বাংলাদেশ ও স্বাধীনতার কথা -এবনে গোলাম সামাদ

আমার বয়স অনেক হলো। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন অনেক কথাই আমার মনে পড়ে। আমি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি না হলেও রাজনীতি সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল থাকার চেষ্টা করেছি। আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল কেবলমাত্র বাংলাভাষী মুসলমানের স্বার্থরক্ষার জন্য নয়। এর ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল সাবেক পাকিস্তানের আমজনতার আর্থসামাজিক উন্নয়ন। কেবলমাত্র পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কল্যাণ সাধন নয়। শেখ মুজিব তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, ‘আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজোরিটি পার্টির নেতা।’ এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, শেখ মুজিব নিজেকে সাবেক পাকিস্তানের নেতা হিসেবে মনে করতেন। কেবলই পূর্ব পাকিস্তানের নেতা হিসেবে মনে করতেন না। তিনি নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন সাবেক নিখিল পাকিস্তানকে; কেবলমাত্র বাংলাদেশকে নয়। অনেকে বলছেন, শেখ মুজিব হলেন, আজকের বাংলাদেশের জনক। কিন্তু তিনি নিজে এ ধরনের কোনো মনোভাব পোষণ করেননি। তিনি চেয়েছেন সাবেক সমগ্র পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দিতে। শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণের অনেক রকম বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের একটি শুদ্ধ নমুনা পাওয়া যাবে ‘স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা’ নামক পুস্তিকায়। বইটি সম্পাদনা করেন, ফজলুল হক বাঙ্গালী, মেসবাহউদ্দিন ও নজরুল ইসলাম। (প্রকাশনা ও প্রচার সংস্থা, মুজিবনগর, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত (১৯৭১)।) এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল ইয়াহিয়া কর্তৃক প্রদত্ত Legal Framework Order (1970) মেনে। যাতে বলা হয়েছিল পাকিস্তান হবে একটা প্রজাতন্ত্র ও ফেডারেশন। এর রাষ্ট্রিক মতাদর্শ (Ideology) হতে হবে ইসলাম এবং এই রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী হতে পারবেন না। এই মূলনীতিসমূহের সঙ্গে কোন অসঙ্গতিপূর্ণ সংবিধান রচিত হলে প্রেসিডেন্ট (ইয়াহিয়া) পারবেন তা বাতিল করে দিতে।
১৯৭১-এর পর পরিস্থিতি নানা দিক থেকেই ভিন্ন হয়ে পড়েছে। ১৯৯৮ সালে ১১ মে ভারত রাজস্থানের মরুভূমিতে ভূগর্ভে তার নিজের তৈরি পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। কিন্তু পাকিস্তানও এ ক্ষেত্রে ভারতের চাইতে পিছিয়ে নেই। ১৯৯৮ সালের ২৮ মে বেলুচিস্তানের মরুভূমির ভূগর্ভে পাকিস্তান ঘটায় তার তৈরি পাঁচটি পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ। এরপর ঐ একই সালে আরো শক্তিশালী পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় পাকিস্তান। যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় হইচই। কারণ, পাকিস্তান একটি ধনী রাষ্ট্র নয়। পাকিস্তান বানাতে পেরেছে অতি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরমাণু বোমা। গুজব রটে পাকিস্তান খুব সস্তায় পরমাণু বোমা তৈরির কৌশল আবিষ্কার করতে পেরেছে। ভারত যা পারেনি। পাকিস্তান যদি সস্তায় পারমাণবিক বোমা তৈরি করে অন্য দেশে বিক্রি করে, তবে তার পরিণতি দাঁড়াতে পারে ভয়াবহ। কিন্তু পাকিস্তান এভাবে বোমা তৈরি করে বিদেশের কাছে বিক্রি করেনি। রেখেছে কেবল নিজের প্রতিরক্ষার জন্য সংরক্ষিত। পাকিস্তান এখন তৈরি করতে পারছে এমন রকেট, যার সাহায্যে তার পক্ষে সম্ভব ভারতের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ। সমর বিজ্ঞানের দিক থেকে পাকিস্তানকে অবহেলা করা যায় না। পরিস্থিতি পাল্টেছে ঠিকই। কিন্তু সেটা যে ভারতের জন্য অনুকূল হয়েছে, এরকম ভাববার কোনো কারণ নেই। ভারত এখন মিত্রবিহীন দেশ। কিন্তু পাকিস্তান ঠিক তা নয়। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে চীন গড়েছে নৌঘাঁটি। কাশ্মিরের কাছে চীন গড়েছে এমন সড়ক, যার মাধ্যমে সে যে কোন সময় লাদাঘ অঞ্চলে সৈন্য পাঠাতে পারে। শ্রীলঙ্কার উত্তরে জাফলা অঞ্চলেও চীন নৌঘাঁটি গড়ে তুলেছে বলে প্রকাশ। নেপালের সাথে চীনের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন হতে পেরেছে খুবই উন্নত। বেইজিং থেকে কাঠমান্ডু এখন সহজেই আসতে পারা সম্ভব। আমাদের দেশে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীর দল ভারতকে যতটা শক্তিমান ভাবছেন, ভারত আসলে সে পর্যায়ে এখনো এসে পৌঁছাতে পেরেছে বলে মনে করবার কোনো হেতু নেই। আওয়ামী লীগ যদি মনে করেই থাকে যে, বাংলাদেশে সে ক্ষমতায় চিরস্থায়ী হতে পারবে, তবে মনে হয় সে ভুল হিসাবই করছে।
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে ঠিক কী চেয়েছিলেন আমরা এখনও তা জানি না। ইন্দিরা গান্ধী একটি বই লিখেছেন My Truth নামে। বইটির বাংলা অনুবাদ করেছেন, স্কোয়াড্রন লিডার (অব:) মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম। তিনি বইটির নাম দিয়েছেন ‘আমার সত্যকথন’। এই বইতে ইন্দিরা গান্ধী শেখ মুজিবুর রহমানের মূল্যায়ন করেছেন এইভাবে : ‘তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত ভাবপ্রবণ, উষ্ণ হৃদয়ের লোক, যিনি একজন আইনপ্রণেতার চেয়ে পিতৃসুলভ ব্যক্তিত্বের বেশি অধিকারী ছিলেন। উপরন্তু তিনি সংগ্রামের বেশির ভাগ সময় দূরে অবস্থান করেছিলেন। আমি বলতে চাচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধ, নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় তার চিন্তাধারা, জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে স্বতন্ত্র ছিল, যারা এ সকল বিষয়ে অংশ নিয়েছিলেন।
আমি মনে করি না যে তিনি তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা তাঁর প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন। তাই তাঁরা যা কিছু করেছিলেন, তাঁর (মুজিব) নামে ও তাঁর জন্য করেছিলেন। কিন্তু তিনি এ সকল লোকদের গুরুত্ব দেননি, বরঞ্চ তাদের গুরুত্ব দিয়েছিলেন, যারা তাঁর বিরুদ্ধে ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল। এতে একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি অবশ্যম্ভাবী ছিল।’
এখন আওয়ামী লীগ দাবি করছে, শেখ মুজিব ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে ৬ নভেম্বর নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতা প্রদান করেন। এতে তিনি বলেন- তিনি যতদূর জানেন, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি। তিনি চাচ্ছেন, পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান। শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপায়ের পথ এখনও রুদ্ধ হয়ে যায়নি। তিনি তার সেই বক্তৃতায় আরো বলেন যে, শেখ মুজিব হলেন একজন মধ্যপন্থী নেতা। তিনি কোন বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্দীপ্ত নন। শেখ মুজিব একজন মার্কিনবিরোধী মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তিও নন। আসলে একসময় তার বিরুদ্ধে প্রচারণা ছিল যে, তিনি মার্কিন ঘেঁষা নেতা। ইন্দিরা গান্ধীর নিজের কথায়- And he is not an extremist, he was a moderate person. In fact, if I may use the term, he used to be called by some others an American stooge at one time। ইন্দিরা গান্ধী তার এই বক্তৃতায় আরো বলেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি উঠেছে শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর। তার আগে নয়। শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর বাংলাদেশে ঘটেছে বিরাট গণহত্যা। বাংলাদেশে মানুষ তাই ভাবতে শুরু করে স্বাধীন হওয়ার কথা। ইন্দিরা গান্ধীর নিজের কথা-……the cry for independence arose after Sheikh Mujib was arrested and not before. He himself, so far as know, has not asked far independence, even now. but after he was arrested, after there was this tremendous massacre, it people should say: ` after this how can we live together? we have to be separate.’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, হাজার বছরের বাঙালির কথা। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর উপরোক্ত কথা যথার্থ হলে বলতে হবে শেখ মুজিব ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা কামনা করেননি। শর্মিলা বসু তার ডেড রেকনিং বইতে বলেছেন- ইন্দিরা গান্ধী সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে যা বলেছিলেন, সেটা ছিল একটা ধাপ্পা। কারণ তিনি নিজে নিচ্ছিলেন বাংলাদেশকে স্বাধীন করার নামে পাকিস্তানকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে বিরাট যুদ্ধের প্রস্তুতি। কিন্তু ধাপ্পা হলেও ইন্দিরা গান্ধী যা বলেছেন, তা থেকে প্রমাণিত হয় না, শেখ মুজিব চাচ্ছিলেন পৃথক স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে। শেখ মুজিবের লক্ষ্য নিয়ে তার মনেও ছিল সংশয়। ইন্দিরা গান্ধীর এই বক্তৃতাটি পাওয়া যাবে India Speaks নামক বইতে। বইটি ভারত সরকারের প্রচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭১-এর ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে প্রচার করা হচ্ছে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা। আর বলা হচ্ছে শেখ মুজিব ছিলেন, এই জাতীয়তাবাদের জনক। যার ভিত্তিতে বর্তমান বাংলাদেশের উদ্ভব সম্ভব হতে পেরেছে। কিন্তু ১৯৭১-এর দলিল দস্তাবেজ আমরা যা হাতের কাছে পাচ্ছি, তা সমর্থন করছে না আওয়ামী লীগের দাবিকে। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহ্যাস তার বহুল পঠিত ‘বাংলাদেশ এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইতে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বলেন যে, তিনি পাকিস্তান ভেঙে দিতে যাচ্ছেন না, তিনি চাচ্ছেন বর্তমান পাকিস্তানের সাথে একটা বিশেষ ধরনের সম্পর্ক (Link) বজায় রাখতে। সাংবাদিক মাসকারেনহ্যাসের এই কথার প্রতিবাদ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ করেছে বলে আমার মনে হয় না।
ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে তার দুইজন উপদেষ্টার ওপর খুব নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। এদের মধ্যে একজন হলেন দুর্গাপ্রসাদ দার (ধর); আর একজন হলেন পি এন হাক্সার। এরা উভয়েই ছিলেন জন্মসূত্রে কাশ্মিরের লোক। আর এরা উভয়েই ছিলেন ছাত্রজীবন থেকেই মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট। এদের দু’জনের প্রচেষ্টাতেই সম্ভব হতে পেরেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারতের ২৫ বছরের শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট। তাই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল কলকাতায় গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। তিনিও ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর খুবই আপন লোক। ইন্দিরা গান্ধী হয়তো ভেবেছিলেন শেখ মুজিব পাকিস্তান থেকে আর কখনই ফিরবেন না। তার প্রাণদণ্ড হবে। এর ফলে তিনি তাজউদ্দীন আহমদ ও তার দলের লোকদের সহায়তায় করে চলতে পারবেন বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। জুলফিকার আলী ভুট্টু জেল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন শেখ মুজিবকে। ফিরে আসতে সুযোগ করে দিয়েছিলেন তাঁকে বাংলাদেশে আসবার জন্য; যাতে বাংলাদেশে তাজউদ্দীন আহমদ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে। শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি। তিনি পাকিস্তান থেকে ৮ জানুয়ারি পিআইএর একটি বিশেষ বিমানে করে যান লন্ডনে। সেখানে যেয়ে দেখা করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্থ হিথের সঙ্গে। লন্ডন থেকে তিনি ১০ জানুয়ারি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি বিমানে করে আসেন নায়াদিল্লি। দেখা করেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। তারপর ঐ একই ব্রিটিশ বিমানে করে যাত্রা করেন ঢাকায়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আপত্তি তুলেছিল। বলেছিল, ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর বিমানে করে ঢাকা যাওয়া ঠিক হবে না। কেননা, গ্রেট ব্রিটেন তখনও বাংলাদেশকে একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেনি। কিন্তু শেখ মুজিব তাদের আপত্তিকে পাশ কাটিয়ে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর বিমানে করেই এসে পৌঁছান ঢাকায়। কেন তিনি এরকম করার প্রয়োজনীয়তা দেখেছিলেন, সেটা এখনও জানা যায়নি। গ্রেট ব্রিটেন বাংলাদেশকে একটা পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে। শেখ মুজিব সরাসরি পাকিস্তান থেকে নয়াদিল্লিতে না আসায়, ভারতে সৃষ্টি হতে পেরেছিল দারুণ প্রতিক্রিয়া। এ সময় আমি ছিলাম কলকাতায়। কলকাতায় ট্রামে বাসে লোককে বলতে শুনেছিলাম, শেখ মুজিবুর রহমানকে ইন্দিরা গান্ধীর অতটা বিশ্বাস করা উচিত হয়নি। এ রকম কথাও কথা অনেককে বলতে শুনেছিলাম যে, ইন্দিরা গান্ধীর পিতা জওহরলাল নেহেরু সৃষ্টি করেছিলেন একটি পাকিস্তান, তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী সেই একটি পাকিস্তানকে খন্ডিত করে সৃষ্টি করলেন দুটি পাকিস্তান। যার ফলে ভারতে পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়েই পড়ল।
বাংলাদেশ হওয়ার পর শেখ মুজিব চান বর্তমান পাকিস্তানের সঙ্গে কোন বিবাদ-বিসম্বাদে না জড়াতে। ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান, ইরান এবং তুরস্ক বাংলাদেশকে একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। শেখ মুজিব এর পরপর যান লাহোরে। সেখানে তিনি যোগ দেন ওআইসি সম্মেলনে। এবং বাংলাদেশকে করেন ওআইসির সদস্য। শেখ মুজিব কেবল বিশুদ্ধ বাঙালি হতে চাননি। তাঁর মধ্যে কাজ করেছে একটা মুসলিম উম্মাহ চেতনা। তিনি চাননি বাংলাদেশকে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ থেকে বিযুক্ত করে রাখতে। এরপর ১৯৭৪ সালে ২৭ জুন জুলফিকার আলী ভুট্টু ঢাকায় আসেন শেখ মুজিবের আমন্ত্রণে। জেড এ ভুট্টু ঢাকায় ছিলেন তিন দিন। এ সময় মুজিব ও ভুট্টুর মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্বন্ধ নিয়ে হয়েছিল হৃদ্যতাপূর্ণ আলোচনা। শেখ মুজিবকে জুলফিকার আলী ভুট্টু আমন্ত্রণ করেছিলেন পাকিস্তানে যেতে। শেখ মুজিব গ্রহণ করেছিলেন সেই আমন্ত্রণ। বর্তমানে পাকিস্তানের অধিবাসীরাও চাচ্ছেন না বাংলাদেশের সঙ্গে বিবাদ বিসম্বাদ। বর্তমানে পাকিস্তানে এখনো বাস করছেন প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষ ও তাদের বংশধর। পাকিস্তান চাচ্ছে না এদের বাংলাদেশে জোর করে পাঠিয়ে দিতে। বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ চাচ্ছে পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করে রাজনীতি করতে। কিন্তু শেখ মুজিব সেটা চাননি। বর্তমান আওয়ামী লীগ আর সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিব প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগকে এক করে দেখা যায় না।
অন্য দিকে আর একটি কথা ভুলে গেল চলে না যে, সারা ব্রিটিশ-ভারতে মোট মুসলমানের সংখ্যার শতকরা ৩৩ ভাগ ছিলেন বাঙালি মুসলমান। আসলে তারা চেয়েছিলেন বলেই সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকায়। ১৯৪০ সালে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভায় পাকিস্তানের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন আবুল কাশেম ফজলুল হক। আজ কথায় কথায় বলা হয় পাকিস্তান আমাদের ওপর চেপে বসেছিল। কিন্তু ইতিহাসে এর সমর্থন মেলে না।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply