বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়েছিল যেভাবে -আহমেদ আফগানী

অনেকেই মনে করে থাকেন ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির মাধ্যমেই এদেশে ইসলাম এসেছে। কথাটা পুরোপুরি সঠিক নয়। তাঁর মাধ্যমে বাংলায় ইসলাম শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বখতিয়ারের বিজয়ের আগেই এদেশে ইসলাম প্রচারক আলেম, দরবেশ ও মুজাহিদগণ জনগণকে সাথে নিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন-রাজত্বের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম পরিচালনা করেন।
ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বর্ণবৈষম্য ও শ্রেণিবৈষম্যে নির্যাতিত মানুষের পাশে ইসলামের দায়ীরা দাঁড়িয়েছিল। তার মধ্যে দিয়ে ইসলামের প্রতি জনগণের সমর্থন গড়ে ওঠে। জনসমর্থনের সে দৃঢ় ভিত্তির ওপর ১২০৩ সালের মার্চ মাসে সম্পন্ন হয় ইখতিয়ারউদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির ঐতিহাসিক বিজয়। তিব্বতীয় বৌদ্ধ-ভিক্ষু লামা তারানাথ তাঁর ষোল শতকের বিবরণীতে জানান, বৌদ্ধরা মুসলমানদের বিজয়কে অভিনন্দিত করেছিল এবং ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজিকে বিজয়ে সাহায্য করেছিল। শ্রীচারু বন্দোপাধ্যায় ও প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বৌদ্ধরা মুসলমান বিজেতার সাহায্যে হিন্দুদের অত্যাচারের প্রতিশোধ নিয়ে কিছুটা শান্তি লাভ করেছিল। (১)
এদেশের মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বখতিয়ার খিলজি। ইদানীংকালে কিছু সাহিত্যিক ও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বলতে চান বখতিয়ার কোনটা দুর্গ আর কোনটা বিশ্ববিদ্যালয় তা বুঝতেন না। তিনি দুর্গ মনে করে বৌদ্ধদের বিশ্ববিদ্যালয় বা বিহারগুলো ধ্বংস করেছিলো। অথচ বৌদ্ধ ঐতিহাসিকরাই জানিয়েছেন বৌদ্ধরা মুসলিমদের স্বাগত জানিয়েছে এদেশে। খিলজিকে বৌদ্ধরা সমগ্র বিহার ও বাংলা অঞ্চল দখল করতে সাহায্য করেছিলো। সুতরাং নালন্দা বিহারসহ অন্যান্য বিহার ধ্বংসের যে অভিযোগ খিলজির উপর আরোপ করা হয়েছে তা পুরোটাই অসত্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। মূলত সেন আমলে আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বৌদ্ধদের ওপর যে অত্যাচার চালিয়েছিলো তার দায় তারা মুসলিমদের ওপর চাপাতে চেয়েছে।
ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খলজি ছিলেন জাতিতে তুর্কি আর পেশায় ভাগ্যান্বেষী সৈনিক। জীবনের প্রথম ভাগে তিনি ছিলেন আফগানিস্তানের গরমশির বা আধুনিক দশত-ই-মার্গের অধিবাসী। তিনি গজনির সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরির সৈন্যবাহিনীতে চাকুরিপ্রার্থী হয়ে ব্যর্থ হন। আকারে খাটো, লম্বা হাত এবং অসুন্দর চেহারার অধিকারী হওয়ায় সেনাধ্যক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হন। গজনীতে ব্যর্থ হয়ে তিনি দিল্লিতে কুতুবউদ্দীন আইবেকের দরবারে হাজির হন। এখানেও তিনি চাকুরি পেতে ব্যর্থ হন। অতঃপর তিনি বদাউনে যান। সেখানকার শাসনকর্তা মালিক হিজবর-উদ্দিন বখতিয়ার খলজিকে নগদ বেতনে সেনাবাহিনীতে চাকুরি প্রদান করেন। অল্পকাল পর তিনি বদাউন ত্যাগ করে অযোদ্ধায় যান। অযোদ্ধার শাসনকর্তা হুসামউদ্দিন তাকে বর্তমান মির্জাপুর জেলার পূর্ব দক্ষিণ কোণে ভগবৎ ও ভিউলি নামক দুইটি পরগনার জায়গির প্রদান করেন। (২)
মুসলিমদের দুর্দশা ও ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের প্রেক্ষিতে ১২০১ সালে বখতিয়ার মাত্র দুই হাজার সৈন্য সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী হিন্দু রাজ্যগুলো আক্রমণ করতে থাকেন। সেই সময়ে তার বীরত্বের কথা চারিদিক ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং অনেক মুসলিম সৈনিক তার বাহিনীতে যোগদান করতে থাকে, এতে করে তার সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি তার সেনাবাহিনী নিয়ে বিহার অধিকার করেন।
বিহার জয়ের পর বখতিয়ার খলজি কুতুব-উদ্দিন আইবকের সাথে দেখা করতে যান এবং কুতুবউদ্দিন কর্তৃক সম্মানিত হয়ে ফিরে আসেন। কুতুব উদ্দিন তাকে স্বীকৃতি দেন। এরপরই তিনি বাংলা জয়ের জন্য সাহস এবং শক্তি সঞ্চয় করতে থাকেন। তৎকালীন বাংলার রাজা লক্ষ্মণ সেন বাংলার রাজধানী নদিয়ায় অবস্থান করছিলেন কারণ নদিয়া ছিল সবচেয়ে সুরক্ষিত অঞ্চল। বলা হয়ে থাকে যে নদিয়ায় আসার কিছু আগে রাজসভার কিছু দৈবজ্ঞ পণ্ডিত তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে এক তুর্কি সৈনিক তাকে পরাজিত করতে পারে। এতে করে লক্ষ্মণ সেনের মনে ভীতির সঞ্চার হয় এবং নদিয়ার প্রবেশপথ রাজমহল ও তেলিয়াগড়ের নিরাপত্তা জোরদার করেন। লক্ষ্মণ সেনের ধারণা ছিল যে ঝাড়খন্ডের শ্বাপদশংকুল অরণ্য দিয়ে কোনো সৈন্যবাহিনীর পক্ষে নদিয়া আক্রমণ করা সম্ভব নয় কিন্তু বখতিয়ার সেই পথেই তার সৈন্যবাহিনীকে নিয়ে আসেন। নদিয়া অভিযানকালে বখতিয়ার ঝাড়খন্ডের মধ্য দিয়ে এত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়েছিলেন যে তার সাথে মাত্র ১৮ জন সৈনিকই তাল মেলাতে পেরেছিলেন।
বখতিয়ার সোজা রাজা লক্ষ্মণ সেনের প্রাসাদদ্বারে উপস্থিত হন এবং দ্বাররক্ষী ও প্রহরীদের হত্যা করে প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করেন। এতে প্রাসাদের ভিতরে হইচই পড়ে যায় এবং লক্ষ্মণ সেন দিগি¦দিক হারিয়ে ফেলে প্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে নৌপথে বিক্রমপুরে (মুন্সীগঞ্জে) আশ্রয় নেন। বখতিয়ার নদিয়া জয় করে পরবর্তীতে গৌড়ের দিকে অগ্রসর হন এবং সেখানেই রাজধানী স্থাপন করেন। গৌড় জয়ের পর আরও পূর্বদিকে বরেন্দ্র বা উত্তর বাংলায় নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি এলাকাগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে একজন করে সেনাপতিকে শাসনভার অর্পণ করেন। বখতিয়ারের সেনাধ্যক্ষদের মধ্যে দুজনের নাম পাওয়া যায়। এদের মধ্যে আলি মর্দান খলজি বরসৌলে, হুসামউদ্দিন ইওজ খলজি গঙ্গতরীর শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। লাখনৌতিকে কেন্দ্র করে বাংলার নবপ্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাজ্যের সীমানা ছিল উত্তরে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পুর্নিয়া শহর, দেবকোট থেকে রংপুর শহর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে তিস্তা ও কারতোয়া, দক্ষিণে গঙ্গার মূলধারা (পদ্মা) এবং পশ্চিমে কুশী নদীর নিম্নাঞ্চল থেকে গঙ্গার কিনারায় রাজমহল পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। পরবর্তী এক শ’ বছরের মধ্যে বাংলার প্রায় সমগ্র এলাকা মুসলিম শাসনাধীনে আসে।
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বাংলা জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসন শুরু হয়। এই আমলই ছিলো বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সময়। শিক্ষা, সভ্যতায় ও সম্পদে বাংলা হয়ে উঠেছিলো পৃথিবী বিখ্যাত স্থান। সারা পৃথিবী থেকে পর্যটক ও অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিরা বাংলায় আসতেন বাংলার রূপ, রস, সৌন্দর্য ও গন্ধ উপভোগ করতে। ভারতে মুসলিম বিজয় সম্পর্কে গোপাল হালদার মন্তব্য করেন, “ইসলামের বলিষ্ঠ ও সরল একেশ্বরবাদ এবং জাতিভেদহীন সাম্যদৃষ্টির কাছে ভারতীয় জীবনধারা ও সংস্কৃতির পরাজয় হয়েছে। এ পরাজয় রাষ্ট্রশক্তির কাছে নয়, ইসলামের উদার নীতি ও আত্ম-সচেতনতার কাছে। কারণ ইসলাম কোন জাতির ধর্ম নয়, প্রচারশীল ধর্ম। ইহা অন্যকে জয় করেই ক্ষান্ত হয় না, কোলে তুলে নেয়।” (৩)
ভারতে বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির ব্যর্থতা ও ইসলামী সংস্কৃতির বিজয়ের কারণ চিহ্নিত করে কমরেড এম. এন. রায় ‘ইসলামের ঐতিহাসিক অবদান’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন, “ভারতে বৌদ্ধ বিপ্লবের পরাজয় ঘটেনি বরং তার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার জন্যই তা ব্যর্থ হয়েছে। সেই বিপ্লবকে জয়ের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য সমাজ-শক্তি তেমনভাবে দানা বেঁধে উঠতে পারেনি। তার ফল হলো এই যে, বৌদ্ধ মতবাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই সমগ্র দেশ অর্থনৈতিক দুর্গতি, রাজনৈতিক অত্যাচার, বিচার-বুদ্ধির স্বেচ্ছাচারিতা আর আধ্যাত্মিক স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে ডুবে গেল। বাস্তবিকপক্ষে সমগ্র সমাজ তখন ধ্বংস ও বিলুপ্তির ভয়াবহ কবলে পড়ে গেছে। এ জন্য নিপীড়ত জনগণ ইসলামের পতাকার নিচে এসে ভিড় করে দাঁড়াল …। ইসলামের সমাজব্যবস্থা ভারতীয় জনগণের সমর্থন লাভ করল। তার কারণ তার পিছনে জীবনের প্রতি সে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, হিন্দু দর্শনের চাইতে তা ছিল শ্রেয়; কেননা হিন্দু দর্শন সমাজদেহে এনেছিল বিরাট বিশৃঙ্খলা আর ইসলামই তা থেকে ভারতীয় জনসাধারণেকে মুক্তির পথ দেখায়।” (৪)
মুসলিম শাসন আমল বাংলার ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা গঠনমূলক যুগ হিসেবে ঐতিহাসিকদের বিবেচনা লাভ করেছে। এ জনপদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ যুগেই একটি উন্নত ও সংহত রূপ লাভ করে। রাজনৈতিকভাবে এ যুগেই বাংলার জনগণ একটি আদর্শের ভিত্তিতে সামাজিক ঐক্যমঞ্চে সংঘবদ্ধ হয়। বাংলা ভাষা ও বাঙালির ইতিহাসের ভিত্তিও এই যুগেই প্রতিষ্ঠিত হয়। এ প্রসঙ্গে ড. এম এ রহীমের মন্তব্য, “যদি বাংলায় মুসলিম বিজয় ত্বরান্বিত না হতো এবং এ প্রদেশে আর কয়েক শতকের জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন অব্যাহত থাকত, তবে বাংলা ভাষা বিলুপ্ত এবং অতীতের গর্ভে নিমজ্জিত হতো।” (৫)

বাংলায় দিল্লির শাসন
বাংলায় দিল্লির শাসন প্রতিষ্ঠা হয় ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাত ধরেই। তিনি বিহার, বাংলা ও তদসংশ্লিষ্ট অঞ্চলে নির্যাতিত মানুষের আহবানে সাড়া দিয়ে জয় করে নেন। এরপর তিনি দিল্লির শাসক সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেকের সাথে দেখা করেন এবং নিজেকে সমর্পণ করেন। কুতুবুদ্দিন খুশি হন এবং এই অঞ্চলের শাসনভার তার হাতে অর্পণ করেন। এরপর প্রায় একটানা ১৩৬ বছর দিল্লির অধীনে ছিল বাংলা।
বখতিয়ার খলজি একজন সুশাসক ছিলেন। তিনি তার রাজ্যকে কয়েকটি জেলায় বিভক্ত করেন এবং সেগুলোর শাসনভার তার প্রধান অমাত্য ও সামরিক প্রধানদের ওপর ন্যস্ত করেন। তাদেরকে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা, রাজস্ব আদায় করা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং জনগণের পার্থিব ও নৈতিক উন্নতির দিকে লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি লখনৌতিতে রাজধানী স্থাপনের পর খুতবা পাঠ করেন এবং দিল্লির সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেকের নামে মুদ্রা প্রবর্তন করেন। তিনি দিনাজপুর ও রংপুরের নিকট দুটি ছাউনি শহর নির্মাণ করেন। তার সময়ে প্রচলিত প্রশাসনিক বিভাগকে ইকতা এবং এর শাসনকর্তাকে মুকতা বলা হতো। তিনি বহু মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ নির্মাণ করেন। (৬)
দিল্লির শাসক কুতুবুদ্দিন আইবেক মধ্য এশিয়ার কোনো এক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন; তার পূর্ব পুরুষেরা ছিলেন তুর্কি। শিশুকালেই তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়। তাকে ইরানের খোরাসান অঞ্চলের নিসাপুরের প্রধান কাজী সাহেব কিনে নেন। কাজী তাকে তার নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন এবং আইবেককে তিনি ভালো শিক্ষা দিয়েছিলেন, তিনি আইবেককে ফার্সি এবং আরবী ভাষায় দক্ষ করে তোলেন। তিনি আইবেককে তীর এবং অশ্বচালনায়ও প্রশিক্ষণ দেন। আইবেকের প্রভুর মৃত্যুর পরে প্রভুর ছেলে আইবেককে আবারও এক দাস বণিকের কাছে বিক্রি করে দেন। কুতুবুদ্দিনকে এবার কিনে নেন গজনির গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ ঘুরি। (৭)
মোহাম্মদ ঘুরির কোনো সন্তান না থাকায় তার প্রিয় সন্তানের মতো কুতুবুদ্দিন আইবেকই হন দিল্লির শাসনকর্তা। তিনিই প্রথম দিল্লিকে রাজধানীতে পরিণত করেন। তিনি মামলুক সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা। মামলুক সালতানাত ১২০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্য এশিয়ার তুর্কি সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেক মামলুকদের উত্তর ভারতে নিয়ে আসেন। দিল্লি সালতানাত শাসনকারী পাঁচটি রাজবংশের মধ্যে মামলুক রাজবংশ প্রথম। এর শাসনকাল ছিল ১২০৬ থেকে ১২৯০ সাল পর্যন্ত। ঘুরি রাজবংশের প্রতিনিধি শাসক হিসেবে কুতুবুদ্দিন আইবেক ১১৯২ থেকে ১২০৬ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। এসময় তিনি গাঙ্গেয় অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করেন এবং নতুন অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
কুতুবুদ্দিন আইবেক দিল্লির প্রাচীন মুসলিম স্মৃতিস্থাপনাগুলোর নির্মাণ তিনি শুরু করেন। এর মধ্যে রয়েছে কুয়াত-উল-ইসলাম মসজিদ ও কুতুব মিনার। ১২১০ সালে তিনি পোলো খেলার সময় ঘোড়া থেকে পড়ে মারা যান। লাহোরের আনারকলি বাজারের কাছে তাকে দাফন করা হয়। এরপর শাসক হন আরাম শাহ। আরাম শাহ কুতুবুদ্দিনের সাথে কী সম্পর্কিত এই নিয়ে দ্বিমত আছে ঐতিহসিকদের মধ্যে। কেউ বলেছেন ভাই, কেউ বলেছেন ছেলে। যাই হোক আরাম শাহের ক্ষমতায় বেশিদিন ছিলেন না। চিহালগনি নামে পরিচিত ৪০ জন অভিজাত ব্যক্তির একটি দল আরামশাহের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বাদাউনের গভর্নর শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশকে আমন্ত্রণ জানায়। ১২১১ সালে ইলতুৎমিশ আরামশাহকে দিল্লির নিকটে জুদের সমতল ভূমিতে পরাজিত করেন।
ইলতুৎমিশ দক্ষ শাসক ছিলেন। তিনি মুলতানের নাসিরউদ্দিন কাবাচা ও গজনির তাজউদ্দিন ইলদুজকে পরাজিত করে। এই দুজন দিল্লির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তার শাসনামলে মঙ্গোলরা জালালউদ্দিন খোয়ারিজম শাহর খোঁজে ভারত আক্রমণ করে। ইলতুৎমিশ শক্ত হাতে মঙ্গোলদের প্রতিহত করেন। চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর ইলতুৎমিশ হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে উত্তর ভারতে তার নিয়ন্ত্রণ মজবুত করেন। ১২৩০ সালে তিনি মেহরাউলিতে হাউজ-ই-শামসি নামক জলাধার নির্মাণ করেন। ১২৩১ সালে তিনি দিল্লিতে প্রথম মুসলিম সমাধি সুলতান গারি নির্মাণ করেন। (৮)
ইলতুৎমিশ কন্যা রাজিয়া সুলতানা ছিলেন ভারতের প্রথম মুসলিম নারী শাসক। তিনি অভিজাত ব্যক্তিদের সাথে সমঝোতায় আসতে সক্ষম হন এবং সালতানাত পরিচালনায় সফল ছিলেন। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত জামালউদ্দিন ইয়াকুতের সাথে তার সহযোগিতার কারণে মধ্য এশিয়ার তুর্কীয় বংশোদ্ভূত অভিজাতরা তার বিরূপ হয়ে পড়ে। এ ছাড়া নারী স¤্রাজ্ঞীর শাসনকে তারা নেতিবাচক হিসেবে দেখতেন। ক্ষমতাশালী অভিজাত মালিক আলতুনিয়া তাকে পরাজিত করেছিলেন। রাজিয়া সুলতানা তাকে বিয়ে করতে সম্মত হয়েছিলেন। রাজিয়ার ভাই মুইজউদ্দিন বাহরাম চিহালগনিদের সহায়তায় সিংহাসন দখল করেন এবং রাজিয়া ও তার স্বামীর সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেন। পরাজিত হয়ে তারা কাইথাল পালিয়ে যান। তাদের সাথে থাকা অবশিষ্ট সৈনিকরা এরপর তাদের ত্যাগ করে। তারা দু’জনেই জাটদের হাতে ধৃত হন। ১২৪০ সালের ১৪ অক্টোবর তাদের হত্যা করা হয়। এরপর কয়েক বছর বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। (৯)
১২৪৬ সালে ইলতুৎমিশের আরেক ছেলে নাসিরউদ্দিন মাহমুদ ক্ষমতা দখল করেন। নাসিরউদ্দিন মাহমুদ ধার্মিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অধিকাংশ সময় তিনি নামাজ এবং দরিদ্র ও অসহায়দের সহায়তা করতেন। তার অধীনস্থ গিয়াসউদ্দিন বলবন রাষ্ট্রীয় বিষয় দেখাশোনা করতেন। তিনি ও গিয়াসউদ্দিন বলবন দিল্লি সালতানাতে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। প্রায় ২০ বছর শাসক থাকার পর নাসিরউদ্দিন মাহমুদের মৃত্যু হয়। তারপর ১২৬৬ সালে গিয়াসউদ্দিন বলবন শাসক হন। তিনি ১২৮৭ পর্যন্ত শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন।
গিয়াসউদ্দিন বলবন কঠোর হস্তে শাসন পরিচালনা করেন। তিনি চিহালগনিদের প্রভাব খর্ব করেন। ভারতে তিনি শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ইচ্ছুক ছিলেন। বিশৃঙ্খল অঞ্চলগুলোতে তিনি অনেক চৌকি নির্মাণ ও সেনা মোতায়েন করেন। আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য তিনি সফল গোয়েন্দা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। এরপর আর উল্লেখযোগ্য মামলুক সুলতান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারেননি। এরপর শুরু হয় দিল্লির দ্বিতীয় সালতানাত খিলজি রাজবংশ। বাংলা এ সময় দিল্লির শাসকদের দ্বারাই শাসিত হতে থাকে।

তথ্যসূত্র :
১. আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা / মোহাম্মদ আবদুল মান্নান / পৃ. ৩৩
২. বাংলাদেশের ইতিহাস / ড. মুহাম্মদ আব্দুর রহিম / পৃ. ১৪৯
৩. সংস্কৃতির রূপান্তর / গোপাল হালদার / পৃ. ১৯৬
৪. ইসলামের ঐতিহাসিক অবদান / এম. এন. রায় / পৃ. ৬১-৬২
৫. বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস / ড. এম এ রহীম / ভূমিকা
৬. বখতিয়ার খলজি / বাংলাপিডিয়া / যঃঃঢ়ং://নরঃ.ষু/২শপজঢ়ঙঙ / অ্যাকসেস ইন ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
৭. ইতিহাসের ইতিহাস / গোলাম আহমেদ মোর্তজা / পৃ. ৬৬-৬৯
৮. মোগল সা¤্রাজ্যের সোনালী অধ্যায় / সাহাদত হোসেন খান / পৃ. ২৪
৯. মোগল সা¤্রাজ্যের সোনালী অধ্যায় / সাহাদত হোসেন খান / পৃ. ২৬

SHARE

Leave a Reply