বিএমএর স্যালুট নিলেন ভারতীয় সেনাপ্রধান ইহাও দেখিতে হইল

আব্দুল হাই শিকদার

মৃত্যুর পূর্বে কোনো এক খ্যাতিমান মহাপুরুষ খেদোক্তি করেছিলেন, ‘মরিবার পূবেই ইহাও দেখিতে হইল।’ সেই খেদোক্তি জাতি হিসেবে এখন আমাদেরও। বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে বার্ষিক পাসিং আউট প্যারেডে স্যালুট গ্রহণ করেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিজয় কুমার সিং (বি কে সিং)।  ২১ জুন চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে বিএমএর ৬৪তম দীর্ঘমেয়াদি ও ৩৫তম স্পেশাল কোর্সের প্রশিক্ষণ কোর্সের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের সেনাপ্রধানও অনুষ্ঠানে থাকেন। তবে চৌকস ক্যাডেটদের মধ্যে সনদ বিতরণ ও কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন ভারতীয় সেনাপ্রধান। আমাদের সেনাপ্রধানের কাজ শুধু তাকে সঙ্গ দেয়া।

দেশের সচেতন মহল, দেশপ্রেমিক জনতা এই বিষয়টি নিয়ে যতোই হতবাক হন না কেন, যতো বিস্ময়ই তাদের সামনে স্তূপীকৃত হোক না কেন, প্রশিক্ষণ শেষে সরাসরি সেনাবাহিনীতে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেয়া এবং দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ নেয়ার এই অনুষ্ঠানে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশী সেনাপ্রধান স্যালুট গ্রহণ করেন। এই ভয়ানক এবং উদ্বেগজনক ঘটনার স্রষ্টা আমাদের বর্তমান সরকার। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এরপর আমাদের স্বাধীনতার পদক বিতরণ কিংবা মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানেও হয়তো প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন কোনো ভারতীয় সেনাপ্রধান কিংবা পশ্চিমবাংলার রাজ্যপাল।

পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্নরুচির লোকটিও তার অপকর্ম জায়েজ করার জন্য কিছু অজুহাত নতিজা হিসেবে পেশ করে। আমাদের বর্তমান মহামহিম সরকারও এ ক্ষেত্রে একটি অজুহাত খুঁজে বের করেছে। অজুহাতটি হলো ভারতের বর্তমান সেনাপ্রধান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের হয়ে অংশ নিয়েছিলেন। এই অজুহাতকে খাড়া করে আমাদের সেনাবাহিনীর নৈতিক ও মানসিক শক্তিকে জলাশয়ে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ভারতীয় সেনাপ্রধান আমাদের মুক্তিযুদ্ধে হয়তো ভূমিকা রেখেছিলেন। ভালো কথা। সে জন্য তাকে বিশেষ কোনো পুরস্কার কিংবা সনদ দিয়ে সম্মানিত করা যেতো। মানা করে কে? যদিও তা না করে বিএমএর পাসিং আউট প্যারেডে স্যালুট গ্রহণ করার জন্য তাকে আমদানি করা কেন? এসব কিসের আলামত! আমাদের সেনাবাহিনীর মান-সম্মান, আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা ধ্বংস করার জন্য আর কত নিচে নামবে এ সরকার জানি না। দেশে হচ্ছেটা কী?

‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিয়াছিল সে মরেনি।’ আর আমাদের সরকার ভারতের সেনাপ্রধানকে সনদ প্রদান অনুষ্ঠানেও স্যালুট গ্রহণের জন্য ব্যাক টু ব্যাক এলসিতে এনে প্রমাণ করলো, তাদের কাছে বাংলাদেশ নয়, বাংলাদেশের মানুষের মঙ্গল নয়, প্রধান ও একমাত্র নীতি ভারতের তোষণ, ভারতপ্রীতি এবং ভারতের মুখাপেক্ষী করে সব কিছু গড়ে তোলা। সেনাবাহিনীর শত্রু যদি কেউ থেকে থাকে, তবে তা ভারত নয়। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে যারা মানে না, তারাই হলো তাদের মূল টার্গেট। এই মেসেজটাই তারা সেনাবাহিনীকে দিতে চাচ্ছে।

এই পথ ধরেই তারা ধ্বংস করেছে বিডিআর, ভেঙে দিয়েছে সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড, ভারতের স্বার্থে উন্মুক্ত করে দিয়েছে করিডোর, ভারতীয় ফেনসিডিল ঢুকতে দিয়ে মৃত্যুর মুখে ছুড়ে দিয়েছে ১ কোটি তরুণকে।

প্রতিদিন ভারতের বিএসএফ-এর হাতে নির্মমভাবে নিহত হচ্ছেন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মানুষ। ফারাক্কা বাঁধ চুইয়ে এক ফোঁটা পানিও ঢুকতে পারে না এ দেশে। কল্লোলিনী মেঘনাকে হত্যার পর আয়োজন এখন টিপাইমুখকে ঘিরে। সমুদ্রসীমার বিরাট অংশ ভারতের অবৈধ দাপটের নিচে। আকাশ উন্মুক্ত করে দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি প্রতিদিন কোনো না কোনো ঘর থেকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে। বাংলাদেশের সৃজনশীল বইয়ের বাজার বহুদিন হলো ভারতকে অলিখিত ইজারা দেয়া হয়েছে। গার্মেন্টস শিল্পে লাগিয়ে রাখা হয়েছে ভয়াবহ অস্থিরতা। নানা অজুহাতে মিল ফ্যাক্টরি দেয়া হচ্ছে বন্ধ করে। ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোর অত্যাধুনিক মার্কেটের বিরাট অংশের মালিকানা নাকি বেনামে কিনে নিয়েছে ভারতীয়রা। তাতে শুধু ভারতীয় দ্রব্যই বিক্রয় হবে। হাজার হাজার সাংস্কৃতিক সংগঠনকে ঢালাও পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হচ্ছে – বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতির পাললিক প্রাণ ভোমরাটিকে হত্যা করার জন্য। সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের বিষয় চলে যাচ্ছে পাশ কাটিয়ে। লাখ লাখ ছেলেমেয়ে পড়াশুনার জন্য প্রতি বছর ছুটে যাচ্ছে ভারতে। খ্যাতি, প্রতিপত্তি, পুরস্কার ও স্কলারশিপের লোভে ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করছে দেশের সুশীলসমাজের সিংহভাগ অংশ। ধর্মের বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এখন আমাদের ফতোয়া দিচ্ছেন, এদেশের সংবিধানে আল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ইত্যাদি থাকবে কি থাকবে না। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মারেফাত তার গোয়েন্দা কার্যক্রম। সেই কার্যক্রমের পশ্চাৎদেশ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে ভারতের কাছে। সংস্থাগুলোর সাবেক প্রধানরা এখন আসামির কাঠগড়ায়।

বাকি ছিল শুধু সেনাবাহিনী। সেই সেনাবাহিনীর নতুন অফিসারদের, নতুন কর্মকর্তাদের মনের মধ্যে যাতে ভারতের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা, ভক্তি জন্ম নেয় – হয়তো তারই জন্য নিয়ে আসা হচ্ছে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধানকে। ভারতের আগের সেনাপ্রধান দীপক কাপুর মইন উদ্দিন মিয়ার মাধ্যমে অশ্বমেধ যজ্ঞের সূচনা করেছিলেন। এখন দেখার বিষয়, বর্তমান ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল বি কে সিং সেই যজ্ঞের রক্ত ও অগ্নিতে আমাদেরকে আর কতটুক আহুতি দেন। যে হাতে তিনি আমাদের অফিসারদের সালাম গ্রহণ করেছেন, সেই হাতেই তো লেগে আছে বাংলাদেশের নিরপরাধ মানুষের রক্ত।

SHARE

Leave a Reply