বায়োমেট্রিকস সিম নিবন্ধন বিতর্ক -হারুন ইবনে শাহাদাত

কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ভালো-মন্দ দু’টি দিকেই ভাবতে হয়। ভুলে গেলে চলবে না, মানুষের আঙুলের ছাপ, চোখের রেটিনা এবং ডিএনএ তথ্য একান্ত ব্যক্তিগত সম্পদ। প্রযুক্তিবিদ জাকারিয়া স্বপন বলেন, ‘এ তথ্য রাষ্ট্র ছাড়া কারো কাছে থাকাই নিরাপদ নয়। রাষ্ট্র শুধু এটা প্রটেক্ট করতে পারে বা স্টোর করতে পারে। ওই ড্যাটাবেজ থেকে যদি কেউ পেয়ে যায় তাহলেতো ডেফিনেটলি ক্রাইম। এনশিওর করতে হবে যে গভর্মেন্ট ছাড়া আর কেউ কোনো পাবলিক ইনফরমেশন স্টোর করছে না কোনো অপারেটর বা যারা এর মধ্যে কাজ করছে, ইভেন মিডলে যারা আছে। কারণ এই ফিংগার প্রিন্টের প্রসেসটা কিন্তু থার্ড পার্টির ইমপ্লিমেন্ট করে দিচ্ছে। স্বপন আরো বলেন, আঙুলের ছাপ তৃতীয় পক্ষের কাছে চলে গেলে নানারকম অপব্যবহার হতে পারে। রিস্কটা হলো অন্য একটা পারসন আমাকে ইমপার্সনেট করতে পারে সে প্রিটেন্ড করতে পারে যে আমি জাকারিয়া স্বপন। আমার অনুমতি ছাড়াই করতে পারে। বেসিক্যালি আমার যত জায়গায় ডিজিটাল ইনফরমেশন আছে, স্টোর করা আছে সব অ্যাকাউন্ট চাইলে সে নিয়ে নিতে পারে। এ রিস্ক কিন্তু শুধু আমার-আপনার না, সবার ক্ষেত্রে হতে পারে। ইভেন একজন কৃষকেরও হতে পারে। দেখা যাবে উনি লোন নিয়ে বসে আছেন উনি জানেনই না।”

কী এই বায়োমেট্রিকস?
এখন সারাদেশে বায়োমেট্রিকস পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন বিতর্ক চলছে। কিন্তু কী এই বায়োমেট্রিকস? বায়োমেট্রিকস হলো বায়োলজিক্যাল ড্যাটা মাপা এবং বিশ্লেষণ করার বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি। গ্রিক শব্দ “bio (life) ও metric (to measure) থেকে উৎপত্তি হয়েছে (Biometrics) বায়োমেট্রিকস। তথ্যপ্রযুক্তিতে বায়োমেট্রিকস হলো সেই প্রযুক্তি যা মানুষের দেহের বৈশিষ্ট্য যেমন- ডিএনএ, ফিংগারপ্রিন্ট, চোখের রেটিনা এবং আইরিস, কণ্ঠস্বর, চেহারা এবং হাতের মাপ ইত্যাদি মেপে এবং বিশ্লেষণ করে বৈধতা নির্ণয় করে। কম্পিউটার পদ্ধতিতে নিখুঁত নিরাপত্তার জন্য বায়োমেট্রিকস পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। এ পদ্ধতিতে মানুষের বায়োলজিক্যাল ড্যাটা কম্পিউটারের ড্যাটাবেজে সংরক্ষিত করে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে এসব ড্যাটা নিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখা হয়। ড্যাটাতে মিল পেলে বৈধ বলে বিবেচিত হয় এবং অনুমতিপ্রাপ্ত হয়। বিশেষ ব্যক্তিকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বায়োমেট্রিকস প্রযুক্তি কী, এর উন্নয়ন, প্রয়োজনীয়তা এবং সুবিধাদি সম্পর্কে চলুন আরো একটু বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।
সহজ একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে। অনেকেই হয়ত লক্ষ্য করেছেন, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের গেটে ফিংগারপ্রিন্ট সেন্সর লাগানো থাকে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিতে কারা ঢুকতে পারবে আগে থেকেই তাদের ফিংগারপ্রিন্ট নিয়ে কম্পিউটারে বিশেষ নিরাপত্তা সফটওয়ারের ড্যাটাবেজে সংরক্ষিত করে রেখে দেয়া হয়। গেটে আগত প্রবেশকারীরা আঙুল দিয়ে ফিংগারপ্রিন্ট সেন্সরের বিশেষ স্থানে চাপ দিলে ফিংগারপ্রিন্ট তৈরি হয়ে তা কম্পিউটারে যাবে এবং কম্পিউটারে রক্ষিত ফিংগারপ্রিন্টের সাথে মিলিয়ে দেখবে। যদি মিলে যায় তাহলে গেট খুলে যাবে আর মিল না পেলে গেট খুলবে না। এই ফিংগারপ্রিন্ট হলো এখানে একটি বায়োলজিক্যাল ড্যাটা। ফিংগারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ হলো ইউনিক আইডেনটিটি। একজনের আঙুলের ছাপের সাথে অন্যজনের ছাপ কখনও মেলে না। আর এই আঙুলের ছাপকে ব্যবহার করে কম্পিউটার সফটওয়্যার নির্ভর যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয় তা-ই হলো বায়োমেট্রিকস পদ্ধতি।

বায়োমেট্রিকসের প্রকারভেদ
(Classification of Biometrics)– দেহের গঠন ও আচরণগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বায়োমেট্রিকস পদ্ধতি বিভিন্ন প্রকার হতে পারে। যেমন- ১. দেহের গঠন ও শরীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যের বায়োমেট্রিকস পদ্ধতি : মুখ, ফিংগারপ্রিন্ট, হ্যান্ড জিওমেট্রি, আইরিস, রেটিনা এবং শিরা।২. আচরণগত বৈশিষ্ট্যের বায়োমেট্রিকস পদ্ধতি : কণ্ঠস্বর, সিগন্যাচার, টাইপিং কি স্ট্রোক।
বায়োমেট্রিকসের ব্যবহার- (Application of Biometrics) : বর্তমানে নিরাপত্তার কাজে বায়োমেট্রিকস পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ প্রযুক্তি সাধারণত দুই ধরনের কাজে ব্যবহৃত হয়। যেমন : ১. ব্যক্তি শনাক্তকরণ (Identification) ২. সত্যতা যাচাই (Verification)
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত বায়োমেট্রিকস পদ্ধতিগুলো হলো : ফিংগারপ্রিন্ট রিডার( Finger reader), ফেইস রিকগনিশন (Face recognition), হ্যান্ড জিওমেট্রি (Hand Geometry), আইরিস এবং রেটিনা স্ক্যান (Iris and Retina Scan), ভয়েস রিকগনিশন  (Voice Recognition) ও সিগন্যাচার ভেরিফিকেশন (Signature Verification).

বিতর্কের কারণ
প্রযুক্তিবিদ জাকারিয়া স্বপনের যে বক্তব্য ওপরে তুলে ধরা হয়েছে তাতে বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয় কেন এই বিতর্ক। মানবাধিকারের দৃষ্টিতে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও নিরাপত্তার অংশ। সরকারের দায়িত্ব জনগণের জানমাল, সম্মানসহ সকল মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ। নিরাপত্তার নামে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের কাজ নয়। বায়োমেট্রিকস পদ্ধতিতে মোবাইল ফোনের সিম বাছাই নিয়ে সারাদেশে নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা বিষয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এর ফলে অপরাধী শনাক্ত করতে সহজ হবে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও আইনজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, অপরাধীরা এর অপব্যবহার করে সাধারণ নিরীহ নাগরিকদের ফাঁসাতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি এখন এতটাই উন্নত যে, মোবাইল ফোন কোথা থেকে কে ব্যবহার করছে তা আঙুলের ছাপ ছাড়াই নির্ণয় করা সম্ভব। বায়োমেট্রিকস পদ্ধতি চালুর আগে শুধু অপরাধী নয়, ভিন্ন মতের একাধিক রাজনৈতিক নেতাকেও পুলিশ এই মোবাইল ট্র্যাকিং করে গ্রেফতার করছে। তাই নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিকদের অতি স্পর্শকাতর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি বন্ধে এবং ব্যক্তিগত মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের দাবিতে ইতোমধ্যে আদালতে রিট আবেদন করা হয়েছে।

কুইনাইন জ্বর ছাড়াবে কিন্তু কুইনাইন ছাড়াবে কে?
পরিণতির বিষয়টি চিন্তা না করে ঝোঁকের বশে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ফ্রাংকেনস্টাইন দৈত্যের মতো বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই কোন আইন বিধান করার আগে অবশ্যই তার লাভ-ক্ষতি ও পরবর্তী প্রভাব নিয়ে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কম্পিউটারাইজড বায়োমেট্রিকস পদ্ধতির অনেক আগে থেকেই মোবাইল সিম কিনতে আঙুলের ছাপ এবং ন্যাশনাল আইডি কার্ড নম্বর দেয়ার বিধান আমাদের দেশে চালু আছে। তারপরও কেন আবার নতুন করে কম্পিউটারাইজড বায়োমেট্রিকস পদ্ধতি? নাগরিকদের একান্ত ব্যক্তিগত নিজস্ব সম্পদ নিয়ে কেন এত টানাহেঁচড়া। আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং স্পর্শকাতর এসব তথ্যের নিরাপত্তার কারণে উন্নত রাষ্ট্র এবং সেখানকার নাগরিক অধিকার কর্মীরা সোচ্চার থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে নাগরিক অধিকারের স্পর্শকাতর এসব দিক অনেকটা উপেক্ষিত হচ্ছে। সংবিধানে আমার এই ব্যক্তিগত সবকিছুর গোপনীয়তা রক্ষা করার কথা বলা আছে। তবে সরকার দেশের স্বার্থে আইন করে এর ব্যতিক্রম করতে পারে। এইখানে তো কোনো আইন নাই। আর আমরাও আমাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না বলে আমরাও দিয়ে যাচ্ছি। আমি বলবো যে চিন্তা করেন, পরে হকার বা বাসে উঠতে বা দুধ কিনতে গেলে যদি ফিংগারপ্রিন্ট দিতে হয়, তখন কিন্তু আমরা ব্যাপারটা বুঝতে পারবো যে এটা কত উদ্ভট কাজ হচ্ছে। বাংলাদেশে এখন থেকে নতুন সিম কেনা কিংবা সংযোগ বন্ধ করতেও আঙুলের ছাপ দিয়ে যাচাই করতে হবে।’
ঠিক বায়োমেট্রিকস নয়, আঙুলের ছাপ দিয়ে মোবাইল সিম নিবন্ধন প্রথম বাধ্যতামূলক করেছে পাকিস্তান। সর্বশেষ সৌদি আরবেও এ নিয়ম চালুর খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে তো অনেক আগে থেকেই চালু আছে সিম কেনার সময় ছবি, আঙুলের ছাপ ও ন্যাশনাল আইডি কার্ডের নম্বর দেয়ার নিয়ম। তদারকি না থাকায় এর যথেচ্ছা অপব্যবহার হয়েছে। ন্যাশনাল আইডি কার্ড আর ছবির মতো বায়োমেট্রিকসের অপব্যবহার হলে কী অবস্থা দাঁড়াবে একবার ভেবে দেখা দরকার। কারণ এমন প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী, বিটিআরসি ও মোবাইল অপারেটরদের কথার মধ্যে কোনো মিল নেই। দেশের অন্যতম একটি বড় অপারেটর বাংলালিংকের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা শিহাব আহমাদ বলেন, ‘যে তথ্যগুলো আসে সব তথ্যই এখানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত এটা ভেরিফাই করা না হচ্ছে। ভেরিফাই হওয়ার পর বিটিআরসির নির্দেশনানুযায়ী এগুলো হয় সংরক্ষণ করা হবে অথবা আমরা এটা পরবর্তীতে অন্য কোনো পদ্ধতিতে ডিলিট করে দেবো।’ তারা গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা দিয়ে থাকেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সংরক্ষণ না করে ভেরিফাই করা সম্ভব না। গ্রাহকদের তথ্য পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষণ করা হয় এবং ওইটা প্রটেকশন দেয়া হয়। আমাদের সার্ভার থেকে এটা বাইরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই।’
এ দিকে বিটিআরসির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এমদাদ উল বারী বলেন, ‘রিটেইলার লেভেলে সংরক্ষণ করার কোনো সুযোগই রাখা হয়নি। টেকনিক্যালি ফিংগারপ্রিন্ট সংরক্ষণ করা সম্ভব না। কারণ এটা রিয়েল টাইম মিলিয়ে দেখা হয়। তবে অপারেটর লেভেলে এটা সম্ভব হতে পারে যদি আলাদা করে কেউ করে। বাট আমরা অপারেটরদেরকে নির্দেশ দিয়েছি যেন এটা তারা না করে।’ এদিকে আঙুলের ছাপ বিতর্ক নিয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম তার ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, ‘মোবাইল কোম্পানির কাছে আঙুলের ছাপ সংরক্ষণের কোনো প্রযুক্তিও নেই।’ এদিকে মোবাইল অপারেটরদের পক্ষ থেকে জানা গেছে কোনো পর্যায়ে বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে না বিটিআরসি এই নির্দেশনা দিয়েছে ২৩ ফেব্রুয়ারি। এই নির্দেশ না মানলে কার কী করার আছে? মোবাইল সিমের বিক্রি বাড়াতে ইতঃপূর্বে তারা ছবি, আঙুলের ছাপ ও ন্যাশনাল আইডি কার্ডের যথেষ্ট অপব্যবহার করেছে। এ ক্ষেত্রেও তা অসম্ভব নয়, কারণ একটি আইডির বিপরীতে ২০ সিম রাখা যায়।
এ প্রসঙ্গে ‘বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম যাচাই ও নিবন্ধনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন’ শিরোনামে কামরুল হাসান দর্পণ লিখেছেন, ‘টেকনোলজির এ যুগে কে কখন কোন দিক দিয়ে ঢুকে আঙুলের ছাপ নিয়ে নেবে, তার গ্যারান্টি পাওয়া খুবই মুশকিল। ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি একই ব্যক্তি তার জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে একই কোম্পানির একাধিক সিম ব্যবহার করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব সিম অপরাধমূলক কর্মকান্ডেও ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে মোবাইল কোম্পানিগুলো কোনো দায়দায়িত্ব নেয়নি। ফলে আঙুলের ছাপ যে কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রকাশিত হবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিছুকাল আগে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন দেশের গোপনীয় তথ্য পাওয়ার জন্য নির্মাণের সময়ই নতুন কম্পিউটারের মধ্যে এক ধরনের অতি সূক্ষ্ম চিপ বসিয়ে দেয়া হয়েছে, যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এই অপকর্মের অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ওঠে। অভিযোগ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কোনো কোনো দেশের আমদানিকৃত নতুন কম্পিউটারে মাইক্রোচিপ বসিয়ে দিয়েছিল। এর মাধ্যমে সে ওইসব দেশের রাষ্ট্রীয় অনেক গোপন তথ্য সংগ্রহ করে। শুধু কম্পিউটারই নয়, আমেরিকার তৈরি ব্ল্যাকবেরি ব্র্যান্ডের মোবাইলেও মাইক্রোচিপ বসিয়ে দিয়েছিল। এর মাধ্যমে অনেক দেশের গোপন তথ্যাদি সংগ্রহ করার অভিযোগও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ওঠে। এ নিয়ে তুলকালাম কান্ড ঘটে যায়। কাজেই আধুনিক প্রযুক্তির এ যুগে, আমাদের জনগণের আঙুলের ছাপ নেয়ার কাজ যেভাবে বহুজাতিক মোবাইল কোম্পানির কাছে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তাতে তাদের আঙুলের ছাপ কতটা নিরাপদ থাকবে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে এবং তা উঠেছেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আঙুলের ছাপ নেয়ার নেতিবাচক দিকের বিবরণ উল্লেখ করে অনেকে গ্রাহককে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। অনেকে বলছেন, বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন করা ঝুঁকিপূর্ণ। বেসরকারি বিদেশী কোম্পানিগুলো আমাদের ফিংগার প্রিন্ট সংগ্রহ করছে, যা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
আগামী দিনে যখন ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে পাসওয়ার্ড প্রথা উঠে যাবে এবং ফিংগার প্রিন্টের ব্যবহার শুরু হবে, তখন যে কেউ সহজে যে কারো গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টের এক্সেস নিতে পারবে। তারা প্রশ্ন তুলে বলছেন, আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য সরকার তার প্রয়োজনে জমা রাখতে পারে। বেসরকারি কোম্পানি কেন রাখবে? একটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানি স্বীকার করেছে, তাদের ডিজিটাল ফিংগার প্রিন্ট জমা করা ছাড়া বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন সম্ভব নয়। তাদের কাছে এ প্রযুক্তিও নেই। প্রতিষ্ঠানটির কথা অনুযায়ী, এ রকম অরক্ষিত অবস্থায় ফিংগার প্রিন্ট দেয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলছেন, এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুন। জঙ্গি ও অপরাধী দমন করতে সিম নিবন্ধন করা অবশ্যই জরুরি। তবে সেটা করা হোক বিকল্প কোনো উপায়ে। অনেকে প্রশ্ন তুলে বলছেন, যে বিদেশী কোম্পানিগুলো কোটি কোটি ভুয়া নিবন্ধন তৈরি করতে পারে, তারা যে গ্রাহকদের ডিজিটাল ফিংগার প্রিন্টের অপব্যবহার করবে না, তার গ্যারান্টি কী? দুই. বায়োমেট্রিক কী তা হয়তো আমরা অনেকে পরিষ্কারভাবে বুঝি না। অক্ষর-জ্ঞানহীন তো বটেই, অনেক শিক্ষিত লোকজনেরও আধুনিক এ প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেই। বায়োমেট্রিক একটি অটোমেটিক বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই এর ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিধানে ভয়ঙ্কর অপরাধ ও অপরাধী শনাক্তকরণ কাজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ পদ্ধতি ব্যবহার করে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত আলামত থেকে অপরাধীর ফিংগার প্রিন্ট সংগ্রহ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তির ফিংগার প্রিন্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। মিলে গেলে সহজেই তাকে শনাক্ত করা যায়। বায়োমেট্রিকে শুধু ফিংগার প্রিন্ট নয়, মানুষের চেহারা, হাতের গঠন, চোখের আইরিস, রেটিনা, কণ্ঠস্বর, শিরা ও হাতের লেখাও অন্তর্ভুক্ত। এসব ব্যবহার করে একজন মানুষকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়। বলা যায়, এসব এক ধরনের শনাক্তকরণ চিহ্ন।
‘আমরা হলিউডের সিনেমায় এসবের ব্যবহার অহরহ দেখতে পাই। তবে আমেরিকায় সাধারণ মানুষের ফিংগার প্রিন্ট শনাক্তের এ প্রক্রিয়াকে তাদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী বলে সেখানের মানবাধিকার কর্মীরা বরাবরই প্রতিবাদ করে আসছে। বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ফিংগার প্রিন্টের ব্যবহার সর্বপ্রথম শুরু করে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)। ১৯২৪ সালে সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ফিংগার প্রিন্ট সংগ্রহ করা শুরু করে। কিন্তু তা আমাদের দেশের মতো এই পদ্ধতিতে নয়। আঙুলের ছাপ নেয়ার পর এর ছবি সংরক্ষণ করা হয় না। সংরক্ষণ করা হয় আঙুলের রেখাচিত্র। এ রেখাচিত্র বাইনারি পদ্ধতিতে গণনা করা হয়। গণনা করে যে নম্বরটি পাওয়া যায়, তাই সংরক্ষণ করা হয়। এই নম্বর অন্য কারো আঙুলের রেখাচিত্রের নম্বরের সঙ্গে মিলবে না। ফলে নির্ভুলভাবে যে কাউকে শনাক্ত করা যায়। বলা যায়, কোনো ব্যক্তির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয় হচ্ছে ফিংগার প্রিন্ট। এটি কেবলমাত্র ওই ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। এগুলো কেবলমাত্র রাষ্ট্রের কাছে গোপনীয় দলিল হিসেবে জমা থাকবে। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সংরক্ষণ করা যাবে না। আমরা দেখেছি, জাতীয় পরিচয়পত্র করার সময় আমাদের সেনাবাহিনী পুরো কাজটি সমাপ্ত করেছে। নাগরিকের যাবতীয় ব্যক্তিগত তথ্যসহ আঙুলের ছাপও নেয়া হয়েছে। সে সময় এ নিয়ে তেমন প্রশ্ন ওঠেনি। এর কারণ এটি সরকারের নিজস্ব সংস্থার মাধ্যমে করা হয়েছে। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হয়নি। এবারের ফিংগার প্রিন্ট সংগ্রহের কাজটি করা হচ্ছে বেসরকারি বিদেশী মোবাইল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে। এখানেই সচেতন নাগরিকদের আপত্তি এবং শঙ্কা। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান যতই বলুক, গ্রাহকের ফিংগারপ্রিন্ট তারা সযত্নে রাখবে এবং কোনোভাবেই ফাঁস হবে না, তাদের এ কথায় সচেতন শ্রেণী নিশ্চয়তা ও আস্থা রাখতে পারছে না। কারণ মোবাইল কোম্পানিগুলো জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়। যে কোনো সময় যে কোনো কোম্পানি ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে পারে, আবার মালিকানা পরিবর্তনও হতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এসব মোবাইল কোম্পানি কোটি কোটি ভুয়া নিবন্ধনের মাধ্যমে সিম বিক্রি করেছে। তারা তো কখনো এসব সিম ভেরিফাই করেনি। এর কারণ হচ্ছে, তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ব্যবসা, দায়বদ্ধতা নয়। যত বেশি সিম বিক্রি হবে, তত বেশি তাদের লাভ। এমন দায়িত্বহীন বেনিয়া মনোবৃত্তির প্রতিষ্ঠানের কাছে কি জনসাধারণের ফিংগার প্রিন্ট নিরাপদ থাকতে পারে? আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি, মোবাইলে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতা ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে। এখনও ছড়ানো হচ্ছে। ইউটিউবে এসব কথাবার্তার রেকর্ড অহরহ পাওয়া যাচ্ছে। এতে গ্রাহকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্য হচ্ছে। তদ্রুপ ফিংগার প্রিন্ট যে অন্যের হাতে চলে যাবে না, এ নিশ্চয়তা কোথায়? স্বাভাবিকভাবেই যেসব সচেতন মানুষ বিষয়টি বুঝতে পেরেছে, তারা এর প্রতিবাদ ও অন্যদের সতর্ক করার দায়িত্ব পালন করছে। বলা যায়, তারা অনেকটা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বই পালন করছে।
সরকারের উচিত হবে বায়োমেট্রিক পদ্ধতির এ প্রক্রিয়া বাতিল করে নিজ উদ্যোগে তা পুনরায় শুরু করা। কারণ এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং রাষ্ট্রকেই তা সংরক্ষণ ও রক্ষা করতে হবে। ফাঁস হওয়ার ন্যূনতম শঙ্কা যেখানে রয়েছে, সেখানে কোনোভাবেই এ কাজ করতে দেয়া উচিত নয়। আমরা এটাও মনে করি, শুধু সিম নয়, মোবাইল সেট রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ একটি সিম যত সহজে নষ্ট বা ফেলে দেয়া যায়, একটি সেট তত সহজে ফেলে দেয়া যায় না। এতে অপরাধীর অবস্থান জানাসহ তাকে গ্রেফতার করার কাজটিও সহজ হবে। বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টির আগেই বিষয়টি নিয়ে আরো গভীরভাবে সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখা জরুরি।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply