বায়ুদূষণ: জীবন-প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস করে টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব – অধ্যক্ষ ডা: মিজানুর রহমান

প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে এবং মানুষের চলমান জীবন বিপন্ন করে উন্নয়ন মডেল তৈরি করা অসম্ভব। জীবনমান উন্নয়নে যখন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয় তার আগে পরিবেশগত বিপর্যয়ের সমীক্ষা ও সম্ভাবনা বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হয়। যাতে করে চলমান কিংবা ভবিষ্যৎ উন্নয়নের নামে গৃহীত কর্মকাণ্ড যেন কোনোভাবেই পরিবেশ ও জনগণের ক্ষতি সাধন না হয়। উন্নয়ন কার জন্য? নিশ্চয়ই বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। সেই প্রজন্মই যদি পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হয়ে বসবাসের পরিবেশের অযোগ্যতার মধ্যে নিপতিত হয়, তাহলে সে উন্নয়নধারা দেশের নাগরিকদের মানবাধিকার সময়ের ব্যবধানে বঞ্চিত করবে। কাজেই রাষ্ট্রযন্ত্রসহ সুশীলসমাজকে আগে থেকেই ভেবে চিন্তে অগ্রসর হতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার টেকসই উন্নয়নে লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নিয়ে মহাব্যস্ত। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি পূরণ করার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অপ্রতিরোধ্য। এ দেশের নাগরিকদের জীবন-প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়টি কৌশলে উপেক্ষা করে উন্নয়নের মডেল হিসেবে বিশ্বের দরবারে নিজেদের স্থান অর্জন করতে যা ইচ্ছে তাই করছে। সুন্দরবন-কক্সবাজার ও দ্বীপগুলোকে ধ্বংস করে একের পর এক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে চলেছে। কক্সবাজার মাতার বাড়িতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, গাইবান্দার গোবিন্দগঞ্জে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সুন্দরবনে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে উচ্ছেদ অভিযানে সেখানে ভূমির মালিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিশ্চিত না করার অভিযোগ উঠেছে।
পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে অপরিকল্পিত ভূমি অধিগ্রহণে বাস্তুভিটা থেকে একদিকে উচ্ছেদ হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্য দিকে জীবিকা ও চলমান পেশা হারিয়েছেন। ভুক্তভোগী মাতার বাড়ির পাঁচজন বাসিন্দা ঢাকায় এক গণশুনানিতে বলেন- অন্তত বিশ হাজার পরিবার জমি অধিগ্রহণে বসতভিটা হারিয়েছেন এবং বেকার হয়ে পড়েছেন। এসব স্থানে অবকাঠামোগত উন্নয়নে পরিবেশ সংরক্ষণের এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নাগরিক অধিকার বিপর্যস্ত হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বিশ্বজুড়ে অভাব দরিদ্রতা তথা গরিবি হটাতে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ৭০তম অধিবেশনে হাতে নেয় ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৯৩টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান ১৫ বছর মেয়াদি ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেন জাতিসংঘের সদয় দফতরে। বিপুল করতালি আর হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে গৃহীত হয় ১৬৯টি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। এই লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে? এবং কিভাবে হচ্ছে? তা নিরূপণ করার জন্য জাতিসংঘ কৃর্তৃক ৩০৪টি মাত্রা সূচক নির্ধারণ করে দিয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বৈশ্বিক উন্নয়নের একটি নতুন এজেন্ডা।
২০৩০ সালের একটি টেকসই বিশ্বগড়ার এক উচ্চাভিলাষী বৈশ্বিক লক্ষ্য-মানুষের বসবাসের জন্য এবং পৃথিবীকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও উপযোগ্য করে গড়ে তোলাই হলো এর প্রধান লক্ষ্য। বিগত সময়ে বাংলাদেশ সহ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মানুষের জীবন মানের উন্নয়নে এসডিজি তথা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা ও তা বাস্তবায়নে পথনির্দেশনা দিয়েছিলো।
বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এসডিজির সবকয়টি এজেন্ডা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নকল্পে জাতিসংঘ সহ বিশ্ব পরিমণ্ডলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিলো। কিন্তু পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এখন উন্নয়নের সাথে নতুন মাত্রা যুক্ত করা হয়েছে। তাহলো শুধু দৃশ্যত উন্নয়ন হলেই চলবে না, তা হতে হবে টেকসই তথা সাসটেইনেবল। আক্ষরিক অর্থে এটিই মূলত প্রকৃত উন্নয়ন।
দুর্ভাগ্যের বিষয় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সূচকের তলানিতে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। বাংলাদেশের তালিকা একেবারে পেছনে কাতারে। অর্থাৎ ১৪৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৮তে। এসডিজি অর্জনে প্রধান ১৭টি অভীষ্ট লক্ষ্য এর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধামুক্ত, সুস্বাস্থ্য, কল্যাণ ও গুণগত শিক্ষা, নারী পুরুষের সমতা বিধান, নিরাপদ-পানি ও সেনিটেশনের নিশ্চয়তা, সকলের জন্য সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানির ব্যবস্থা করা, যথাযোগ্য কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্প উদ্ভাবন ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ অসমতা তথা বৈষম্য হ্রাসকরণ, টেকসই নগর ও সমাজ উন্নয়ন ইত্যাদি।
বাংলাদেশে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৪ কোটি ৮০ লক্ষ তরুণ-তরুণী এখন পর্যন্ত বেকার। এদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দেশে ক্ষুদ্র মাঝারি এবং ভারি শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে এবং উঠছে অপরিকল্পিতভাবে। এসব শিল্প কারখানা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে পরিমাণ ইটের প্রয়োজন পরে তা কিভাবে উৎপন্ন হচ্ছে? দৃশ্যমান উন্নয়নের স্বার্থে এসব শিল্পকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও নিষ্কাশনের বিষাক্ত পানি নীরবে প্রাণঘাতী বায়ুদূষণ নীরবে হত্যা করছে এদেশের অসংখ্য জীবন ও প্রাকৃতিকে। তার পরিসংখ্যান সংরক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই এদেশে।
অপরিকল্পিত নগরায়নে কৃষিজমি হ্রাস এখন চলমান প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে জীবন্তসত্তা নদীহত্যার মহড়া চলছে প্রতিনিয়ত। দেশের ১৩শত নদ-নদীর মধ্যে এখন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বহ্মপুত্রসহ হাতেগোনা কয়েকটি নদী বিদ্যমান, আর এসব নদীতে প্রায় ৯ মাস ধূ ধূ বালিচর চোখে পড়ে আর ৩ মাস ভয়াবহ বন্যায় অগণিত আবাদি জমি, বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। নদীগুলোর নাব্য না থাকায় পানিপ্রবাহ প্রায় শূন্যের কোঠায়, নদীতীরবর্তী কলকারখানার বর্জ্যদ্রব্য নদীর তলানিতে মিশে মারাত্মকভাবে পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনছে। এতে বায়ুদূষিত হয়ে পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। সবুজ নির্মল পরিবেশ ধ্বংস করছে।
২০১৪ সালে WHO-এর রিপোর্টে জানা যায়- ২০১২ সালেই বায়ুদূষণে ৭ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। বায়ুদূষণের মূল উপাদানসমূহ এবং তাদের প্রধান উৎস কার্বন ডাই অক্সাইড (Co2)-পরিবেশের নেসেসারি ইভিল এই গ্যাসীয় উপাদানে অতিরিক্ত উপস্থিতি ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় গ্রিন হাউজ এফেক্টের ফলে। কলকারখানা, যানবাহনই এই গ্যাসের প্রধান উৎস।
সালফার ডাই অক্সাইড (So2) ট্যানারি এবং অন্যান্য কারখানার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়াসহ মশার কয়েল থেকে প্রতিনিয়ত ছড়ানো বিষাক্ত ধোঁয়া বায়ুদূষণ বিপর্যয়ের জন্য কম দায়ী নয়। বাতাসে ভাসমান জলীয় বাষ্পের সাথে মিশে গিয়ে ঐ বিষাক্ত গ্যাস মানবদেহের জন্য, প্রাণিজগতের জন্য অতি ক্ষতিকর বস্তু। কার্বন মনোক্সাইড (Co)-মানুষের শ্বাসক্রিয়ার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি মূলত পুরনো যানবাহন এর নির্গত গ্যাস থেকে এর উৎপত্তি।
ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন (CFC)- মূলত পুরাতন ইয়ার কনডিশনার এবং গ্যাসীয় সিলিন্ডারের গ্যাস। এ ছাড়া ইটের ভাটার চিমনি থেকে এবং অন্যান্য কলকারখানা চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়াসহ সোনার কারখানা থেকে নাইট্রিক এসিডজনিত গ্যাসসহ এবং এ ধরনের ধাতব কারখানার নানা পদার্থের ব্যবহারজনিত নির্গত গ্যাস যেমন-নাইট্রোজেন, মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, মিথাইল গ্যাস, বর্জ্য দ্রব্যের স্তূপ থেকে, সেফটি ট্যাংকি ও গোবর বা মলমূত্রের সংরক্ষণ থেকে নির্গত গ্যাস জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। বিশেষ করে সালফারের যৌগ, ফ্লোরিনের যৌগ ইত্যাদি থেকে উদ্ভূত গ্যাস বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে পরিগণিত হয়।
চিকিৎসকের মতে ধুলার বায়ুদূষণের কারণে বহু রাজধানীসহ নগর মহানগরের মানুষগুলোর শ্বাসকষ্ট, যক্ষ্মা, হাঁপানি, চোখের সমস্যা, ব্রংকাইটিস, সর্দি, কাশি, ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগের আবির্ভাব ঘটে থাকে। বায়ুবাহিত নানা ধরনের মাত্রায় বিশেষ করে ধুলা দূষণের কারণে নানা সংক্রামক ব্যাধি ছড়ায় সহজেই। এর ফলে বাংলাদেশে পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে স্কুল প্রতিষ্ঠানের শিশুরা প্রতিদিন রাস্তাঘাটে দূষিত বায়ু গ্রহণে কৃমিসহ নানা রকম পেটের পীড়া ও নানারকম রোগবালাইয়ের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। মশারির পরিবর্তে বস্তি এলাকাসহ দেশের সর্বস্তরে বসতবাড়িতে মশার কয়েলের বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে সমগ্র দেশের বায়ু দূষিত হচ্ছে প্রতিদিন। এ নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই বললেই চলে।
চলতি বছরের নভেম্বরের ১৯ তারিখে ইয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) ঢাকার স্কোর দাঁড়ায় ২১২, যা খুবই অস্বাভাবিক। অপরদিকে ইয়ার ভিজ্যুয়ালের ওপর সাইটের তথ্য মতে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ১৯ নভেম্বর ২০১৯ ছিলো এক নম্বরে ঢাকা শহর। বায়ুদূষণের কারণে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৯ রাজধানী ঢাকা দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় শীর্ষ অবস্থান করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন- যখন একিউআই এর মান ২০১ এবং ৩০০ এর মধ্যে অবস্থান করে তখন মানুষ লক্ষণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সংবেদনশীল গোষ্ঠীগুলো ক্রিয়াকলাপে কম সহনশীলতা বোধ করবে। বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ অধিদফতর ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণ নিয়ে সম্প্রতি যে, প্রতিবেদন দিয়েছেন তাতে এক নম্বরের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ইটভাটাকে।
যে কারণে ঢাকাসহ ৫ জেলায় ইটভাটা বন্ধের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে প্রশাসন। ঢাকা ছাড়া অন্যান্য জেলা হলো নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ। এসব জেলায় অবৈধ ইটভাটা বন্ধে প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে বলেছেন হাইকোর্টের একাধিক বিচারপতি। এ ছাড়া হাইকোর্ট বায়ুদূষণ রোধে এবং জীবন্ত সত্তা নদী হত্যা রোধে নিষ্ক্রিয়তায় রুল জারি করেন। এই আদেশ যথাযথভাবে প্রতিপালনে স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন নাগরিক, সুশীলসমাজ, অভিজ্ঞমহল, জনপ্রতিনিধি এবং সাংবাদিক বন্ধুরা সমন্বিতভাবে এগিয়ে এলে অবশ্যই খুব কম সময়ের মধ্যে বায়ুদূষণ রোধ করে জনজীবনের ঝুঁকিহ্রাসসহ জীবন ও প্রকৃতিকে অনেকাংশে নিরাপদে রাখা সম্ভব।

লেখক : জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

SHARE

Leave a Reply