বিজয়ের ৪৩ বছর কী চেয়েছি কী পেয়েছি

মুহাম্মদ আবদুল জব্বার #

Prochched১৯৭১ সাল। একটি ইতিহাস। একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। দীর্ঘ শোষণ বঞ্চনার নাগপাশ থেকে মুক্তির তাড়নায় ছিনিয়ে আনা নির্মল সবুজ একটি ভূখন্ড। শত চড়াই উতরাই পেরিয়ে আজকের এ অর্জন। ৪৩ বছর একটি নবজন্মা দেশের জন্য খুব বেশি সময় না হলেও কম সময় নয়। এই ভূখন্ডকে ঘিরে আমাদের প্রত্যাশার কমতি ছিল না, এখনো এক বুক আশা বুকে চেপে বেঁচে থাকার সোনালি স্বপ্ন দেখে দেশের মানুষ। যদিও বা এ দেশ বিশ্বদরবারে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়েছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলে পিষ্ট হয়ে চলছে। নানা ধরনের ঘৃণ্যতর চক্রান্তের পদাঘাতে দেশ আক্রান্ত হলেও জনগণের দেশের প্রতি আকুণ্ঠ ভালোবাসা ও পরিশ্রমপ্রিয়তার কারণে দেশ এখনো মেরুদন্ডহীন হয়নি। শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতাকে দেশের উন্নয়নে ব্যবহার না করে নিজেদের আখের গোছানোর সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্য দিকে সাধারণ মানুষ তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম দিয়ে তিলে তিলে দেশকে গড়তে নিরন্তর চেষ্টা চালাছে। বিচারের নামে অবিচার, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীনতা আমাদের অস্তিত্বকে চুরমার করে দিয়ে এক নতুন প্রেতাত্মা জাতির ঘাড়ে ভর করেছে। এরপরও আমরা আশা নিয়ে বেঁচে থাকি কারণ আমাদের তরুণরা মেধাবী ও সাহসী। তাদেরকে যদি আজ সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া যায় তাহলে দেশ এগিয়ে যাবে। মাথা উঁচু করে বিশ্বদরবারে স্থান করে নেবে আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ।

আমাদের প্রত্যাশা
স্বাধীনতার মুক্তির সংগ্রামে যারা সেদিন অংশগ্রহণ করেছিল তাদের প্রত্যেকের তীব্র আকাক্সক্ষা ছিল আমরা স্বাধীন সার্বভৌম একটি বাংলাদেশ পাবো। যেখানে কারো তাঁবেদারি থাকবে না। গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন সুদৃঢ় ঐক্যের বাংলাদেশ। থাকবে না রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন; থাকবে অর্থনৈতিক সুদৃঢ় ভিত্তি। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আমরাও এগিয়ে যাবো সমভাবে। সুসম্পর্ক থাকবে প্রতিবেশী দেশের সাথে, আমাদের কোন বন্ধু অবয়বে শত্রু থাকবে না, এ দেশের প্রতি থাকবে না খবরদারি; থাকবে শুধু বন্ধুত্ব ও পরস্পর সহযোগিতার সম্পর্ক।

আমাদের প্রাপ্তি
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক কিছু সা¤্রাজ্যবাদীরা নিয়ে গেলেও আমরা একটি সমৃদ্ধ ভাষা পেয়েছি। যার অবস্থান পৃথিবীতে ষষ্ঠ। লাল-সবুজের এমন একটি পতাকা পেয়েছি যে পতাকাটি পৃথিবীর অন্য যে কোন দেশের পতাকার চেয়ে সুন্দর, যেমন সুন্দর এখানকার চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য। এমন একটি ভূখন্ড পেয়েছি যে ভূখন্ডটি এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিধিজুড়ে। পূর্বদিকে সুবিশাল বঙ্গোপসাগর, অন্য তিন দিকে ভারত ও মিয়ানমার দ্বারা বেষ্টিত। জনসংখ্যা সাড়ে সাত কোটি মানুষের ১৪ কোটি হাত নিয়ে এর যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ছাড়িয়ে। এখানের মানুষ অসম্ভব পরিশ্রমপ্রিয়, অল্পে তুষ্ট। আমরা পেয়েছি একটি উর্বর ভূমি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনুপম বাংলাদেশ।

সম্ভাবনার বাংলাদেশ : মৌলিক অপ্রাপ্তি
স্বাধীন হওয়ার পর রাজনৈতিকভাবে ভারত বাংলাদেশকে তাদের করদরাজ্যে পরিণত করতে অব্যাহত রেখেছে নানামুখী আগ্রাসন। অন্য দিকে আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে ঘায়েল করার বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশকে তাদের ফাইটিং জোন হিসেবে প্রস্তুত করতে চায়, কারণ এই দেশটি ভৌগোলিকভাবে চীনকে আক্রমণ করার সবচেয়ে উপযোগী ভূমি। ভারত এককভাবে এতদঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করুক সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নারাজ। তাদের বৃহত্তর স্বার্থে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেও মূলত ভারতকে কাজে লাগিয়ে এতদঞ্চলে চীনের একক আধিপত্য খর্ব করাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য। ভারত এক সময় চীনের মতো অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে উন্নীত হোক এটি কোনো ভাবে চাইবে না, কারণ এশিয়া মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বিস্তারে চীন একমাত্র বাধা আবার এর ভেতর নতুন কোন বিষফোঁড়া গজে উঠুক তারা তা হতে দেবে না। এ কারণে বিশ্ব মিডিয়ায় প্রচারিত সংবাদমাধ্যমগুলো ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনুমান করা যায় যে ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলো সময়ের ব্যবধানে ভাঙনের কাজে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে যাচ্ছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। সময়ে সময়ে ভারতের দাঙ্গাগুলো রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণকে অতিশয় সত্য প্রমাণিত বলে প্রমাণিত করে। দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র নিয়ে আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র্রগুলো এগিয়ে চলছে। দেশের সচেতন নাগরিকেরা উদ্বিগ্ন, না জানি কখন এমন একটি সম্ভাবনাময়ী অঞ্চলকে বাংলাদেশ হারাবে!

স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব কতটুকু নিরাপদ
৪৩ বছর পরেও আমাদের ভাবতে (!) হয় আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব কতটুকু নিরাপদ। পাশের দেশের ফরমায়েশি দেশের জনগণকে বিষিয়ে তুলেছে। আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অলিখিতভাবে তাদের হাতে। প্রতিনিয়ত সীমান্তবর্তী মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণায় প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিক দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমাদের পাশের দেশ বন্ধুত্বের প্রশ্নে কতটুকু উত্তীর্ণ। আমরা যেন স্বাধীন দেশের বন্দি নাগরিক। এমন পরিস্থিতিতে বারবার প্রশ্ন জাগে আমাদের কষ্টের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ফসল কী? এমন আচরণ নিশ্চয় কোন প্রতিবেশী দেশের আচরণ হতে পারে না। আমাদের দেশ থেকে ওরা নেবে আর নেবে আমরা সব বিলিয়ে দেবো এ যেন মগের মুল্লুক, আমরা জীবিত থেকেও মৃত লাশ। আমরা এমন স্বাধীনতা চেয়েছিলাম যেখানে থাকবে না কোনো বঞ্চনা ও অধিকার আদায়ের পুনঃপুন আন্দোলন। আমরা চেয়েছিলাম হাতে হাত রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বাংলাদেশ। যে দেশটি বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, প্রমাণ করবে আমরা সার্বভৌম আমরা স্বাধীন।

গণতন্ত্রের পরিবর্তে রাজতন্ত্রের কবলে বাংলাদেশ
একটি দেশকে গণতন্ত্রের ফ্রেমে বন্দি করা যায়, গণপ্রজাতন্ত্রী দেশ সরকার বলা যায় কিন্তু বাস্তবতা এর পুরো উল্টো। আমাদের দেশের রাজনীতি রাজতন্ত্রের ফ্রেমে আবদ্ধ সেই সূচনালগ্ন থেকে। এখানে শেখ পরিবার, এরশাদেও স্বৈরশাসন ও জিয়া পরিবারই গণতন্ত্র! এমনকি শুধু রাষ্ট্র পরিচালনায় নয়, দল পরিচালনায়ও চর দখলের মতো শীর্ষ স্থান দখল করে আছে সেই পরিবারগুলো। তীর্থের কাকের মতো দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে চেপে বসা এই নেতাদের পড়ন্ত বেলা কবে শেষ হবে? কবে যোগ্যতার ভিত্তিতে গণন্ত্রের ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের পক্ষের ব্যক্তি সরকারে বা দলের কান্ডারি হবে? যে নেতাদেরকে দেশের মানুষ অভিশপ্ত করার পরিবর্তে ভালোবাসা ও ভালো লাগার জায়গায় স্থান দেবে। শত্রু নয় বন্ধু হিসেবে সবাই সবার তরে দেশমাতৃকার জন্য একযোগে কাজ করবে, এগিয়ে যাবে প্রিয় বাংলাদেশ। কে জানে? কখন এমন হবে? কখন আমরা বলব এই আমাদের প্রিয় স্বপ্নের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কবলে দেশ
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কথা অনেক দেশের মানুষ শোনেনি। কিন্তু আমাদের দেশ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়েছে বহু আগে। এখানকার লোকেরা খুব রাজনীতি সচেতন। রাজনৈতিক ঝড়ো হাওয়া সেই অজপাড়াগাঁয়ের চা দোকানের চায়ের কেতলি-কাপে ধুয়া তুলে। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী হাইকমিশনার ড্যান ডব্লিউ মজিনা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের ডিএনএ-তেও রাজনীতি পাওয়া যাবে!’ কথায় প্রচলিত আছে- রাজনীতিবিদরা রাজনীতি বা দেশ চালান না সা¤্রাজ্যবাদীরাই দেশ চালান। অধিকাংশ রাজনীতিবিদ সা¤্রাজ্যবাদীদের দোসর হয়ে কাজ করছে।

অনৈক্যের বাংলাদেশ
একটি জাতির জন্য ৪৩ বছর কম সময় নয়। আমাদের অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে দেশ যতটা না সামনে এগোচ্ছে তার চেয়ে বেশি পিছু হটছে। দেশে মীমাংসিত ইস্যুগুলোকে নিয়ে যারা পুনরায় দেশে বিভক্তির রেখা টেনে দিচ্ছেন তারা মূলত নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন।
একটি দেশ সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনৈক্য সবচেয়ে বড় অন্তরায়। আমরা আফ্রিকান শ্বেতাঙ্গ নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারিনি। তিনি বিরোধী পক্ষের রোষানলে পড়ে ফ্যাসিস্ট রাজনীতির জাঁতাকলে ২৭ বছর কারাবরণ করেছিলেন। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বিরোধী শিবিরকে ক্ষমা করে দিয়ে তিনি আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ লাভ করেন। বিশ্বব্যাপী দলমত নির্বিশেষে সবাই তাকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অথচ আমাদের দেশে মীমাংসিত একটি বিষয় নিয়ে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য মৌলবাদী, রাজাকার, আলবদর, মানবতাবিরোধী অপরাধ, নানা ষড়যন্ত্রে বিচারের নামে অবিচার শুরু করেছে। যে বিচারব্যবস্থার অস্বচ্ছতার ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের আইন বিশেষজ্ঞরা কথা বলেছেন। যারাই শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ করেছেন, সরকার তাদেরকে রাষ্ট্রদ্রোহী বানিয়েছে, আইন আদালতের ফেরফোকরে অতিষ্ঠ হয়ে পিষ্ট হয়েছে তাদের জীবন। এমন বিভক্তি আর শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব নিয়ে আইনের অপব্যবহার করা সম্ভব কিন্তু একটি দেশকে প্রত্যাশিত মঞ্জিলে উন্নীত করা অসম্ভব।

ধর্মীয় স্বাধীনতাকে দমন
বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ। এখানকার কৃষ্টি কালচার কখনো ধর্মের বিরোধী নয়। তারা তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে মিলিয়ে জীবনাচরণ পরিচালনা করে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ফরামায়েশদারির আনুগত্য করতে গিয়ে দেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে উল্লেখ করলেও মূলত এখানকার মানুষের কর্ম ও বিশ্বাস থেকে ইসলামকে বিদায় করতে পারেনি। বারবার প্রমাণিত হয়েছে যেখানে যত বাধা এসেছে এর অগ্রযাত্রা আরো বেশি শাণিত হয়েছে। এখানে যার যার ধর্ম সে ধর্মের অনুসারীরা পালন করবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করতে গেলে এখানে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয় প্রতিটি পরতে পরতে। মাঝে মধ্যে সরকারের আচরণ পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয় এখানে সংখ্যালঘুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কারণ তাদের আচার অনুষ্ঠানে সরকারি বা বেসরকারি কোনো বাধা বিপত্তি নেই। আর দেশের প্রধান সঞ্চালকরা মুসলমান নামধারী হলেও তারা স্বধর্মের সাথে অমুসলিমসুলভ আচরণ করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। ৫ মে শাপলা চত্বরে বাংলাদেশে যে গণহত্যা ঘটেছে তা কারবালার প্রান্তর ও স্পেনের গ্রানাডা ট্র্যাজেডিকে হার মানিয়েছে বহু আগে।

দরিদ্রতার কবলে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের প্রধানতম সমস্যা হল দরিদ্রতা। দরিদ্রতা দূরীকরণের জন্য প্রয়োজন সুশিক্ষা ও কর্মসংস্থান। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। না খেয়ে দরিদ্রতার কশাঘাতে পিষ্ট হয় মানুষ মরার খবর এখনো খবরে প্রকাশিত হয়। শাসকদের ভাগ্যের চাকা ঘোরে কিন্তু কোন পরিবর্তন হয় না অভাগা জনগোষ্ঠীর। নেতাদের চাকচিক্যতায় আর বিত্তবৈভব দেখলে বিশ্বের কেউ মনে করবে না এখানকার মানুষ দরিদ্রসীমার মাঝে বাস করে। সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমান অষ্টম জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বলেছিলেন, ‘বিদেশে গিয়ে আমরা যখন দেশের নানা সমস্যার কথা বলে সাহায্য চাই, তখন আমাদেরকে বিদেশী বন্ধুরা তচ্ছু-তাচ্ছিল্য করে বলে, তোমাদের দেশের লোকেরা খেতে পায় না অথচ তোমরা পাজারো গাড়ি হাঁকাও! তোমাদের লজ্জা থাকা উচিত।’ আসলেই মন্তব্যটি আমাদের জন্য লজ্জাজনক হলেও নিজেদের বোধোদয় হওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের কোন সরকারই কর্মমুখী শিক্ষা ও দরিদ্রতা বিমোচনে বাস্তবমুখী টেকসই কর্মসূচি গ্রহণ করতে না পারায় সমসাময়িককালে স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশ মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো কোন চমক লাগানো পরিবর্তন আনতে পারেনি। উল্লিখিত দেশগুলোর জনগণ যেখানে দেশের সম্পদ সেখানে আমাদের দেশের বহুল জনসংখ্যাকে মনে করা হয় বোঝা।

অর্থনৈতিক বৈষম্যের জাঁতাকলে পিষ্ট সমগ্র জাতি
বাংলাদেশ পাকিস্তানের বৈষম্যের অক্টোপাস থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বনির্ভর অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দন্ডায়মান হবে এটিই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের অর্থনীতির চাবিকাঠি অন্যদের হাতে। মুক্ত বাণিজ্যের নামে গার্মেন্টস সেক্টরে চলছে ভয়াবহ অরাজকতা। যেখানে আমরা আমাদের দেশীয় উৎপাদনে স্বয়ংসম্পন্ন সেখানে পাশের দেশের আমদানি করা নিম্নমানের পণ্যে বাজার সয়লাব। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সরকারিভাবে উল্লেখযোগ্য কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেনি। কলকারখানা পাকিস্তান আমলে যা হয়েছিল তাও এখন বন্ধ প্রায়। দেশের যা কিছু অগ্রগতি হয়েছে প্রাইভেট সেক্টরের কারণে। বৈদেশিক মুদ্রার আয় আমাদের রাজস্ব আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যারা কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশ পাড়ি জমায় তারা অধিকাংশ অশিক্ষত-স্বল্প শিক্ষিত ও অদক্ষ শ্রমিক। পররাষ্ট্রনীতির অদক্ষতার কারণে আমাদের দেশের বাইরের কাজের পরিধিও কমে যাচ্ছে। এর উন্নয়নে সরকারের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় না।

দুর্নীতির অতল গহিনে বাংলাদেশ
একটি দেশ এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনীতি একটি বড় চালিকাশক্তি। সে অর্থব্যবস্থার ভিত যদি সুদৃঢ় হতে না থাকে তাহলে রাষ্ট্রের পক্ষে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা করা দুরূহ ব্যাপার। তাই প্রয়োজন স্থিতিশীল অর্থব্যবস্থা। আর যে দেশের প্রতিটি সেক্টর দুর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে প্রতিবছর শীর্ষস্থান দখল করে নেয় সে দেশে স্থিতিশীল অর্থব্যবস্থার প্রত্যাশা আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া কী হতে পারে? দেশ এখন তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের অফিস থেকে প্রধানমন্ত্রীর দফতর পর্যন্ত ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। স্বয়ং আওয়ামী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছেন, ‘ঘোষ বৈধ!’ রাষ্ট্রের অতি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই দুর্নীতির কবলে পড়ে সেই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়, আবার সে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রীয় সংস্থা কর্তৃক দেশপ্রেমিক(!) বলে সার্টিফিকেট পায় এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে? এমন ব্যাধি থেকে মুক্ত হওয়া একটি রাষ্ট্রের জন্য সাংঘাতিক চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সর্বস্তরে সৎ যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের পাশাপাশি সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণের পরিবর্তে দলীয় বিবেচনায় ঘুষের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তরা দেশকে এর চাইতে ভালো কী উপহার দিতে পারবে? সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ছাত্রলীগের এক সমাবেশে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘তোমরা বিসিএস পরীক্ষায় লিখিত ভালো করো। বাকিটা আমরা দেখব।’ রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তির এমন বক্তব্য মেধাবী জনগোষ্ঠীকে মারাত্মকভাবে মর্মাহত করেছে। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড় প্রবাদ প্রবচনে সীমাবদ্ধ রাখতেই আমাদের নেতারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। নিজের আখের গোছাতেই সবাই ব্যস্ত। তাই দুর্নীতির ঘোড়া ক্রমেই আমাদেরকে দাবিয়ে বেড়াচ্ছে।

বিচারের নামে অবিচার
দেশের শাসকরা যতই জবাবদিহিতার বাইরে থাকার চেষ্টা করুক না কেন আইনের কাঠগড়ায় সবাইকে দাঁড়াতে হবে। এটাই আইনের অমোঘ নীতি। আমাদের বিচারব্যবস্থার বিচারকদের প্রতি সাধারণ মানুষের যে আস্থা ও বিশ্বাস অর্জিত হয়েছিল তা এখন শূন্যের কোটায় বলে অনেকেই মনে করেন। কারণ শাসকদের ইশারায় এখন বিচার চলে, বিচারকদের হাত-পা-চোখ কার্যত বাঁধা। বিচারকরা আইনের বিবেচনায় বিচারকার্য পরিচালনা বাদ দিয়ে দলীয় বিবেচনায় বিচারকার্য শুরু করেছেন। একটি দেশের নিরপরাধ মানুষের সর্বশেষ নিরাপদ জায়গা আদালত যদি অনিরাপদ হয়ে যায় তার চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কী হতে পারে? স্বয়ং আইন যখন দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য দিয়ে নিজেই অসহায় ভুক্তভোগী বিচার প্রার্থীর বুকে গুলি চালায় তখন দেশে আচার বিচারের কী বেহাল অবস্থা তা বুঝতে খুব জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। দেশে এখন ১৯৭১ ইস্যুকে সামনে রেখে একটি বিশেষ দলকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্মূল করার জন্য আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের নামে আদালত গঠন করা হয়েছে। গঠিত এই আদালতের ব্যাপারে দেশে ও দেশের বাইরে সর্বমহলে বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও অবৈধ সরকার রাজনৈতিক হত্যায় মরিয়া হয়ে উঠেছে।

৪৩ বছর পরও অবৈধ সরকারের দেশ পরিচালনা!
একটি দেশের বয়স যত বাড়তে থাকে তার ঐক্য, সংহতি, গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রপরিচালনা সুদৃঢ় হতে থাকে দেশের প্রজাতান্ত্রিক পদ্ধতির ওপর। আমাদের দেশটি গণপ্রজাতান্ত্রিক সরকার নামে পরিচিত। নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে গণতন্ত্রের পথে দেশ হাঁটা শুরু করলেও শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রয়োজনে গণতন্ত্র-স্বৈরতন্ত্র এক সাথে সব গুলিয়ে ফেলে। এখনও আমাদের বলতে হয় দেশে অবৈধ ও অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা পরিচালনা করছে। সরকারের মদদপুষ্ট প্রশাসনযন্ত্র সরকারের নির্দেশে নির্বিচারে তার দেশের নাগরিকের ওপর গুলি চালাচ্ছে। এখানে জনমত উপেক্ষা করে আইনকে নিজেদের করায়ত্তে এনে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। দেশে কেয়ারটেকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য যে দল আন্দোলন করেছিল আবার ক্ষমতাকে চিরায়ত করার জন্য সে দলই সে ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে নিজেদের মতো করে নির্বাচন আয়োজন করে ৫% ভোটকে ৪৫% ভোট বানিয়ে নেহাত জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ (!), জনগণের রায় প্রতিফলিত হয়েছে বা জনগণ মেন্ডেট দিয়েছে বলে প্রচার করা এর চাইতে নিজের বিবেক ও জনগণের সাথে সম্মুখযুদ্ধ ঘোষণা ছাড়া কী বলা যেতে পারে?

শিক্ষাব্যবস্থা : সৎ ও দক্ষ, দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের অভাব
উপরের বর্ণিত যত অপ্রাপ্তি সকল অপ্রাপ্তির মূল গলদ নেতৃত্বের। নেতৃত্ব যদি সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক না হয় তাহলে সে দেশে নানামুখী অরাজকতা ও অশান্তি লেগেই থাকে। কাক্সিক্ষত নেতৃত্ব এমনি এমনি তৈরি হয় না, এর জন্য প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা। আর সে শিক্ষার পরিধি মূল গোড়া আমাদের শিক্ষানিকেতন, সমাজ ও পরিবার। যেকোনো উৎপাদনকেন্দ্রের মূল ইঞ্জিনে যদি গরবর থাকে সেখান থেকে টেকসই সামগ্রী উৎপাদন সম্ভব নয়। এখনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্রিটিশ বেনিয়াদের স্বার্থ হাসিল করার প্রয়াসে একদল কেরানি আর ভোগবাদী মানুষ সৃষ্টি করার বিকল ইঞ্জিন দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা চলছে। রক্তে মাংসে নামে মুসলমান হলেও আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জাহেলিয়াতের বিষবাষ্প অনুপ্রবেশ করেছে সাংঘাতিকভাবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা নামমাত্র থাকলেও এখানে পুঁজিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার শিক্ষা দেয়া হয়। অথচ মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হজরত মুহাম্মদকে (সা) প্রথম যে শিক্ষা দিয়েছিলেন তা হলো ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন (আল কুরআন)।’ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতে আগামী প্রজন্ম কথিত আধুনিক শিক্ষা লাভ করতে গিয়ে আল্লাহদ্রোহী হয়ে পড়ছে। সমাজ ও পরিবারে চলছে বুদ্ধিসঙ্কট। এখানে নিজেদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উপযোগী কত বেশি করা যায় তার চাইতে দুনিয়ার বাজারে যেকোনো মূল্যে নিজের প্রতিপত্তি কিভাবে বাড়ানো যায় তার নোংরা প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রতিযোগিতায় সন্তানের বাহ্যিক অর্জনের (শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ প্রতিপত্তি) জন্য যত আয়োজন, সন্তানের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য (নৈতিক চরিত্র, মানবিক মূল্যবোধ, পরকালীন সচেতনতা) বৃদ্ধির ব্যাপারে সমাজ বা পরিবারে কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না। যারা একটু আধটু চেষ্টা করে সমাজের এমন নাজুক পরিস্থিতিতে তাদের প্রচেষ্টায়ও ভাটা পড়েছে। দুনিয়ার সাময়িক আয়োজনের পেছনেই ছুটতে ছুটতে তারা হাঁফিয়ে উঠেছে। মানব জীবনের চূড়ান্ত পরিণতির বিষয়ে অবিশ্বাস বা অজ্ঞতার কারণেই বিশ্বমানবতার এমন বেহালদশা। তাই এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামীকরণ ব্যতীত প্রত্যাশিত নেতৃত্ব ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জাতির এমন বেহাল পরিস্থিতিতে সাহসিকতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য নেতৃত্ব আসা জরুরি।
দেশের এমন করুণ পরিস্থিতিতে ভালো মানুষের মন কাঁদে। তারা দেখেও না দেখার ভান করে, এড়িয়ে চলে। স্বদেশের প্রতিটি অপ্রত্যাশিত দুর্যোগ তাদের রঙিন স্বপ্নগুলো দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দিচ্ছে। যারা ভালো, যাদেরকে তাদের পরিবার প্রতিবেশী সমাজ ভালো বলে আখ্যায়িত কওে, তারা যদি প্রত্যাশিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সমাজের কোনো পরিবর্তন করতে না পারে তাহলে সে ভালো দিয়ে কী হবে? স্বপ্নচারীর মতো স্বপ্ন দেখা নেহাত বোকামি যদি সে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করার কোনো প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকে। ৪৩ বছরে অসংখ্য দুর্যোগের ঘনঘটা আর নানা অপ্রাপ্তিতে আমরা বেদনাহত হই, মুষড়ে পড়ি। এরপরও অজানা এক শক্তিতে বুক বেঁধে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস আমাদের তাড়িত করে। ১৬ কোটি মানুষকে যদি জাগাতে পারি, ঘুণে ধরা সমাজের সকল অনাচার যদি শুধরে নিতে পারি, নৈতিক শিক্ষার বলে বলীয়ান করতে পারি, তাহলে আমরাই হবো আমাদের তুলনা। সেই বিশ্বাসে আমাদের পথ চলা হোক দুর্বার, দুর্দমনীয়, অপ্রতিরোধ্য।
লেখক : কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply