বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের কৃষি শিক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান

মুহাম্মদ বায়েজিদ হক রনি

ময়মনসিংহ শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত প্রকৃতি কন্যা খ্যাত বাংলাদেশের কৃষি শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। কৃষি ক্ষেত্রে শুধুমাত্র জ্ঞান বিতরণ নয়, নতুন নতুন জ্ঞান তৈরির মাধ্যমে বাকৃবি এদেশের কৃষিতে অসামান্য অবদান রেখে যাচ্ছে।
১৯৫৯ সালে জাতীয় শিক্ষা কমিশন এবং খাদ্য ও কৃষি কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় ১৯৬১ সালের ৮ জুন এবং এর অধ্যাদেশ জারি হয় ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্টে। ২ সেপ্টেম্বর প্রথম উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. এম ওসমান গণি দায়িত্ব পান এবং ময়মনসিংহের ভেটেরিনারি কলেজ নামে শুরু হয় কৃষি শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম।
চিরসবুজে ঘেরা গ্রামীণ পরিমণ্ডলে ১,২০০ একর জমি  নিয়ে গড়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ৬টি অনুষদ ভবন, প্রশাসন ভবন, ছাত্রদের ৯টি এবং ছাত্রীদের ৩টি আবাসিক হল। এ ছাড়াও রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে গবেষণা খামার, সমৃদ্ধ বোটানিক্যাল গার্ডেন, ফলের জাত উন্নয়নের জন্য জার্ম প্লাজম সেন্টার, দেশের একমাত্র কৃষি জাদুঘর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র উদ্ভিদের রোগ নির্ণয়ের ক্লিনিক এবং মাৎস্য জাদুঘর, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ কেন্দ্র (বাউএক), সিড প্যাথলজি, কেন্দ্রীয় গবেষণাগার, বায়োটেকনোলজি ল্যাব, ভেটেরিনারি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন কৃষি সম্পর্কিত সুবিধা সংবলিত স্থাপনা। এছাড়াও দেশের কৃষি সম্পর্কিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এ সবুজ ক্যাম্পাসেই অবস্থিত।
১৯৬১ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকার্যক্রম শুরু করেছিল ভেটেরিনারি ও কৃষি অনুষদ দিয়ে। ২৩টি শিক্ষা বিভাগে তখন মাত্র ৩০ জন শিক্ষক ছিলেন। মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৪৪৪ জন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কয়েক মাস পর ১৯৬২ সালে পশুপালন অনুষদ নামে তৃতীয় একটি অনুষদ যুক্ত হয়। এরপর  ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, ১৯৬৪-৬৫ শিক্ষাবর্ষে কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদ এবং ১৯৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ছয়টি অনুষদের আওতায় ৪৩টি বিভাগে মোট ৫৩৩ জন শিক্ষক রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে স্নাতক পর্যায়ে ৩,২৮৮ জন, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ১,৩০১ জন এবং পিএইচডি পর্যায়ে ২৮৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। এযাবৎ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৩,২৭০ জন স্নাতক, ১২,৭৮৪ জন স্নাতকোত্তর এবং ৩৫৫ জন পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন (৩১ ডিসেম্বর ২০১০ অনুযায়ী)। উল্লেখ্য, জামালপুর জেলার মেলান্দহে অবস্থিত শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মাৎস্যবিজ্ঞান কলেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধিভুক্ত। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নোবেল বিজয়ী কৃষিবিজ্ঞানী ড. নরম্যান ই. বোরগলকে সম্মানসূচক ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আসন সংখ্যা ১০০০টি (৫৪টি সংরক্ষিতসহ)। অনুষদভিত্তিক আসন সংখ্যা : ভেটেরিনারি অনুষদ-১৫০, কৃষি অনুষদ-৩১৮, পশুপালন অনুষদ-১৫০, কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ-১০৫, কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদ-১১৮, এগ্রি. ইঞ্জি.-৭৮; ফুড ইঞ্জি.-৪০, মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ-১০৫। সংরক্ষিত আসন সংখ্যা : মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-৪৮, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপজাতীয়/অ-উপজাতীয় প্রার্থী-৩, বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার উপজাতীয় প্রার্থী-৩।
জ্ঞান বিতরণের পাশাপাশি বাকৃবিতে চলে জ্ঞান বিতরণের কাজ। কৃষি গবেষণায় বাকৃবি দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির পাশাপাশি উন্নত কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম (বাউরেস) তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন দেশী ও বিদেশী গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হয়েছে ফল-ফসলের জাতসহ নিত্য-নতুন কৃষি প্রযুক্তি। শস্যবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে- অধিক ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন; বিভিন্ন ফলের জাত উদ্ভাবন; শস্য ক্ষেতে সহজে রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি; বোরো মৌসুমে কম পানি ব্যবহার করে বোরো ধান উৎপাদনের কলাকৌশল, বীজ শোধন যন্ত্র। পশুসম্পদ বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির মধ্যে মোরগ-মুরগির রানীক্ষেত রোগ, হাঁসের প্লেগ ভ্যাকসিন, কৃত্রিম পশুপ্রজনন প্রযুক্তি, কোয়েলের উচ্চ উৎপাদনশীল জাত, সয়াদুধ ইত্যাদি। নতুন নতুন কৃষি প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে স্বল্প ব্যয়ে সেচ নালা তৈরি, বাকৃবি জিয়া সার-বীজ ছিটানো যন্ত্র, সোলার ড্রায়ার, স্বল্প ব্যয়ে হস্তচালিত ধান কাটার মেশিন, পাতা দেখে উদ্ভিদের রোগ নির্ণয়ের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং। মাছের কৃত্রিম প্রজননসহ ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষপদ্ধতি, ইলিশ মাছ আহরণের পর মানসম্মত উপায়ে বরফজাতকরণ, স্বল্প খরচে মাছ সংরক্ষণে বরফ বাক্স, মাছের প্রাকৃতিক খাবার পেরিফাইটন, এলোজাইম মার্কার ব্যবহার করে পিতামাতার সাথে ক্রস কৈ মাছের কৌলিতাত্ত্বিক পার্থক্য নিরূপণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। যা বর্তমানে দেশের মাঠপর্যায়ের কৃষকরা ব্যবহার করে অধিক ফসল উৎপাদন করে দেশকে খাদ্য নিরাপত্তার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি তথ্য :
ভর্তি পরীক্ষা মোট ৩০০ নম্বরে হয়ে থাকে। এর মধ্যে ২০০ নম্বর এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ধারণ করা হয়। এতে এসএসসি পরীক্ষায় চর্তুথ বিষয় বাদ দিয়ে প্রাপ্ত জিপিএ এর ১৬ গুণ অর্থাৎ ৮০ নম্বর এবং এইচএসসি পরীক্ষার চর্তুথ বিষয় বাদ দিয়ে প্রাপ্ত জিপিএ এর ২৪ গুণ অর্থাৎ ১২০ নম্বর নিয়ে মোট ২০০ নম্বর নির্ধারণ করা হয়। আর ভর্তি পরীক্ষায় পদার্থ, রসায়ন, জীবজ্ঞিান ও গণিত বিষয় থেকে ২৫টি করে মোট  ১০০টি এমসিকিউ প্রশ্ন করা হয়।
আবেদনকারীদের মধ্য থেকে আসনসংখ্যার সর্বোচ্চ ১০ গুণ প্রার্থীকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হবে।
অনুষদভিত্তিক চাকরির ক্ষেত্র : বাকৃবির গ্র্যাজুয়েটদের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি নতুন কৃষিভিত্তিক ও অন্যান্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ রয়েছে। এখান থেকে পাস করে বিসিএস প্রশাসনিক কর্মকর্তা তথা এ এস পি, ম্যাজিস্ট্রেটসহ অন্যান্য ক্যাডারেও চাকরির সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সকল প্রকার সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকে চাকরির সুযোগ রয়েছে। বাকৃবির বিশেষ চাকরির ক্ষেত্রওগুলো নিম্নরূপ :
ভেটেরিনারি : BCS (ভেটিরিনারি সার্জন,  বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, প্রভাষক পদে), গবেষণা প্রতিষ্ঠান (LRI, BLRI,FAO,WHO,ICDDRB), বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রে  MS, PHD, Post doc Fellow  করার রয়েছে অনন্য সুযোগ। বাংলাদেশ  সেনাবাহিনীতে সরাসরি লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করতে পারেন।
পোলট্রি ফার্ম : আফতাব পোলট্রি ফার্ম, কাজী পোলট্রি ফার্ম, Lions, CLP, BKSP, BRAC, TMSS,  Bengal meat, Corporate job (Marketing officer, Technical support office  eg-ACI), বিভিন্ন  ডেইরি ফার্ম, Pharmaceutical Industries Ltd (NAVANA, ACME,  NOVERTIS)চিড়িয়াখানা।
কৃষি : BCS (উপজেলা কৃষি অফিসার), BRRI, BARI, BARC, BADC, BINA, SRDI,, পাট গবেষণা কেন্দ্র, তুলা গবেষণা কেন্দ্র, ডাল গবেষণা কেন্দ্র, ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র, চা গবেষণা কেন্দ্র, NGO (ASA, PROSHIKA, BRAC, Different seed company etc), Pharmaceutical Ind. (ACI, ACME etc.) Pesticide & fertilizer industries, Different Agricultural Bank.
পশুপালন : BCS (Livestock), BLRI, Progeny Testing, Milk vita, Aftab poultry farm ltd. CP Bangladesh ltd.(Thailand), Kazi farm ltd. New hopes ltd. Index farm ltd. Youth development, CLP(Char Livestock Project), RDRS (Rangpur Dinajpur Rural Service), BRAC, Grameen Bank and other livestock farm ltd.
কৃষি অর্থনীতি :BRRI, BINA, BARD, BARI, PDB, BLRI, BRDB
Different NGO & Private sector (national & multinational company)
Different Bank
কৃষি প্রকৌশল : BRRI, BINA, BARI, BADC, বরেন্দ্র প্রকল্প, পানিবিদ্যু DAE, IRRI, RDA, ACI পানি উন্নয়ন বোর্ড, নদী গবেষণা, পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড।
মাৎস্যবিজ্ঞান : BCS (উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা), BFRI, BFDC, DOF.
Hatachery, NGO (BRAC, GB, ASA, PROSHIKA, DANIDA, CARE, CARITUS, World Fish Centre etc.)
Feed company (Aftab feed company, Soudi-Bangla feed company etc)
Pharmaceutical Ind.( NAVANA, ACI, NOVATIS etc)
ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং : প্রাণ-আরএফএল, কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও সকলপ্রকার খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি : বাকৃবিতে বর্তমানে সক্রিয় ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট। বর্তমানে ছাত্রশিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে আস্থা অর্জনের পাশাপাশি ক্যাম্পাস ও এর আশপাশ এলাকাগুলোয় শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply