বিজয়ের প্রয়োজনে সময়ের দাবী -ডা. শফিকুর রহমান

মানবজাতিকে আল্লাহ তায়ালা তার খেলাফতের জন্য বিশেষভাবে বাছাই করে নিয়েছেন। এটাতে আল্লাহ তায়ালা অন্য কোনো সৃষ্টিকে শরিক করেননি। খালেছভাবে শুধু মানুষকে। মানুষ আল্লাহ তায়ালার প্রতিনিধি হিসেবেই দুনিয়াতে দায়িত্ব পালন করবে। এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমরা ‘আলাস্তু বিরাব্বিকুম’ এর জবাবে বলেছিলাম ‘বালা’। এই বালা বলনেওলারাই আমরা আছি এখন দুনিয়ায়। অতীতে বহুলোক চলে গিয়েছেন। সামনে আরো অনেকে আসবেন। অতীতের লোকেরা যেমন চিরদিন বাঁচে নাই, আমরাও চলে যাবো। আমরাও এখানে থাকবো না।

এই যে যাওয়া আসার পালা, এটা কী জন্য? এই জায়গাটা আল্লাহ তায়ালার বান্দাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটার ওপরই নির্ভর করবে অনন্ত দিনে বাকি সমস্ত ফলাফল পাওয়া। আমরা হয় কামিয়াব হবো, না হয় নাকাম হবো। হয় জান্নাতবাসী হবো, না হয় জাহান্নামবাসী হবো। আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামবাসী হওয়ার হাত থেকে আমাদের হেফাযত করুন।

আল্লাহ তায়ালা জান্নাত ও জাহান্নামের রাস্তা, মুক্তি ও ধ্বংসের রাস্তা, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির রাস্তা, কল্যাণ ও অকল্যাণের রাস্তা সব একেবারের পরিস্কার করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ তাঁর বিধান কুরআনুল কারিম নাজিলের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতা দান করেছেন। সূরা আল মায়েদার তিন নম্বর আয়াত আমরা সকলেই জানি। الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের জীবন যাপন প্রণালীকে আমি পরিপূর্ণ করে দিলাম। আমার নিয়ামতকে পূর্ণতা দান করলাম। ইসলামকে সকলের জন্য আমার মনোনীত জীবন বিধান হিসেবে কবুল করে নিলাম”। এর বাইরে যা থাকবে তার কিছুই কবুল হবে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই আয়াতের মধ্য দিয়ে মানবজাতির প্রতি বড় এহসান করেছেন, বড় মহব্বত করেছেন। তিনি যেমন আমাদেরকে পথ দেখিয়েছেন তেমন আমাদের ওপর তার রহমত বর্ষণ করেছেন, তাঁর নেয়ামত বর্ষণ করেছেন। এবং বলেছেন এটা কুরআনেই পাওয়া যাবে, কিতাবুল্লায় পাওয়া যাবে। এখন এই কিতাবুল্লাহ হচ্ছে গাইড বুক। গাইডের বাস্তব ওস্তাদ কে? তাও আল্লাহ তায়ালা আমাদের সামনে তাঁর নবীকে হাদিয়া করে দিয়ে বললেন, وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ “হে নবী! নিশ্চয় তোমাকে সর্বোত্তম চরিত্র ও মহত্ত্ব দিয়ে পয়দা করেছি” (সূরা কলম : ৪)। সুতরাং দুনিয়াতে সর্বোত্তম চরিত্রের নমুনা আল্লাহ তায়ালা সার্টিফাই করেছেন তিনি হচ্ছেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.।

আর মানব জাতিকে আল্লাহ তায়ালা বলে দিলেন, لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ (সূরা আহযাব : ২১)। তাহলে উস্তাদ আমরা পেয়ে গেলাম। আল্লাহর নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. নিজের ব্যাপারে একই কথা বলেছেন। ‘আমাকে পাঠানো হয়েছে মুয়াল্লিম করে’। ওস্তাদ করে। আমি মানবতাকে আল্লাহ তায়ালার গোলামী শিক্ষা দেবো, দুনিয়ার ডিসিপ্লিন শিক্ষা দেবো, কল্যাণের শিক্ষা দেবো। অকল্যাণের ব্যাপারে সতর্ক করবো এই জন্য আমাকে পাঠানো হয়েছে। আমি বাশির ও আমি নাজির। যারা কল্যাণের পথে হাঁটবে তাদেরকে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও জান্নাতের সুসংবাদ দেবো। যারা উল্টা পথে হাঁটবে তাদেরকে আমি আল্লাহ তায়ালার গজব, আজাব ও জাহান্নামের ভয় দেখাবো। এই দুই দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালা আমাকে দিয়েছেন।

সম্মানিত ভাইয়েরা! আল্লাহ তায়ালাকে বলে আসলাম, ও রব! তোমাকে আমরা রব হিসেবে মানি। ও আল্লাহ তোমাকেই আমরা রব হিসেবে মানি, আর কাউকে না। কিন্তু দুনিয়ায় আসার পরে শয়তান আমাদেরকে ভুলায়, লোভ দেখায়, ভয় দেখায়। লোভ এবং ভয়ের মাঝখানে ফেলে আমাদেরকে অনেক সময় এলোমেলো করে দেয়। আমাদেরকে নষ্ট করে দেয়। সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে সরিয়ে দেয়। এ অবস্থায় আল্লাহর ওপর যাদের তাওয়াক্কুল আছে, যারা হিকমা এবং হিম্মত ও তাওয়াক্কুল আ’লাল্লাহকে সম্বল করে সামনের দিকে এগিয়ে যায় আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সাহায্য করেন। এটা আল্লাহর ওয়াদা। আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহর দ্বীন মেনে সামনের দিকে যারা আগাবে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সাহায্য করবেনই। দুনিয়াতেও আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে গালিব করবেন অপশক্তির ওপরে, আর আখেরাতে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে নাজাত দিবেন জাহান্নামের আগুন থেকে।

সম্মানতি ভাইয়েরা! এই ছোট্ট জীবনে খুব বেশি সময় আমাদের হাতে নাই। আল্লাহ তায়ালা সূরা মূলকের ২য় আয়াতে বলেছেন,الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۚ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ তোমাদেরকে মওত দিয়েছি, হায়াতও দিয়েছি। তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো যাতে কে কত উত্তম আমল করে সেটা আমি দেখতে চাই। আমলে সালেহ কে করো? নিজের অন্তরকে হিংসা থেকে মুক্ত রাখো? খালেছ দিলে কে আমার গোলামী করো? মুখে যা বলো বাস্তবে তা বিশ্বাস করো কে? ফিকির, জিকির ও আ’মল এই তিনটিকে কারা তোমরা এক লাইনে নিয়ে এসেছো? এটা আমি দেখতে চাই। মওত ও হায়াতের মধ্যেকার সময় সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, এটা হচ্ছে চোখের দুই পাতা বন্ধ করার সময়। এটিই দুনিয়ার জীবন। চোখের পাতা বন্ধ করতে কত সময় লাগে? এতো কোনো সময়রই ব্যাপার না।

আর রাসূলে করীম সা. বলেছেন, এটা হচ্ছে মহাসমুদ্রে আঙ্গুল চুবায়ে আবার বের করে আনার মতো। ওই বের করে আনলে আঙ্গুলের মাথায় যে পানি লেগে থাকবে এটি হচ্ছে দুনিয়ার জীবন আর মহাসমূদ্রের মধ্যে যেটা পড়ে রয়েছে সেটা হচ্ছে আখেরাতের জীবন। সেই মহাসমুদ্র আমাদের পাড়ি দিতে হবে না ভাই? মহাসমুদ্র পাড়ি দিতে হলে জাহাজের টিকিট কাটতে হবে না? এটা তো কেনাই লাগবে। এটা কিনতে হবে নিজের আমল দিয়ে, স্যাক্রিফাইস দিয়ে। আল্লাহর পথে জানমালের কুরবানি দিয়ে। যে যত বেশি করবো নিজের জন্যেই করবো। এটা অন্যের খাতায় যুক্ত হবে না। হ্যাঁ হবে আমার মা-বাবা যদি আমাকে তালিম দিয়ে যান। আর আমি যদি বাবা-মায়ের নেক তালিমের পথ ধরে মহান আল্লাহ ও তাহার রাসূলের মাকসুদ পানে চলি তাহলে এখান থেকে আমার মা-বাবাও উপকৃত হবেন। আমি হবো তাদের জন্য সদকাতুল জারিয়া।

অনুরূপভাবে আমরা যদি নেক আওলাদ রেখে যাই তাহলে আমাদের সন্তানরা হবে সদকাতুল জারিয়া। এই সদকাতুল জারিয়ার সিলসিলা জারি রাখার জন্যেই কুরআনের পথে আমাদের হাঁটতে হবে, স্বপরিবারেই হাঁটতে হবে। আমার বউ বাচ্চা সবাইকে নিয়েই হাঁটতে হবে। আল্লাহ তায়ালাও বলে দিয়েছেন, হে মুসলমানরা! তোমরা কী করবা? ঈমানদারগণ তোমরা তোমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। আর বাঁচাও তোমাদের আপনজনকে।

সেই প্রিয়জন বা আপনজন কে হবে? আমার আব্বা-আম্মা হবে, আমার ছেলে-মেয়েরা হবে, আমার ভাই-বোন হবে, আমাকে যারা মহব্বত করে আমার দ্বীনের সাথীরা হবে, আমার কর্মস্থলের সঙ্গীরা হবে, আমার আহল, পাড়া-প্রতিবেশী যারা তারা হবে। সুতরাং অনেক মানুষের হক আমাদের ওপরে রয়েছে। আমরা যদি জাহান্নামের আগুন থেকে একা বাঁচতে চাই পারবো না। একটা পরিবেশ আমার লাগবে। এই জন্যে দেশে ইসলামী শাসন প্রয়োজন। আমরা তো ওখানে মন্ত্রী মিনিস্টার, এমপি হয়ে মানুষের মাথার ওপর ছড়ি ঘুরাতে চাই না। আমরা নিজেদের আখের গুছাতে চাই না। আমরা কী চাই? আমরা চাই আল্লাহর জমিনে কুরআনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক। কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলুল্লাহর শাসন জারি হোক। তাতে করে মানুষ দুনিয়ায় থাকা অবস্থায় বেহেস্তের আমেজ পাবে, ইজ্জত পাবে, মানুষ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করার প্রয়োজন হবে না। মহান আল্লাহ ছাড়া কারো গোলামি করবে না। গোলামী-দাসত্ব করবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার। যে কথাটা মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা বনী ইসরাইলের ২৩ নম্বর আয়াতে বলেছেন। তোমাদের রব তোমাদের হুকুম করছেন। তোমরা শুধুমাত্র তোমাদের রবের বন্দেগী করবে, ইবাদত করবে, গোলামী করবে। আর কারো নয়।

সম্মানিত ভাইয়েরা! এভাবে পাতায় পাতায় আল্লাহ তায়ালা তাঁর গোলামী করার জন্য মানবতাকে নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশ যারা মেনেছে তারা একটা মাত্র সম্মানিত সত্ত্বার গোলাম হয়েছে। আর যারা এই নির্দেশ মানে নাই তারা আল্লাহর গোলামী বাদ দিয়ে অসংখ্য দুর্বলের গোলাম হয়েছে। আল্লাহর সাথে শের্ক করেছে। চিন্তার শের্ক, কথার শের্ক ও কাজের শের্ক। আল্লাহ তায়ালা শের্কের নাপাকি থেকে আমাদেরকে মুক্ত রাখুন।

সম্মানিত ভাইয়েরা! আমাদের এই প্রিয় সংগঠনটি শহীদদের রেখে যাওয়া একটা আমানত। তারা একটা স্বপ্ন বুকে নিয়ে কাজ করেছেন। সেই স্বপ্নটা হচ্ছে তারা আল্লাহর জান্নাতে আমাদের সকলকে নিয়ে পৌঁছতে চান। তারা একটা স্বপ্ন নিয়ে কাজ করেছেন। ওই জান্নাতে যাওয়ার পথে প্রথম মনজিল হিসেবে বাংলাদেশকে দ্বীনের বাগানে পরিণত করতে চান। সেই বাগানের চারাগাছ আপনি আমি সবাই, এখানে যারা আছি। ছাত্রজীবনে অনেকেই কন্ট্রিবিউশন রেখেছেন। জানপ্রাণ দিয়ে দিবারাত কাজ করেছেন। কিন্তু কর্মজীবনে এসে অনেকে শিথিল হয়ে গিয়েছেন। ভাইয়েরা এই শিথিলতা আপনার আমার জীবনে কোনো কল্যাণের জিনিস নয়। শয়তান যে আমাদের ক্ষতি করার অঙ্গিকার ব্যক্ত করেছিল আল্লাহর সামনে ধৃষ্টতাপূর্ণভাবে, এটি তার কাজ। সে আমাদেরকে লোভ দেখায়, ভয় দেখায়। আমাদেরকে নিরাশ করে। এভাবে দ্বীনের পথ থেকে আমাদেরকে পিছিয়ে রাখে। এটা তার বিজয়।

আমরা অঙ্গিকার করবো আমরা শয়তানকে পরাজিত করে এক আল্লাহর গোলামী করবো ইনশাআল্লাহ। আমাদের ওপরে শয়তানের কোনো কৌশলকে বিজয়ী হতে দিবো না। এজন্য যে ভাইয়েরা জীবনে একবার قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ বলে শপথ নিয়েছিলেন ছাত্র জমানায়, আমার সেই ভাইগুলোর জন্য আমি প্রাণভরে দোয়া করি। আল্লাহ তায়ালা তাদের দিলকে তাঁর রহমতের ফোটা দিয়ে শীতল এবং উর্বর করে দিন। তারা যেনো আরেকবার হিম্মতের সাথে এগিয়ে এসে জীবনের একটা চূড়ান্ত অঙ্গিকার গ্রহণ করতে পারে এই শপথের মধ্য দিয়ে। ইনশাআল্লাহ শহীদ নেতৃবৃন্দের রেখে যাওয়া আমানত আমরা এই কাঁধে বহন করে চলবো এবং আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে দ্বীনের বিজয় অর্জন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাবো। আল্লাহ তায়ালা এই ভাইদেরকে কবুল করুন। যারা এই কোরবানীর শপথ জীবনে নিতে পারেননি তাদের জন্য প্রাণভরে দোয়া করি শপথের মজাটা তাদেরকে দান করুন। এই শপথ নিয়ে যেনো তারা সৌভাগ্যবান হতে পারেন। জান্নাতের পথে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে তারা এগিয়ে যেতে পারেন।

প্রিয় ভাইয়েরা আমাদের এই দেশে সবকিছু ব্যর্থ হয়েছে। এখন ইসলাম সফল হওয়ার সময় এসেছে। এখন ঘুমাবার সময় নয়, হেলায় সময় কাটাবার সময় নয়। এখন নিজেদেরকে প্রস্তুত করে আগামী দিনের সংগ্রামের জন্য শক্ত হয়ে মজবুত হয়ে দাঁড়ানোর সময়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তৌফিক দান করুন। আমাদেরকে দ্বীন বিজয়ের এ মহান কাজের জন্য খালেছ ভাবে কবুল করুন। আমীন।।

লেখক : রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক

SHARE

Leave a Reply