বায়োসেন্সর জীবনদায়ী প্রযুক্তি

গোলাপ মুনীর

বায়োসেন্সর হচ্ছে একটি অ্যানালাইটিক্যাল ডিভাইস বা বিশ্লেষণ যন্ত্র। এই যন্ত্রে রয়েছে একটি জৈবিক উপাদান। আর এর সাথে রয়েছে একটি পিজিকোডিটেক্টর। এই যন্ত্র চিহ্নিত ধরতে পারে স্পর্শকাতর সব জৈব উপাদান বা বস্তু। যেমন; কোষকলা (টিস্যু), মাইক্রো অর্গানিজম, অর্গানেলস, সেল রিসিপ্টর, এনজাইম, এন্টিবডি, নিউক্লিক অ্যাসিড ইত্যাদি। স্পর্শকাতর জৈববস্তু বা বায়োলজিক্যালি সেন্সেটিভ ম্যাটেরিয়াল সৃষ্টি করা যায় জৈব প্রকৌশলের মাধ্যমে।
এই বায়োসেন্সরে ধরা পড়ে ট্রান্সডুসার বা ডিটেক্টর এলিমেন্ট যা কাজ করে পিজিকো কেমিক্যাল উপায়ে; অপটিক্যাল, পিজোইলেকট্রিক ইলেকট্রোকেমিক্যাল ইত্যাদি উপায়ে। একটি বায়োসেন্সর রিডার ডিভাইসে থাকে ইলেকট্রনিকস বা সিগন্যাল প্রসেসর। এগুলোই প্রাথমিকভাবে পরীক্ষার ফলাফল ব্যবহাকারী বান্ধর উপায়ে দিয়ে থাকে।
সুপরিচিত একটি বাণিজ্যিক বায়োসেন্সর হচ্ছে ব্লাড গ্লুকোজ বায়োসেন্সর। ব্লাড গ্লুকোজ ভেঙে ফেলতে এ বায়োসেন্সরে ব্যবহার হয় এনজাইম মষঁপড়ংব ড়ীরফরুব। তা করতে একটি প্রথমে গ্লুকোজকে অক্সিডাইজ করে এবং দু’টি ইলেকট্রন ব্যবহার করে ভধফ (এনজাইমের একটি উপাদান) কে ভধফয২ তে রূপান্তর করতে। অপরদিকে তা ইলেকট্রোডের মাধ্যমে অক্সিডাইজ হয় (ইলেকট্রোড থেকে দু’টি ইলেকট্রন গ্রহণ করে) কয়েকটি ধাপে। এর ফলে যে তড়িৎপ্রবাহ সৃষ্টি হয়, তা থেকে মাপা যায় গ্লুকোজের ঘনত্ব্। এ ক্ষেত্রে ইলেকট্রোড হচ্ছে ট্রান্সডুসার আর এনজাইম হচ্ছে জৈবিকভাবে সক্রিয় উপাদান।
অতি সম্প্রতি তথাকথিত ইলেকট্রনিক নোজ ডিভাইসে ব্যবহার হচ্ছে নানা ধরনের ডিটেক্টর মলিউকুল। এক্ষেত্রে ডিটেক্টরের রেন্সপন্সের ধরন ব্যবহার হয় একটি বস্তু চিনতে।
ওয়াসফ হাউন্ড ওডোর ডিটেক্টর মেকানিক্যাল এলিমেন্ট হচ্ছে একটি ভিডিও ক্যামেরা এবং বায়োলজিক্যাল এলিমেন্ট হচ্ছে পাঁচটি প্যারাসাইটিক ওয়াসফ (পরজীবী বোলতা), যেগুলোকে কন্ডিশন করা হয়েছে সুনির্দিষ্ট রাসায়নিকের উপস্থিতিতে সাড়া দিতে। আজকের দিনের কমার্শিয়াল ইলেকট্রনিক নোজে অবশ্য বায়োলজিক্যাল এলিমেন্ট ব্যবহার হয় না। গ্যাস উদগিরণের ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়ার জন্য খনিশ্রমিকেরা খাঁচার ভেতর দক্ষিণ আফ্রিকার গায়ক পক্ষী ক্যানারি রাখে। এটিকে ধরে নেয়া যায় এক ধরনের বায়োসেন্সর। আজকের দিনে বায়োসেন্সর প্রয়োগগুলো মোটামুটি একই ধরনের। এখন এক্ষেত্রে ব্যবহার হয় অর্গানিজম, যা বিষাক্ত পদার্থে সাড়া দেয়। এসব ডিভাইস ব্যবহার করা যেতে পারে পরিবেশ মনিটরিং, গ্যাসের উপস্থিতি জানা ও পানি শোধনের কাজে।
অতি সম্প্রতি
গত ২৭ মে বিজ্ঞানীরা বায়োসেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করে উদ্ভাবন করেছেন এক ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষাপদ্ধতি। এর মাধ্যমে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষণগুলো চিহ্নিত করা যায়। লন্ডনের ইম্পারিয়াল কলেজ এবং স্পেনের ভিগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে কাজ করে এই টেস্ট উদ্ভাবন করেছেন। এই টেস্টের সাহায্যে সুনির্দিষ্ট মলিউকুল চিহ্নিত করা যায়। এ মলিউকুলই বলে দেয় শরীরে কোন রোগের উপস্থিতি রয়েছে। এ রোগের তীব্রতা কত বেশি বা কম, তা এখনো বিবেচ্য নয়। রোগের উপস্থিতি রয়েছে কি না, সেটাই এখানে বিবেচ্য। এসব মলিউকুলগুলোকে বলা হয় বায়োলজিক্যাল মার্কার। আরো সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয় বায়োসেন্সর। যদিও এর ভেতরের প্রযুক্তিটি মোটেও নতুন নয়, তবুও এর মধ্যে এক ধরনের সতর্কবার্তা রয়েছে। আজকের দিনে বিদ্যমান বায়োসেন্সরগুলো বায়োমার্কার চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে কম সেন্সেটিভ, যখন বায়োমার্কারের উপস্থিতি কম মাত্রায় থাকে। অনেক সময় তা ধরাও পড়ে না। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ের রোগের উপস্থিতি এগুলোতে ধরা পড়ে না।

উল্লিখিত বিজ্ঞানী দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অধ্যাপক মোলি স্টিভেনস। ইম্পারিয়াল কলেজের ডিপার্টমেন্ট অব ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড বায়ো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এ সম্পর্কিত সমীক্ষা প্রতিবেদনের ঊর্ধ্বতন প্রণেতাও তিনি। তিনি বলেছেন, যেহেতু একটা কথা আছে প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর, অতএব জরুরি কাজ হচ্ছে সূচনা পর্বেই রোগ চিহ্নিত করা। তা সম্ভব হলেই আমরা রোগীদের জন্য সর্বোত্তম উপকারটি করতে পারব। যে কোনো রোগের চিকিৎসাই প্রাথমিক পর্যায়ে সহজতর। এতে চিকিৎসা খরচও কম। প্রথম দিকেই রোগ ধরা পড়লে এর বিস্তার থামানো যায় সহজে। কিন্তু আজকের দিনে আমাদের কাছে যেসব ডাক্তারি পরীক্ষা রয়েছে তা দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ চিহ্নিত করা আর খড়ের গাদায় সূচ খুঁজে বের করা সমান কথা। কিন্তু সম্প্রতি উদ্ভাবিত আলোচ্য এ টেস্ট আমাদের সেই সূচ খোঁজার কাজটিকে যেনো সহজতর ধরে তুলেছে। এখন পর্যন্ত আমরা একটি রোগের ক্ষেত্রে এই টেস্ট কার্যকর দেখতে পেয়েছি। তবে আমরা খুবই আশাবাদী অন্যান্য রোগের বেলায়ও আমরা এ টেস্টকে কার্যকর দেখতে পাব খুব শিগগির। এর মাধ্যমে আমরা সূচনাতেই অনেক রোগ চিহ্নিত করতে পারব।’
নতুন পরীক্ষায় ব্যবহার করা বায়োসেন্সরে রয়েছে ন্যানো সাইজের গোল্ডস্টার, যা ভেসে থাকে একটি দ্রবণে। এই দ্রবণে থাকে নানা ধরনের প্রোটিন, যা নেয়া হয়েছে রক্ত থেকে। গোল্ডস্টারের উপরিভাগে লাগানো আছে কিছু অ্যান্টিবডি। জীবদেহের রক্তের মধ্যে তৈরি হওয়া যে পদার্থ অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থের ক্রিয়াশক্তি নষ্ট করে তাকেই বলা হয় অ্যান্টিবডি। এই অ্যান্টিবডি যোগ দেয় জীবদেহের অ্যান্টিজেনের সাথে। আ্যান্টিজেন হচ্ছে জীবদেহের বিষাক্ত বা ক্ষতিকর পদার্থ নষ্টকারী পদার্থকে চাঙ্গা করার ভেষজ বিশেষ। গোল্ডস্টারের সাথে লাগানো একটি মাধ্যমিক অ্যান্টিবডিতে রয়েছে গ্লুকোজ অক্সিডেইজ নামের একটি এনজাইম। এই এনজাইম উৎসেচক্য হচ্ছে জীবন্ত প্রাণীর দেহকোষ উৎপন্ন জৈব রাসায়নিক পদার্থবিশেষ, যা নিজে পরিবর্তিত না হয়ে অন্য পদার্থের পরিবর্তন করতে পারে। গ্লুকোজ অক্সিজেইজ নামের এই এনজাইম এন্টিজেন চিহ্নিত করে এবং গোল্ডস্টারের ওপর আলাদা ধরনের দানদার সিলভারের আবরণ সৃষ্টি করে। বায়োমার্কার যখন কম ঘনত্বে থাকে, তখন তা বেশি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এই সিলভারের আবরণ কাজ করে একটি সঙ্কেতের মতো। এই সঙ্কেত অ্যান্টিজেনের উপস্থিতি জানিয়ে দেয়। অপটিক্যাল মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে চিকিৎসকেরা তা সহজেই জানতে পারেন।
এই উদ্ভাবক দল পিএসএ (প্রোস্টেট-স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন বায়োমার্কার নমুনা ব্যবহার করে এই বায়োসেন্সরের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখান। এটি প্রোস্টেট ক্যান্সারের (মূত্রস্থলীর গ্রীবা সংলগ্ন গ্রন্থির ক্যান্সার) জন্য একটি বায়োমার্কার। এতে ব্যবহার হয় রক্ত থেকে পাওয়া সিরাম। রক্তের পাতলা অংশ তৈরিকারক তরল) প্রোটিনের একটি জটিল দ্রবণ। পিএস মনিটরিং করে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রোস্টেট ক্যান্সার ধরা সম্ভব। এই সমীক্ষায়, এই উদ্ভাবক দল পিএসএ চিহ্নিত করেছে প্রতি মিলিলিটারে ০.০০০০০০০০০০০০০০০০০১ গ্রাম বর্তমান বায়োসেন্সর টেকনোলজিব জন্য এটি চূড়ান্ত সীমা। অপর দিকে এই সময়ে বিদ্যমান ইএলআইএসএ (এনজাইম-লিঙ্কেড ইমিউনোসরবেন্ট অ্যাসে) টেস্টে চিহ্নিত করা গেছে প্রতি মিলিলিটারে ০.০০০০০০০০১ গ্রাম। সম্প্রতি উদ্ভাবিত টেস্টটি খুবই নির্ভরযোগ্য বলেও প্রমাণিত হয়েছে। তারপরও এ নিয়ে আরো পরীক্ষা নিরীক্ষা দরকার।

অন্যান্য বায়োসেন্সর
বায়োমেট্রিক : অনেক অপটিক্যাল বায়োসেন্সর এসপিআর (সারফেস প্লাসমন রেজোন্যান্স) ফেনোমেনন-ভিত্তিক। এগুলোতে ব্যবহার হয় এভানেসেন্ট (বিলীয়মান, ছুটে বলে অদৃশ্য হচ্ছে এমন) ওয়েভ টেকনিক। এতে ব্যবহার হয় স্বর্ণের ও অন্যান্য পদার্থের ধর্ম। বিশেষ করে বেশি মাত্রার বিবর্ধক কাচের ওপর স্বর্ণের একটি পাতলা আবরণ লেজার আলো শুষে নিতে পারে। লেজার আলো শুষে নিয়ে স্বর্ণের ওপর তা তৈরি করে ইলেকট্রন তরঙ্গ (সারফেস প্লাসমন) সারফেস প্লাসমন রেজোন্যান্স সেন্সরগুলো কাজ করে একটি সেন্সর চিপ ব্যবহার করে। এ চিপে থাকে একটি প্লাস্টিক ক্যাসেট, যার এক পাশে থাকে স্বর্ণের অতি পাতলা স্তর, যা শুধু মাইক্রোস্কোপ দিয়েই দেখা সম্ভব। এই পাশটি সংযোগ রক্ষা করে এই যন্ত্রের অপটিক্যল ডিটেকশন আপারেটাসের সাথে বিপরীত পাশটি যোগাযোগ রাখে মাইক্রো ফ্লুইড ফ্লো সিস্টেমের সাথে। ফ্লো সিস্টেমের সাথে সংযোগ সৃষ্টি করে কিছু চ্যানেল, যার মধ্যে দিয়ে দ্রবণে রিঅ্যাজেন্ট প্রবাহিত করা যায়। প্লাস সেন্সর চিপ সাইডে কয়েক উপায়ে পরিবর্তন আনা যায়। আর তা করা হয় পছন্দমতো মলিউকুল সংযোজনের জন্য। সাধারণত একে বলা হয় কার্বোক্সিমিথাইল ডেক্সট্রান বা একই ধরনের যৌগ।
ইলেকট্রো কেমিক্যাল
ইলেকট্রো কেমিক্যাল বায়ো সেন্সর সাধারণত একটি বিক্রিয়ার এনজাইমেটিক ক্যাটালাইসিসভিত্তিক। এ বিক্রিয়ায় ইলেকট্রন তৈরি অথবা শুষে নেয়া হয়। এর সেন্সরে থাকে তিনটি ইলেকট্রোড : একটি রেফারেন্স ইলেকট্রোড, একটি ওয়ার্কিং ইলেকট্রোড এবং একটি কাউন্টার ইলেকট্রোড। টার্সেট অ্যানাইলট অংশ নেয় একটি বিক্রিয়ায়। এ বিক্রিয়াটি ঘটে অ্যাক্টিভ ইলেকট্রোড সারফেসে। আর এই বিক্রিয়া দুই স্তরে ইলেকট্রন স্থানান্তর করতে পারে অথবা দুই স্তরের সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে পারে ভোল্টেজ উৎপাদন করে। আমরা পরিমাপ করতে পারি ইলেকট্রন প্রবাহের মাত্রা, যা এনাইলাইট কনসেন্ট্রেশনের সমানুপাতিক। লক্ষ করুন, ওয়ার্কিং অথবা অ্যাক্টিভ ইলেকট্রোডের ক্ষমতা স্পেসচার্জ সেন্সিটিভ পটেনশিও মেট্রিক বায়োসেন্সরের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে, এই সেন্সর দেয় ল্যাগারিদমিক রেসপন্স। এই বায়োসেন্সর সাধারণত তৈরি করা হয় স্ক্রিন প্রিন্টের মাধ্যমে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply