটি ভারতসেবী বাঙালিদের হাতে। মিয়ানমারে বহু হাজার মুসলমানের ঘরবাড়ি জ্বালানো হয়েছে; কিন্তু এ বিধান কখনোই প্রয়োগ করা হয়নি যে, মিয়ানমারে কোন রোহিঙ্গা মুসলিমের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটের মালিক হওয়ার অধিকার নেই। ফলে কোন বৌদ্ধই রোহিঙ্গা মুসলিমের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটের মালিকানা দাবি করেনি। অথচ সে নীতির প্রয়োগ করা হয়েছে বিহারি মুসলমানদের বিরুদ্ধে। তাদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তাদের বসতবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য। বিহারিদের তাদের নিজ ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে বস্তিতে পাঠানো হয়েছে। বাংলার সমগ্র ইতিহাসে কখনোই কি এমন অপরাধ হয়েছে? ১৯৪৭ সালে কি কোন হিন্দু পরিবারকে বস্তিতে বসানো হয়েছে? অথচ তারাতো পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করেছিল?
রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার বিরুদ্ধে বহু বার্মিজ বুদ্ধিজীবী যে সোচ্চার সে প্রমাণ অনেক। তারা বিদেশী টিভি চ্যানেলে এমনকি সেদেশের নেত্রী অং সান সু চির বিরুদ্ধেও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু বিহারি মুসলিমদের বিরুদ্ধে একাত্তরে যে বর্বর নৃশংসতা হলো তার বিরুদ্ধে কি কোনো বাঙালি বুদ্ধিজীবী বা রাজনীতিবিদ প্রতিবাদী হয়ে রাস্তায় নেমেছে বা পত্রিকায় কোন বিবৃতি দিয়েছে? সে নৃশংসতা নিয়ে বিদেশের পত্র-পত্রিকায় বহু নিবন্ধ ছাপা হলেও ঢাকার কোন পত্রিকায় কি একটি নিবন্ধও ছাপা হয়েছে? ডাকাত পাড়ায় যেমন নৃশংস ডাকাতির নিন্দা না হয়ে বরং তা নিয়ে প্রচন্ড উল্লাস হয়, সেরূপ একটি অবস্থা ছিল বাংলাদেশের ভারতসেবীদের মহলে। বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের চেতনার ভুবন যে ভারতসেবীদের হাতে কতটা অধিকৃত ও মৃত এ হলো তার নজির। একাত্তরে বিহারি মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা বাঙালি নয়। এখন বাঙালি মুসলিমদের বেছে বেছে হত্যা করা হচ্ছে এ কারণে যে, তারা ভারতসেবী রাজনীতির সেবাদাস নয়। সে অপরাধে এমনকি ৫৭ জন বাঙালি সেনা অফিসারকে নিহত হতে হয়েছে। ভারতসেবী রাজনীতিকে বলা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এবং সে চেতনার বিরুদ্ধে কথা বলা চিত্রিত হচ্ছে যুদ্ধাপরাধ বলে।

নতুন স্ট্র্যাটেজি ইসলাম ও
মুসলিমদের বিরুদ্ধে
বিশ্বরাজনীতির অঙ্গন থেকে সোভিয়েত রাশিয়ার বিদায়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল, তাদের পথের কাঁটা এবার বুঝি দূর হলো। ভেবেছিল, আধিপত্য বিস্তৃত হবে এবার বিশ্বজুড়ে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মুসলিমগণ। আফগানিস্তান ও ইরাকের মত দুইটি দেশ দখলে রাখতেই তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ শেষ হতে ৫ বছর লেগেছিল। কিন্তু বিগত ১৭ বছর যুদ্ধ লড়েও মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৪০টিরও বেশি দেশের কোয়ালিশন বাহিনী আফগানিস্তানে বিজয় আনতে পারেনি। বরং দ্রুত এগিয়ে চলেছে পরাজয়ের দিকে। পাশ্চাত্যের কাছে এখন এটি সুস্পষ্ট, আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, লেবানন, সোমালিয়ার মত ক্ষুদ্র দেশগুলো দখল করা এবং সেগুলোকে কন্ট্রোলে রাখার সামর্থ্য তাদের নেই। যে প্রতিরোধের মুখে তারা হারাতে বসেছে সেটির মূল হাতিয়ার অত্যধিক যুদ্ধাস্ত্র নয়, জনবল বা অর্থবলও নয়। বরং সেটি কোরআনি দর্শন ও ইসলামের সনাতন জিহাদী সংস্কৃতি। এ দর্শন ও সংস্কৃতিই মুসলমানের জন্য আত্মসমর্পণকে অসম্ভব ও অচিন্ত্যনীয় করে তুলেছে। বরং হাজার হাজার যুবকের কাছে অতিশয় কাম্য গণ্য হচ্ছে আগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই ও শাহাদত। এমন চেতনা এবং এমন সংস্কৃতির বলেই এক কালের মুসলমানেরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছিল। এ যুগেও তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ও বিশ্বশক্তি রাশিয়াকে পরাজিত করেছে। এবং এখন গলা চেপে ধরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। আফগান মোজাহিদদের জিহাদ তাই পাল্টে দিচ্ছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ। কামান, বোমা ও যুদ্ধবিমানের বলে গণহত্যা চালানো যায়, নগর-বন্দরও ধ্বংস করা যায়। কিন্তু সে কামানে বা গোলায় কি দর্শন ও সংস্কৃতির বিনাশও সম্ভব? বরং তাদের আগ্রাসন ও গণহত্যায় প্রতিরোধের সে দর্শন ও সংস্কৃতিই দিন দিন আরো বলবান হচ্ছে। কোন মার্কিনিকে রণাঙ্গনে রাখতে মাথাপিছু প্রায় এক মিলিয়ন তথা ১০ লাখ ডলার খরচ হয়। অথচ মুসলমানরা হাজির হচ্ছে নিজ খরচে। তারা শুধু স্বেচ্ছাই অর্থই দিচ্ছে না, প্রাণও দিচ্ছে।
অবস্থা বেগতিক দেখে পাশ্চাত্য এখন ভিন্ন স্ট্র্যাটেজি নিয়েছে। সেটি শুধু গণহত্যা নয়। নিছক নগর-বন্দর, ঘরবাড়ি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনাশও নয়। বরং সেটি হলো ইসলামের কোরআনি দর্শন ও সংস্কৃতির ধ্বংস। তাই শুরু করেছে প্রকান্ড আকারের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। নতুন এ স্ট্র্যাটেজির আলোকে ইরাক ও আফগানিস্তানে তারা শুধু মানুষ হত্যাই করছে না, ঈমান হত্যাতে তৎপর হয়েছে। এবং সেটি শুধু আফগানিস্তান ও ইরাকে সীমিত নয়। বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশই এখন একই রূপ সাংস্কৃতিক যুদ্ধের শিকার। তবে বাংলাদেশ তাদের অন্যতম টার্গেট হওয়ার কারণ, দেশটিতে ১৬ কোটি মুসলমানের বসবাস। তেল, গ্যাস বা অন্য কোন খনিজ সম্পদের চেয়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার ফ্যাক্টরটিই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেল, গ্যাস যোদ্ধা বা বোমায় পরিণত হয় না, কিন্তু মানুষ হয়। তাই বাংলাদেশীগণ না চাইলেও সাম্রাজ্যবাদীদের এ আগ্রাসনের টার্গেট হওয়া থেকে বাঁচার উপায় নেই। শত্রুর লক্ষ্য এখন মুসলমানদের ঈমানকে হত্যা করা। ফলে মহাসংকটে এবার শুধু দুনিয়ার জীবন নয়, আখেরাতের জীবনও। কারণ এ যুদ্ধে তারা বিজয়ী হলে অসম্ভব হবে ঈমান নিয়ে বাঁচা।
লক্ষ্য: কোরআন থেকে দূরে সরানো
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্ট্র্যাটেজি তাই মুসলমানদের জীবন থেকে জিহাদের সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা এবং ভুলিয়ে দেয়া শরিয়ত, হুদুদ, শূরা, খেলাফত, জিহাদ, মুসলিম ঐক্যের ন্যায় ইসলামী মৌল বিষয়গুলোকে। তেমন এক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে ব্রিটিশগণ ভারতে স্কুল-কলেজ ও আলিয়া মাদরাসা খুলেছিল। ধর্ম-শিক্ষার ছদ্মবেশে মুসলমানদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করেছিল জিহাদের ন্যায় ইসলামের মূল হাতিয়ারকে। ফলে নিরাপদ হয়েছিল তাদের ১৯০ বছেরের শাসন। ইসলামে বিরুদ্ধে সে সফল স্ট্র্যাটেজির প্রয়োগকল্পে তারা আবার ময়দানে নেমেছে খোদ বাংলাদেশে। সে কাজে এখন ব্যবহার করছে জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিষ্ঠিত হাজার হাজার স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনসহ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত তাদের হাতেই অধিকৃত। অধিকৃত দেশের অধিকাংশ মিডিয়াও। ইসলামের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে ব্যাপক মিথ্যা-প্রপাগান্ডা। বলতে চায়, ইসলাম এ যুগে অচল। যেন ইসলাম শুধু নবীজি (সা)-এর জামানার লোকদের জন্যই নাজিল হয়েছিল। তারা শরিয়তকে বলছে মানবতাবিরোধী। সে প্রপাগান্ডাকে ব্যাপকতর করতে বহু টিভি চ্যানেল, অসংখ্য পত্র-পত্রিকার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছে হাজার হাজার এনজিও।
ইসলামের এ শত্রুপক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা হলো, নবীজি (সা)-এর আমলের ইসলাম যাতে রয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার রাজনীতি ও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ, তা জনগণের মন থেকে ভুলিয়ে দেয়া। অথচ ইসলাম থেকে নামাজ-রোজাকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি আলাদা করা যায় না শরিয়তের প্রতিষ্ঠার রাজনীতি ও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদকেও। পবিত্র কোরআনে জিহাদে অংশ নেয়ার নির্দেশ এসেছে বার বার। সে সব জিহাদে অর্ধেকের বেশি সাহাবা শহীদ হয়েছেন। নবীজি (সা) নিজে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লড়েছেন বহুবার। ইসলামের বহুশত্রুকে হত্যা এবং বনু কুরাইজা ও বনু নাজির ন্যায় ইহুদি বস্তিকে নির্মূল করা হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। অথচ নবীজি (সা)-এর সে আপসহীন নীতি ও ইসলামের সে সংগ্রামী ইতিহাসকে তারা সুপরিকল্পিতভাবে আড়াল করতে চায়। নামাজ-রোজা, হজ-জাকাতের বাইরেও শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও আইন-আদালতের সংস্কারে ঈমানদারের যে গুরুতর দায়ভার রয়েছে সেটিকেও ভুলিয়ে দিতে চায়। এ কারণেই ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস ও জিহাদী সংস্কৃতি আজ দেশে দেশে শত্রুপক্ষের লাগাতার হামলার শিকার। তাদের লক্ষ্য, মহান আল্লাহর কোরআনি নির্দেশের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে বিদ্রোহী করা।

চেতনার অরক্ষিত ভূমি
বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য বিপদের কারণ হলো, এরূপ হামলার মুখে দেশটির ভৌগোলিক সীমান্তের ন্যায় সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্ত আজ অরক্ষিত। অথচ মুসলমানদের দায়িত্ব শুধু দেশের সীমান্ত পাহারা দেয়া নয়। বরং অতিগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, চেতনার রাজ্য পাহারা দেয়া। সেটি সুস্থ ঈমান-আকিদা ও ইসলামী সংস্কৃতি গড়ে তোলার স্বার্থে। সীমান্ত পাহারায় অবহেলা হলে অনিবার্য হয় সামগ্রিক পরাজয় ও গোলামি। তখন বিপন্ন হয় জানমাল ও ইজ্জত-আবরু। যেমনটি ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে হয়েছিল। সে পরাজয়ের ফলেই মুসলমানদের জীবনে নেমে এসেছিল ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের দাসত্ব। আর সামরিক ও রাজনৈতিক পরাজয় একাকী আসে না। আসে অর্থনৈতিক দুর্গতি, আসে দুর্ভিক্ষ। তাই পলাশীর পরাজয়ের পর এসেছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। সে দুর্ভিক্ষে বাংলার বহু লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল, এবং মৃতদের অধিকাংশই ছিল মুসলিম। একইভাবে নেমে এসিছিল ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ। একই রূপ ভয়ানক পরিণতি নেমে আসে সাংস্কৃতিক যুদ্ধে পরাজিত হলে। তখন মারা পড়ে ঈমান-আকিদা। আর মুসলমানের কাছে দৈহিকভাবে বাঁচার চেয়ে ঈমান ও আকিদা নিয়ে বাঁচার গুরুত্ব কি কম? ঈমান নিয়ে বাঁচা অসম্ভব হলে পন্ড হয় জীবনের মূল বাঁচাটাই। তখন অনিবার্য হয় জাহান্নামের অন্তহীন আজাব।
ভৌগোলিক সীমান্তকে সুরক্ষিত করার চেয়েও তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো ঈমান-আকিদার এ সীমান্তকে সুরক্ষিত করা। কারণ শয়তানি শক্তির সবচেয়ে বিনাশী হামলা হয় চেতনার এ মানচিত্রে। এটি অধিকৃত হলে দেশ দখল অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। প্রতিটি ঈমানদারকে তাই সে হামলার বিরুদ্ধে লাগাতার জিহাদ করতে হয়। সশস্ত্র যুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে অন্ধ-বধির বা পঙ্গু ব্যক্তির নিষ্কৃতি আছে। কিন্তু চেতনার মানচিত্রে শয়তানি শক্তির আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক হামলার বিরুদ্ধে যে লাগাতার জিহাদ তা থেকে সামান্য ক্ষণের নিষ্কৃতি নেই। এ জিহাদকেই ইসলামে জিহাদে আকবর বা শ্রেষ্ঠ জিহাদ বলা হয়েছে। রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষেত্রের লড়াইটি আসে তার পরে। বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের আগে তেরোটি বছর ধরে এ জিহাদ লাগাতার চলেছে মক্কায়। মুসলমানের চেতনার সীমান্তকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই অপরিহার্য হলো মুসলিম ভূমির ভৌগোলিক মানচিত্রকে সুরক্ষিত করা।
তাই ঘরবাঁধা, চাষাবাদ করা বা কলকারখানা গড়াই একটি জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার জন্য সবকিছু নয়। শুধু পানাহারে জীবন বাঁচে বটে, তাতে ঈমান বাঁচে না। এমন বাঁচার মধ্য দিয়ে সিরাতুল মোস্তাকিমও জোটে না। তখন যা জুটে তা হলো পথভ্রষ্টতা। সে পথভ্রষ্টতায় বিপদাপন্ন হয় আখেরাতের জীবন। ইহকাল ও পরকাল বাঁচাতে এজন্যই একজন চিন্তাশীল মানুষকে বেড়ে উঠতে হয় জীবন-বিধান, মূল্যবোধ, জীবন ও জগৎ নিয়ে একটি সঠিক ধারণা নিয়ে। মুসলমানের কাছে সে জীবন-বিধান হলো ইসলাম। আর নিত্যদিনের বাঁচবার সে প্রক্রিয়া হলো ইসলামী সংস্কৃতি। নামাজ-রোজা, হজ-জাকাত এবং জিহাদ হলো একজন ঈমানদারের ইবাদতের প্রক্রিয়া। আর সংস্কৃতি হলো এ জগতে বাঁচবার বা জীবনধারণের প্রক্রিয়া। ইসলামী পরিভাষায় এ প্রক্রিয়া হলো তাহজিব। আরবি ভাষায় তাহজিবের অর্থ হলো, ব্যক্তির কর্ম, রুচি, আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ও সার্বিক জীবনযাপনের প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ রিফাইনড তথা পরিচ্ছন্ন বা সুন্দরতম হয়। দিন দিন সুন্দরতম হয় তার রুচিবোধ, আচার-আচরণ, কাজকর্ম ও চরিত্র।
তাই মুসলমানের ইবাদত ও সংস্কৃতি এ দুটোকে পৃথক করা যায় না। উভয়ের মধ্যেই প্রকাশ পায় আল্লাহতায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া গভীর প্রেরণা ও প্রচেষ্টা। পাখি যেমন তার দুটো ডানার একটিকে হারালে উড়তে পারে না, ঈমানদারও তেমনি আল্লাহর ইবাদত ও ইসলামী সংস্কৃতিও একটি হারালে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠতে পারে না। তাই মুসলমানগণ যেখানে রাষ্ট্র গড়েছে সেখানে শুধু মসজিদ-মাদরাসাই গড়েনি, ইসলামী সংস্কৃতিও গড়েছে। একটির পরিশুদ্ধি ও পরিপুষ্টি আসে অপরটি থেকে। মোমেনের মূল্যবোধ, রুচিবোধ, পানাহার, পোশাকপরিচ্ছদ, অপরের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় তার আল্লাহভীরুতা। তখন সে অন্যের কল্যাণে সচেষ্ট হয় আল্লাহর কাছে প্রিয়তর হওয়ার চেতনায়। এ হলো তার সংস্কৃতি। এমন সংস্কৃতি থেকে সে পায় ইবাদতের স্পিরিট। ঈমানদারে চিন্তা ও কর্মে এভাবেই আসে পবিত্রতা যা একজন কাফের বা মোনাফিকের জীবনে কল্পনাও করা যায় না। মুসলিম সমাজে এভাবেই আসে শান্তি, শৃঙ্খলা ও শ্লীলতা। অথচ সেক্যুলার সমাজে সেটি আসে না। সেক্যুলার সমাজে যেটি প্রবলতর হয় সেটি পার্থিব স্বার্থ হাসিলের প্রেরণা। এমন চেতনায় মানুষ শুধু রাজনীতিতেই স্বেচ্ছাচারী হয় না; জীবনের উপভোগেও স্বেচ্ছাচারী হয়। সে স্বেচ্ছাচারিতাকে তারা ব্যক্তিস্বাধীনতার লেবাস পরিয়ে জায়েজ করে নিতে চায়। সেক্যুলার সমাজে পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, সমকামিতা, অশ্লীলতা, মদ্যপানের ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বৈধ্যতা পায় তো জীবন উপভোগের এমন স্বেচ্ছাচারী প্রেরণা থেকেই। ফলে সেক্যুলারিজম যেখানে প্রবলতর হয় সেখানে পাপাচারেও প্লাবন আসে।
মুসলমান ইবাদতে প্রেরণাও পায় তার সংস্কৃতি থেকে। ফলে স্কুল-কলেজ বা মাদরাসায় না গিয়েও মুসলিম সমাজে বসবাসকারী যুবক তাই মসজিদে যায়, নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং মানুষের কল্যাণ সাধ্যমত চেষ্টাও করে। সীমান্তের প্রতিরক্ষায় বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ময়দানেও হাজির হয়। এ কাজে শুধু শ্রম-সময়-মেধা নয়, জানমালের কোরবানিও দেয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদরাসার ডিগ্রিধারী না হয়েও নিজেকে বাঁচায় বেপর্দা, ব্যভিচার, অশ্লীলতা, চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস-কর্ম ও নানাবিধ পাপাচার থেকে। প্রাথমিক কালের মুসলমানগণ যে মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিলেন সেটি এজন্য নয় যে সেদিন বড় বড় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদরাসা ছিল। বরং তখন প্রতিটি ঘর পরিণত হয়েছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান। সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে গড়ে উঠেছিল চেতনা ও চরিত্রের বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেদিনের মুসলমানেরা উন্নত মানবরূপে বেড়ে উঠতে পেরেছিলেন।
বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের আজকের বড় সমস্যা শুধু এ নয় যে, দেশগুলো অধিকৃত। বরং সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা এবং সে সাথে ভয়ানক বিপদের কারণ হলো, দেশগুলোর সাংস্কৃতিক সীমান্ত বিলুপ্ত হয়েছে এবং তা অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা। দেশের সীমান্ত বিলুপ্ত না হলেও মুসলিম দেশগুলোর সংস্কৃতির ময়দান শত্রু পক্ষের দখলে গেছে। ফলে এদেশগুলোতেও তাই হচ্ছে যা কাফেরকবলিত একটি দেশে হয়ে থাকে। মুসলিম দেশের সংস্কৃতিও পরিণত হয়েছে মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য রূপে গড়া তোলার ইনস্টিটিউশনে। এর ফলে বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলিম সন্তান মসজিদে না গিয়ে হিন্দুদের ন্যায় মঙ্গলপ্রদীপ হাতে নিয়ে শোভাযাত্রা করছে। কপালে তিলক পরছে, থার্টি ফার্স্ট নাইটে অশ্লীল নাচগানও করছে। এরাই শয়তানের পক্ষে লড়াকু সৈনিক, তাদের যুদ্ধাংদেহি রূপটি শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে।

বিদ্রোহ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে
ব্যক্তির জীবনে প্রতিটি পাপ, প্রতিটি দুর্বৃত্তি, আল্লাহর হুকুমের প্রতিটি অবাধ্যতাই হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা প্রকাশ পায় বেপর্দা, ব্যভিচার, অশ্লীলতা, নাচগান, মদ্যপান, মাদকাসক্তি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ইত্যাদির ব্যাপক বৃদ্ধিতে। জাতীয় জীবনে সেটি প্রকাশ পায় দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, সুদমুক্ত ব্যাংক ও অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশ আল্লাহর বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহে সমগ্র বিশ্বমাঝে একবার নয়, ৫ বার শিরোপে পেয়েছে। তাদের সে মহাবিদ্রোহটি ঘটেছে আল্লাহর নির্দেশিত সুনীতি প্রতিষ্ঠার হুকুমের অবাধ্যতা এবং সর্বস্তরে দুর্নীতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এরূপ শিরোপা লাভই কি বলে দেয় না দেশটির মানুষের জীবনযাত্রার প্রক্রিয়া তথা সংস্কৃতি কতটা অসুস্থ ও বিদ্রোহাত্মক? এবং সাংস্কৃতিক যুদ্ধে ইসলামের পক্ষের শক্তি কতটা পরাজিত?
ব্যক্তির সংস্কৃতির পরিচয় মেলে পোশাক-পরিচ্ছদ বা পানাহার থেকে নয়। বরং কিরূপ দর্শন বা চেতনা নিয়ে সে বাঁচলো তা থেকে। সংস্কৃতির মূল উপাদান হলো এই দর্শন। বস্তুত দর্শনই মানুষকে পশু থেকে পৃথক করে। নাচগান তো পশুপাখিও করে। কিন্তু তাতে কোন দর্শন থাকে না। তাই পশুপাখির নাচে-গানে কোন সমাজই সভ্যতর হয় না, সেখানে সভ্যতাও নির্মিত হয় না। তাই যে সমাজের সংস্কৃতি যতটা দর্শনশূন্য সমাজ ততটাই মানবতাবর্জিত। সে সমাজ তখন ধাবিত হয় পশুত্বের দিকে। দর্শনই নির্ধারণ করে দেয় কে কিভাবে বাঁচবে, কিভাবে পানাহার করবে, কিভাবে জীবন যাপন করবে বা উৎসব করবে সেটি। চেতনার এ ভিন্নতার কারণেই একজন পতিতা, ঘুষখোর, সন্ত্রাসী এবং দুর্বৃত্তের বাঁচার ধরন, পোশাক-পরিচ্ছদ, পানাহার ও উৎসবের ধরন ঈমানদারের মত হয় না। মুসলমানের সংস্কৃতি এজন্যই অবিশ্বাসী বা কাফেরের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি বিশেষ বিশ্বাস বা দর্শন জন্ম দেয় একটি বিশেষ রুচি ও সে রুচিভিত্তিক অভ্যাস। সে অভ্যাসের কারণেই ব্যক্তি বেড়ে উঠে সে সংস্কৃতির মানুষ রূপে। সংস্কৃতি এভাবেই সমাজে নীরবে কাজ করে। মুসলিম সমাজ থেকে সৎ নামাজি ও রোজাদারের পাশাপাশি আপসহীন মোজাহিদ বের হয়ে আসে তা তো সংস্কৃতির সে ইনস্টিটিউশন সক্রিয় থাকার কারণেই। যেখানে সেটি নেই, বুঝতে হবে সেখানে সে পুণ্যময় সংস্কৃতিও নেই।
মুসলমানদের শক্তির মূল উৎস তেল-গ্যাস নয়, জনশক্তিও নয়। সে শক্তি হলো কোরআনভিত্তিক দর্শন ও সে দর্শনভিত্তিক সংস্কৃতি। এ জন্যই শত্রুপক্ষের আগ্রাসনের শিকার শুধু মুসলিম দেশের ভূগোল নয়, বরং মূল টার্গেট হলো ইসলামী দর্শন ও সংস্কৃতি। তাই পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ বাংলাদেশের মত দেশে বোমা বা যুদ্ধবিমান নিয়ে হাজির হয়নি। হাজির হয়েছে সাংস্কৃতিক প্রকল্প নিয়ে। বাংলাদেশের হাজার হাজার এনজিওর ওপর দায়িত্ব পড়েছে সে প্রকল্পকে কার্যকর করা। দেশের সংস্কৃতিকে তারা এভাবে ইসলামের শিক্ষা ও দর্শন থেকে মুক্ত করতে চাচ্ছে। রাস্তায় মাটি কাটা ও তুতগাছ পাহারা দেয়াকে মহিলার ক্ষমতায়ন বলে এসব এনজিওগুলো তাদেরকে বেপর্দা হতে বাধ্য করছে। অপর দিকে মাইক্রোক্রেডিটের নামে সাধারণ মানুষকে সুদ দিতে ও সুদ খেতেও অভ্যস্ত করছে। অথচ সুদ খাওয়া বা সুদ দেয়া উভয়ই হলো আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ।
লক্ষ্য : মুসলিম সংস্কৃতির বিনাশ
ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী কোয়ালিশনের মূল এজেন্ডাটি কি সেটি বুঝা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আফগানিস্তান দখল ও সেখানে চলমান কার্যক্রম থেকে। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সেখানে মুসলিম সংস্কৃতির বিনাশে হাত দিয়েছে। আফগানিস্তানের অপরাধ, অতীতে দেশটির জনগণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছে। এবং সেটি কোন জনশক্তি, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক শক্তির বলে নয়, বরং ইসলামী দর্শন ও সে দর্শননির্ভর আপসহীন জিহাদী সংস্কৃতির কারণে। সে অভিন্ন দর্শন ও দর্শনভিত্তিক সংস্কৃতির বলেই তারা আজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্রদের পরাজিত করতে চলেছে। ফলে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সে দর্শন ও সে দর্শনভিত্তিক সংস্কৃতির নির্মূল করতে চায়। এবং সে বিনাশীকর্মের পাশাপাশি বিপুল বিনিয়োগ করছে সেদেশে সেক্যুলার দর্শন ও সেক্যুলার সংস্কৃতির নির্মাণে। এটিকে তারা বলছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামোর নির্মাণ। পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলছে অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আফগানিস্তানের শিশুরা এখনও নানা রোগভোগে লাখে লাখে মারা যাচ্ছে। কিন্তু তা থেকে বাঁচানোর আগ্রহ তাদের নেই, অথচ শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ করছে তাদের নাচগান শেখাতে। বিবাহের বয়স বাড়িয়ে সহজতর করা হচ্ছে ব্যভিচারকে।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিসরের মত দেশে অতীতে একই রূপ স্ট্র্যাটেজি নিয়ে কাজ করেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। এদেশগুলির ওপর তাদের দীর্ঘ শাসনামলে তেমন কোন শিল্প কলকারখানা বা প্রযুক্তি গড়ে না উঠলেও তারা সেসব দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেক্যুলার করেছিল। সে আমলে প্রতিটি শহরে গড়া হয়েছে ব্যভিচার পল্লী। গড়া হয়েছ সুদি ব্যাংক। ফলে এনেছে সাংস্কৃতিক জীবনে প্রচন্ড বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি। সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ হলো ইহজাগতিকতা। সেক্যুলারিজমের অর্থ, ব্যক্তি তার কাজ-কর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে প্রেরণা পাবে ইহজাগতিক আনন্দ-উপভোগের তাগিদ থেকে, ধর্ম থেকে নয়। উপভোগ বাড়াতে সে নাচবে, গাইবে, বেপর্দা হবে, অশ্লীল নাটক ও ছায়াছবি দেখবে। মদ্যপান করবে এবং ব্যভিচারিতেও লিপ্ত হবে। উপার্জন বাড়াতে সে সুদ খাবে এবং ঘুষও খাবে। এগুলো ছাড়া তাদের এ পার্থিব জীবন আনন্দময় হয় কী করে? অপর দিকে ধর্মপালনকে বলেছে মৌলবাদী পশ্চাৎপদতা ও গোঁড়ামি। তাই দেশে সেক্যুলারিজম বাড়লে অসভ্যতা এবং দুর্নীতিও বাড়ে। এ কারণেই বাংলাদেশ বিশ্বের দুইশত দেশের মাঝে দুর্নীতিতে লাগাতার ৫ বার প্রথম স্থান অধিকার করেছে।
কোন মুসলিম দেশে এমন সেক্যুলার চেতনা ও সংস্কৃতির প্রকোপ বাড়লে জনগণের মন থেকে আল্লাহতায়ালার ভয়ই বিলুপ্ত হয়। মুসলমানগণ তখন ভুলে যায় নিজেদের ঈমানী দায়বদ্ধতা। বরং বাড়ে মহান আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রবণতা। ফলে বাংলাদেশ, মিসর, পাকিস্তান বা তুরস্কের মত দেশে আল্লাহর আইন তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠা রুখতে কোন কাফেরকে অস্ত্র ধরতে হয়নি। সে কাজের জন্য বরং মুসলিম নামধারী সেক্যুলারগণই যথেষ্ট করিৎকর্মা প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামের জাগরণ ও মুসলিম শক্তির উত্থান রুখার লক্ষ্যে আজও দেশে দেশে পাশ্চত্যের অনুগত দাস গড়ে তোলার এটিই সফল মডেল। মার্কিন দখলদার বাহিনী সেটিরই বাস্তবায়ন করছে আফগানিস্তানে। এ স্ট্র্যাটেজিক কৌশলটির পারঙ্গমতা নিয়ে ব্রিটিশ শাসকচক্রের মনে কোন রূপ সন্দেহ ছিল না। যেখানে অধিকার জমিয়েছে সেখানেই এরূপ সেক্যুলারদেরকেই সযতেœ গড়ে তুলেছে। তাদের সংখ্যা পর্যাপ্ত সংখ্যায় বাড়াতে যেখানে দেরি হয়েছে সেদেশের স্বাধীনতা দিতেও তারা বিলম্ব করেছে। সে ব্রিটিশ পলিসির পরিচয়টি মেলে মিসরে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিনিধি লর্ড ক্রোমারের লেখা থেকে। তিনি লিখেছেন, ‘কোন ব্রিটিশ ঔপনিবেশকে স্বাধীনতা দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না যতক্ষণ না সে দেশে এমন এক সেক্যুলার শ্রেণী গড়ে না ওঠে যারা চিন্তা-চেতনায় হবে ব্রিটিশের অনুরূপ।’
ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে ব্রিটিশ পলিসি যে কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে তার প্রমাণ মিলে বাংলাদেশের মত সাবেক ব্রিটিশ ঔপনিবেশগুলোর প্রশাসন, রাজনীতি, সেনাবাহিনী ও বিচারব্যবস্থায় সেক্যুলার ব্যক্তিদের প্রবল আধিপত্য দেখে। আজও আইন-আদালতে ব্রিটেশের প্রবর্তিত পেনাল কোড। বাংলাদেশের সেক্যুলার সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ মুসলিম দেশের জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিপালিত হলে কি হবে, দেশে যারা শরিয়ত বা আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা চায় ব্রিটিশদের ন্যায় তারাও তাদেরকে শত্রু মনে করে। আর বিশ্বস্ত আপনজন মনে করে ভিন্ দেশী কাফেরদের। এদের কারণেই মুসলিম দেশে হামিদ কারজাইয়ের মত দাস পেতে ইসলামের শত্রুপক্ষের কোন বেগ পেতে হয় না। ইসলামী দর্শন থেকে দূরে সরানো এবং মগজে সেক্যুলার চেতনার পরিচর্যাকে তীব্রতর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের মত দেশে সেক্যুলার দিনক্ষণকে ইতিহাস থেকে খুঁজে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিচ্ছে। এরই উদাহরণ, বাংলাদেশের মত দেশে বসন্তবরণ বা নববর্ষের দিন উদযাপন। নবীজির হাদিস, মুসলমানের জীবনে বছরে মাত্র দুটি উৎসব। একটি ঈদুল ফিতর এবং অপরটি ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। বাংলার মুসলমানগণ এ দুটো দিনই এতদিন ধুমধামে উদযাপন করে আসছে। বাংলার মুসলমানদের জীবনে নববর্ষের উৎসব কোন কালেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
লক্ষ্য: মূল পরীক্ষায় বিফল করা
এ জীবনে কে কতটা সফল বা বিফল সে মূল্যায়নটি আসে মহান আল্লাহতায়ালার মূল্যায়ন থেকে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহর নিজস্ব ঘোষণাটি হলো, “তিনিই (মহান আল্লাহতায়ালা) জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন যেন পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম।” (সূরা মুলুক, আয়াত ২) অর্থাৎ মানুষের জন্য এ পার্থিব জীবন পরীক্ষাকেন্দ্র মাত্র। শয়তানের লক্ষ্য: জীবনের এ চূড়ান্ত পরীক্ষায় বিফল করা। সে লক্ষ্য পূরণে শয়তানের স্ট্র্যাটেজি বহুবিধ। হাজির হয় সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্মের নামে। আয়োজন বাড়ে খেলাধুলা ও নাচগানের। তখন শুরু হয় জাহান্নামের পথে চলা। সংস্কৃতির নামে এগুলো শুরু হলে যেটি বাড়ে তা হলো পথভ্রষ্টতা। তখন সিরাতুল মোস্তাকিমে পথচলাই অসম্ভব হয়ে ওঠে। তাই এগুলো শয়তানের স্ট্র্যাটেজি, মুসলমানের নয়।
নতুন বছর, নতুন মাস, নতুন দিন নবীজি (সা)-এর আমলেও ছিল। কিন্তু তা নিয়ে তিনি নিজে যেমন কোনদিন উৎসব করেননি, সাহাবাগণও করেননি। অথচ তারাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়েছিলেন। নবীজি (সা) ও সাহাবাগণ এ ব্যাপারে অতিশয় মনোযোগী ছিলেন যেন শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে সমাজ বা রাষ্ট্রে এমন কিছুর চর্চা না হয় যাতে সিরাতুল মোস্তাকিমে চলাই অসম্ভব হয়। এবং মনোযোগে ছেদ পড়ে ধর্মের পথে পথচলায়। ড্রাইভিং সিটে বসে নাচগানে মত্ত হলে সঠিকভাবে গাড়ি চালানো যায়? এতে বিচ্যুতি ও বিপদ তো অনিবার্য। অবিকল সেটি ঘটে জীবন চালানোর ক্ষেত্রেও। নবীজি (সা)-এর আমলে সংস্কৃতির নামে আনন্দ উপভোগের প্রতি এত আকর্ষণ ছিল না বলেই সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা তাদের জন্য সহজতর হয়েছিল। বরং তারা জন্ম দিয়েছিলেন মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতির। সে সংস্কৃতির প্রভাবে একজন ভৃত্যও খলিফার সাথে পালাক্রমে উটের পিঠে চড়েছেন। এবং খলিফা ভৃত্যকে উটের পিঠে বসিয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এর কোন তুলনা নেই। অথচ বাংলাদেশে আজ সংস্কৃতির নামে কী হচ্ছে? ২০১০ সালে এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা নববর্ষের কনসার্টে কী ঘটেছিল? যৌন ক্ষুধায় অতি উদভ্রান্ত অসংখ্য হায়েনা কি সেদিন নারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েনি? অসংখ্য নারী কি সেদিন লাঞ্ছিত হয়নি? কিছু কাল আগে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ব্যান্ড সঙ্গীতের আসরে কী ঘটলো? শত শত নারী কি সেদিন ধর্ষিতা হয়নি? এটিই কি বাঙালি সংস্কৃতি? দেশের সেক্যুলার পক্ষ এমন সংস্কৃতির উৎকর্ষতা চায়?
লক্ষ্য: ইসলাম থেকে দূরে সরানো
নববর্ষ উদযাপনের নামে নারী-পুরুষদের মুখে উলকি কেটে বা নানান সাজে একত্রে রাস্তায় নামানোর রীতি কোন মুসলিম সংস্কৃতি নয়। বাঙালির সংস্কৃতিও নয়। এমনকি বাঙালি হিন্দুদেরও নয়। নববষের্র নামে বাংলায় বড়জোর কিছু হালখাতার অনুষ্ঠান হতো। কিন্তু কোন কালেই এদিনে কনসার্ট গানের আয়োজন বসেনি। জন্তু-জানোয়ারের প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিলও হয়নি। পাশ্চাত্যেও নববর্ষের দিনে এমন উৎসব দিনভর হয় না। বাংলাদেশে এগুলোর এত আগমন ঘটেছে নিছক রাজনৈতিক প্রয়োজনে। যুদ্ধজয়ের লক্ষ্যে অনেক সময় নতুন প্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্র সৈনিকদের হাতে তুলে দেয়া হয়। অনেক সময় তাতে বিজয়ও আসে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধে সংস্কৃতির নামে এসব অভিনব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ত্বরিত বিজয়ের লক্ষ্যে। তাদের লক্ষ্য নাচ-গান, কনসার্টের নামে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়ে নতুন ঢংয়ের এসব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ষড়যন্ত্রমূলক প্রয়োজনে। পাশ্চাত্যের যুবক-যুবতীদের ধর্ম থেকে দূরে টানার প্রয়োজন নেই। জন্ম থেকেই তারা ধর্ম থেকে দূরে। নাচগান, মদ, অশ্লীলতা, উলঙ্গতা ও ব্যভিচারের মধ্য দিয়েই তাদের বেড়ে ওঠা। তাই নববর্ষের নামে তাদের মাঝে এসবে অভ্যস্ত করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেটির প্রয়োজন রয়েছে বাংলাদেশে। সেটি ধর্ম থেকে ও নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরানোর লক্ষ্যে। এসবের চর্চা বাড়াতে কাজ করছে প্রচুর দেশী-বিদেশী এনজিও। এমন অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয়ও হচ্ছে। এবং সে অর্থ আসছে বিদেশীদের ভান্ডার থেকে। এভাবে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার পাশাপাশি অশ্লীলতারও সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এবং লুপ্ত করা হচ্ছে ব্যভিচার ও অশ্লীলতাকে ঘৃণা করার অভ্যাস, যা পাশ্চাত্য থেকে বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে।
শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য মুসলিম দেশেও এরূপ নববর্ষ পালনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ পাশ্চাত্য দেশ বিপুল অঙ্কের অর্থ সাহায্য দিচ্ছে। ইরানি-আফগানি-কিরগিজি-কুর্দিদের নওরোজ উৎসবের দিনে প্রেসিডেন্ট ওবামা বিশেষ বাণীও দিয়েছেন। তবে নববর্ষের নামে বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিনিয়োগের মাত্রাটি আরো বিচিত্র ও ব্যাপক। এখানে বাণী নয়, আসছে বিপুল বিনিয়োগ। কারণ, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। আফগানিস্তানের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ। জনসংখ্যার ৯০% ভাগ মুসলমান, যাদের আপনজনেরা ছড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে। ফলে এদেশে ইসলামের দর্শন প্রচার পেলে তা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। এ বিশাল জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে সেক্যুলার সংস্কৃতিতে বশ করানো তাদের কাছে তাই অতিগুরুত্বপূর্ণ। তারা চায় এ পৃথিবীটা একটি মেল্টিং পটে পরিণত হোক। আলু-পটোল, পেঁয়াজ-মরিচ যেমন চুলার তাপে কড়াইয়ে একাকার হয়ে যায়, তেমনি বিশ্বের সব সংস্কৃতির মানুষ একক সংস্কৃতির মানুষের পরিণত হোক। এভাবে নির্মিত হোক গ্লোবাল ভিলেজ। আর সে গ্লোবাল ভিলেজের সংস্কৃতি হবে পাশ্চাত্যের সেক্যুলার সংস্কৃতি। এজন্যই বাংলাদেশে নারী-পুরুষকে ভ্যালেন্টাইন ডে, বর্ষপালন, মদ্যপান, অশ্লীল নাচ, পাশ্চাত্য ধাঁচের কনসার্টে অভ্যস্ত করায় এসব এনজিওদের এত আগ্রহ। তারা চায় তাদের সাংস্কৃতিক সীমানা বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশের প্রতি বসতঘরের মধ্যেও বিস্তৃত হোক। তাই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সীমানা আজ বিলুপ্ত।

মহাবিপর্যয়ের পথে
বিপদের আরো কারণ, এত বড় গুরুতর বিষয় নিয়েও কারো কোন দুশ্চিন্তা নেই। কোন পরিবারে কেউ মৃত্যুশয্যায় পড়লে সে পরিবারে দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না, দৌড়াদৌড়ি শুরু হয় কিভাবে তাকে বাঁচানো যায় তা নিয়ে। অথচ আজ শয্যাশায়ী সমগ্র বাংলাদেশ। সমগ্র দেশবাসী ছুটে চলেছে মহাবিপদের দিকে। সামনে অনন্ত অসীম কালের জাহান্নাম। অথচ তা নিয়ে ক’জন আলেম, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও লেখক উদ্বিগ্ন? ক’জন মুখ খুলেছেন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন? ১৭৫৭ সালের চেতনা থেকে বাংলার মুসলমান কি সামান্যতমও সামনে এগিয়েছে? তখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্রিটিশের দখলদারি। অস্তমিত হয়েছিল বাংলার মুসলমানদের স্বাধীনতা। সে পরাধীনতা বিরুদ্ধে কোনো জনপদে ও গ্রাম-গঞ্জে সাথে সাথে কোনরূপ প্রতিরোধ বা বিদ্রোহের ধ্বনি উঠেছিল সে প্রমাণ নেই। বরং যে যার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ততা থেকেছে। দেশের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু ভাবা বা কিছু করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি। অথচ শত্রুর হামলার মুখে প্রতিরোধের এ দায়ভার প্রতিটি মুসলমানের। এ কাজ শুধু বেতনভোগী সৈনিকের নয়। প্রতিটি নাগরিকের। ইসলামে এটি জিহাদ। মুসলমানদের গৌরব কালে এজন্য কোন সেনানিবাস ছিল না। প্রতিটি গৃহই ছিল সেনানিবাস। প্রতিটি নাগরিক ছিল সৈনিক। প্রতিটি যুদ্ধে মানুষ তখন স্বেচ্ছায় নিজ ঘর থেকে নিজ খরচে যুদ্ধে গিয়ে হাজির হয়েছে। সে জিহাদে অর্থের খরচ, শ্রমের খরচ ও রক্তের খরচ তারা নিজেরা পেশ করেছেন। অথচ আজ সেনানিবাসের পর সেনানিবাস বেড়েছে অথচ শত্রুর হামলার মুখে কোন প্রতিরোধ নেই। দেশের পর দেশ তাই অধিকৃত। এবং অধিকৃত মুসলিম দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতিও। এতে দূরত্ব বেড়েছে নবীজি (সা) আমলের ইসলাম থেকে।
সাংস্কৃতিক সীমানা রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হলে পরাজয় অনিবার্য হয় ঈমান-আকিদা রক্ষার লড়াইয়েও। কারণ, মুসলমানে ঈমান-আকিদা কখনো অনৈসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠে না। মাছের জন্য যেমন পানি চাই, ঈমান নিয়ে বাঁচার জন্যও তেমনি ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী সংস্কৃতি চাই। মুসলমান তাই শুধু কোরআন পাঠ ও নামাজ-রোজা আদায় করেনি, ইসলামী রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়ত ও ইসলামী সংস্কৃতিরও প্রতিষ্ঠা করেছে। মুসলমানদের অর্থ, রক্ত, সময় ও সামর্থ্যরে সবচেয়ে বেশি ভাগ ব্যয় হয়েছে তো ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতির নির্মাণে। নামাজ-রোজার পালন তো কাফের দেশেও সম্ভব। কিন্তু ইসলামী শরিয়ত ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যা তথা ইসলামী বিধানের পূর্ণ পালন কি অমুসলিম দেশে সম্ভব? অতীতের ন্যায় আজকের মুসলমানদের ওপরও একই দায়ভার। সেটি শুধু কলমসৈনিকের নয়, প্রতিটি আলেম, প্রতিটি শিক্ষক, প্রতিটি ছাত্র ও প্রতিটি নাগরিকের ওপরও। এ লড়াইয়ে তাদেরকেও ময়দানে নেমে আসতে হয়। এ লড়াইটি হয় কোরআনি জ্ঞানের তরবারি দ্বারা। নবীজি (সা)-এর যুগে সেটিই হয়েছে। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে এজন্যই নামাজ- রোজার আগে ফরজ করা হয়েছে। কিন্তু সে ফরজ পালনের আয়োজনই বা কোথায়?
অনেকেই জ্ঞানার্জন করছেন নিছক রুটিরুজির তালাশে। ফরজ আদায়ের লক্ষ্যে নয়। ফলে প্রচন্ড শূন্যতা ও বিচ্যুতি রয়েছে জ্ঞানার্জনের নিয়তেই। ফলে সে জ্ঞানচর্চায় তাদের রুটি-রুজি জুটছে ঠিকই, কিন্তু তাতে জ্ঞানার্জনের ফরজ আদায় হচ্ছে না। বাড়ছে না জিহাদের ময়দানে লোকবল। এবং বাড়ছে না ইসলামের প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য এটি এক বিপজ্জনক দিক। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে অরক্ষিত শুধু দেশটির রাজনৈতিক সীমান্তই নয়, বরং প্রচন্ডভাবে অরক্ষিত দেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও। দেশ তাই দ্রুত ধেয়ে চলেছে সর্বমুখী পরাজয় ও প্রচন্ড বিপর্যয়ের দিকে। ইসলামের নামে যা বেঁচে আছে সেটি নবীজি (সা)-এর আমলের কোরআনি ইসলাম নয়। যে সনাতন ইসলামে শরিয়ত, খেলাফত, হুদুদ, শূরা, প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও জিহাদ ছিল, দেশটিতে সে ইসলামের মৃত্যু ঘটেছে বহু আগেই। শুধু মসজিদ-মাদরাসা ও নামাজ- রোজার সংখ্যা বাড়িয়ে কি এ বিপদ থেকে মুক্তি মিলবে?
লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

SHARE

Leave a Reply