বিচার ও মিথ্যা সাক্ষ্য

শফিউল আহমাদ
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজজীবনে হরেক রকম মানুষের বাস। সুশীল-কুশীল, উৎপীড়ক-উৎপীড়িত, সবল-দুর্বল, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নিয়েই সমাজ। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও সাম্য সৃষ্টির লক্ষ্যে আইনকানুন আরোপ করা হয় মুসলিম সমাজ ও মুসলিমপ্রধান সমাজে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা বিধিবিধান আরোপ করেছেন।
আদর্শ মানব রাসূলুল্লাহ (সা) উন্নত সমাজের দিকনির্দেশনা বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করেছেন। বর্বর হিসেবে খ্যাত একটি সমাজ তাঁর আদর্শ অনুকরণে স্বীকৃত হয়েছিল সোনালি সমাজ হিসেবে। মারামারি-কাটাকাটি ছিল যাদের নেশা, তারা হয়ে গিয়েছিল গোটা বিশ্বের শান্তির দূত। কালান্তরে তাঁর উম্মাহ সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে আজ বিজাতীয়দের হাসির খোরাক হিসেবে চিহ্নিত। মুসলিম সমাজে মিথ্যা বলা, অপবাদ দেয়া, পরনিন্দা করা, মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা ছিল সম্পূর্ণ বর্জনীয় কাজ।
আজকের মুসলিম সমাজে এগুলো হয়েছে পালনীয় কাজ। তা দেখে ইবলিসও লজ্জায় মুখ ঢাকে। ইহুদি, খ্রিষ্টান, হিন্দু ও বৌদ্ধ সমাজ মুসলিমদের নিয়ে টিপ্পনি কাটে। এক মুসলিম যে অপর মুসলিমের ভাই, এ কথাটি মুসলিম সমাজে আজ তিরোহিত। শত্রুরা মুসলিমে মুসলিমে রেষারেষি সৃষ্টি করছে, অথচ আমরা বেমালুম তাদের থেকে প্রেরণা নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছি।
কে কার বড় হব, কাকে আঘাত করতে পারলে আমার দল ভারী হবে; সেই চিন্তায় আমরা বিভোর। এরই লক্ষ্যে অহর্নিশ আমরা দোষারোপ, অভিযোগ আরোপ, কুৎসা রটনায় নিমজ্জিত রয়েছি। চাই তা সত্য হোক আর মিথ্যা হোক। বাস্তবসম্মত হোক আর অবাস্তব হোক প্রতিপক্ষকে দামিয়ে রাখতে পারলেই যেন কেল্লা ফতেহ। রাজনৈতিক সুবিধা লাভের প্রশ্ন হলে তো আর কথাই নেই। এখানে নাকি সত্য-মিথ্যা বলতে কিছুই নেই।
রাজনীতির স্বার্থে সবই জায়েজ। এমন আচরণ অন্যদের হতে পারে, কিন্তু মুসলিমের জন্য কস্মিনকালেও মানায় না। আপনি রাজনীতি করুন আর না করুন, আপনার সামনে রয়েছে আখেরাত। যেখানে আপনার কৃতকর্মের কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব দিতে হবে। অভিযোগ তলিয়ে দেখা মুমিনের কাজ। যেকোনো মানুষকে দোষারোপ করার আগে তা পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করা মুমিনের কাজ, কেউ কোনো অভিযোগ করলেই তাতে কান না দিয়ে বিষয়টি তলিয়ে দেখার জন্য স্বয়ং আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছেÑ “হে মুমিনগণ যদি কোনো পাপাচারি তোমাদের নিকট কোনো অভিযোগ নিয়ে আসে, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে; যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো গোত্র বা দলকে ক্ষতিগ্রস্ত না করো এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।” (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)।
অনুমাননির্ভর দোষারোপ থেকে বিরত থাকা : মুমিনের গুণ হলো পরস্পরের প্রতি সুধারণা পোষণ করা। মতের অমিল হলেই কাউকে হেয় করতে কোনো মন্দ বিশেষণে বিশেষায়িত করা মুমিনের কাজ নয়। মুমিন সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ যাতে নষ্ট না হয় সে জন্য আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে সচেতন হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পরনিন্দা ও দোষত্রুটি তালাশের দ্বারা সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হয়। ফলে আল্লাহ তায়ালা তা এড়িয়ে চলতে আদেশ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছেÑ “হে মুমিনগণ, তোমরা বহুবিধ অনুমান থেকে বিরত থেকো। কারণ অনুমান কোনো ক্ষেত্রে পাপ এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় তালাশ কোরো না। একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা কোরো না।” (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)।
ইনসাফপূর্ণ বিচার : অভিযোগ যে কেউ করতে পারে। অভিযুক্ত হলেই কেউ দোষী সাব্যস্ত হয় না। সাক্ষ্যপ্রমাণ ও ইনসাফপূর্ণ রায়ের মাধ্যমে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে হয়। বিচারককে ইনসাফ কায়েমে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে রায় দেয়া থেকে বিরত থাকতে হয়। ন্যায়পরায়ণ বিচারককে রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর ছায়া হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘কিয়ামতের বিভীষিকাময় দিবসে আল্লাহ তায়ালা সাত শ্রেণীর মানুষকে তার আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। এদের প্রথম শ্রেণী হলো ন্যায়পরায়ণ বিচারক।’ (সহীহ বুখারি ও মুসলিম) কোনো দল বা গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হয়ে ন্যায়বিচার জলাঞ্জলি না দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং মহান আল্লাহ। ইরশাদ হচ্ছে- “কোনো গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন কখনো সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার করবে। এটি তাকওয়ার নিকটতর।” (সূরা মায়িদা, আয়াত : ৮)
“যখন তোমরা রায় প্রকাশ করবে তখন ইনসাফ করবে, তা স্বজন সম্পর্কে হলেও।” (সূরা আনাম, আয়াত : ১৫২)
“যখন তোমরা মানুষের মাঝে বিচারকাজ পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে।” (সূরা নিসা, আয়াত ৫৮) আরো ইরশাদ হচ্ছেÑ “যে ব্যক্তি ন্যায়ের নির্দেশ দেয় এবং যে আছে সিরাতে মুস্তাকিম বা সরল পথে।” (সূরা নাহল, আয়াত : ৭৬)
অন্যায় রায় দানকারী জাহান্নামি : ন্যায়পরায়ণ বিচারকের যেমন উচ্চমর্যাদা রয়েছে আল্লাহর দরবারে, তেমনি অন্যায় রায় প্রদানকারীর ভয়াবহ পরিণতির কথাও বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, বিচারকগণ তিন শ্রেণীর। এক শ্রেণী হলো জান্নাতি আর দুই শ্রেণী হলো জাহান্নামি। যে বিচারক সত্যকে জেনে সে অনুযায়ী রায় প্রদান করেন তিনি জান্নাতি। আর যে সত্য জেনে তা উপেক্ষা করে অন্যায় রায় প্রদান করেন তিনি জাহান্নামি। যে ব্যক্তি অজ্ঞতাপ্রসূত রায় প্রদান করে সেও জাহান্নামি।’ (সুনানু আরবায়া বরাত ফিকহুল ইসলামি ৫খ ৪৮৩)
বিচারকাজ খুবই দুরূহ। এর দায়িত্ব যার ওপর বর্তায় তাকে খুবই কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাকে সত্যের সম্মুখীন হতে গিয়ে ক্ষমতাধরদের বিরাগভাজন হতে হয়। তবুও বিচারককে বিচলিত হলে চলবে না। বিচারের বাণীকে নীরবে-নিভৃতে কাঁদানো যাবে না। বিচারকের দায়িত্ব হলো বিচারকাজে ন্যায়নিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া। বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যাকে মানুষের মাঝে বিচারকাজের জন্য নিয়োগ করা হয়, তাকে যেমন ছুরিবিহীন জবাই করা হয়। (তিরমিজি)।
