বাড়ছে কিশোর অপরাধ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী?

শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া

অধুনা বাংলাদেশসহ পৃথিবীর দেশে দেশে একটি সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এটি হলো কিশোর অপরাধ। কিশোরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চুরি, হত্যা, আত্মহত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, পকেটমার, মাদকসেবন, ইভটিজিং (Eve-teasing) ইত্যাদিসহ এমন সব ভয়াবহ কাজ করছে, এমন সব অঘটন ঘটিয়ে চলছে এবং এমন সব লোমহর্ষক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হচ্ছে যা কি না অকল্পনীয়। বিষয়টি সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী, আইনবিদ, রাজনীতিবিদ ও সুশীলসমাজকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে সভ্যতার এ চরম উৎকর্ষের যুগে আমাদের আগামী দিনের আশা ভরসার স্থল কিশোরসমাজের এ ব্যাপক বিপর্যয় সত্যিই বড় দুঃখ ও দুর্ভাগ্যজনক। এ সর্বনাশা ছোবল থেকে আমাদের কিশোর-কিশোরীদেরকে রক্ষা করতে হবে।

কিশোর অপরাধচিত্র
১৯৯৪ সালে ইলিশিয়াম ভবনে স্কুল বন্ধুদের দ্বারা দশম  শ্রেণীর ছাত্র ঈশা (১৫)  হত্যাকাণ্ড ঘটে। গ্রেফতার হয় ঈশার বন্ধু প্রিন্সসহ ৫ কিশোর। খুন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কিশোরটি বন্ধু-বান্ধব নিয়ে নীল ছবি দেখছিল। ঘটনায় দেশবাসী স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। অথচ এ ঈশাই মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তার মাকে বারবার আর্তনাদ করে বলছিল মা তুমি চাকরি ছেড়ে দাও, আমি একা বাসায় থাকতে পারছি না।
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সম্প্র্রিতিক ও নিকট অতীতের আরও কিছু অবাক করা ঘটনা
ক. ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজের তাসনুভা নামে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বার্ষিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় সে আত্মহত্যা করে বলে কলেজ কর্র্তৃপক্ষের ধারণা। তার বাড়ি কুষ্টিয়াদের। তাসনুভার বাবা মো: একরাম একজন এনজিও কর্মকর্তা। গতকাল তার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
(দৈনিক আমাদের সময়, ৩০.১১.২০০৮)
১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সন পর্যন্ত এই ৫ বছরে পুলিশের ডায়েরি মতে, শুধু ঝিনাইদহ জেলায় ৬১ জন শিশু, ১৯১ জন কিশোর ও ৪৩৬ জন কিশোরী অত্মহত্যা করে। দৈনিক ইতেফাক, ২২. ৩. ১৯৯৫ ।
খ. কোতোয়ালী থানা পুলিশ গত ১৫ই জুলাই পাট গুদাম হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র নাজমুল হাসান বাবু (১২) হত্যা রহস্য উদঘাটন এবং হত্যার সহিত জড়িত একই মাদ্রাসার ছাত্র হামিদুল ইসলাম (১৪) ও আবদুর রহমান মুন্না নামের অপর এক কিশোরকে গ্রেফতার করিয়াছে। পুলিশ নিহত বাবুর অপহৃত সাইকেল ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দা উদ্ধার করিয়াছে। উল্লেখ, গত ১২ই জুলাই রাত্রে শহরের কেওয়াটখালী নিবাসী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসর এমরান হোসেনের পুত্র নাজমুল হাসান বাবুকে জবাই করিয়া হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে ধৃত কিশোরদের স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, নিহত বাবু গত ৫ জুলাই পাট গুদাম হাফিজিয়া মাদ্রাসা হইতে হেফজ সম্পূর্ণ করায় তাহার পিতা তাহাকে একটি সাইকেল কিনিয়া দেয়। বাবু সাইকেল লইয়া রাস্তায় বাহির হইলে তাহার সহপাঠী কোতয়ালী থানার চর নিকলিয়ার হামিদুল ইসলাম চালানোর জন্য বাবুর নিকট সাইকেলটি চায়। বাবু সাইকেল না দেয়ায় উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে বাবু হামিদুলকে চপেটাঘাত করে। হামিদুল তাহার বন্ধু কোতয়ালী থানার মড়াখোলার আবদুল জলিলের পুত্র আবদুর রহমানকে ওরফে মুন্নাকে ঘটনা অবহিত করে এবং বাবুকে মারিয়া ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত ১২ ই জুলাই রাত্রি সাড়ে আটটায় তাহার এক বাড়িতে কুরআন খতমের দাওয়াতের কথা বলিয়া একই সাইকেলে তিনজন রওয়ানা হয়। পথিমধ্যে পাওয়ার হাউজের দৌয়ালের পার্শ্বে হামিদুল অতর্কিত বাবুকে জাপটাইয়া ধরিয়া মাটিতে ফেলিয়া দিয়া দুইজন মিলিয়া দা দিয়া তাহাকে জবাই করিয়া ফেলিয়া রাখে। ঘটনার পর হমিদুল ও মুন্না সাইকেলযোগে চলিয়া যায়। (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮.০৭.১৯৯৬)
গ. পকেটমার আরিফ হোসেন (১৬) বয়সে কিশোর হলে কাজে সে ভয়ঙ্কর। চার বছরে শতাধিক মোবাইল ফোন সেট চুরির অভিজ্ঞতা আছে তার। সুযোগ পেলে আস্ত্রের মুখে পণবন্দী করেও পথচারীদের ফোন ও টাকা লুটে নেয়। এসব অপরাধে এ পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে চারবার। তবে কিশোর হওয়ার সুবাদেই বারবার ছাড়া পেয়ে যায়। আরিফ ও তার সহযোগী কিশোর অপরাধী রাজ্জাক মূলত বাস বা জনবহুল স্থানে পকেট মারে। প্রতিপক্ষ তাদের থেকে দুর্বল হলে তখন পকেটমার থেকে তারা ছিনতাইকারীতে পরিণত হয় তাদের টার্গেট মূলত জনসাধারণের পকেটে থাকা মোবাইল সেট ও মানিব্যাগ। পকেটমার হিসেবে দুজনই খুব দক্ষ। পকেট কেটে এ পর্যন্ত এক থেকে দেড়শটি মোবাইল ছিনতাই করেছে। ছিনতাইকৃত মোবাইল বিক্রি করে গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেটের মফিজ ভাই, নজু ভাইসহ অনেকের কাছে। তবে বয়সে ছোট হওয়ার কারণে ন্যায্যমূল্য পায় না তারা। সে জানায়, নোকিয়া এন সিরিজের একটি মোবাইল আনতে পারলে তাদের মাত্র ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা দেয়া হয়। বেশি টাকা চাইলে বড় ভাইয়েরা পুলিশে দেয়ার ভয় দেখায়। এ পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে আরিফ চারবার পুলিশের কাছে ধরা পড়েছে। তবে বয়স কম থাকায় প্রতিবারই সে বেরিয়ে এসেছে। সে জানায়, আগে ছাড়া পেলেও এবার মনে হয় পাব না।
আরিফের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে। অভাবের তাড়নার লেখাপড়া বাদ দিয়ে ছয় বছর আগে এক প্রতিবেশীর সাথে ঢাকায় আসে। এখানে এসে পুরান ঢাকার একটি ওয়ার্কশপে ওয়েলিংয়ের কাজ শেখে। সেখানে জাহাঙ্গীর নামে এক ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয় তার। এ জাহাঙ্গীর যে ছিনতাই ও পকেটমার শেখানোর ওস্তাদ তা সে জানত না। এক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে জাহাঙ্গীর তাকে পকেটমার শেখায়। এরপর থেকে চলতে থাকে ছিনতাই ও পকেটমার। আরিফ ও রাজ্জাক মূলত একসাথে পকেট কাটার কাজ করে থাকে। এ কাজের জন্য তাদের কিছু সাঙ্কেতিক শব্দ রয়েছে। বুকপকেটকে বলে বুককান, পাঞ্জাবী বা প্যান্টের ঝুল পকেটকে নিচকান ও প্যান্টের পেছনের পকেটকে বলে থাকে পিচকান। বাস বা জনবহুল স্থানে পকেট কাটার জন্য তারা এক ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করে। এরপর ওই ব্যক্তির পিছু নেয়। সাধারণত রাজ্জাক ওই ব্যক্তির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিজের শরীর চুলকাতে থাকে। রাজ্জাকের হাত নাড়াচাড়ার এক ফাঁকে আরিফ ওই ব্যক্তির পকেটে হাত ঢুকিয়ে নিয়ে যায় তার মূল্যবান জিনিসপত্র। হাত দিয়ে সহজভাবে কাজ সম্পন্ন না হলে সে ক্ষেত্রে ব্লেড ব্যবহার করা হয়। আর পকেট কাটার জন্য সব সময় জিলেট কোম্পানীর উন্নতমানের দামি ব্লেড ব্যবাহার করে থাকে বলে সে জনায়। দৈনিক নয়া দিগন্ত, ৫-৪-২০০৮।
ঘ. দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়–য়া এক স্কুলছাত্রী শিমুকে ধর্ষণ করেছে দুর্র্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বিদ্যানগর গ্রামে এ ঘটনাটি ঘটে।
এলাকাবাসী জানায়, প্রতিবেশী লুৎফর রহমানের পুত্র হুমায়ুন (১৮) ও হযরত আলীর পুত্র শাকিল (১৫) দুজন মিলে ৮ বছর বয়সী দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী শিশুটিকে ধরে জোরপূর্বক একটি টমেটো ক্ষেতে নিয়ে যায়। সেখানে হুমায়ুন ও শাকিল পালাক্রমে শিশুটিকে ধর্ষণ করে। এ সময় শিশুটির কান্না ও আর্তচিৎকার শুনে অশপাশের লোকজন ছুটে এসে শিশুটিকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে এবং উপজিলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে শিশুটির শারীরিক আবস্থায় আরো অবনতি হলে তাকে কিশোরগঞ্জের সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ঘটনার পরপর দুষ্কৃতিকারী হুমায়ুন ও শাকিল পালিয়ে যায়। এ ব্যাপারে থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। দৈনিক অপরাধকণ্ঠ, ০৫-০১-২০০৯।
বর্ণিত ঘটনাগুলো থেকে আমাদের দেশে কিশোর অপরাধের মাত্রা ও ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায।

কিশোর অপরাধ কী
মানবিক জীবনে কৈশোর কালটি নানা প্রতিকূল প্রতিবন্ধকতার মাঝ দিয়ে পার হয়। স্কুল পেরুনো বয়সটাই হেলো উডু উডু চঞ্চল। বাধা না মানার বয়স। এ বয়সে বন্ধু খুঁজতে থাকে সে। পেয়েও যায়। বন্ধুকে ঘিরে যা সত্য না তাও ভাবতে থাকে। কখনও সে মধুর স্বপ্নে আনন্দে বিভোর থাকে। আবার কখনও বিভিন্ন জটিল সমস্যার কারণে ভিষণœতায় ভোগে। এ ক্রান্তিলগ্নে তার মাঝে এসে ভর করে অস্থিরতা, রোমান্টিসিজম, অ্যাডভারটারিজম ও হিরোইজম। এ সব চিন্তার মাঝে যেমন আছে ভালো লাগা তেমনই আছে নীরব পতনের পদধ্বনি।
সংক্ষেপে যে সমস্ত কাজ প্রাপ্ত বয়স্কদের দ্বারা সংঘটিত হলে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় সে ধরনের প্রচলিত আইন ভঙ্গকারী কাজ অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা কিশোরদের দ্বারা সংঘটিত হলে সেটিকে কিশোর অপরাধ বলা হয়। অন্য কথায়, অসদাচরণ অথবা অপরাধের কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা বিচারালয়ে আনীত কিশোরকে কিশোর অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে বলা হয় যে, আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত কিশোররাই হচ্ছে কিশোর অপরাধী। কিন্তু আদালতের অপরাধ নিরূপণ পদ্ধতি ও রায় দেশ ও সমাজ ভেদে বিভিন্ন ধরনের হয়। তাই বলা যেতে পারে যে, কোনো কিশোর অপরাধী কি না তা নির্ভর করে তার মাতাপিতা, প্রতিবেশী সমাজ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সর্বোপরি আদালতের বিচারকের মনোভাবের ওপর।
অপরাধ ও অপরাধীদের বিচার সম্পর্কিত ১৯৫০ সালের আগস্টে লন্ডনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের দ্বিতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে গৃহীত এক সিদ্ধান্তে বলা হয় যে, শিশু বা অপ্রাপ্ত বয়স্কদের দ্বারা সংঘটিত যে সব আচরণ অসংগতিপূর্ণ বা আইনভঙ্গমূলক অর্থাৎ যা সমাজিকভাবে বাঞ্ছিত বা স্বীকৃত নয় তা সবই কিশোর অপরাধের অন্তর্ভূক্ত। অন্যদিকে আমেরিকান চিল্ড্রেন ব্যুরো কিশোর অপরাধের সংজ্ঞায় উল্লেখ করেছে যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক বা কিশোরদের দ্বারা সংঘটিত রাষ্ট্রিক আইন বা পৌর বিধি বিরোধী সব কাজই কিশোর অপরাধের আওতাভুক্ত। উপরন্তু, সমাজ সদস্যদের অধিকারে আঘাত করে এবং কিশোরদের নিজের ও সমাজের কল্যাণের পথে হুমকি স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়, কিশোরদের দ্বারা সংঘটিত এমন যে কোনো মারাত্মক সমাজবিরোধী কাজও কিশোর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
অপরাধ বিজ্ঞানী  cavan এবং ferdinand এর মতে সমাজ কতৃক আকাক্সিক্ষত আচরণ প্রদর্শনে কিশোদের ব্যর্থতাই কিশোর অপরাধ। পি ডব্লু টটাপপান কিশোর অপরাধীদের চারটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন
ক. যার বৃত্তি আচরণ, পরিবেশ অথবা সংগীতদল তার নিজস্ব কল্যাণের পথে ক্ষতিকর।
খ. যে অবাধ্য, কিংবা যে তার মাতা-পিতা বা অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়;
গ. ইচ্ছাকৃতভাবে যে স্কুল পালায় কিংবা সেখানকার নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে এবং
ঘ. যে রাষ্ট্রিক আইন বা পৌর বিধি বহির্ভূত কাজ করে।

কৈশোরে বিশেষ চাহিদা
ক. স্বাধীনতা ও সক্রিয়তার চাহিদা (Need for freedom and activity) : এ বয়সে কিশোর কিশোরীরা সর্ব ব্যাপারে স্বাধীন হতে চায়। তার আত্মসম্মানবোধ মনে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে। দায়িত্ব বহন করার, নিজের মত প্রকাশ করার, দশের মধ্যে একজন হবার প্রবল আকাক্সক্ষা তার মধ্যে দেখা দেয়। তখন সে সদা কর্মমুখর থাকে। তার এ স্বাধীনতা ও সক্রিয়তাবোধ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
খ. সামাজিক বিকাশের চাহিদা : বয়ঃসন্ধিকালে সমাজ চেতনার বিকাশ খুব গভীর হয়। আত্মসম্মান ও মর্যাদাবোধ তাকে সামাজিক বিকাশে সহায়তা করে। গৃহের বন্ধন অপেক্ষা বাইরের আহবান তাকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। সে তখন বৃহত্তর সমাজ জীবনের ভাবের দোসর খোঁজে, সঙ্গীসাথীদের সাথে মেলামেশায় সুযোগ গ্রহণ করে, অপরিচিতের মধ্যে আত্মীয়তা অনুসন্ধান করে।
গ. আত্মপ্রকাশের চাহিদা : এ বয়সে অরেকটি চাহিদা হলো নিজেকে প্রকাশ করা। আবেগপ্রবণ হওয়ায় বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে তারা নিজেদের মূল্যবোধকে সমাজের কাছে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সমাজের অন্যান্য ব্যক্তি তাদের এ কর্মের মূল্য দেবে এটাই তারা বিশেষভাবে চায়। এ চাহিদার তৃপ্তি ব্যক্তিসত্তার সুষম বিকাশের পক্ষে অপরিহার্য। এ চাহিদা পূরণ না হলে তারা দুর্বলচেতা, আত্মবিশ্বসহীন ও নিষ্ক্রিয় হয়। পড়াশুনা, খেরাধুলা, গান বাজনা, অভিনয়, অংকন, কবিতা লেখা, পত্র মিতালী, ডায়েরি লেখা এবং অন্যান্য কালেজের মাধ্যমে তারা আত্মপ্রকাশ করে।
ঘ. আত্মনির্ভরতার চাহিদা : আত্মপ্রকাশের চাহিদা থেকেই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার ইচ্ছা জাগে। তারা ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা শুরু করে। পরনির্ভর না হয়ে স্বাধীন জীবন যাপনের প্রবল ইচ্ছা বয়ঃসন্ধিকারে দেখা দেয়। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখে। ভবিষ্যতে কোন ধরনের পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করবে সে চিন্তা সে করে।
উপযুক্ত পেশা নির্বাচনে মাতাপিতা ও শিক্ষকের সহায়তা এ বয়সে বিশেষভাবে প্রয়োজন।
ঙ. নতুন জ্ঞানের চাহিদা : এ বয়সে মানসিক বিকাশ পূর্ণতা লাভ করে। ফলে কৌতূহলপ্রিয়তা, অজানাকে জানার আকাক্সক্ষা তাদের মধ্যে দেখা দেয়। নতুন কিছু জানতে চায়, শিখতে চায়, অসীম কৌতূহলে বিশ্বের জ্ঞান ভান্ডার আহরণ করার তাকিদ অনুভব করে। এ স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞানের আকাক্সক্ষাকে যদি মাতা-পিতা, শিক্ষক, অভিভাবকবৃন্দ সঠিক পথে পরিচালনা করতে পারেন তবে এ ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যৎ জীবনে, কর্মক্ষেত্রে, সমাজে সাফল্য লাভ করতে পারে।
চ. নীতিবোধের চাহিদা : বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের মধ্যে নীতিরোধ জাগ্রত হয়। ভালো মন্দ, ন্যায় অন্যায়, উচিত অনুচিত বোধ সে মন থেকে উপলব্ধি করে। নিজের এবং অপরের কাজকে নীতিবোধের মানদণ্ডে বিচার করে। সমাজের রীতি নীতি, আদর্শবোধ তার বিবেককে নাড়া দেয়। নিজে নীতিবিরোধী কোনো কাজ করলে তার মনে অপরাধবোধ সৃষ্টি হয়।
ছ. নিত্য নতুন চমকপ্রদ ও অভিনব বিষয়ে আগ্রহ : প্রাত্যহিক জীবনের কার্যক্রম এ বয়সের ছেলেমেয়েদের একঘেঁয়ে এবং বিরক্তিকর মনে হয়। তারা চায় নতুন নতুন চমকপ্রদ ও অভিনব বিষয়ের মাধ্যমে আনন্দ পেতে। তারা চায় দল বেঁধে পিকনিক করতে অথবা সিনেমা দেখতে। শিক্ষককে ফাঁকি দিয়ে পাঠশালায় পলায়ন, রাতের অন্ধকারে পাড়া প্রতিবেশীর বাগানের ফল চুরি করা, সিগারেট বা মাদকদ্রব্য চেখে দেখা ইত্যাদি কাজে তাদের অসীম আগ্রহ ও নিষ্ঠা দেখা যায়। মাদকাসক্তদের কেইস হিস্ট্রি থেকে জানা যায় প্রথম মাদকদ্রব্য সেবনের অভিজ্ঞতা তাদের হয়েছে সহযোগী বন্ধুদের পরামর্শে অ্যাডভেঞ্চার করতে যেয়েই এবং পরবর্তীতে ড্রাগস এর মরণ ফাঁদে তারা জড়িয়ে পড়েছে।
জ. নিরাপত্তার চাহিদা : বেশির ভাগ কিশোর কিশোরীর মনে নিজের কর্মক্ষমতা, পরিবারের দলে অথবা স্কুলে তার অবস্থান এবং নৈতিক মূল্যবোধ এর সমন্বয়ে নানারকম মানসিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এ দ্বন্দ্বের টানাপোড়েনে তারা আত্মবিশ্বাস হারিযে অসহায় বোধ করে। এ বয়সের চাহিদাগুলোর পাশাপাশি শাস্তি পাওয়ার ভয়ও তাদের মনে কাজ করে। ফলে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
ঞ. আত্ম পরিচিতির চাহিদা (Need for self identity) : এ বয়সের ছেলেমেয়েদের নিজ সম্পর্কে ধারণা পাকাপোক্ত হয়। তারা (gendr appropriate behaviour)- এর মাধ্যমে নিজের পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এরিকসন ও স্তরে Identity vs.role diffusion এ দ্বন্ধের কথা বলেছেন এ বয়সের ছেলেমেয়েরা সমাজে তার স্থান ও ভূমিকা নিয়ে চিন্তা করে এবং যাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, উদ্যম ও স্বাধীনভাব অর্জিত হয়, তারা নিজেদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধনাত্মক পরিচিতি লাভ করে। অন্যদিকে, নিজ সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা থাকলে অনেক সময় আত্মসংযম হারিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে। কিশোর কিশোরীরা এ বয়সে মাতা-পিতার ও সমাজের মূল্যবোধকে তীক্ষèভাবে যাচাই করে আত্ম পরিচিতি গড়ে তোলে।

কৈশোর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সামাজিক প্রক্রিয়া
বয়ঃসন্ধিক্ষণে মানব জীবনের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। কৈশোরে পা দেয়ার পর থেকে কিশোর-কিশোরীরা ভাবতে শুরু করে যে, তারা আর ছোটটি নেই, আবার ঠিক বড়ও হতে পারেনি। কারণ, পরিবারের অন্য সদ্যগণ তাদের ছোট হিসেবে দেখে। এ বয়সে মা বাবার কাছ থেকে সন্তান যেন সরে যেতে থাকে। ছেলের সাথে মায়ের, বাবার সাথে মেয়ের মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে। ছেলেমেয়ের আলাদা শোবার ঘর করে দেন বাবা মা। হঠাৎ করেই ছেলে অথবা মেয়ে একা হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে একজন কিশোর মনে করে, সে ছোট ও বড়র মাঝামাঝি এক অচেনা জগতের বাসিন্দা। তার তখন কোনো কিছুই ভালো লাগে না। কোনো কিছুতেই যেন মন ভরে না।
অন্যদিকে একজন কিশোরী আয়নায় এক অন্য আমিকে আবিষ্কার করে। নিজেকে দেখতে বা নিজের শরীরে পরিবর্তনকে দেখতে গিয়ে অনুচিত হীনমন্যতায় ভূগতে শুরু করে। সামান্য কারণে যখন তখন মার বকুনি শুনতে হয়। যে মেয়েটি মা ছাড়া একদিন কিছু বুঝত না সে তখন ধীরে ধীরে মায়ের চেনা জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে।

কিশোর অপরাধীদের বিভাগ
কিশোর অপরাধীদেরকে কয়েকটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা যায়। এখানে কয়েকটি মূল বিভাগের উল্লেখ করা হলো
ক. দুর্বোধ্য মনস্ক : ইংরেজিতে এদের problem boy বলা যায়। অনেক কিশোর তারা কী চায় তা তারা নিজেরাই জানে না। লক্ষ্যবস্তু সম্বন্ধে তাদের নিজস্ব কোনোও ধারণা নেই। তাই কোনো কাজই তাদের মনৎপূত হয় না। তারা বারে বারে একটি কাজ বা পাঠ ছেড়ে অন্য কাজ বা পাঠ গ্রহণ করে। পরক্ষণেই তারা বুঝে যে, এটিও তাদের মনপূত নয়।
খ. আক্রমণাত্মক (Aggresive) : এ কিশোর সদাব্যস্ত ও একরোখা হয়, তারা লক্ষ্য ও পথ পরিবর্তন করতে চায় না, সব কিছুই ওদের তাৎক্ষণিক চাই। ঈপ্সিত লক্ষ্য সম্বন্ধে তাদের স্পষ্ট ধারণা থাকে। কিন্তু ওদের সকলে বিনা বাধায় ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে না। কাউকে কাউকে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। ওই বাধাবিঘœ অতিক্রম করতে অসমর্থ হলে তাদের ভাবাবেগ রুদ্ধ হয়। অবরুদ্ধ ভাবাবেগ নৈরাশ্যের সৃষ্টি করে। এ ণৈরাশ্য হতে দু’শ্রেণির আক্রমণাত্মক কিশোরের উদ্ভব হয় পরাঘাতী ও আত্মঘাতী।
গ. বিকল্পপন্থী : এরূপ কিশোরদের লক্ষ্যস্থল খুব উঁচু বা খুব নিচু নয়। বাধা পেলে তারা বিকল্প লক্ষ্য কিংবা পথ খুঁজে নেয়। সাধ্যাতীত লক্ষ্যবস্তুকে এরা এড়িয়ে চলে। এদের আকাক্সক্ষা সীমিত। নিজেদর সীমিত ক্ষেত্রে এরা প্রায়ই সফল হয়। এ সফলতা তাদের ভয়শূন্য করে। ব্যর্থতাও এদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ না। এটা তারা সহজভাবে গ্রহণ করে। এদের নিকট ভাবাবেগ অপেক্ষা যুক্তি বুদ্ধিই প্রধান। অভিজ্ঞতা দ্বারা সমস্যার গুরুত্ব কমিয়ে আনে। বয়স্ক লোকদের মত এদের ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস আছে।
ঘ. অস্বভাবী : অস্বভাবী কিশোরগণ নানারূপ অন্তর্দ্বন্দ্বে ভোগে। প্রশমিত মনোজট (comple) এর কারণ হতে পারে। কেউ বিচ্ছিন্নমনা (ssplit up) সরহফ রোগে ভোগে । কারো মধ্যে দ্বৈত বা বহু ব্যক্তিত্ব দেখা যায়।
সিনেমায় কিংবা থিয়েটারে যাব কিংবা ভাত বা রুটি কোনটি গ্রহণীয়। এরূপ সামান্য অন্তর্দ্বন্দ্ব ক্ষতিকর না। এ দুটি তাদের নিকট সমান প্রিয় হতে পারে। কিন্তু গুরুতর অন্তর্দ্বন্দ্ব বেদনাদায়ক। তাদের মধ্যে বহু হেতুহীন ভয় ও ক্রোধ দেখা যায। মাঝে মাঝে এরা বিমর্ষ হয়ে ওঠে। কিন্তু এর কারণ বুঝতে পারে না। কোনোও কিছুতে মনোনিবেশে অক্ষম হয়। এরা ধৈর্যহীন ও বিস্ফোরণশীল হয়ে থাকে।
ঙ. অপরাধমুখী : অপরাধমুখী কিশোরদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা কিছু বেশি থাকে। সুযোগ ও সুবিধা পেলে অপকর্ম করার জন্য তারা সদা উম্মুখ। এদের মধ্যে লোভী কিশোরদের মতো প্রতিহিংসাপরায়ন কিশোরও থাকে। এদের অপরাধ প্রতিরোধ সম্পর্কীয় স্নায়ু অত্যন্ত দুর্বল । সামান্য প্রলোভন বা ক্রোধ এদের প্রদমিত অপস্পৃহাকে গর্হিত করে। ওদের কেউ কেউ যৌনজ ও অযৌনজ এবং কেউ সম্পত্তির বিরুদ্ধে অপরাধ করে। এরা স্বার্থপর হয় ও লাভালাভ বোঝে । এরা ভবিষ্যৎ আশু ফল প্রয়াসী।
চ. দুর্বল-চিত্ত (Feeble-minded) : দুর্বলচিত্ত কিশোদের বুদ্ধিমত্তা বয়সের তুলনায় কম থাকে। এটিকে চিত্তদৌর্বল্য বলা হয়। এরা সরলমনা ও বিশ্বাসী হয়। কিছু বিষয়ে অভিযোগমুখর হলেও এরা প্রতিহিংসাপরায়ণ না হয়ে কৃতজ্ঞতা ও কর্তব্য বোধ দেখায়। এরা সহজেই অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এদের ভুল বোঝানো ও ভুল বিশ্বাস করানো সহজ। ভিটামিন, প্রোটিন খাদ্য ও হরমোনের ঘাটতিপূরণ এদের নিরাময় করে। বয়সের সাথে ওদের অনেকেরই বুদ্ধি দ্রুত বেড়ে পূর্বক্ষতি পূরণ করে।
মধ্যবর্তী কালে ওদের প্রতি কিছু বেশি লক্ষ্য রাখা সহ উৎপীড়কদের হাতে থেকে ওদের রক্ষ করার প্রয়োজন হয়। অবশ্য বহু সরলমন কিশোরের সাধারণ বুদ্ধি প্রখর হয়। তবে উন্মাদ ও নির্বোধদের জন্য স্বতন্ত্র মানসিক ও দৈহিক চিকিৎসার প্রয়োজন।
ছ. নেতৃত্ব বিলাসী : এ শ্রেণীর বালক অতি মাত্রায় নেতৃত্ব অভিলাষী হয়ে থাকে। এদের কেউ কেউ এজন্য নিজেদের মধ্যে মারপিট পর্যন্ত করেছেন। কিন্তু এদের সকলের মধ্যে নেতৃত্বের উপযুক্ত গুণ থাকে না। এদের মধ্যে কিছু শান্তিপ্রিয় কিংবা দুর্বলদেহী কিশোর থাকে। এরা নেতা হওয়ার সহজ পন্থাসমূহ বেছে নেয়।
এরা বাড়ির কিংবা অন্যের অর্থ আত্মসাৎ করে ফুটবল বা খেলার সরঞ্জামাদি কিনে ক্লাব তৈরি করে নিজেই ক্লাবের প্রধান হয়। পড়াশুনা বা অন্য বিষয়ে এরা মধ্যপন্থা কিশোর। এদের অভিভাবকরা প্রয়োজনীয় যৎ সামান্য অর্থ দিলে এরা এরূপ অপকর্মে লিপ্ত হতো না। ওদের এরূপ নেতৃত্ব আরোপিত হলেও তারা সেটির দ্বারা সুষ্ঠু ব্যক্তিত্ব লাভ করে।

কিশোর অপরাধীদের বৈশিষ্ট্য
কিশোর অপরাধীদের মাঝে নিম্নোক্ত বৈশিস্ট্যসমূহ লক্ষ্য করা যায়
ক.স্বাস্থ্যগত বৈশিষ্ট্য : নিরেট দেহী, সুসংবদ্ধ, পেশীবহুল।
খ. মানসিক বৈশিষ্ট্য : অস্থির, ধৈর্যহীন, ভাবুকতা।
গ. কর্মশক্তিগত বৈশিষ্ট্য : মাত্রাহীনতা, আক্রমণাত্মক, নাশকতাপ্রিয়।
ঘ. আচরণগত বৈশিষ্ট্য : শত্রুতা, বেপরোয়া, বিঘœসৃষ্টিকারী, সন্দিগ্ধ, জেদী, অধিকার বিলাসী, দুঃসাহসিক, সংস্কারবিহীন মন ও আনুগত্যহীন।
ঙ. মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য : জবরদস্তি স্বভাব, নেতত্ববিলাসী, সফলতার জন্য অন্যায় পন্থা গ্রহণ, নিষ্ঠুরতা, নির্দয়ভাব, স্বার্থপরতা।

কিশোর অপরাধের কারণ
১ মনস্তাত্ত্বিক কারণ
ক. বয়ঃসন্ধিপ্রাপ্ত ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সহনশীলতার অভাব খুব প্রকট হয়ে ওঠে। এ সঙ্কটের অন্যতম কারণ অপরিণত আবেগের বৃদ্ধি। মনস্তত্ত্বের পরিভাষায়, অপরিণত মনস্তাত্ত্বিক উন্নতি মানে সুস্থ আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত বৃদ্ধি ঘটতে না দেয়া। সহনশীলতা ব্যাপারটা সৃষ্টি হয় আবেগ থেকে। সেই স্বতস্ফূর্ত আবেগে যদি বাধা আসে, তাহলে সহনশীলতার অভাব ঘটতে বাধ্য। এই মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ই কৈশোরে অনেক বিতণ্ডার মূল।
খ. শিশু-কিশোরদের আমরা নৈতিক কিছুই  ঠিকমতো শেখাই না। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা সেভাবে সচেতন হয়ে উঠতে পারে না। জীবনে অনেক জিনিসই পাওয়া যায় না। না পাওয়া ব্যাপারটা যে জীবনেরই অঙ্গ, আমরা তা শেখাই না।
এমনিতেই বয়ঃসন্ধির সময় হরমোন এবং শারীরিক পরিবর্তনের জন্য ছেলেমেয়েদের মধ্যে সঙ্কট দেখা যায, এ সঙ্কট এতোটাই মারাত্মক হয়ে ওঠে যে, তখন কোনো ব্যর্থতা দেখা দিলে তারা তা সহ্য করতে পারে না। সহ্য না করতে পেরে তারা ভেতরে ভেতরে নানাভাবে অপরাধী হয়ে ওঠে। আবার কেউ কেউ এক ধরনের পলায়নপর মনোবৃত্তির আশ্রয় নেয়। শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া ছাড়া তাদের আর কোনো রাস্তা থাকে না। এটি যেমন পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে ঘটে থাকে, তেমনটা ঘটে থাকে প্রেম বা অন্য কিছুর ক্ষেত্রেও ।
গ. কোনো কোনো ছেলেমেয়ে এ বয়সে Pathological lier হয়ে যায়। তারা মিথ্যের মধ্যেই থাকতে শুরু করে। মিথ্যে আর সত্যের মাঝে ভেদরেখাটা তাদের সামনে ক্রমশ মুছে যায়। অবাস্তব বা রোমান্টিক স্বপ্ন দেখতে শুরু করে তারা। মাতা-পিতার সঙ্গে যত বেশি মানসিক বিভেদ, বাড়িতে যত অশান্তি বাড়তে থাকে, ততই এ মিথ্যাচারও বাড়তে থাকে। পলাতকী মনোভাব (Escapism ) থেকে এ মিথ্যা বিশ্বাস, মিথ্যা কথার ব্যাপারটা আসে। এ বয়সে ছেলেমেয়েরা একটু বেশি স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে। মাথা পিতার মধ্যে কোনোও রকম টেনশন থাকলে, নিঃসঙ্গ বা Neglected বোধ করলে ছেলেমেয়েরা খুব বেশি স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে। অসম্ভব জেদি, রাগী, একগুঁয়ে, সন্দেহপ্রবণ হয়ে এমন একটা পর্যায়ে তারা ক্রমশ চলে যায় যে, শেষ পর্যন্ত জীবন বিমুখ হয়ে পড়ে। সব রকম আনন্দ স্পৃহা, উৎসাহ থেকে দূরে চলে যায় এবং একেবারে খেতে চায় না। খিদেই পায় না এবং এদের শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায় না। বয়ঃসন্ধির এ মানসিক রোগকে বলে Anorexia nervosa। যারা এতদূর যায় না তাদের অনেকেই বিষণতায় (depression) ভোগে।
ঘ. একটি কিশোরের ভেতরে Input output খুব স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্টি হতে থাকে। তাদের হাবভাবও ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে ওঠে। ওরা বুঝতে পারে, যদি সে পরীক্ষায় ভালো ফল করে, তাহলে মা তাকে ভালোবাসবে। এ মানসিকতার ফলে মা-শিশুর মধ্যে স্বাভাবিক ভালোবাসার ঘাটতি দেখা যয়। ভালোবাসা ব্যাপারটা শর্তসাপেক্ষ হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারটা শুরু হয় স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় এ থেকেই। স্কুলে ভর্তি হওয়ার চাপ থেকে এই Input output এর চাপ তৈরি। তখন থেকেই দূরে সরে যায় সহজ সরল জীবনের যাবতীয় সম্ভাবনা।
ঙ. অতি অল্পবয়স থেকেই কিশোরকে একটা যান্ত্রিক রুটিনের মধ্যে বেঁধে ফেলার চেষ্টা চলে। সে যেন কোনো এক উপকরণ বা কাঁচামাল। ওই যান্ত্রিক রুটিনের মধ্যে তাকে ক্রমশ বড় করে তোলা হয়। সে যখন বন্ধুদের সাথে খেলছে, তখন হয়তো তাকে টেনে হিঁচড়ে অঙ্ক কষানোর জন্য টিচারের কাছে বসিয়ে দেয়া হল। পড়ানো শেষ না হতেই সাঁতারের সময় হয়ে যায়। তখনই আবার দৌড়। এরপর নাচগানের ক্লাস আছে। ড্রইং শেখা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে, এ সব যান্ত্রিকতা ওদের ভালো লাগে না। এ ধরনের যান্তিকতায় তারা মরিয়া হয়ে পড়ে। ফরে পড়াশোনাটা স্বাভাবিকভাবে হয় না, পুরোটাই জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়। ‘নাও এবার এটা মুখস্থ করো’- এ মনোভাবে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এমন কি বাড়ির গণ্ডি ছাড়িয়ে গেলেও দৃশ্য একই পদ্ধতি। সেখানেও রয়েছে সেই যান্ত্রিকতা। স্কুলে গিয়েও একই পদ্ধতির শিকার হয়।
চ. কিশোররা অনেক কিছু আঁচ করে নিতে পারে। তারা বুঝতে পারে বাবা মায়েরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রমাগত ভাবনা-চিন্তা করছেন। বাবা-মায়ের উদ্বেগ তাদের ওপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলে, এ ব্যাপারে কোনোও সন্দেহ নেই। কিশোরদের মনেও তৈরি হয় অপরাধবোধ।
ছ. বাবা-মায়েদের কৃত্রিম ব্যবহারও কিশোররা বেশ বুঝতে পারে। সারাদিনের ধকল সামলে বাবা মায়েরা নিতান্ত অনীহা সত্ত্বেও যখন ছেলেমেয়েদের সঙ্গ দেন হাসিমুখে রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে, তখন সে বুঝতে পারে বাবা কিংবা মায়েরা ক্লান্তি, বিরক্তি সত্ত্বেও মুখে উৎসাহের ভান করছেন। তাদের সংবেদনশীল মন এ ব্যাপারটা বুঝতে পারে এবং ক্রমশ বাবা-মায়েদের মেকি ব্যবহারে দুই পক্ষের মাঝে দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় নিজেরই অজ্ঞাতসারে। ফলে পরীক্ষায় খারাপ ফল বা
প্রেমে ব্যর্থ হলে বাবা-মায়ের কাছ থেকে সাহায্য চাইতে পারে না। অন্যদিকে ব্যর্থতা মেনে নিতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
জ. অভিভাবকেরা সব সময়ই চান তাদের চাহিদামতো সন্তানটি বেড়ে উঠবে। অর্থাৎ তার কোনো স্বকীয়তা থাকার দরকার নেই, তারা যেমনটি চাইবেন, ঠিক তেমনটি তাকে হতে হেবে। একচুল এদিকে ওদিক হবার জো নেই
ঝ. একসময় মায়ের ভালোবাসা ছিল শর্তহীন। আমার সন্তান সুতরাং চাওয়া-পাওয়ার হিসেব না করে হৃদয়ের নিষ্কলূষ ভালোবাসা দিয়ে যাব এ মনোভাব কাজ করত। মা মানেই সকল দুঃখের অবসান, অফুরান ভালোবাসা এ শ্বাশত ধারণা ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। আজকাল মায়েরা নিজস্ব জগৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ফলে মায়ের ভূমিকা এখন মিশ্র।
২. স্বভাবগত কারণ
কিশোরদের অপরাধী হওয়ার নেপথ্যে কিছু স্বভাবগত কারণও রয়েছে। বিশেষত নিম্নোক্ত কয়েকটি স্বভাব ওদের অপরাধী হওয়ার সূচনা ঘটায়। যেমন : সৃষ্টি জগতের প্রতি নির্ধয় ব্যবহার, অতিরিক্ত অবাধ্যতা, স্কুল পলায়ন, দেরিতে ঘরে ফেরা, বেঢপ ও মলিন পোশাক পরিধান, শারীকি অপরিচ্ছন্নতা, অকর্তিত কেশ, দুঃসাহসিকতা, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়তা, অতিমাত্রায় ছায়াছবিপ্রিয়তা ইত্যাদি।
৩. কিশোর অপরাধের কারণ হিসেবে মাতা-পিতা
নিম্নোক্ত প্রকার মাতা-পিতার সন্তানগণ কিশোর অপরাধী হয়ে থাকে-
ক. সংসারত্যাগী বা পলাতক মাতাপিতা : এরা সন্তানদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না করে পলাতক হয়েছেন। সন্তান এদের অপত্য স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
খ. অপরাধী মাতাপিতা : এরা সন্তানকে পাপের মধ্যে রেখে বড় করেন। কখনওবা সন্তানের সহায়তায় পাপ করেন।
গ. অপকর্মে সহায়ক মাতা-পিতা: এরা সন্তানের অপরাধ স্পৃহায় উৎসাহ দেন।
ঘ. অসচ্চরিত্র মাতা-পিতা : তারা নির্বিচারে সন্তানের সামনেই নানা অসামাজিক কাজ করেন ও কথা বলেন।
ঙ. অযোগ্য মাতা-পিতা : এরা সন্তানকে প্রয়োজনীয় ধর্মীয ও নৈতিক শিক্ষাদানে অমনোযোগী বা অপারগ।
আধুনিককালে শহরগুলোতে দেখা যায় যে, মা বাবা উভয়ে ঘরের বইরে কাজ করছেন। ফলে সন্তানসন্ততি তাদের উপযুক্ত স্নেহ-শাসন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা আচরণে বিদ্রোহধর্মী হয়ে যাচ্ছে। এমনটিও দেখা যায় যে, মৃত্যু বা বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে কোনো কোনো কিশোর মা অথবা বাবাকে হরাচ্ছে। এ কারণেও কিশোরদের স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব বিকাশে সমস্যা দেখা দেয় এবং তারা সংলগ্ন আচরণ তথা সমাজবিরোধী কাজকর্মে লিপ্ত হয়। অধিকন্তু পারিবারিক পরিমণ্ডলে কোনো শিশুকিশোর যদি সর্বদা ঝগড়া-বিবাদ, ব্যক্তিত্বের সংঘাত এবং অপরাধমূলক ও হিংসাত্মক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে তাহলে তাদের পক্ষে সহসা কিশোর অপরাধী হয়ে উঠা অসম্ভব নয়।
৪. দারিদ্র্য
দারিদ্র্য যে অপরাধের জন্য দায়ী তা বলাই বাহুল্য। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত পরিবারের কিশোর-কিশোরী তার নিত্য দিনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে ব্যর্থ হয়। ফলে তার মধ্যে কিশোর অপরাধমূলক আচরণ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে এরা ছোট-খাটো চুরি বা ছিনতাই-এ অংশগ্রহণ করে। দারিদ্র্যের কারণে আত্মহত্যা বা ইচ্ছায় অনিচ্ছায় পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করতেও বাধ্য হয় অনেক কিশোর-কিশোরী।
দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয় দুই ভাগ্যবিড়ন্বিতা কিশোরীর ঘটনা। চরনগরদীর শবমেহের কাঁদিতেছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাতিষ্ঠানিক শুশ্রুষা, শিয়রে নির্বাক ভাইয়ের উপস্থিতি কিছুই সর্বস্বহারা নারীত্বের এ কান্না থামাইতে পারিতেছে না। নারী ব্যবসায়ের প্রথাসিদ্ধ নিয়মে শিকারীরা দূর গ্রামাঞ্চলে শিকার সন্ধানে গিয়া এ এতিমকে শিকার করিয়া আনিয়াছে। নারায়ণগঞ্জে টান বাজারের অসামাজিক বন্দীত্বে তাহার নারীত্ব হরণের আগে জনপদবধুর বরণে সাজানোর ভূষণ সেলোয়ারটি এখনও তাহার আছে। কিন্তু যাহা গিয়াছে, শবমেহের তাহা পাইবে না। ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের দেয়ালে দেয়ালে শাশ্বত নারীত্বের কান্না গুমরাইয়া মরিতেছে কিশোরী শমমেহেরের কান্না ও প্রলাপে।”
“আট নয়দিন আগেও কৃষক জনপদের উদ্দাম কিশোরী ছিল শবমেহের (১১) দারিদ্র্য ও বয়সের দিকটি ছাড়া শঙ্কা তাহার ছিল না। কোনো এক জরিনা তাহাকে ফুসলাইয়া নারায়ণগঞ্জে আনিয়া টানবাজার পতিতালয়ে দুই হাজার টাকায় বিক্রয় করে। পতিত গনগরে বিধ্বংস হয় পল্লীর দারিদ্র্য-প্রপীড়িত স্বপ্ন-শবমেহের। তিনটি দিন পর মৃত্যুন্মুখে অসাড় দেহে শবমেহেরকে ট্রেনের কামরায় ফেলিয়া পতিতালয়ের লোকেরা চলিয়া যায়। কমলাপুরে সংজ্ঞাহীন শবমেহের ট্রেনে করিয়া আসিয়া পৌঁছিলে লোকজন তাহাকে হাসপাতালে লইয়া আসে। সংজ্ঞা ফিরিয়া পাইবার পর হইতে শবমেহের কাঁদিতেছে। নীরব কান্নার মাঝে মাঝে প্রলাপ কহিয়া উঠে। সে প্রলাপে ধিক্কার কাহার প্রতি, স্পষ্ট বোঝা যাইতেছে না।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ০৪-০৪-১৯৮৫)
দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ২০ ডিসেম্বর, ২০০৮ তারিখে প্রকাশিত আরও একটি রিপোর্ট : শিশুশ্রম নিষিদ্ধ সারাবিশ্বেই। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তা সত্ত্বেও ঢাকা মহানগরীর সর্বত্রই শিশুশ্রম আছে। বিদেশীদের হস্তক্ষেপে গার্মেন্টস কারখানায় শিশুরা এখন আর কাজ করে না, কিন্তু বাসে অথবা গ্রামীণ নামক ২২-২৪ সিটের ছোট বাসে। এরা কাজ করছে। রামপুরা যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন রুটে এ বাস চলছে। এ ছোট বাসে যে শিশুরা কাজ করে এদের অধিকাংশের বয়স ১০ থেকে ১২ বছর। যে বয়সে মা-বাবার আদরে আহলাদে এদের স্কুলে যাওয়ার কথা, বিকেলে সমবয়সীদের সাথে খেলাধুলা করার কথা, সে বয়সে এরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করছে। মাঝে মাঝে ছোট এ বাসের ভেতরে অথবা হ্যান্ডল ধরে ঘুমিয়ে পড়ে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে। অন্য দিকে যাত্রীদের দুর্ব্যবহার তো এদের নিত্যদিনের সঙ্গী। একটু আদর, একটু ভালোবাসার কাঙাল এ শিশুদের সুযোগ দেয়া হলে এরাই একদিন দেশের সম্পদে পরিণত হতে পারে। দরিদ্র মাতা-পিতার ঘরে জন্ম নেয়াই এদের অপরাধ। জন্ম অপরাধে এদের সাথীরা যাচ্ছে স্কুলে আর এদের বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে ঝুলে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত কাটিয়ে সামান্য পারিশ্রমিক নিয়ে ঘরে ফেরা। এ ধরনের হাড়ভাঙা শ্রমের কাজ থেকে এদের সরিয়ে নিয়ে হালকা কাজ দিয়ে লেখাপড়ার দায়িত্ব নেয়ার কী কেউ নেই?
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয় ও চিকিৎসাসহ জীবনধারনের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা। তাছাড়া দেশে বিদ্যমান আছে অনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৩৩ (The suppression of Immoral traffic Act, 1933)। কিন্তু সংবিধান, আইন সব কিছজুই নাগরিকগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে অদ্যাবধি অসমর্থ। অসংখ্য শবমেহের এর আত্মদান তারই প্রমাণবহ।
দুঃখ ও দুর্ভাগ্যজনক হলেও একথা সত্য যে, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতির উল্লেখ করেন তা শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। বাস্তবতার সাথে তার কোনো মিল থাকে না। আর এসব বাস্তবতা আমাদের সমাজে বাড়িয়ে দিচ্ছে দুর্নীতি এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ। দুর্নীতি, অপরাধের সে থাবা ছাড়ছে না আমাদের কিশোরদেরও। এমতাবস্থায়, জঠর যন্ত্রণা নিবৃত্তির জন্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো কিশোরকিশোরী বাধ্য হয়ে যদি দুষ্কর্মে বা পাপাচারে লিপ্ত হয় তাহলে তাকে কতখানি দোষারোপ করা যায় তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
সুতরাং, দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবনধারনের মৌলিক উপকরণসমূহ কীভাবে নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে জাতীয়ভিত্তিক সর্মসূচি নিতে হবে। এ দায়িত্ব পরিবার প্রধান থেকে শুরু করে রাষ্ট্র প্রধান পর্যন্ত সবার। এ লক্ষ্যে সামাজিক ন্যায় বিচারের স্বার্থে সম্পদের সুষম বণ্টনসহ বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বিশেষ করে অতি দরিদ্র ও দুস্থদের জন্যে অর্থনৈতিক-আর্থিক নিরাপত্তামূলক সুযোগ সুবিধাদির ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের জন্যে বিশেষ করে অনগ্রসর অঞ্চল ও জনগোষ্টীর জীবনযাত্রার মান গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তবে সবার আগে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করা ছাড়া দারিদ্র্য দূর করার কোনো উপায় নেই।
৫ সুষ্ঠু বিনোদন সঙ্কট
শিশু-কিশোরদের জন্য চাই উপযুক্ত চিত্তবিনোদনমূলক ব্যবস্থা। এজন্য খেলাধুলা, শরীরচর্চা, সঙ্গীত এবং নানাবিধ সুস্থ বিনোদনধর্মী অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এ সবের অভাব শিশু-কিশোরকে যত্রতত্র রাস্তাঘাটে ঘুরতে ফিরতে এবং ছুটাছুটি করতে দেখা যায়। এ ধরনের বিশৃঙ্খল ঘোরাফেরা কিশোরদের মনে সাময়িক আনন্দ দিলেও বস্তুত পক্ষে তা একটি আদর্শ ও সুশৃঙ্খলা পরিবশে সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়। আর এ কারণেও কিশোররা অসৎ সঙ্গে মেশে এবং একটি অনিয়মতান্ত্রিক পন্থার মধ্যে সময় কাটানোর কারণে তাদের চরিত্রে অনিয়ম এবং অসংলগ্নতার সৃষ্টি হয় এবং পরিণামে তারা হয়ে ওঠে অপরাধপ্রবণ।
প্রসঙ্গত আকাশ সংস্কৃতির অপব্যবহারের কথা বলা প্রয়োজন। ইদানীং নিয়ম নীতিহীনভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা সাইবার ক্যাফেগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারের নামে চলছে রীতিমত পর্নোগ্রাফির প্রদর্শনী। সার্ভিস চার্জ কম হওয়ায় এবং অন্যান্য অসৎ সুবিধা থাকায় উঠতি বয়সীরা এখন সাইবার ক্যাফের প্রধান গ্রাহক। অবাধ তথ্য প্রযুক্তির নামে অশ্লীল ওয়েবসাইটগুলো হয়ে উঠছে তাদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে। শিক্ষার্থীরা নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নানা অজুহাতে বেরিয়ে এসে সাইবার ক্যাফেতে ঢুকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পর্নো ওয়েবসাইট ব্রাউজিং করছে। এখানে এক ভিন্ন নেশায় মত্ত হয়ে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমনকি কেউ কেউ পুরোদিনই চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত থাকছে। এর ফলে পড়াশোনার প্রতি তাদের অমনোযোগিতা সৃষ্টিই শুধু নয়, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়াসহ নৈতিক চরিত্রের অবনতি ঘটছে।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বিভিন্ন দেশে সাইবার ক্যাফে ব্যবসা পরিচালনার জন্য সাইবার নীতিমালা থাকলেও বাংলাদেশে এখনও তা প্রণীত হয়নি। কিশোরদের জন্য উপযুক্ত কিশোর সাহিত্য, নাটক , চলচ্চিত্র ও বিনোদন কেন্দ্রের চরম সঙ্কট রয়েছে আমাদের।
৬. শিল্পায়ন ও নগরায়ন
শিল্পায়নের ফলে নগরায়ন ত্বরান্বিত হয় এবং শিল্পনির্ভর নগর জীবনে কতিপয় সমস্যার উদ্ভব ঘটে। এগুলোর মধ্যে আবাসিক সমস্যা অন্যতম। এর অনিবার্য ফলস্বরূপ বস্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং গোটা শহর জনাকীর্ণ হয়ে পড়ে। চরম আবাসিক সঙ্কটের কারণে জনাকীর্ণ এলাকার কিশোরদের চলাফেরা, গল্পগুজব এবং নানা ধরনের মেলামেশা বৃদ্ধি পায়। একদিকে দারিদ্র্য অন্যদিকে অবাধ ও সারাক্ষণ দলবদ্ধ জীবনযাপন করতে গিয়ে অনেক সময় কিশোরদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা জাগে। তাদের এই অপরাধপ্রবণতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে দুঃসাহসিক অভিযান ও কাজকর্মকে কেন্দ্র করে। এ অবস্থায় তারা কখনও একাকী আবার কখনও বা ছোট ছোট দল বেঁধে নানা ধরনের অপরাধকর্মে লিপ্ত হয়।
বাংলাদেশের শহর এলাকার মধ্যে রাজধানী ঢাকা শহরের চিত্র ভয়ঙ্কর। বস্তি আর রাস্তায় বেড়ে উঠা শিশু-কিশোররা সবকিছু এখানেই রপ্ত করে। এরা চলতে শিখলেই ছোট ছোট চুরি করে। একটু সাহস হলেই স্ট্রিটলাইট, ম্যানহোল, ইট, রডের টুকরো চুরি করে। পরবর্তীতে পরিবেশ পরিস্থিতি এদেরকে ক্রমশ মাদকদ্রব্যের দিকে টেনে নেয়।
কখনও এরা পরিণত হয় রাজনৈতিক দলের টোকাইবাহিনী যা হয়ে ওঠে হরতাল, ধর্মঘট, অবরোধ তথা কোনো দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের হাতিয়ার। এদের ব্যবহার করা হয় অস্ত্র বহনের কাজে। এমনকি মাঝে মধ্যে ওদের ব্যবহার করা হয় মানুষ মারার মতো ঘৃণ্য ও ভয়াবহ কাজে। দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবেও এরা কাজ করে থাকে। অপরদিকে ছিন্নমূল কিশোরীরা নেমে পড়ে ভাসমান পতিতাবৃত্তিতে। কিন্তু এ তো গেল দরিদ্রদের কথা। ধনীর দুলালেরা নষ্ট হচ্ছে ঘুষখোর, উচ্ছৃঙ্খল, মদ্যপ, জুয়াড়. মাতা পিতার অযতœ, অবহেলা, উদাসীনতা, স্নেহহীনতা, বিত্তবৈভবের প্রাচুর্যের কারণে। তাছাড়া ড্রাগ, ভিসিআর, ডিশ অ্যান্টেনার অনুপ্রবেশ, ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও ঠেশে দিচ্ছে নগরের বিত্তবানদের সন্তানদের অপরাধকর্মে।
৭ স্বাস্থ্যগত কারণ
কিশোর অপরাধের জন্য সামাজিক, রাজনৈতকি, অর্থনৈতিক কারণ ছাড়া স্বাস্থ্যগত কারণও দায়ী হতে পারে। মানসিক ও স্নায়রোগবিশেষজ্ঞগণের মতে, নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলোর কারণে একটি কিশোরের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কাজ করতে পারে-
বার্থট্রমা : জন্মের সময় কোনো আঘাত পেলে। এটি হতে পারে নিচের কারণগুলোর জন্য :
ক. ফোরসেপ ডেলিভারি, খ. অপস্ট্রাকটেড ডেলিভারি, গ. কর্ড ইনজুরি, ঘ. অত্যধিক রক্তপাত, ঙ. মেকোনিয়াম অ্যাসপিরেশন ও ফিট্যাল সিসট্রেস।
এছাড়া মায়ের অসুস্থতার কারণেও এটি হতে পারে। মা অসুস্থ হতে পারেন নিচের কতিপয় কারণে :
ক. নেশাগ্রস্ত হলে অথবা মদ, গাঁজা, অত্যধিক ঘুমের ওষুধ সেবন করলে, খ. উন্মাদগ্রস্ত বা মানসিক বিকারগ্রস্ত হলে, গ. ডিভোর্সী হল, ঘ. অপরাধপ্রবণ হলে।
জেনিটিক ইনহেরিটেল-এর কারণে শিশু-কিশোররা অপরাধপ্রবণ হতে পারে :
ক. ক্লোমাজমাল ডিজিস, খ. এক্স, ওয়াই, ওয়াই, ক্রোমোজমের শিশুকিশোররা : কয়েদীদের ওপর জরিপে দেখা গেছে যে, এ উপাদানটির কারণে তারা নরহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনে জড়িত হয়েছে, গ. বর্ডার লাইন পারসোন্যলিটি থাকলে সামান্য কারণে উত্তেজিত ও বদ মেজাজী হতে পারে, ঘ. শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী, বাতিকগ্রস্ত মন, দুর্বল দেহ, ভগ্ন স্বাস্থ্য, বিকলাঙ্গতা ইত্যাদি হলে, ঙ. অস্বাস্থ্যকর বা বস্তির ছিন্নমূল হলে।
৮ ডুয়েল ম্যাসেজ এফেক্ট
মা বললেন ‘হ্যাঁ’ কিন্তু বাবা বললেন, ‘না’- একজন কিশোরের এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়াকে মনোচিকিৎসকরা বলেন ‘ডুয়েল ম্যাসেজ এফেক্ট’। এমন অবস্থা একজন কিশোর-কিশোরীর জন্য দারুণ ক্ষতিকর। এমন অবস্থার শিকার হলে সেই বয়সী কিশোরেরা এক দ্বন্দ্বের অবদ্ধে আটকে পড়ে। তারা বুঝতে পারে না আসলে কোনটা সত্য বা মিথ্যা। কারণ একেই অবস্থায় দুটোই সত্য বা মিথ্যে হতে পারে না। তাই সে মানসিক বিপর্যয়ে পড়ে এবং এ থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজতে নানা কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে।
ডুয়েল ম্যাসেজ এর ধরন ভিন্নও হতে পারে।
“অভিদের স্কুলে বার্ষিক বনভোজন আর বেশিদিন নেই। সবাই খুব হৈ হুল্লোড় করছে। বন্ধু-বান্ধবরা সবাই মিলে পরিকল্পনা করছে। বনভোজনে কী করবে। সবকিছু ঠিকঠাক। অভির মনেও দারুণ আনন্দ। এখন শুধু বাবা-মাকে জানানোই বাকি। কিন্তু সে কাজটা করতে গিয়েই যতকিছু ঘটল। বাবা বলল, বনভোজনে একা যাওয়ার মতো বড় তুমি এখনো হওনি। অনেক আকুতি মিনতি করেও কোনো কাজ হয়নি। অবশেষে অভি না যাওয়াতেই রাজি হলো।”
সাধারণত ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোরদের এমন অবস্থা মুকাবিলা করতে হয়। কেননা এ বয়সী কিশোররা চট করে মুখের ওপর না বলতে পারে না। ওরা নীরবে নিজেদের কষ্ট দিতেই ভালোবাসে। তখন তাদের মাঝে একধরনের দুঃখ বিলাসিতাও কাজ করে। মাতা-পিতা বা অভিভাবকের কথা ব্যথার অপমানের-অসন্তোষের হলেও অপারগতা সত্ত্বেও সেগুলো মেনে চলে।
সাধারণ কিশোর অপেক্ষা কিশোরীরাই এ অবস্থার শিকার হয় বেশি। মেয়েদের দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধি সেই মেয়েকে শিখিয়ে দেয় যে সে বড় হয়েছে। কিন্তু শারীরিক বৃদ্ধির সঙ্গে মানসিক বৃদ্ধিও প্রয়োজন। আর এর অভাব থাকলে সেই মেয়ে চিন্তা করে যে, সে তেমন একটি বড় হয়নি। তাই তারা মা-বাবার অনুশাসনমূলক বাধা-বিপত্তির মধ্যে সবচেয়ে বেশি পড়ে। এতে সে দারুণ বিষণœতায় ভোগে। নিজেকে জগৎ থেকে আলাদা মনে করতে থাকে। এক পর্যায়ে আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিয়ে বসে এবং তাতে সফল হয় অনেকে।
মা-বাবার দু’জনের দু’রকম বাক্য ব্যয়ে সন্তান আক্রান্ত হয়ে থাকে। যদি না বলতে হয় তবে ভালোভাবে যুক্তিসহকারে তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। আর যদি হ্যাঁ করেন তাহলেও তাই।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞগণের মতে, অবসাদ, মাদকসক্তি, ভগ্নমনস্কতা (Schizophrenia)সহ বহু মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে এমন পরিস্থিতিতে পড়লে। মূলত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে এমনটি হয়। তাই কিশোর-কিশোরীদের মনকে বুঝতে হবে। সব সময় ‘না না’ বাক্য কারোরই ভালো লাগার কথা নয়। ওদের মনকে দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙ্গে দেয়া যাবে না। ওদের দ্বন্দ্বমুক্ত রাখতে হবে এবং যথাসম্ভব স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ করে দিতে হবে। কখনো যেন মানসিক বিপর্যয় না ঘটে সেদিকে বিশেষ নজর রাখা জরুরি। ছেলেমেয়ে বিভেদ-বৈষম্য করা ঠিক না যা কিছু নিষিদ্ধ তা দুজনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে হবে।
৯. অন্যান্য কারণ
সামাজিক অসাম্য, দুঃখ-দুর্দশা, তদারকীর ঘাটতি, অবিচার, আশৈশব দুর্ব্যবহার প্রাপ্তি, কুসংস্কার ও কুসঙ্গ, প্রাকযৌন অস্থিরতা, প্রকাযৌন অভিজ্ঞতা, অসময়ে পিউবারটি (puberty), অপছন্দকর কর্মস্থান, অতি আদর বা অনাদর, আর্থিক অসচ্ছলতা বা আর্থিক প্রাচুর্য, অনিদ্রা, পরাশ্রয়, বিমাতা বা দূর আত্মীয়দের গলগ্রহ হওয়া, মাতা বা পিতার মালিকের গৃহে বসবাস, মালিক-তনয় দ্বারা নিগ্রহ ও অবজ্ঞা, অপুষ্টি, ভেজাল আহার বিদ্যালয়ে সহপাঠীদের উপেক্ষা ও উপহাস, দ্বন্দ্বরত মন ও বিবিধ প্রদমিত মনোজট (complex) কিশোরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এগুলো কিশোরদের উন্মাদ নির্বোধ ও অপরাধী করে তোলে যা জীবন প্রভাতে তাদের চরিত্রবান নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার পথে প্রবল প্রতিবন্ধক।

কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে করণীয়
আগেই বলা হয়েছে যে, মানব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অধ্যায় হলো কৈশোরকাল। এটি এমন এক সময় যখন একজন ব্যক্তি বয়স ও বুদ্ধি এ উভয়দিক থেকে ক্রমশ এগিয়ে যেতে থাকে বটে, তবে যথার্থ অর্থে বয়সী তথা প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে না। প্রাকৃতিকভাবে জীবনের এ সন্ধিক্ষণটি হয় স্বাপ্নিক ও কৌতূহলোদ্দীপক। এ সময়ে সে জানতে চায়, জানাতে চায়। জানতে ও জানাতে গিয়ে যদি বাধাগ্রস্ত হয় বা হোঁচট খায় তাহলে সে মূক ও বিমূঢ় হয়ে পড়ে, বিভ্রান্তি তাকে অপরাধী করে তোলে, নিয়ে যায় সর্বনাশার অতল গহ্বরে। অন্যদিকে যদি সে অবলীলায় জানতে পারে, জাতে পারে, উত্তর পায়, মানসিক আশ্রয় ও অবলম্বন পায়, নৈতিক দীক্ষা ও প্রেরণা পায় তাহলে তার অগ্রগতি-অগ্রযাত্রার হয়ে ওঠে অনিবার্যভাবে সুন্দর, শাশ্বত ও সাবলীল।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোনোমানুষই অপরাধী হয়ে জন্মায় না। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নানাবিধ কারণে আবেগ ও পরিবেশের নেতিবাচক প্রভাবে মানুষ অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। সুতরাং কিশোর অপরাধীরা পেশাদার অপরাধীদের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হচ্ছে তো অনুনন্ধানপূর্বক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। এজন্য সবার আগে দরকার গ্রাম কিংবা শহর, পাড়া কিংবা মহল্লায় সর্বত্র ভালো পরিবেশ বজায় রাখতে শিক্ষিত সজ্জন ও অভিভাবক শ্রেণীর সম্মিলিত প্রয়াস। অধ্যয়ন, সৃজনশীলতা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা জরুরি। পরিবার, সমাজ ও স্কুলের পরিবেশ হওয়া দরকার আনন্দময় ও প্রণোদনাপূর্ণ।
পরিবারের দায়িত্ব : শিশু-কিশোরদের কাদামাটির সাথে তুলনা করা হয়ে থাকে। শিল্পী কাদামাটিকে যেভাবে রূপ দিতে চান, সে রূপেই গড়ে তুলতে পারেন। বস্তুত, শিশু-কিশোররা কাদামটির মতোই কোমল। পরিবার ও সমাজ জীবনের পরিপার্শ্বের মধ্যে তারা বেড়ে ওঠে। সভ্যতার প্রথম সোপানই হলে াপরিবার সংগঠন। দয়া, মায়া, প্রেম-ভালোবাসা অপরের প্রতি সৌজন্যবোধ, সহনশীলতা, সত্যবাদিতা প্রভৃতি হৃদয়বৃত্তিগুলোর বিকাশের উপযুক্ত শিক্ষালয় হচ্ছে পরিবার। পরিবারকে বলা যায়, মানব জীবনের প্রধান বুনিয়াদ।
তাই সুষ্ঠুভাবে শিশু-কিশোরের ব্যক্তিত্ব বিকাশে এবং কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে একটি সুসংহত পরিবার এবং পারিবারিক দায়িত্ব অপরিসীম। অস্বীকার করার জো নেই যে, নৈতিক শিক্ষার ভিত এখানেই রচিত হয় যা আজীবন টেকসই হতে পারে। এ প্রসঙ্গে নিম্নে কয়েকটি দিকের প্রতি আলোকপাত করা হলো-
ক. নিয়ন্ত্রণ : শিশু-কিশোরদের এমন শিক্ষা দিতে হবে যাতে তারা তাদের কার্যকলাপ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নিবদ্ধ রাখে এবং সীমার বাইরের কাজ করলে তা অন্যায়ের পর্যায়ে পড়বে, এ বোধ তৈরি হয়।
খ. বোধজ্ঞান : শিশু-কিশোরদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট নৈতিক মানের সৃষ্টি করতে হবে। স্বাভাবিক উচিত, অনুচিত, ভালোমন্দের সাধারণ প্রভেদ তাকে বুঝতে দিতে হবে।
গ. সাহায্য : মাতা-পিতাকে প্রত্যেক শিশু-কিশোররের আস্থাভাজন হতে হবে। সন্তানেরা যাতে নিজের ও অন্যের উপকার করবার মানসিকতা র্অনণ করতে পারে তার জন্য তাকে সাহায্য করতে হবে।
ঘ. বিশ্বাস : কাকে বিশ্বাস করা উচিত এবং কাকে বিশ্বাস করা অনুচিত এসব সম্বন্ধে তাকে অবহিত করা প্রয়োজন।
ঙ. স্বাধীনতা : একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে কিশোরদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া প্রয়োজন এবং অপরিহার্য নাহলে তাদের কোনো কাজের প্রতিবন্ধক হওয়া অনুচিত।
চ. ভালোবাসা : কিশোররা যেন অনুভব করে যে, তাদের প্রতি তাদের মাতা-পিতার অসীম ভালোবাসা ও গভীর দরদ রয়েছে এবং এ ভালোবাসায় আছে তাদের প্রতি তাদের মাতাপিতার সমতা নীতি।
ছ. প্রশংসা : কিশোরদের প্রতিটি সুন্দর ও কৃতিত্বপূর্ণ কাজে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং প্রশংসা করতে হবে। তাদেরকে উৎসাহ দেয়া দরকার, তবেই তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জন্ম নেবে। মাতা-পিতার বলা উচিত ‘আমি জানি এটা তুমি করতে পারবে’। তারপর হয়তো বলা হলো, ‘জানতাম, তুমি পারবে’ ইত্যাদি। কোনও সাফল্যই অভিনন্দন জানানোর জন্য ক্ষুদ্র নয়। কখনও কাজে সফল না হলে সমালোচনা করতে হবে, তবে প্রশংসাসহ। ছেলে যদি ফুটবল খেলতে গিয়ে গোল করতে না পারে, তাহলে তাকে বলা উচিত, ‘তুমি যেভাবে ড্রিব্ল (Dribble) করলে তা অসাধারণ ছিল। কালকে আর একটু ভালো করে প্র্যাকটিস করো।’ এভাবে তাদের ছোটখাট সাফল্যকে মূল্য না দিলে তাদের জীবনে দ্বন্দ্ব ঘিরে আসবে। কোনো লক্ষ্যেই পৌঁছতে পারবে না ওরা। পায়ের নিচে জমি নড়বড়ে হয়ে যাবে।
জ. রক্ষা কার্য : কিশোররা যেন বিশ্বাস করে যে, মাতা-পিতা তাদের বিপদের বান্ধব, সর্বোপরি সবসময়ের অকৃত্রিম রক্ষাকবচ। ঝ. নিরাপত্তা : কিশোররা যেন উপলব্ধি করে যে, তাদের ঘর তাদের জন্য সর্বোত্তম আশ্রয় ও সর্বাপেক্ষা নিরাপদ স্থান।
ঞ. সংযম : ব্যবহার, কাজকর্মসহ বিভিন্ন বিষয়ে কতটা পর্যন্ত এগুনো উচিত, কী পরিমাণে একটি কাজ করা উচিত, কখন ও কেন একটি কাজ পরিহার করা উচিত ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাথমিক পরিমিতিবোধ ও তৎসম্পর্কিত সাধারণ জ্ঞান তাকে দিতে হবে।
ট. প্রশ্নোত্তর দান : শিশু-কিশোরদের প্রতিটি প্রশ্নের সদুত্তর দেয়া উচিত। জার্মান শিক্ষাবিদ Friedrich froebel (১৭৮২-১৮৫২ ) এর একটি উপদেশ প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘হে শিশুর পিতা, শিশুর প্রতি কঠোর হয়ো না। তার পুনঃপুনঃ প্রশ্নবাণে অস্থিরতা প্রকাশ করো না। প্রতিটি কঠোর শব্দের আঘাত তার জীবন ফুলের পাপড়ি নষ্ট করে দেয়। জীবন তরুণের শাখা বিনষ্ট করে ফেলে।’
কিশোরদেরকে সরল ও সংক্ষিপ্ত ভাষায় বোঝাতে হবে। কথা অপেক্ষা ঘটনা ও দৃষ্টান্ত তাদেরকে প্রভাবিত করে বেশি। তারা অনুকরণপ্রিয়। সুতরাং মাতা-পিতাকে তাদের সামনে মিথ্যাচার, ভণ্ডামী বা নৈতিকতাবর্জিত আচরণ হতে বিরত থেকে নিজেদেরকে অনুকরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করতে হবে। মাতা-পিতা হবেন সন্তানের কাছে একজন সৎ ও সুন্দর মানুষের প্রোজ্জ্বল প্রতিভূ।
ঠ. আবিষ্কার করতে দেয়া : একবার এক ঘন বৃষ্টির পর একটি কিশোর বাবার কাছে দৌড়ে এলোÑ দ্যাখো বাবা কী সুন্দর পাথর। বাবা তো কোনও পাত্তাই দিলেন না, বরং রাগ করলেন, কী সব সময় যে কাদা ঘাঁটো! কিশোরটির মুখ শুকিয়ে গেল। বাবা যদি ছেলের এ প্রয়াসকে অভিনন্দন জানিয়ে বলতেন, বা কী সুন্দর! কেথা থেকে পেরে আরও ভালো পেতে পারে! ইত্যাদি। তাহলে ছেলেটি আরও উৎসাহিত হতো। নতুন কিছু করার আনন্দ পেত, জীবনে বৃহত্তর ক্ষেত্রে এগোনোর সুবিধা হতো।
ড. সন্তানের স্বপ্ন সম্বন্ধে জানা : মাতা-পিতা দেখলেন তাদের কিশোর ছেলেটি খেলোয়াড় হতে চায়। কিংবা কিশোরী মেয়েটি হতে চায় বিমানের পাইলট যা মাতা-পিতার অপছন্দ। এক্ষেত্রে ওদেরকে ভর্ৎসনা করার আগে পুরো ব্যাপারটি ভালোভাবে জানা প্রয়োজন। তাই ওদের পছন্দের পেশার খোঁজখবর নিতে হবে, সেগুলোর ভবিষ্যৎ জানতে হবে। মাতা-পিতার অপছন্দ হলো ওদের পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে পুরো ব্যাপারটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করতে হবে।
এখানে এটি বলা হচ্ছে না যে, কিশোর-কিশোরীর সব ইচ্ছেকে বিনা বাক্যে যাচাই-বাছাই ছাড়াই মেনে নিতে হবে। যাচাই বাছাই অবশ্যই করতে হবে। তবে ওদের আবেগ-অনুভূতি-চিন্তা-রুচি ইত্যাদিকেও সহানুভূতির সাথে বিশ্লেষণ করে দেয়া প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের ভূমিকা : কিশোর-কিশোরীরা দিবসের একটি উল্লেখযোগ্য সময় ধরে বিদ্যালয়ে অবস্থান করে। বিদ্যালয়ের রীতিনীতি, আচরণ, শৃঙ্খলা, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ব্যবহার, দৃষ্টিভঙ্গি, সিলেবাস কারিকুলমা ইত্যাদি কিশোর-কিশোরীদের মানস গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। একটি বিদ্যালয়ের রীতিনীতি আচরণ-শৃঙ্খলায় যদি সভ্যতা, ভব্যতা, নিয়মানুবর্তিতা, সমতা ইত্যাদিসহ নানামুখী সুস্থ সংস্কৃতির নিয়ত চর্চা ও প্রাত্যহিক অনুশীলন ঘটে তাহলে কিশোর-কিশোরীরা ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে বাধ্য। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ । তাঁদের চরিত্র-মাধুর্য, চিন্তা-চেতনা, আচার-ব্যবহার, রুচি-লেহাজ, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি দ্বারা কোমলমতি শিক্ষার্থীরা উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। সুতরাং শিক্ষক যদি চত্রিবান না হন, সুন্দর স্বভাবের অধিকারী না হন, সমতা ও সমদর্শিতার গুণে গুণান্বিত হয়ে না ওঠেন, সর্বোপরি শিক্ষার্থীর মনোরাজ্যে একটি নির্মল আসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন তাহলে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁর কাছ থেকে নিছক পাঠ্য পুস্তকের বাইরে জীবন গঠনের কোনো দীক্ষা লাভ করতে পারবে না। সুতরাং সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং আদর্শ ও চরিত্রবান শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন। পাশাপাশি স্কুল-মাদ্রাসার সিলেবাস কারিকুলামকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শিশু-কিশোরদের মাঝে একগুচ্ছ অভিন্ন নৈতিক মূল্যবান মুল্যবোধ তৈরিতে সহায়ক হয়, হয় জীবনমুখী।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে বৈষম্যের ছড়াছড়ি। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মনুষ্যত্ব বোধের জাগরণ এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের মৈত্রীবন্ধন। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এক্ষেত্রে হাঁটছে বিপ্রতীপ পথে। এ জায়গাটিতে প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি সংস্কার। বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার অসম্ভব বাংলাদেশ বিরাজমান। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংরাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সাধারণ স্কুল, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, ক্র্যাডেট কলেজ, মাদ্রাসা ইত্যাদির ধারা-উপধারা মিলে মোট তের ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে। সন্দেহ নেই যে, শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যপুস্তক, কারিকুলাম, শিক্ষা পদ্ধতি, সংস্কৃতি একেক রকম। ফলে ওরা একে অপরের সাথে স্বচ্ছন্দে মিশতে পারে না, মন খুলে কথা বলতে পারে না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, একশ্রেণীর অভিভাবকও এতে উৎসাহ যোগান। এভাবে ক্রমশ একজন শিক্ষার্থী অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা (superior of inferior) ভাবতে শুরু করে। সৃষ্টি হয় অতি শৈশবেই বৈষম্য সৃষ্টিকারী মানসিকতা। এ মানসিকতা শিশু-কিশোরকে সমতা, একতা, ভ্রাতৃত্ব ইত্যাদির পরিবতেৃ নিজের অজান্তেই অপরাধমনস্ক অথবা অনুচিত হীনমনা করে তুলতে সহায়ক হয়। কাজেই এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করার জন্য মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত একটি একমুখী সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন।

টিএনজ আত্মহত্যা রোধে ভূমিকা :
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর কেবল ৪০ লাখ কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যার চেষ্টা করে (Attempt suicide)। দেশে দেশে এ বয়সে আত্মহত্যার হার তারতম্য দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার পেছনে অনেক কারণ জড়িত রয়েছে। যেমন জেনেটিক, হরমোনাল, আবেগপ্রবৃত্ত (impulsive) ও পরিবেশগত কারণ। আত্মহত্যার কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হচ্ছে বিষণœতা দৈহিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন, উগ্রতা ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনাচার।
উল্লেখ্য যে, আত্মহননের অনুভূতি ও ডিপ্রেশনের উপসর্গের মাঝে মিল রয়েছে। কিশোর-কিশোরীর নিচের উপসর্গগুলোর প্রতি মাতা-পিতাকে নজর রাখতে হবে
ক. ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাস বদলে যাওয়া। শরীরের ওজন কমে যাওয়া।
খ. দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করা, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও আলাদ থাকা।
গ. প্রতিদিনের কাজকর্ম থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা এবং উৎসাহে ভাটা পড়ো।
ঘ. সহিংস প্রতিক্রিয়া, বিদ্রোহী আচরণ, ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা, আক্রমণাত্মক ভঙ্গিমায় ঘনিষ্ঠজনের প্রতি ছুটে আসা ইত্যাদি।
ঙ. মাদকের নেশায় জড়িয়ে যাওয়া।
চ. চোখে পড়ার মতো ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন। কথা বলা বা চলাফেরায় অস্বাভাবিক গতি, হয় খুব দ্রুত অথবা ধীরে।
ছ. সব সময় মানসিক অস্বাচ্ছন্দ্যববোধ বা বিরক্তিভাব নিয়ে থাকা, মনোযোগের ঘাটতি, স্কুলে দক্ষতায় পিছিয়ে যাওয়া।
জ. আবেগের সঙ্গে সম্পর্কিত দৈহিক উপসর্গ যেমন মাথাব্যথা, পেটব্যথা, অবসাদ ইত্যাদি নিয়ে সব সময সেঁটে থাকা।
ঝ. আনন্দময় কাজে আনন্দ খুঁজে না পাাওয়া।
ঞ. প্রশংসা বা পুরস্কার কোনটিই সহ্য না করা।
ট. সব সময় নিজের খারাপ দিক নিয়ে কথা বলা, নিজেকে খারাপ ভাবা, অনুভূতির ঘুরপাকে নিজেকে আটকে ফেলা।
ঠ. আত্মহতার ব্যাপারে মৌখিক সঙ্কেত দেয়া যেমন ‘তোমাদের আর বেশি জ্বালব না, আর বেশি দিন নেই আমি’ ইত্যাদি।
ড. নিজের প্রিয় সব কিছুতেই অিনীহ, গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলা।
ঢ. বিষাদের একটি সময়ের পর আচমকা খুশি হয়ে ওঠা।
ণ. মনোরোগের বিভিন্ন উপসর্গ, মেযন দৃষ্টিভ্রম (Hallucination) ও উদ্ভট চিন্তার গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাওয়া।
ধর্মীয় সংস্কৃতি অনুশীলন : কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে ধর্মীয় সংস্কৃতির অনুশীলনের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কেননা মানুষের শুধু শারীরিক সত্তা নয়, তার একটি মানস ও মনন রয়েছে। এ মনন বা মানসের বিকাশ দরকার এবং সেটা কেবল বস্তুগত নয়। এ মানস বিকাশ ধর্মের দ্বারা সম্ভব। ধর্ম মানব জীবনকে পরিপূর্ণ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে এবং ধর্ম হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবোধে ও নৈতিকতার ভিত্তি। এক কথায় মানব জীবনের ভোলে ামন্দ, ন্যায অন্যায় নৈতিকতা-অনৈতিকতা ইত্যাদি বিচারবিবেচনার এক সাবলীল ও সুষ্ঠু নির্ণায়ক নীতি বা বন্ধন হলো ধর্ম।
পৃথিবীর সৃষ্টির শুরু থেকে যুগে যুগে যত ধর্ম এসছে, যত ধর্মগুরু এসেছেন সবাই অন্যায়ের বিপক্ষে ন্যায়ের ও মানবতার জয়গান গেয়েছেন। সততা, সাধুতা, সেবা, সংযম, সৌজন্য, সম্প্রীত, সৌহার্দ্য, সদাচার, দয়া, ক্ষমা, প্রেম, পরোপকার, পরমতসহিষ্ণুতা, বিনয়, বদান্যতা ইত্যাদি সব ধর্মেরই সারকথা। সব ধর্মই তার প্রতিটি অনুসারীকে শৈশব-কৈশোর থেকে পথে চলার, সুন্দভাবে বাঁচার, সরলপথ অনুসরণ করার তাকিদ দিয়েছে। সুতরাং আশৈশব স্বধর্মের বিশুদ্ধ চর্চা ও যথাযথ অনুশীলন ব্যক্তির অপরাধস্পৃহা অবদমনসহ আত্মশুদ্ধির জন্য সহায়ক।
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম
সন্তাদেরকে সঠিক প্রতিপালনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে ইসলাম এ প্রসঙ্গে ইসলামের নির্দেশনা হচ্ছে প্রথম সাত বছর তাকে (সন্তানকে) মুক্ত রাখ, দ্বিতীয় সাত বছর তাকে শিষ্টাচার (আদব) শিক্ষা দাও এবং তৃতীয় সাত বছর তার সাথে গভীর সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোল।
ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা) বলেছেন, ‘পিতার ওপর পুত্রের যেরূপ অধিকার আছে পুত্রের ওপরও পিতার তদ্রƒপ অধিকার আছে। পিতার অধিকার হলো পুত্র শুধু আল্লাহকে অমান্য করার আদেশ ব্যতীত তাঁর সকল আদেশ মেনে চলবে এবং পুত্রের অধিকার হলো পিতা তার একটি সুন্দর নাম রাখবে, তাকে উত্তম প্রশিক্ষণ দেবে এবং কুরআন শিক্ষা দেবে। (নাহজ আল বালাগা)
ইসলাম অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে চায়। এ কারণে ইসলামী শরিয়াত মানুষের নৈতিক সুরক্ষার্থে নিম্নলিখিত কর্মসূচি, বিধান ও মূলনীতির মাধ্যমে ব্যক্তির চারদিকে সুদৃঢ় ও দুর্ভেদ্য প্রাচীর তুলে দেয়, যার বিশুদ্ধ চর্চা তাকে পাপের দিকে আকর্ষণ ও পদস্খলন থেকে নিয়ত রক্ষা করতে সহায়ক হয়।
ক. ইসলাম আশৈশব ব্যক্তির সংশোধন, ব্যক্তির মন পবিত্র ও পরিশুদ্ধকরণ এবং তাকে সুন্দর ও নির্মলভাবে লালন ও প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নত মহান চরিত্রে বিভূষিত করে তোলে। তার হৃদয়ে ঈমানের বীজ বপন করে তাকে কল্যাণমুখী বানিয়ে তার মধ্যে অপরাধ ও বিপর্যয় বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করে দিতে চায়। আর প্রকৃত সঠিক ঈমান ও একনিষ্ঠ দৃঢ় প্রত্যয়ই হচ্ছে সুদৃঢ় দুর্ভেদ্য দুর্গ এবং নির্লজ্জতা ও নিষিদ্ধ কাজ অবলম্বনের বিরুদ্ধে এক শক্ত প্রতিরোধ। কেননা সে নিঃসন্দেহে জানে ও বিশ্বাস করে যে, সে যা কিছুই করছে, আল্লাহপাক সে বিষয়ে পুরাপুরি অবহিত আছেন।
খ. ইসলাম নিষিদ্ধ কাজ করা থেকে দূরে রাখার জন্য খারাপ পরিণতির ভয প্রদর্শন করে। সে খারাপ পরিণতি মানুষের সম্মুখে ভয়াবহরূপে চিত্রিত করে পেশ করা হয়েছে। যা স্বভাবতই মানব মনে এমন তীব্র ভীতির সঞ্চার করে যে, সে কিছুতেই সেই খারাপ কাজের দিকে পা বাড়াতে সাহস করে না।
গ. ইসলাম শরীয়তী বিধি বিধানের মাধ্যমে সকল ভালো কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা, পারস্পরিক কল্যাণ কামনা, সৎ কাজে আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ, ধৈর্য অবলম্বনের উপদেশ এবং সকল পাপ, সীমালংঘনমূলক কাজ, অন্যায়, জুলম ও বিপর্যয় প্রতিরোধের নির্দেশ দেয়।
ঘ. ইসলাম যখন কোনো কাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, তখন সেই কাজের সুযোগ করে দেয় বা অনিবার্য করে তোলে যেসব পথ, তাও সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেয, সেই উপায়, পথ ও পন্থাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। যেসব প্রাথমিক অবস্থা ও কর্মকাণ্ড সেসব নিষিদ্ধ কাজকে সহজ করে দেয়য, সেগুলোও সাথে সাথে নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
ঙ. ইসলাম যখন কোনো জিনিস বা কাজ নিষিদ্ধ করে, তখন তদস্থলে একটা বৈধ কাজের পন্থাও বাতলে দেয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ নিষিদ্ধ কাজটি পরিহার করে বৈধ কাজটির দ্বারা তার প্রয়োজন পূরণ করুক।
চ. মানুষের মন পবিত্রকরণ, আত্মা বিশুদ্ধকরণ এবং তাদেরকে পাপ ও অভিশপ্ত কাজে জড়িত হওয়াকে রক্ষা করার জন্য ইসলামের অবশ্য পালনীয় দুটি ইবাদাত সর্বজন পরিচিত, মৌলিক এবং ব্যাপক প্রভাবশালী ইসলামী জীবনে সর্বাধিক গুরুত্বের অধিকারী। এ দুটি ইবাদাত হলো সালাত ও সাওম। মূলত এ দুটি ইবাদাতই বিশেষ প্রশিক্ষণ স্বরূপ। যার চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে সকল প্রকার হীনতা-নিচতা থেকে মুক্ত করে কেবল এক আল্লাহ অনুগত বান্দাহ বানানো।
সালাত : সালাত মহান আল্লাহর সাথে তাঁর বান্দাহর এবং বান্দাহর সাথে তার মাবুদের প্রেমময়, গভীর ও পবিত্র সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে মানব হৃদয়ে আল্লাহর ভয় এবং আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণের ভাবধারার সৃষ্টি করে। আল কুরআনের সূরা আত তোয়াহা’র ১৩২ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, “আপনি (হে রাসূল!) আপনার পরিবারের লোকদের নামাজের আদেশ দিন।”
আবু দাউদ শরীফে নামাজ অধ্যায়ে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, “তোমাদের সন্তানকে সাত বছর বয়সে নামাজ পড়ার নির্দেশ দাও।”
সালাতে মানবদেহের প্রায় সবকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়োজিত হয়। দিন রাত্রির চব্বিশ ঘণ্টায় পাঁচবারের সালাত আল্লাহতাআলা বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে সব মানুষের ওপর ফরজ করেছেন। এরই মাধ্যমে বান্দাহ ও আল্লাহর মাঝে স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপিত হয়। দুনিয়ার কোনো মোহ সে সম্পর্ককে দুর্বল বা ছিন্ন করতে পারে না। বান্দাহ তখন ভুলি না যে, তার ওপর আল্লাহর হক সর্বাগ্রে এবং তাঁর ফরমানসমূহ কাজে পরিণত করেই মহামহিমের সেই অধিকার যথাযথভাবে আদায় করা সম্ভব। মোদ্দা কথা, সারাদিনেরকোনো মুহূর্তেও মহান আল্লাহকে ভুলে না যাওয়াই পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বড় সুফল ও মহামূল্যবান প্রাপ্তি। এরূপ অবস্থায় কোনো অপরাধজনক কাজে অংশগ্রহণ করা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ কারণেই সালাম সম্পর্কে আল্লাহতাআলার ঘোষণা হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে সর্বপ্রকারের নির্লজ্জ ও ঘৃণ্য কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখে।”
(সূরা আনকাবুত : ৪৫)
সাওম : রমজানের মাসব্যাপী সিয়ামের প্রশিক্ষণমূলক অবদান অত্যন্ত সূক্ষ্ম, ব্যাপক ও গভীর। সিয়াম মানব মনের যাবতীয় কুপ্রবৃত্তির ওপর শক্ত লাগাম লাগিয়ে দেয় এবং রোজাদারকে যাবতীয় অপকর্ম থেকে বিরত রাখে। অপরাধ যে ধরনের ও যে প্রকৃতিরই হোক, তা হৃদয়ের কামনা-বাসনা, লোভ ও লালসা থেকে উৎসারিত হয়। আর এর উৎসে তিনটি প্রবল শক্তি নিহিত থাকে। লোভ-লালসা;  যৌন স্পৃহা ও কৃপ্রবৃত্তি এবং আহমিকা দাম্ভিকতাবোধ। সাওমের প্রবল প্রশিক্ষণমূলক প্রভাব রয়েছে এ তিনটি শক্তির ওপর।
এভাবে আল ইসলামের উপর্যুক্ত মূলনীতি ও বিধানবালীর আলোকে মানবজীবনকে শৈশব-কৈশোর হতে সকল প্রকার অনাচার, পাপ ও পংকিলতা থেকে মুক্ত করা গেলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অপরাধজনক কাজ থেকে দূরে সরে থাকবে। ইসলামের এ বিধানসমূহ প্রতিটি মানবসন্তানকে সেই লক্ষ্যে ক্রমশ প্রস্তুত করে তোলে।

কিশোর অপরাধীদের জন্য আইন-আদালত ও বিচার ব্যবস্থাপনা
কিশোর অপরাধ থেকে কোনো দেশ বা সমাজ মুক্ত নয়। এটিকে একটি রোগ বলে বিবেচনা করা হয়। একাদশ পোপ ইতালির রোমে কিশোর অপরাধ সংশোধনের জন্য সেন্ট মাইকেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ থেকে বুঝা যায় যে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতেও সমস্যার অস্তিত্ব ছিলো।
তবে কিশোর অপরাধ সংশোধনের ধারণাটি গত শতকের। সভ্যসমাজ ক্রমশ বুঝতে পারলেন যে, কিশোর অপরাধ যতটা না শাস্তিমূলক, তার চেয়েও বেশি সংশোধনমূলক।
বাংলাদেশে এতদসংক্রান্ত আইন তৈরির প্রেক্ষাপট : ১৯৭৪ সালে শিশু-কিশোরদের জন্য চিল্ড্রেন এ্যাক্ট, ১৯৭৪ প্রণয়ন করা হয়। ১৯৭৬ সালে চিল্ড্রেন্স রুলস, ১৯৭৬ জারী করে প্রথমত ঢাকা জেলা এবং পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে সমগ্র বাংলাদেশকে এ আইনের আওতায় আনা হয। শিশু আইন, ১৯৭৪ এবং শিশু বিধি, ১৯৭৬’র ভিত্তিতে ১৯৭৮ সালের ১লা জুন তারিখে ঢাকার অদূরে টঙ্গীতে ২০০ আসন বিশিষ্ট জাতীয় কিশোর অপরাধ সংশোধনী প্রতিষ্ঠান (বর্তমান নাম কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র) স্থাপন করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো, অপরাধী কিশোরদের কারাগারে অপরাপর বয়স্ক, দাগী অপরাধী ও অন্যান্য খারাপ পরিবেশ থেকে দূরে রেখে শাস্তির পরিবর্তে সংশোধন এবং অপরাধপ্রবণ, উচ্ছৃঙ্খল ও অভিভাবক কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কিশোরদের চরিত্র সংশোধনের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এ প্রতিষ্ঠানটি কিশোর আদালত, কিশোর হাজত, কিশোর সংশোধনী কেন্দ্র- এ তিন ভাগে বিভক্ত। এরপর ১৯৯৬ সালে কিশোর অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণের আশা নিয়ে সরকার যশোর শহরের অদূরে পুলেরাহাট নামক স্থানে আরও একটি কিশোর সংশোধনী প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন। তাছাড়া গাজীপুরের কোনাবাড়িতে রয়েছে একটি কিশোরী সংশোধনী কেন্দ্র । এটি স্থাপিত হয় ১৯৮২ সনে।
১. ভবঘুরে আইন, ১৯৫৩ : অভাব অনটন, পারিবারিক ও সামাজিক বঞ্চনা, অবহেলা আর অনাদরে গৃহত্যাগী কিশোর-কিশোরীরা শহরে এসে হয় ভবঘুরে বা টোকাই। ভবঘুরেদের পুনর্বাসনকল্পে ১৯৪৩ সালে কলকাতায় ভবঘুরে আইন জারি হয়। বাংলাদেশে এ আইন প্রবর্তিত হয় ১৯৫৩ সালে। এরপর ১৯৬২ সালে গাজীপুরের পুবাইলে এবং ময়মনসিংহের ধলায় দু’টি ভবঘরে আশ্রয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৭৭ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরো ৪টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এগুলো হলোÑ  ঢাকার মীরপুর, গাজীপুরের কাশিমপুর, নারায়নগঞ্জে গোদাণনাইল ও মানিকগঞ্জের বেতিলে। এসব আশ্রয় কেন্দ্র আসন খালি হয়ে গেলেই পুলিশের মাধ্যমে ভবঘুরেদের আটক রাখা হয়। প্রথমে তাদেরক মীরপুর ভবঘুরে আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হয়। এখানে সামারী কোর্ট বসে। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পরিচালনা করেন। শুনানির পর আবাস স্থলহীন, পরিচয়হীনদের রেখে দেয়া হয় ভাবঘুরে আশ্রমে। অন্যদের অর্থাৎ যারা নাম ঠিকানা যথাযথভাবে বলতে পারে তাদেরকে ফেরৎ দেয়া হয অভিভাবক অথবা আত্মীয়-স্বজনদের কাছে। আশ্রয় কেন্দ্রে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনাও করানো হয়। এখানে আশ্রিতদের বেশির ভাগই ১২-২৫ ভছর বয়সী কিশোর-কিশোরী।
২. শিশু আইন, ১৯৭৪ : অপরাধী কিশোরদের সংশোধনার্থে প্রণীত শিশু আইন, ১৯৭৪ এর কয়েকটি গুরুত্বপূূর্ণ ধারা উল্লেখ করা প্রয়োজন। এ আইনে বলা হয়েছেÑ
ধারা-৬ বয়স্ক অপরাধীদের সাথে কিশোর অপরাধীা বিচার একত্রে হবে না।
১. ফৌজদারি কার্যবিধির ২৩৯ ধারা অথবা বর্তমানে বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাই থাকুক না কেন কোনো বয়স্ক অপরাধীর সাথে একত্রে কোনো কিশোর অপরাধীর বিচার করা যাবে না।
২. যদি কোনো শিশু ফৌজদারি কার্যবিধির ২৩৯ ধারায় বা বর্তমানে বলবৎ অন্য কোনো আইনে অপরাধী হয় তবে আমল গ্রহণকারী আদালত শিশু এবং বয়স্ক ব্যক্তির বিচার পৃথককভাবে করার নির্দেশ দেবেন।
ধারা-৪৯-জামিনে মুক্তি প্রদান করা না হলে সে ক্ষেত্রে করণীয়
১. যে ক্ষেত্রে আপাত দৃষ্টিতে ১৬ বছরের কম বয়স্ক শিশুকে ৪৮ ধারা অনুযাযী জামিনে মুক্তি না দেয়া হয় সেক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উক্ত শিশুকে আদালতে হাজির করার পূর্ব পর্যন্ত রিমান্ড হোম বা নিরাপদ হেফাজতে রাখবেন।
২. আদালত উক্ত শিশুকে জামিনে মুক্তি না দিলে রিমান্ড হোম বা নিরাপদ হেফাজতে রাখার জন্য আদেশ দেবেন।
ধারা-৫- শাস্তি প্রদানে বাধা নিষেধ
১. অন্য কোনো আইনে যাই থাকুক না কেন, কোনো শিশুকে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা কারাদণ্ড প্রদান করা যবে না।
তবে শর্ত থাকে যে, আদলত যদি মনে করেন যে, শিশুটি এতই অপরাধ করছে যে অত্র বিধানে শাস্তি যথেষ্ট নয় অথবা যদি আদালতে সন্তুষ্ট হন যে শিশুটি এত দুরন্ত ও লম্পট চরিত্রের যে তাকে কোনো সংশোধনাগারে রাখা যথোপযুক্ত হলে আদালত শিশুটিকে কারাদণ্ড প্রদান করতে পারেন অথবা আদালত যেরূপ মনে করেন সেরূপ জায়গায় আটক থাকার আদেশ প্রদান করতে পারেন। তবে শর্ত থাকে যে, যে মেয়াদের জন্য তাকে দণ্ডিত করা যেত তার চেয়ে বেশি সময়ের জন্য তাকে আটকাধীন রাখা যাবে না। তবে আরো শর্ত থাকে যে, এরূপ আটকাবস্থার যে কোনো সময় আদলত উপযুক্ত মনে করলে এরূপ আটক রাখার পরিবর্তে ১৮ বৎসর বয়স অতিক্রান্ত হওয়া পর্যন্ত কোনো সংশোধনাগারে রাখার আদেশ প্রদান করতে পারে।
২. কিশোর অপরাধীকে তার কারাদণ্ড ভোগকালীন সময়ে বয়স্ক কয়েদীদের সাথে একত্রে আটক রাখা যাবে না।
ধারা-৫২-সংশোধনাগারে আটক রাখা
কোনো শিশু যদি মৃত্যুদণ্ডে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় কোনো অপরাধে দণ্ডিত হয়, তাহলে আদালত উক্ত শিশুকে সংশোধনাগারে আটক রাখার আদেশ প্রদান করতে পারবেন, তবে এ আটকের মেয়াদ ২ বছরের কম ও ১০ বছরের বেশি হবে না এবং কোনোক্রেমেই শিশুর বয়স ১৮ বৎসর অতিক্রম কত পাবেন।
ধারা-৫৩-কিশোর অপরাধীকে অব্যাহতি প্রদান বা যথোপযুক্ত হেফাজতে রাখা
১. আদালত উপযুক্ত মনে করলে কোনো শিশু অপরাধীকে ৫২ ধারা অনুযায়ী কিশোর সংশোধনাগারে আটক থাকার আদেশের পরিবর্তে নিম্নে বর্ণিত নির্দেশ প্রদান করতে পারেনÑ
ক. যথাযথ সতর্ক করে অব্যাহতি, অথবা
জামানতসহ বা ব্যতীত সর্বোচ্চ ৩ সৎসর সদাচরণের মুচলেকা গ্রহণপূর্বক শিশুটির পিতা-মাতা বা অভিভাবক বা বয়স্ক আত্মীয় বা তাদের কোনো যোগ্যতম ব্যক্তির হেফাজতে দিতে পারেন এবং আদালত আরো নির্দেশ প্রদান করতে পারেন যে, শিশুটি প্রবেশন অফিসারের তত্ত্বাবধানে থাকবে।
২. যদি আদালত প্রবেশন অফিসার বা অন্য কোনো মাধ্যমে সংবাদ পান যে, শিশুটি সদাচরণে ব্যর্থ হচ্ছে তখন আদালত তা তদন্ত করে সন্তুষ্ট হলে প্রবেশনের বাকি মেয়াদ কোনো সংশোধনাগারে আটক রাখার নির্দেশ প্রদান করতে পারেন।
ধারা-৬৫-পলাতক শিশুর প্রতি পযুলিরেমকার্যক্রম
বর্তমানে বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাই থাকুক না কেন, কোনো পুলিশ অফিসার বিনা পরোয়ানায় সংশোধনাগার হতে বা কোনো তত্ত্বাবধায়কের নিকট হতে পলাতক কোনো শিশুকে গ্রেফতার করতে পারবেন এবং এরূপ শিশুর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ রেকর্ড না করে বা তাকে অভিযুক্ত নাকরে উক্ত শিশু বা কিশোর অপরাধীকে সংশোধনাগারে বা তত্ত্বাবধায়কের নিকট পুনরায় প্রেরণ করবেন এবং কোনো শিশু বা কিশোর অপরাধী এরূপ পলাতক হবার কারণে কোনো অপরাধ করেনি বলে ধরে নেয়া হবে।
৩. বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ : ধারা ৩৪-শিশু ও কিশোর নিয়োগে বাধা নিষেধ।
১. কোনো পেশায় বা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিশুকে নিয়োগ করা যাইবে না বা কাজ করিতে দেয়া যাইবে না।
২. কোনো পেশায় বা প্রতিষ্ঠানে কোনো কোনো কিশোরকে নিয়োগ করা যাইবে না বা কাজ করিতে দেয়া যাইবে না। যদি না-
ক) বিধি দ্বারা নির্ধারিত ফরমে একজন সেজিস্টার্ড চিকিৎসক কর্তৃক তাহাকে প্রদত্ত সক্ষমতা প্রত্যয়নপত্র মালিকের হেফাজতে থাকে।
খ) কাজে নিয়োজিত থাকাকালে তিনি উক্ত প্রত্যয়নপত্রের উল্লেখ সম্বলিত একটি টোকেন বহন করেন।
ধারা-৩৯-কতিপয় কাজে কিশোর নিয়োগে বাধা : কোনো প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি চালু অবস্থায় উহা পরিষ্কারের জন্য, উহাতে তেল প্রদানের জন্য বা উহাকে সুবিন্যস্ত করার জন্য বা উক্ত চালু যন্ত্রপাতির ঘূর্ণায়মান অংশগুলির মাঝখানে অথবা স্থির এবং ঘুর্ণায়মান অংশগুলির মাঝখানে কোনো কিশোরকে কাজকরিতে অনুমতি দেয়া যাইবে না।
ধারা-৪০-বিপজ্জনক যন্ত্রপাতির কাজে কিশোর নিয়োগ
১. কোনো কিশোর যন্ত্রপাতির কোনো কাজ করিবেন না, যদি না
ক. তাহাকে উক্ত যন্ত্রপাতি সংক্রান্ত বিপদ সম্পর্কে এবং এই ব্যাপারে সাবধনতা অবলম্বন সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে ওয়াকেবহাল করানো হয়
এবং
খ. তিনি যন্ত্রপাতিতে কাজ করার জন্য যথেষ্ট প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিয়াছেন, অথবা তিনি যন্ত্রপাতি সংক্রান্ত অভিজ্ঞ এবং পুরোপুরি জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে কাজ করেন।
ধারা-৪১-কিশোররে কর্মঘণ্টা।
কোনো কিশোরকে কোনো প্রতিষ্ঠানে সন্ধ্যা ৭:০০ ঘটিকা হইতে সকাল ৭:০০ ঘটিকার মধ্যবর্তী সময়ে কোনো কাজ করিতে দেয়া যাইবে না।
ধারা-৪২-ভূগর্ভে এবং পানির নিচে কিশোরের নিয়োগ নিষেধ। কোনো কিেেশারকে ভূগর্বে বা পানির নিচে কোনো কাজে নিয়াগ করা যাইবে না।
কিশোর আইনসমূহ পর্যালোচনা : প্রথমত শিশু আইন, ১৯৭৪ এর ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় যে, কিশোর আদালত সাধারণ কোনো শাস্তি প্রদান না করে মূলত কিশোরদেরকে সংশোধনের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু আমাদের দেশের কিশোর সংশোধনাগারের সংখ্যা হাতে গোণা কয়েকটি মাত্র। যা প্রয়োজনের তুলনায় নেহায়েত অপ্রতুল। অন্যদিকে দেশের কারাগারগুলোর বাস্তব অবস্থা উল্টো। সেখানে শিশু-কিশোর অপরাধীদেরকে সাধারণ কয়েদীদের সাথে রাখা হয। যার পরিণতি হয়ে ওউঠে ভয়াবহ।
হাইকোর্ট ২০০৩ সালে ৯ এপ্রিল এক আদেশে কিশোর অপরাধীদেরকে সাধারণ কয়েদগীদের সাথে না রাখাসহ পৃথক হোমের ব্যবস্থা করার জন্য নির্দেশ দেন। কিন্তু এ নির্দেশনাটি কার্যকর হয়নি। ফলে যেসব কিশোর অপরাধী কারাগারে থাকছে তারা সংশোধনের সুযোগ তো পাচ্ছেই না বরং বয়স্ক অপরাধীদের সংস্পর্শে এসে আরও দাগী অপরাধীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে আমাদের দেশের কল-কারখানা মিল-ফ্যাক্টরিগুলোতে বাছ-বিচারহীনভাবে নিয়োগ করা হচ্ছে কিশোর-কিশোরীদের। এসব কিশোর-কিশোরী কাজ করার জন্য শারীরিকভাবে সক্ষম কী না সে বিষয়ে কোনো চিকিৎসকের নিকট থেকে সনদপত্র গ্রহণের গরজ বোধ করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরীদের এমন সব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা হয় যা শ্রম আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। শুধু তাই না, তাদেরকে দিয়ে গভীর রাত পর্যন্তও কাজ করানো হয়ে থাকে। আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, অনেক কিশোরী রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করে বিধ্বস্ত দেহ ও মন নিয়ে ঘরে ফিরছেন।

সুপারিশমালা
১. সমন্বিত ভূমিকা গ্রহণ : কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে মাতা-পিতা, অভিভাবক, শিক্ষক, রাজনীতিক সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবার, বিদ্যালয, সমাজ, সরকার ও রাষ্ট্র সবাইকে কিশোর অপরাধের প্রতিরোধে সংবেদনশীল ও সহানুভূতিশীল হতে হবে। সুস্থ কিশোর মানস ও মনন গঠনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে স্ব স্ব স্থান থেকে সমন্বিত প্রয়াস চালাতে হবে।
২. দারিদ্র্য দূরীকরণ : দারিদ্র্য বিমোচনে দেশের অর্থনীতিবিদসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দকে উদ্যোগী হতে হবে।
৩. বিনোদন : প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রশস্ত খেলার মাঠ থাকা উচিত। বিদ্যালয়গুলোতে বর্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, বার্ষিক মিলাদ মাহফিল, বিজ্ঞান, মেলা, বই পড়া প্রতিযোগিতা, বিতর্ক উৎসব, দেয়ালিকা প্রকাশ ইত্যাদি নিয়মিত হওয়া প্রয়োজন। স্কুলগুলোতে ছাত্রদেরকে বয় স্কাউট, ছাত্রীদেরকে গার্ল গাইডে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। সরকারি উদ্যোগে প্রতিটি বিভাগে একটি করে শিশু-কিশোর পার্ক থাকা উচিত। জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে সাপ্তাহিক বা মাসিক কিশোর পাতা প্রকাশ এবং রেডিও ও টিভি চ্যানেলগুলোতে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠান করা প্রয়োজন।  কিশোর পত্রিকা, উপযুক্ত কিশোর সাহিত্য রচনা এবং কিশোরদের উপযোগী শর্ট ফিলম্ নির্মাণ করা উচিত। জাতীয়ভাবে বছরের একটি দিনকে জাতীয় কিশোর দিবস হিসেবে উদযাপন এবং কিশোর-কিশোরীদের কৃতিত্বপূর্ণ কর্মের জন্য কিশোর পুরস্কার প্রবর্তন করা যেতে পারে।
৪. ধর্ম চর্চা : ধর্মীয় নৈতিকতা কিশোর মনে পোক্তভাবে প্রোথিত হতে হবে। এ লক্ষ্যে আশৈশব ধর্মের বিশুদ্ধ চর্চা ও যথাযথ অনুশীলন করতে হবে।
৫. সুশিক্ষক নিয়োগদান : শিক্ষক শিক্ষার্থীর মানসিক শক্তি-সামর্থ্য-চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। শিক্ষার্থীর দৈহিক ও মানসিক দুর্বলতার কারণসমূহ অবগত হয়ে শিক্ষক প্রতিকারে ব্যবস্থা করবেন এবং শিক্ষার্থীর অধীত বিষয়সমূহে অর্জিত জ্ঞানের পরিমাপ করবেন। শিক্ষকদের আদর-যতœ, মায়া-মমতা ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনে নিরাপত্তাবোধ জাগ্রত করে তুলতে হবে। এজন্য প্রয়োজন বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগদান এবং বুনিয়াদি প্রশিক্ষণসহ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে শিশু-কিশোরদের মানসিকতা অনুধাবন করার মতো বিষয় অন্তর্ভূক্ত করা।
৬. পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার সাধন : শিক্ষার্থীদের বয়স, সামর্থ্য ও অভিরুচির প্রতি লক্ষ্য রেখে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
৭ আত্মহত্যা রোধ : আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রাথমিক অবস্থায় ঝুঁকি নির্ণয়পূর্বক চিকিৎসা করতে হবে। ডিপ্রেশন শনাক্ত করা সম্ভব হলে চিকিৎসা সহজ হতে পারে। এক্ষেত্রে মনোচিকিৎসকের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। কিশোর-কিশোরীদের সহজ নাগাল থেকে কীটনাশক দ্রব্যাদি দূরে রাখতে হবে। চারপাশে এমন কিছু যথাসম্ভব না রাখা যা আত্মহননে সাহায্য করে।
৮. সংবেধনশীল মনোভাব প্রদর্শন : যে কোনো সমস্যার ওপর তাদের কথা ধৈর্য, আন্তরিকতা ও গুরুত্বের সাথে মন দিয়ে শুনতে হবে এবং সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের সাথে এমনভাবে কথা বলতে হবে যাতে সে মনে করে তার কাজে বড়দের সমর্থন ও সহানুভূতি আছে। কথায় কথায় তাদের সাথে ঝগড়া বা তাঁকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।
৯. টিনএজ ক্রাইসিস বিষয়ে কাইন্সেলিং : ক্ষেত্রবিশেষে টিনএজ ক্রাইসিস বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী বা মনোচিকিৎসকগণের দ্বারা পরিচালিত কাউেন্সিলিং সার্ভিসে কিশোর-কিশোরীদের অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে সমস্যা মুকাবিলায় মনোবল সঞ্চয় করানো যেতে পারে।
১০. কিশোর সংশোধনাগারের সংখ্যা বৃদ্ধি : সরকারি ও বেসরকারী উভয় উদ্যোগে কিশোর সংশোধনাগারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সংশোধনাগারগুলোকে সত্যিকার অর্থে কিশোরবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেখানে কিশোর-কিশোরীদের আত্মিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসূচি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একদল দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রশিক্ষকের মাধ্যমে কিছু দিন পর পর সংশোধনাগারে আনীত কিশোর-কিশোরীদের উন্নতি অগ্রগতি যাচাই পূর্বক তদনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে।
১১. শ্রম পরিদর্শন দফতরের তদারকী : কল-কারখানাসমূহে সরকারের শ্রম পরিদর্শন দফতরের আন্তরিক তদারকী জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের নিয়োগ ও কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে শ্রম আইনের বিধানসমূহ প্রতিপালন করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
১২. কিশোর আইন রিফর্ম সেল গঠন : বয়সের নিরিখে কিশোরের একটি একক আইনানুগ সংজ্ঞা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কিশোরদের জন্য প্রণীত আইনসমূহকে আরও প্রাকটিক্যাল ও কার্যকর করে তোলার লক্ষ্যে বিচারপতি, আইনজীবী, শিক্ষক, মনোবিজ্ঞানী, পুলিশ কর্মকর্তা ও কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে কাজ করছেন এমন সব এনজিওর প্রতিনিধি সমন্বয়ে জাতীয় ল কমিশনের আওতায় ও আইন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় একটি কিশোর আইন রিফর্ম সেল গঠন করা যায় কী না ভেবে দেখা যেতে পারে।
১৩. আদর্শ ও উদাহরণ স্থাপন : সর্বোপরি সমাজের সকল স্তরে অভিভাবক ও বায়োজ্যেষ্ঠগণকে সর্বক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরীদের সামনে কথা ও কাজের সমন্বয়ে আদর্শ স্থাপন করতে হবে।
উপসংহার
আমাদের কিশোর-কিশোরীরা আমাদের গর্বের ধন, আমাদের সম্পদ। এরাই আগামী দিনে দেশের নেতৃত্ব দেবে, এরাই হবে জাতির কর্ণধার। জাতির ভবিষ্যৎ উন্নতি অগ্রগতি এদের ওপরই নির্ভর করছে। সুতরাং কৈশোর থেকে ওদেরকে সৎ ও চরিত্রবান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, গড়ে তুলতে হবে সুনাগরিক হিসেবে, আলোকিত মানুষ হিসেবে। এ লক্ষ্যে উপরের সুপারিশমালার আলোকে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা আশু প্রয়োজন। এভাবেই ক্রমশ অপরাধ ও অপরাধীদের রাহুগ্রাস থেকে কিশোর-কিশোরীদেরকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। সম্ভব ওদেরকে প্রকৃত জনসম্পদে পরিণত করা। অন্যায় ও অবক্ষয়ের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে সোনালি ভোরের রক্তিম আভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক আমাদের নতুন প্রজন্ম- এই-ই হোক সবার সম্মিলিত প্রত্যাশা।
লেখক : বিশিষ্ট আইনবিদ
গ্রন্থপঞ্জি
১. ডক্টর মোহাম্মাদ সাদের, অপরাধ ও সংশোধন।
২. গাজী শামছুর রহমান অপরাধ, বিজ্ঞান।
৩. ড. পঞ্চানন ঘোষাল, অপরাধ তত্ত্ব।
৪. হামজা হোসেন, অপরাধবিজ্ঞান, ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭।
৫. ড. সুকুমার বসু, অপরাধ ও অপরাধী
৬. মওলানা আ: রহীম অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম,
৭. আহমদুল্লাহ মিয়া ও এসএস এম আতীকুর রহমান, কিশোর অপরাধ সংশোধনী প্রতিষ্ঠান থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত কিশোরদের বর্তমান অবস্থার উপর জরিপ। ঢাকা সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮৮, পৃ. ৬।
৮. মোহাম্মাদ হাবিবুর রহমান, আত্মহত্যায় আর্থ সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিককারণ, বাংলা একাডেমী ঢাকা, ১৯৯৮ ।
৯. এডভোকেট সাহিদা বেগম, পতিতা আইন (The suppression of Immoral traffic Act, 1933) খোশরোজ কিতাব মহল, ঢাকা, ২০০৫।
১০. মোহাম্মদ আবদুস সালাম, অপরাধ, শাস্তি, সংশোধনীমূলক প্রবেশন এবং মুক্তিপ্রাপ্ত কয়েদীর সংশোধনমূলক কার্যক্রম, আলীগড় লাইব্রেরী, ঢাকা আগস্ট, ১৯৮৯।
১১. বেবী মওদুধ সম্পদিত, দেহ ব্যবসায় বাধ্য কিশোরীরা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রকাশিত, অক্টেবর, ১৯৯২।
১২. মো: সিদ্দিকুর রহমান ও মো: শাওকাত ফারুক, শিক্ষা ব্যবস্থা, আহমদ পাবলিশিং হাউস, মে, ১৯৯৮।
১৩. ভক্তি প্রসাদ মল্লিক, অরপরাধ জগতের ভাষা ও শব্দকোষ, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯৩।
১৪. সিডি আই জার্নাল, ৪র্থ বর্ষ, ১ম সংখ্যা, ১৯৯২, শন্তিবাগ, ঢাকা।
১৫. আলী ইবনে আবি তালিব, নাহজ আল বালাঘা র‌্যামন পাবলিশার্স, ঢাকা, ২০০০।
১৬. আনু মাহমুদ, বাজেট : পরিকল্পনা-দারিদ্রবিমোচন, হক্কানী পাবলিশার্স, ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮।
17. Morales A. Yvonne F. AndP.R. Munford. The Juvenile Justice System and Minorities. Social Work, Boston: Allyn and Bacon INC, 1986. p.397-3.
18. Tappa Paul, Juvenile Deliquency. Newyork: Mc Graw Hill Book Company, INC. 1949. p.17.
19. Ahmed, Salahuddin. Studies in Juvenile Delinquency and Crime in East Pakistan. Dhaka: College of Social Welfare and Reseach Center. 1966. p.9.
20. Mia Ahmadullah. Criminal, Propensity of Youth: Prevention and Suppression. The Detective. Vol. 11 No. 1, January 12, 1988, Dhaka, PP. 4647.
21 See. Ahmadullah A.K. Social Factors of Jvenile Offence in East Pakistan, College of Social Welfare and Rescarch Center, 1964.
22. Juvenile Deliquency in East Pakistan. Social Science Research Project. Dhaka University, 1965.
23. Govt. of Bangladesh. The Children  Act No xxxix of 1974; Rules vide notification date 11 March 1976 framed uner the Children Rulce 1976.
24. Mohammad Afsaruddin, Juvenile Delinquency in Banngladesh, D.U., 1993.
25. Kelvin Seifert & Robert J. Hoffnung, Child and Adolescent Development.
26. Zaria Rahman Khan & H.K. Arefeen, The Situation of Child Prostitutes in Bangldesh,Centre for Social Studies, Dhaka, 1990.
27. Understanding Your School-Age Child, Alexandaria, Virginia.

SHARE

Leave a Reply