বিজয়ের মাসে বিশেষ ভাবনা -এবনে গোলাম সামাদ

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার বলছে, প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন না, আসলে প্রকৃত ইতিহাস কিভাবে জানতে হবে। একটা বিষয়কে মনে করা যায় স্বতঃসিদ্ধ। তা হলো, আজকের বাংলাদেশের উদ্ভব হতে পেরেছে পাকিস্তান আন্দোলনের ফলে। পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তি ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদ, যা গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশ শাসনামলে এই উপমহাদেশের বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। ইসলাম একটি আন্তর্জাতিক ধর্ম। এই উপমহাদেশ তার উদ্ভবভূমি নয়। কিন্তু যে বিশেষ মুসলিম জাতীয়তাবাদকে নির্ভর করে এই উপমহাদেশে পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হতে পেরেছিল তার জন্ম হয়েছিল এই উপমহাদেশেই। ধর্ম হিসেবে ইসলাম আর মুসলিম জাতীয়তাবাদ একই আবেগের ফল নয়। মুসলিম জাতীয়তাবাদ ছিল একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। ঠিক ধর্মীয় বাস্তবতা নয়। যারা পাকিস্তান আন্দোলন করেছিলেন তারা সকলেই ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত। কোনো মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিক পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করেননি।
সাবেক পাকিস্তান ভেঙে আজকের পৃথক রাষ্ট্র বাংলাদেশের উদ্ভব হতে পেরেছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত না হলে আজকের স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের উদ্ভব যে হতে পারত না, সেটা ধরে নেয়া যেতে পারে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে। আজকের বাংলাদেশ ব্রিটিশ-ভারত বিভক্ত হয়ে হয়নি, তার উদ্ভব হয়েছে সাবেক পাকিস্তান ভেঙে। সাবেক পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ছিল ১৭০০ কিলোমিটারের ভৌগোলিক ব্যবধান। ব্যবধান ছিল মানবধারার। ব্যবধান ছিল ভাষার, ব্যবধান ছিল ইতিহাসের। এসব কিছুকে মিলিয়ে নিয়ে বিচার করতে হয় আজকের পৃথক রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্মকথাকে। আজকের পৃথক রাষ্ট্র বাংলাদেশ সৃষ্টি হতে পেরেছে বাংলাভাষী মুসলমানের সংগ্রামের ফলে। বাংলাভাষী হিন্দু কোনো দিনই চাননি ভাষার ভিত্তিতে একটা পৃথক স্বাধীন দেশ গড়তে। তারা বিশ্বাস করেছেন ভারতীয় জাতীয়তাবাদে। বেঁচে থাকতে চেয়েছেন ভারতীয় মহা জাতির অংশ হিসেবে। তাদের আদর্শ হয়েছে ভারতীয় মহাজাতীয়তাবাদ; কোনো ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ নয়। ভারতের মধ্যে ভাষার ভিত্তিতে একটা পৃথক জাতি হতে চেয়েছেন তামিলরা কিন্তু বাংলাভাষী হিন্দুরা নন। বাংলা যাদের মাতৃভাষা তাদের শতকরা ৬০ ভাগের বাস আজকের পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশে। আর বাদবাকি শতকরা ৪০ ভাগের বাস ভারতে। রবীন্দ্রনাথের গান সব বাংলাভাষী মানুষেরই ভালো লাগে। কিন্তু এই গান সব বাংলাভাষী মানুষকে নিয়ে আসতে পারেনি কেবলমাত্র একটি রাষ্ট্রের পতাকা তলে। রবীন্দ্রনাথ ভারতের হিন্দু সভ্যতার জয়গান করেছেন। ফিরে যেতে চেয়েছেন বৈদিক সমাজজীবনে। কিন্তু তিনি পৃথক বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গড়বার কোনো প্রস্তাব রাখেননি তাঁর কোনো লেখায়। পৃথক বাংলাদেশ হওয়ার মূলে তাই কাজ করেনি রবীন্দ্রদর্শন। এর মূলে কাজ করেছে বাংলাভাষী মুসলমানের একটা পৃথক ইতিহাসের ধারা। যে ধারাকে অস্বীকার করে আজকের বাংলাদেশের জন্ম-পরিচয় বোঝা সম্ভব হতে পারে না। বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস নিয়ে এখনো যথেষ্ট গবেষণা হয়নি। কিন্তু অনুমান করার কারণ আছে যে, অতীতে বাংলাদেশে হিন্দুরা নন, মহাজন বৌদ্ধরা বিশেষভাবে গ্রহণ করেন ইসলাম ধর্ম। হিন্দুরা মুসলমানদের বিদ্রুপ করতেন ‘নেড়ে’ হিসেবে। বৌদ্ধরা মস্তক মুণ্ডায়ন করতেন, তাই তাদের বলা হতো নেড়ে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে দলে দলে বৌদ্ধ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতেও গ্রহণ করেছেন ইসলাম। এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচার হয়েছে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে। এ অঞ্চলের সাথে প্রাচীন বাংলাদেশের ছিল বিশেষ বাণিজ্যিক যোগাযোগ। এই অঞ্চলের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করার ফলে বাংলাদেশেও এসে পড়তে পেরেছিল ইসলামের ব্যাপক প্রভাব। হতে পেরেছিল ইসলাম প্রচার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো বাংলাদেশের মুসলমানও লুঙ্গি পরেন। এক সময় এ দেশে হিন্দুরা লুঙ্গি পরতেন না। লুঙ্গিকে ঘৃণা করতেন মুসলমানি বা নেড়েদের পোশাক হিসেবে। যদিও বাড়ির ধারে মিয়ানমারের মানুষ পরেছে লুঙ্গি। লুঙ্গি শব্দটা বর্মি ভাষার। বাংলাদেশে হিন্দু ও মুসলমান ঠিক একভাবে চিন্তা করেনি। সমাজজীবনে থেকেছে হিন্দু-মুসলমান পার্থক্য। যে স্বাতন্ত্র্যবোধ এখনো কাজ করে চলেছে বাংলাদেশে। পৃথক বাংলাদেশের মূল ভিত্তি হলো বাংলাভাষী মুসলমান। বাংলাদেশে মুসলমানরা একটি সম্প্রদায় নয়। তারা হলেন এ দেশের জাতিসত্তার মূল বুনিয়াদ, যা কিছু এ দেশের মুসলিম মানসকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে তা বাংলাদেশকে রক্ষা করবার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হয়ে উঠতে বাধ্য। এবার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খুব ঘটা করে দুর্গাপূজা হতে দেখা গেল। পত্রপত্রিকায় লেখা হলো দুর্গাপূজা হলো বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি। দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় পূজা। কিন্তু বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসের সঙ্গে তা আদৌ সম্পৃক্ত নয়। আজ বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের ইতিহাসকে অস্পষ্ট করে তোলা হচ্ছে। বাঙালি সংস্কৃতির নামে প্রশ্রয় পেতে পারছে হিন্দুত্ব, যা আমাদের জাতিসত্তার স্বতন্ত্র পরিচয়ের ক্ষেত্রে সৃষ্টি করেছে নানাভাবেই বিভ্রান্তি। এর মূলে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মহলবিশেষের নস্যাৎ করবার নেপথ্য অভিলাষ, যা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ছত্রছায়ায় পেতে পারছে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বিশেষ প্রশ্রয়। এই উপমহাদেশে এক সময় উদ্ভব হতে পেরেছিল ৪টি পৃথক স্বাধীন মুসলিম সালতানাতের। এরা হলোÑ বাংলা, মালোব, গুজরাট ও কাশ্মির। মালোবের অধিকংশটাই এখন হলো ভারতের মধ্যপ্রদেশের অন্তর্গত। যাকে এক সময় বলা হতো মালোব, তার উত্তরে হলো চম্বল। দক্ষিণে হলো নর্মদা নদী। পশ্চিমে হলো বর্তমান গুজরাট আর পূর্বে হলো বুন্দেলখন্ড। সাবেক মালোব এখন হয়েছে বিলুপ্ত। যদিও কিছু স্বতন্ত্র চেতনা বিরাজ করছে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে। গুজরাটে চলছে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ। গুজরাটে মুসলমানের সংখ্যা হলো শতকরা ৩০ ভাগের কাছাকাছি। গুজরাট এখন ভারতের অঙ্গরাজ্য। গুজরাটের উত্তর ভাগ পাকিস্তানের সাথে লাগোয়া। কাশ্মিরে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। কাশ্মিরি মুসলমানেরা ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন একটা পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গড়বার লক্ষ্যে। শোনা যায়, এই জন্য ইতোমধ্যে ভারতীয় সৈন্যের হাতে ৮০ হাজারের ওপর মানুষকে সেখানে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। মানুষ সেখানে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়বার জন্য মরণপণ লড়াই করছে।
বালাদেশের জাতিসত্তার ইতিহাস বিশ্লেষণে স্বাধীন সুলতানি আমলের ইতিহাস হয়ে আছে বিশেষভাবে স্মরণীয়। এই আমলেই বিশেষভাবে ঘটতে পেরেছে বাংলা ভাষার বিকাশ, এর আগে নয়। এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন ড. দ্বীনেশচন্দ্র সেন তাঁর বিখ্যাত History of the Bengali Language and Literature বইতে, যা ১৯১১ সালে প্রকাশ করা হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বাংলাভাষা আজকের বাংলাদেশের জাতিসত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু মুসলিম নৃপতিদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই স্বাধীন সুলতানি আমলে হতে পেরেছে এর বিশেষ বিকাশ। সুলতানি আমলের আগে কোনো বাংলা পুঁথি পাওয়া যায়নি। চর্যাপদকে ঠিক বাংলাভাষার নিদর্শন বলা যায় কি না তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। চর্যাপদের ভাষা এখন আর আমরা বুঝি না। কিন্তু স্বাধীন সুলতানি আমলের বাংলা পুঁথি পড়ে আমরা সহজেই যা বুঝতে পেরে থাকি। এ পর্যন্ত সর্ব প্রাচীন যে বাংলা পুঁথি আবিষ্কৃত হয়েছে, তা হলো, ‘ইউসুফ জুলেখা’। এর রচক হলেন শাহ মুহাম্মদ সগির (সগিরি)। এক সময় মনে করা হতো বাংলাভাষার সর্বপ্রাচীন পুঁথি হলো বড়–চণ্ডী দাশের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। কিন্তু এখন আর তা মনে করা যাচ্ছে না। এখন শাহ মুহাম্মদ সগিরের রচিত ইউসুফ জুলেখাকে দিতে হচ্ছে অগ্রাধিকার। শাহ মুহাম্মদ সগিরের ওপর পড়েছে ইরানি কবি জামির প্রভাব। ফারসি রোমান্টিক কাব্যের প্রভাবে বাংলাতে শুরু হয় রোমান্টিক কাব্যের সূচনা। একটা বাঙালি মনোভাবের পরিচয় গড়ে উঠেছিল বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলেই। বাবর তার আত্মজীবনীতে বাংলার বিখ্যাত সুলতান নুসরাত শাহ (১৫১৮-১৫৩২ খ্রি.)কে উল্লেখ করেছেন, সুলতান নুসরাত শাহ বাঙালি হিসেবে। বাংলার কোনো নৃপতির নামের সাথে এভাবে বাঙালির বিশেষণটি আগে আর কখনো সংযুক্ত হতে দেখা যায়নি। আজকের বাংলাভাষী মানুষের জাতিসত্তার পৃথক পরিচয়কে ব্যাখ্যা করতে হলে তাই স্বাধীন সুলতানি আমলের ইতিহাস চর্চা আবশ্যিক হয়ে ওঠে। বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের ইতিহাসের আরম্ভ ধরা হয় ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে, যা চলেছিল প্রায় ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। অর্থাৎ আকবরের বাংলা অধিকারের আগে পর্যন্ত। বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের প্রতিষ্ঠা করেন ফকর-উদ-দীন মুবারক শাহ। মুঘল শাসনামলে বাংলায় চলেছে নানা বিদ্রোহ। বাংলার মানুষ মুঘল শাসনকে মেনে নিতে পারেনি। ভাবতে পারেনি আপন।
এই উপমহাদেশে পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। এই মুসলিম জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হতে পারে ব্রিটিশ শাসনামলের বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতে। যারা ভারতের মুসলমানদের মধ্যে প্রায় শতকরা ৩৩ ভাগ মুসলমান ছিলেন বাংলাভাষী। বাংলাভাষী মুসলমানদের সকলে না হলেও অধিকাংশ সমর্থন করেন পাকিস্তানের দাবিকে। ফলে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্র। যার দুই অংশ ছিল ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন। এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা সাবেক পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে সৃষ্টি করে একটা পৃথক জাতীয়তাবোধ, যা আবার মুসলিম জাতীয়তাবাদ থেকে হয়ে ওঠে অনেক ভিন্ন। সাবেক পাকিস্তানের অধিকাংশ নাগরিক বাস করতেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে, যাদের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোট রাজস্বের অর্ধেকের বেশি রাজস্ব প্রদান করতেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল ভিত্তি ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের পাট। কিন্তু সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলাভাষী মুসলমান কুড়াতে থাকেন অবহেলা, যা তাদের পৃথক জাত্যাভিমানকে তীব্র করে তুলে। আর এটা শেষ পর্যন্ত অনিবার্য করে তোলে পৃথক স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকে। সাবেক পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক কাঠামোর মধ্যে বাংলাভাষী মুসলমানদের অবহেলা কুড়াবার একটা কারণ ছিল, তখনকার প্রশাসনে উর্দুভাষী মুসলমানের প্রাধান্য। উর্দুভাষী মুসলমানরা বড় চাকরি করতেন। তারা পাকিস্তানে এসেছিলেন প্রধানত ভারতের উত্তর প্রদেশ ও অন্য উর্দুভাষী অঞ্চল থেকে। উর্দু আসলে পাকিস্তানে কোনো অঞ্চলের মানুষেরই মাতৃভাষা ছিল না। সাবেক পাকিস্তানের পশ্চিম ভাগে মানুষ কথা বলত পাঞ্জাবি, পশতু, সিন্ধি ও বালুচি ভাষায়। তবে পাঞ্জাবে উর্দু ছিল যথেষ্ট প্রচলিত। পাঞ্জাবের উচ্চবিত্তরা উর্দু বলতেন। পাঞ্জাবিরা কাজ করেছেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে। ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে চলতো উর্দু ভাষা। কবি ইকবাল কবিতা লিখেছেন ফারসি ও উর্দু ভাষায়, তাঁর মাতৃভাষা পাঞ্জাবিতে নয়। যদিও তাঁর উর্দু সমালোচিত হয়েছে পাঞ্জাবি প্রভাবিত হিসেবে। বর্তমান পাকিস্তানে ভারত থেকে উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া উর্দুভাষী মুসলমানদের সঙ্গে ভিন্নভাষী মুসলমানদের বনিবনা হচ্ছে না। সিন্ধিরা মোটেও পছন্দ করছেন না ভারত থেকে যাওয়া উর্দুভাষী মুসলমানদের। ভারত থেকে যাওয়া উর্দুভাষী মুসলমানরা সিন্ধুর রাজধানী করাচিতে (করাচিট্টা) এখন হয়ে উঠেছেন সংখ্যাগুরু আর সংখ্যা লঘু হয়ে উঠছেন সিন্ধিরা। কিন্তু করাচির বাইরে সিন্ধিরা এখন বিশেষভাবে আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছেন তাদের মাতৃভাষা সিন্ধিকে। পাকিস্তানে ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তার সমস্যা যথেষ্ট জটিল হয়েই উঠেছে। কিন্তু বিভিন্ন জাতিসত্তা সেখানে এখনো একত্র হয় আছে ভৌগোলিক একত্বের কারণে, যা সাবেক পাকিস্তানে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সম্ভব হয়নি। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্রেট ব্রিটেনের অধীনতা থেকে স্বাধীন হতে চেয়েছে। এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন হয়েছে। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো বলছে ইংরেজি ভাষাতেই কথা। ইংরেজি না জানলে কেউ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে পারে না। ভাষা নয়, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা একটি জনসমষ্টিকে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে উজ্জীবিত করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বিশেষ দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশকেও ধরা যায় ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাজনিত কারণে একটা পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সাবেক পাকিস্তান আর নেই। সাবেক পাকিস্তানে বাংলাভাষী মুসলমানের রাজনীতি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধ দ্বারা বিশেষভাবে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের বাংলাভাষী মুসলমানের মধ্যে জেগে উঠেছে ভারতীয় আধিপত্যবাদ-ভীতি, যা তার রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনাকে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে চাচ্ছে। চীন এক সময় চেয়েছিল নেপাল, সিকিম ও ভুটানকে একত্রিত করে একটি হিমালয়ান ফেডারেশন গড়তে। চীন যাতে এটা করতে না পারে সে জন্য ভারত ১৯৭৫ সালে সিকিম দখল করে। বাংলাদেশে বাড়ছে চীনের প্রভাব। ভারতের চীনভীতি তাকে বাংলাদেশ দখলে উদ্বুদ্ধ করে কি না সেটা অনুমান করা যাচ্ছে না। তবে সাধারণভাবে বাংলাভাষী মুসলমান চাচ্ছে না সিকিমের ভাগ্য বরণ করতে। আজ ৪৫ বছর হলো বাংলাদেশ একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে। আর সে চাচ্ছে স্বাধীনভাবেই টিকে থাকতে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ লড়াই করেছে স্বাধীন হওয়ার জন্য। আর এখন সে প্রস্তুত থাকতে চাচ্ছে স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধের জন্য। আর বাংলাদেশের এই বাস্তবতাকেই আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে।
বাংলাদেশের আগামী ইতিহাস কেবল বাংলাদেশের ভেতরকার ঘটনাপ্রবাহ দ্বারাই যে নিয়ন্ত্রিত হবে তা মনে করবার কারণ নেই। এ অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশকে প্রভাবিত করছে। ১৯৭১-এর বিশ্বরাজনীতি আর বর্তমান বিশ্বরাজনীতি এক হয়ে নেই। ১৯৭১-এ ভারত ও তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল এক অক্ষে। কিন্তু এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ভারত হয়ে উঠেছে পরস্পরের প্রগাঢ় মিত্র। একদিকে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন করছে সামরিক জোট। দেখা দিচ্ছে বড় রকমের যুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে হতে হবে এমন যে, সে যাতে এই যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে।

SHARE