মিথ্য সাক্ষ্য প্রদান : বিচারের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য প্রদান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিচারের রায় নির্ভর করে সাক্ষীর ওপর। সাক্ষীর ন্যায়পরায়ণতাকে আল্লাহ তায়ালা আবশ্যক করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে- “তোমাদের মধ্য থেকে দু’জন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখবে।” (সূরা তালাক, আয়াত : ২) সাক্ষী দিতে হবে কেবল আল্লাহকে খুশি করার নিমিত্তে। এতে কোনো গোষ্ঠীর অনুকম্পা পাওয়া কখনো কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। দুনিয়ার সুবিধা লাভের তো প্রশ্নই ওঠে না। ইরশাদ হচ্ছে- “আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তোমরা সাক্ষী প্রদান করো।” (সূরা তালাক) সাক্ষীদানের ক্ষেত্রে আদি-অন্ত সব কিছু খুলে বলতে হবে। কাউকে ঘটনায় ফাঁসানোর জন্য মতলবি বিবরণ দেয়া পাপ। ইরশাদ হচ্ছে- “তোমরা সাক্ষ্য গোপন কোরো না। যে কেউ তা গোপন করে তার অন্তর অপরাধী।” (সূরা বাকারা, আয়াত : ২৮৩)
গ্রহণযোগ্য হিসেবে স্বীকৃত এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রদান ধর্তব্য। মিথ্যাবাদী, প্রতারক ও পাপাচারি হিসেবে চিহ্নিত এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। ইরশাদ হচ্ছেÑ “সাক্ষীদের মধ্যে যাদের প্রতি তোমরা সন্তুষ্ট।” (সূরা বাকারা, আয়াত : ২৮২)
মিথ্যা সাক্ষ্য মহাপাপ : মানুষের পাপেরও শ্রেণী বিন্যাস রয়েছে। ছোট পাপ, বড় পাপ ও মহাপাপ। মিথ্যা সাক্ষ্য হলো মহাপাপের শ্রেণীভুক্ত। এ ছাড়া এতে মানবাধিকার বা হক্কুল ইবাদ জড়িত। মানুষ যা মাফ না করলে আল্লাহও মার্জনা করেন না। এ কারণে রাসূলুল্লাহ (সা) এ ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, দিবালোকের মতো কোনো ঘটনা সম্পর্কে অবহিত না হলে সাক্ষ্যদান থেকে বিরত থাকবে। বর্ণিত হয়েছে : তুমি দিবালোকের মতো অবহিত হলে সাক্ষ্য প্রদান করবে। অন্যথায় বিরত থাকবে। (আল-জামে, আল খাল্লাল বয়াত ফিকহুল ইসলামী ৬ খণ্ড ৫৫৯)
মিথ্যা সাক্ষ্যদানকে আল্লাহর সাথে শিরক করার নামান্তর বলে রাসূলুল্লাহ (সা) ঘোষণা করেছেন। বর্ণিত হয়েছে : রাসূলুল্লাহ (সা) ফজরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর মুসল্লিদের দিকে ফিরে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন আর বললেন, মিথ্যা সাক্ষ্যদানকে আল্লাহর সাথে শরিক করার সমতুল্য অপরাধ গণ্য করা হয়েছে। উক্তিটি তিনি তিনবার পুনর্ব্যক্ত করলেন। অতঃপর তিনি মহান আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী তেলাওয়াত করলেন- ‘সুতরাং তোমরা মূর্তিপূজার অপবিত্রতা বর্জন করো এবং মিথ্যা কথন থেকে দূরে থেকো।’ (আবু দাউদ, আস-সুনান, বিচার অধ্যায়, মিথ্যা সাক্ষ্য অনুচ্ছেদ- হাদিস নম্বর ৩৫৯৯, তিরমিজি হাদিস নম্বর ২৩১০)
নির্ভীক এক বিচারকের দৃষ্টান্ত : কাজী শুরায়হ ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে এক বিরল প্রতিভার অধিকারী বিচারপতি। হজরত উমর (রা) তাকে বিচারক নিয়োগ করেছিলেন এবং হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের শাসনকাল পর্যন্ত তিনি এ পদে আসীন ছিলেন। উমর (রা)-এর শাসনকালে এক ব্যক্তি খলিফার বিরুদ্ধে বিচারপ্রার্থী হয়, লোকটি হজরত উমরের বিরুদ্ধে কাজী শুরায়হের নিকট বিচার প্রার্থনা করে। বিচারটি ছিল একটি সওয়ারির ক্ষতি সাধন সম্পর্কে।
খলিফা সওয়ারিটি নিয়ে তা অপরকে আরোহণ করতে দিয়েছিলেন। এতে সওয়ারিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কাজী শুরায়হ উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনে আমিরুল মুমিনের বিরুদ্ধে রায় দিলেন। অর্ধ জাহানের খলিফা, যার নাম শুনলে সিংহহৃদয় পুরুষদের অন্তরে কম্পন শুরু হতো, তার বিরুদ্ধে বিচারের রায় চাট্টিখানি কথা! কিন্তু ইনসাফ ও ন্যায়ের পথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আমিরুল মুমিনীন এতে সামান্যতম কুণ্ঠা বোধ করেননি।
বিচারের রায় অম্লান বদনে মেনে নিলেন এবং বাদির দাবি অনুযায়ী প্রাণীটির ক্ষতিপূরণ প্রদান করলেন। আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে নিঃসঙ্কোচ আমিরুল মুমিনীন কাজী শুরায়হের সাহসিকতা দেখে তাকে স্থায়ী বিচারপ্রতি হিসেবে নিয়োগ দিলেন। একষট্টি কিংবা পঁচাত্তর বছর পর্যন্ত তিনি কুফায় বিচারপতির আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন। (ইসলামী বিশ্বকোষ ২৪ খণ্ড) এটি ছিল সৎ সাহসের নগদপ্রাপ্তি। বলা হয়, হজরত আলী (রা)-এর শাসনকালেও কাজী শুরায়হ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। একটি লৌহবর্ম নিয়ে জনৈক ইহুদির সাথে আলী (রা)-এর বিবাদ ছিল। কাজী শুরায়হের নিকট ইহুদি বিচার দায়ের করলে তিনি আলী (রা)-কে বিষয়টি অবহিত করেন। আলী (রা) বলেছিলেন আমার দাবির পক্ষে আমার ছেলে হাসান (রা) সাক্ষী রয়েছে। কাজী শুরায়হ তাকে জানিয়ে দিলেন- পিতার পক্ষে পুত্রের সাক্ষ্য গৃহীত হয় না। ফলে আপনার দাবি অগ্রাহ্য হলো। আল্লাহর ভয় যাদের অন্তরে রয়েছে তারা জাগতিক কোনো মহাক্ষমতাধরকে ভয় করে না। আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে ন্যায়নীতির পথে পরিচালিত করুন।

মিথ্যা একটি জঘন্য অপরাধ
মিথ্যা শুধু ইসলামেই জঘন্য পাপ নয়, বরং পৃথিবীর সব ধর্ম ও নীতিতেই মিথ্যা ভয়াবহ এবং জঘন্যতম অপরাধ বলে ঘৃণিত। সব পাপের মূল হচ্ছে মিথ্যা। এমন কোনো অপরাধ নেই যার ভেতর মিথ্যা উপস্থিত নেই। অথচ এই মিথ্যাকে পুঁজি করেই চলছে বর্তমান বিশ্ব শাসনব্যবস্থা। বর্তমান বিশ্বের সব প্রভাবশালী মিথ্যার হাতিয়ার দিয়ে নিরীহদের শোষণ করছে।
শুধু বর্তমান সময়ে নয়, ইতিহাসের পাতা দেখলে জানা যাবে অতীতেও ক্ষমতাবানেরা মিথ্যা চাপিয়ে দিয়ে সাধারণদের ওপর জুলুম চালাত। মিথ্যাচার সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, “আর যে ব্যক্তি নিজে কোনো অন্যায় বা পাপকাজ করে, অতঃপর কোনো নির্দোষ ব্যক্তির ওপর এর দোষ চাপিয়ে দেয় সে তো নিজের মাথায় বহন করে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য গুনাহ।” (সূরা আন্-নিসা, আয়াত : ১১২)
সমাজ, রাষ্ট্রে তথা সারা বিশ্বে মিথ্যা ভয়াবহ ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। যার কারণে কোথাও শান্তি নেই। অশান্তির দাবানল মানুষকে তাড়া করছে। মিথ্যার অগ্নিশিখায় সব কিছু গ্রাস করে নিয়েছে। এখন শিক্ষাব্যবস্থা মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত। শিক্ষার্থীদের জন্য মিথ্যা ইতিহাস তৈরি করে শেখানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেও একশ্রেণীর নির্বোধ, অন্ধ জাতি তৈরি হচ্ছে। মিথ্যার কুফল সমপর্কে শিক্ষার্থীদের তেমন কিছু শিখানো হচ্ছে না। যুগে যুগে মুনাফিকেরা ইসলামের বড় ক্ষতি করেছে।
মুনাফিকের অন্যতম লক্ষ্য মিথ্যা কথা বলা। আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় মিথ্যার কুফল সম্পর্কে পাঠ্যপুস্তকে তেমন কিছু না থাকায় মুনাফিকের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। মিথ্যার পক্ষশক্তি বর্তমান পৃথিবী শাসন করছে। এর ফলে যারা মিথ্যার বিরুদ্ধবাদী তথা ইসলামের পক্ষে যারা কাজ করে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যার পক্ষশক্তি নানা অদ্ভুত বানোয়াট অভিযোগ তৈরি করে চলছে। মিথ্যা আজীবন সত্যের বিরুদ্ধে। সত্য প্রতিষ্ঠিত হলে মিথ্যা হারিয়ে যেতে থাকবে। মিথ্যা দিয়ে স্থায়ী কোনো সত্য আদর্শকে ধ্বংস করা যায় না। মিথ্যা দিয়ে সাময়িক মানুষকে কিছু ক্ষতি করা যায়। তবে মিথ্যাবাদীদের পরিণতি কখনোই ভালো হয় না।
মিথ্যাচার সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে- হজরত আবু বাকারাতা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা নবী করিম (সা)-এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। হঠাৎ তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহের কথা বলে দেবো না? কথাটা তিনি তিনবার বললেন। অতঃপর তিনি বললেন, তা হচ্ছে আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া কিংবা কথা বলা। হুজুর (সা) হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় কথাগুলো বলছিলেন। হঠাৎ তিনি কথার গুরুত্ব উপলব্ধি করার নিমিত্ত সোজা হয়ে বসলেন এবং ওই কথাটি বারবার বলতে থাকলেন। এমনকি আমরা মনে মনে বলছিলাম আহ! হুজুর যদি এখন থেমে যেতেন। (সহীহ বুখারি, মুসলিম) মহানবী (সা) সত্য দিয়ে ইসলামের বিজয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি সর্বদা মিথ্যার বিরুদ্ধে কাজ করতেন। তাই আমাদেরও মিথ্যার বিরুদ্ধে নিরলস কাজ করে যেতে হবে। তবেই আমাদের মধ্যে শান্তি ফিরে আসবে।

জুলুমের পরিণাম
জুলুম বা অত্যাচার হলো কারো প্রতি অন্যায় আচরণ করা। এটা ব্যক্তির সম্পদ আত্মসাৎ, শারীরিক আক্রমণ বা সম্মানহানির মাধ্যমেও হতে পারে। বিদায় হজের সময় মহানবী (সা) বলেছেন, আজকের এই দিন, এই মাস এবং স্থান তোমাদের কাছে যেমন পবিত্র তেমনি তোমাদের একের জীবন, সম্পদ এবং সম্মানও অপরের কাছে পবিত্র।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসের অসংখ্য স্থানে জুলুমের ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা ইব্রাহিমে বলা হয়েছে, “জালিমদের কার্যকলাপের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে গাফেল মনে করো না। বস্তুত তিনি তাদেরকে সে দিন পর্যন্ত অবকাশ দিচ্ছেন, যেদিন দৃষ্টিসমূহ স্থির হয়ে যাবে এবং তারা মাথা ওপরের দিকে তুলে ছুটতে থাকবে। সেদিন তারা চোখের পাতা এক করতে পারবে না এবং তাদের অন্তরগুলো জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়বে।
আর মানুষদেরকে ভয় দেখাও সে দিনের, যে দিন তাদের ওপর আজাব এসে পড়বে এবং জালিমরা বলবে, হে আমাদের রব, আমাদের খানিকটা অবকাশ দিন যাতে আমরা আপনার আহ্বানে সাড়া দিতে পারি এবং রাসূলদের আনুগত্য করতে পারি। (তাদের বলা হবে) তোমরা কি ইতঃপূর্বে কসম করে বলনি যে, তোমাদের কখনো পতন নেই? অথচ তোমরা সেসব জাতির বস্তিসমূহে বসবাস করতে, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল এবং আমি তাদের সাথে কীরূপ আচরণ করেছি, তাও তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়েছিল।
তোমাদের শিক্ষার জন্য উদাহরণ পেশ করেছিলাম। তারা সব ধরনের চক্রান্ত করেছিল কিন্তু তাদের প্রতিটি চক্রান্তের উপযুক্ত জবাবের ব্যবস্থাও আল্লাহর কাছে ছিল, যদিও তাদের চক্রান্ত এতটা শক্ত ছিল যে, তাতে যেন পাহাড় টলে যাবে। তোমরা কখনো এমন ধারণা পোষণ করো না যে, আল্লাহ তার রাসূলের সাথে কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করবেন। নিশ্চয়ই পরাক্রমশালী এবং প্রতিরোধ গ্রহণকারী।” (আয়াত, ৪২-৪৭) আলোচ্য আয়াতগুলোতে একই সাথে জুলুমের কারণে অতীত জাতিগুলোর ভয়াবহ পরিণত ও যারা বর্তমানে জুলুম করছে, তাদের ভবিষ্যৎ পরিণতির বর্ণনা রয়েছে।
সূরা আরাফের ৪৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “সাবধান! অত্যাচারীদের ওপর আল্লাহর লা’নত।” সূরা শুরার ৪২ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, “জালিমরা যখন আজাব দেখবে তখন তুমি দেখবে তারা বলছে, (দুনিয়াতে) ফিরে যাওয়ার কোনো পথ রয়েছে কি?” পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই জালিমরা চিরস্থায়ী আজাবে নিমজ্জিত থাকবে।” মহানবী (সা) বলেছেন, ‘একজন মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই, সে তার ওপর জুলুম করতে পারে না ও জালিমের হাতে সোপর্দও করতে পারে না।’ (সহীহ বুখারি) অন্য হাদিসে এসেছে, ‘মুসলমান মুসলমানের ভাই।
সে তার ওপর না জুলুম করতে, না তাকে অসহায় অবস্থায় পরিত্যাগ করতে পারে ও না তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে। তিনি নিজের বুকের দিকে ইশারা করে বলেন, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে, তাকওয়া এখানে। কোন লোকের নিকৃষ্ট হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করবে। প্রত্যেক মুসলমানের জীবন, ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান প্রত্যেক মুসলমানের সম্মানের বস্তু। অর্থাৎ এর ওপর হস্তক্ষেপ করা হারাম।’ (সহীহ মুসলিম)
অপর হাদিসে এসেছে, ‘জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে।’ বুখারি শরিফের অপর একটি হাদিসে এসেছে, ‘মজলুম বা অত্যাচারিতের বদদোয়াকে ভয় করো। কেননা তার বদদোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই।’ আবু হুরায়রাহ (রা) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সমভ্রমহানি কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুমের জন্য দায়ী, সে যেন আজই তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয় সেই দিন আসার আগে, যেদিন তার কোনো অর্থ-সম্পদ থাকবে না।
সেদিন তার কোনো নেক-আমল থাকলে তা থেকে জুলুমের দায় পরিমাণ কেটে নেয়া হবে। আর যদি নেক আমল না থাকে তা হলে যার ওপর জুলুম করেছে, তার বদ আমল থেকে নিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হবে।’ (সহীহ বুখারি) বুখারি শরিফের অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি এক আঙুল পরিমাণ জমি অন্যায়ভাবে কেড়ে নেবে, সাত তবক জমির শৃঙ্খল তার গলায় পরানো হবে।’ এক হাদিসে জালিমকে সাহায্য না করার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি বাতিলের সাহায্যে সত্যকে পরাভূত করার জন্য জালিমকে অন্যায় সাহায্য করল, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জিম্মার বাইরে চলে গেল।’ (আল মুজামুসসগির)
ইসলামে জুলুম মস্তবড় অন্যায় বলে বিবেচিত। ইসলাম সব সময় জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ইসলাম বলেছে, আল্লাহর হক আদায় না করলে আল্লাহ ক্ষমা করলেও বান্দার হক বিনষ্টকারীকে আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন না যতক্ষণ না যার ওপর জুলুম করা হয়েছে, সে ক্ষমা করে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জুলুম নির্যাতন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
এ জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরই রুখে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো মুসলমানেরা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করছে। মিসর, সিরিয়া ও ইয়েমেন প্রভৃতি মুসলিম দেশগুলোতে সেই চিত্রই দেখা যায়। বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ, অথচ এ দেশেই এখন ইসলামের কথা বলা যায় না। দেশের ইসলামপ্রিয় ব্যক্তিদের ওপর চলছে নির্যাতনের স্টিম রোলার। মিথ্যা অজুহাতে আলেম-ওলামাদের ওপর যেমন শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে, তেমন মিডিয়ায় অপপ্রচারের মাধ্যমে তাদের মানহানি করা হচ্ছে। এ অবস্থায় যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করে, তাদের ঈমানী দায়িত্ব হলো এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। আর যারা জুলুম করছে, তাদের উচিত হবে এ অপকর্ম থেকে বিরত থাকা। অন্যথায় তারা আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবে না।

SHARE

Leave a Reply