বাংলা ভাষায় কুরআন চর্চা উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ । ড. মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

বাংলা ভাষায় কুরআন চর্চা উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ । ড. মোহাম্মদ আবদুল অদুদপবিত্র কুরআন মানবজাতির ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক, ধর্মীয়, জাগতিক, ও পারলৌকিক জীবনের দিকনির্দেশনার প্রধান উৎস। এ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন বৈজ্ঞানিক উপাত্ত সংবলিত একটি সংবিধান। এর বহু আয়াত ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে। একমাত্র গবেষণার মাধ্যমেই এর যথাযথ ব্যাখ্যা সম্ভব। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মনীষীরা যুগে যুগে স্বভাষায় কুরআন চর্চা করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাভাষী প্রথিতযশা মুসলিম ও অমুসলিম পণ্ডিতবর্গ এবং কবি-সাহিত্যিকরাও বাংলা-পাক-ভারতে বাংলা ভাষায় পবিত্র কুরআনের অনুবাদ ও তাফসির চর্চা করে কুরআনি সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। কুরআনি সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের বঙ্গানুবাদ, ভাষ্য, কুরআনের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত গ্রন্থাবলি রচনা ও সাময়িক পত্রে কুরআন চর্চা প্রভৃতি বিষয়ে তাঁদের অবদান অবিস্মরণীয়।

পবিত্র কুরআনের ভাষান্তর সূচনা

পবিত্র কুরআন মানবজীবনের পার্থিব ও পারলৌকিক বিষয়সহ সর্ব বিষয়ে সকল প্রকার দিকনির্দেশনার প্রধান উৎস। সর্বশেষ নবী ও রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন সর্ব যুগে যুগসমস্যার যুগোপযোগী সর্বশ্রেষ্ঠ সমাধান সংবলিত একটি অতুলনীয় জীবনবিধান। এ কুরআন হলো তাঁর রিসালাতের চিরন্তন ও চূড়ান্ত সাক্ষী। এতে স্রষ্টার সৃষ্টিকুলের সর্ব বিষয়ের বিবরণ নিহিত রয়েছে। এ কুরআনে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের পথনির্দেশক। পবিত্র কুরআনের ভাষা আরবি। কুরআন নাজিল হওয়ার সময় থেকে অদ্যাবধি এ আরবি কুরআন থেকে মানুষ যেভাবে দিকনির্দেশনা পেয়ে আসছে অনাগত কালের সকল শ্রেণীর মানুষ অনুরূপ দিশা পাবে। কারণ, আল্লাহ স্বয়ং এ পবিত্র কুরআন সংরক্ষণের নিশ্চয়তার বিধান দিয়েছেন। এ কুরআন আরবি ভাষায় নাজিল হলেও এর আবেদন ও আহ্বান সর্বজনীন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সমগ্র মানবজাতির হিদায়াতের উদ্দেশ্যেই প্রেরিত। ফলে তাঁর ওপর যখনই পবিত্র কুরআনের যতটুকু অবতীর্ণ হতো তখনই তা তার আশপাশের লোকদের হিদায়েতের উদ্দেশে শুনিয়ে দিতেন। কারণ, এটা ছিল তাঁর রিসালাতের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। তিনি তার দায়িত্ব পালনে কোন ত্রুটি করেননি। বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হতেন। আর তিনি তাদের প্রত্যেকের ভাষা অনুযায়ী অনুবাদ করেন বুঝাতেন। ফলে তাঁর জীবদ্দশায়ও বিভিন্ন ভাষী মানুষ ভাষান্তরের মাধ্যমে তাদের নিজ ভাষায় কুরআন অনুধাবনে সক্ষম হয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, মক্কায় ইসলাম প্রচারে যখন রাসূল (সা.) তীব্র বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখন সেখানে একজন আজমি (ইরানি) বসবাস করতেন। তিনি ছিলেন দ্বিভাষী। কুরআন শুনা মাত্রই তিনি নিজে বুঝার জন্য অবচেতনে তা ফার্সিতে অনুবাদ করে নিতেন। তিনি কুরআনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

বাংলা ভাষায় কুরআন চর্চা উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ । ড. মোহাম্মদ আবদুল অদুদকুরআনের পরোক্ষ অনুবাদের ধারা

তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে রাজা লক্ষ্মণ সেনকে লখনৌ থেকে বিতাড়িত করে বাংলা জয় করেন। এবং বিজিত অঞ্চলে সংস্কৃত চর্চার মূলে কুঠারাঘাত হেনে বাংলা ভাষা চর্চার পথ উন্মুক্ত করেন। তার এই বিজয়ের পর থেকেই মুসলমানদের সাথে বাংলা ভাষার একটি ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলমানরা বঙ্গ দেশে মসজিদ, খানকা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত করে তাদের ধর্ম কর্ম স¤পাদন করতে থাকেন এবং বাংলা ভাষার মাধ্যমে দেশবাসীর প্রতি ইসলাম ধর্ম প্রচার ও ধর্মবিষয়ক গ্রন্থাবলি রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। মধ্যযুগীয় কবি শাহ মুহাম্মদ সগীর এদের অন্যতম। মাতৃভাষায় কুরআনি সাহিত্য চর্চার গুরুত্বটি ষোড়শ শতাব্দীর মধ্য ভাগের কবি সৈয়দ সুলতানের (১৫৫০-১৬৪৮) ‘ওফাতে রসুল’ নামক কাব্য গ্রন্থেও প্রতিফলিত হয়েছে।

কুরআনের প্রত্যক্ষ বঙ্গানুবাদ ও তাফসির

১৭৩৭ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির শাহ ওয়ালিউল্যাহ ফার্সি ভাষায় কুরআনের অনুবাদ করেন। এর ৬১ বছর পর ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ১৮০৮-১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে আমপারার একটি প্রত্যক্ষ বঙ্গানুবাদ প্রকাশের সন্ধান পাওয়া যায়। অনুবাদক ছিলেন রংপুরের মটুকপুর নিবাসী আমির উদ্দীন বসুনিয়া। এ খণ্ডিত অনুবাদটি ছিল বাংলা পুঁথি সাহিত্যের ভাষায় আমপারার কাব্যানুবাদ। শাহ ওয়ালিউল্যাহ অনুবাদের ১৪৪ বছর পর ব্রাহ্মণ ধর্মাবলম্বী গিরিশ চন্দ্র সেন (১৮৩৫-১৯১০) কর্তৃক বঙ্গানুবাদিত স¤পূর্ণ কুরআন প্রকাশিত হয় ১৮৮১-১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে। আমির উদ্দীন বসুনিয়ার পর কুরআনের বঙ্গানুবাদে এগিয়ে আসেন কলকাতার পাটওয়ার বাগানের মির্জাপুর মহল্লার অধিবাসী আকবর আলী। ব্রিটিশ ভারতের অধিবাসী রাজেন্দ্রনাথ মিত্র, গিরিশ চন্দ্র সেন (১৮৩৫-১৯১০), খ্রিষ্টান পাদ্রি তারাচরণ বন্দোপাধ্যায়, টাঙ্গাইলের মাওলানা নঈমুদ্দিন (১৮৩২-১৯০৮), দিনাজপুরের আকবর উদ্দিন, ব্রিটিশ ভারতের অধিবাসী একজন দেশীয় খ্রিষ্টান শ্রী ফিলিপ বিশ্বাস প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। এদের মধ্যে গিরিশ চন্দ্র সেনের বঙ্গানুবাদটি ছিল পূর্ণাঙ্গ আর অন্যদের অনুবাদ ছিল খণ্ডিত। গিরিশ চন্দ্র সেনের অনুবাদটি অনেকটা আক্ষরিক পর্যায়ের। এতে টীকা-টিপ্পনী সংযুক্তির ফলে এটাকে অর্থানুবাদ বললেও অত্যুক্তি হবে না। এর ভাষা প্রাঞ্জল। তবে সংস্কৃত শব্দের প্রভাবও কম নয়। প্রাথমিক পর্যায়ের কুরআন হিসেবে বিভিন্ন মুসলিম পণ্ডিত ও সাহিত্যিকদের কর্তৃক অনুবাদটি প্রশংসিত হলেও অনুবাদটি ত্রুটিমুক্ত নয়। উদাহরণস্বরূপ সূরা ইখলাসের ‘আস সামাদ’ শব্দের অনুবাদটি লক্ষণীয়। তিনি শব্দটির অনুবাদ করেছেন ‘নিষ্কাম’ অথচ এর সঠিক অর্থ হবে ‘অমুখাপেক্ষী’। তিনি তার অনূদিত কুরআনের বিভিন্ন স্থানে স্বধর্মের প্রভাব বিস্তারেও প্রয়াসী হন। দৃষ্টান্তস্বরূপ সূরা হুমাযার অনুবাদের একটি টীকা লক্ষণীয়। তিনি বলেন “এই সূরাতে নরক যে বাহিরে নয়, অন্তরে ইহাই পরিব্যক্ত হইয়াছে”।* গিরিশ চন্দ্র সেন (অনূদিত) কুরআন শরীফ (কলকাতা হরফ প্রকাশনী, ১৯৭৯)
আকবর আলীর অনুবাদটি ‘তরজমা আমছে পারা’ নামে বাংলা পুঁথি সাহিত্যের ভাষায় একটি কাব্যানুবাদ। এটি কলকাতা থেকে ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে মাওলানা নঈমুদ্দীন সর্বপ্রথম কুরআনের বঙ্গানুবাদসহ ভাষ্য রচনা করেন। তাঁর অনূদিত কুরআন হতে ১ম থেকে ৯ম পারা পর্যন্ত তাঁর জীবদ্দশায় (১৮৮৭-১৯০৮) খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে প্রকাশিত হয়। অতঃপর তাঁর পুত্রগণও তাঁর অনুসরণ করে ২৩ পারা পর্যন্ত কুরআনের বঙ্গানুবাদ ও ভাষ্য ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশ করেন। শ্রী ফিলিপ বিশ্বাসের অনুবাদটি ছিল খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অনুবাদটি ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হলে তৎকালীন জনতার প্রতিবাদের মুখে ব্রিটিশ সরকার তা বাজেয়াপ্ত করে।
ঊনিশ শতকে বাঙালি মুসলিম পণ্ডিত ও সাহিত্যিকদের ধর্মপ্রচারক ও কুরআনি সাহিত্য চর্চার ফলে মুসলমানদের স্বধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবোধ উজ্জীবিত হয়েছিল। এ সময় খ্রিষ্টান, আর্য, ব্রাহ্মধর্মের পণ্ডিতদের লিখনি দ্বারা স্বধর্ম প্রচারে তৎপরতা লক্ষ করা যায়। তখন এ সময় মুসলিমদের ক্ষুরধারা লিখনিও ইসলামের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে এবং মুসলিম চেতনা ও স্বাতন্ত্র্যবোধ রক্ষায় সক্রিয় ছিল। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেও এ মুসলিম চেতনা ও স্বাতন্ত্র্যবোধ অব্যাহত থাকে। বাঙালি মুসলমানদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনধারায় এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এ অখণ্ড ভারতে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কুরআনের পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ ও ভাষ্য চর্চায় যারা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন তাদের মধ্যে মাওলানা মুহাম্মদ আব্বাস আলী (১৮৫৯-১৯২৩), মাওলানা তসলিমুদ্দীন আহমদ (১৮৫২-১৯২৭), আবুল ফজল আবদুল করিম (১৮৭৫-১৯৪৭), মুহাম্মদ আব্দুল হাকীম (১৮৮৭-১৯৫৭) ও মুহাম্মদ আলী হাসান, মাওলানা ওসমান গনি ও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (রহ)। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের সর্বশেষে কুরআনের পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ হলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (রহ)। তবে তাঁর অনুবাদ আজও প্রকাশ হয়নি। ‘মহাবাণী’ নামে এর মাত্র ১০টি সূরার বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে।বাংলা ভাষায় কুরআন চর্চা উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ । ড. মোহাম্মদ আবদুল অদুদবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলিম পণ্ডিত ও কবি সাহিত্যিকদের অনেকেই বাংলা গদ্যে ও কাব্যাকারে কুরআনের খণ্ডিত অনুবাদ ও ভাষ্য লিখনে অবদান রেখেছিলেন। এঁদের মধ্যে কয়েকজন অমুসলিম পণ্ডিত অনুবাদকও রয়েছেন। বাংলা ভাষায় কুরআনি সাহিত্য চর্চায় এই সব অনুবাদ খণ্ডিত অনুবাদ ও প্রকাশিত অনুবাদগুলোর নিম্নোক্ত মুসলিম ও অমুসলিম পণ্ডিত, কবি-সাহিত্যিক ও তাঁদের কৃত অনুবাদগুলো উল্লেখযোগ্য।
আবদুল মজিদ অনূদিত ‘কোরান শরীফ’ (১৯০৭), শ্রী কিরণ গোপাল সিংহ (১৮৮৫-১৯৪২), আমপারা কাব্যানুবাদ (১৯০৮), মুন্সী করিম বক্স (১৮৭৫-১৯৪৭) অনূদিত ‘কোরান শরীফ’ ১ম পারা (১৯১৬) ও আমপারা (১৯১৮), মাওলানা মোহাম্মদ রুহুল আমিন (১৮৭৫-১৯৪৫) অনূদিত ও ব্যাখ্যাত ‘কোরান শরীফ’ ১ম, ২য়, ৩য় পারা ও ‘আমপারা’ (১৯১৭-১৯৩০), এয়ার আহমদ এল টি (মৃ. ১৯৪৪) এর ‘আমপারার বাংলা তফসির, (১৯২০), আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর (১৮৭৯-১৯৫১) গদ্যে ও পদ্যে অনূদিত ‘মহাকোরান কাব্য’-আমপারা (১৯২৭), মীর ফজল আলীর (১৮৯৮-১৯৩৯) ‘কোরান কণিকা’ (১৯৩০), আবদুল ওয়াসেক (১৮৭১-১৯৪৬) অনূদিত ‘আমপারা’ (১৯৩৩), কবি মুহাম্মদ আবু বকর (১৯১২-১৯৭৩) অনূদিত ‘আমপারা’ (১৯৩৩), কাজী নজরুল ইসলামের (১৯৯৯-১৯৭৬) ‘কাব্য আমপারা’ (১৯৩৩), মোহাম্মদ গোলাম আকবরের (মৃ. ১৯৫৬), ‘আমপারার তফসির’ (১৯৩৬), মুহাম্মদ ইব্রাহিম (১৮৭৭-১৯৪০) অনূদিত ‘আমপারা’-১ম ও ২য় সোপান (১৯৩৬-১৯৩৮), আবদুর রশীদের ‘সরল আমপারা’ (১৯৩৯) নূর মহল বেগমের (১৯১৯-১৯৭৩), ‘কোরান মুকুল’ (১৯৪০), মীজানুর রহমানের (১৯০০-১৯৬০) ‘নূরের ঝলক’ ও ‘বেহেস্তী সওগাত’ (১৯৪৪-১৯৪৭), মুফতী মুহাম্মদ ওয়াফীর ‘তাফসীর পারা আম্ম’ (১৯৪৫), মাওলানা কুদরাত-ই-খুদার (১৯০০-১৯৭৭) ‘পবিত্র কোরআনের পূত কথা’ ১ম ও ২য় ভাগ (১৯৪৫-১৭৪৭) ও রংপুর নিবাসী মুনীর উদ্দিন আহমদের ‘হাফিজীল কাদেরী’ (১৯৪৭) ইত্যাদি।
উল্লিখিত পবিত্র কুরআনের খণ্ডিত অনুবাদগুলোর মধ্যে মাওলানা রুহুল আমিনের অনুবাদটি ছিল তাঁর পূর্ববর্তী ও সমসাময়িক যুগের কুরআনের অনুবাদকদের বিভ্রান্তিকর অনুবাদের খণ্ডন স্বরূপ।

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হলে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ফলে বঙ্গদেশ তথা বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম ভারতের অঙ্গিভূত হয়ে যায়। আর আসামের সিলেট জেলাসহ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তনের পূর্বাংশে পরিণত হয়। অখণ্ড ভারতের বাঙালি মুসলিম পণ্ডিত ও কবি সাহিত্যিকদের সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের তৎপরতা কলকাতায় কেন্দ্রীভূত ছিল। কিন্তু দেশ বিভাগের পর পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের জন্য সাহিত্যকর্মের মূল কেন্দ্র হিসেবে ঢাকা কলকাতার স্থলাভিষিক্ত হয়। এ দিকে পূর্ববঙ্গে বাংলা ভাষা আন্দোলনেরও তৎপরতা শুরু হয়। এ সময় স্বাধীনতাত্তোর উভয় দেশের উভয় বঙ্গে বাঙালি মুসলিম পণ্ডিত ও কবি সাহিত্যিকরাও নব উদ্দীপনায় সাহিত্য-চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। বাংলা সাহিত্যের ধর্মীয় শাখায় কুরআনি সাহিত্যেও এর বেশ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এ সময় উভয় বঙ্গে বাঙালি মুসলিম পণ্ডিত ও কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেই গদ্য ও পদ্যাকারে কুরআনের বঙ্গানুবাদ, কুরআনের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত গ্রন্থাবলি ও প্রবন্ধ রচনা করে কুরআনি সাহিত্য-চর্চাকে সমৃদ্ধ করতে মনোনিবেশ করেন। পাক-ভারতের স্বাধীনতাত্তোর ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে এ উপমহাদেশে কুরআনি সাহিত্য চর্চায় কুরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও ভাষ্য লিখনে যারা বিশেষভাবে অবদান রেখেছিলেন তাদের মধ্যে খান বাহাদুর আবদুর রহমান খাঁ (১৮৯০-১৯৬৪), ঢাকার ইমদাদিয়া লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গঠিত কুরআনের অনুবাদ বোর্ড, মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (১৯১৮-১৯৮৭), হাকীম আবদুল মান্নান (জ. ১৯২২), ঢাকার ইসলামিক একাডেমী কর্তৃক গঠিত কুরআনের অনুবাদ বোর্ড, কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), অধ্যক্ষ আলী হায়দার চৌধুরী, মুহাম্মদ আবদুল বারী (১৯৩২-১৯৯৯), ও মাওলানা মোহাম্মদ তাহের (১৯২২-১৯৯৪) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

বাংলা সাময়িকপত্রে কুরআন চর্চা

পবিত্র কুরআনের বঙ্গানুবাদ, ব্যাখ্যা ও কুরআনের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে স¤পর্কিত বিভিন্ন প্রবন্ধ রচনার মাধ্যমে কুরআন চর্চার ক্ষেত্রে বাংলা সাময়িক পত্রের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের মাঝামাঝি সময়ে বাংলা সাময়িকপত্রে পবিত্র কুরআনের বঙ্গানুবাদ চর্চা লক্ষ করা যায়। আলোচ্য শতাব্দীর ৭০ এর দশক থেকে বাংলা সাময়িক পত্রে পবিত্র কুরআনের বঙ্গানুবাদ চর্চা আরম্ভ হয়। কলকাতার অধিবাসী ভারতীয় খ্রিষ্টান তারাচরণ চট্টোপাধ্যায় জনৈক মাওলানার সহযোগিতায় ও মাওলানা আবদুল কাদেরের উর্দু ভাষায় অনূদিত কুরআনের সাহায্যে প্রায় ১২ পারা পর্যন্ত পবিত্র কুরআনের বঙ্গানুবাদ করেন। আর এই অনুবাদ চন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বঙ্গমিহির’ পত্রিকায় ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়। এবং ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে অনুবাদটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। অতঃপর ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত মুন্সী রেয়াজুদ্দীন আহমদ (১৮৬২-১৯৩৬) স¤পাদিত ‘ইসলাম প্রচারক’ পত্রিকায় বিভিন্ন সংখ্যায় বিক্ষিপ্তভাবে প্রকাশিত হতে থাকে।
উনিশ শতকের শেষে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বাংলা-পাক-ভারতে খ্রিষ্টান মিশনারিদের ইসলামবিরোধী তৎপরতা বেড়ে গেলে তা প্রতিহত করার লক্ষ্যে মুন্সি আব্দুর রহিম (১৮৫৯-১৯৩১) ও মুহাম্মদ রিয়াজ উদ্দীন আহমদ (১৮৬২-১৯৩৩) প্রমুখ মুসলিম পণ্ডিত আবু মুহাম্মদ আবদুল হক হক্কানী কৃত উর্দু তাফসিরের ভূমিকা অংশের বঙ্গানুবাদ করে ‘ইসলামতত্ত্ব’ নামক সাময়িকপত্রে প্রকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীকালে সুফী মধুমিয়া ওরফে ময়েজ উদ্দীনের (মৃ. ১৯২০) মাসিক ‘প্রচারক’ পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়। এছাড়াও ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে শামসুদ্দীন আহমদের ‘বেদ ও কুরআন’ প্রবন্ধ ‘শরীয়তে এসলাম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ আবদুল কাদের বখতেয়ারীর ‘কুরআনের বৈশিষ্ট্য’ প্রবন্ধ ‘শরিয়াতে এসলাম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ নূরুল হকের ‘কুরআনের উপদেশ’ প্রবন্ধ ‘আল-ইসলাম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে খান বাহাদুর কামরুদ্দিন আহমদের ‘কুরআনে মানবের স্থান ও অর্থনীতি’ প্রবন্ধ ‘মাসিক সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে আবদুল মজিদ সাহিত্য রত্নের ‘কুরআনের শিক্ষা’ প্রবন্ধ ‘আল-ইসলাহ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (রহ)-এর ‘শবে কদর ও কুরআন অবতরণের তারিখ’ প্রবন্ধটি ‘মা. দিলরূবা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে মীজানুর রহমানের ‘কালামুল্লাহ’ প্রবন্ধটি ‘আল-ইসলাহ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
সারকথা হলো, বাংলা ভাষায় কুরআন চর্চা পরোক্ষ সূচনা হয় বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে (১২০২-১৮০০ খ্রি:)। আর এ জাতীয় চর্চার প্রত্যক্ষ কার্যক্রম শুরু হয় আধুনিক যুগে অর্থাৎ উনিশ শতকের গোড়ার দিকে। এ শতকের সত্তর এর দশক পর্যন্ত কতিপয় মুসলিম পণ্ডিত ও কবি-সাহিত্যিক পবিত্র কুরআনের খণ্ডিত অনুবাদ করে প্রকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তবে এগুলোর অধিকাংশই ছিল বাংলা পুঁথি সাহিত্যের ভাষায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুলগ্নে সর্বপ্রথম মাওলানা আমির উদ্দীন বসুনিয়া ১৮০৮-১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে কুরআনের আংশিক অনুবাদ করেন। এরপর গিরিশ চন্দ্র সেন পবিত্র কুরআনের একটি পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ করেন। অতঃপর পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকপত্রে বিক্ষিপ্তভাবে এবং গ্রন্থকারে পবিত্র কুরআনের খণ্ডিত অনুবাদ ও ভাষ্যের প্রকাশনা পরিলক্ষিত হয়।
পূর্ণকথা হলো উল্লিখিত বাংলার এই প্রথিতযশা বিজ্ঞ পণ্ডিতদের ‘বাংলা ভাষায় পবিত্র কুরআন চর্চা’ ধর্মীয় শিক্ষা ও শিল্প সাহিত্যের ধারা উন্মুক্ত করেছে। বাংলা ভাষাভাষী সকল ধর্ম বর্ণের মানুষ কুরআনের অমিয় বাণী হৃদয়াঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছে এবং কুরআন চর্চার মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের মূল প্রতিপাদ্য আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কে কৃষক-চাষী, জেলে-মজুর, কামার কুমার তাঁতীসহ নিম্নবিত্ত অক্ষর জ্ঞানহীন জনসাধারণও অবহিত হয়েছে।

লেখক : সাবেক সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

SHARE

Leave a Reply