বাংলাভাষার লড়াই -সাজজাদ হোসাইন খান

শুরুতেই ষড়যন্ত্রের শিকার। এ যেনো তার ললাটের লিখন। যে ভাষা তার হৃদয়ের আর্তিকে প্রকাশ করতে গিয়ে প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছিল। মুখোমুখি হয়েছিল লড়াইয়ের। তা ছিল তার জন্মের শুভক্ষণেই। অর্থাৎ ধ্বনি যখন তার কণ্ঠে ভর করেছিল সেই মুহূর্তে। লড়াইয়ে হারজিত আছে। আছে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা এবং অপমান-অপবাদ। যার সব ক’টার চিহ্নই বাংলা ভাষায় উজ্জ্বলভাবে আটকা। এ ভাষার ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস। এ ভাষার ইতিহাস প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাস।
বায়ান্ন সালে ভাষার লড়াইয়ে রক্ত ঝরেছে অস্বীকার করি না। কিন্তু বাংলাভাষার লড়াই মাত্র আড়াই যুগের বা তিন যুগের নয়। আসলে বাংলাভাষা রাজরোষে পড়েছিল তার আঁতুড় ঘরেই।
দেশের শাসক এবং ব্রাহ্মণ পন্ডিতরা এতে তাদের সর্বনাশ আবিষ্কার করেছিল। শিশু বয়সেই তাকে ঠেঙ্গিয়ে দেশছাড়া করেছিল। দেশছাড়া করেছিল এ ভাষার ধারকদেরও। তখন থেকেই ভাষার লড়াইয়ের সূচনা। যদিও সরবে নয়, নীরবে। বখতিয়ার খিলজিই পরবর্তীকালে এ ভাষার অন্তরে জীবনের স্পন্দন জাগিয়েছিলেন। এ ভাষার শাখা-প্রশাখাকে ফুলে-ফলে পল্লবিত করেছিলেন। এ কথা ইতিহাসের। যদিও কেউ কেউ এ দিকটাকে অন্ধকারে ফেলে রাখার পক্ষে।
বাংলা পক্ষীর ভাষা, বাংলা ইতরের ভাষা, যারা বাংলা চর্চা করেন তাদের অধিবাস নরকে এসব বিশেষণের টানা-হেঁচড়াও এই সেদিনের। এই শাস্ত্রীয় বাক্যগুলোর যারা ছিলেন আবিষ্কারক তারা সেন রাজাদেরই সার্থক উত্তরপুরুষ। কিন্তু পক্ষীর ভাষাই নতুন ঐ খিলজি শাসকের আদরে লালিত হলো। মাটির সাথে তার যোগাযোগ ঘটলো। কিন্তু সংস্কৃতসেবী পন্ডিতদের ষড়যন্ত্র অনুসরণ করলো ছায়ার মতো। দেশের শাসক এর পক্ষে, তাই ষড়যন্ত্র ততটা গভীরে কামড় বসাতে ব্যর্থ হয়েছিল। পরবর্তীকালে অর্থাৎ ইংরেজ আমলে তারা তাদের মনের খায়েশকে পূরণ করেছিল। বাংলাকে সংস্কৃতের ‘দুহিতা’ বানিয়ে ছেড়েছিল। কিন্তু বিধি বাম। ষড়যন্ত্র ফাঁস। সাময়িকভাবে বিভ্রান্তিতে ফেলেছিল অনেককে। বিশেষ করে এ দেশের বাংলাভাষী মুসলমানরা এর শিকার। এ ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্যই ছিল এটি। যার ফল দাঁড়াল এদেশের মুসলমানরা বাংলাভাষা থেকে নিজদেরকে কিছুটা আলগা করে নিলো। এ সুযোগে বাংলা ভাষা-সাহিত্য অবস্থান নিলো ভিন্ন জগতে। চেহারা-সুরতেও ভিন্নতা এলো। কিন্তু এর রেশ বেশিদিন থাকলো না। বাংলাভাষী মুসলমানরা আবার এক করে নিলো নিজেদের মেধাকে, যে মেধা একদিন এ ভাষার জমিনে নানা সোনালি ফসলের জন্ম দিয়েছিল। যে বাংলাভাষার চারা গাছটি নিজ হাতে লাগিয়েছিল, তাতে তারা আবার ঢালল ¯েœহের পানি।
কিছুকালের জন্য বাঙালি মুসলমানরা যে এ ভাষার চর্চা থেকে নিজেদের দূরে রেখেছিল সে কথা অস্বীকার করার জো নেই। কিন্তু কেন? এর উত্তর দিয়েছেন কবি আবদুল ওহাব বাংলা এগারো শ’ দু’ সালে। উত্তরটা হলো এ রকমÑ ‘আবদুল ওহাব কহে কদমে সবার
ত্রিপুরার বিচে জান মাকান আমার
শুন যত মোমেন সবের
এক ভাষা আছিলেক সে দোন জাতের
বাংলা জবান তারে বলিত সকলে
লিখিত পড়িত সবে খুশিখোশহালে।
…………..
কিন্তু ক্রমে ঘটিলেক এমন হালত
হনুদ কোশেশ কৈল হইতে তফাত
বাঙ্গালা জবান মধ্যে আনিলেক ছাড়া।
কোফরী শেরেকী বাত ভরিল তাহারা
তা দেখি মোজেজ লোকেরা এছলামের
ছাড়িল সে ভাষা ভাই ঈমান খাতের।”
তাহলে দেখা যাচ্ছে হনুদ অর্থাৎ এদেশের সংস্কৃত হিন্দু পন্ডিতরা এমনটা ঘটিয়ে ছিল। আগে ‘দোন জাতের’ ভাষাতো একটাই ছিল আর তা ছিল বাংলা জবান। কিন্তু পরবর্তী ভাষা হলো দুই। কারণ ‘হনুদের’ তফাত থাকার খায়েশ।
বাংলা ভাষার উচ্চারণ নানা চড়াই-উতরাইয়ের সাঁকো বেয়ে। এ ভাষাকে কেন্দ্র করে সক্রিয় ছিল দু’টি শক্তি। একটি উৎখাতের আর অন্যটি প্রতিষ্ঠার। এই দুই শক্তির টানা-হেঁচড়ায় বাংলা ভাষার শিরায় এখন দু’টি ধারা। যারা এ ভাষাকে উৎখাতে তৎপর ছিল তারা কারা সে খবর দিয়েছি। বাংলা ভাষায় মূল ধারা কোনটি সে কথাও কবি আবদুল ওহাব তার কবিতায় জানিয়েছেন। বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সূচনা তার জন্মকালেই। অর্থাৎ শব্দ উচ্চারণের প্রাক্কালেই। সেন রাজারা ছিল যার প্রথম প্রতিপক্ষ।
বায়ান্ন একুশে ছিল ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত লড়াই। সেন ষড়যন্ত্রের বিপক্ষে খিলজি-শাহরা যে লড়াই করে বাংলা ভাষাকে মানুষের মুখের এবং মায়ের ভাষারূপে প্রতিষ্ঠা করেছিল, বায়ান্নর লড়াই তাকে অভিষিক্ত করেছিল।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply