বিজয়ের চেতনা: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি – সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

স্বাধীনতা প্রত্যেক জাতির জন্যই সবচেয়ে বড় অর্জন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয়ের মাধ্যমে। মূলত আমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ধারাবাহিকতার ফলই হচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যে প্রত্যাশা নিয়ে আমরা মরণপণ মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও প্রাপ্তির খাতা অনেকটাই শূন্য রয়ে গেছে। ফলে স্বাধীনতা ও মহান বিজয় আমাদের কাছে আজও পুরোপুরি অর্থবহ হয়ে ওঠেনি। পূরণ হয়নি মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য শহীদের স্বপ্নও। মুক্তিযুদ্ধ ও মহান বিজয়ের অন্যতম চেতনা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আজও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।
পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রই ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে সমঝোতা ও আলোচনার মাধ্যমে; বিনা রক্তপাতে। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে লাখো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে। মূলত মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। আমরা এমন এক স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার মূলনীতি হবে গণতান্ত্রিক। যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত হবে; অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিপীড়ন, ধর্মীয় ভেদাভেদ, বৈষম্যের অবসান ঘটবে। আমরা এমন এক ন্যায়ানুগ সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে সবার অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে; সকল প্রকার কুসংস্কার ও অশিক্ষা দূর হবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন, অনৈক্য, শ্রেণিবিশেষের অহমিকা ও ক্ষমতালিপ্সার কারণে আমাদের সে স্বপ্ন আজও পূরণ হয়নি।
যেসব কারণে আমরা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলাম এবং সেসব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করেছি, মূলত সেগুলোই হলো মুক্তিযুদ্ধ ও মহান বিজয়ের চেতনা। নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য রক্ষা ছিল এসবের অন্যতম। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে আত্মাহুতি এবং শুধু উর্দুর সঙ্গে বাংলা ভাষাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি আদায় এর দৃশ্যমান উদাহরণ।
আমরা সকল ক্ষেত্রে বৈষম্যেরও অবসান চেয়েছিলাম। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানিদের সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ ও কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করা হতো। তাদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ, অবিচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ ও বঞ্চনার ফলে পূর্ব পাকিস্তানিরা পাকিস্তানের অন্য নাগরিকদের তুলনায় নিজেদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করতে বাধ্য হতেন।
সঙ্গত কারণেই তখন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের জোরালো দাবি উঠেছিল। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সেই দাবি দমিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। একপর্যায়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানিদের কাছে এটা স্পষ্ট হয় যে, স্বকীয়তা রক্ষা, বৈষম্যের অবসান এবং নানা ধরনের সামাজিক অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্তির জন্য তাদের একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রকাঠামো প্রয়োজন; যার শাসন ও পরিচালন ভার নিতে হবে তাদের নিজেদের হাতে। সঙ্গত কারণেই আমরা অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তান ভূখণ্ডের পূর্ব পাকিস্তান অংশ আলাদা হয় এবং সেখানে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অভ্যুদয় ঘটে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমাদের দেশের নামকরণ করা হয় ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণের নিজেদের শাসন করার অধিকারসহ একটি সার্বভৌম ভূখণ্ড, যেখানে আমরা নিজেদের বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা নিয়ে সব ধরনের বৈষম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার পরিপন্থী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত থাকবো।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও তার ভিত্তিতে সৃষ্ট বাংলাদেশের দু’টি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, প্রথমত, বাংলাদেশ হবে জনগণের এবং জনগণের দ্বারা পরিচালিত দেশ; অর্থাৎ গণতান্ত্রিকভাবে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত দেশ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ হবে সব ধরনের বৈষম্যমুক্ত, অন্যায়, অবিচার ও শোষণমুক্ত; অর্থাৎ সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক দেশ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় এ চেতনার প্রভাব খুবই স্পষ্ট।
আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনার তৃতীয় প্যারায় বলা হয়েছে, ‘…..আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১-এ বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র, যাহা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত হইবে’। ‘৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্ব কার্যকর হইবে।’
সাংবিধানিকভাবেই বাংলাদেশ জনগণের দেশ; জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক। জনগণ নিজের দেশ নিজেরাই শাসন করার অধিকার সংরক্ষণ করে। সে কারণে সংবিধান অনুযায়ী জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে দেবে। এই প্রতিনিধিদের একটি অংশ তাদের হয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। অন্য অংশ জনগণের হয়ে সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যক্রমের ভুলত্রুটি তুলে ধরে শাসকদের জবাবদিহির ব্যবস্থা করবে। তারা বিভিন্নভাবে জনগণের মতামত তুলে ধরে শাসনকার্যে দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। জনগণ এ প্রতিক্রিয়া শুধু সরকার গঠনে নয়, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণে সক্ষম হবে।
এ পদ্ধতিকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার জন্য অবশ্যপালনীয় প্রথম শর্ত হলো, অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচন। এরপরই প্রয়োজন কার্যকর সংসদ ও একটি শক্তিশালী বিরোধী দল। মূলত গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত দেশে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রাধান্য লাভ করে এবং সম্পদের সুষম বণ্টন হয়; অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিষ্পেষণ হ্রাস পায়; মানবাধিকার, বাকবাধীনতা, সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।
গণতন্ত্র আমাদের স্বাধীনতা অন্যতম চেতনা ও সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি হলেও এক্ষেত্রে আমাদের অর্জন মোটেই সুখকর নয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সে অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। গণতন্ত্র ও অবাধ নির্বাচনের রক্ষাকবজ কেয়ারটেকার সরকারপদ্ধতি অনাকাক্সিক্ষতভাবেই বাতিল করা হয়েছে। আমাদের দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সবযাত্রা শুরু হয়েছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তামাশা ও ভাঁওতাবাজির নির্বাচনের মাধ্যমে। মূলত সে নির্বাচনে সকল আসনে নির্বাচনের তফসিল ও ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। ১৫৪ আসনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। যেসব আসনে নির্বাচন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে সেসব আসনে জনগণ ও প্রার্থীদের অধিকাংশের মতে ভোটারের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। এ ছাড়া অধিকাংশ প্রার্থী ও এলাকাবাসীর অনেকের মতামত বা অভিযোগ, নির্বাচনে প্রকৃত ভোট প্রাপ্তির সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, পূর্বনির্ধারিত ফলাফল অনুযায়ী ঘোষণা দেয়া হয়েছে। মূলত নির্বাচনটি ছিল সম্পূর্ণ প্রহসনমূলক।
মূলত ৫ জানুয়ারি নির্বাচন শুধু দেশে নয় বরং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের বিরোধীদলের বর্জনের এ নির্বাচনে চলছে সহিংসতা। তারা শিরোনাম করেছে, সহিংসতা আর বয়কটের মধ্য দিয়ে চলছে ভোট গ্রহণ। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে আগুন, ককটেল ও বোমা বিস্ফোরণ, সহিংসতা ও নিরাপত্তাবাহিনীর সরাসরি গুলিতে হতাহতের খবরও গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করছে সংবাদ মাধ্যমটি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী ফিন্যান্সিয়াল টাইমস অনলাইন সংস্করণে বলেছে, ভোটকেন্দ্র দখল, অগ্নিসংযোগ, ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের মধ্যে দিয়ে সকাল আটটা থেকে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিরোধী দলহীন এ নির্বাচন পরিণত হয়েছে সহিংসতা আর গ্রেফতারের নির্বাচনে। একই মত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি নিউজও।
কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা ‘বাংলাদেশর নিবার্চনে মৃত্যু’ শিরোনামে তাদের অনলাইন সংস্করণে বলেছে, এক তরফা এ নির্বাচনে পুলিশের সঙ্গে বিরোধীদের সংঘর্ষে কমপক্ষে ১১ জন নিহত হয়েছে। সহিংসতা হয়েছে কমপক্ষে এক হাজার ভোটেকেন্দ্রে। এই অবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিকে গভীর সংকটের দিকে নিয়ে যাবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েট প্রেস (এপি) বলেছে দেশজুড়ে ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ভোটকেন্দ্রে যাননি বেশির ভাগ ভোটার। তবে নিরুত্তাপ এ নির্বাচনে উত্তাপ ছড়িয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নির্বাচনের দিনেও ১৮-দলীয় জোটের কর্মীদের উপর ব্যাপক সহিংস আচরণ করেছে পুলিশ। বিরোধীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে তারা। এমনকি সকাল ৮ টায় ভোটগ্রহণ শুরুর পর কমপক্ষে ১০০টি ভোটকেন্দ্রে বিরোধীদের সঙ্গে পুলিশের সহিংসতা হয়েছে, যা নির্বাচনকে ‘প্রহসনের নির্বাচনে’ পরিণত করেছে। এ ছাড়া ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, জি নিউজ, পাকিস্তানে ডন, এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, চীনের সিনহুয়া গুরুত্বের সঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচনের খচর প্রচার করছে। বস্তুত, ৫ জানুয়ারির কথিত নির্বাচনে অধিকাংশ ভোটার ভোট দিতে পারেননি বা দেননি। জনগণ ক্ষমতার মালিক; জনগণ কাউকে তার ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য নির্বাচিত না করলে সেই ক্ষমতা ব্যবহার কখনোই নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয় না। কিন্তু গণতন্ত্র ও নির্বাচনের নামে এমন তামাশায় হয়েছে আমাদের দেশে। যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা বৈ কিছু নয়।
আমাদের দেশের গণতন্ত্র কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়নি। তবু ১৯৯১ সালের পর থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে জনমতের ভিত্তিতে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন সরকার ও সরকারি দল নিজেরাই নিজেদের ইচ্ছেমতো ফলাফল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। যার বাস্তব প্রমাণ গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন। সেই ‘মিড নাইট’ নির্বাচনের ভোটারদের ভোট দেয়ার প্রয়োজন হয়নি বরং আগের রাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাক্স ভর্তি করা হয়েছে। ফলে গণতন্ত্রের প্রধানতম সুফল, জনগণের ইচ্ছানুযায়ী শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর এখন শুধু নাগালের বাইরেই নয় এবং এখন রীতিমত স্বপ্নবিলাসেও পরিণত হয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় জনগণের মতামতের তোয়াক্কা না করে এক দলের ও ব্যক্তির শাসন চিরস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, যা শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী নয় বরং সংবিধানের সাথেও সাংঘর্ষিক।
মূলত গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও দেশ-বিদেশের কোনো মহলের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। এই নির্বাচন সম্পর্কে ভারতের কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এর মূল্যায়ন হলো, ‘২৮৮ আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট জয়লাভ করলেও বিরোধীরা ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে মহাজোটের সমর্থকদের বাধার মুখে লোকজন ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেনি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রধান বিরোধী জোটের নেতা এই নির্বাচনকে প্রহসন উল্লেখ করে তা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে। অনেক পোলিং এজেন্ট জানিয়েছে তারা ভয়ে কেন্দ্র থেকে দূরে ছিলেন। আবার অনেকে অভিযোগ করেন তাদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।….. এমনকি ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ব্যালটে সিল মেরে ব্যালটবাক্স ভরাট করেছে। একজন নারী ভোটার দাবি করেন, পুলিশ তাদের স্বাধীনভাবে ভোট দিতে দেয়নি। পুলিশ বলেছে যদি নৌকায় ভোট দেয় তাহলেই কেবল ভোট দিতে পারবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনার ক্ষমতা দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং দেশটি একদলীয় শাসনে পরিণত হতে চলেছে।
বাংলাদেশ একটি গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবে শাসনকার্যে জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই; গণতন্ত্র বিপন্ন; যা মুক্তিযুদ্ধ ও মহান বিজয়ের চেতনার পরিপন্থী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য বৈষম্যমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিষ্পেষণমুক্ত সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ। আমাদের দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি ও দুর্নীতির ক্রমবিকাশ এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত ও সমালোচিত হতে দেখা যাচ্ছে।
গণতন্ত্রহীনতা ও সুশাসনের অভাবেই আমাদের দেশে বৈষম্য স্থায়িত্ব লাভ করেছে। দলীয়করণের ব্যাপক প্রভাবে বর্তমানে সরকারদলীয় ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য নাগরিকদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা, চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি সম্ভব হচ্ছে না বলে জনগণের উপলব্ধি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে বা অন্য সরকারি দপ্তরসমূহে, প্রশাসনে সরকারদলীয় লোকজনের জন্য সুবিধাজনক পৃথক ব্যবস্থা। স্পষ্টত, সাধারণ মানুষ ও সরকারদলীয় ব্যক্তিদের মধ্যে নিয়মনীতি ও আইন প্রয়োগে ব্যাপক পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ লক্ষ করা যায়।
ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে চেহারা, পোশাক-পরিচ্ছদের কারণে বৈষম্যের অভিযোগ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় শুধু নয়, সাধারণ নাগরিকদের মধ্য থেকেও শোনা যায়। কাজেই বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠনে যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বস্তুত, বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিকামী। মুক্তির চেতনা বাস্তবায়নে তারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে, যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকে। মানুষ এখনো অপেক্ষায় আছে। তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তারাই, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে সক্রিয়।
মূলত ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও শাহাদাতের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা হারিয়েছিলাম। এরপর প্রায় দু’শ বছর পর্যন্ত আমাদেরকে ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়েছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে আমরা স্বাধীনতা লাভ করে পেয়েছিলাম পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র। কিন্তু আমাদের ভাগ্য মোটেই সুপ্রসন্ন ছিল না। তাই পাকিস্তানি শাসনের প্রায় পুরোটা জুড়েই আমাদেরকে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। স্বাধীনতা বলতে যা বোঝায় তা পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রায় ক্ষেত্রেই ছিল অনুপস্থিত। অধ্যাপক লাস্কি (Laski) স্বাধীনতা সংজ্ঞা দিয়ে বলেন, ‘By liberty I mean the eager maintenance of the atmosphere in which men have the opportunity to be their best selves’ অর্থাৎ ‘স্বাধীনতা বলতে আমি সে পরিবেশের সাগ্রহ সংরক্ষণ বুঝি, যা দ্বারা মানুষ তার শ্রেষ্ঠ সত্তা উপলব্ধি করার সুযোগ পায়’। তিনি সদ্য স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে এসবের তেমন কোন প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়নি।
এ বিষয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ফলাফল বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সে নির্বাচনে বিজয়ী দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। তাই গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় জন্য আমাদেরকে মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। মূলত মুক্তিযুদ্ধের জন্য এই নির্বাচনী বিজয়ই আমাদের দিয়েছিল এক অনন্য সাধারণ যৌক্তিক ও নৈতিক ভিত্তি। আর সে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই রচিত হয়েছে স্বাধীনতা ও বিজয়ের সৌধ, যা আমাদের জাতীয় জীবনের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই উভয় অংশের মধ্যে নানাবিধ বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই বৈষম্য ছিল আকাশ-পাতাল ব্যবধানে। রপ্তানিতে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও দেশের পূর্ব অংশে বিনিয়োগ ছিল বেশ বৈষম্যমূলক। বড় ও ভারী শিল্পকারখানা প্রায় সবই গড়ে তোলা হলো পশ্চিম অংশে। সরকারি চাকরি ও সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও ছিল ব্যাপক বৈষম্য। এর রাজনৈতিক প্রতিফলন দেখা দেয় শেখ মুজিবের ছয় দফায়। ছাত্রদের ১১ দফা দাবিতে এই বৈষম্য ঘোচানোর দাবি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে স্বাধিকারের দাবি জোরালো ভিত্তি পায়। এক সময় তা মুক্তি সংগ্রামে রূপ নেয়।
সাম্য, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, সামাজিক ন্যায়-বিচার, অর্থনৈতিক শোষণ ও সাংস্কৃতিক গোলামি থেকে মুক্তি লাভের জন্যই এদেশের আপামর জনসাধারণ ৯ মাসের মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেয়েছিল। কিন্তু যে প্রত্যাশা নিয়ে পিন্ডির গোলামির শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম সে স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। উদার গণতন্ত্র, সাম্য, আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলেও দেশে প্রচলিত নেতিবাচক রাজনীতির কারণেই সে ফসলগুলো ঘরে তুলতে পারিনি বরং বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর উচ্চাভিলাষকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বানানো হয়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক, সুখী, সমৃদ্ধ, শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয় নিয়েই আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ক্ষমতালিপ্সা, অপরাজনীতি ও অহমিকার কারণে আমাদের স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হলেও সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বরং অর্জন যৎসামান্যই বলতে হবে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যখন পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করা উচিত ছিল তখন ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত বা চিরস্থায়ী করার জন্য যা যা করা দরকার তাই করেছে। পরিকল্পিতভাবে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে বহুধাবিভক্ত করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা হয়েছে। যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা বলে দেশের মানুষকে মরণপণ যুদ্ধে ঠেলে দেয়া হয়েছিল সে গণতন্ত্রই তাদের কাছে আর নিরাপদ থাকেনি বরং স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে যতবারই রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে সকল ক্ষেত্রেই তা ছিল গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে কেন্দ্র করেই।
স্বাধীনতার পর দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুন্ন রাখা সম্ভব হয়নি রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও নেতিবাচক রাজনীতির কারণেই। স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকার নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতেই সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একদলীয় শাসন কায়েম করেছিল। The Newspaper (Announcement Of declaration) Act-1975 মাত্র ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত পত্রিকা রেখে সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে ব্যর্থতার কারণেই আমাদের মুক্তিসংগ্রামের সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারের অগণতান্ত্রিক মানসিকতার কারণেই সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ধারা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পর ১৯৯৬ সালে দেশের নির্বাচন পদ্ধতির বিষয়ে একটি সমঝোতায় আসলেও ক্ষমতাসীনদের অবৈধ ক্ষমতালিপ্সার কারণই সে অর্জনও আমরা ধরে রাখতে পারিনি। রাজনীতিকদের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে আমরা কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন, জীবনমান, সুশাসন ও নিরাপত্তা লাভে সমর্থ হইনি। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাও বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০০৮ সালে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় এসে সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে গণতন্ত্র, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের রক্ষাকবজ কেয়ারটেকার সরকারপদ্ধতি বাতিল করে দেশে রাজনৈতিক সঙ্কটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। যা ক্ষমতাসীনদের আদর্শিক দেউলিয়াত্বই প্রমাণ করে।
নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকারপদ্ধতি বাতিল করতে সংবিধান সংশোধন করা হলেও এ বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর কোনো মতামত গ্রহণ করা হয়নি। ফলে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে এবং একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতাসীন হয়েছে। আবার গত বছরের ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে তারা অতীতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান চেতনা ‘গণতন্ত্র’ ক্ষমতালিপ্সার শেকলে বন্দী।
সঙ্গত কারণেই আমাদের দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখন খাদের কিনারে। আর এজন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল ক্ষমতাসীনদেরই দায়ী করছেন। পরমত সহনশীলতা গণতন্ত্রের মূল উপাদান। মূলত প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক তিন ধরনের অধিকার ভোগের নিশ্চয়তা পায় : ১. সামাজিক অধিকার, ২. রাজনৈতিক অধিকার এবং ৩. অর্থনৈতিক অধিকার।
সামাজিক অধিকার: জীবন ধারণের অধিকার. ২. ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার, ৩. মতপ্রকাশের অধিকার, ৪ সভা-সমিতি করার অধিকার, ৫. সম্পত্তি ভোগের অধিকার, ৬. ধর্মীয় অধিকার, ৭. আইনের অধিকার, ৮. চুক্তির অধিকার, ৯. ভাষার অধিকার, ১০. পরিবার গঠনের অধিকার ও ১১. শিক্ষা লাভের অধিকার।
রাজনৈতিক অধিকার: ভোটাধিকার, ২. প্রার্থী হওয়ার অধিকার, ৩. অভিযোগ পেশ করার অধিকার, ৪. সমালোচনার অধিকার, ৫. চাকরি লাভের অধিকার ও ৬. বসবাসের অধিকার।
অর্থনৈতিক অধিকার: কাজের অধিকার, ২ উপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভের অধিকার, ৩. অবকাশ যাপনের অধিকার, ৪. সংঘ গঠনের অধিকার ও ৫. রাষ্ট্র প্রদত্ত প্রতিপালনের অধিকার ইত্যাদি।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকে যেসব অধিকারের স্বীকৃত সরকার সে নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। অথচ এসব অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই সাংবিধানিক দায়িত্ব। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র জনগণের শাসন, শাসকগোষ্ঠীর জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে সরকার মোটেই গুরুত্ব না দিয়ে তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্যই গণতান্ত্রিক সকল রীতিনীতি উপেক্ষা করছে যা আমাদের জন্য রীতিমতো অশনি সঙ্কেত। মূলত শাসনকার্যে জনগণের সম্পৃক্ততা উপেক্ষা করে দেশকে এগিয়ে নেয়া মোটেই সম্ভব নয়। আমাদের দেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শাসনকার্যে জনগণের অংশগ্রহণ শুধু কাগজে-কলমেই রয়েছে। ফলে জনগণ অনেকটাই রাজনীতিবিমুখ হতে শুরু করেছেন। আর রাজনীতি সম্পর্কে উদাসীন কোন জাতিকে নিয়ে একবিংশ শতাব্দীর বৈশি^ক চ্যালেঞ্জ তো দূরের কথা অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।
অধ্যাপক লাস্কির (Laski মতে, ‘Liberty is the organization of resistance to abuse.’ অর্থাৎ ‘কদাচারের প্রতিরোধের সংগঠনই স্বাধীনতা’। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আমরা এখনও কদাকার মুক্ত হতে পারিনি। মূলত নেতিবাচক ও বিভেদের রাজনীতির কারণে আমরা অনেক পিছিয়েছি। বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র যখন সামনের দিকে এগিয়ে চলছে, তখন আমরা নিজেরাই আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছি। আমরা যে প্রত্যাশা নিয়ে পিন্ডির গোলামি থেকে মুক্তি লাভের জন্য মরণপণ যুদ্ধ ও বিজয় অর্জন করেছিলাম প্রতিহিংসা ও অপরাজনীতির কারণে এর সুফল আমরা ঘরে তুলতে পারিনি।
মুক্তিসংগ্রাম ও মহান বিজয়ের অন্যতম চেতনা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আজও বিকশিত হতে পারেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থধারার রাজনীতি চর্চার সংস্কৃতি এখনও গড়ে ওঠেনি। যে প্রত্যাশা ও স্বপ্ন নিয়ে আমরা মুক্তি সংগ্রামে মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম তা প্রায় ক্ষেত্রেই আমাদের কাছে অধরায় রয়ে গেছে। ক্ষমতাসীনদের অতিমাত্রায় ক্ষমতা লিপ্সায় আমাদের দুর্ভাগ্যের অন্যতম কারণ। তাই আমাদের স্বাধীনতা ও মহান বিজয় পুরোপুরি অর্থবহ হয়ে ওঠেনি বরং মহান বিজয়ের স্বপ্নে ছন্দপতন ঘটেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার খুব একটা সুযোগ থাকছে না।
লেখক : কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply