বাঙালিদের ইসলামী সংস্কৃতি ও মওলানা আকরম খাঁ -হামিদুর রশিদ জামিল

মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮) একাধারে রাজনীতি, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি একজন ইসলামী পণ্ডিতও বটে।
তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলার চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমায় মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ১৮৬৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মওলানা হাজী আবদুল বারী খাঁ গাজী। আবদুল বারী খাঁ নিজে ছিলেন একজন আলেম ও জিহাদিচেতনা সম্পন্ন মানুষ। সৈয়দ আহমদ শহীদ ব্রেলভীর নেতৃত্বে পরিচালিত শিখ ও ইংরেজ বিরোধী জিহাদে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে সীমান্ত প্রদেশে গমন করেন। ফলে তিনি ‘গাজী’ খেতাব লাভ করেন। এহেন একজন গাজীর পুত্র হিসাবে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁও ছিলেন জিহাদি মনোভাবাপন্ন এক লড়াকু ব্যক্তিত্ব। তার পূর্ব-পুরুষেরা ছিলেন কুর বা ব্রাহ্মণ। পরবর্তীতে তাঁরা ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম কবুল করেন। কথিত আছে, মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একই বংশোদ্ভূত। উভয়েরই পূর্ব-পুরুষ ছিলেন কুলীন ব্রাহ্মণ।

শৈশবেই তিনি পিতৃ-মাতৃহীন হন। অতি কষ্ট এবং দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে তার শৈশব-জীবন অতিবাহিত হয়। এ কারণে তিনি নানা দুঃখ-কষ্ট ও দারিদ্র্যের মধ্যেও বিদ্যাশিক্ষা চালিয়ে যান এবং কঠোর নিষ্ঠা ও সাধনায় মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত কৃতিত্বের সাথে উচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯০০ সালে তিনি কলকাতা মাদরাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে এফ.এম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্রজীবনে তিনি ইংরেজি-বাংলা শেখার সুযোগ না পেলেও পরবর্তীতে নিজ চেষ্টায় বাংলা, সংস্কৃতি ও ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেন। আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষায়ও তিনি বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন।
তিনি প্রথমেই চিন্তা করলেন লেখালেখি ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে জাগাতে হবে। ‘আলতাফী প্রেস’ থেকে ১৯১০ সালে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ প্রথমে ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ পত্রিকা প্রকাশের সময় ‘বলকান’ যুদ্ধ চলছিল। এ সময় মুসলমানগণ ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মুসলমানদের এ আবেগ ও ক্ষোভের বিষয় ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় বিশেষভাবে তুলে ধরার কারণে পত্রিকাটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কিন্তু ইংরেজ সরকার এ পত্রিকাটি সহ্য করতে পারেনি। তাই সরকারের আদেশে তা অচিরেই বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে এখান থেকেই মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ‘আল ইসলাম’ নামে আর একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯২২ সালে কংগ্রেসের অসহযোগিতা আন্দোলনের প্রাক্কালে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ‘মোহাম্মদী’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। কিন্তু সরকার অল্প দিনের মধ্যেই এ পত্রিকাটিও বন্ধ করে দেয়। অতঃপর ১৯৩৭ সালে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর পরিচালনায় এবং সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের সম্পাদনায় ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা বাঙালি মুসলমানের প্রথম দৈনিক পত্রিকা। তার সম্পাদিত আরো দু’টি স্বল্পায়ু পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রথমটির নাম ‘সেবক’ ও দ্বিতীয়টির নাম উর্দু ‘দৈনিক জামানা’। আজাদী আন্দোলন, মুসলিম নব-জাগরণ ও মুসলমানদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য চিন্তার বিকাশে এসব পত্রিকার অবদান ছিল সীমাহীন। তাই তাঁকে যথার্থই মুসলিম বাংলার ‘সাংবাদিকতার জনক’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়।

বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি বাঙালি মুসলমানদের একটি সাহিত্য সংগঠন। কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের (১৮৯৩) অনুপ্রেরণায় কয়েকজন উদীয়মান মুসলিম লেখক ১৯১১ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৭-১৮ সালে পরিচালক পরিষদের সভাপতি পদে ছিলেন আবদুল করিম, সহসভাপতি খান বাহাদুর আহছানউল্লা ও মোহাম্মদ আকরম খাঁ।
পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও তাদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে গঠিত একটি সংগঠন। ১৯৪২ সালের ৩০ আগস্ট কলকাতার দৈনিক আজাদ পত্রিকার অফিসে সাহিত্যিক ও ছাত্রদের এক ঘরোয়া বৈঠকে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সোসাইটি প্রতিষ্ঠার পটভূমিতে ছিল ১৯৪০ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের লাহোর প্রস্তাব ও তৎপরবর্তী পাকিস্তান আন্দোলন। ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে সোসাইটি ইসলামিয়া কলেজে প্রথম বার্ষিক সম্মেলন করে। তাতে সাহিত্য-সংস্কৃতিবিষয়ক মোট ১১টি শাখায় প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খাজা নাজিমুদ্দীন, খাজা শাহাবুদ্দীন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, হাসান সোহরাওয়ার্দী, নুরুল আমীন, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, এ. কে ফজলুল হক, আবুল কাশেম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

মওলানা আকরম খাঁ শিক্ষা কমিশন (১৯৪৯) প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে সুপারিশ পেশ করার জন্য ১৯৪৯ সালে পাকিস্তানে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। এই কমিটির প্রধান ছিলেন মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ এবং এই কমিটি আকরম খাঁ কমিটি অন এডুকেশন নামে পরিচিত। কমিটি ১৯৫২ সালে রিপোর্ট পেশ করে। ১৯৪৯ সালে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ কমিটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সুপারিশ করে। ১৯৬৩ সালের ৩১ মে ড. এস. এম. হোসাইন-এর সভাপতিত্বে ‘ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন’ গঠন করা হয়।

‘সংস্কৃতি’ শব্দটি মূলত সংস্কৃত ভাষার শব্দ। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ‘কালচার’ যার অর্থ কর্ষণ করা। আর আরবী প্রতিশব্দ হলো ‘আস সাকাফাহ’। অর্থ উপলব্ধি করা, জানা ও প্রশিক্ষণ পাওয়া। রুচিশীল ব্যক্তিকে বলা হয় ‘মুসাক্কাফ’ বা সংস্কৃতিবান। সুতরাং সংস্কৃতি অর্থ হলো সংস্করণ, বিশুদ্ধকরণ, অনুশীলনলব্ধ দেহ, মন ও আত্মার উৎকর্ষ সাধন। আবার ইসলামী সংস্কৃতি হলো ইসলামের মূলনীতির উপর ভিত্তি করে মানুষ তার আচার-ব্যবহার, দেহ, মন ও আত্মাকে যেভাবে সংস্কার ও সংশোধন করে, তাই ইসলামী সংস্কৃতি। ড. সালেহ হিন্দি ইসলামী সংস্কৃতির সংজ্ঞায় বলেন, এ হলো এমন এক জীবনপদ্ধতি যা মুসলমানগণ প্রতিনিয়ত প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টি ভঙ্গি ও জীবনাদর্শের আলোকে অবলম্বন করছে। চাই তা সামাজিক জীবনের বৈষয়িক ক্ষেত্রেই হোক কিংবা সভ্যতা নামে পরিচিত আত্মিক চিন্তার ক্ষেত্রে হোক।

মুসলিম বাংলার দীর্ঘ ইতিহাসে (সত্যিকারের) ইসলামী ভাবধারা ও আদর্শে অনুপ্রাণিত এরূপ একজন চরিত্রবান শাসনকর্তা, সরকারি কর্মচারী ও রাজনৈতিক নেতার সাক্ষাৎ আমরা পাই না, যিনি বাংলার মুসলমানদিগকে তাহাদের ব্যক্তিগত অথবা সমাজ জীবনে প্রেরণা জোগাতে সক্ষম ছিলেন। ইহাই ছিল মুসলিম সমাজের মানসিক খাদ্যের দুর্ভিক্ষ, যা উহাকে ভিতর হতে ধ্বংস ও অধঃপাতিত করে চলেছিল।

দূরদর্শী চিন্তানায়ক মওলানা আকরম খাঁ এরপর বলেন, ‘মুসলিম মানস যখন সম্পূর্ণভাবে ইসলামী ভাবধারা ও আদর্শ বিবর্জিত এবং উহার নিজস্ব তাহজিব-তমদ্দুনের সহিত পরিচয়শূন্য হয়ে শয়তানের কারখানায় পরিণত হতে চলেছে, ঠিক সেই সময় বাংলার হিন্দুদের মধ্যে বুদ্ধি ও ধর্মের এক অভূতপূর্ব জাগরণ দেখা দেয়। বলা বাহুল্য হিন্দু বাংলার এই বুদ্ধির জয়যাত্রা ধর্ম ও পৌরাণিক সাহিত্যকে ভিত্তি করিয়াই শুরু হয়। এই সময় মুসলমানদের ধর্মীয় অবস্থা চরম শোচনীয় অবস্থায় ছিল। মোগল হেরেমে নিয়মিত মূর্তিপূজা ও অগ্নিপূজা চলতো, সালামের বদলে সিজদা চালু ছিল, গরু কুরবানি আকবরের আইনে নিষিদ্ধ ছিল, হিন্দু-মুসলিম বিবাহ মহা ধুমধামে অনুষ্ঠিত হতো। বাংলার মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজ এমন কলুষিত ইসলামবিরোধী আবহাওয়ার মধ্যে অবস্থান করছিল যে, হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায় হ’তে ধর্মান্তরিত নও-মুসলিমদের পক্ষে ইসলামের সত্যিকারের শিক্ষা ও আদর্শের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কোন সুযোগই ছিল না। ফলে বিভিন্ন আরবী ও ফারসী নামের আড়ালে মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ ঘটে অসংখ্য শিরক ও বিদয়াতী অনুষ্ঠান। আকবর কর্তৃক উত্তর-পশ্চিম ভারত হতে স্থানান্তরিত একদল ধর্মদ্রোহী পীর ও ফকিরের আগমনের ফলে এই সময় বাংলার মুসলমানের ধর্মীয় অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়ে। মুসলমানগণ কিভাবে সরাসরি হিন্দুদের দেব-দেবীগণকে আপন করে নিজেদের পীর হিসাবে বরণ করে নিয়েছিল তা দেখাবার জন্য ড. দীনেশচন্দ্র সেন ‘কালুগাজী চম্পাবতী’ নামক পুঁথি, ‘জেবুল মুলক শামা রুখ’ কাব্য প্রভৃতি পুঁথিকাব্য সমূহের নাম উল্লেখ করেছেন। সপ্তদশ শতকের মুসলিম কবি জনৈক মোহাম্মদ আকবরের (জন্ম ১৬৫৭ খ্রি.) একখানি পুঁথিকাব্যের প্রারম্ভে মা হাওয়াকে মা কালী ও হযরত মোহাম্মদ সা.-কে শ্রী চৈতন্য রূপে দেখানো হয়। যেমন তিনি বলেন,
মা হাওয়া বন্দম জগৎ জননী
হিন্দুকুলে কালী নাম প্রচারে মোহিনী।
হযরত রছুল বন্দি প্রভু নিজ সখা
হিন্দুকুলে অবতারি চৈতন্য রূপে দেখা।
দুর্ভাগ্য বর্তমান সময়ের দুইজন প্রখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত (ড. এনামুল হক ও আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ) উক্ত বন্দনা গীতিটিকে খুবই প্রশংসা করেছেন। অমনিভাবে ‘নূরন্নেহার ও কবির কথা’ নামক গীতি কাব্যের রচয়িতা লিখেছেন ‘বিছমিল্লাহ ও শ্রী বিষ্ণু একই কথা। আল্লাহ দুই অংশে বিভক্ত হইয়া রাম ও রহিম হইয়াছেন।’ শুধু বাংলা সাহিত্য নয় ফারসি ও উর্দু সাহিত্যের মাধ্যমেও মুসলিম সমাজের সর্বনাশ ঘটানো হয়েছে। যেমন মোহাম্মাদ সা.-কে আল্লাহর আসনে বসাতে গিয়ে মিলাদের কবিতায় বলা হয়েছে-
ওহ্ জো মুস্তাবী আরশ থা খোদা হো ক
উতার পড়া হ্যায় মদীনা মেঁ মুছতফা হো ক
অর্থ : যিনি আরশের উপর খোদারূপে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তিনিই মদীনায় অবতরণ করলেন ‘মোছতফা’ হয়ে। এরই সুরে সুর মিলিয়ে বাংলার কবি লালন শাহ (১৭৭২-১৮৯০ খ্রি.) গেয়ে ওঠেন, ‘আকার কি নিরাকার সাঁই রববানা, আহমদ আহাদ হ’লে তবে যায় জানা’। প্রখ্যাত ইরানী কবি হাফেয শীরাযী (মৃ. ৭৯১ হি./১৩৮৯ খ্রি.) বলেন,
‘হাফেয! যদি মিলন চাও, তাহলে সকলের সাথে সন্ধি করে চলো। মুসলমানের সাথে আল্লাহ। আর ব্রাহ্মণের সাথে রাম রাম’ (দিওয়ানে হাফেয)।
কর্মজীবনে প্রবেশ করেই মওলানা আকরম খাঁ মুসলমানদের অধঃপতনের মূল কারণ অনুসন্ধান করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, মুসলমানদের এই ক্রমাবনতির মূল কারণ হল তার নিজের সত্তা সম্পর্কে অজ্ঞতা। তিনি দেখতে পেলেন যে, মুসলমানের মূল তওহিদ বিশ্বাসেই ঘুণ ধরেছে। তিনি সর্বপ্রথমে এর বিরুদ্ধে কলম ধরেন এবং প্রমাণ করেন যে, ইসলামে রেওয়াজ পূজা ও অন্ধ তাকলিদের কোন স্থান নেই। বরং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে কিয়ামত ঊষার উদয় কাল পর্যন্ত অনাগত ভবিষ্যতের অসংখ্য সমস্যাবলির সমাধান অবশ্যই সম্ভব এবং প্রতি যুগের যোগ্য আলেমগণ কুরআন ও হাদিস ব্যাখ্যা করার অধিকার রাখেন। তিনি ইংরেজ প্রবর্তিত দ্বিমুখী শিক্ষানীতির তীব্র বিরোধিতা করেন। এতদ্ব্যতীত তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যখন মুসলমানদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করতে থাকে তখন মুসলিম ছাত্রদের হীনমন্যতা এত নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তারা রীতিমত টেরি কেটে ধুতি পরে ক্লাসে যেত এবং তা দেখে যখন হিন্দু বন্ধুরা বলতো ‘কিরে লতিফ! চমৎকার ধুতিখানা পরেছিস তো, তোকে দেখে কারুর বাবার সাধ্য নেই যে, তোকে মুসলমান বলে’। তখন মুসলিম ছাত্ররা আহলাদে আটখানা হয়ে বলতো ‘সকলে তাই-ই তো বলে’।

‘শ্রী’ হিন্দুদের বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী ‘সরস্বতী’ এবং ‘পদ্ম’-কে তার আসন হিসাবে মনে করা হতো। এ পৌত্তলিক ভাবধারার মনোগ্রাম কখনো কোনো মুসলমান গ্রহণ করতে পারে না, এটা তাদের ঈমান ও আকিদার খেলাপ। মওলানা আকরম খাঁ তার বিভিন্ন লেখায় এ সম্পর্কে অকাট্য যুক্তিসহ তার বক্তব্য তুলে ধরেন এবং মুসলমান সমাজ দৃঢ় ভাবে তাঁর পক্ষ সমর্থন করে। কবি রবীন্দ্রনাথসহ অনেকেই ‘বন্দে মাতরম’ অর্থে দেশ মাতৃকা ও ‘শ্রীপদ্ম’ অর্থে বাংলাদেশের একটি বিশেষ ফুল বলে ব্যাখ্যা দিলেও মুসলমান সমাজ তা গ্রহণ করেননি। এ আন্দোলনের ফলে দীর্ঘকাল থেকে মুসলমানের নামের আগে হিন্দুরা ইচ্ছাকৃতভাবে যে ‘শ্রী’ শব্দ ব্যবহার করতো, মুসলমানরা সে সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং ঐ সময় থেকে তারা নামের আগে ‘শ্রী’র পরিবর্তে ব্যাপক ভাবে ‘জনাব’, ‘মৌলভী’ ইত্যাদি ব্যবহার করা শুরু করে। এটা ছিল মুসলমানদের এক ধরনের সাংস্কৃতিক সচেতনতা। এ সচেতনতাবোধের কারণেই মুসলমানদের মধ্যে স্বাজাত্যবোধ দৃঢ়বদ্ধ হয় এবং পাকিস্তান আন্দোলনেও তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও তিনি সদ্য স্বাধীন মুসলিম দেশকে একটি খাঁটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।

ওদিকে হিন্দুদের অপপ্রচারণার ফলে এবং জরংষবু-এর সেন্সাস রিপোর্টের ফলে মুসলমান শিক্ষিত সমাজে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, বাঙালি মুসলমানেরা হাঁড়ি, ডোম, বাগদী নমশূদ্র প্রভৃতি অন্ত্যজ ও অস্পৃশ্য হিন্দুদের বংশধর। জরংষবু তাঁর রিপোর্টে বললেন, বর্ণ হিন্দুদের চেয়ে এদের নাকের উচ্চতা অনেক কম। চোয়ালের হাড়ের উচ্চতা, কোঁকড়ানো চুল প্রভৃতিতে এদের অনার্য্য রক্তের পরিচয় সুস্পষ্ট।
মওলানা আকরম খাঁ ইতিহাস ঘেঁটে প্রমাণ করে দেখিয়ে দিলেন যে, বাংলাদেশী মুসলমানেরা নমঃশূদ্রের বংশধর নয়, বরং তারা ইসলাম কবুলকারী এ দেশেরই উচ্চ বংশের সন্তান এবং অনেকে সরাসরি আরব রক্তের সন্তান।

সাহিত্যকর্ম
সমস্যা ও সমাধান [এই গ্রন্থে লেখকের ইসলামে নারীর মর্যাদা, সুদ সমস্যা, চিত্র (ছবি তোলা) সমস্যা, সঙ্গীত সমস্যা এই চারটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়]
আমপারার বাংলা অনুবাদ
মোস্তফা-চরিত (বর্তমানে খোশরোজ কিতাব মহল হতে প্রকাশিত)
মোস্তফা-চরিতের বৈশিষ্ট্য
বাইবেলের নির্দেশ ও প্রচলিত খ্রিষ্টান ধর্ম
মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস (ঐতিহ্য হতে প্রকাশিত)
তাফসীরুল কোরআন (১-৫ খণ্ড) (খোশরোজ কিতাব মহল হতে প্রকাশিত)
মুক্তি ও ইসলাম

সম্মাননা ও পদক
স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, ১৯৮১; বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার।

মৃত্যু
মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ১৮ আগস্ট ১৯৬৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকার বংশালে আহলে হাদিস মসজিদে প্রার্থনারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
‘যে দেউটি নিভে গেছে, তারই জ্বালা শত দীপশিখা
জ্বলেছে যে ঘরে ঘরে।….
জ্ঞানের সাধক তার মহৎ জীবনে
গভীর সাধনালব্ধ সুচিন্তিত ধ্যানে
যা কিছু পেয়েছে তারে ভরিয়া অঞ্জলী
ছড়ায়ে দিয়েছে। সত্য প্রকাশে কেবলি
প্রয়াস পেয়েছে বার বার,
¯্রষ্টার অমৃতবাণী করেছে প্রচার
যুগে যুগে যে বাণীর স্রােতধারা বয়ে
কাল হ’তে কালান্তরে চলিবে তাহার স্মৃতি ল’য়ে’।
মওলানা স্মরণে লিখিত প্রখ্যাত মহিলা কবি বেগম সুফিয়া কামালের (১৯১১-১৯৯৯) কবিতা।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply