বাংলা কবিতায় ঈদ

মোশাররফ হোসেন খান#

মুসলমানদের জন্য প্রধান দু’টি ঈদ উৎসব বা আনন্দের দিন। একটি হলো ঈদুল ফিতর, অন্যটি ঈদুল আজহা। এ দু’টি দিনই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং গুরুত্ববহ।
দু’টি ঈদ নিয়েই আমাদের অগ্রজ পথিকৃৎ কবিরা কবিতা লিখেছেন।
কায়কোবাদ, কাজী নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা প্রমুখ কবির কবিতা এ ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছে।
সঙ্গত কারণে কবি কায়কোবাদের কবিতার কথা মনে পড়ে যায়। কী অসাধারণ উচ্চারণ :
“আজি এ ঈদের দিনে হয়ে সব এক মনপ্রাণ,
জাগায়ে মোস্লেম যাবে গাহ আজি মিলেনের গান।
ডুবিবে না তবে আর ঈদের এ জ্যোতিষ্মান রবি,
জীবন সার্থক হবে, হইবে যে এ দরিদ্র কবি।”
আর কাজী নজরুল ইসলামের সেই উচ্চকিত কণ্ঠ তো কখনো ভুলবার নয় :
“পথে পথে আজ হাঁকিব, বন্ধু,
ঈদ মুবারক! আস্সালাম।
ঠোঁটে ঠোঁটে আজ বিলাব শিরনী ফুল-কালাম।
বিলিয়ে দেওয়ার আজিকে ঈদ।”
কবি গোলাম মোস্তফার চোখে ঈদের চাঁদটা কেমন? তিনি লিখেছেন:
“আজ নূতন ঈদের চাঁদ উঠেছে
নীল আকাশের গায়।
তোরা দেখবি কারা ভাই-বোনেরা
আয়রে ছুটে আয়।
আহা কতই মধূর খুবসুরাৎ ঐ ঈদের চাঁদের মুখ
ও ভাই তারও চেয়ে, মধুর যে ওর স্নিগ্ধ হাসিটুক্।
যেন নবীর মুখের হাসি দেখি ওই হাসির আভায়।”
কবি শাহাদাত হোসেন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে কমপক্ষে তিনটি কবিতা লিখেছেন। তার ‘শাওয়ালের চাঁদ’ কবিতায় লিখছেন :
“তোমার আগমে আজি বরিহ্নহ্ন অশান্তির
নিভে যাক, হাহাকার মহা-মহামার
বিশ্ব নিখিলের; ডুবে যাক প্রশান্তির
গভীর অতলে; রূপ-রস গন্ধভারে
দগ্ধসৃষ্টি হোক পুন ঋতুপর্ণা রূপা।”
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অজস্র গদ্যের পাশাপাশি আবার ‘রমজানের চাঁদ’ নিয়ে কবিতাও লিখেছেন :
“পুনরাজ রমযানের এই অগ্রচর;
বসন্ত ঋতুর যথা দূত পিকবর;
অথবা এ বিধাতার শরীরিণী বাণী
রোজাব্রত পালিবার যাকিছে সবায়
কিংবা পাঠায়েছে এযে পূর্বে ঈদরাণী
যেমনি পাঠায় ঊষা শুক্র তারকায়।”
চল্লিশ দশকের কবি ফররুখ আহমদের উচ্চারণে ঈদ এসেছে এইভাবে :
“আকাশের বাঁক ঘুরে চাঁদ এল ছবির মতন,
নতুন কিশতি বুঝি এল ঘুরে অজানা সাগর;
নাবিকের শ্রান্ত মনে পৃথিবী কি পাঠালো খবর
আজ এ স্বপ্নের মধ্যে রাঙা মেঘ হল ঘনবন।”
এইতো, এই ভাবেই অনুরণিত ও ধ্বনিত হতে চলেছে আমাদের ঈদের কবিতা। ঐতিহ্যের স্মারক।

দুই.
মাহে রমজান-তাকওয়া অর্জনের মাস। আল্লাহর অফুরন্ত রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস। এই মাসটি মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি অপরিসীম নিয়ামতের মাস। এক মাস সিয়াম সাধনার পরই আসে বহু প্রতীক্ষিত ঈদুল ফিতর।
ঈদুল ফিতরের দিনে ধনী-দরিদ্র একই কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করে। এই যে একই কাতারে আশরাফ-আতরাফ, সমবেতভাবে নামাজ আদায় করলো, এর মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে কেবলই সাম্যের দ্যুতি।
ঈদের দিনে আমরা সবাই খুশি হই। আনন্দ প্রকাশ করি। কোলাকুলির মাধ্যমে একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে আসি। এটা আমাদের সংস্কৃতিরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। শহর, নগর, গ্রাম বাংলার সকল বয়সের প্রতিটি মুসলিমই এই উৎসবমুখর সংস্কৃতির সমান অংশীদার। স্বাভাবিভাবেই এই খুশির বারতা বাংলার কবি-সাহিত্যিককেও আলোড়িত করেছে যুগে যুগে। তারাও সমানভাবে আন্দোলিত হয়েছেন। কার না মনে পড়ে কাজী নজরুলের (১৮৯৯-১৯৭৬) এই ভুবন কাঁপানো সুরের দোলা?
“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে
এলো খুশির ঈদ।
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে
শোন আসমানী তাকিদ ॥

তোর সোনাদানা বালাখান
সব রাহে লিল্লাহ্
দে জাকাত মুর্দা মুসলিমে আজ
ভাঙাইতে নিঁদ ॥

তুই পড়বি ঈদের নামাজ রে মন
সেই সে ঈদগাহে
যে ময়দানে গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ ॥

আজ ভুলে গিয়ে দোস্ত-দুশ্মন
হাত মিলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে র্ক বিশ্ব নিখিল
ইসলামে মুরীদ ॥
রোযার যে মহান শিক্ষা সাম্যের, ঈদুল ফিতরের নামাজের কাতারে এসে আমরা তারই বাস্তব প্রমাণ পাই। কবি নজরুলের ওপরের পঙক্তিগুলার মধ্যেও এই সাম্যের কথা আছে। আছে মানবিক ও ভ্রাতৃত্ববোধের কথা। সেই সাথে আমাদের জাগিয়ে তোলার প্রেরণাও।
নজরুলের এ ধরনের বহু পঙক্তি আছে, সম্পূর্ণ গান আছে, যাতে আমাদের জাতীয় মৌল চেতনা জাগরিত হয়েছে। তার গান থেকে আর একটা উদাহরণ দেয়া যাক :
“আল্লার রাহে দিতে পারে যারা
আপনারে কোরবান
নির্লোভ নিরগঙ্কার যারা
যাহারা নিরাভিমান,
দানব-দৈত্য কতল করিতে
আসে তলোয়ার লয়ে,
ফিরদৌস হতে এসেছে যাহারা
ধরায় মানুষ হয়ে,
অসুন্দর ও অত্যাচারীরে
বিনাশ করিতে যারা
জন্ম লয়েছে চির নির্ভীক
যৌবন-মাতোয়ারা
তাহাদেরি শুধু আছে অধিকার
ঈদগাহে ময়দানে”
নজরুলের অগ্রজ প্রখ্যাত লেখক সৈয়দ এমদাদ আলী (১৮৭৫-১৯৬৫) ‘নবনূর’ পত্রিকায় ১৯০৩ সালে ঈদ সংখ্যায় ‘ঈদ’ নিয়ে একটি কবিতা লেখেন। বাংলা কবিতায় এটাই ঈদ-বিষয়ক প্রথম কবিতা হিসাবে স্বীকৃত হয়ে আসছে। তিনি লিখেছিলেন-
“কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে
অরুণ তরুণ উঠিয়ে ধীরে
রাঙিয়া প্রতিটি তরুণ শিরে
আজ কি হর্ষ ভরে।
আজি প্রভাতের মৃদুল বায়
রঙে নাচিয়া যেনো কয়ে যায়
মুসলিম জাহান আজ একতরফা
দেখ কত বল ধরে।”
সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘মুসলিম জাহান আজ একতায়’ উচ্চারণের মধ্যে যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ইঙ্গিত রয়েছে, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার-‘দেখ কত বল ধরে’ বাক্যের মধ্যে। অর্থাৎ এখানেও স্পষ্ট যে, ঈদের এই নামাজ কিংবা জামাত কিংবা এর বাহ্যিক আনন্দ উৎসব-এর অন্তমূলে রয়ে গেছে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের মহান শিক্ষা।
সাম্য ও সামাজিকতার উদ্ভাস।
কবি কায়কোবাদের (১৮৫৭-১৯৫১) উচ্চারণেও ধ্বনিত হয়েছে ঐ একই রকম সুর। যেমন :
“কুহেলির অন্ধকার সরাইয়া
ধীরে ধীরে ধীরে
উঠেছে উচল গিরে শিরে
তাই বিশ্বভূমে কি পবিত্র
দৃশ্য সুমহান……”
কবি গোলাম মোস্তফার (১৮৯৬-১৯৬৪) চোখেও ঈদের ছবি ভাসছে এইভাবে :
“আজ নূতন ঈদের চাঁদ উঠেছে
নীল আকাশের গায়।
তোরা দেখবি কারা ভাই-বোনেরা
আয়রে ছুটে আয়।

ওরে চাঁদ নহে ও, ওযে মোদের নূরেরি খঞ্জর
ওই খঞ্জরেতে কাটবো মোরা শয়তানের পঞ্জর
মোরা ভুলবো আজি সকল বিরোধ
মিলবো গো ঈদগায়।”
কবি গোলাম মোস্তফা ‘ভুলবো আজি সকল বিরোধ’ এবং ‘মিলবো ঈদগায়’-এর মধ্য দিয়ে যে সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের কথা বলেছেন, তারই ঈঙ্গিতবহ ধ্বনি পাচ্ছি তার ‘ঈদ-উৎসব’ কবিতায়। তিনি বলছেন :
“আজিকে আমাদের জাতীয় মিলনের পুণ্য দিবসের প্রভাতে
কে গো ঐ দ্বারে দ্বারে ডাকিয়া সবাকারে ফিরেছে বিশ্বের সভাতে!

কণ্ঠে মিলনের ধ্বনিছে প্রেম-বাণী, বক্ষে ভরা তার শান্তি,
চোক্ষে করুণার স্নিগ্ধ জ্যোতি-ভার, বিশ্ব-বিমোহন কান্তি,
প্রীতি ও মিলনের মধুর দৃশ্যে
এসেছে নামিয়া সে নিখিল বিশ্বে,
দরশে সবাকার ঘুচেছে হাহাকার বিয়োগ-বেদনার শ্রান্তি।

এনেছে নব-গীতি, এনেছে সুখ-স্মৃতি, এনেছে প্রেম-প্রীতি-পণ্য,
এনেছে নব-আশা, একতা-ভালোবাসা, নিবিড়, মিলনের জন্য,
ভ্রাতৃ-প্রণয়ের মহান দৃশ্য!
মিলব-কলগানে মুখর বিশ্ব!
বিভেদ-জ্ঞানে যতো আজিকে সব হত, ধন্য ঈদ তুমি ধন্য।”
ইসলামী জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) ঈদকে কিভাবে চিত্রিত করেছেন? তাঁর একটি শিশুতোষ কবিতায় বলছেন :
“আজকে এল খুশীর দিন,
দেখ্না চেয়ে খুশীর চিন্
দেখ্না চেয়ে আজ রঙিন
খুশীর ঝলক ঈদগাহ।
সেই খুশীতে চলছি ভাই
নাইতো কিছু দুঃখ নাই,
চলছি যাতে জামাত পাই
খোদার দেওয়া এক রাহে।”
‘ঈদের স্বপ্ন’ কবিতায় ফররুখ আহমদ বলছেন :
“ঈদের আনন্দ, স্বপ্ন রেখায়িত গোধূলি আকাশে,
চাঁদের ইঙ্গিত মাঝে আবছানা জাগে স্বপ্ন ঘোর,
মনে পড়ে বহু আগে একদিন এসেছিল কাছে;
এখনো সে স্বপ্নালোকে ফেরে এক অতৃপ্ত চকোর
কাবার মিনার ঘিরে আনন্দের সফেদ আভাসে
নিমেষে ভাঙিয়া যায় বঞ্চিত পাথর ॥”
তাঁর ‘ঈদের কবিতা’য় এই ‘বঞ্চিত পাথর’ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেখানে বঞ্চনা এবং অসাম্যের গ্লানি দূরে ঠেলে এক প্রশান্তির পৃথিবীর কামনাই উচ্চকিত হয়েছে। যেমন :
“আজ ঈদগাহে নেমেছে নতুন দিন,
চিত্তের ধনে সকলে বিত্তবান,
বড় ছোট নাই, ভেদাভেদ নাই কোন;
সকলে সমান-সকলেই মহীয়ান।”
কবি ফররুখ আহমদের এই কয়টি চরণে ঈদের প্রকৃত শিক্ষার চমকই ঝলসে উঠেছে।
কবি শাহাদাৎ হোসেনের (১৮৯৩-১৯৫৩) মানসভূমিতে ‘ঈদ’ কি প্রভাব বিস্তার করেছিল, একটু জানা যাক। তিনি ‘রমজান’-এর ওপর দু’টি কবিতা লিখেছিলেন। এছাড়া লিখেছেন ‘শাওয়ালের চাঁদ’। এটাও রমজান এবং ঈদকেন্দ্রিক। আর সরাসরি ঈদের ওপর কবিতা লিখেছেন দু’টি-‘ঈদ বোধন’ ও ‘ঈদ-উল-ফিতর’। ‘ঈদ-বোধন’ কবিতাটি ঈদুল আজহার প্রেক্ষাপটেরচিত। ‘ঈদ-উল-ফিতর’ কবিতার কয়েকটি চরণ এরকম :
“মহাকেন্দ্রে মিলনের মহা-মহোৎসব
ভেদ দ্বন্দ্ব-দ্বিধা নাই রাজেন্দ্র কাঙালে
সাম্যের বিজয় তীর্থে-

মৃত্তিকার আস্তরণে নতশির সবে।
সাম্যের দিশারি আমি-আমি মুসলমান
দেশ-কাল-পাত্র মোর সর্ব্ব একাকার
বহুত্বে একক আমি
আত্মার আত্মীয় মোর দুনিয়া জাহান।”
এভাবেই আমাদের কবিতায় ঈদের শিক্ষা, মহিমা এবং গরিমা ভাস্বর হয়ে উঠেছে। যুগের পর যুগ রচিত হয়ে চলেছে ঈদের ওপর কবিতা। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঈদকে কোনো কবিই খুশি ও আনন্দের কেবল ঝর্ণাধারা হিসাবে চিহ্নিত করেননি, বরং তাদের দৃষ্টি ও মননের সীমায় আছে সৌভ্রাতৃত্ববোধ, মানবতা, ঐক্য, সাম্য আর মহামিলনের এক বৈশ্বিক বোধ। মূলত এটাই তাদের কবিতার কেন্দ্রীয় চারিত্র্য। রমজানুল মুবারক ও ঈদ বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও আল্লাহর রাসূল (সা) যে ধরনের শিক্ষা গ্রহণের কথা বলেছেন, ঈদবিষয়ক কবিতায় আমরা তারই প্রতিধ্বনি লক্ষ্য করি। সন্দেহ নেই, ঈদ মুসলিম মিল্লাতের জন্য একটি সার্বজনীন আনন্দ উৎসব। কিন্তু সেই সাথে আবার স্বাতন্ত্র্যিকও বটে। কারণ ঈদের এই সাম্যের শিক্ষা ও বৈশিষ্ট্য একমাত্র ইসলাম ছাড়া আর কোনো ধর্মে লক্ষ্য করা যায় না। বাংলা কবিতাও ঈদের এই সার্বভৌম উদার শিক্ষা ধারণ করেই বয়ে চলেছে ভরস্রোতা নদীর মত। বাংলা সাহিত্যে এটাও একটি বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ঐশ্বর্যিক দিক বটে।

তিন.
কিন্তু একটি বেদনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়; আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করছি, স্বাধীনতা-পরবর্তী কালে ঈদ নিয়ে তেমন কোনো উজ্জ্বল, দৃষ্টান্তমূলক কবিতাই রচিত হয়নি। চল্লিশ দশকের পর যে সকল কবি আধুনিকতার স্রোতে গা ভাসালেন, তাদের কবিতায় বহুবিধ বিষয় উঠে এলেও মুসিলম ঐতিহ্যের চিহ্নবাহী ঈদ, রমজান, শবে কদর, নামাজ, রোজা প্রভৃতি বিষয় প্রায় অনুপস্থিত রয়ে গেছে। ‘আধুনিক’ হতে গিয়ে তারা এবং আজকের অধিকাংশ কবি এই সকল বিষয়কে উপেক্ষা কিংবা তুচ্ছজ্ঞান করে চলেছেন।
প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রতিটি পত্রিকা ঈদসংখ্যা প্রকাশ করে বিশেষ আয়োজনে। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো-এসব ঈদসংখ্যায় ‘ঈদ’ কিংবা ‘রমজান’ ‘নামাজ’ কোনো কিছুই স্থান পায় না। জানি না, তাহলে ঈদ সংখ্যার সার্থকতা কোথায় থাকে? কোনো কোনো ঢাউস ‘ঈদসংখ্যা’য় এমন সব গল্প-কবিতা ছাপা হয়, যা অশ্লীলতাকেও হার মানায়। অর্থাৎ আমাদের চেতনায় রমজান কিংবা ঈদের কোনো তাৎপর্যই স্পর্শ করে না। ভাববার বিষয় বটে। মূল বিষয় ও চেতনা থেকে আজকের কবিদের অবস্থান যোজন দূরত্বে। এটা কোনো সুখের কথা নয়, স্বস্তির বিষয়ও নয়। তারা সম্ভবত ধরেই নিয়েছেন যে, মুসলিম ঐতিহ্যের এ সকল বিষয় ‘আধুনিকতার’ পরিপন্থী। কিংবা লেখার মত কোনো সন্দেহ নেই।
ভারত থেকে প্রকাশিত ‘শারদীয়’ সংখ্যাগুলো সামনে রাখলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে হিন্দুরা কী পরিমাণ তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি আনুগত্যশীল ও দরদি। এমন কোনো ‘শারদীয়’ সংখ্যার কথা চিন্তাও করা যায় না, যেখানে তাদের দেব-দেবীর কিংবা পূজা-পার্বণের ওপর লেখা এবং ছবি থাকে না। অথচ আমাদের ঈদ সংখ্যাগুলোর প্রচ্ছদে মূল বিষয়ের কোনো চিহ্নই থাকে না। কোনো কোনো ঈদসংখ্যার দিকে তো তাকানোই যায় না।
আমাদের এই হীনমন্যতা এবং মানসিকতার ক্ষতটি দূর হওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, আধুনিকতার অর্থ শেকড়হীন কিংবা আদর্শ ও ঐতিহ্যহীন হওয়া নয়। আমাদের প্রতিদিনের জীবনাচারকে কেন্দ্র করেই আধুনিকতার বেড়ে ওঠা। এই সত্যকে অস্বীকার করে, পাশ কাটিয়ে আর যাই হোক না কেন-পূর্ণাঙ্গ কবি হওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে যায়।
পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর দশকের কবিরা যে পথে হেঁটেছেন, আমাদেরকেও কলুর বলদের মতো সেই পথেই হাঁটতে হবে, তার কোনো মানে নেই। সঙ্গত কারণও নেই। আমরাই পারি আমাদের পৃথক পথ রচনা করতে। সেটাই সঙ্গত। এ আত্মবিশ্বাস আজকের তরুণ ও নবীন কবিদের মধ্যে যত দ্রুত জাগ্রত হবে, ততই কল্যাণকর। বোধ করি এক্ষেত্রে আশির দশকের আমাদের কতিপয় ঐতিহ্যবাদী ও বিশ্বাসী কবির সচেষ্ট ও শ্রমলব্ধ ব্যতিক্রমী প্রয়াস আশা, উদ্দীপনা ও সাহস জোগাতে পারে। আমরা আমাদের কবিতায় এ ধরনের আমূল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আশাবাদী। নিশ্চয়ই আজ এবং আগামীর কবিরা আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবেন। এক্ষেত্রে আদর্শ ও ঐতিহ্যগত চেতনাই মুখ্য বিষয়। কথাটা স্মরণে রাখা আবশ্যক বলে মনে করি।
লেখক : কবি

SHARE

Leave a Reply