বালাকোট আন্দোলন ভারতে ইসলাম বিজয়ের পথিকৃৎ -জাহিদুল ইসলাম জাকি

ভারতের বালাকোট নামক স্থানটি হয়তো মানুষের দৃষ্টি থেকে অচেনাই রয়ে যেতো। এর নামও হয়তো জানার সুযোগ হতো না কারো। কিন্তু বালাকোট এখন ভারত বা ভারতীয় উপমহাদেশ শুধু নয়, পুরো বিশে^র মুসলমানদের নিকট নিজ মাতৃভূমির ন্যায়ই সুপরিচিত একটি পবিত্র ভূমি। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে দেশে দেশে খেলাফত শাসনের স্বপ্ন নিয়ে গড়ে ওঠা বীর মুজাহিদদের প্রেরণার পিরামিড এই বালাকোট প্রান্তর। ১৮৩১ সালের ৬ মে বালাকোটের প্রান্তরে সৈন্য সামন্তসহ শাহাদাত বরণ করেন সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভী (রহ.)।

সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভী (রহ.)-এর পরিচয়
সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভী (রহ.) ২৯ নভেম্বর ১৭৮৬ সালে রায়বেরেলিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বংশতালিকা চতুর্থ খলিফা আলী রা.-এর সাথে মিলিত হয়েছে। তিনি ১৬০৫ সালে স¤্রাট শাহজাহানের স্ত্রী ইয়ালুননিসা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘আকবরবাদী’ নামক মসজিদেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। বলা হয় মসজিদ মুসলমানদের প্রধান বিদ্যালয়। বিশ^নবী সা. মসজিদে বসেই বিশ^বিখ্যাত মুফতি, মুহাদ্দিস, মুফাসসির তৈরি করে গেছেন। সারা বিশ্বে আজো মসজিদগুলো মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র। সাইয়্যেদ সাহেবও তেমনি মসজিদেই তার প্রথম বিদ্যার্জন শুরু করেন। অন্যান্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যার দৌড় খুব লম্বা হলেও অনেক সময় তা তার কাছের সত্যকেই দেখতে পায় না, খুব সহজেই অন্ধকারে ডুবে যায়। অপরদিকে মসজিদের জ্ঞানের পরিধি খুব বিস্তৃত না হলেও, একাধিক পাঠ্যক্রম বা সিলেবাস না থাকলেও তা দিয়ে সত্য চেনা যায়, কালোকে কালো, অসৎকে অসৎ বলার সাহস জোগায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সাম্প্রদায়িক শক্তি পবিত্র এই স্থান তথা আকবরবাদী মসজিদকে বর্তমানে ‘এডয়ার্ড পার্ক’ এ রূপান্তরিত করেছে।

দাওয়াতি মিশন
শৈশব থেকেই সাইয়্যেদ সাহেবের ভিতর নেতৃত্বের চিহ্ন ফুটে ওঠে। কিন্তু নেতৃত্বের গুণাবলী কখনো তাকে বস (ইড়ংং) বানাতে পারেনি। ছাত্রজীবনে নিজের কাপড় পরিষ্কার করার সময় বন্ধুদের ময়লা কাপড় নিয়ে পরিষ্কার করে দিতেন। এ থেকে প্রমাণিত হয়, দায়ীদের নেতৃত্ব হবে নিরহঙ্কার। আল্লাহ প্রদত্ত জীবন-বিধান ও রাসূল সা. প্রদর্শিত পন্থা অনুসরণ করার মিশনকে জীবনের সবচেয়ে বড় টার্গেট হিসাবে গ্রহণ করেন সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভী (রহ.)। ১৮২০ সালে দাক্ষিণাত্যের নিজাম রাজ্য, পাটনা-কলকাতা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশে দাওয়াতি কাজের ভিত মজবুত করেন। এভাবেই মানুষকে সত্য ও কল্যাণের পথে আজীবন আহবান জানান তিনি। শুধু দাওয়াতি কাজ নয়, ঈমান তথা তাওহিদ যেন হয় শিরকমুক্ত এ বিষয়েও তিনি জোরালো ভূমিকা রাখেন। এ জন্য কখনো তিনি ভণ্ড পীরদের সাথে সাক্ষাৎ করে দরদভরা সুরে বুঝাতেন। কখনো প্রয়োজন হলে বল প্রয়োগ করতেন। একবার তিনি শুনতে পেলেন যে, পীর শাহ করীম আতার দরবারে নাচ-গান ও শিরকি কর্মকাণ্ড হচ্ছে অহরহ। এমন সংবাদে তিনি খুব কষ্ট পেলেন, কাল বিলম্ব না করে উক্ত পীরের সাথে সাক্ষাৎ করে বুঝালেন, পীর সাহেব নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। চিরদিনের জন্য সেখান থেকে শিরক-বিদায়াতের প্রস্থান হলো।

দ্বীন বিজয়ের বীর সিপাহশালা
সাইয়্যেদ সাহেব কেন এই পথ বেছে নিলেন, অন্যান্য স্বার্থবাদী মুসলমানের ন্যায় তিনিও আরাম আয়েশে জীবন-যাপন করতে পারতেন। অন্যান্য স্বার্থবাদী মুসলমানেরা বলতো- আমরাতো এখনো আল্লাহ ও রাসূলের নাম সজোরে উচ্চারণ করতে পারছি, আমাদের খানকাগুলোতে এখনো সামষ্টিক জিকির হয়, সুন্নাতি পোশাক পরে আমরা দিব্বি সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে পারছি, এহেন অবস্থায় অহেতুক তাদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া মানেই নিজেদের অমঙ্গল ডেকে আনা। সাইয়্যেদ সাহেব তাদের এমন উদ্ভট কথার প্রেক্ষিতে বলেন-“ইংরেজরা খাজনা, ওশর, বিচারালয়, জন্ম নিয়ন্ত্রণ বিধান, রাজস্ব, চোর-ডাকাত দমন বিধি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমাদের জন্য কেবল জুমার নামাজ, ঈদের নামাজ ও গরু জবাইয়ে তারা বাধা দেবে না। নিয়ন্ত্রিত এ সমস্ত ইবাদতই কেবল ইসলাম নয়।” কোয়ালিশন সরকারের সময় ঠিক এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান (রহ.)। তাকে একজন প্রশ্ন করলো, জনাব এরবাকান, আপনারা প্রকাশ্যে নামাজ আদায় করতে পারছেন, মসজিদগুলোতে দিনে ৫ বার আজান হয়, নামাজও হয় তারপরও আপনারা ইসলামী আন্দোলনের কথা বলে যাচ্ছেন, ইসলামী খেলাফতের কথা বলে যাচ্ছেন কেন? জনাব এরবাকান উত্তর দিলেন, “মনে করেন জাদুঘরে একটি সুন্দর পাখি দেখছেন। পাখিটির রং খুব মিষ্টি, তার ২টি পা, ২টি পাখা, ঠোঁট সবই আছে, কিন্তু তাতে কেবল প্রাণ নেই। অর্থাৎ সেটি পাখি ঠিকই, কিন্তু জীবন্ত নয়। আজ এখানে ইসলাম আছে কিন্তু তাতে প্রাণ নেই। আমরা প্রাণহীন ইসলাম চাই না, আমরা চাই জীবন্ত ইসলাম।

মহান আল্লাহ সমস্ত নবী-রাসূল প্রেরণ করার মহান লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পবিত্র কুরআনুল কারীমের মাধ্যমে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর বাণী- “তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি এ দ্বীনকে অন্য সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন, তা মুশরিকদের কাছে যতই যন্ত্রণার কারণ হোকনা কেন।” (সূরা সফ : ৯)
এই আয়াতের মহান শিক্ষাকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে তিনি ছুটে চলেছেন দিক-বিদিক। লোকসংখ্যা কম/বেশি দেখেননি, শত্রুর মজবুত অবস্থান সংগ্রামী পথ থেকে বিচ্যুতি ঘটাতে পারেনি, নির্যাতন বা শাহাদাতের ঘটনাও তাদের একবিন্দু টলাতে পারেনি। ইতিহাস সাক্ষী কোনো নবী-রাসূল বা মুজাহিদদের হত্যা করে, হাদিয়া তোহফা দিয়ে, নারী-গাড়ি দিয়ে, হুমকি দিয়ে এই মিশনকে তদানীন্তন পরাশক্তি; যারা নিজেদের বড় খোদা বলে দাবি করেছিল তারাও রুদ্ধ করতে পারেনি। কখনো পারবেও না। সাইয়্যেদ সাহেব প্রেরণা নিয়েছেন এসকল ঘটনা থেকে। ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামের সকল বন্দেগি পালন করেছেন, ধর্মীয় আন্দোলন, সমাজ সংস্কারমূলক আন্দোলন ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন তিনি। ইংরেজ ও শিখদের অত্যাচার-নির্যাতনের চরম বিরোধিতা করেন তিনি। সর্বদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতেন। নিজের কি আছে আর বিরোধী শক্তির কি আছে- তা আমলে নিতেন না। শুধু বিশ^াস করতেন- এপথ থামার নয়, এপথ কণ্টকাকীর্ণ, শাহাদাতের এবং জান্নাতের। মুসলমানদের মহা দুর্যোগকাল চলছিল তখন। এমনকি হজ্জব্রত পালনের মত বড় ইবাদতও মুসলমানরা নিরাপত্তার জন্য করতে পারতেন না। সাইয়্যেদ সাহেব একবার ১০টি জাহাজ নিয়ে হজ্জে গমন করেন। শত্রুর আক্রমণ হতে পারে চিন্তা করে প্রতিরোধের ব্যবস্থাও করেছিলেন তিনি। প্রত্যেক জাহাজে একজন করে আমির নিযুক্ত করেন, তিনিও একটি জাহাজের আমির হন। এ সময় আতিয়াতুর রহমান ও গোরাবায়ে আহমদী নামক ২টি জাহাজে ১১টি কামান স্থাপন করেছিলেন তিনি। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, দ্বীনি জ্ঞান ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী একদল মুজাহিদ বাহিনী গঠন করেন। এই আন্দোলন কেন করছি? ঈমানের দাবি কি? এই কাফেলায় সম্পৃক্ত হলে জাগতিক ও পারলৌকিক লাভ-ক্ষতি কী তা তিনি দলের লোকদের ভালোভাবেই বুঝাতে পেরেছিলেন। তিনি দলীয় লোকদের উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন “আন্দোলনের মেজাজ অনুযায়ী লোক তৈরি না হলে সফলতা সম্ভব নয়”। তিনি অন্যান্য ইসলামিক দলের মত সবাইকে/সকল জনশক্তিকে এক প্লাটফর্মে আনেননি। তিনি অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলেন। এ জন্য তিনি সাধারণ মুসলমানদের সমর্থক, প্রশিক্ষিত জনশক্তিদের কর্মী এবং কর্মীদের মধ্য হতে অভিজ্ঞ বাছাইকৃত জনশক্তিদের মুজাহিদ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করেন। এমন মুজাহিদ দল নিয়ে গোপনে ছায়া সরকার গঠন করেন। যা ইংরেজ গোয়েন্দারাও দীর্ঘ ৪০ বছরে বুঝতে পারেনি। তার মুজাহিদ দলের মধ্যে অনেকেই ব্রিটিশ শাসিত সরকারের চাকরিজীবী ছিলেন। সরকারি ছুটিসহ নানা ছুটিতে একটু সময় পেলেই খুব গোপনে সাইয়্যেদ সাহেবের সান্নিধ্যে চলে আসতেন। দলের লোকদের নিয়মিত কর্মসূচি ছিল-সকালে দাওয়াতি কাজ, দিবাভাগে কঠোর পরিশ্রম, রাত্রির একাংশে ঘুম ও পরের অংশে জায়নামাজে পার করতেন।

বালাকোট ডাকে আজও বীর মুজাহিদদের
সাইয়্যেদ সাহেবের সাহসিকতা, দূরদর্শিতা এবং ঈমানী তেজোদীপ্ততা দলের লোকদের অসাধ্য সাধনেও সাহস যুগিয়েছে। ক্ষণকালের জন্য হলেও পাঞ্জতারকে রাজধানী করে ছোট্ট একটি ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। সেখানে চলে কুরআন-সুন্নাহর শাসন। লোকেরা নিজ ভূমির ওশর নিজ দায়িত্বে ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুলমালে জমা দেন। নিয়মিত ও এককালীন আর্থিক অনুদান সাইয়্যেদ সাহেবের হাতে তুলে দেন অনেকেই। এ যেন এক টুকরো সুখের কুঁড়েঘর। অভাব আছে, কিন্তু অশান্তি নেই, নেই কোনো হাহাকার। আছে পারস্পরিক সহযোগিতা, শ্রদ্ধাবোধ ও ঈমানী ভালোবাসার পবিত্র চিহ্ন। কিন্তু সে সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সমস্ত ওশর, যাকাত সাইয়্যেদ সাহেব তথা ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুলমালে জমা দেয়ায় স্থানীয় মোল্লাদের স্বার্থে আঘাত হানে। এ কথা চিরসত্য যে, যুগে যুগে মুসলমানদের পতনের অন্যতম কারণ হিংসুক, স্বার্থবাদী কিছু মুসলমানের বিশ^াসঘাতকতা, মুনাফেকি। থাকতে পারে তার গায়ে সুন্নাতি পোশাক, বলতে পারে মুখে ইসলামী রাজ প্রতিষ্ঠার কথা, শুনাতে পারে অনেক আয়াত-হাদীস। কিন্তু অন্তরের নিফাক নিয়ে এই ধরনের ব্যক্তিরাই এক সময় সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভী (রহ.), মাওলানা মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর, কাজী নজরুল ইসলামকে কাফের ফতুয়ার জালে আবদ্ধ রেখে বাতিল শক্তির সাথে আলিঙ্গন করেছে। মোল্লাদের হিংসা এত বেড়ে গিয়েছিলো যে, অন্ধকার রাতে তারা অসংখ্য গাজী/মুজাহিদ ভাইদের পিটিয়ে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এতে সাইয়্যেদ সাহেব দারুণ ব্যথিত হন। তিনি এ সমস্ত মোল্লাদের মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি কোনো মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত করতে চাননি। ব্যথাতুর মন নিয়ে সিন্ধু নদী পার হন মাত্র ৩ দিনে। অনেক সঙ্গী-সাথীদের এমন করুণ মৃত্যু তাকে ব্যথিত করেছে সত্য, কিন্তু হতাশ করতে পারেনি। নদী পার হয়ে তাঁর স্ত্রীদ্বয়কে বললেন “এ পথে আমি শহীদ হলে তোমরা বাকি জীবন মক্কা-মদীনাতে কাটাবে।”একটি বাক্যের নসিহত, কিন্তু তার মর্মার্থ কত গভীর! এরপর তিনি বীর মুজাহিদ বাহিনীকে ৪টি বিষয়ে বাইয়াত দেন।
১. কোনো প্রকার অভাব অভিযোগই আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নিকট প্রকাশ না করা।
২. যা নিজের জন্য অপছন্দনীয়, অন্য মুসলিম ভাইয়ের জন্যও তা অপছন্দনীয় মনে করা। নিজের পছন্দনীয় বস্তু অন্যের জন্য পছন্দ করা।
৩. নিজের অভাব অভিযোগের চেয়ে অন্যের অভাব অভিযোগকে গুরুত্ব দেয়া।
৪. প্রত্যেকটি কাজ শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা।
ইংরেজ ও শিখদের বিরুদ্ধে তিনি বহুবার খণ্ড খণ্ড যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ১৮২৯ ও ৩০ সালে ২টি যুদ্ধে শিখদের পরাজিত করেন। কিন্তু এবারের যুদ্ধ একটু ভিন্ন। একেতো মুজাহিদ বাহিনীর সংখ্যা অনেক কম, যারা আছেন তারাও শোকাহত। যুদ্ধাস্ত্রও তেমন নেই। যুদ্ধের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়নি। সাইয়্যেদ সাহেব ভাবছিলেন নিরাপদ দূরত্বে কিছুদিন থেকে সৈন্য সংগ্রহ করবেন। কিন্তু মোল্লারা ইংরেজ ও শিখদেরকে সাইয়্যেদ সাহেবের নতুন আস্তানার কথা গোপনে জানিয়ে দেন। শিখ সৈন্যরা বালাকোটের দিকে ধেয়ে আসছে। তাদের সংখ্যা ও গোলা-বারুদের অবস্থান জেনে সাইয়্যেদ সাহেব দলবলসহ অন্য পথ ধরে পালাতে পারতেন। কিন্তু সে পথ মুজাহিদদের পথ নয়, সে পথ ভীরু-কাপুরুষ আর নিফাকের পথ। সাইয়্যেদ সাহেব মজলিশে শূরার বৈঠক ডাকলেন, বৈঠকে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত হলো। পরের দিন অর্থাৎ ১৮৩১ সালের ৬ মে, শুক্রবার মুসলমান ও শিখ সেনাদের সাথে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। মুসলমান ও শিখদের সৈন্যের অনুপাত ছিল ১:১০০ (মুসলমান ১ আর শিখ ১০০)। যুদ্ধের প্রথম দিকে শিখরা মুসলমানদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। তারা দৌড়ে পালাতে লাগলো। কিন্তু একটু পরেই আরো সৈন্য বাহিনী ও ভারী অস্ত্রসহ কুখ্যাত সন্ত্রাসী রণজিৎ সিংহের নেতৃত্বে তারা হামলা করে। অসংখ্য মুজাহিদ শহীদ হন। বেলা তখন ১১ অথবা ১২টা, পবিত্র জুমার নামাজের সময় অতি সন্নিকটে, এমন পবিত্র সময় মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি, যুগশ্রেষ্ঠ মুজাহিদ, দলের আমির, প্রাণপ্রিয় নেতা সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভী (রহ.) শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। মুজাহিদগণ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। হঠাৎ একজন বললো-“ভাইয়েরা তোমরা এখানে কি করছো? অথচ তোমাদের আমির সাহেব পাহাড়ের ভিতরে ঢোকার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এই আওয়াজটি কার ছিল তা আজো জানা যায়নি। বালাকোট প্রান্তরে রক্তের বন্যা বয়ে গেলো। অসংখ্য মুজাহিদ ভাইয়ের লাশ পড়ে আছে। পরবর্তীতে মুজাহিদ ভাইদের লাশ দাফন শেষে দেখা গেল তখনো ৩০০ মুজাহিদ ভাই জীবিত ছিলেন। কিছুদিন পরেই মুজাহিদ ভাইয়েরা আবার মাওলানা বেলায়েত আলী ও মাওলানা এনায়েত আলীর নেতৃত্বে সংগঠিত হতে থাকে। এসময় ব্রিটিশ সরকার মুজাহিদ বাহিনীর অনেককে দেশদ্রোহী বলে গ্রেফতার করে। কি আশ্চর্য! দেশ আমার, অথচ এই দেশ রক্ষার আন্দোলন করতে গিয়ে দেশদ্রোহী হই, আর ইংরেজদের অবৈধ শাসন মেনে নিলে হই দেশপ্রেমিক!

শিখরা যা ভেবেছিল তাদের সে স্বপ্ন প্রতিফলিত হয়নি। তারা ৬ মে বালাকোট প্রান্তরে মুসলমানদের দাফন করেছিলো মনে করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল, কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী বালাকোটের প্রান্তরে শহীদ সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভী (রহ.) এবং তাঁর বীর মুজাহিদ ভাইদের দাফন হয়েছে, কিন্তু সাইয়্যেদ সাহেবের আদর্শকে দাফন করা সম্ভব হয়নি, বরং তা আরো বেগবান হয়েছে। যার প্রমাণ- সাইয়্যেদ সাহেবের শাহাদাতের খবর শুনেও ইংরেজদের সাথে কোনো আপস না করে মাত্র ১১ দিন পর ১৭ মে যুদ্ধাবস্থায় শহীদ হন উপমহাদেশের আরেক বীর সেনানী মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর। পরবর্তীতে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব, ফরায়েজি আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, দেশভাগ আন্দোলনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছে বালাকোটের বিপ্লবী চেতনা থেকে। এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পদ্ধতি ও সাহস যুগিয়েছে সাইয়্যেদ সাহেবের আন্দোলন তথা বালাকোটের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে সাইয়্যেদ সাহেবের আন্দোলন (ওহাবি আন্দোলন-ওহাবি আন্দোলনের সাথে সামঞ্জস্য থাকায় অনেকেই সাইয়্যেদ সাহেবের আন্দোলনকে ওহাবি আন্দোলন বলতো) হতে স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রেরণা খুঁজে পেতাম।

সাইয়্যেদ সাহেবের শাহাদাতের পর মাওলানা বেলায়েত আলী প্রায় দেড় বছর শিখ সেনাপতি গোলাব সিংহের সাথে যুদ্ধ করেন। ইংরেজ সরকারের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ২৭-২৮ হাজার মুসলমানকে বিনা বিচারে হত্যা করে, প্রায় ৭০০ বিশিষ্ট আলেমকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হয়, মাওলানা ফজলে হক খায়রাবাদী ও মাওলানা মুফতি এনায়েত আলীকে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সাজা দিয়ে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসনে দেয়া হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে আজাদি হাসিল পর্যন্ত প্রায় ২০ লক্ষ মুসলমান শহীদ হন। (আজাদি আন্দোলনে আলেমসমাজের ভূমিকা, পৃষ্ঠা ৩১)। মুসলমানরা মাঝপথে একটু ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। যখন মুসলিম নেতৃবৃন্দ দেখলেন যে, কিছু মুসলমান ইংরেজদের অর্থের লোভের কারণে মুজাহিদ বাহিনীর বিপক্ষে নানা ফতোয়া দিয়ে সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করছে, তখনই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন এই দেশকে সহজে শত্রুমুক্ত করা যাবে না, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রয়োজন। যার জন্য শিশু ও তরুণ প্রজন্মকে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের জ্ঞান শিক্ষা, আজাদি আন্দোলনের গুরুত্ব উপলব্ধি করাতে হবে। এজন্য তারা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মাওলানা কাসেম নানতুবী (রহ.)-এর অক্লান্ত পরিশ্রমে দেওবন্দ দারুল উলুম ও পরবর্তীতে এরূপ আরো ৪০টি দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হয়। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, তরুণ প্রজন্মকে পথ দেখানোর মতো এমন উদ্যোগই মূলত আজাদি আন্দোলনের ভিত মজবুত করে। আজ লক্ষ লক্ষ মাদরাসা, দ্বীনি প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। বালাকোটের প্রেরণার ইতিহাস, সাইয়্যেদ সাহেবের আদর্শ ও শিক্ষা গ্রহণ করে একদিন জাহিলিয়্যাতের অন্ধকার ভেদ করে খেলাফতের সূর্য উদিত হবে, মুক্ত গগনে উড়বে কালিমার পতাকা, মানুষ ফিরে পাবে তার অধিকার ইনশাআল্লাহ।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply