বায়তুল্লাহর তওয়াফ ও বায়তুল্লাহকেন্দ্রিক জীবন

জাফর আহমাদ

তওয়াফ অর্থ জিয়ারত করা। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহর ঘর কাবার চার পাশে জিয়ারত ও চক্কর দেয়া। তওয়াফ হজের একটি অংশ। হজের তিনটি ফরজের একটি হলো তওয়াফে এফাদাহ বা ফেরত তওয়াফ। অর্থাৎ আরাফাহ, মোজদালেফা এবং মিনা থেকে হজের বিভিন্ন হুকুম পালন করার পর মসজিদে হারামে এসে কাবা শরীফ তওয়াফ করা। এই তওয়াফ বাদ গেলে হজ হবে না এবং পরবর্তীতে পুনরায় হজ করতে হবে। এই তওয়াফ ছাড়াও ওয়াজিব ও সুন্নত তওয়াফও রয়েছে। হজের পাঁচটি ওয়াজিবের মধ্যে শেষ ওয়াজিবটি হলো হজ শেষে বাড়ি ফেরার জন্য বিদায়ী তওয়াফ করা। সুন্নত তওয়াফ হলো মিকাতের বাইরে থেকে আগত লোকদের জন্য তওয়াফে কুদুম করা।
কাবা আল্লাহর ঘর, আল্লাহর মহত্ত্বের বিশেষ নিদর্শন। কাবাকে কেন্দ্র করে তওয়াফ নিছক শারীরিক কোনো কসরতের নাম নয়। বরং বিশ্বমুসলিম দীনের উৎস, তাওহিদের উৎস ও বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে এ জানান দিলো যে, হে রব! তুমি তোমার প্রিয় বান্দাহ হজরত ইবরাহিমের মাধ্যমে আমাদেরকে ডেকে এনেছো, তুমি ইবরাহিমকে বলেছ “এবং তুমি মানুষকে হজের জন্য সাধারণ আহ্বান জানিয়ে দাও যেন তারা তোমার কাছে দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে অথবা উটের পিঠে চড়ে আসে।” আমরা তোমার ডাক শুনেছি এবং আমরা আমাদের বিনীত হৃদয় নিয়ে তোমার কাছে হাজির হয়েছি।
এই সম্মানিত কাবাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশ্ব মুসলিমের জীবনধারা। ইসলামী জীবনব্যবস্থা ও ইসলামী সংস্কৃতি কাবাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। কাবাকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থা মানে আল্লাহর দেয়া জীবনব্যবস্থা। বিশ্ব মুসলিমের সমাজ, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও আইন-কানুন এই কাবার প্রতি সম্পর্কিত। তাই কাবার গুরুত্ব অপরিসীম। বৈশ্বিকতা, আন্তর্জাতিকতা ও এর পরিব্যাপ্ততা পুরো বিশ্বকে শামিল করেছে। আল্লাহ তা’আলা তাঁর এমন একজন বিশ্বনেতা বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও নবী দ্বারা কাবা নির্মাণকাজ সম্পন্ন করান যাঁর নেতৃত্ব বিশ্বের ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলমান সমভাবে মেনে নিয়েছে।
আল্লাহর মেহমান হিসেবে যারা কাবার কাছে যাওয়ার আর্থিক যোগ্যতা রয়েছে, তারা এই ঘরের তওয়াফের মাধ্যমে এই স্বীকৃতি, এই ওয়াদা করে আসেন যে, কাবার মালিক মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদের রব। তিনি এক ও একক। ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও রাজত্ব একমাত্র তাঁরই। তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। আমাদের সামনে দৃশ্যমান এই যে পৃথিবী যা বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত, এগুলোতে একমাত্র তাঁরই হুকুম চলবে। তাঁর দেয়া জীবনব্যবস্থা অনুযায়ী রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও সার্বিক জীবন পরিচালিত হবে। পৃথিবীর দায়িত্ব, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা কাবাকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হবে। কাবার পাশে উপস্থিত হয়ে বিশ্ব মুসলিম তালবিয়ার মাধ্যমে মূলত এই ঘোষণাই দিয়ে থাকেন- ‘লাব্বায়িক আল্লাহুম্মা লাব্বায়িক …অর্থাৎ “প্রভু হে! তোমার ডাকে আমি উপস্থিত। আমি এসেছি, তোমার কোনো শরিক নেই, আমি তোমারই নিকট এসেছি। সকল প্রশংসা একমাত্র তোমার জন্য। সব নিয়ামত তোমারই দান, রাজত্ব আর প্রভুত্ব সবই তোমার। তুমি একক- কেউই তোমার শরিক নেই।”
পক্ষান্তরে যে মুসলিম কাবার কাছে উপস্থিত হওয়ার আর্থিক ক্ষমতা রাখেন না, তারাও আল্লাহর নিদর্শন কাবাকে সম্মুখে রেখে (কেবলামুখী হয়ে) প্রতিদিন অন্তত পাঁচবার এই ওয়াদা করেন যে, “আমি সব দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বিশেষভাবে কেবল সেই মহান সত্তাকেই ইবাদাত-বন্দেগির জন্য নির্র্দিষ্ট করলাম, যিনি সমস্ত আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের মধ্যে শামিল নই।” এবং আমরা প্রতি নামাজে এই ওয়াদাও করি যে, “সব প্রশংসা আল্লাহর যিনি বিশ্বজগতের রব। তিনি রহমান ও রহীম। আমরা কেবলমাত্র তাঁরই গোলামি করি আর তাঁরই কাছে সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করি।” তাঁর গোলামি করি মানে আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি-অর্থনীতি, আইন-আদালত সকল কিছু এই ঘরের মালিক মহান রবের ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালিত করি এবং করতে থাকবো। কোথাও যদি সামান্যতমও এর ব্যত্যয় ঘটে তবে আল্লাহর গোলামি থেকে বেরিয়ে অন্যের গোলামিতে ঢুকে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়।
এই কাবাকে কেন্দ্র করে শুধু হাজী সাহেবান ঘুরছেন না বরং বিশ্ব মুসলিমের সকল কিছুই এই কাবা কেন্দ্র করে হরহামেশাই ঘুরছে। পূর্বেই বলা হয়েছে বিশ্ব মুসলিমের সমাজনীতি, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও আইন-কানুন সব কিছুই কাবাকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, মুসলমানের কোনো নীতি যদি কাবার পথ থেকে কখনো সিটকে অন্য পথে চলে যায় বা দিক পরিবর্তিত হয়ে পড়ে তথা কাবার নীতি থেকে বিচ্যুত হয়, তবে একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে প্রথমে এককভাবে ও পরে সম্মিলিতভাবে তাকে কাবার পথে তুলে দিতে হবে। আল্লাহর মেহমান হিসেবে যারা সেখানে আল্লাহর কাছে এই ওয়াদা করে এসেছেন, তাদের ওপর এই দায়িত্ব আরো বেশি করে চলে আসে। এ কথাও বলা হয়েছে কাবার চারদিকে প্রদক্ষিণ করা বা কাবার দিকে মুখ ফেরানো নিছক কোনো শারীরিক কসরত নয় বরং এই প্রদক্ষিণ বা মুখ ফেরানো মানে জীবনের সকল কিছুই কাবাকেন্দ্রিক। অর্থাৎ পরিপূর্ণভাবে কাবার মালিকের কাছে আত্মসমর্পণ করা বা মুসলিম হওয়া। এই কাবা নির্মাণের প্রাক্কালে মুসলিম জাতির পিতা ও নেতা হজরত ইবরাহিম (আ) ও তাঁর সুযোগ্য  সন্তান হজরত ইসমাইল (আ) দু’জনে এমনই এক দোয়া মহান প্রভুর কাছে করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, “হে আমাদের রব! আমাদের দু’জনকে তোমার মুসলিম (নির্দেশের অনুগত) বানিয়ে দাও। আমাদের বংশ থেকে এমন একটি জাতির সৃষ্টি করো যে হবে তোমার মুসলিম।” (সূরা বাকারা : ১২৮)
আল্লাহর ঘর কাবা নির্মাণের উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, তার তওয়াফ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা হজরত ইবরাহিম (আ)-কে এর জন্য তাকিদ করেছেন এবং এ তাকিদ কুরআনের দুই জায়গায় করা হয়েছে- “আমার ঘরকে তওয়াফকারীদের জন্য পাক করো।” (সূরা বাকারা : ১২৫) “এ প্রাচীন ঘরের তওয়াফ করতে হবে।” (সূরা হজ : ২৬) পাক-পবিত্র রাখার অর্থ কেবলমাত্র ময়লা-আবর্জনা থেকে পাক-পবিত্র রাখা নয়। আল্লাহর ঘরের আসল পবিত্রতা হচ্ছে এই যে, সেখানে আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নাম উচ্চারিত হবে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর ঘরে বসে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে মালিক, প্রভু, মাবুদ, অভাব পূরণকারী ও ফরিয়াদ শ্রবণকারী হিসেবে ডাকে, সে আসলে তাকে নাপাক ও অপবিত্র করে দিয়েছে। এবং আল্লাহর ঘর প্রদক্ষিণ করে এসে বাইরে এসে একই নীতি অবলম্বন করে তারাও একই অপরাধে অপরাধী। তারা মূলত কাবার মালিকের সাথে শিরক করার দায়ে দায়ী হবেন। সে কাবার চেতনা ভুলে গিয়ে নাপাক বা অপবিত্র জীবনের গলিতে প্রবেশ করে।
তওয়াফের গুরুত্ব এত বেশি যে, কোনো কোনো সময় পুরো হজ অনুষ্ঠানটিকে তওয়াফ নামে আখ্যায়িত করা হয়। যেমন মসজিদ শব্দের অর্থ হলো সেজদার স্থান। অথচ এটি সালাতের স্থান হিসেবে এর নাম মুসল্লা চালু হতে পারতো। কিন্তু পুরো সালাতের মধ্যে সেজদা এমন একটি কর্ম যার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি বান্দার পুরো আনুগত্যের দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। মানুষের আভিজাত্যের প্রতীক নাক, কপাল ও মাথা সারা জাহানের প্রভু আল্লাহর সামনে লুটিয়ে দেয়। ফলে এর নাম মুসল্লা না হয়ে মসজিদ হয়েছে।
তদ্রƒপ পুরো হজে ‘বায়তুল্লাহর তওয়াফ’ এমন একটি কাজ, যার মাধ্যমে বান্দাহ আল্লাহর পুরো আনুগত্যকে বাস্তবে পেশ করে। সে বলে, “প্রভু হে! তোমার ডাকে আমি উপস্থিত। আমি এসেছি, তোমার কোনো শরিক নেই, আমি তোমারই নিকট এসেছি। সকল প্রশংসা একমাত্র তোমার জন্য। সব নিয়ামত তোমারই দান, রাজত্ব আর প্রভুত্ব সবই তোমার। তুমি একক-কেউই তোমার শরিক নেই।”
এই চক্করের মাধ্যমে বান্দাহ শিরকমুক্ত জীবন পরিচালনা করার অনুশীলন প্রদর্শন করে। সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ তাআলার স্বীকৃতি প্রদান করে। তওয়াফের মাধ্যমে বান্দাহ তার জীবনের প্রতিটি কর্ম কাবার মালিকের ইচ্ছানুযায়ী করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তার শিরায় শিরায় তাওহিদের এ বিশ্বাস প্রতিধ্বনিত হয়।
লেখক : ব্যাংকার

SHARE

Leave a Reply