বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আশা বনাম বাস্তবতা

জালাল উদ্দিন ওমর

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বহুল প্রত্যাশিত বাংলাদেশ সফর সমাপ্ত হয়েছে। বাংলাদেশের সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক উন্নয়নের ঘোষণা দিয়ে তিনি সেপ্টেম্বরের ৬-৭ তারিখ বাংলাদেশ সফর করেছেন। এর আগে গত ২৪ শে জুলাই ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের প্রধান ও ভারতীয় রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক সোনিয়া গান্ধী বাংলাদেশ সফর করেন। গত ২০১০ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পর থেকেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছিল। তার এই সফরকে ঘিরে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে অতি মাত্রায় তৎপরতা ছিল। কিন্তু তার এই সফরে যা হওয়ার আশা ছিল, বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। ভারত সরকার তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে কোন চুক্তি করেনি। একইভাবে ফেনী নদীর পানিবণ্টন নিয়েও কোন চুক্তি হয়নি। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ট্রানজিট এবং বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতকে সম্মতি দেয়নি। একইভাবে ভারত থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয়ের বিষয়েও কোন চুক্তি হয়নি। তার মানে বহুল আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিসমূহ স্বাক্ষরিত হয়নি। অথচ এই সব চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য দেশ দু’টি দীর্ঘদিন থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিল। তবে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি, প্রটোকল ও আটটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। চুক্তিটি হচ্ছে আঞ্চলিক সহযোগিতার রূপরেখা। স্থলসীমা নিয়ে স্বাক্ষরিত হয় প্রটোকল। আর স্বাক্ষরিত সমঝোতাসমূহ হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত-নেপালের মধ্যে স্থলবন্দর ব্যবহারের সমঝোতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা, সুন্দরবন সুরক্ষা, মৎস্য উৎপাদন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষা বিনিময়, কলকাতার দূরদর্শন ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের মধ্যে সহযোগিতা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজি ও ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজির মধ্যে সহযোগিতা। এদিকে ভারত তিনবিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার এবং বাংলাদেশের ৪৬টি গার্মেন্টস পণ্য বিনাশুল্কে ভারতে প্রবেশাধিকারের ঘোষণা দেন। আর ট্রানজিট এবং তিস্তা নিয়ে চুক্তি না হলেও অদূর ভবিষ্যতে সেগুলো সম্পন্ন হবে বলে দুই দেশের নেতারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এই হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবস্থা, যা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এখন বিশ্লেষণে ব্যস্ত। আর রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একজন গবেষক ও বিশ্লেষক হিসেবে আমিও বাস্তবতার আলোকে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের মাত্রা ও এর গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে একটি বিশ্লেষণ করব।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে সত্য কথাটা বলতে হলে এর কিছু ইতিহাসও জানতে হবে। ১৯৪৭ সালে ভারত এবং পাকিস্তান নামে দু’টি দেশ ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। আর বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলো নিয়ে ভারত এবং মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাসমুহ নিয়ে পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়। আর বাংলাদেশ অঞ্চলটি মুসলিমপ্রধান হওয়ার কারণে সাত সমুদ্র তের নদী দূরে হওয়া সত্ত্বেও তা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুতরাং ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক জানতে হলে তা ১৯৪৭ সাল থেকেই জানতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত ও পাকিস্তান বৈরী প্রতিপক্ষ। আর পাকিস্তানের অংশ থাকার কারণে ১৯৪৭ সালের পর থেকেই বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রতিও ভারতের আচরণ ছিল বৈরী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সহযোগিতা করে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার কারণে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হবার ফলে রাজনৈতিক যে পটপরিবর্তন হয়, তাতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেরও দিক পরিবর্তন হয়। বঙ্গবন্ধুর জীবিত দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহেনাকে ভারত আশ্রয় দেয়। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল দীর্ঘ ২১ বছর আওয়ামী ক্ষমতার বাইরে ছিল। এই ২১ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ছিল শীতল পর্যায়ে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন গতি লাভ করে। ক্ষমতায় এসেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেন এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়ার সাথে আলোচনায় বসেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি সম্পাদিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের অঙ্গরাজ্য আসামের স্বাধীনতাকামী সংগঠন উলফার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে গ্রেফতার করা হয় এবং তিনি এখনো বাংলাদেশের কারাগারে বন্দী। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আবার শীতল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ২০০৮ এর ২৯ শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আবারো গরম হয়ে ওঠে। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ভারতকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট প্রদান এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সম্মতির কথা ঘোষণা করে। ভারত বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে একশ কোটি টাকা ঋণ প্রদানের কথা ঘোষণা করে। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির কথাও ঘোষণা করে বাংলাদেশ। উলফা প্রধান অরবিন্দ রাজখোয়াসহ উলফার কয়েকজন শীর্ষনেতাকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে গ্রেফতার করে এবং ভারতের হাতে তুলে দেয়। এতে ভারত বেশ খুশি হয়। বাংলাদেশ ভারতকে স্বল্পকালীন ট্রানজিট দেয় এবং ভারত আখাউড়া দিয়ে ত্রিপুরায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য মালামাল পরিবহন শুরু করে। ভারত এবং বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের নেতারা উভয় দেশের মধ্যে সফর বৃদ্ধি করেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ফিরতি সফরে বাংলাদেশে আসেন। আর এই সফরে বহুল আলোচিত ট্রানজিট এবং তিস্তার পানি নিয়ে চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। কারণ ভারত তিস্তার পানি নিয়ে চুক্তি করেনি। ফলে বাংলাদেশও ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যতটুকু বরফ গলার কথা ততটুকু গলেনি। আর এই সম্পর্ক নিয়ে আবারো সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের মাত্রা বেড়েছে।
ভারত হচ্ছে বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী। বলতে গেলে ভারত প্রায় চারদিক দিয়েই বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রয়োজন। কিন্তু এই দুই দেশের মধ্যে অনেক সমস্যা রয়েছে। আর এসব সমস্যা সমাধান না হওয়ায় সম্পর্কটাও ভালো হচ্ছে না। ফলে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। সমস্যাগুলো হচ্ছেÑ সীমান্ত সমস্যা, ছিটমহল সমস্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সমস্যা, ট্রানজিট সমস্যা ইত্যাদি। প্রথমেই সীমান্ত সমস্যাটি আলোচনা করছি। বাংলাদেশের সাথে ভারতের ৪০৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। মূলতপক্ষে ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টির সময় থেকেই ভারতের সাথে সীমান্ত সমস্যা রয়েছে। এই সীমান্ত জুড়ে প্রহরারত ভারতীয় বিএসএফ প্রায়ই নিরীহ বাংলাদেশীকে পাখির মত গুলি করে হত্যা করছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে সীমান্তে মানুষ হত্যা বন্ধের জন্য বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত তা আমলে নেয়নি। বাংলাদেশের দাবির প্রেক্ষিতে ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা বন্ধে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। আর এটা কিন্তু বন্ধুত্ব এবং সুসম্পর্কের লক্ষণ নয়। সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ কর্তৃক নিরবচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশী মানুষদেরকে হত্যা করার বিষয়টি এদেশের মানুষ কখনই ভালভাবে গ্রহণ করেনি। আর এটা বাংলাদেশীদের মনে ভারতবিরোধী মনোভাবকে চাঙ্গা করছে। ইতঃপূর্বে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ দক্ষিণ বেরুবাড়ি ভারতের কাছে হস্তান্তর করে। বিনিময়ে দহগ্রাম আঙ্গরপোতায় বাংলাদেশের অবাধে যাতায়াতের জন্য তিনবিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকার কথা ছিল। কিন্তু ভারত প্রথমে ৬ ঘণ্টা এবং পরবর্তীতে ১২ ঘণ্টা এই করিডোর বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে দেয়। অবশেষে মনমোহন সিংয়ের এবারের সফরে ভারত তিনবিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার ঘোষণা দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের এই সুযোগ আরো অনেক আগে থেকে পাওয়ার অধিকার ছিল। যদিও ভারত দীর্ঘদিন পর তিনবিঘা করিডোর বাংলাদেশকে ২৪ ঘণ্টা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে তবু এটা আমরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। এ দিকে ছিটমহল ইস্যুটি দীর্ঘদিন থেকেই দুই দেশের মাঝে অমীমাংসিত একটি বিষয়। বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের মোট ১১১টি ছিটমহল রয়েছে যার আয়তন ১৭১৬০ একর। অপর দিকে ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল রয়েছে যার আয়তন ৭১১০ একর। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ভারতীয় ছিটমহলগুলোতে ৩৪ হাজার এবং বাংলাদেশের ছিটমহলগুলোতে মোট ১৭ হাজার মানুষ বসবাস করে। এসব ছিটমহলগুলোর অধিবাসীরা মূলতপক্ষে নিজদেশে পরবাসীর মতই জীবনযাপন করে। এবার দুই দেশের মধ্যে প্রটোকল স্বাক্ষরের ফলে ছিটমহলসমূহ বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা আশা করব এবার ছিটমহলসমূহ বিনিময় হবে এবং এ সমস্যার সমাধান হবে। সুতরাং এ বিষয়টিকেও আমরা ইতিবাচক অগ্রগতি হিসাবেই দেখছি। ছিটমহলের পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের অপদখলীয় ভূমি রয়েছে ৩০২৪ একর। অপর দিকে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের অপদখলীয় ভূমির পরিমাণ হচ্ছে ৩৫০৬ একর। এসবের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দৈখাতা, লাঠিটিলা ও বেলুনিয়া অঞ্চলের ৬.৫০ কিলোমিটার সীমানা অচিহ্নিত অবস্থায় আছে। এবারের প্রটোকল স্বাক্ষরের পর অপদখলীয় ভূমি এবং অচিহ্নিত সীমানার স্থায়ী একটি সমাধান হবার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটাকেও আমরা ইতিবাচক হিসাবে দেখছি। সীমান্ত সমস্যার পাশাপাশি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন উভয় দেশের মাঝে বিরাট একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন ৫৪টি নদী রয়েছে যেগুলো ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশেই প্রবাহিত। সুতরাং এই নদীসমূহের ওপর ভারত এবং বাংলাদেশের অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু ভারতের ঢালুতে অবস্থিত সেহেতু ভারত হয়েই এই নদীগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কিন্তু ভারত এই নদীগুলোর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার কারণে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশ এখন পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৪ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালুর কারণে পদ্মায় এখন ধু ধু বালুচর। শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারত পানি নিয়ন্ত্রণ করার কারণে পদ্মা নদীর বুকে কেবল চর আর চর জেগে ওঠে। অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দেয়ার কারণে সেই পানিতে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সাথে বাংলাদেশের তৎকালীন ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ভারত কখনোই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে পানি দেয়নি। ফলে ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের জন্য আজ মহা এক অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। এদিকে ফারাক্কা বাঁধের পর ভারত এবার বরাক নদীর টিপাইমুখ নামক স্থানে বাঁধ নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই বাঁধটি কার্যকর হলে তার প্রভাবে বিস্তীর্ণ সিলেট অঞ্চল পানির অভাবে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। এ দিকে তিস্তা নদীতেও একই অবস্থা চলছে। তিস্তা নদীর ভারতীয় অংশে ভারত একাধিক স্থানে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ফলে দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশ তিস্তার পানি পাচ্ছে না। শুষ্ক মৌসুমে ভারত কর্তৃক পানি আটকিয়ে রাখার কারণে তিস্তায় কেবল ধু ধু বালুচর। অপর দিকে ভারত কর্তৃক পানি ছেড়ে দেবার কারষে বর্ষা মৌসুমে তিস্তার পানিতে সৃষ্ট বন্যায় তলিয়ে যায় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এভাবে আমাদের উজানে অবস্থিত হবার সুযোগে ভারত অভিন্ন নদীর পানিকে ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে বাংলাদেশ তার ন্যায্য পরিমাণ পানি থেকেই বরাবরই বঞ্চিত হচ্ছে। এই ইস্যুটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারতবিরোধী মনোভাবকে জাগিয়ে তুলছে। আর অভিন্ন নদীর পানির সুষম বণ্টনে ভারতের অনীহা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে বিরাট এক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড দিয়ে ভারতের ট্রানজিট চাওয়া এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের আবেদন দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন আরেকটি জটিলতা সৃষ্টি করেছে। মূলতপক্ষে ভারত দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট চাচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত সাতটি রাজ্যে সহজে মালামাল পরিবহন করা। কিন্তু ভারত যেটা চাচ্ছে সেটা কোন ট্রানজিট নয় বরং এটা হচ্ছে করিডোর। কারণ এক্ষেত্রে ভারত থেকে যাত্রা শুরু হয়ে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আবার ভারতে ঢুকবে। এরশাদ এবং বিএনপি সরকার ভারতকে এই করিডোর সুবিধা না দিলেও  আওয়ামী লীগ সরকার বরাবরই ভারতকে করিডোর সুবিধা দিতে আগ্রহী। আর এই করিডোর সুবিধা জন্য ভারত কেন এত আগ্রহী তা বুঝানোর জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ভারতের কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আগরতলায় যেতে মাত্র ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। অপরদিকে ভারতের আসাম হয়ে কলকাতা থেকে আগরতলায় যেতে প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। ফলে সময় লাগে বেশি, পরিবহন খরচ পড়ে বেশি। আর এতে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু ভারতের সুবিধার জন্য বাংলাদেশ কিছুতেই ভারতকে করিডোর সুবিধা দিতে পারে না। কারণ এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা বিঘিœত হবে। ভারত যে ধরনের ট্রানজিট সুবিধা চাচ্ছে, তা পৃথিবীর কোন দেশে চালু নেই। বাংলাদেশের মত ছোট একটি দেশের ওপর দিয়ে ভারত যদি একাধিক রুটে চলাচল শুরু করে, তখন স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। একইভাবে চট্টগ্রাম এবং মংলা বন্দর ব্যবহারের অধিকারও ভারতকে দেয়া যাবে না। ভারত নিশ্চয়ই তার ভূখণ্ড দিয়ে বাংলাদেশ বা অন্য কোন দেশকে পাকিস্তান এবং চীনে যেতে দেবে না। একইভাবে ভারত তার কোন বন্দরও অন্য কোন দেশকে ব্যবহার করতে দেবে না এবং পৃথিবীর কোন দেশ আজ পর্যন্ত দেয়নি। কারণ এতে দেশের নিরাপত্তা বিনষ্ট হয়। আর নিরাপত্তা না থাকলে উন্নয়নও থাকে না, তখন সবকিছুই ছিনতাই হয়ে যায়। এদিকে ট্রানজিটের নামে ভারতকে করিডোর দিলে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা দুর্বল হবার পাশাপাশি বাংলাদেশের রফতানি বাজারেও ধস নামবে। বর্তমানে ভারতের সেভেন সিস্টারে বাংলাদেশী পণ্যের বিরাট একটি বাজার রয়েছে। করিডোর চালু হলে এইসব রাজ্যে বাংলাদেশী পণ্য রফতানি বন্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং কোন অবস্থাতেই ভারতকে ট্রানজিটের নামে করিডোর দেয়া যাবে না। এদিকে মনমোহন সিংয়ের এবারের সফরে ভারতকে ট্রানজিট এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য চুক্তি হবার কথা থাকলেও ভারত তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি না করার কারণে বাংলাদেশ তা করেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমি এ জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এখন বলা হচ্ছে ভারত তিস্তা চুক্তি না করায় বাংলাদেশ ট্রানজিট চুক্তি করেনি। কিন্তু আমি মনে করি এখানে আমাদের বুঝার বিরাট একটি ভুল আছে। সেটা হচ্ছে তিস্তা চুক্তির সাথে ট্রানজিট চুক্তি সম্পৃক্ত হবে কেন? যারা এই দুটোকে এক করছে তারা হয় বোকা, না হয় ষড়যন্ত্রকারী। কারণ তিস্তা হচ্ছে ভারত এবং বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত অভিন্ন একটি নদী। এই নদীর পানির ওপর ভারতের যেমন অধিকার আছে, বাংলাদেশেরও তেমনি অধিকার আছে। সুতরাং তিস্তার পানি আমাদের ন্যায্য অধিকার। আন্তর্জাতিক নদী আইনানুসারে এটা আমাদের আইনগত অধিকার। সুতরাং এটা আমাদের বৈধ অধিকার। সুতরাং তিস্তার পানি থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করে ভারত অন্যায় করেছে এবং বাংলাদেশকে তিস্তার পানি দিতে ভারত বাধ্য। অপর দিকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড, রাস্তাঘাট, বন্দর সবই আমাদের নিজস্ব সম্পত্তি। এগুলোর ওপর ভারতের কোন অধিকার নেই। একইভাবে অন্য কোন দেশেরও কোন অধিকার নেই। সুতরাং তিস্তার পানি দিলেও, আমরা ভারতকে ট্রানজিট এবং বন্দর ব্যবহার করতে দিতে পারি না। যারা তিস্তার পানির বিনিময়ে ভারতকে করিডোর ও বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেবার কথা বলছে তারা মূলতপক্ষে সুকৌশলে ভারতকে করিডোর সুবিধা দিতে চাচ্ছে। আর ভারতকে করিডোর দেয়াটা যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করার জন্য তিস্তার পানির কথা বলা হচ্ছে। সুতরাং অদূর ভবিষ্যতে ভারত আমাদেরকে তিস্তার পানি দিলেও আমরা ভারতকে করিডোর দিতে পারব না। কারণ ট্রানজিট কখনো তিস্তার পানির বিনিময়ে বিনিময়যোগ্য হতে পারে না। একইভাবে আমরা ভারতকে বন্দর সুবিধাও দিতে পারব না। আর এসব দিতে চাইলে সরকারকে গণভোট দিতে হবে। কারণ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে ভারতকে করিডোর দেবার কথা বলা ছিল না, আর জনগণ এ জন্য ভোটও দেয়নি।
এদিকে ভারত বাংলাদেশকে নেপালে যাওয়ার জন্য ট্রানজিট এবং বাংলাদেশী ৪৬টি গার্মেন্টস পণ্যের বিনাশুল্কে ভারতে প্রবেশাধিকার দিলেও এর মাধ্যমে বাংলাদেশ তেমন একটা লাভবান হবে না। প্রথমেই নেপালে যাওয়ার ট্রানজিটের ব্যাপারটি আলোচনা করছি। আওয়ামী লীগ যখন ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেছিল তখনো ভারত বাংলাদেশকে নেপালে যাওয়ার জন্য ট্রানজিট দিয়েছিল। বাংলাবান্ধায় স্থলবন্দর কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু সেই স্থলবন্দর সচল হয়নি, কারণ ভারত সেই ট্রানজিট কার্যকর করেনি। অথচ নেপালে যাওয়ার সেই ট্রানজিট রুটটির দূরত্ব ৫০ কিলোমিটারেরও কম। অপর দিকে নেপাল ছোট্ট একটি দেশ, এর জনসংখ্যাও খুব বেশি নয়। ফলে নেপালের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ খুব বেশি নয়। তাই নেপালে যাওয়ার জন্য ভারত বাংলাদেশকে ট্রানজিট দিলেও এর উপকারিতার মাত্রা একেবারেই কম। একইভাবে ভারত বাংলাদেশকে ৪৬টি গার্মেন্টস পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিলেও এর মাধ্যমে বাংলাদেশী এসব পণ্য ভারতে বাজার পাবে না। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত বাংলাদেশী পণ্যের মান ভারতীয় সমজাতীয় পণ্য থেকে উন্নত হতে হবে। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশী পণ্যের দাম ভারতীয় সমজাতীয় পণ্যের দাম থেকে তুলনামূলক কম হতে হবে। তৃতীয়ত ভারতীয় ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের চাহিদা বাড়ানোর জন্য মূল্য কমিয়ে দেবেন। চতুর্থত বাংলাদেশী পণ্য ব্যবহারের জন্য ভারতীয়দের আগ্রহী হতে হবে। কিন্তু ভারতীয়রা যে ধরনের দেশপ্রেমিক তাতে তারা নিজ দেশের পণ্য বাদ দিয়ে বাংলাদেশী পণ্য কিনবে না। সুতরাং ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের বিনাশুল্কে প্রবেশাধিকার থাকলেও বাংলাদেশী পণ্য আপনাআপনিই ভারতের বাজার হারাবে। অতএব বাস্তবতা হচ্ছে নেপালে যাওয়ার ট্রানজিট এবং বাংলাদেশী ৪৬টি পণ্যের বিনাশুল্কে ভারতে প্রবেশাধিকার থেকে বাংলাদেশ কোন ধরনের উপকৃত হবে না।
এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কটা কী রকম হবে? যদি কোন রকমের লুকোচুরি না করে আসল কথাটা বলি তাহলে বলব বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোনদিনই স্বাভাবিক হবে না। ভারতের সাথে পাকিস্তান এবং চীনের সম্পর্ক যেমন কখনোই স্বাভাবিক হয়নি, ঠিক তেমনি ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কও কখনো স্বাভাবিক হবে না। এত ঢাকঢোল পিটিয়ে এবং দীর্ঘ প্রস্তুতি সত্ত্বেও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরেও যেখানে সম্পর্কের বরফ গলেনি তাহলে ভবিষ্যতে সেই বরফ গলার সম্ভাবনা কই? বরং এবারের সফর দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এবং সন্দেহের মাত্রাকে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের পরিবর্তে ভবিষ্যতে যদি অন্য কেউ ক্ষমতায় আসে তাহলে তো দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব আরো বৃদ্ধি পাবে। আর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ভালো না হওয়ার অনেক কারণ আছে। প্রধানত বাংলাদেশ এবং ভারত বিপরীত ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকদের বাস। এটা কিন্তু বিরাট একটি বিষয় এবং এটাকে অবজ্ঞা করার কোন উপায় নেই। আর দুই ধর্মের অনুসারী দু’টি দেশের মধ্যে সম্পর্ক কখনো মজবুত হয় না। যেমন ইসরাইলের সাথে মুসলিম দেশসমূহের সম্পর্ক কখনোই ভালো যায়নি। যে সমস্ত মুসলিম দেশের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সেটাও কিন্তু এখন ভঙ্গুর পর্যায়ে। যেমন তুরস্ক, মিসর এবং ফিলিস্তিনের পিএলও এর সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত থাকলেও তা টেকসই হয়নি এবং তা এখন ভঙ্গুর পর্যায়ে। অপর দিকে চীন, ভেনিজুয়েলাসহ অনেক অমুসলিম এবং সমাজতান্ত্রিক দেশের সাথে পাকিস্তান এবং ইরানের মতো মুসলিম দেশের সম্পর্কের কারণ কিন্তু অন্যটা। আর সেটা হচ্ছে শত্রুর শত্রু বন্ধু এবং শত্রুর বন্ধু শত্রু। এই অবস্থায় ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঠিক সেই রকম, যে রকম ভারতের সাথে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক। আর আওয়ামী লীগের শাসনামালে ভারতের সাথে সম্পর্ক ভালো হলেও, তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। আর সুসম্পর্ক চাইলে ভারতকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ বড় রাষ্ট্র হিসেবে এক্ষেত্রে ভারতের দায়িত্ব বেশি। আর আমরা অবশ্যই ভারতের সাথে সুসম্পর্ক চাই। তবে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তাকে দুর্বল করে নয়। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে এবং শক্তি অর্জন করতে হবে। আমাদেরকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে শক্তি অর্জন করতে হবে। আর শক্তি অর্জন করলে তখন কিন্তু অধিকারও অর্জিত হয়। কারণ শক্তি হচ্ছে শান্তি এবং নিরাপত্তার গ্যারান্টি। সুতরাং বাংলাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
লেখক :  প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply