বাঙালি মুসলমানের জাগৃতি । নঈম আহমেদ

১৭৫৭ সালে বাংলার পলাশী প্রান্তরে ইংরেজদের হাতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ে বাংলার ভাগ্যবিপর্যয় ঘটে এবং বাঙালি মুসলমানের সর্বনাশ শুরু হয়।১৭৫৭ সালে বাংলার পলাশী প্রান্তরে ইংরেজদের হাতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ে বাংলার ভাগ্যবিপর্যয় ঘটে এবং বাঙালি মুসলমানের সর্বনাশ শুরু হয়। বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পতনের এই ইতিহাস দীর্ঘ ও মর্মন্তুদ। ১৭৬৫ সালে দিল্লির বাদশাহ্ শাহ্ আলমের কাছ থেকে বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা রাজস্ব দানের প্রতিশ্রুতিতে লর্ড ক্লাইভ বাংলা, বিহার ও ঊড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা লাভ করে। ফলে কোম্পানি আইনত দেশের প্রকৃত মালিক হয়ে ওঠে। দেশে দ্বৈতশাসনের সূচনা হয়। সারা বাংলায় ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ (১১৭৬ বাংলা ১৭৬৯ খ্রি.) ঘটে। এই মন্বন্তরে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অনাহারে মারা যায়।

১৭৭২ সাল থেকে ১৭৯৩ সাল পর্যন্ত বাংলার শাসনে ইংরেজগণ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। লর্ড হেস্টিংস্ ও লর্ড কর্নওয়ালিস এই সময়ে বাংলার বড় লাট। এই সময়ের গোড়ার দিকে মুর্শিদাবাদ হতে কলকাতায় বাংলার রাজধানী স্থানান্তরিত হয়; নবাব বৃত্তিভোগী হলেন এবং ১৭৯৩ সালে বাংলার জনসাধারণের বিশেষ করে মুসলিম জনসাধারণের দ্বিতীয় অভিশাপরূপে কর্নওয়ালিসের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রবর্তিত হয়। বাংলার মুসলমানদের সর্বনাশ ডেকে আনে। ১৮৩৬ সালে অফিস-আদালত থেকে ফারসি ভাষা উঠে যায়। এতে বাংলার সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের বেঁচে থাকার শেষ সম্বলও চিরতরে নিঃশেষ হয়।
এই সময়ের প্রায় চল্লিশ বছর পূর্ব থেকে ইংরেজগণ দেশে ইংরেজি শিক্ষা প্রচলনে সচেষ্ট হন। চার্লস গ্র্যান্টই এর সর্বপ্রথম উদ্যোক্তা। তিনি যা করতে পারেননি, ইংরেজ মিশনারিরা তা সমাধান করেছিলেন। বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারে ইংরেজদের মধ্যে উইলিয়াম কেরিই প্রধান। ১৭৯৩ সালে কেরি কলকাতায় আসেন এবং শ্রীরামপুরের ইংরেজ মিশনে যোগ দেন। তার প্রচেষ্টায় সেখানে ইংরেজি স্কুল স্থাপিত হয় এবং শ্রীরামপুর থেকে বাইবেলের বাংলা গদ্য অনুবাদ প্রচারিত হয়। তারপর ডেভিড হেয়ার ও রাজা রামমোহন রায় ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারে বিশেষভাবে সচেষ্ট হয়েছিলেন। ১৮০০ সালে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত এবং ১৮২৩ সালে ‘কমিটি অব পাবলিক ইন্স্ট্রাকশন’ গঠিত হয়। তার উদ্যোগের ‘সংস্কৃত কলেজ’ প্রতিষ্ঠিা পায়। এভাবে ইংরেজি শিক্ষা দেশে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো এবং ফারসি শিক্ষার ক্ষেত্র দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে পড়তে শুরু করে। হিন্দু সম্প্রদায় ইংরেজি শিক্ষার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে, আর মুসলমানেরা বিদেশী ভাষার মাধ্যমের প্রতি সহানুভূতিহীনতাবশত তা হতে সরে থাকলেন।
এই সময়ে মুসলমানের রাজ্যহারা, ভাগ্যহারা, সম্পদহারা এবং ইংরেজ মিশনারিদের প্রচারে বর্ণহারা হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দেয়। তবু তারা দিশেহারা হলেন না। একদিকে ইংরেজ অধিকারের স্থায়িত্ব ও ক্রমবর্ধন এবং অন্যদিকে শাসনসংক্রান্ত পরিবর্তন ও সংস্কৃতিগত বিবর্তন মুসলমানদেরকে নীরবে বসে থাকতে দেয়নি। তাদের মধ্যে ‘ওহাবি আন্দোলন’ দেখা দিলো। চব্বিশ পরগনার বারাসত মহকুমার অধিবাসী মীর নিসার আলী ‘তিতুমীর’ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করে ১৮৩১ সালে ‘নারকেল বাড়িয়ার বাঁশের কেল্লায় ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হন। অতঃপর ১৮৪৭ সালে ফরিদপুর জেলার পীর দুদু মিঞাও এই আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করে বহু লাঞ্ছনা ভোগ করলেন। বাংলার মুসলমান এতেও দমলেন না। তাদের মধ্যে অসন্তোষ ধূমায়িত হতে লাগলো। পরিশেষে জাতীয় জীবন পুনরুজ্জীবিত করার মানসে বাংলার মুসলমান মরিয়া হয়ে ইংরেজ রাজত্ব উচ্ছেদ করতে ১৮৫৭ সালে ‘সিপাহি-বিদ্রোহে’ যোগ দিলেন। সিপাই বিদ্রোহ দমিত হলো। বাংলার মুসলমানও ইংরেজ হতে ক্রমবর্ধমান বিমাতাসুলভ ব্যবহার লাভ করতে করতে জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকলেন। অন্য দিকে, ১৮২০-এ লাখেরাজ সম্পত্তির বাজেয়াপ্ত, ১৮৩৫-এ রাজভাষা হিসেবে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজির প্রবর্তন, বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটায়।
বাংলার মুসলমানের এই কাহিনী অত্যন্ত করুণ ও অতিশয় মর্মবিদারী। ১৮৭১ সালে William Wilson Hunter ÔThe Indian Musalmans:’ নামক গ্রন্থে বাংলার মুসলমানদের যে চিত্র এঁকেছেন, নিম্নে তারই সংক্ষিপ্তসার সঙ্কলিত হলো :
পলাশী যুদ্ধের সময় হতে সিপাহি বিদ্রোহের বহু দিন (অন্তত পঁচিশ বছর) পর পর্যন্ত, প্রায় ১২৫ বছর যাবৎ বাংলার মুসলমানদের প্রতি আমাদের অবিচারের সীমা ছিলো না। এই সেদিন পর্যন্ত যারা দেশের বিজেতা ও শাসক সম্প্রদায় ছিলেন, তারা আজ প্রাসাচ্ছাদন সংগ্রহ করতেও অসমর্থ। এই সম্প্রদায় আজ সর্বপ্রকারে নিঃস্ব ও ধ্বংসোন্মুখ। এর জন্য দায়ী আমাদের কল্পনাবিরহিত শাসন।

১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হওয়ার পর থেকে দেশে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তৃতির যে প্রচেষ্টা চলে, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক কারণে বাংলার মুসলমানরা সে সুযোগ গ্রহণ করেনি ও করতে পারেনি
১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হওয়ার পর থেকে দেশে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তৃতির যে প্রচেষ্টা চলে, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক কারণে বাংলার মুসলমানরা সে সুযোগ গ্রহণ করেনি ও করতে পারেনি।

বাংলার অভিজাত মুসলমান ধ্বংস হয়েছে। তাদের আয়ের পথ ছিল তিনটি- যথা, সৈন্য বিভাগের উচ্চপদ, দেওয়ানি ও বিচার-বিভাগের পদগুলি এবং উচ্চ রাজনৈতিক পদগুলিতে নিয়োগ। সৈন্যবিভাগ এখন বাংলার অভিজাত মুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাদের কেউ আমাদের সেনাদলে (Regiment) প্রবেশ করতে পারে না। দেওয়ানি বিভাগও তাদের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। বড় বড় পদগুলি ইংরেজরা, ছোট ছোট পদগুলি হিন্দুরা দখল করেছে। ১৭৯৩ সালে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ দেওয়ানি বিভাগ হতে মুসলিম অভিজাত বিতাড়ন সম্পূর্ণ করে দিয়েছে। যে সমস্ত হিন্দু রাজস্ব আদায়ের নিম্নস্তরে থেকে চাষিদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতো, ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’র ফলে তারা জমির মালিক হয়ে জমিদাররূপে ধনী হয়ে উঠেছে, আর মুসলমান অভিজাত জমিদারি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। আমাদের অবিচারে এবং কর্নওয়ালিস কোড্ প্রভৃতির মারপ্যাঁচে তাদের কেউ এখন উচ্চ রাজনৈতিক ও বিচার-বিভাগীয় পদে অধিষ্ঠিত নাই। অথচ এই সেদিন পর্যন্ত এই সমস্ত পদ তাদের একচেটিয়া ছিলো। আইন ব্যবসায় তাদেরই ছিলো। তাও ফারসি ভাষার অবসানের সাথে লুপ্ত হয়ে গেছে। বড়-ছোট সমস্ত রাজপদের দরজাও এখন তাদের জন্য বন্ধ ও হিন্দুর জন্য মুক্ত।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলার মুসলমান ও হিন্দুর অবস্থা এক নয়। মুসলমানেরা ইংরেজি শিখেন না। যে ফারসি ভাষার সাহায্যে তার এই সেদিন পর্যন্ত দেশ শাসন করেছেন, গুণী-জ্ঞানী ও মনীষীর জন্ম দিয়েছেন, আমাদের ইংরেজি শিক্ষা যতই ভালো হোক, তাদেরকে এর উপকারিতা বুঝতে সময় লাগবে। হিন্দুরা মুসলমান রাজত্বে যেমন ফারসি শিখেছে, এখন তেমন ইংরেজি শিখছে ও নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করে নিচ্ছে।
বাংলার মুসলমানদের এ অবস্থার জন্য হান্টার একমাত্র তার স্বজাতিকেই দায়ী করেছেন। প্রকৃতপক্ষে ইরেজ আমলে বাংলার মুসলমানদেরকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য প্রধানত ইংরেজই দায়ী।

১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হওয়ার পর থেকে দেশে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তৃতির যে প্রচেষ্টা চলে, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক কারণে বাংলার মুসলমানরা সে সুযোগ গ্রহণ করেনি ও করতে পারেনি। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লবের পর থেকে বাধ্য হয়ে মুসলমানরা ধীরে, অতি ধীরে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকেন। কাজে কাজেই বাংলার মুসলমানরা বাংলার হিন্দুদের কমপক্ষ অর্থ শতাব্দী পিছনে পড়ে গেলেন। ফলে সাহিত্যের ক্ষেত্রে বাংলার মুসলমানদের যে ক্ষতি সাধিত হলো, তা তারা আজও পূরণ করতে পানেনি।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে কেন্দ্র করে গদ্য-রীতি অবলম্বনে যে আধুনকি বাংলাসাহিত্য ও ভাষা চর্চা আরম্ভ হলো, তা ১৮৫৭ সালের আগে বাংলার মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। অথচ সাহিত্যের ক্ষেত্রে গদ্যরীতির ব্যাপক ব্যবহারই হলো বাংলাদেশে পাশ্চাত্য-শিক্ষা প্রবর্তনের সর্বপ্রথম সাহিত্যিক ফল। উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, প্রবন্ধ, গল্প, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, সংবাদপত্র প্রভৃতির প্রবর্তন ও ব্যাপক প্রচার বাংলায় গদ্যরীতির প্রবর্তনেই সম্ভব হলো। বাংলার সনাতন কাব্যজগতেও পাশ্চাত্য-প্রভাব ফুটে ওঠে, বাংলার কাব্যরূপ ও রস পরিবর্তন করে অভিনব মূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করলো এবং তার সাথে পাশ্চাত্য জগতের গভীর আত্মীয়তা সংস্থাপিত হলো। বাংলা কাব্যজগতের এই পরিবর্তন দেশে পাশ্চাত্য-শিক্ষা প্রবর্তনের দ্বিতীয় ফল। ১৮০০ হতে ১৮৭০ সালের মধ্যে রাজা রামমোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১), অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২১-১৮৮৭), বিহারী লাল চক্রবর্তী (১৮৩৫-১৮৯৪), মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) প্রমুখ সাহিত্যিকদের অক্লান্ত চেষ্টায় ‘আধুনিক’ বাংলা-সাহিত্যের নানা শাখায় গদ্যরীতি যখন সুপ্রতিষ্ঠিত ও পাশ্চাত্য-প্রভাবদীপ্ত কাব্যধারা যখন পূর্ণ-বিবর্তিত, তখনই বাংলা সাহিত্যে মুসলমানেরা প্রবেশ করলেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রে বাংলার মুসলমানদের এই যে অর্ধ-শতাব্দীরও অধিককালের বিলম্বিত প্রবেশ, তা-ই আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলিম অবদানের স্বল্পতার জন্য প্রধানত দায়ী। ফলে তৎকালীন বাংলা-সাহিত্য প্রধানত হিন্দু-ঐতিহ্যবাহী। কেননা হিন্দুদের কাছ হতে হিন্দু-ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য ব্যতীত ইসলামী-ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য সৃষ্টি আশা বাতুলতা মাত্র।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ হতে হিন্দুদের দ্বারা ‘তোতা কাহিনী’ বা ‘গোলে-বকাওলী’ জাতীয় পতন-যুগের মুসলিম-ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য প্রচারের চেষ্টা করা হলেও, উন্নত প্রকৃতির পাশ্চাত্য-প্রভাব ও ভাবপুষ্ট বাংলা সাহিত্যের আসরে এইগুলোর কদর হয়নি। কিন্তু মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ বাংলার হিন্দু-মুসলমান, এমনকি মুসলমানদের চেয়ে হিন্দুই অধিক পরিমাণে ঘরে ঘরে পাঠ করেছেন। হিন্দুদের মতো বাংলার মুসলমানও যদি যথাসময়ে পাশ্চাত্য শিক্ষা-দীক্ষা সম্পর্কে সচেতন হতেন, তবে আধুনিক বাংলা-সাহিত্যে তাঁদের সৃষ্টি, হিন্দুদের তুলনায় পরিমাণ ও গুণ- এই দু’য়ের কোনটিতেই নিকৃষ্ট বা ন্যূন হতো না। কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও মুসলমানদের মধ্যে বহু পূর্বেই আরও অনেক গগনচুম্বী সাহিত্য-প্রতিভার আবির্ভাব ঘটত।

১৮০০ হতে আরম্ভ করে ১৮৫৭ সালের মধ্যেই পদ্য ও গদ্য উভয়ক্ষেত্রেই আধুনিক বাংলা-সাহিত্যের ভিত্তি সুদৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। হিন্দু পাশ্চাত্য-শিক্ষা-দীপ্ত মনীষাই আধুনিক বংলা-সাহিত্যের এই প্রতিষ্ঠার মূলীভূত কারণ বলে, পাশ্চাত্য পোশাকে বিভূষিত হিন্দু-ঐতিহ্যই এই সাহিত্যে অধিকতর পরিস্ফুট। বাংলার মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের বিমাতাসুলভ ব্যবহার ১৮৭১ সালের পরও সমান তালে চলেছিলো। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর মুসলমানদের প্রতি ইরেজদের অবিশ্বাস বেড়ে যাওয়ার ফলে, তারা সর্বপ্রকারে মুসলমানদের সর্বনাশ সাধনে ব্রতী হওয়ার ১৮৭১ সালে হান্টার বাংলার মুসলমানদেরকে ধবংসপ্রাপ্ত অবস্থায় দেখেছিলেন। ১৯০০ সালের আগে মুসলমানদের এই জীর্ণ অবস্থার কোন বিশেষ উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। তবে মুসলমানেরা মরিয়া নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার মত জাতি নয়। তারা যখন দেখলেন যে, রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতার পরিপুষ্ট হিন্দুদের সাথে কিছুতেই পারা যাচ্ছে না, তখন তারা ১৯০৪ সালে ‘বঙ্গ-বিভাগ’ করে পৃথক হওয়ার চেষ্টা করলেন। সিপাহি-বিদ্রোহের পর ১৯০৪ সালে এই প্রচেষ্টাই জীবন্মৃত বাঙালি মুসলমানের জাতীয় জাগরণের একটি প্রধান নিদর্শন। যা হোক হিন্দুদের প্রবল আন্দোলনেই অল্পকাল পরেই ‘বঙ্গ-বিভাগ’ রহিত হয়Ñ মুসলমানদের স্বার্থ ও ইচ্ছার একান্ত বিরুদ্ধেই।


‘বঙ্গভঙ্গে’র প্রভাবে অল্প সময়ের ব্যবধানে পূর্ব-বাংলার জনজীবন, অকাঠামো, অর্থনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে গুণগত পরিবর্তন সাধিত হতে শুরু করে। কিন্তু ‘বঙ্গভঙ্গ রদে’র পর আবার সেইসব শাখা উদ্যম ও প্রাণচাঞ্চল্যহীন হয়ে পড়ে। তবু সেই ঢেউ ক্ষুদ্র হলেও বহমান থাকে এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার মাধ্যমে আবার নতুন জীবনীশক্তির উদ্বোধন ঘটে। এভাবেই সামগ্রিক সৃষ্টিশীলতার ধারা অব্যাহত থাকার পরিণামে উনিশ শতকের শেষ ভাগে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে এক ধরনের জাগরণ দেখা দেয়।


‘বঙ্গভঙ্গে’র প্রভাবে অল্প সময়ের ব্যবধানে পূর্ব-বাংলার জনজীবন, অকাঠামো, অর্থনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে গুণগত পরিবর্তন সাধিত হতে শুরু করে। কিন্তু ‘বঙ্গভঙ্গ রদে’র পর আবার সেইসব শাখা উদ্যম ও প্রাণচাঞ্চল্যহীন হয়ে পড়ে। তবু সেই ঢেউ ক্ষুদ্র হলেও বহমান থাকে এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার মাধ্যমে আবার নতুন জীবনীশক্তির উদ্বোধন ঘটে। এভাবেই সামগ্রিক সৃষ্টিশীলতার ধারা অব্যাহত থাকার পরিণামে উনিশ শতকের শেষ ভাগে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে এক ধরনের জাগরণ দেখা দেয়।

এই কালপর্বে লেখকবৃন্দ প্রাচীন সাহিত্যিক ধারার অনুবর্তন করেছেন। মুহম্মদ রেজা, আলী রেজা, মুহম্মদ মুকীম, মুহম্মদ আলী, মুহম্মদ কাসিম, সৈয়দ নুরুদ্দিন, কবি চুহর, হামিদুল্লাহ খান, শাহ মুহম্মদ গরীবুল্লাহ, সৈয়দ হামজা উল্লেখযোগ্য কবি। আর এদের মধ্যে শাহ মুহম্মদ গরীবুল্লাহ ও সৈয়দ হামজা সবচেয়ে শক্তিমান ও খাতিমান। এই সময়ে দোভাষী পুঁথি সাহিত্যের বিস্তার ঘটে। দোভাষী পুঁথিতে বাংলার সাথে প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার হয়েছে। গরীবুল্লাহর বিখ্যাত কাব্যগুলো হচ্ছে ‘আমীর হামজা’ (১৭৯২), ‘ইউসুফ-জোলায়খা’, ‘জঙ্গনামা’, সত্যপীরের পুঁথি’ ও ‘সোনাভান’। সৈয়দ হামজা ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি গরীবুল্লাহর অনুসারী ছিলেন। ১৭৯২ সালে তিনি গরীবুল্লাহর অসমাপ্ত পুঁথি ‘জঙ্গনামা’ সমাপ্ত করেন। তাঁর অন্যান্য পুঁথি হলো: ‘মধুমালতী’ (১৭৭৮), ‘আমীর হামজা’, ‘হাতেম তাঈ (১৮০৪) ও ‘জৈগুনের পুঁথি’ (১৭৯৮)। গরীবুল্লাহ ও সৈয়দ হামজা একদিকে দোভাষী পুঁথির একটি শক্তিশালী ধারা তৈরি করেন, অন্যদিকে ইসলামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাদী সাহিত্যের গতিস্রোতকে মজবুত করেন।


নবজাগরণের প্রভাবে উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বাঙালি মুসলমানের জীবন ও জগৎ সবদিক থেকে বদলে যেতে থাকে। সমাজ ও রাজনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সবক্ষেত্রে এক ধরনের নব উদ্যম, পিপাসা, অনুসন্ধিৎসা ও প্রেরণা জেগে ওঠে। এই সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিক সাহিত্যজগতে কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। উনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজে রেনেসাঁ বা নবজাগৃৃতি ভাবাদর্শ, চিন্তা-চেতনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।


দুই.
ভারতবর্ষে ইংরেজ রাজত্বের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, শৈক্ষিক, সাংস্কৃতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের সাথে সাথে পুরাতন কাঠামো ভেঙে নতুন ইমারত সৃষ্টি হতে থাকে। এই নতুন গতিধারার সঙ্গে ইংরেজি ভাষা-সাহিত্য-দর্শনের মাধ্যমে হিন্দু সম্প্রদায় কলকাতাকেন্দ্রিক সমাজ-সংস্কৃতিতে এক ধরনের জাগরণ আসে।
‘বাংলার জাগরণ’ যখন অর্ধ-শতাব্দী অতিক্রম করে বিংশ শতাব্দীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন বাঙালি মুসলমানের মাঝে এক ‘সার্বত্রিক জীবন-পিপাসা’ জেগে ওঠে। চিন্তা, ভাবুকতা, মনস্বিতা, জিজ্ঞাসা, সন্ধিৎসা ইত্যাদির মতো জাগরণী উৎসমুখ বাঙালি মুসলমানের মানস-চেতনায় খুলে যায়। এই জাগরণের ধারা ‘কোহিনূর’, ‘নবনূর’, ‘মোহাম্মদী’, ‘বাসনা’, ‘বঙ্গীয়-মুসলমান-সাহিত্য-পত্রিকা’, ‘সওগাত’, ‘মোসলেম ভারত’, ‘ধূমকেতু’, ‘লাঙল’, ‘শিখা’, ‘নওরোজ’, ‘জয়তী’, ‘বুলবুল’ প্রভৃতি পত্রিকার মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। শুধু সাহিত্যিক নয়, সমাজ-সংস্কারক, ইতিহাসসন্ধানী, পণ্ডিত, সংগঠক-সম্পাদক, নারী জাগরণকামী, ভাবুক, ঐতিহ্যসন্ধানী- সকলে মিলে বাঙালি-মুসলমানের জাগরণের ক্ষেত্র তৈরি করেন। আর ‘মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি’ (১৮৬৩, কলকাতা), ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ (১৯১১, কলকাতা), ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ (ঢাকা : ১৯২৬)- এই তিনটি সংস্থা এই রেনেসাঁর সহায়ক শক্তিরূপে কাজ করেছে।
নবজাগরণের প্রভাবে উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বাঙালি মুসলমানের জীবন ও জগৎ সবদিক থেকে বদলে যেতে থাকে। সমাজ ও রাজনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সবক্ষেত্রে এক ধরনের নব উদ্যম, পিপাসা, অনুসন্ধিৎসা ও প্রেরণা জেগে ওঠে। এই সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিক সাহিত্যজগতে কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। উনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজে রেনেসাঁ বা নবজাগৃৃতি ভাবাদর্শ, চিন্তা-চেতনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। একদিকে দেশের শিল্প বাণিজ্য ধ্বংস এবং ভূমি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, ইংরেজ রাজশক্তির মুখাপেক্ষী ও স্থিতিশীল নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সৃষ্টি, শিক্ষিত অশিক্ষিতের মধ্যে নতুন শ্রেণীভেদের গোড়াপত্তন; বাঙালির সাহস, উদ্যম এবং সৃজনশক্তির হানি ও বাংলার পল্লীসভ্যতার বিনাশ, মুসলমান সামন্তব্যবস্থা ধ্বংস ও হিন্দু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সম্প্রসারণ, শিক্ষিত বাঙালি মানসের নির্বিচারে ইউরোপের আদর্শ গ্রহণ, প্রাচ্যদেশের সমস্ত পুরনো ঐতিহ্য-সাধনা-সিদ্ধিকে ইউরোপের মাপকাঠিতে বিচার প্রভৃতি রূপান্তর ইতিহাসে সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকেরা সৃজিত সাহিত্যে নিজেদের সুখ-দুঃখের পাঁচালি গেয়েছেন, অভাব-অভিযোগ বঞ্চনার কথা তুলে ধরলেন। বাঙালির জাতীয় চেতনা যে তার সামাজিক, ঐতিহ্যিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত এ-বক্তব্য বই পুস্তক, সংবাদমাধ্যম ও পরস্পরের যোগাযোগের ফলে বিকাশ লাভ করে। লেখকদের মধ্যে অনেকেই প্রবীণ ও প্রাজ্ঞ ছিলেন। তাঁরা দার্শনিকবোধ ও যুক্তির সাহায্যে এই বিবেচনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেন যে, বাঙালি মুসলিম আলাদা কোন জনগোষ্ঠী নয়, ভূঁইফোড় কোন জাতি নয়, আবহমান কাল ধরে বাংলার ভূখণ্ডে জন্মসূত্রেই তাঁরা তাদের ঐতিহ্য নির্মাণ করেছেন। কত কাল কত যুগ ধরে মুসলমানগণ বসবাস করে আসছেন পুরুষানুক্রমে; তবু আপন বলে স্বীকার করতে নারাজ কোন কোন মহল। যা হোক, মুসলমানের জাতিসত্তার পরিচয় তাদের লেখক ও কবি-সাহিত্যিকদের রচনায় বলিষ্ঠভাবে ফুটে ওঠে সে প্রসঙ্গই বর্তমানে বিচার-বিশ্লেষণ করার অবকাশ আছে।

আধুনিক মুসলিম সাহিত্যিকদের পথপ্রদর্শক দল
মীর মশাররফ হোসেন, মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন, কায়কোবাদ, শেখ আবদুর রহীম, রিয়াজউদ্দীন মাশহাদী, মোজাম্মেল হক, মুন্সী মোহা. মেহেরুল্লাহ, মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, আবদুল করিম সাহিত্য-বিশারদ, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কাজী ইমদাদুল হক, মোহাম্মদ নজিবর রহমান, নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী, বেগম রোকেয়া ইশরামুদ্দীন, শেখ ফজলুল করিম, এয়াকুব আলী চৌধুরী, ডা. লুৎফর রহমান, সৈয়দ এমদাদ আলী, শেখ মোহাম্মদ ইদরিস আলী, খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ্, শেখ হবিবর রহমান সাহিত্যরত্ন, নূরুন্নেসা খাতুন বিদ্যাবিনোদনী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, গোলাম কাসেম, এস. ওয়াজেদ আলী, শাহাদাৎ হোসেন, ইব্রাহীম খাঁ, গোলাম মোস্তফা, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ বরকতুল্লা, আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রমুখ।
এইসব সাহিত্যিক বাংলার মুসলমানদের সৃজনশীল, মননশীল ও জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন এবং বাঙালি মুসলমানের জাগৃতি ত্বরান্বিত করেন।

SHARE

Leave a Reply