বাংলাদেশে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে আকাশচুম্বী ব্যয় : অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতিই মূল কারণ – জসিম উদ্দীন সিকদার

উন্নয়নশীল দেশ থেকে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে। এর মধ্যে চার লেনের সড়ক, সেতু, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যয় বেশি করা হচ্ছে। মূলত অপরিকল্পিত সড়কব্যবস্থায় কারণেই ব্যয় বেশি হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

চার লেনের সড়ক
ইউরোপে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ২৮ কোটি টাকা। পাশের দেশ ভারতে এ ব্যয় ১০ কোটি টাকা। আর চীনে তা গড়ে ১৩ কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশের তিনটি মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ব্যয় হচ্ছে গড়ে ৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক চার লেন নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫ কোটি টাকা। ফলে মহাসড়ক নির্মাণে সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশে পরিণত হওয়ার পথে বাংলাদেশ। যদিও প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর প্রত্যেকটিই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
২০১৪ সালে সেপ্টেম্বরে জেনেভায় ইউএন-ইসিই (ইকোনমিক কমিশন ফর ইউরোপ) আয়োজিত এক সেমিনারে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মহাসড়ক নির্মাণের তুলনামূলক ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন গ্রিসের ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব এথেন্সের অধ্যাপক দিমিত্রিয়স স্যামবুলাস। ‘এস্টিমেটিং অ্যান্ড বেঞ্চমার্কিং ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার কস্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তিনি বলেন, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খরচ হয় গড়ে ৩৫ লাখ ডলার বা ২৮ কোটি টাকা। আর দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ২৫ লাখ ডলার বা ২০ কোটি টাকা।
চলতি বছর জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ ব্যয়-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ২২ লাখ ডলার বা ১৭ কোটি টাকা। আর দুই লেনের মহাসড়ককে চার লেন করতে এ ব্যয়ের পরিমাণ সাড়ে ১৪ লাখ ডলার বা বাংলাদেশী মুদ্রায় ১১ কোটি টাকা। ৪০টি দেশের নির্মাণ ব্যয়ের ভিত্তিতে ইকোনোমেট্রিক মডেল প্রয়োগ করে গড় ব্যয় নির্ণয় করা হয়। ‘দ্য কস্ট অব রোড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইন লো অ্যান্ড মিডল ইনকাম কান্ট্রিজ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রণয়ন করেন অক্সফোর্ড, কলাম্বিয়া ও গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন অধ্যাপক।
পাশের দেশ ভারতে গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় গড়ে ৮-৯ কোটি রুপি; বাংলাদেশের মুদ্রায় যা সাড়ে ৯ থেকে সাড়ে ১০ কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহণ ব্যয়ও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। আর জমি অধিগ্রহণ করা না হলে ব্যয় অর্ধেকে নেমে যাবে। তবে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেন করতে কিলোমিটারপ্রতি ৫ কোটি রুপি বা ৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে। দেশটির ১২তম (২০১২-১৭) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
চীনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশটিতে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় গড়ে ১৬-১৭ লাখ ডলার; বাংলাদেশের মুদ্রায় যা সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। তবে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেন করতে কিলোমিটারপ্রতি পড়বে ১০ কোটি টাকার কম। দেশটির ১২তম (২০১০-১৫) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ তথ্য উল্লেখ আছে।
এদিকে দেশের মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ তিন প্রকল্পের মধ্যে রংপুর-হাটিকুমরুল অংশ আগামী বছর শুরুর কথা রয়েছে। এ মহাসড়কের ১৫৭ কিলোমিটার চার লেনে উন্নীতকরণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ৫২ কোটি ৭ লাখ টাকা। আর ঢাকা-সিলেট ২২৬ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৬৬৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ৫৬ কোটি ৪ লাখ টাকা। ২০১৭ সালে প্রকল্পটি শুরু করার কথা। দুটি প্রকল্পই বাস্তবায়ন হবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে।
আগামী বছর শুরু হওয়ার কথা ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন প্রকল্পের কাজ। সম্প্রতি প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) চূড়ান্ত করতে সড়ক পরিবহন বিভাগে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুটি প্যাকেজে ঢাকার বাবুবাজার লিংক রোড থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও মাদারীপুরের পাচ্চর থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত চার লেন করা হবে। ৫৩ কিলোমিটার চার লেন করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে প্রায় ৯৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে শতভাগ সরকারি অর্থায়নে।
যদিও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণে ব্যয় অন্যগুলোর তুলনায় কম হচ্ছে। এ মহাসড়কের ১৯২ দশমিক ৩ কিলোমিটার চার লেনে উন্নীত করায় ব্যয় হচ্ছে ৩ হাজার ৭৯৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। আর ৮৭ দশমিক ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৮১৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ২০ কোটি ৮২ লাখ টাকা। বাস্তবায়ন বিলম্বে উভয় প্রকল্পে একাধিকবার ব্যয় বাড়ানোও হয়েছে।
জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এমএএন ছিদ্দিক বলেন, নতুন চার লেন প্রকল্পগুলোয় ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেন নির্মাণ করা হবে। রেল ক্রসিং ও ইন্টারসেকশনে (মোড়) ওভারপাস, ইউ-লুপ ও ফ্লাইওভার থাকবে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের সড়কে কোনো বাধা ছাড়াই যানবাহন চলাচল করবে। বেশকিছু সেতু ও কালভার্টও রয়েছে প্রকল্পগুলোর আওতায়। এ ছাড়া জমি অধিগ্রহণেও ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এ জন্য খরচ কিছুটা বেশি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানের কারণে সড়কের নির্মাণব্যয় বেশি হবে- এ যুক্তির সঙ্গে একমত নন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ২০০৫ সালে নির্মাণ করা বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কটি বাংলাদেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের সড়ক। ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনও রয়েছে এতে। এটি নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫ কোটি টাকা। গত ১০ বছরে এ ব্যয় বাড়লেও ১০ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। তবে ফ্লাইওভার বা ওভারপাস ও সেতুর কারণে ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে।
জানা গেছে, নতুন চার লেন প্রকল্পগুলোয় খুব বেশি জমিরও প্রয়োজন হবে না। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন নির্মাণ করতে প্রকল্পটির আওতায় মাত্র ২৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন পড়বে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে মাত্র ৯৭ কোটি টাকা। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পে ৩৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয় ১০৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া রড, সিমেন্টসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর দাম পাঁচ বছরের মধ্যে বর্তমানে সর্বনিম্ন। আর বাংলাদেশের নির্মাণশ্রমিকদের মজুরিও ভারত বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের চেয়ে অনেক কম।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণে গড়ে ব্যয় হয় ৫-৬ কোটি টাকা। ফলে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে কিলোমিটারপ্রতি ১০-১২ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা। তবে প্রকল্পের মধ্যে সেতু, ফ্লাইওভার বা ওভারপাস থাকলে ব্যয় কিছুটা বেশি হবে। সে ক্ষেত্রেও চার লেনে উন্নীত করতে কিলোমিটারপ্রতি ২০-২২ কোটি টাকার মধ্যেই থাকবে ব্যয়।
উল্লিখিত তিন প্রকল্পের তুলনায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক (জয়দেবপুর-এলেঙ্গা-টাঙ্গাইল) চার লেন নির্মাণেও ব্যয় অনেক কম। এক্ষেত্রে ৭০ কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে গত মাসে ঠিকাদার নিয়োগ চুক্তি সই হয়।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বনপাড়া-হাটিকুমরুল অংশটি নির্মাণ করা হয় ২০০৫ সালে। হাওরের ভেতর দিয়ে হওয়ায় সেখানে নয় মিটার পুরু মাটির স্তর তৈরি করতে হয়। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছিল ৫ কোটি টাকা। সেটাই ছিল বাংলাদেশে মহাসড়ক নির্মাণে সর্বোচ্চ ব্যয়ের উদাহরণ।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে দেশে মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৫-৬ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। নতুন চার লেন প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন মোড়ে ফ্লাইওভার, ওভারপাস বা ইউ-লুপ নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যয় কিছুটা বেশি হওয়া স্বাভাবিক। তবে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৯৫ কোটি টাকা অনেক বেশি মনে হচ্ছে। প্রকল্প প্রস্তাবনা দেখলে কারণটা বোঝা যাবে।

সেতু
সম্প্রতি উদ্বোধন হয়েছে মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় পেনাং সেতু। ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সুলতান আবদুল হালিম মুয়াজ্জাম শাহ নামের এ সেতু নির্মাণ শুরু হয় ২০০৮ সালের নভেম্বরে। সমুদ্রের ওপর সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪৫০ কোটি মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত বা প্রায় ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়েছে ৪৩৭ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ইন্দোনেশিয়ায় উদ্বোধন হয় ১২ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু বালি মান্দারা। এটি নির্মাণে ব্যয় হয় ২২ কোটি ডলার বা ১ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। এ হিসাবে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ১৩৯ কোটি টাকা। ২০১১ সালে কাজ শেষ হওয়া চীনের জিয়াঝোউ বে সেতুরও কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয় ৪৯১ কোটি টাকা। সাগরের ওপর নির্মিত ২৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সেতুর কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালে।
গত কয়েক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ রকম বেশ কয়েকটি বড় আকারের সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। নির্মাণকাজ চলছে আরো কয়েকটির। এগুলোর কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণব্যয় ৪০০-৬০০ কোটি টাকা। কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে তা আরো কম। তবে বাংলাদেশে কয়েক বছরের মধ্যে নির্মাণ হতে যাওয়া বড় সেতুগুলোর কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরো বেশি। যদিও বাংলাদেশে জমির দাম ও শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলক কম। বাংলাদেশে সেতু নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয় প্রসঙ্গে বেশ কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে জমির দাম ক্রমেই বাড়ছে। এ কারণে জমি অধিগ্রহণজনিত পুনর্বাসন ব্যয় অনেক বেশি। এছাড়া কোনো প্রকল্পই সময়মতো শেষ হয় না। ফলে নির্মাণকাল বাড়ে, পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়ছে। আর কস্ট অব ডুয়িং বিজনেসও অনেক বেশি। এর মূল কারণ পরিবহন ভাড়া ও সুদহার বেশি। ফলে সেতু নির্মাণ ব্যয় বেশি হওয়া অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়।’
এদিকে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর বর্তমান নির্মাণ ব্যয় ধরা আছে ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ৩ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। নির্মাণ শুরুর পর এ ব্যয় আরো ৩ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে বলে জানান প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়াবে ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদনের সময় পদ্মা সেতুর নির্মাণব্যয় ধরা হয় ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। বলা হয়েছিল, ২০১৫ সালের মধ্যে সেতু তৈরির কাজ সম্পন্ন হবে। তবে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে প্রথমে বলা হয়, পদ্মা সেতুর নির্মাণে ব্যয় হবে ১২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এরপর আরো তিন দফা ব্যয়ের হিসাব ঘোষণা করা হয় এবং প্রতিবারই তা বাড়ে। পরে ২০১১ সালে রেলপথ যুক্ত করে প্রকল্প ব্যয় চূড়ান্ত হয় ২৯৭ কোটি ডলার বা ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা।
দ্বিতীয় কাঁচপুর, দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু নির্মাণেও অত্যধিক ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রায় তিন কিলোমিটার সড়ক সেতু নির্মাণে এক্ষেত্রে ব্যয় হবে ৮ হাজার কোটি টাকা। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। আগামী বছর শুরু হয়ে ২০১৮ সালে সেতু তিনটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা। এছাড়া প্রস্তাবিত পাঁচ কিলোমিটার দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ব্যয় ধরা হয়েছে ২০০ কোটি ডলার বা ১৬ হাজার কোটি টাকা। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়াবে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: সামছুল হক বলেন, সারা বিশ্বে সাধারণত প্রতি কিলোমিটার সেতু নির্মাণে বর্তমান ব্যয় ৫০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে রেলপথ যুক্ত হলে তা ৭০০ কোটি টাকার মতো দাঁড়াতে পারে। তবে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো একটু জটিল প্রকৃতির। এখানকার নদীতে পলি পড়ে বেশি, নদীর তলদেশের মাটিও (স্কাওয়ারিং) দ্রুত সরে যায় এবং পাড়ও ভাঙে। ফলে নদী শাসন সেতু নির্মাণ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছু তারতম্য ঘটাতে পারে। তবে তা কখনই ব্যয়কে দ্বিগুণের বেশি করবে না। অর্থাৎ এখানে কিলোমিটারপ্রতি সেতু নির্মাণে সর্বোচ্চ দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ হতে পারে।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোর মধ্যে ২২ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ হংকং-ঝুহাই-ম্যাকাও সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে ২০১৬ সালে। ২০১১ সালে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৪২ কিলোমিটার সংযোগ সড়কসহ ছয় লেনবিশিষ্ট সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯০০ কোটি ডলার বা ৭২ হাজার কোটি টাকা। আর মূল সেতুর কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। এছাড়া ব্রুনেইয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ টেমবুরোন সেতু। ব্রুনেই উপসাগরের ওপর সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হবে চলতি বছর। আর শেষ হবে ২০১৮ সালে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০০ কোটি ব্রুনেই ডলার বা ১৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়বে ৫৯৩ কোটি টাকা। ভারতে ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ মুম্বাই ট্রান্স হারবার লিংক সেতু নির্মাণ শুরু হবে চলতি বছর। সড়ক ও রেল সেতুটি ২০১৯ সালে সম্পন্ন হওয়ার কথা। এর নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছে ১৫০ কোটি ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকা। কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ৫৪৫ কোটি টাকা।
২০১৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল কনস্ট্রাকশন কস্ট সার্ভের তথ্যমতে, মালয়েশিয়ায় নির্মাণশ্রমিকের গড় মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ৩ ডলার, চীনে ২ ও ভারতে ৪০ সেন্ট। আর বাংলাদেশে ৪০ সেন্টেরও কম। ফলে শ্রমিকের গড় মজুরির হিসাবে চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনেই বা ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে সেতু নির্মাণব্যয় কম হওয়ার কথা। বাংলাদেশে জমি অধিগ্রহণ ব্যয়ও উল্লিখিত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।
দি ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইবি) সভাপতি ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. এম শামিম জেড বসুনিয়া বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে সেতু নির্মাণব্যয় কম হওয়ার কথা। তবে বিদেশী ঋণনির্ভরতা এক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। এ ধরনের ঋণের বড় অংশ পরামর্শক ও তাদের শর্তাধীন বিভিন্ন খাতে চলে যায়। এতে ব্যয় বেড়ে যায়। তবে পদ্মা সেতু এখন যেহেতু নিজস্ব অর্থায়নে হচ্ছে, ফলে ব্যয় অনেক যৌক্তিক পর্যায়ে থাকবে বলে আশা করা যায়।

বিআরটি
যানজট নিরসনে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এক ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক মানদন্ডে এটি গড়ে তুলতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় ১০ থেকে ৩০ লাখ ডলার। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বিমানবন্দর সড়ক থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রস্তাবিত বিআরটির জন্য কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৯০ লাখ ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৭০ কোটি টাকা। এ হিসাবে ২০ কিলোমিটার এ ব্যবস্থায় ব্যয় হবে ১৮ কোটি ডলার বা ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে এটাই হবে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিআরটিএ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিআরটিএ বাবদ ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রথম বিআরটি চালু হয় ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরে ১৯৭৪ সালে। ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যাবস্থাটি চালু করতে সে সময় ব্যয় হয় ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয়ের পরিমাণ ১৫ লাখ ডলার। ২০১১ সালে একই শহরে নতুন আরেকটি বিআরটি চালু করা হয়। এতে ব্যয় হয় কিলোমিটারপ্রতি ২৫ লাখ ডলার।
কলাম্বিয়ার রাজধানী বোগোটায় বিআরটি ব্যবস্থা চালু করা হয় ২০০০ সালে। ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পে ব্যয় হয় ২১ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা কিলোমিটারপ্রতি ৫৩ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের লাসভেগাসে ২০০৪ সালে চালু করা সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বিআরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ কিলোমিটার। এতে ব্যয় হয় প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ ডলার, কিলোমিটারপ্রতি যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ডলার। ব্রাজিলের সাওপাওলোয় ২০০৫ সালে ১১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি বিআরটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৩৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। কিলোমিটার হিসাবে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ লাখ ডলার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআরটি ব্যবস্থা চালুতে খুব বেশি কাজের প্রয়োজন হয় না। বিদ্যমান সড়কের দুই পাশে ডিভাইডার (সড়ক বিভাজক) দিয়ে বাসের জন্য পৃথক লেন করলেই চলে। আর বাসে ওঠানামার জন্য কিছু স্টপেজ তৈরি করতে হয়। এক্ষেত্রে ভূমি থেকে দুই-তিন ফুট উঁচুতে ছাউনির ব্যবস্থা করতে হয়। বাস স্টপেজের সামনে থামার পর সোজা হেঁটে তাতে উঠে যান যাত্রীরা। আর চলাচলের রুটের মধ্যে কোনো জংশন (মোড়) থাকলে সেখানে বিআরটির বাসকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপনের প্রয়োজন পড়ে। বাস মোড়ের কাছাকাছি আসার পর সিগন্যাল বাতি জ্বলে। এতে মোড়ে অন্যান্য যানবাহন বন্ধ করে বিআরটির বাসকে আগে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়।
জানতে চাইলে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থায় বিআরটি সবচেয়ে কম ব্যয়সম্পন্ন পদ্ধতি। খুব বেশি জটিলতা না থাকায় খুব দ্রুতই এটি চালু করা যায়। আন্তর্জাতিক মানদন্ডে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় ১০ থেকে ৩০ লাখ ডলার। তবে বাংলাদেশে এটা অনেক বেশি হচ্ছে। মূলত অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থায় বিআরটি চালু করার কারণেই ব্যয় বেশি পড়ছে।
বুয়েটের প্রতিবেদনটি আরো কিছু শহরের বিআরটির তুলনামূলক ব্যয়ের চিত্রও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০০৮ সালে ইকুয়েডরের কুইটো শহরে ৩৭ কিলোমিটার বিআরটি নির্মাণে ব্যয় হয় ২ কোটি ২২ লাখ ডলার। কিলোমিটারপ্রতি যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ডলার। এছাড়া ২০১০ সালে তাইওয়ানের তাইপে শহরে বিআরটি চালু করা হয়। ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ব্যবস্থা নির্মাণে ব্যয় হয় ২ কোটি ৮৫ লাখ ডলার বা কিলোমিটারপ্রতি ৫ লাখ ডলার।
এদিকে নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ২০১২ সালে আহমেদাবাদে ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি চালু করেন। এতে ব্যয় হয় ১৪ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রতিবেশী ভারতেও এ ব্যাবস্থা চালু করতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছে ১৯ লাখ ৩১ হাজার ডলার। আর ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে ব্রাজিলের পোর্তো অ্যালেগ্রে শহরে ৩৭ দশমিক ৪ কিলোমিটার বিআরটি চালু হয় গত ১৪ মার্চ। এটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৩ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। কিলোমিটারপ্রতি যার পরিমাণ ১০ লাখ ডলার।
জানা গেছে, বিআরটি চালু করার জন্য গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর সড়ক পর্যন্ত চার লেন বিশিষ্ট ২০ কিলোমিটার বাসের পৃথক লেন, ৩১টি স্টপেজ ও গাজীপুরে ১টি বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি কিছু সড়ক প্রশস্ত, সার্ভিস সড়ক ও গাজীপুরে ৩ কিলোমিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হবে। শুধুমাত্র এ জন্যই ব্যয় হবে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি প্রকল্পটির আওতায় ৮ লেন বিশিষ্ট টঙ্গী সেতু ও ৭টি মোড়ে ফ্লাইওভার নির্মাণেরও কথা রয়েছে। এতে ব্যয় হবে আরো ৬৪০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে প্রকল্পে ব্যয় হবে মোট ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা বা ২৬ কোটি ১৫ লাখ ডলার। সেক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়াবে ১ কোটি ৩১ লাখ ডলার।
এ ব্যাপারে গাজীপুর-বিমানবন্দর বিআরটি প্রকল্পের পরিচালক মো. আফিল উদ্দিন বলেন, প্রকল্পটির আওতায় বিআরটির পাশাপাশি কিছু সড়ক প্রশস্ত করা হবে। এছাড়া টঙ্গী ব্রিজটি নতুন করে নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যয় কিছুটা বেশি হবে। তবে এগুলো বাদ দিলে বাংলাদেশেও বিআরটি নির্মাণ ব্যয় অনেক কমে যাবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গাজীপুর-বিমানবন্দর সড়ক বিআরটির নির্মাণকাল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিকভাবে বিআরটি নির্মাণে ২৪-৩০ মাস সময় লাগে। আর গাজীপুর-বিমানবন্দর সড়ক বিআরটি নির্মাণ প্রকল্পটির মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ৪৮ মাস। তবে এটি বাস্তবায়নে অন্তত ৬০ মাস লাগতে পারে। কারণ ফ্লাইওভার ও সেতু নির্মাণ দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এছাড়া প্রকল্পটি অনুমোদনের পর প্রায় ২০ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো নকশা প্রণয়ন সম্পন্ন হয়নি। এর পর দরপত্র আহ্বান করা হবে। নির্মাণ শুরু হতে আরো কয়েক মাস লাগবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ), সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিআরডি)। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

ফ্লাইওভার
গত কয়েক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শতাধিক ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়। এগুলোর নির্মাণব্যয় কিলোমিটারপ্রতি ৮০-৯০ কোটি টাকা। কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে ব্যয় আরো কম। অথচ গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী (মেয়র হানিফ) ফ্লাইওভারের নির্মাণব্যয় কিলোমিটারপ্রতি প্রায় ২১১ কোটি টাকা। এতে ফ্লাইওভার নির্মাণব্যয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বে শীর্ষস্থান দখল করেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের ১৪ জুন মুম্বাইয়ে উদ্বোধন করা হয় ১৬ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্টার্ন ফ্রিওয়ে। এর নির্মাণব্যয় ১৯ কোটি ডলার বা ১ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়ায় ৮৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। ভারতীয় কোম্পানি সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ফ্লাইওভারটি নির্মাণ করে; যারা গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার নির্মাণে বাংলাদেশী ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচারকে সহযোগিতা করছে। আবার কলকাতায় নির্মাণাধীন ৮ দশমিক ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পরমা-পার্ক সার্কাস ফ্লাইওভারের নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছে ৩১৭ কোটি ২০ লাখ রুপি বা ৩৯২ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হচ্ছে ৪৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতার বাটানগরে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি ফ্লাইওভারও নির্মাণ করা হচ্ছে; যার কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণব্যয় ৪৪ কোটি টাকা।
এদিকে গত ২৪ এপ্রিল মালয়েশিয়ায় ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি ফ্লাইওভার উদ্বোধন করা হয়। এগুলোর কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণব্যয় ৫৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। গত বছর উদ্বোধন করা চীনের প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি এলিভেটেড রোড নির্মাণেও কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় ৪৮ কোটি টাকা।
শ্রমিকের গড় মজুরির হিসাবেও চীন, মালয়েশিয়া ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে ফ্লাইওভার নির্মাণব্যয় কম হওয়ার কথা। ২০১২ সালের ইন্টারন্যাশনাল কনস্ট্রাকশন সার্ভের তথ্যমতে, মালয়েশিয়ায় নির্মাণ শ্রমিকদের গড় মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ৫ ডলার, চীনে ৩ ও ভারতে ১ ডলার। আর বাংলাদেশে তা ৫০ সেন্টেরও কম। অথচ ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নির্মাণব্যয় কয়েক দফা বৃদ্ধির পর দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
এ প্রকল্পের জন্য ফ্লাইওভার নির্মাণব্যয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষ স্থানে রয়েছে- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই বলে মন্তব্য করেন- বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. মুজিবুর রহমান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্লাইওভার নির্মাণে গড়ব্যয় ৮০-৯০ কোটি টাকার মধ্যেই থাকে। মজুরি কম হওয়ায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ব্যয় আরো কম। ঢাকা শহরে মাটির নিচে অপরিকল্পিতভাবে পরিষেবা সংযোগ লাইন ছড়িয়ে থাকায় এক্ষেত্রে ব্যয় কিছুটা বেশি হয়। তবে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় কোনোভাবেই ১০০ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। এক্ষেত্রে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নির্মাণব্যয় অস্বাভাবিক হয়ে গেছে।
বিল্ড ওন অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার (বিওওটি) পদ্ধতিতে নির্মিত গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের ব্যয় অনেক বেশি হলেও সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত অন্যান্য ফ্লাইওভারের নির্মাণব্যয় তুলনামূলক কম। এক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ কুড়িল ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০৬ কোটি টাকা। এই  ফ্লাইওভারটি নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৯০ কোটি টাকা।
আবার প্রায় ৯০০ মিটার দীর্ঘ ছয় লেনবিশিষ্ট বনানী ওভারপাস, ৫৬১ মিটার সংযোগ ব্রিজ ও ১ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের মিরপুর-বিমানবন্দর সড়ক ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৬০ কোটি টাকা। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত এ ফ্লাইওভারের কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ১০৫ কোটি টাকা। আর রাজধানীতে চলমান ৮ দশমিক ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) অধীনে নির্মিত ফ্লাইওভারটির কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৯৪ কোটি টাকা। এছাড়া ২০০৭-০৮ সালে নির্মিত প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ তেজগাঁও ফ্লাইওভারের নির্মাণব্যয় ১০০ কোটি আর ২০০৫ সালে নির্মিত ১ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ খিলগাঁও ফ্লাইওভারের গড় ব্যয় ৭৬ কোটি টাকা।
অস্বাভাবিক নির্মাণব্যয় প্রসঙ্গে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার প্রকল্পের পরিচালক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আশিকুর রহমান বলেন, ‘কুড়িল ফ্লাইওভার বা মিরপুর-বিমানবন্দর সড়ক ফ্লাইওভারের চেয়ে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার আকারে অনেক বড়। এক্ষেত্রে গড় ব্যয় দিয়ে সব বিষয় মূল্যায়ন করা যায় না। এটি একটি ভিন্নধর্মী প্রকল্প। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’

মূলত অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থার কারণেই সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশে।

লেখক: সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply