বাংলাদেশ : সার্বভৌমত্বের সঙ্কট -মাসুমুর রহমান খলিলী

রাষ্ট্রের যেসব মৌলিক উপাদান না থাকলে এর কোন স্বীকৃতি থাকে না তার মধ্যে প্রধান শর্ত হলো সার্বভৌমত্ব। তবে ভৌগোলিক স্বাধীনতা বা পৃথক মানচিত্র থাকলেও কার্যকর সার্বভৌমত্ব অনেক দেশের থাকে না। কার্যকর স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব বলতে একটি দেশের সরকারের তার জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পররাষ্ট্র বা প্রতিরক্ষা বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাকে বোঝায়, যা প্রয়োগে বাইরের কোন হস্তক্ষেপ থাকে না।
সার্বভৌমত্বের কতগুলো বিশেষ দিক রয়েছে। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব, যার অর্থ হলো রাষ্ট্রের ভেতরে সরকারের প্রকৃত সুসংগঠিত নিয়ন্ত্রণ। এখনকার বিশ্বে অনেক দেশ রয়েছে যেগুলোর অভ্যন্তরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্রোহী বা নন স্টেট-এক্টর গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। সরকারের কার্যকারিতা সেসব এলাকায় থাকে না। দ্বিতীয়ত, আন্তঃনির্ভরশীলতার সার্বভৌমত্ব। এর অর্থ হলো রাষ্ট্রের যে সার্বভৌম সীমানা রয়েছে তার মধ্যে রাষ্ট্রের বাস্তব ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইনি সার্বভৌমত্ব তথা অন্যান্য সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি একটি দেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হবার অন্যতম প্রধান শর্ত। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্র হিসাবে গণ্য করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদের কোন স্থায়ী সদস্য ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করলে কোন দেশ জাতিসংঘের সদস্য হতে পারে না। তাইওয়ানসহ বেশ কয়েকটি দেশ রয়েছে যেগুলো ভোটো ক্ষমতাসম্পন্ন এক বা একাধিক দেশের বিরোধিতার কারণে স্বাধীন দেশ হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি। আবার জাতিসংঘের এমন অনেক স্বীকৃত দেশ রয়েছে যেগুলো তার জনসংখ্যা, ভূগোল বা অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে অন্য দেশের প্রভাব বা সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। চতুর্থত, ওয়েস্টফ্যালিকান সার্বভৌমত্ব। এর অর্থ হলো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানের ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি। যেমন বাইরের চার্চ, বিদেশি রাজনৈতিক দল অথবা অন্য কোনো বিদেশি এজেন্সির নিয়ন্ত্রণের কারণে সরকারের কার্যত নিয়ন্ত্রণহীনতা।
কার্যকর সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে ওপরে যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের কতকগুলো মৌলিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয়। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের তিনটি বিভাগের অধীনে কাজ করে। রাষ্ট্রের এই তিনটি বিভাগ হলো শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ। এই তিন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় এবং ক্ষমতার বিভাজনের ব্যবস্থা রয়েছে বাংলাদেশের সংবিধানে। এই তিন বিভাগের যথোপযুক্ত কার্যকারিতা শুধু গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য বিশেষ শর্তই নয়, একই সাথে তা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকেও বিশেষভাবে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সরকারকে নির্বাচন করে। এই সরকার নির্বাচিত হবার পর নির্বাহী বিভাগকে প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করে। আবার আইন পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই সরকার গঠন করতে পারে। ফলে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আইন সভা বা সরকার দুটোরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রক। অন্য দিকে বিচার বিভাগের উচ্চতর স্তর হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। সংসদের সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। আর রাষ্ট্রপতি কাজ করেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে। ফলে বিচার বিভাগের নিয়োগও সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। সরকার চাইলে তার প্রতি রাজনৈতিকভাবে অনুগতদের এ পদে নিয়োগ দিতে পারেন।
এভাবে দেখা যায়, সরকারের তিনটি বিভাগের মধ্যে এক ধরনের যোগসূত্র এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। আবার একই সাথে এই তিন বিভাগের মধ্যে সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার পৃথকীকরণের ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রত্যেক বিভাগ তার ওপর যে দায়িত্ব রয়েছে তা যদি এখতিয়ারের মধ্যে থেকে প্রয়োগ করে তাহলে এই পৃথকীকরণ কাজ করে। আর যদি এক পক্ষ তার উপর যে এখতিয়ার রয়েছে তা ছাড়িয়ে অন্য বিভাগের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে তাহলে শাসন ব্যবস্থায় সঙ্কট সৃষ্টি হয়। ক্ষমতার এখতিয়ার বহির্ভূত এই চর্চা মূলত করে থাকে বা করার অবকাশ বেশি থাকে শাসন বিভাগের। শাসন বিভাগ বলতে মূলত সরকারকে বুঝানো হয়। বিচার বিভাগের নিয়োগ পদোন্নতির যে এখতিয়ার সরকারের রয়েছে সেটিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করে বিচার কাজের উপর হস্তক্ষেপ করতে পারে সরকার। বিচারপতিদের অভিশংসনের এখতিয়ার সরকারের হাতে থাকলে এ নিয়ন্ত্রণ আরো প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। আইন বিভাগ সংসদের বিভিন্ন কমিটি এবং সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সংসদীয় কমিটিগুলোর দায়িত্ব যদি মন্ত্রীদের ওপর দেয়া হয় তা হলে সেই নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হয় না। আবার সরকার সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে আইনসভার কাজ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যবহার করা হতে পারে।
বিচার বিভাগের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকলে এর মাধ্যমে সরকার তার রাজনৈতিক স্বার্থকে হাসিল করতে পারে। এটি করা হয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মামলার মাধ্যমে শায়েস্তা করা অথবা আইনি প্রতিকার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে। আবার বিচার বিভাগ তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়েও ক্ষমতার চর্চা করতে পারে। এক্ষেত্রে সংবিধানের ব্যাখ্যাদাতা উচ্চতর আদালত এবং সংবিধান পরিপন্থী আইন অথবা সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য পরিপন্থী সাংবিধানিক আইন বাতিলের স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা উচ্চতর আদালতের রয়েছে বলে মনে করার কারণে এ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণহীন প্রয়োগ দেখা যায়। সংবিধানে যেখানে শাসনতন্ত্রের পরিবর্তন সংযোজন বিয়োজনের এখতিয়ার সুনির্দিষ্টভাবে আইন সভার ওপর অর্পণ করা হয়েছে সেখানে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ অথবা আপিল বিভাগের কয়েকজন বিচারপতির একটি বেঞ্চ সংবিধানের খোলনলচে পাল্টে দেয়ার মতো সংশোধনী বাতিলের রায় দিয়ে দিচ্ছে। এই ক্ষমতা বিচার বিভাগের কতটা রয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক উঠলেও তার প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা রাষ্ট্র কাঠামোকে দেখা যায় না।
রাষ্ট্রের কতগুলো মৌলিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলোর ওপর রাষ্ট্রের কার্যকারিতা অনেকখানি নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে রাষ্ট্র শক্তিশালী থাকে। এসব প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আর ওপরে সার্বভৌমত্বের যেসব উপাদান বা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে সেগুলো কাজ করে না, অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব অকার্যকর হয়ে পড়ে। এসব মৌলিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক নিরাপত্তা বিধানের জন্য সামরিক বাহিনী। অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, জন নিরাপত্তা বিধান ও আইনের প্রয়োগের জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য জনপ্রশাসন এবং এর নিয়োগের জন্য সরকারি কর্মকমিশন। আইনের প্রয়োগ বিচার ফয়সালার জন্য উচ্চ ও নিম্নস্তরের আদালত। আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য নাগরিক গড়ার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন। রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন। এর বাইরে আরো অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট।
রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলো নীতি নিয়মের ভিত্তিতে পরিচালিত হলে এসব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের সংহতি ও অগ্রগতির জন্য ভূমিকা রাখতে পারে। আর এসব প্রতিষ্ঠান যদি অন্যায্যভাবে ব্যবহার করা হয় তাহলে এর ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়, তা সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। যেমন নির্বাচনপ্রক্রিয়া অকার্যকর হয়ে পড়লে নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটে না। তখন সরকারে যারা থাকে তারা নিজেদের ক্ষমতাকে অন্যায়ভাবে ধরে রাখার জন্য অনুগত নির্বাচন কমিশন তৈরি করে। আর নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এর ফলকে অন্যায়ভাবে নিজেদের পক্ষে নিয়ে যেতে চায়। তখন সরকার বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর সুযোগে দেশের নানা ক্ষেত্রে সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বিঘিœত হয়। সরকারের সিদ্ধান্তে বাইরের হস্তক্ষেপ বেড়ে যায়।
প্রতিরক্ষা বিভাগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বাইরের শক্তির আক্রমণের মুখে পড়লে অখন্ডতা বজায় রাখতে সশস্ত্র বাহিনী অপারগ হয়ে পড়ে। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা তখন কঠিন হয়ে পড়ে। এতে বাইরের শক্তির প্রভাব বেড়ে যায়। প্রতিরক্ষার জন্য বিরাট বাহিনী থাকে কিন্তু তা হয়ে পড়ে দুর্বল ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অকার্যকর। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে রাজনৈতিক স্বার্থে নিয়ন্ত্রিত হলে আইনের প্রয়োগ হয় এক পক্ষী। এতে সমাজে অন্যায় অত্যাচার খুন-গুম এসব বেড়ে যায়। মুক্ত ও নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ হয় না বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হলে। রাজনৈতিক কারণে খুনের বা অপরাধের শিকার ব্যক্তিরা হয়ে পড়েন এর জন্য অভিযুক্ত। আর প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে নতুন নতুন অপরাধ করতে থাকে। প্রশাসনে মেধা বা যোগ্যতাকে আচ্ছন্ন করে রাজনৈতিক পরিচয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের জন্য যোগ্য নাগরিক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার হয়। দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলোতে দুর্নীতি বাসা বাঁধে। সার্বিকভাবে সমাজে অবক্ষয় বাড়তে থাকে। রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলের শেকড়গুলো দুর্বল হতে থাকে।
এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহতভাবে চলতে থাকলে এক পর্যায়ে সরকারের সুসংগঠিত নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন বিদ্রোহী ও জঙ্গি গ্রুপের সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রীয় সীমানার ওপর নিয়ন্ত্রণে নানা সমস্যা দেখা দেয়। বিদেশি শক্তিগুলো দেশের অভ্যন্তরের সংক্ষুব্ধ শক্তির সাথে যোগসূত্র তৈরি করে অশুভ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সরকার রাষ্ট্রের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণে হয়ে পড়ে অপারগ। এক পর্যায়ে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও বিদেশী প্রভাব প্রকট হয়ে পড়ে। এ ধরনের অবস্থা দীর্ঘদিন চললে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বও হয়ে পড়ে হুমকির সম্মুখীন। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমন এক অবস্থা সৃষ্টির শঙ্কা যেন দিন দিন প্রবল হয়ে উঠছে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply