বাকশাল আর স্বৈরাচারের নব্যরূপ দেখছে এখন বাংলাদেশের মানুষ

index-300x140২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাধীনতার এই সংগ্রাম শুরু হয়েছিলো এই মার্চে। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক এ জন্য অবশ্যই আমরা গর্বিত। কিন্তু গণতন্ত্র, মানবতা, সামাজিক নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা যে আজ প্রশ্নবিদ্ধ এ সম্পর্কে কারো কোনো দ্বিমত নেই। গণতন্ত্র এখন কেবল কেতাবি ভাষায় পরিণত হয়েছে।
বাকশাল আর স্বৈরাচারের নব্যরূপ দেখছে এখন বাংলাদেশের মানুষ। মানুষের অধিকার ভূলুুণ্ঠিত, মানবতা আজ লাঞ্ছিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হচ্ছে সমগ্র জাতি। সুবিচার, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এখন অলৌকিক ব্যাপার। সুতরাং স্বাধীনতার রক্তবন্যার যে ঋণে আবদ্ধ করে রেখেছেন আমাদের শহীদেরা সে ঋণ পরিশোধে আরো বহু পথ পাড়ি দিতে হবে নিঃসন্দেহে।
অত্যাচার, অবিচার ও নির্যাতনের অবসান, ইনসাফ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বৈষম্যের নিরসন, মৌলিক মানবাধিকার, সামগ্রিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের চেতনাই একাত্তরের সংগ্রামে আমাদের চালিকাশক্তি ছিল এবং স্বাধীনতা অর্জনের পর স্বাভাবিকভাবেই জাতি আশা করেছিল যে তাদের এই স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, অনেক মৃত্যু ও দুঃখ-বেদনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও শোষণমুক্ত মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। মানুষ যেমন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি বিচারের নামে অবিচারের শিকারও হচ্ছে চরমভাবে।
তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক মানুষ হত্যা আজ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গ্রেফতারবাণিজ্য, রিমান্ডের নামে অমানবিক নির্যাতন, জামিনের পর কোনো ধরনের মামলা ছাড়া জেলগেট থেকে পুনরায় গ্রেফতার, রাজনৈতিক মামলার নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুলিশি হয়রানি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। দেশটা যেন আজ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের গণদাবি উপেক্ষা, সংখ্যালঘু নির্যাতন আর জঙ্গিবাদের নতুন নতুন নাটক সাজাচ্ছে সরকার। কিন্তু সরকারের কোনো নাটকই হালে পানি পাচ্ছে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচনে ভোটাধিকারের সুযোগ পেয়ে জনগণ তার উত্তম জবাব দিচ্ছে। সরকারের দলীয় ক্যাডার কর্তৃক ভোটকেন্দ্র দখল, পুলিশ কর্তৃক অত্যন্ত ঘৃণ্য কায়দায় জাল ভোট প্রদানসহ সরকার ও প্রশাসনের নানামুখী চাপেও জনগণ যতটুকু ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে তাতেই একদলীয় নির্বাচিত সরকারের প্রতি অনাস্থায় সরকারের ভিত নড়ে উঠেছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনও চালাতে দেয়া হচ্ছে না। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি সঙ্কটাপন্ন এবং জনদুর্ভোগ চরমে উঠেছে। একদলীয় শাসন ও ব্যক্তিপূজা আমাদের জাতীয় মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমরা পিণ্ডির আধিপত্য মানিনি, স্বাধীনতা অর্জন করেছি কিন্তু একশ্রেণীর রাজনৈতিক দল আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আধিপত্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অবস্থার অবসান দরকার। স্বাধীনতার এই দিনে আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সার্বভৌম অবস্থানের বিষয়টি মূল্যায়ন করে তা পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করতে না পারলে স্বাধীনতা অর্থবহ হবে না।
১১ মার্চ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের শহীদ দিবস। ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ছাত্রশিবির আয়োজিত নবাগত ছাত্রসংবর্ধনা অনুষ্ঠানের ওপর চালানো হয় এক নারকীয় লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড। শাহাদাত বরণ করেন শাব্বির আহম্মেদ, আব্দুল হামিদ, আইয়ুব, আব্দুল জব্বার…
সেদিনের সেই রক্তস্রোত শুধুমাত্র শোকের নয়; বরং শোককে শক্তিতে পরিণত করার এক শিলাদীপ্ত প্রত্যয়। সেই প্রত্যয়ের স্রোতে, প্রতিকূল তরঙ্গমালা ভেঙে ক্রমাগত সামনে এগিয়ে চলবে সত্যের নির্ভীক কাফেলাÑ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
স্বাধীনতা অর্জনের এই মাসে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সরকারের সকল প্রকার অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে দেশ গঠনে এগিয়ে আসবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

SHARE

Leave a Reply