বাংলায় আর্যদের সামরিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আহমেদ আফগানী

এখন থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগের কথা। আর্য নামের এক আগ্রাসী জাতি প্রবেশ করেছিল উত্তর ভারতে। সেখান থেকে তারা সারা ভারত দখল করে। তবে বাংলা দখল করতে তাদের আরো এক হাজার বছর প্রয়োজন হয়। দ্রাবিড় অধ্যুষিত সিন্ধু, পাঞ্জাব ও উত্তর ভারত আর্যদের দখলে চলে যাওয়ার পর এই যাযাবরদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে অধিকাংশ দ্রাবিড় দক্ষিণ ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আর্যরা তাদের দখল বাড়াতে আরো পূর্বদিকে অগ্রসর হয়। সামরিক বিজয়ের সাথে সাথে বৈদিক আর্যরা তাদের ধর্ম-সংস্কৃতির বিজয় অর্জনেও সকল শক্তি নিয়োগ করে। পুরো উত্তর ভারত আর্যদের অধীনতা স্বীকার করে নেয়। কিন্তু স্বাধীন মনোভাব ও নিজ কৃষ্টির গর্বে গর্বিত বঙ্গবাসীরা আর্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে রুখে দাঁড়ায়। ফলে করতোয়ার তীর পর্যন্ত এসে সামরিক অভিযান বন্ধ হয়ে যায় আর্যদের।
বাংলাদেশের পূর্বপুরুষদের এই প্রতিরোধ-যুদ্ধ সম্পর্কে অধ্যাপক মন্মথমোহন বসু বলেন, “প্রায় সমস্ত উত্তর ভারত যখন বিজয়ী আর্যজাতির অধীনতা স্বীকার করিয়াছিল, বঙ্গবাসীরা তখন সগর্বে মস্তক উত্তোলন করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছিল। শতপথ ব্রাহ্মণ বলেন, আর্যদের হোমাগ্নি সরস্বতী তীর হইতে ভাগলপুরের সদানিরা (করতোয়া) নদীর পশ্চিমতীর পর্যন্ত আসিয়া নিভিয়া গিয়াছিল। অর্থাৎ সদানিরার অপর পাড়ে অবস্থিত বঙ্গদেশের মধ্যে তাঁহারা প্রবেশ করিতে পারেন নাই।”১
জাবি অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ বলেন, আর্যদের আদিবাস ছিল ইরানের শেষ উত্তরে। কাস্পিয়ান সাগরের তীরে। কৃষিকাজ ছিল তাদের প্রধান পেশা। জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাদের কৃষিজমির সঙ্কট দেখা দেয়। ফলে তাদের খাদ্যের অভাব প্রকট হয়। বাধ্য হয়ে এরা নতুন জমির খোঁজে ছড়িয়ে পড়ে নানা দেশে। এদেরই একটি দল দক্ষিণে এসে ইরানের মূল ভূমিতে বসতি গড়ে। এখানে বসবাস করতে করতে এক সময় খোঁজ পায় ভারত আর বাংলার। জানতে পারে সম্পদশালী এই দেশগুলোর মাটি খুব উর্বর। প্রচুর ফসল ফলে ওখানে। কৃষিজমির লোভে একসময় আর্যরা ভারতের দিকে অগ্রসর হয়। প্রথমে বসতি স্থাপন করে ভারতে। তারপর সুযোগ মতো চলে আসে বাংলায়।
তবে যত সহজে ভারতে আসতে পেরেছিল, বাংলায় প্রবেশ করা ততটা সহজ ছিল না। প্রথমদিকে বাংলার বীর যোদ্ধারা রুখে দিয়েছিল আর্য আগমন। আর্যদের এ সময়ের ইতিহাস জানার একমাত্র উপায় আর্যদের লেখা ধর্মগ্রন্থ। এই গ্রন্থের মূল নাম বেদ। এ কারণে আর্যদের ধর্মকে বলা হয় ‘বৈদিক ধর্ম’। এই বৈদিক ধর্ম থেকেই ‘সনাতন ধর্মের’ জন্ম হয়। সনাতন ধর্মকে আমরা সাধারণভাবে ‘হিন্দু ধর্ম’ বলে থাকি। বেদগ্রন্থের অনেক খণ্ড ছিল। যেমন ঋগবেদ, যযুর্বেদ, অথর্ববেদ, ব্রাহ্মণ ইত্যাদি। বেদের লেখা থেকে জানা যায়, খুব নাক উঁচু জাতি ছিল আর্যরা। অর্থাৎ নিজেদের সকল জাতি থেকে অনেক বড় মনে করতো। অন্যায়ভাবে ভারত দখল করেছিল তারা। কিন্তু নিজেদের অন্যায়কে আড়াল করতে চেয়েছে বেদগ্রন্থে।২
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান তাঁর জাতিসত্তার বিকাশধারা বইতে লিখেন, সামরিক অভিযান ব্যাহত হওয়ার পর আর্যরা অগ্রসর হয় বুদ্ধির আশ্রয় নিয়ে। তারা বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অভিযান পরিচালনা করে। তাই দেখা যায়, আর্য সমাজের ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা এ দেশে প্রথম আসেনি, আগে এসেছে ব্রাহ্মণেরা। তারা এসেছে বেদান্ত দর্শন প্রচারের নামে। কেননা, ধর্ম-কৃষ্টি-সংস্কৃতি-সভ্যতার বিজয় সম্পন্ন হয়ে গেলে সামরিক বিজয় সহজেই হয়ে যাবে। এ এলাকার জনগণ ব্রাহ্মণ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম পরিচালনা করেন, তা ছিল মূলত তাদের ধর্ম-কৃষ্টি-সভ্যতা হেফাজত করার লড়াই। তাদের এই প্রতিরোধ সংগ্রাম শত শত বছর স্থায়ী হয়। ‘স্বর্গ রাজ্যে’ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে দীর্ঘকাল দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সংগ্রামের যে অসংখ্য কাহিনী ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ প্রভৃতি আর্য সাহিত্যে ছড়িয়ে আছে, সেগুলো আসলে আমাদের পূর্বপূরুষদের প্রতিরোধ ও মুক্তি সংগ্রামেরই কাহিনী। আমাদের পূর্ব পুরুষদের গৌরবদীপ্ত সংগ্রামের কাহিনীকে এসব আর্য সাহিত্যে যেভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোন জাতির ধর্মশাস্ত্রে কোনো মানবগোষ্ঠীকে এমন নোংরা ভাষায় চিহ্নিত করার নজির পাওয়া যাবে না।৩
একই কথা বলেছেন কামরুদ্দীন আহমদ তাঁর ‘সোশ্যাল হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’ বইয়ে, “তিন স্তরে বিভক্ত আর্য সমাজের ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা প্রথমে বাংলায় আসেনি। এদেশে প্রথমে এসেছে ব্রাহ্মণেরা। তারা এসেছে বেদান্ত দর্শন প্রচারের নামে। বাংলা ও বিহারের জনগণ আর্য-অধিকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন পরিচালনা করেন, তাও ছিল ধর্মভিত্তিক তথা সাংস্কৃতিক।”
বেদগ্রন্থগুলোকে সাধারণভাবে বৈদিক সাহিত্য বলা হয়। এমন একটি বৈদিক সাহিত্যের নাম ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’। কিভাবে আর্যরা ভারতে এসেছে তা বলতে গিয়ে একটি গল্প সাজিয়েছিলেন আর্য লেখক। বলেছেন ভারত একটি অপবিত্র দেশ। নিচু জাতির মানুষেরা বাস করে এখানে। অগ্নি উপাসক উঁচু জাতির আর্যরা অমন
দেশে বাস করতে পারে না। তারপরও তারা ভারতে এসেছে কেন? বলেছে এই সমস্যাটির সমাধান করে নিয়েছিল আর্যরা। বইতে লেখা আছে, আর্যদের একজন মুনি অর্থাৎ ধর্মগুরু ছিলেন, যার নাম বিদেঘ। বিদেঘের ছিল একটি বিশেষ গুণ তাঁর মুখ দিয়ে আগুন বেরুতো। সে আগুনে পুড়ে পবিত্র হয়েছিল ভারত ভূমি। আর সেই পবিত্র মাটিতেই বসতি গড়েছিল আর্যরা। তবে বাংলায় পৌঁছতে তখনো অনেকটা বাকি ছিল।
বঙ্গ-দ্রাবিড়দের প্রতিরোধের ফলে অন্তত খ্রিস্টপূর্ব চার শতক পর্যন্ত এদেশে আর্য-প্রভাব রুখে দেয়া সম্ভব হয়। খ্রিস্টপূর্ব চার শতকে মৌর্য এবং তার পর গুপ্ত রাজবংশ প্রতিষ্ঠার আগে বাংলায় আর্য ধর্মের প্রভাব বিস্তৃত হয়নি। মৌর্যদের বিজয়কাল থেকেই বাংলাদেশে আর্য প্রভাব বাড়তে থাকে। তারপর চার ও পাঁচ খ্রিস্টাব্দের গুপ্ত শাসনামলে আর্য ধর্ম, আর্য ভাষা ও আর্য সংস্কৃতি বাংলাদেশে প্রত্যক্ষভাবে শিকড় গাড়ে।
মৌর্য বংশের শাসনকাল পর্যন্ত বৌদ্ধ-ধর্ম ব্রাহ্মণ্যবাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হয়। অশোকের যুগ পর্যন্ত এই ধর্মে মূর্তির প্রচলন ছিল না। কিন্তু তারপর তথাকথিত সমন্বয়ের নামে বৌদ্ধ ধর্মে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু তান্ত্রিকতার প্রবেশ ঘটে। হিন্দু দেব-দেবীরা বৌদ্ধমূর্তির রূপ ধারণ করে বৌদ্ধদের পূজা লাভ করতে শুরু করে।
অশোকের সময় পর্যন্ত বুদ্ধের প্রতিমা-পূজা চালু ছিল না। পরে বুদ্ধের শূন্য আসনে শোভা পেল নিলোফার বা পদ্ম ফুল। তারপর বুদ্ধের চরণ দেখা গেল। শেষে বুদ্ধের গোটা দেহটাই পূজার মণ্ডপে জেঁকে বসল। এভাবে ধীরে ধীরে এমন সময় আসল, যখন বৌদ্ধ ধর্মকে হিন্দু ধর্ম থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ লোপ পেতে থাকল।
গুপ্ত আমলে বাংলাদেশে আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দোর্দণ্ড প্রতাপ শুরু হয়। আর্য ভাষা ও সংস্কৃতির স্রোত প্রবল আছড়ে পড়ে এখানে। এর মোকাবিলায় জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রাম পরিচালিত হয় জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মকে আশ্রয় করে। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতি বাংলা ও বিহারের জনগণের আত্মরক্ষার সংগ্রামে এ সময় প্রধান ভূমিকা পালন করে। আর জনগণের আর্য-আগ্রাসনবিরোধী প্রতিরোধ শক্তিকে অবলম্বন করেই বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতি দীর্ঘদিন এ এলাকার প্রধান ধর্ম ও সংস্কৃতিরূপে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়ের মতো ঐতিহাসিকও স্বীকার করেছেন, “আর্যরাজগণের অধঃপতনের পূর্বে উত্তরাপথের পূর্বাঞ্চলে আর্য ধর্মের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন উপস্থিত হইয়াছিল। জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্ম এই আন্দোলনের ফলাফল।”৪
এ আন্দোলনের তোড়ে বাংলা ও বিহারে আর্য রাজত্ব ভেসে গিয়েছিল। আর্য-দখল থেকে এ সময় উত্তরাপথের পুব-সীমানার রাজ্যগুলো শুধু মুক্তই হয়নি, শতদ্র নদী পর্যন্ত সমস্ত এলাকা অনার্য রাজাদের অধীনতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্ম ও সংস্কৃতির অনাচারের বিরুদ্ধে সৃষ্ট গণজোয়ারের শক্তিতেই আর্যরা পরাজিত হয় বাংলায়। এই আন্দোলনের নেতা শিশুনাগবংশীয় মহানন্দের শূদ্র-পুত্র মহাপদ্মনন্দ ভারত ভূমিকে নিঃক্ষত্রিয় করার শপথ নিয়েছিলেন এবং ক্ষত্রিয় শাসকদের নির্মূল করে সমগ্র ভারতকে অনার্য অধিকারে আনার শপথ করেছিলেন। তিনি এ জন্য ‘একরাট’ উপাধি ধারণ করেছিলেন।
মহাপদ্ম নন্দ দ্রাবিড় জাতির লোক ছিলেন। আর্যদের তিনি বাংলা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। মহাপদ্ম নন্দ মগধ অঞ্চলের শাসক ছিলেন। মগধ প্রাচীন ভারতে ষোলোটি মহা জনপদ বা অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম। ষোলোটি মহা জনপদের মধ্যে মগধ বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই রাজ্য বর্তমানের বিহারের পাটনা, গয়া আর বাংলার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ছিল। রাজগৃহ ছিল মগধের রাজধানী। পরে এর রাজধানী পাটালিপুত্রে স্থানান্তরিত হয় রাজা অজাতশত্রুর সময়ে।৫
মহাপদ্মনন্দ নন্দ বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সমস্ত ক্ষত্রিয় রাজাদের তথা আর্যদের পরাজিত করে বিন্ধ্য পর্বত পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। তাকে ভারতের প্রথম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতাও বলা হয়। সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য তিনি ২,০০,০০০ পদাতিক, ২০,০০০ অশ্বারোহী, ২,০০০ রথ ও ৩,০০০ হস্তীবিশিষ্ট সুবিশাল বাহিনী গড়ে তোলেন। গ্রিক ঐতিহাসিক প্লুটার্কের মতে তার বাহিনী আরো বড় ছিল। এই বংশের শেষ রাজা ছিলেন মহাপদ্ম নন্দের ছেলে ধননন্দ। তিনিই ছিলেন নন্দ বংশের শেষ রাজা।
আর্যদের মধ্যে এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ব্যক্তি চাণক্য এই নন্দ রাজবংশকে ধ্বংস করার জন্য কাজ শুরু করেন। তিনি ক্ষত্রিয় রাজাদের একত্রিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু খুব একটা সুবিধে করতে সক্ষম হননি। তিনি এক ক্ষত্রিয়কে অর্থশাস্ত্র, যুদ্ধনীতি, রাজনীতির জ্ঞান দেন এবং তাকে মগধ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য গড়ে তোলেন তক্ষশীলা বিদ্যালয়ে। তক্ষশীলা হলো বর্তমান পাকিস্তানে পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডিতে। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সমস্ত জ্ঞান লাভ করে।
চন্দ্রগুপ্তকথা নামক গ্রন্থানুসারে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও চাণক্যের সেনাবাহিনী প্রথমদিকে নন্দ সাম্রাজ্য কর্তৃক পরাজিত হয়। কিন্তু চন্দ্রগুপ্ত এরপর বেশ কয়েকটি যুদ্ধে ধননন্দ ও তাঁর সেনাপতি ভদ্রশালাকে পরাজিত করতে সক্ষম হন এবং অবশেষে পাটলিপুত্র নগরী অবরোধ করে ৩২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে নন্দ সাম্রাজ্য অধিকার করেন। এভাবেই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মৌর্য শাসনামল শুরু করেন।
চন্দ্রগুপ্ত তাঁর রাজত্বের শেষ পর্যন্ত তামিল ও কলিঙ্গ অঞ্চল ব্যতিরেকে ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ স্থান অধিকার করতে বা পদানত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পূর্বে বাংলা থেকে পশ্চিমে আফগানিস্তান ও বেলুচিস্তান, উত্তরে কাশ্মির থেকে দক্ষিণে দাক্ষিণাত্য মালভূমি পর্যন্ত তার শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। ভারতের ইতিহাসে ইতঃপূর্বে এর চেয়ে বৃহৎ সাম্রাজ্য নির্মিত হয়নি।৬
চন্দ্রগুপ্ত ও তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা চাণক্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করেন। চাণক্য রচিত অর্থশাস্ত্রের ওপর নির্ভর করে চন্দ্রগুপ্ত একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রশাসন গড়ে তোলেন। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্য ও কৃষির উন্নতির সাথে সাথে এই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার ফলস্বরূপ একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। মেগাস্থিনিসের বর্ণনা অনুসারে, চন্দ্রগুপ্তের মৌর্যের বিশাল সেনাবাহিনীতে ৪ লক্ষ সৈন্য ছিল।
ভারত উপমহাদেশে সবচেয়ে বড় এলাকাজুড়ে শাসন করেছে মৌর্য বংশের রাজারা। এই মৌর্যদের সময়েই আর্যরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় বাংলায় প্রবেশ করেছিল। এখনকার বাংলা অঞ্চল তখন একটি প্রদেশ ছিলো। প্রদেশকে তখন বলা হতো, ‘ভুক্তি’। বাংলা অঞ্চলের এই ভুক্তিটির নাম হয় ‘পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তি’। এই ভুক্তিটির রাজধানী করা হয় আজকের বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়। মৌর্য শাসনামলে এর নাম ছিল ‘পুণ্ড্রনগর’।৭
মৌর্যবংশের রাজাদের মধ্যে চন্দ্রগুপ্ত (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২১-২৯৮ অব্দ), বিন্দুসার (খ্রিষ্টপূর্ব ২৯৮-২৭২ অব্দ) এবং অশোক (খ্রিষ্টপূর্ব ২৭২-২৩২ অব্দ) ছিলো উল্লেখযোগ্য। অশোকের মৃত্যুর পর উল্লেখযোগ্য কোনো রাজা মৌর্য বংশে আসেনি।
২৯৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের জৈন ধর্ম গ্রহণ ও রাজ্য শাসন থেকে স্বেচ্ছা অবসরের পর তাঁর পুত্র বিন্দুসার মাত্র বাইশ বছর বয়সে সিংহাসন লাভ করেন। বিন্দুসার মৌর্য সাম্রাজ্যকে তিনি দক্ষিণ দিকে আরো প্রসারিত করেন এবং কলিঙ্গ, চের, পাণ্ড্য ও চোল রাজ্য ব্যতিরেকে সমগ্র দক্ষিণ ভারত ছাড়াও উত্তর ভারতের সমগ্র অংশ তাঁর করায়ত্ত হয়। তাঁর রাজত্বকালে তক্ষশীলার অধিবাসীরা দুইবার বিদ্রোহ করেন কিন্তু বিন্দুসারের পক্ষে তা পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হয়নি। তক্ষশীলার বিদ্রোহের মূল কারণ আর্যরা। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা মৌর্য শাসকদের নিজেদের মতো করে চালাতে চাইলেন কিন্তু তারা আর্যদের সব পরামর্শ মানতেন না বিশেষ করে জাতিভেদ মানতে চাইতেন না। এই নিয়ে আর্যরা বিদ্রোহ করে।
২৭২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিন্দুসারের মৃত্যু হলে উত্তরাধিকারের প্রশ্নে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বিন্দুসার তাঁর অপর পুত্র সুসীমকে উত্তরাধিকারী হিসেবে চেয়েছিলেন, কিন্তু সুসীমকে উগ্র ও অহঙ্কারী চরিত্রের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে বিন্দুসারের মন্ত্রীরা তাঁর অপর পুত্র অশোককে সমর্থন করেন। রাধাগুপ্ত নামক এক মন্ত্রী অশোকের সিংহাসন লাভের পক্ষে প্রধান ভূমিকা পালন করেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অশোক সুসীমকে হত্যা করেন।৮
সিংহাসনে আরোহণ করে অশোক তার সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। উত্তরে হিন্দুকুশ পর্বতমালা থেকে শুরু করে দাক্ষিণাত্যের কিছু অংশ বাদ দিয়ে সমগ্র ভারতবর্ষ তার অধীনে চলে আসে। তার রাজত্বকালের শুরুর দিকে তিনি কলিঙ্গ আক্রমণ করেন। এই ভয়াবহ যুদ্ধে লক্ষাধিক মানুষ নিহত হন এবং অগণিত মানুষ উদ্বাস্তু হন। অশোকের ত্রয়োদশ শিলালিপিতে বর্ণিত হয়েছে যে কলিঙ্গের যুদ্ধে প্রচুর মানুষের মৃত্যু ও তাঁদের আত্মীয় স্বজনদের অপরিসীম কষ্ট দেখে অশোক দুঃখে ও অনুশোচনায় দগ্ধ হন। এই ভয়ানক যুদ্ধের কুফল লক্ষ্য করে যুদ্ধপ্রিয় অশোক একজন শান্তিকামী ও প্রজাদরদি সম্রাট এবং বৌদ্ধ ধর্মের একজন পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় শুধুমাত্র মৌর্য সাম্রাজ্য নয়, এশিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারিত হয়।৯
সম্রাট অশোকের সময় বর্তমান বাংলা তৎকালীন পুণ্ড্রনগরের শাসকরা প্রজাদের প্রতি ভালো আচরণ করতেন। তাদের সুখে রাখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু তবুও স্বস্তি ছিল না বাংলার মানুষের। স্বাধীনতাপ্রিয় বাংলার মানুষের এই পরাধীনতা ভালো লাগেনি। বাংলার কোনো কোনো অংশে সুযোগ পেলেই তারা স্বাধীনতা ঘোষণা করতো। এর প্রমাণ হচ্ছে গঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা একটি স্বাধীন রাজ্য। গ্রিক লেখকরা এই রাজ্যটির নাম লিখেছেন ‘গঙ্গারিডি’। হিসাব মতে বাঙালির এই স্বাধীন রাজ্যটি গড়ে উঠেছিল মৌর্য যুগে। এই শক্তিশালী রাজ্যের সৈন্যবাহিনীতে চার হাজার হাতির এক বিশাল বাহিনী ছিল।
অশোকের মৃত্যুর পরবর্তী পঞ্চাশ বছর দশরথ, সম্প্রতি, শালিশুক, দেববর্মণ, শতধনবান ও বৃহদ্রথ এই ছয় জন সম্রাটের রাজত্বকালে মৌর্য সাম্রাজ্য দুর্বল হতে থাকে।
মৌর্য শাসকেরা মূলত জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। জৈন ধর্মের প্রচারক মহাবীর আর বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক গৌতমের জীবনধারা এবং তাদের সত্য-সন্ধানের প্রক্রিয়া লক্ষ্য করে মওলানা আবুল কালাম আযাদসহ অনেক গবেষক মনে করেন যে, তারা হয়তো বিশুদ্ধ সত্য ধর্ম তথা একেশ্বরবাদের প্রচার করেছেন। কিন্তু ষড়যন্ত্র ও বিকৃতি তাদের সে সত্য ধর্মকে পৃথিবীর বুক থেকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে যে, তার কোন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া আজ অসম্ভব।
এ প্রসঙ্গে আব্দুল মান্নান তালিব লিখেছেন, “জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস আলোচনা করলে এ ষড়যন্ত্রের বহু ইঙ্গিত পাওয়া যাবে। এ উভয় ধর্মই আর্যদের ধর্মীয় গ্রন্থ বেদকে ঐশী গ্রন্থ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে। তপস্যা, যাগযজ্ঞ ও পশুবলিকে অর্থহীন গণ্য করে। ব্রাহ্মণদের পবিত্রাত্মা ও নরশ্রেষ্ঠ হওয়ার ধারণাকে সমাজ থেকে নির্মূল করে দেয়। ফলে বর্ণাশ্রমভিত্তিক সমাজব্যবস্থার ভিত্তি নড়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবে জনসাধারণ এ ধর্মদ্বয়ের আহ্বানে বিপুলভাবে সাড়া দেয়। দ্রাবিড় ও অন্যান্য অনার্য ছাড়া বিপুল সংখ্যক আর্যও এ ধর্ম গ্রহণ করে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য আর্য ব্রাহ্মণ্য ধর্ম বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মদ্বয়কে প্রথমে নাস্তিক্যবাদের অন্তর্ভুক্ত করে। নাস্তিক্যবাদের সংজ্ঞা তারা এভাবেই নিরূপণ করে যে, বেদবিরোধী মাত্রই নাস্তিক। কাজেই জৈন ও বৌদ্ধরাও নাস্তিক। অতঃপর উভয় ধর্মীয়দের নিরীশ্বরবাদী প্রবণতা প্রমাণ করার চেষ্টা চলে।”১০
মৌর্যরা সরাসরি আর্যদের প্রতিনিধিত্ব না করলেও প্রচুর আর্য এসময় বাংলায় প্রবেশ করে। তারা তাদের কৃষ্টি, কালচার ও ধর্ম দিয়ে দ্রাবিড়দের প্রভাবিত করে। পরবর্তী গুপ্ত আমলে আর্যরা পুরোপুরিভাবে দ্রাবিড়দের সংস্কৃতি ও ধর্ম বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়।

লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট, গবেষক ও ইতিহাসবিদ

তথ্যসূত্র:
১. বাংলা নাটকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ / মন্মথমোহন বসু / কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৯) / পৃ. ২১
২. বাংলায় আর্য আগমন / ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ / দৈনিক ইত্তেফাক / ২৫ আগস্ট, ২০১৫
৩. আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা / মোহাম্মদ আবদুল মান্নান / পৃ. ২৪-২৫
৪. বাঙ্গালার ইতিহাস / রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় / পৃ. ২৭-২৮
5. A History of India: Volume 1 / Romila Thapar / P. 384
6. Ancient Indian History And Civilization / S N Sen / P. 165
৭. পুণ্ড্রনগর / বাংলাপিডিয়া // https://bit.lz/31S5QrF / অ্যাকসেস ইন ২২ আগস্ট ২০১৯
8, India: From Indus Valley Civlization to Maurzas / Gzan Swarup Gupta / P. 268
9. Asoka and the Buddhist Emperor of India / Vincent A. Smith / P. 130-134
১০. বাংলাদেশে ইসলাম / আব্দুল মান্নান তালিব / পৃ. ৩৭-৩৮

SHARE

Leave a Reply