বাঙালি না বাংলাদেশী -এবনে গোলাম সামাদ

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় (১৮৩৪-৯৪ খৃ.)-এর ‘বাঙ্গালীর উৎপত্তি’ নামে একটি প্রবন্ধ আছে। প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘মাসিক বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার ১২৮৭ বঙ্গাব্দের পৌষ সংখ্যায়। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর এই বিখ্যাত প্রবন্ধে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে একজাতি বলতে চাননি। তিনি বলেন, বাঙালি বহু জাতি। কারণ, তাঁর মতে, বাংলাভাষীদের মধ্যে আছে কোল বংশীয় অনার্য; দ্রাবিড় বংশীয় অনার্য; মিশ্র আর্য-অনার্য এবং বিশুদ্ধ আর্য। বঙ্কিমচন্দ্রের মতে বিশুদ্ধ আর্য হল বাংলাভাষী ব্রাহ্মণরা। তিনি ইংরেজদের বলেছেন এক জাতি। কারণ, যদিও ইংরেজরা উৎপন্ন হয়েছে স্যাকসন, ডেন ও নরমান জাতের মিশ্রণে। কিন্তু স্যাকসন, ডেন ও নরমানদের উদ্ভব হতে পেরেছে একই আর্য জাতি থেকে। তিনি বাংলাভাষী মুসলমানকে বাঙালি বলতে চাননি। বলেছেন, এরা হল বাইরে থেকে আসা নবাগত আগন্তক জাতি। এদের মধ্যে নাই কোন আর্য রক্তের লেশ। কিন্তু আজকের বাংলাদেশ সৃষ্টি হতে পেরেছে বাংলাভাষী হিন্দুদের কারণে নয়; বাংলাভাষী মুসলমানদের জন্য। বর্তমান পৃথক রাষ্ট্র বাংলাদেশের মূলে আছে একটা বিশেষ মুসলিম স্বাতন্ত্রবোধ। আর এক কথায় বলতে হয়, এর মূলে আছে বাংলাভাষী মুসলিম জাতীয়তাবাদ। বাংলাভাষী হিন্দু চেয়েছে এবং চাচ্ছে ভারতীয় মাহাজাতির অংশ হয়ে বাঁচতে। কিন্তু বাংলাদেশের বাংলাভাষী মুসলমানের মানসিকতা সেটা নয়। অন্যদিকে বাংলাভাষায় যত লোক কথা বলেন তার মধ্যে প্রায় ৬০ ভাগ বাস করেন বর্তমান বাংলাদেশে। আর শতকরা ৪০ ভাগ বাস করে ভারতে। এই ৪০ ভাগ চাচ্ছেন ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করতে; বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নয়। বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান সাবেক পাকিস্তানে ‘জয়বাংলা’ আওয়াজ তুলেছিল। কিন্তু সাবেক পাকিস্তান এখন আর নাই। সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ। তাই এখন জয়বাংলা না বলে ‘জয় বাংলাদেশ’ বলাই শ্রেয়।

শেখ মুজিব সাবেক পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক কাঠামোর মধ্যে বলেছিলেন, বাঙালিদের স্বার্থ সংরক্ষণের কথা। উঠিয়েছিলেন ছয়দফার দাবি। কিন্তু এখন সৃষ্টি হতে পেরেছে একটা পৃথক স্বাধীন বাংলাদেশ। এর জাতিসত্ত্বার রূপ হতে যাচ্ছে ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এটা উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি তাই গ্রহণ করেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণা। আওয়ামী লীগ এখনও আঁকড়ে আছে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে। কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যাকে সংক্ষেপে ইংরেজির অনুকরণে বলা হচ্ছে বিএনপি, সে বলছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা। ১৯৭৬ সালের ৩ রা মার্চ জিয়া বলেন, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা। তিনি ১৯৭৭ সালের ২৫ শে অক্টোবর বঙ্গভবনে শিল্পী সাহিত্যিক সমাবেশে বলেন যে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদই হতে হবে আমাদের শিল্প-সাহিত্যের প্রেরণা; বাঙালি জাতীয়তাবাদ নয়। জিয়ার এই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে ব্যাখা করতে গেলে বলতে হয়, এর ভিত্তি হলো বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমানা, এর বাংলাভাষী জনসমাজ এবং ইসলামের স্বাতন্ত্র।

পাকিস্তান আমলে ১৯৬৭ সালে ২২ শে জুন রেডিও পাকিস্তান থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীতকে সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের অনেক বুদ্ধিজীবী সে সময় করেন এর প্রতিবাদ। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান অসুস্থ কবি নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে নিয়ে আসবার ব্যবস্থা করেন। তিনি নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে প্রদান করেন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব। সেই সঙ্গে নজরুলকে করেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি। নজরুলের একটি গানকে করেন বাংলাদেশের রণ সঙ্গীত। অর্থাৎ শেখ মুজিব চান না রবীন্দ্রনাথকে প্রাধান্য প্রদান করতে। তাঁর মধ্যেও কাজ করেছিল একটা বিশেষ মুসলিম চেতনা। যদিও তিনি বলেননি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা। যেমন বলেছেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বিদেশে বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষ বাঙালি বলে পরিচিত না হয়ে, পরিচিত হচ্ছেন বাংলাদেশী হিসাবে। আর মনে হয় তার এই বাংলাদেশী পরিচয়টিই পেতে যাচ্ছে স্থায়িত্ব। জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে না রাখতে। কিন্তু তিনি এটা করে যেতে পারেন না। জিয়ার শাসনামলে একটি গান বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে উঠছিল, তা হলো ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ/ জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ/ বাংলাদেশ বাংলাদেশ….। ‘বাংলাদেশী’ শব্দটা অবশ্য প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদ্ভাবন নয়। এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছেন কবি আলাওল। আলাওল ছিলেন খৃস্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমভাগের কবি। তিনি এ সময় হন আরাকানের রাজসভার কবি। আরাকান রাজারা ছিলেন আরাকন ভাষী। কিন্তু তারা বাংলা বুঝতেন। কদর করতেন বাংলা ভাষা-সাহিত্যের। আলাওলের পক্ষে তাই সম্ভব হয়েছিল আরাকানের রাজসভার কবি হতে পারা। তিনি তাঁর একটি বইতে বলেছেন, আরাকানে নানা দেশ থেকে মানুষ এসে বসতি করছে। এর মধ্যে আছে বাংলাদেশীরাও। আলাওল বাঙালি শব্দটা ব্যবহার না করে, তাঁর বইতে ব্যবহার করেছেন বাংলাদেশী শব্দটা। বাংলাদেশী শব্দটাকে তাই বলা চলে না শিকড় বিহীন। বাংলাভাষী মানুষ কেবল বাংলাদেশে নেই। তাই ‘বাংলাদেশী’ শব্দটার ব্যবহার বাংলাদেশের নাগরিকদের দিচ্ছে একটি পৃথক পরিচিতি।

এক একটি জাতি গড়ে ওঠে ইতিহাসের ধারায়। ভাষা জাতীয়তাবাদের একটি মৌলিক উপাদান। কিন্তু একমাত্র উপাদান নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে গেলে ইংরেজি ভাষা জানতে হয়। পাশ করতে হয় ইংরেজি ভাষায় পরীক্ষা দিয়ে। কিন্তু কেবলমাত্র ইংরেজি ভাষাকে নির্ভর করেই মার্কিন জাতীয়তাবাদের আবেগ সৃষ্টি হতে পেরেছে, তা বলা যায় না। ফরাসি ভাষা বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ডেও চলে। কিন্তু তা বলে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড মিলে একরাষ্ট্র গড়ে উঠেনি। এদের গড়ে ওঠার ইতিহাস এক নয়। ইউরোপে অস্ট্রিয়ানরা জার্মান ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু তা বলে, তারা জার্মানির সাথে এক হয়ে এক রাষ্ট্র গড়তে চাচ্ছে না। এর একটি কারণ হল, অস্ট্রিয়ার অধিবাসীদের ধর্ম-বিশ^াস। অস্ট্রিয়ার লোক জার্মান ভাষায় কথা বলে কিন্তু ধর্ম-বিশ^াসের দিক থেকে তারা হল গোড়া ক্যাথলিক খৃস্টান। অস্ট্রিয়াতে প্রটেস্টান খৃস্টানও আছে। তবে অস্ট্রিয়ার জনসংখ্যার শতকরা নব্বই ভাগ হল গোড়া ক্যাথলিক খৃস্টান। অস্ট্রিয়ার লাগোয়া দেশ হল ইটালি। ইটালি হল গোড়া খৃস্টানদের দেশ। কিন্তু অস্ট্রিয়া চাচ্ছে না ইটালির সাথে এক হয়ে যেতে। কারণ অস্ট্রিয়ার লোকে ইটালির ভাষায় কথা বলে না; বলে জার্মান ভাষায়। আমরা এসব কথা বলছি, কারণ আজকের বাংলাদেশের মানুষের জাতীয়তাবাদের থাকছে কেবল ভাষার বাস্তবতা নয়, ধর্ম চেতনার বাস্তবতাও। জাতীয়তাবোধ শেষ পর্যন্ত হল একটা মানসিক ব্যাপার। এই মানসিকতা সৃষ্টি হয় একটি বাস্তবতার সংমিশ্রণে। ভাষা, মানবধারা, ধর্ম এগুলি গঠন করে জাতীয়তাবোধের ক্ষেত্র।

SHARE

Leave a Reply